![]() |
লেখক:DRM Shohagপর্ব:০৯--------------হাদি, নিলয়, সাজ্জাদ একসাথে রংপুরে মেসে থাকে। আর হৃদয় তার বাড়িতে। বাকিরা নিজেদের বাড়িতে। হাদির গ্রামের বাড়ি মূলত পাহাড়পুর গ্রামের মালঞ্চ গ্রামের পাশের গ্রামে। যেখানে একটি কুঁড়েঘরে তার দাদি আর এক ছোট্ট বোন থাকে। হাদির র’ক্তের সম্পর্কের পরিবার বলতে তার দাদি আর ছোট বোন। এরপর হৃদয় আর নিলয়ের পরিবার। প্রায় তিনটে টিউশন চলামন ছিল যা রেখে বন্ধুদের সাথে ক’দিন আগে গ্রামে যেতে পারেনি হাদি। আজ থেকে বেশ ক'দিন টিউশন ছুটি দিয়ে সে গতকাল রাতে গ্রামে যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকিট কে'টে রেখেছে। আজ সকালে হৃদয়দের বাড়িতে এসে এখান থেকেই স্টেশনের দিকে রওয়ানা হওয়ার জন্য মাত্র বাড়ি থেকে বের হয়েছে হাদি। দারোয়ান চাচাকে সালাম দিয়ে হাদি মাত্র মেইন গেইট থেকে বের হয়ে যায়। তখন-ই হৃদয়ের দাদু আরমান নওরোজের ডাকে হাদি পিছু ফিরে তাকায়। আরমান নওরোজ আর তার সবচেয়ে ছোট নাতনি হিয়া পাশাপাশি হেঁটে আসছে। আরমান নওরোজ ছোট নাতনির বাম হাত তার ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে রেখেছে। হৃদয়, হৃদম, হিমি এরা তিনজন আপন ভাইবোন হলেও তাদের ছোট বোন হিয়া তাদের সৎ বোন। অর্থাৎ আজাদ নওরোজ এর দ্বিতীয় স্ত্রীর মেয়ে হিয়া নওরোজ। হিয়ার বয়স ১৫ বছর। সে এবার ক্লাস নাইনে উঠেছে। হাদি আরমান নওরোজ এর দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে আছে। আরমান নওরোজ হাদির সামনে এসে মৃদুস্বরে বলে, “থ্যাংকিউ সো মাচ হাদি দাদুভাই, হৃদয় আর রজনীর ব্যাপারটি আমাকে জানানোর জন্য।” হৃদয় রজনীকে রজনীর বাড়ি রেখে আসতে যাচ্ছে এই কথাটি আরমান নওরোজকে বলার জন্যই মূলত ভদ্রলোক হাদিকে এভাবে বলছে। হাদি মৃদু হেসে বলেন, “আরে কিসের থ্যাংক্স ফ্যাংক্স দেন দাদুভাই। এসব রাখুন। কোথাও যা…..” হিয়ার দিকে চোখ পড়লে হাদি থেমে যায়। ছোটোখাটো গোলগাল চেহারার মেয়ে হিয়া। পরনে কালো বোরখা, কালো হিজাব। মেয়েটি দাদুর হাত ধরে হাদির দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। হাদি তার দিকে তাকাতেই দু'জনের চোখাচোখি হয়৷ মেয়েটি ল’জ্জা পেয়ে সাথে সাথে মাথা নিচু করে নেয়। হাদি নিজেও সাথে সাথে হিয়ার উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে আরমান নওরোজ এর উদ্দেশ্যে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে, “আসছি দাদু, আমার লেট হচ্ছে।” কথাটা বলে হাদি আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। দ্রুতপায়ে উল্টোদিকে এগোলো। আরমান নওরোজ কিছু বলার সুযোগটুকুও পেলেন না। হিয়া মুখ ফুলিয়ে চেয়ে রইল হাদির দিকে। দাদুর দিকে চেয়ে মৃদুস্বরে বলে, “দাদু উনি তো ট্রেনে করেই গ্রামে যাবেন। স্টেশন পর্যন্ত আমাদের গাড়িতে আসতে বলো।” আরমান নওরোজ মাথা নেড়ে গলা উঁচিয়ে ডাকলেন হাদিকে, “হাদি দাদুভাই আমাদের গাড়িতে এসো। একসাথে রেল- স্টেশনে যাই।” হাদির ভ্রু কুঁচকে যায়। সে বুঝল না হৃদয়ের দাদু স্টেশনে কেন যাবে! তবে সে পাল্টা প্রশ্ন করল না। ঘাড় ফিরিয়ে হিয়ার দিকে তাকালো একবার। এরপর দাদুর দিকে চেয়ে বলে, “আপনার নাতনির বুদ্ধিতে আপনার গাড়িতে উঠলে আপনার নাতি আমার কপাল ফাটাবে দাদু। আপনি আপনার মূর্খ নাতনির কথায় কান দিয়েন না। আসছি দাদু। দেখা হবে।” কথাটা বলে হাদি সোজা হয়ে আগের চেয়ে ব্যস্ত হয়ে পা চালালো। আরমান নওরোজ বিনিময়ে কিছু বললেন না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিন্তু হিয়া? মেয়েটা ঝাপসা চোখে হাদির দিকে চেয়ে রইল। চোখের কোণে জলটা হাদির বলা কথার জন্য হলেও, মূলত সেটি হাদির জন্য নয়। কিন্তু সেসব অনুভূতি ছোট্ট মেয়েটার মাঝে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। সে দেখল ল্যামপোস্টের আলোয় হাঁটতে থাকা হাদির পানে। যার পরনে হাঁটু সমান খুব সিম্পল একটি সাদা পাঞ্জাবি আর ক্রিম কালারের গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। হাদির বেশভূষা নতুন নয়, আর না তো হিয়ার কাছে নতুন! ১৫ বছরের হিয়া এবারেও হাদির দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল। যেন কত সুন্দর দৃশ্য দেখছে! আরমান নওরোজ হিয়ার হাত ধরে গাড়ির দিকে এগোয়। হিয়া দাদুর সাথে হাঁটতে হাঁটতেই ঘাড় ফিরিয়ে হাদির দিকে চেয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসির রেখা কখন যে ফুটে উঠেছে সে খবর হিয়ার কাছেও বোধয় নেই। ____________________একটি লম্বা হর্ন দিয়ে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে ট্রেনের গতি বাড়ছে। ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে হিয়া। সে বা হাত বাইরে বাড়িয়ে দিয়েছে। রাতের অন্ধকারে মৃদু বাতাস বইতে শুরু করেছে। হিয়ার মুখে হাসি লেপ্টে। অদ্ভুদ এক খুশির ঝিলিক তার চেহারায়। মেয়েটা বোধয় এর আগে এমন পরিবেশের সাথে নিজেকে মেশাতে পারেনি। যা আজ পেয়ে মেয়েটির খুশি দেখে কে! হঠাৎ-ই ট্রেনের বাদিক থেকে কেউ দৌড়ে আসছে আর গলার জোর খাঁটিয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। হিয়া ট্রেনের দরজা থেকে অনেকটা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ কারো চিৎকারে মেয়েটি ভীষণ ভ'য় পেয়ে যায়। মানুষটা কে এটা দেখার সাহস হয়না তার। সে দ্রুত তার বাড়িয়ে দেয়া হাত গুটিয়ে নিয়ে ট্রেনেট দরজা আটকে দিতে নেয়, তখনই ডান পাশ থেকে হৃদয় হিয়াকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের দরজা খুলে মাথা বের করে দেয়, সাথে ডান হাতে ট্রেনের দরজা আঁকড়ে ধরে বাম হাত বাড়িয়ে দেয় হাদির দিকে। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় হাদি হৃদয়ের হাতে হাত রেখে চলন্ত ট্রেনের ভেতর উঠে পড়ে। বেচারা অনেকক্ষণ যাবৎ দৌড় করায় হাঁপিয়ে গেছে। দু'হাত কোমরে রেখে হাঁপাচ্ছে আর ঘনঘন শ্বাস ফেলছে। সময় নিয়ে নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে হাদি। এরপর হৃদয়ের দিকে চেয়ে বলে, “উফ জোর বাঁচা বাঁচলি ইয়ার! আজ ট্রেন মিস হলে একেবারে কে’লে’ঙ্কা’রি হয়ে যেত। কথাটা বলতে বলতে হাদির কপালে ভাঁজ পড়ে। সে জানেনা রজনীর বাড়ি তাদের পাশের গ্রামে অর্থাৎ নিলয়দের গ্রামে। আর এজন্য হাদি হৃদয়ের উদ্দেশ্যে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, কি রে হৃদয়, তুই এই ট্রেনে কেন? তোর না ওই মেয়েকে ওর গ্রামে রেখে আসার ক…. হাদির কথা শেষ হওয়ার আগেই হাদির ডানদিকে এককোণায় দাঁড়ানো ভীত চোখে হৃদয়ের দিকে চেয়ে থাকা হিয়ার দিকে তেড়ে যায় হৃদয়। কেউ কিছু বোঝার আগেই হৃদয় ডান হাত তুলে হিয়ার বাম গালে ক'ষিয়ে একটা থা'প্প'ড় মে'রে দেয়। ভাইয়ের থা'প্প'ড় খেয়ে মেয়েটা ট্রেনের অপর পাশের দরজায় গিয়ে জোরেসোরে ধাক্কা খায়। বেশি ব্য’থা পায় মাথায়৷ চলন্ত ট্রেন থেকে পড়তে নিলে হিয়া কোনোরকমে দু'হাতে ট্রেনের দরজা আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলায়। শ’ক্ত থা'প্প'ড় সাথে মাথায় আ'ঘা'ত দু'টো মিলিয়ে মাথা ঝিম ধরে আসছে মেয়েটার। হাদি হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। সে একবার হিয়ার দিকে তাকায় আরেকবার হৃদয়ের দিকে। ঢোক গিলে সে ভ'য়ে ভ'য়ে হৃদয়ের দিকে তাকালো। এই দুই-ভাইবোন এক ট্রেনে কি করে এলো? হাদি বারবার ঢোক গিলছে। হৃদয়কে কি করে ঠান্ডা করবে সেটাই ভাবছে। আর হৃদয় চোয়াল শ'ক্ত করে, ভস্ম করে দেয়া দৃষ্টিতে চেয়ে আছে হিয়ার দিকে। হঠাৎ-ই রাগান্বিত স্বরে বলে, “আমার বন্ধুকে ট্রেনে উঠতে না দেয়ার তুমি কে? এভাবে দরজা বন্ধ করে দেয়ার সাহস কোথায় পেয়েছ তুমি?” কথাগুলো বলতে বলতে হৃদয় আবারো হিয়ার দিকে তেড়ে যায়। রা'গে ফুঁসতে থাকা হৃদয়কে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে হিয়া ট্রেনের দরজার সাথে চেপে দাঁড়ায়। দু'চোখ বেয়ে টপটপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। আরেকটা শ'ক্ত থা'প্প'ড় খেতে হবে ভেবে হিয়া কম্পনস্বরে অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করে, ‘ভা.ইই.য়া’ হিয়া শব্দটি অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলেও হৃদয়ের কানে স্পষ্ট যায়। ছেলেটা ক'সেকেন্ড আগে যতটা রে'গে হিয়ার দিকে এগোচ্ছিল, তার চেয়েও কয়েকশো গুণ বেশি রে'গে বোম হয়ে গেল। সে আরও হিং’স্র হয়ে উঠল। আজ বোধয় মেয়েটাকে একেবারেই মে'রে ফেলবে তেমনই একটা রিয়েকশন দিল হৃদয়। কিন্তু সে হিয়ার একেবারে সামনে পৌঁছানের আগেই পিছন থেকে হাদি হৃদয়কে সাপ্টে ধরে বলে, “হৃদয় প্লিজ থাম! এটা বাড়ি নয়। বাড়ির বাইরে এভাবে সিনক্রিয়েট করিস না।” হৃদয় হাদির কথা কানে নিল না। সে হাদিকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। তবে তেমন সুবিধা করতে পারেনা। হিয়াকে ভস্ম করা দৃষ্টি এখনো হিয়ার পানে। হিয়ার দিকে চেয়ে রা'গে ফুঁসতে ফুঁসতে হৃদয় চিৎকার করে বলে, “তোর সাহস কি করে হয়, আমাকে ভাইয়া ডাকার? ন'ষ্ট মেয়ে কেথাকার!” কথাটা বলার সাথে সাথে হৃদয়ের ডান গালে আরমান নওরোজের হাতের শ'ক্ত থা'প্প'ড় পড়ে। যার জন্য হৃদয়সহ কেউই প্রস্তুত ছিল না। হাদি আর হিয়া বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় আরমান নওরোজ এর কান্ডে। হাদির হাত হৃদয়ের শরীর থেকে অটোমেটিক সরে যায়। হৃদয়ের মাথা নিচু। একেবারে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। থা'প্প'ড় টা খেয়ে হৃদয়ের মুখ সামান্য এদিক-ওদিক হয়নি। চোয়াল শ'ক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে সে। জীবনে প্রথমবারের মতো আদরের নাতির গায়ে হাত তুলে আরমান নওরোজের হাত কাঁপছে। ভদ্রলোক ঝাপসা দৃষ্টিতে হৃদয়ের দিকে চেয়ে আছে। হৃদয়কে একেবারে শান্ত দেখে হাদি শুকনো ঢোক গিলল। ঝড় শুরু হয়ে হঠাৎ শান্ত হয়েছে। এরপর যে দ্বিগুণ বেগে ধেয়ে আসবে এর নিশ্চয়তা তার কাছে আছে। আর ওদিকে হিয়া মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। দৃষ্টি মাথা নিচু করে রাখা হৃদয়ের দিকে। ছোট থেকে যার একফোঁটা ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মেয়েটা কার না কার কাছে গিয়েছে! হৃদয় ভাইয়া তাকে সবসময় তাড়িয়ে দেয়, চ’ড়- থা’প্প’ড় দেয় বলে মেয়েটা কেঁ’দে’কে’টে অস্থির হত। তার কথা ছিল, সে পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য বলে সবাই তাকে ভীষণ ভালোবাসতো, একমাত্র হৃদয় ভাইয়াই তাকে সহ্য করতে পারতো না। ভালোবাসতো না। আর এই একটি বিষয় ছোট্ট হিয়া মেনে নিতে পারতো না। সে হ্যাংলার মতো হৃদয়ের পিছু পিছু ঘুরঘুর করত। কিন্তু যখন বড় হয়ে বুঝল তার ইচ্ছা তুচ্ছ, তার আবদার পূরণ হবার নয় সেদিন থেকে হৃদয়ের থেকে পালিয়েই বেঁচেছে হিয়া। নিলয়দের গ্রামে হৃদয় যাচ্ছে এ কথা জেনে হিয়া গ্রামে যেতে চায়নি, কিন্তু তার দাদু তাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে এনেছিল। হিয়াও ভেবেছিল, সে ঠিক হৃদয়ের আড়ালে থাকবে। কিন্তু গ্রামে না পৌঁছতেই হৃদয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল। ছোট্ট মেয়েটা খুব ভালো করেই বুঝেছে, সে হাদির জন্য নয়, বরং সে হৃদয়ের সামনে আসায় হৃদয়ের হাতে মা'র খেয়েছে। কয়েক সেকেন্ড পেরিয়ে গেলে হৃদয় মাথা তুলে তাকায় তার দাদুর পানে। চোখদু'টো টকটকে লাল। উপহাসের সুরে বলে, “তোমার ন’ষ্ট ছেলের ন'ষ্ট বউয়ের ন'ষ্ট মেয়ে ও। এই সত্য শুনতে তোমার গায়ে খুব ফোস্কা পড়ে গেল তাইনা? আসলে আমার আগেই বোঝা উচিৎ ছিল, বে’ঈ’মা’ন তো তুমিও কম নয় দাদু!” কথাটা শুনে আরমান নওরোজের বুকে ব্য’থার উৎপত্তি হলো। হৃদয় চোয়াল শ'ক্ত করে বলে, “অকারণে কেউ আমার গায়ে হাত তুলুক, এটা আমি মোটেও পছন্দ করিনা দাদু, সেটা তুমি হলেও।” আরমান নওরোজ থেমে থেমে বলে, “অ'ভদ্রতার লিমিট অনেক আগেই ক্রস করেছ তুমি হৃদয়। এবার কি দাদুর গায়ে হাত তুলে তার প্রুভ দিতে চাইছো?” দাদুর কথায় হৃদয়ের রা'গের মাত্রা বাড়লো। দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাদুর দিকে চেয়ে রইল ক'সেকেন্ড। দৃষ্টি ঘোরাতে নিলে চোখে পড়ল বাম পাশে রজনী কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকেই চেয়ে আছে। দৃষ্টি তার-ই দিকে। হৃদয় ডান হাত তুলে ঘাড় ডলল দু'বার। এরপর হঠাৎ-ই এগিয়ে এসে রজনীর সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে রজনীর দু'গালে পরপর পুরো ছয়রি থা'প্প'ড় মে'রে দেয়৷ একবার এ গালে আরেকবার ও গালে। হৃদয় কাজটি এতো অল্প সময়ে করেছে যে কেউ বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারেনি। সকলে হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে। রজনীর দু'কান তালি লেগে গিয়েছে। মেয়েটির ব্য’থা সয়ে নেয়ার ক্ষমতা রপ্ত থাকায় টুঁশব্দ করে না এটা বাড়ি নয় বলে, তবে তীব্র ব্য’থায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখদু'টো সাথে সাথে ভরে উঠেছে। দু’ঠোঁটের কোণে র’ক্ত জমাট বেঁধেছে। মেয়েটা তার পিছনে একটি সিটের সাথে গাট্টি মে'রে দাঁড়িয়ে নিজের পড়ে যাওয়া আটকায়। কিন্তু তার শরীর প্রচন্ড দুর্বল লাগছে। রজনী ঠিক বুঝতেও পারলো না সে আসলে কেন এতোগুলো মা'র খেল! এতোগুলো মানুষের সামনে এতোগুলো মা'র খেয়ে রজনীর ভীষণ ল'জ্জা লাগলো। মায়ের একটি কথা খুব মনে পড়ল, ‘মায়ের দোয়া বুলেটের মতো। কখনো মিস হয়না।’ রজনীর মন বলল, সে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসায় মা তার জন্য উল্টো দোয়া করছে, আর তাই সে ধরেই নিল, এজন্য সে শুধু মা'র খাচ্ছে। মনে মনে আওড়ালো, ‘আমি আর পালাবো না মা।’ হৃদয় রজনীকে থা'প্প'ড়গুলো মে'রে খুব স্বাভাবিকভাবে উল্টোদিকে হেঁটে যায়। আরমান নওরোজ রজনীর বি’ধ্ব’স্ত মুখখানার দিকে চেয়ে বাকহারা হয়ে চেয়ে রইল। হৃদয় এই নিরীহ মেয়েটিকে এভাবে কেন মা'র'লো? উত্তর খুঁজে পেল না সে। হিয়া রজনীর দিকে চেয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। এই মেয়েটিকে সে বাড়িতে দেখেছে। কিন্তু সে দেখা করতে যায়নি, পাছে না আবার হৃদয়ের সামনে পড়ে যায় এই ভ'য়ে। কিন্তু এখন মেয়েটাকে ভাইয়ের হাতে এভাবে মা'র খেতে দেখে সে নিজেকেই দায়ী করল। হিয়া মাথা নিচু করে ফোঁপালো। বিড়বিড় করল, “আমি আর তোমাদের সাথে থাকবো না৷ আমি আবার হোস্টেলে চলে যাবো।” হাদি স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে একবার হিয়ার দিকে তাকায়, আরেকবার রজনীর দিকে তো আরেকবার আরমান নওরোজ এর দিকে। তিনজনেই তার মতো একেবারে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাদির চোখেমুখে তীব্র অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। নিজেকে সামলে আরমান নওরোজ এর উদ্দেশ্যে গলা ঝেড়ে বলে, “দাদু এসব ঝামেলার কথা বাদ দিন। আমি ভাবছি অন্য কথা। আপনার দু'জন দিদিভাই আর একজন দাদুভাই মানে তিনজনের গাল-ই লাল হয়েছে। কারো কম, কারো বেশি। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং না?” হাদির কথা শুনে আরমান নওরোজ বিরক্ত চোখে চাইলেন। আর হিয়া ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল হাদির দিকে। রজনীও অদ্ভুদ চোখে তাকালো। এই সময় বোধয় হাদির এমন কথা কেউ আশা করেনি। হাদি তিনজনের দৃষ্টি দেখে কাচুমাচু হয়ে হৃদয় যেদিকে গেছে সেদিকে গেল ব্যস্ত পায়ে। হৃদয়কে খুঁজতে খুঁজতে বগির শেষ মাথায় হৃদয়কে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাদি ভ'য়ে ভ'য়ে জিজ্ঞেস করে, “এতোক্ষণে বুঝেছি মেয়েটির গ্রাম মেবি আমাদের গ্রামের আশেপাশেই। তাই তুই এই ট্রেনেই উঠেছিস। কিন্তু সিট রেখে ব্যাগ নিয়ে এখানে আসলি যে!” হৃদয় শান্ত গলায় উত্তর করল, “সামনের স্টেশনে নেমে যাচ্ছি আমি। ওকে ওর বাড়ি পৌঁছে দিস।” হাদি ভ্রু কুঁচকে বলে, “কাকে?” রজনী তার লালিত চোখ হাদির দিকে ফেরালে হাদি ঢেক গিলে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে, “চিনতে পেরেছি আমি। তুই প্রকৃতি দেখ মামা। আমি ওতো সুন্দর মানুষ নই।” হৃদয় আর কিছু বলল না। সে আবারো দৃষ্টি বাইরে ফেরালো। হাদি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ইশ! হিয়ার মা'রটা তবুও মানা যায় কিন্তু রজনী মেয়েটার মা'র! ভাবলেই কেমন যে লাগে! মেয়েটার যে কি হবে! হৃদয় দায়িত্ব দিয়েছে মানে তাকে দায়িত্ব নিয়ে মেয়েটাকে বাড়ি পৌঁছে দিতেই হবে। কিন্তু ততক্ষণ যেন মেয়েটা সুস্থ থাকে। এতো মা'র খেয়ে ও মেয়ে কিভাবে দাঁড়িয়ে ছিল কে জানে! হাদি এসব ভাবনা চেপে হৃদয়ের উদ্দেশ্যে বলে, “হিয়াকে দশটা মা'রলেও প্রশ্ন করতাম না মামা। অ’ন্যায় হলেও কারণ থাকতো এর পিছনে। কিন্তু ওই অপরিচিত মেয়েটাকে এতোগুলো কেন মারলি মামা?” হৃদয়ের সহজ উত্তর, “নিজের মানুষের উপর রা'গ মিটিয়েছি। তোকে কৈফিয়ত দিব কেন?” চলবে ......... |

0 Comments