গল্প: ওহে হৃদয়ের রজনীগন্ধা (পর্ব:০৮)




লেখক:DRM Shohag

পর্ব:০৮


-------------




নিলয় তাদের বাড়ির পুকুর পাড়ে বসে আছে। জোৎস্নার

আলো চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রাতের অন্ধকারে

পুকুরের চারপাশে দাঁড়ানো তালগাছ নয়তো নারকেল গাছের

ছায়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। কিছু ছায়া পুকুরের পানির

উপর গিয়েও পড়েছে। নিলয়ের দৃষ্টি সেই ছায়াগুলোর দিকে।

সন্ধ্যার পর সাজ্জাদকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে সে। বাড়ি ফিরলে

দেখল তার বাবা, চাচারা কেউ তার সাথে সেভাবে কথা

বললো না। নিলয়ের এতো রা'গ হলো। মেয়েটাকে একটা

থা'প্প'ড়-ই তো মে'রে'ছে। সবাই এমন রিয়েকশন দিচ্ছে যেন

সে কোনো মানুষকে খু'ন করে এসেছে। আর নীতি টা? সে তো

তার সামনেই আসেনা। বিরক্ত লাগছে তার৷ মায়ের ডাকে

নিলয়ের ধ্যান ভাঙে।

ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,


সব গুলো পর্বের লিঙ্ক




“ওহ্ মনে পড়ল তাহলে। আমি তো ভাবলাম তোমরা স্বামী-স্ত্রী

মিলে মাইক ভাড়া করতে গেছো আমাকে ত্যাজ্য পুত্র করে

পুরো গ্রাম জানাবা তাই।”



ছেলের কথায় নিলুফা পাটোয়ারী হেসে ফেললো। সন্ধ্যার পর

থেকে হাতে হাতে জমে রাখা কাজগুলো করে স্বামীর পাশে

বসেছিল কিছু সময়ের জন্য। জানালার বাইরে চোখ পড়লে

ছেলেকে দেখে বাইরে বেরিয়ে এলো। আর এই ছেলের কথা

শোনো। ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে ছেলের পাশে বসল। বা হাত

ছেলের চুলের ভাঁজে দিয়ে ক'বার বুলিয়ে দিয়ে বলে,



“মেয়েটাকে ওভাবে মে'রে'ছিস কেন আব্বা? জানিস না

আমাদের বাড়ির মেয়েদের গায়ে কেউ হাত তুলুক, এসব তোর

বাবারা পছন্দ করেনা?”



নিলয় থমথমে মুখে তাকায় মায়ের দিকে। বলে,


“আরে মা তোমরা আমার কথাটা তো কেউ বুঝতেই পারছো

না। যখন আমার রা'গ উঠল, তখন আমার হাতের কাছে লাঠি,

কঞ্চি, বাঁশ কিছুই ছিল না। ওগুলো থাকলে আমি ক'ষ্ট করে

আমার হাত দিয়ে কস্মিনকালেও মা'র'তা'ম না। মিছেমিছি

কেউ কারো হাতকে ক'ষ্ট দিতে চায় তুমিই বলো? আমি তো

কিছু না পেয়ে নিরুপায় হয়ে হাত দিয়ে মে'রে'ছি।”



ছেলের কথা শুনে নিলুফা পাটোয়ারী হতভম্ব চোখে তাকায়।

এই ছেলেকে কি করা উচিৎ? সে কি বলল আর এ কি বলে?

ভদ্রমহিলা নিলয়ের পিঠে একটা চাপড় মে'রে ধমকে বলে,


“উদ্ধার করেছিস আমাকে। বে'য়া'দ'ব কোথাকার।”



নিলয় পাত্তা দিল না মায়ের কথা। নীতি তার সামনে আসছে না

বলে এমনিতেই বিরক্ত লাগছে৷ তার উপর মায়ের আবার

আজাইরা জ্ঞান। ভেতর থেকে নিলয়ের বাবা ইমাম পাটোয়ারী

স্ত্রীর উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ে,


“নিলুফা ঘরে আসো। তোমার ছেলে ফিডার খায় না যে তার

পাশে বসে আমার হক ন'ষ্ট করতে হবে তোমাকে।”



বাবার কথায় নিলয় চটল। সে-ও গলা উঁচিয়ে বলে,


“মা এখনো সময় আছে, তোমার হিংসুটে স্বামীর থেকে দূরত্ব

বজায় রাখো। আর তাকে বলে দিও আমি তোমার আব্বা,

মানে সম্পর্কে তার শ্বশুর লাগি। তাই আমাকে সবসময় সম্মান

করতে বলবে, বুঝলে?”



জানালার ধারে দাঁড়ানো ইমাম পাটোয়ারী ছেলের কথায় চটে

গিয়ে বলে,




“তোর মতো হতচ্ছাড়াকে আমি সম্মান করব? তোর পিঠে যে

এখনো শ'ক্ত মা'র পরেনি সেজন্য শুকরিয়া কর।”



নিলয় উত্তরে বলে,


“তোমার মতো বুড়ো কালা বাবার কাছে আমার সুন্দরী ফর্সা

যুবতী মাকে আজ পাঠাবো? হাহ্! সপ্তাহখানেক পর মাকে

তোমার কাছে পাঠাতে পারি তাই আজ থেকে শুকরিয়া কর।” 



কথাটা শুনে ইমাম পাটোয়ারী রা'গে ফুঁসতে লাগলো। নিলয়

ঠোঁট চেপে হাসছে। নিলুফা পাটোয়ারী ছেলের পিঠে আরেকটা

চাপড় মে'রে বলে, “বে'য়া'দ'ব হয়েছিস। বাবার সাথে তর্ক

করতে ল'জ্জা লাগে না?”



নিলয় মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে মিটিমিটি হেসে বলে, “ওসব

ল'জ্জা নিয়ে পড়ে থাকলে আমার দিন যাবে না মা। তুমি যাও

তোমার স্বামীকে ঠান্ডা কর। আহারে বেচারা তোমার স্বামী!

সত্য কথা হজম করতে পারছেনা।”



ছেলের কথায় নিলুফা পাটোয়ারী না চাইতেও হেসে ফেললো।

নিলয়কে আর কিছু বলল না। সে ব্যস্ত পায়ে স্বামীর ঘরের

দিকে পথ ধরলেন। তাদের বাড়ির কর্তাদের নাকের ডগায়

রা'গ এসে থাকে। তার উপর এই নিলয়টাও শুধু সুযোগ

খোঁজে সবাইকে রা'গা'নোর।
.
.


রজনীর বাবা রুহুল আমীন বাড়ির উঠানের এক কোণে পা

ছড়িয়ে বসে আছে। বড় মেয়ের চিন্তায় আজ দু'রাত চোখে ঘুম

নেই। সারাদিন ভ্যান চালিয়ে সন্ধ্যার পর পর-ই যেখানে সে

ঘুমিয়ে যায়, সেখানে সেখানে আজ রাত ১২ বাজতে চলল,

অথচ চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। তার রজনী মা টা কোথায়

আছে, কি করছে কে জানে! সারাদিন আব্বা আব্বা করে

পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রাখা মেয়েটা এভাবে হারিয়ে গেলে

কোন বাবা ঠিক থাকবে? রুহুল আমীণের চোখের কোণ জলে

চিকচিক করছে। 


রজনীর মা মিতালী বেগম ছোট মেয়ে রূপাকে ঘুম পাড়িয়ে

ঘরের ভেতর থেকে বাইরে বেরোয়। দুর্বল পায়ে এগিয়ে এসে

স্বামী পাশে বসলে রুহুল আমীন বউয়ের দিকে তাকায়।

মিতালী বেগম শাড়ির আঁচল দিয়ে স্বামীর কপালের ঘাম মুছে

দিয়ে ভাঙা গলায় বলে,


“আমাদের মাইয়াটারে কোথাও পাইলা না রজনীর আব্বা?”



বউয়ের কথায় রহুল আমীন নিজেকে সামলাতে পারেন না।

ভেতর থেকে কান্নারা দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসে। ভদ্রলোক

বাচ্চাদের মতো কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে বউয়ের দু'হাত

খানা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মাথা ঠেকিয়ে অস্পষ্টস্বরে

বলে,


“আমার রজনী মারে পাইলে ওরে আমার কলজার ভিতরে

রাখমু। আমার আল্লাহরে কও, তিনি শুধু আমার মাইয়াটারে

একবার আমার বুকে ফিরায়ে দিক।”



মিতালী বেগমের দু'চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। কাল

রাত থেকে মেয়েটার মুখ থেকে আম্মা ডাক শোনা হয়না তার। 
.


.
“আব্বাআআআআআআ?”



অনেকক্ষণ যাবৎ রজনী ঘুমের মাঝে এপাশ-ওপাশ করে

ছটফট করছিল। এক পর্যায়ে বাবকে ঘিরে দেখা দুঃ’স্বপ্ন

ভেঙে আব্বা বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে৷ ততক্ষণে মেয়েটার ঘুম

পুরোপুরি ছুটে গিয়েছে। ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গিয়েছে

রজনী। চোখ মেলে ঘরের চারপাশে চোখ মেলে তাকালে

দেখল ঘরটিতে ঘুটঘুটে অন্ধকার। রজনীর ভ'য়ের মাত্রা তীব্র

থেকে তীব্র হয়। সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। অন্ধকার আর একা

থাকতে তার খুব ভ'য় লাগে। সে তো এখনো মাকে জাপ্টে ধরে

ঘুমায়। কিন্তু আজ একা এক ঘরে তার উপর এমন ঘুটঘুটে

অন্ধকার দেখে রজনীর গলা শুকিয়ে আসে। বিছানা থেকে

নামতে গেলে আন্ধারে কিছু দেখতে না পেয়ে রজনী বিছানা

থেকে ঠাস করে মেঝেতে পরে যায়। বসেই পড়েছে সে। কিন্তু

কোমরে বেশ ব্য’থা পেয়েছে। তবে শারিরীক ব্য’থায় মেয়েটা

টুঁ-শব্দটিও করল না। তার ভ'য় লাগছে অন্ধকারে, আর এর

চেয়েও বেশি ক'ষ্ট হচ্ছে বাবাকে নিয়ে দেখা দুঃ’স্বপ্নের কথা

ভেবে। মেয়েটা শরীরের ব্য’থায় টু-শব্দ না করলেও মনের

ব্য’থায় ফুঁপিয়ে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে দু'হাঁটু জমা করে

হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে ফোঁপানির পরিমাণ বাড়ে মেয়েটার।

অস্পষ্টস্বরে আওড়াতে থাকে,



“আব্বা, আব্বা, ও আব্বা….?”



হৃদয় হাদির সাথে কথা বলে যখন নিজের ঘর থেকে

বেরিয়েছিল, তখনই পুরো বাড়ির লাইট অফ হয়ে যায়৷

আইপিএস চালু হচ্ছিল না, হয়ত কোনো প্রবলেম হয়েছে। তবে

হৃদয় বাড়ির ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে সে তার ঘরের ভেতর

গিয়ে হাতের কাছে একটি মোম পেয়ে মোমটি লাইটার দিয়ে

জ্বা'লি'য়ে রজনীর ঘরের দিকে আসছিল। তখনই রজনীর

চিৎকার সাথে ধপ করে পড়ে যাওয়ার শব্দ তার কানে আসে।

এ পর্যায়ে হৃদয় পায়ের গতি বাড়িয়ে দ্রুত রজনীর ঘরের দিকে

এগোয়। ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালে হৃদয়ের চোখে

পড়ে রজনী উপুড় হয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মেয়েটির খোলা

চুলগুলো দু'দিক দিয়ে সামনের দিকে ছড়িয়ে আছে।

ফোঁপানির আওয়াজ সাথে থেকে থেকে মেয়েটির শরীরের

কম্পন বোঝা যাচ্ছে।


হৃদয় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রজনীকে সময় নিয়ে

অবলোকন করল। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল। 



কারো পায়ের শব্দ শুনে রজনী ভীত হয়ে ধীরে ধীরে মাথা

তুলে তাকায়। ভেসে ওঠে মোমবাতির আলোয় গম্ভীর শান্ত

দু'টো চোখ। ধীরে ধীরে রজনীর চোখে স্পষ্ট হয় হৃদয়ের

গাম্ভীর্যে ঘেরা মুখাবয়ব। মেয়েটি শুকনো ঢোক গিলল। এতো

রাতে হৃদয় এই ঘরে কেন এলো, এই প্রশ্নটাই সর্বপ্রথম

রজনীর মাথায় আসলো। মেয়েটির ভীতির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে

বাড়তে লাগলো। 


আর হৃদয়! সে বোধয় এই দুনিয়ায় নেই। ছেলেটা রজনীর

চোখে চোখ রেখে রোবটের ন্যায় এগিয়ে এসে রজনীর সামনে

বাম-হাঁটু গেড়ে ডান পা সামান্য উঁচু রেখে মেঝেতে বসে। ডান

হাতে মোমবাতি, যা রজনী আর তার মুখ বরাবর মাঝখানে

বিদ্যমান আছে। 



একদম নিজের সামনে হৃদয়কে দেখে রজনী শুকনো ঢোক

গিলে। ভ'য়ের চোটে মেয়েটার শরীর ভেতরে ভেতরে মৃদু

কাঁপছে। 


অথচ হৃদয়ের এই দুনিয়ায় থাকা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। এতো

কাছে থেকে মোমবাতির আলোয় দৃশ্যমান রজনীর কান্নামাখা

ভেজা হলুদ ফর্সা মুখ হৃদয়ের হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়িয়ে

দিচ্ছে। খাড়া নাক, গোলগাল মুখ, পাতলা চিকন ঠোঁট,,

সবমিলিয়ে হৃদয়ের চোখে এই প্রথম রজনীর চেহারাটুকুও

অদ্ভূদ সুন্দর লাগলো। ছেলেটার দৃষ্টি যখন রজনীর নাকফুলে

আসে, তখনই কপালে বিরক্তির একটি ভাঁজ ফুটে ওঠে।

মেয়েটির এসব গাঁইয়া গ্যাটআপ তার অ'সহ্য লাগে। কিন্তু

হৃদয়ের কপালে বিরক্তির ভাঁজ দু'সেকেন্ডও স্থায়ী হলো না।

তার দৃষ্টি আটকায় রজনীর ভেজা টলমলে বাদামি

চোখদু'টোতে, যেন মনে হচ্ছে এই চোখদু'টো সেকেন্ডে

সেকেন্ডে ঝিলিক দিচ্ছে। মুহূর্তেই হৃদয়ের গলা শুকিয়ে কাঠ

হয়ে গেল। 


রজনীর যেমন ভ'য়ে গলা শুকিয়ে এসেছে, হৃদয়ের তেমন নাম

না জানা অনুভূতির জোয়ারে গলা শুকিয়ে এসেছে। বেশ

ক'বার শুকনো ঢোক গিলল ছেলেটা। দৃষ্টি রজনীর টলমলে

দু'চোখ থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও সরে যায়নি। সে বা

হাতের শপিং ব্যাগটি মেঝেতে রেখে, হাতটি মোমের পাশে

মেলে ধরে। এরপর ডান হাতের মোম বাম হাতের উপর বাঁকা

করে ধরে গলিত মোমের ক'ফোঁটা তরল হাতের উপর ফেলে

মোমটি বাম হাতের উপর শ'ক্ত করে বসিয়ে দেয়। কাজগুলো

হৃদয় রজনীর চোখে চোখ রেখেই করেছে। হয়ত রজনীর

চোখদু'টো আরও আয়েশ করে দেখবে বলে এই কাজটি

করল। 



রজনী একবার হৃদয়ের হাতের দিকে তাকায় তো একবার

হৃদয়ের চোখমুখের দিকে তাকায়। মেয়েটার চোখেমুখে অজস্র

বিস্ময়ের আনাগোনা। মোমের গলিত অংশ এভাবে কেউ

হাতের উপর ফেলে, সে এই প্রথম দেখল। ফেললো তো

ফেললো হৃদয়ের কনো রিয়েকশন-ই নেই। রজনীর দৃষ্টি

তখনো হৃদয়ের হাত আর হৃদয়ের চোখেমুখে ঘুরছে৷ যখন

তার দৃষ্টি হৃদয়ের হাতের উপর আসে তখন হঠাৎ হৃদয়

মুগ্ধতার স্বরে বলে ওঠে,



“ফ্যান্টাস্টিক লুক!”



রজনী কেঁপে ওঠে। চোখ তুলে তাকায় হৃদয়ের দিকে। হৃদয়ের

কথার অর্থ সে বুঝল না। বোকার মতো ড্যাবড্যাব করে চেয়ে

রইল হৃদয়ের দিকে। হৃদয় গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে,



“তুমি হিপনোটাইজ করতে পারো, রাইট?”



এই কথাটার অর্থ বোকা রজনী বুঝল না। মেয়েটির জ্ঞান

ভীষণ-ই সীমিত। এই শব্দটি আগে শুনলেও না তো এর মানে

বুঝল, আর না তো মনে করতে পারলো। সে থেমে থেমে

বলতে নেয়,

“আ.আমি তো…..



মাঝখান থেকে হৃদয় কড়া কণ্ঠে বলে,


“তুমি তো প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে আমাকে হিপনোটাইজ

করছ। শাহরিয়ার হৃদয়কে হিপনোটাইজ করার সাহস কোথায়


পেয়েছ তুমি ম্যানারলেস মেয়ে?”



হৃদয়ের ধমকে বলা কথায় রজনী ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ভীত

চোখে চেয়ে অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়, 


“আ.আমি ককিছু করিনি। আমি কিছু করিনি বিশ্বাস করুন।”



হৃদয়ের দৃষ্টি শিথিল হয়। মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে,


“একটু আগে চিৎকার করলে কেন? আর কাঁদছিলে কেন?”



হৃদয়ের নরম স্বরে রজনী একটু স্বস্তি পায়। নাক টেনে বলে,

“আমার আব্বা ভালো নাই। আমারে একটু গ্রামে দিয়ে

আসবেন?”



এ নিয়ে হৃদয় কিছু বলল না। সে আবারও প্রশ্ন করে,

“কিছুক্ষণ আগে কিসের শব্দ হয়েছিল?”



রজনী মিনমিন করে বলে,


“আমি খাট থেকে পড়েগেছিলাম।”



কথাটা শুনতেই হৃদয় বিস্ময় কণ্ঠে বলে,,

“হোয়াট?”



রজনী ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। হৃদয় ব্যস্ত হয়ে ডান হাত রজনীর

কোমরের দিকে এগিয়ে নেয় আর চিন্তিত কণ্ঠে বলে, “দেখি

কোথায় ব্য’থা পেয়েছ?”



হৃদয়ের কাজে রজনী নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ভীত চোখে

তাকায় হৃদয়ের দিকে। তখন-ই ধাপ করে ঘরের লাইট জ্বলে

ওঠে। সাথে সাথে রজনীর দিকে বাড়িয়ে দেয়া হৃদয়ের হাত

থেমে যায়। মুহূর্তেই ঘোর কেটে যায় তার। দ্রুত বাড়িয়ে দেয়া

ডান হাত সরিয়ে আনে। কি করছিল, কি করছে, কি হচ্ছে

ভাবতেই সব মিলিয়ে হৃদয় হঠাৎ রা'গে ফেটে পড়ল। মাথাটা

দু'দিকে দু'বার নাড়িয়ে হাতের মোম গায়ের জোরে ছুড়ে

ফেলে। এরপর বা হাতের আঙুল রজনীর দিকে উঁচিয়ে রা'গে

ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,


“তোমাকে তো……


রজনী ভ'য়ে বিছানার সাথে লেগে মাথাটা পিছিয়ে নিয়ে

গিয়েছে। ভীত হয়ে মায়া মায়া চোখে চেয়ে আছে হৃদয়ের

দিকে। রজনীর চোখের দিকে চেয়ে হৃদয়ের কথা জিভের

আগায় আটকে যায়। সে নিজের উপর চরম বিরক্ত হয়ে

চিবিয়ে চিবিয়ে আওড়ায়, 


“উফ! অ'সহ্যকর একটা মেয়ে। বা'ল!”



একটু বলেই দ্রুত উঠে দাঁড়ায় হৃদয়। এরপর সামান্য ঝুঁকে

মেঝে থেকে শপিং ব্যাগটি তুলে রজনীর কোলে ছুড়ে দিয়ে


রাগান্বিত স্বরে বলে,

“বিশ মিনিটে এটা পরে রেডি হয়ে ঘর থেকে বের হবে।

তোমাকে তোমার গ্রামের বাড়িতে রেখে আসবো।”



হৃদয় কথাটা বলে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা

বাড়ায়।


রজনী দু'হাতে শপিং ব্যাগটি ধরে রেখে হৃদয়ের দিকে চেয়ে

ঢোক গিলল। এরপর ধীরে ধীরে ব্যাগটি কোলের উপর উপুড়

করে ধরলে ভেতর থেকে দু'টো কালো রঙের কাপড় বেরিয়ে

আসে। রজনী নেড়েচেড়ে দেখে বুঝল এটার একটি বোরখা

আরেকটি হিজাব। সে অন্যদের পরতে দেখেছে। কিন্তু নিজে

কখনো পরেনি। এটা তো তার পোষাক নয়। মেয়েটা অসহায়

কণ্ঠে আওড়ায়, “আমি তো এটা পরতে পারিনা।”



হৃদয় তখন ঘরের দরজা পাস করতে যাচ্ছিল। রজনী বেশ

জোরে বলায় কথাটা হৃদয়ের কানে যায়। ফলস্বরূপ ছেলেটা

প্রচন্ড রে'গে সাথে সাথে উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। বা হাতে ডান

হাতের শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে তেড়ে আসে রজনীর

দিকে। 


নিজের দিকে হৃদয়কে এভাবে তেড়ে আসতে দেখে রজনী

ভীত চোখে তাকায়। হায় আল্লাহ্ এই গু’ন্ডা টা তাকে আবার

মা'র'তে আসছে না-কি? ভাবনার মাঝেই হৃদয় রজনীর সামনে

এসে সামান্য ঝুঁকে বা হাত বেডের সাথে লাগিয়ে রজনীর

উপর ঝুঁকে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,



“এটা না পরলে তোমাকে তোমার গ্রাম নয়, বিদেশে পা'চা'র

করে দিব ম্যানারলেস মেয়ে কোথাকার!”



রজনীর মাথা উঁচু। সে হৃদয়ের দিকে কাঁদোকাঁদো মুখ করে

চেয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলে, 


“না না আমারে পা'চা'র করবেন না। আমি সব পরতে পারি।

এটাও পরতে পারি তো। এক্ষুনি পরব এটা। সত্যি!”





হৃদয় রজনীর চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় বলে,


“গুড। ফাস্ট রেডি হয়ে বের হও। নয়তো ট্রেন মিস হবে৷”



কথাটা বলে হৃদয় দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গটগট পায়ে ঘর

থেকে বেরিয়ে যায়। 


হৃদয়কে চলে যেতে দেখে রজনী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এই

ছেলেটা কেমন যেন অদ্ভূদ। রজনী মাঝে মাঝে কনফিউজড

হয়ে যায়, সে হৃদয়কে ভ'য় পাবে না-কি ভরসা করবে। একবার

রে'গে কিসব যেন বলে, আবার ভালোভাবে রেডি হতে বলে,

তাকে গ্রামেও পৌঁছে দিতে চায়। সব ভেবে রজনী মাথা

চুলকালো। বোরখা আর হিজাব নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে

ভাবলো, এটা কিভাবে পরবে আর তারপর তার গ্রামে যাবে।

একবার নিজের গ্রামে পা রাখতে পারলে তার আর কিচ্ছু

চাইনা। 


____________________




হৃদম ডায়নিং টেবিলের চেয়ারে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।

তার বড় বোন সন্ধ্যার পর পর মেয়ে স্বামীকে নিয়ে নিজের

বাড়ি ফিরে গিয়েছে। তার একটু পরেই তার বউ তার ছোট

ছেলেটাকে নিয়ে রা’গ করে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছে। তার

আগে অবশ্য দু'জনের মাঝে বেশ কথার কা'টা'কা'টি হয়েছে।

এরপরই রূপসা দাদুর থেকে পারমিশন নিয়ে বাপের বাড়ি

চলে গেল। সেই থেকেই হৃদম মনম'রা হয়ে এখানে ওখানে

বসে আছে। ঝগড়া হয়েছে বউয়ের সাথে। বউয়ের লেজ ধরে

শ্বশুর বাড়ি যেতেও তার ইগোতে লাগছে। এজন্য সে তখন

থেকে এভাবেই বসে আছে। 


ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট ধরে রাখা। অর্ধেকটা শেষ করেছে।

হৃদমের থেকে সামান্য দূরত্বে হাদি বসে ফোন ঘাটছিল।

হৃদমের সিগারেট খাওয়ায় বেচারার ভীষণ সমস্যা হচ্ছে।

একটু পর পর কাশছে। হৃদমকে বেশ কয়েকবার বলেছে-ও

সিগারেট ফেলতে। হৃদম শুনলে তো! এক পর্যায়ে হাদি প্রচন্ড

বিরক্ত হয়ে বলে,



“হৃদম ভাই তোমার প্রবলেম কি? সিগারেটটা একটু ফেলো না!

প্রবলেম হচ্ছে আমার।”



হৃদম বিরক্তি কণ্ঠে বলে,


“মেয়ে মানুষের স্বভাব নিয়ে ঘুরলে প্রবলেম তো হবেই!

ডিস্টার্ব করিস না তো যা।”




হাদি ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করছে ফোনে,

এজন্য বেশি কিছু বলল না। চুপচাপ অন্যদিকে গেল, যেখানে

সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যাবে না। 


_________________




মা যাওয়ার পর নিলয় আরও বেশ কিছুক্ষণ উঠানে বসে

থেকে মাত্র উঠে দাঁড়ালো ঘরে যাবে বলে। বাড়ি থাকলে

সবসময় লুঙ্গি থাকে তার পরনে, আজ বিরক্তির ঠেলায় প্যান্ট

আর চেঞ্জ করা হয়নি। সে ঘরের দিকে এগোতে নিলে হঠাৎ-ই

দৃষ্টি পড়ে তার হাতের ডানদিকের একটি জানালায়। যেখানে

নীতি দাঁড়িয়ে ছিল। নিলয়ের সাথে চোখাচোখি হতেই ঠাস

করে জানলা বন্ধ করে দেয় মেয়েটা। নিলয়ের কপালে

বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। কত্তবড় বে'য়া'দ'ব হয়েছে দেখ, তার

মুখের উপর জানালা বন্ধ করে দেয়। এমনিতেই বাড়ি এসে

একবারো তার সামনে আসেনি, আর এখন আবার

বে'য়া'দ'বি। নিলয় বড়বড় পায়ে বাড়ির ভেতর এসে সোজা

নীতির ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। বা হাত তুলে

দরজায় শব্দ করে ধাক্কা দেয় আর তার ছোট চাচার মেয়ের

উদ্দেশ্যে বলে,


“ইরাম দরজা খোল তো।”



ঘরের ভেতর এক কোণায় দাঁড়ানো নীতি বারবার শুকনো

ঢোক গিলছে। নিলয় যখন থেকে পুকুর পাড়ে বসে ছিল তখন

থেকেই সে জানালায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিলয়কে দেখছিল৷ কি

দেখছিল নিজেও জানেনা। কিন্তু হঠাৎ নিলয়ের কাছে ধরা

খেয়ে বেচারার গলা শুকিয়ে আসছে। 



নীতি আর ইরাম অনেক ছোট থেকেই একঘরে থাকে। ইরাম

পড়ার টেবিলে বসে সামনে বই মেলে খোলা জানালায় দিকে

চেয়ে ছিল। পড়ার নামগন্ধ নেই তার। বাইরে চেয়ে কি যেন

খুঁজছিল খুব মনোযোগ দিয়ে। হঠাৎ নীতির জানালা ধাক্কা

দিয়ে বন্ধ করা, আবার নিলয়ের ডাকে বেচারার ধ্যান ভাঙে।

সে চেয়ার থেকে উঠে এক দৌড়ে এসে ঘরের দরজা খুলে

দেয়। নিলয় ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলে দেখল নীতি

ঘরের এক কোণায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সে দৃষ্টি

ফিরিয়ে নিয়ে ইরামের দিকে চেয়ে বলে,



“ঝাল ঝাল করে দু'টো পেয়ারা মেখে আন তো।”


ইরাম অসহায় কণ্ঠে বলে, “আমি?”




নিলয় বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “তো কি তোর নানি?”



ইরাম মুখ ফুলিয়ে ঘরের বাইরে দৌড় লাগায়। তার বাড়ির দুই

ভাই তাকে ছোট পেয়ে শুধু তার থেকে কাজ করে নেয়।

বিড়বিড় করে, “ভাল্লাগে না।”



নিলয় বড়বড় পায়ে এগিয়ে এসে নীতির সামনে দাঁড়ায়। কড়া

কণ্ঠে বলে,


“আমার মুখের উপর জানালা লাগানোর সাহস কোথায়

পেয়েছিস তুই?”



নীতি মাথা তোলেনা। দু'হাতে পরনের জামা চেপে মাথা নিচু

করে দাঁড়িয়ে আছে সে। নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে। নিলয়

ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে, “তাকা আমার দিকে।”



নীতি কানে নেয় না নিলয়ের কথা। মেয়েটি খুব করে চাইছে না

কাঁদতে। কিন্তু হাজার চেয়েও নিজেকে সামলাতে পারছেনা।

নিলয় নীতিকে একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, মেয়েটার

ফোঁপানি টের পেয়ে নিলয় ডান হাত এগিয়ে নিয়ে নীতির

থুতনি ধরে নীতির মুখ উঁচু করে ধরে। নীতির চোখ বন্ধ। ফর্সা

মুখ টকটকে লাল হয়ে আছে। দু'গালে চোখের জল লেপ্টে।

যে গালে নিলয় থা'প্প'ড় মে'রে’ছিল সে গাল এখনো হালকা

হালকা ফোলা ফোলা ভাব আছে। নিলয় নীতির সারা মুখে

দৃষ্টি বুলিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। মৃদুস্বরে বলে,



“বাড়ি ফেরার পর থেকে ইরামকে দিয়ে কতবার ডেকেছিলাম

তোকে? আমাকে উপেক্ষা করার এতো সাহস কবে থেকে হলো

তোর?”



নীতি চোখ বুজে রেখেই থেমে থেমে ভাঙা গলায় বলে, “যেদিন

থেকে নিলয় ভাই আমার গায়ে হাত তুলে নিজের রা'গ মেটাতে

শুরু করল।”



কথাটা বলতে গিয়ে নীতির বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে নোনাজল

গড়ায়। নীতির কথা শুনে নিলয় শব্দহীন হাসলো। থুতনিতে

রাখা হাত সরিয়ে দু'হাত বাড়িয়ে নীতির অর্ধ মাথা ঢেকে রাখা

ওড়না আরেকটু সামনের দিকে টেনে পুরো মাথা মাথা ঢেকে

দিয়ে বলে, “অনেক বেশি ব্য’থা পেয়েছিস?”



নীতি কিছু বলে না। নিলয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“ভ'য় নেই। তোকে আমার সাথে শহরে যেতে হবে না। গ্রামের

কলেজেই পড়বি তুই। আমি সব ব্যবস্থা করে দিয়ে তারপর

শহরে ফিরব।”


কথাটা শুনতেই নীতি চট করে বন্ধ চোখের পাতা খুলে ফেলে।

সামনে নিলয়ের হাস্যজ্জ্বল চোখমুখ ভেসে ওঠে। তার খুব

করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল, ‘তুমি আমার উপর আবার

রা'গ করলে নিলয় ভাই?’



কিন্তু মনের কথা মনেই থাকলো। সে মনের কথা আর প্রকাশ

করল না। মাথা নিচু করে রইল সে। নিলয় নীতির সামনে

থেকে সরে নীতির বাম পাশে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে

দাঁড়ায়। বাঁকা হয়ে দাঁড়ানোর ফলে মাথাটা অনেকটা নীতির

মাথার কাছে এসে ঠেকেছে। সে নীতির দিকে চেয়ে মৃদুস্বরে

বলে, “আমি কিন্তু যে সে মেয়েকে রা'গ দেখাইনা নীতিমালা।”

__________________



ঘড়ির কাটা তখন ১১ টা বেজে ৪৫ মিনিট। ট্রেন স্টেশনে এসে


ট্রেন থেমেছে প্রায় মিনিট পাঁচ আগে। হৃদয় রজনীকে ট্রেনের

নির্দিষ্ট সিটে বসিয়ে দিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে স্টেশনের পাশেই

একটি দোকানের সামনে গিয়ে একটি বেঞ্চের উপর বসে রুটি

কলা খাচ্ছে। পাশেই হাফ লিটারের একটি বোতল রাখা। 


হৃদয়ের পরনে নেভিব্লু কালারের একটি গ্যাবার্ডিন প্যান্ট,

নেভিব্লু কালারের একটি শার্ট। দু'হাতের শার্টের হাতা কনুই

পর্যন্ত গুটানো। 



খেতে খেতে হৃদয়ের কিছু একটা মনে পড়তেই সে রুটি কলা

ডান হাতে রেখে বাম হাতে পকেট থেকে ফোন বের করে

সাজ্জাদের নাম্বারে কল দেয়। প্রথমবারেই কল রিসিভ হয়।


ওপাশ থেকে সাজ্জাদ বলে, “দোস্ত বল।”


হৃদয় বাম হাতে ফোন কানে ধরে রেখে মুখের খাবার খাবারা


চিবোয় আর বলে,

“আজ তোর আর নিলয়ের রংপুর আসার কথা ছিল, আসলি

না কেন?”



সাজ্জাদ উত্তর করে,


“নিলয়ের বাড়িতে কি নিয়ে যেন ঝামেলা হয়েছে, তাই ও

যায়নি।”



হৃদয় চিন্তিত কণ্ঠে বলে, “সিরিয়াস কিছু?”



“নাহ্ তেমন কিছু না। ঝামেলা মেটানোর পথে মেবি। তুই কি

খাচ্ছিস?”


হৃদয়ের ছোট উত্তর, “রুটি-কলা।”



সাজ্জাদের কপালে ভাঁজ পড়ে। খাবার থাকলে হৃদয় রুটি

  কলা খাওয়ার মানুষ নয়। তবে? অতঃপর সে বলে, “রাতে

ভাত খাসনি?”


হৃদয় বলে, 


“ভাবি বাসায় নেই, তার বাবার বাড়ি গেছে।”



সাজ্জাদ বলতে নেয়, “তোর মা…….


নিজে থেকেই থেমে যায় সাজ্জাদ। তারা সবাই জানে, হৃদয়

তার মায়ের হাতের রান্না খায়না। তার ভাবির রান্না কোনোদিন

কপালে না জুটলে, হয় হৃদয় নিজেই কিছু রেঁধে খায়, নয়তো

রুটি-কলা দিয়ে পেট চালিয়ে নেয়, নয়তো অনাহারে। 



সাজ্জাদের কথায় হৃদয়ের চোয়াল শ'ক্ত হয়ে গিয়েছে। মুখের

রুটি-কলা জোর খাটিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে গিলে কড়া কণ্ঠে

বলে,


“ওই মহিলা তোদের চৌদ্দ গুষ্টির মা। যা তার কোলে উঠে দুধ

খা যাহ্।”



সাজ্জাদ থতমত খেয়ে বলে,


“দোস্ত আমার অনেক ল'জ্জা লাগবে। আমি তো অনেক বড়

হয়ে গেছি।”



হৃদয় রে'গে বলে, “বা'ল বড় হইছে তোর।”



সাজ্জাদ এবার অসহায় কণ্ঠে বলে,


“তুই কিভাবে জানলি দোস্ত? এই গ্রামে ক্লিন করতেও পারছি

না, খুব প্যারা লাগছে।”



হৃদয়ের জিভের আগায় আসা কয়েকশটা গা’লি সে গিলে

নিল। রা’গে কল কে'টে ফোন ছুড়ে মা'রতে গিয়েও থেমে

গেল। এখন ফোন ভাঙলে তাকেই ফোনের অনাহারে কাটাতে

হবে। তার তো বাপ-দাদার টাকা পকেটে ভরতে প্রেস্টিজে

লাগে। আপাতত নিজেরও লাখ টাকা ইনকাম নেই। এসব

ভেবেই থেমে গেছে বেচারা। অতঃপর হৃদয় তার ফোন পকেটে

রেখে হাফ লিটারের পানির বোতল নিয়ে ঢকঢক করে

তিনবারে পানি শেষ করে ফাঁকা বোতল ছুড়ে মারে। 



সামান্য দূরত্বে চেঁচামেচির শব্দে হৃদয় ঘাড় বাঁকিয়ে সেদিকে

তাকায়। বেশ কিছুক্ষণ পর বুঝল এক যুবক একজন বয়স্ক

রিক্সাওয়ালার সাথে ভাড়া নিয়ে তর্ক করছে। বয়স্ক লোকটি

বলছে, ‘এখানকার ভাড়া ৫০ টাকা।’ আর সেই যুবকের কথা,

‘সে ৪০ টাকা দিবে। তাকে ১০ টাকা ফেরত দিতে হবে।’


যুবক ছেলেটির বা হাতে একটি জ্ব'ল'ন্ত সিগারেট। দু'জনের

কথার কাটাকাটি হতে হতে যুবকটি এক পর্যায়ে বয়স্ক

লোককে থা'প্প'ড় মা'রা'র জন্য হাত উঠায়। দৃশ্যটি হৃদয়ের

চোখে পড়ার সাথে সাথে সে এক সেকেন্ডও সময় ন'ষ্ট না করে

চোখের পলকে ছেলেটির সামনে গিয়ে ছিলেটির বাড়ানো হাত

ডান হাতে মুচড়ে ধরে বাম হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ছেলেটির নাক

বরাবর সর্বশক্তি দিয়ে ঘু'ষি মা'রে। যার জন্য ছেলেটি মোটেও

প্রস্তুত ছিল না। ফলস্বরূপ সে একেবারে উল্টে পড়ে রাস্তায়।

হৃদয় ভস্ম করে দেয়া চোখে ছেলেটির দিকে চেয়ে আছে।

ছেলেটির দিকে এগোতে এগোতে বাম হাতের কনুই পর্যন্ত

গোটানো শার্টের হাতা আরেকটু টেনে কনুইয়ের উপরে উঠিয়ে

নেয়। এরপর নিচু হয়ে ছেলেটির শার্টের কলার ধরে দাঁড়

করিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,



“সিগারেট খাওয়ার টাকা পকেট থেকে নিয়ম করে ঝরে। আর

অসহায় মানুষদের পাওনা দিতে খুব পা'ছা জ্ব'লে, তাই না?

শা'লা মা’দা’রটোস্ট!”


কথাটা বলতে বলতে ছেলেটির মুখে পর পর আরও দু'টো ঘুষি

মা'রে হৃদয়। 


পাশে দাঁড়ানে একজন হৃদয়ের দিকে এগিয়ে আসতে নিলে

তার বাবা ছেলেটিকে আটকে বলে,


“আরমান নওরোজ এর ছেলে ওটা। ওর সাথে পারবি না।”



ছেলেটি আর এগোলো না। বিরক্ত হলো প্রচন্ড। 


এদিকে মা'র খাওয়া ছেলেটি অসহায় কণ্ঠে কিছু আওড়ায়, যা

অস্পষ্ট হওয়ায় শোনা যায়না। 


তখনই হৃদয়দের ধাপ এলাকায় বাড়ির আশেপাশের বাড়ির

মাঝ থেকে এক বাড়ির লোক এগিয়ে এসে জোর করে

হৃদয়ের দিকে ছেলেটিকে ছাড়িয়ে নেয়। হৃদয় বিরক্তি নিয়ে

তাকায় লোকটির দিকে। আজ যার ছেলেকে সকালে

পিটিয়েছিল, সেই লোককে দেখে হৃদয়ের মে'জা'জ আরও

খারাপ হয়। 



সেই ভদ্রলোকটি হৃদয়ের উপর প্রচন্ড রে'গে আছে ছেলেকে

ওভাবে মা'রা'র জন্য। সেই উদ্দেশ্যেই লোকটি হৃদয়ের দিকে

চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,



“তুমি তো বেশ ভালোই অভদ্র হয়েছ। আমার ছেলেটাকে

হসপিটালে পাঠিয়ে আবার রাস্তায় এসে আরেকজনকে

মা'র'ছ? তোমার কি মা’রা’মা’রি করেই পেট চলে?”


হৃদয় ভ্রু কুঁচকে বলে,



“আমার পেট আমি যেভাবেই চালাই না কেন আপনার মতো

তো আর দু’র্নী’তি করে পেট চালাই না, আজব!”



লোকটি দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

“কি বললে তুমি?”



হৃদয়ের স্বাভাবিক কণ্ঠ, 


“উচিৎ কথা বললাম। কেন আপনার হজম হচ্ছে না আঙ্কেল?

স্বাভাবিক, দু’র্নী’তি’বা’জদের উচিৎ কথা একটু কম কমই

হজম হয়।”



এরপর হৃদয় তার পকেট থেকে তার রুটি-কলার টাকাসহ

বাড়তি কিছু টাকা বের করে দোকানের সামনে সাজিয়ে রাখা

বৈয়ামের মাঝের একটি বৈয়ামের উপর টাকা রেখে বলে,

“মামা উনাকে কয়েকটি হজমের মেডিসিন আনিয়ে দিয়েন।”



হৃদয়ের কথা শুনে দোকানদার মুখ চেপে হাসলো। আর সেই

লোকটি কটমট চোখে হৃদয়কে দেখতে লাগলো। 



এদিকে হৃদয় কথাটা বলে রিক্সাচালক বয়স্ক লোকটির সামনে

গিয়ে তার হাতে পাঁচশ টাকা গুঁজে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, 

“আজ বাড়ি যান চাচা। চাচি খুশি হবে।



লোকটি কিছু বলতে নিলে হৃদয় আবারও বলে,

আপনি ক'ষ্ট করে একটা বে'য়া'দ'ব ছেলেকে আমার সামনে

এনে তাকে চিনিয়ে দিয়েছেন। তাই এটা আমার তরফ থেকে

আপনার জন্য সামান্য পারিশ্রমিক। সংকোচ করবেন না, এটা

রাখুন।”



বয়স্ক লোকটি হৃদয়ের দিকে প্রশান্তির নজরে চেয়েহ হৃদয়ের

মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,


“তুমি মেলা ভালা মানুষ আব্বা, আল্লাহ তোমার ভালো করুক। 



হৃদয় কিছু বলল না। সে একবার লোকটির মুখের দিকে

তাকালো। এরপর বাদিকে মোড় ঘুরিয়ে ট্রেনের দিকে

এগোলো। এদিকে বয়স্ক লোকটি হৃদয়ের দিকে চেয়ে মাথা

চুলকে বলে,


“তোমারে আমার চেনা চেনা লাগে ক্যা? 


এটুকু বলে হঠাৎ-ই বলে,


এ্যাই তুমি তো সেই হৃদয়, ঠিক কইছি না?”



হৃদয়ের কানে কথাটা গেল। কিন্তু সে কোনো প্রতিত্তোর করল

না। উল্টে পায়ের গতি বাড়ালো। সামান্য ঠোঁট বাঁকালো

বোধয়। যা একেবারেই অস্পষ্ট। 
.
.


হৃদয় রজনীকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে যাওয়ার পর থেকে রজনী

জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখছিল৷ কিন্তু একটু আগেই হৃদয়কে

সেই সকালের মতো একজনকে মা'র'তে দেখে মেয়েটা ভীষণ

ভ'য় পেয়ে যায়। হৃদয়ের জন্য প্রথমেই তার মাথায় গু'ন্ডা

শব্দটা ছাড়া আর কিছু আসেনি। লোকটা রে'গে গিয়ে তাকেও

মা'রে। তার হাতটা এখনো পুরোপুরি সারেনি। এরপর তো সে

সামান্য একটি বোরখা পরতে পারবে না বলায় হৃদয় তাকে

পা'চা'র করে দিতে চাইলো৷ সবকিছু ভেবে রজনী ধীরে ধীরে

তার সিট থেকে উঠে ট্রেনের উল্টোদিকে এসে দাঁড়ায়।

মেয়েটির উদ্দেশ্য সে ট্রেনের অন্য বগিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে

দাঁড়িয়ে জামালগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছে যাবে। তার সিট লাগবে

না। ওমন ভ'য়া'ন'ক মানুষের সাথে সিটে বসে যাওয়ার চেয়ে

দাঁড়িয়ে যাওয়া ভালো। সে তো এই স্টেশন চিনতো না। কিন্তু

এখন যেহেতু ট্রেনে উঠে পড়েছে। তাই সে একাই তাদের

পাহাড়পুর এলাকার জামালগঞ্জ স্টেশনে ঠিক পৌঁছে যেতে

পারবে৷ আর তার গ্রামের স্টেশনে একবার পৌঁছালেই রজনীর

আর চিন্তা নেই। বগির শেষ মাথায় এসে ভিড়ের কারণে

মেয়েটা অন্য বগিতে যেতে পারছে না। জীবনের প্রথম বোরখা

পরে এমনিতেই তার দমবন্ধ হয়ে আসছে। ইচ্ছে করছে

বোরখাটা শরীর থেকে ছিঁড়ে ফেলতে। কিন্তু মেয়েটি এই

অচেনা শহরে বড্ড ক'ষ্টে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে। এতক্ষণ

হৃদয়ের জন্য বোরখা পরে ছিল কিন্তু এবার ভাবল, অন্য

বগিতে গিয়েই আগে এই বোরখা খুলে ফেলবে। কিন্তু ভিড়

কমতে না দেখায় রজনী ঠিক করল, ট্রেন থেকে নেমে আরেক

দরজা দিয়ে সে আবারো ট্রেনের অন্য বগিতে উঠবে। অতঃপর

সে ডানদিকে মোড় ঘুরে তিন পা এগিয়ে বাম পা বাড়ায় ট্রেনের

বাইরে রাখার জন্য, তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় হৃদয়।

দু'হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা তার। মুখাবয়ব গম্ভীর।

দৃষ্টি রজনীর দিকে। 



হৃদয়কে দেখে রজনী তার বাড়ানো পা অনেক আগেই গুটিয়ে

নিয়েছে। মেয়েটা ভীত চোখে চেয়ে শুকনো ঢোক গিলল।

একটু একটু করে পিছন দিকে সরে যায়। উদ্দেশ্য ট্রেনের

অপর পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। কয়েক পা পিছিয়ে

হঠাৎ উল্টো ঘুরে ট্রেন থেকে বের হতে নিলে হৃদয় দ্রুত এগিয়ে

এসে ডান হাতে রজনীর বাম হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে

মেয়েটাকে তার দিকে ফেরায়। চোখমুখ শ'ক্ত করে তাকায়

রজনীর দিকে। 



রজনী হৃদয়ের দিকে দ্বিগুণ ভীত চোখে তাকায়। হৃদয়ের

মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর জন্য হাত

মোচড়ায়। হৃদয় রজনীর হাত আরও শ’ক্ত করে ধরে শ'ক্ত

গলায় বলে,


“হোয়াট ইজ ইয়্যুর প্রবলেম?”



রজনী অসহায় কণ্ঠে বলে,


“আমার হাত ছাড়ুন। আমি আপনার সাথে যাবো না।”



কথাটা হৃদয়ের বিন্দুমাত্র পছন্দ হলো না। ইচ্ছে করল এই

মেয়েকে ঠাটিয়ে কয়েকশো ঘা লাগাতে। রজনীর হাত আগের

চেয়েও শ'ক্ত করে চেপে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“তোমাকে আমার সাথেই যেতে হবে।”


এতো জোরে হাত চেপে ধরায় রজনীর মনে হলো, তার হাত

অবশ হয়ে আসছে। মেয়েটার চোখের কোণে জলকণা

চিকচিক করছে। সে কাঁদোকাঁদো স্বরে বলে, “আপনি গু'ন্ডা।

আমি গু'ন্ডাদের ভ'য় পাই। আমার ছাত ছাড়ুন বলছি।”



এটুকু বলতেই হৃদয় তার বাম হাতে রজনীর গাল শ’ক্ত হাতে

ধরে রজনীকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের দরজার সাথে

চেপে ধরে মেয়েটাকে। হৃদয়ের দু'চোখ খানিকটা লাল হয়ে

এসেছে। 



এহেন অবস্থায় ভ’য়ে রজনীর কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়। মেয়েটা

এক্ষুনি শব্দ করে কেঁদে দিবে দিবে ভাব। হৃদয় হঠাৎ-ই ঝট

করে রজনীর হাত ছেড়ে দেয়, সাথে রজনীর চেপে ধরা গলা

ছেড়ে দেয়। নিজের বোন ছাড়া কোনো মেয়ের সাথে দু'টো

কথা বলার রেকর্ড-ও তার জীবনে নেই। আর এই মেয়েটাকে

সে ইতোমধ্যে দু’বার টাচ করে ফেলেছে। বারবার একই ভুল

করতে যাচ্ছে। ব্যাপারটায় হৃদয়ের নিজের উপর প্রচন্ড রা'গ

লাগলো। মাথা নিচু করে বা হাতের দু'আঙুলের সাহায্যে

কপাল স্লাইড করতে লাগলো।



হৃদয়কে নিজের হাত মুখ ছেড়ে দিতে দেখে রজনী স্বস্তির

নিঃশ্বাস ফেলে সে হৃদয়ের সামনে থেকে সরে যেতে নিলে

সাথে সাথে হৃদয় রজনীর দু'পাশে তার দু’হাত বাড়িয়ে ট্রেনের

দরজার সাথে ঠেকিয়ে রাখে। রাগান্বিত দৃষ্টি রজনীর দিকে।

রজনী একবার এদিক আরেকবার ওদিক তাকিয়ে দু'পাশে

হৃদয়ের হাত দেখে শুকনো ঢোক গিলে। এরপর মাথা তুলে

হৃদয়ের দিকে তাকায় অসহায় প্লাস ভীত চোখে। ভীষণ কান্না

পাচ্ছে তার। চোখদু'টো টলমল করছে যেন টোকা দিলেই

নোনাজল গড়িয়ে পড়বে। 



হৃদয় রজনীর টলমলে চোখের দিকে চেয়ে রইল বেশ

কিছুক্ষণ। এরপর মেয়েটার সারামুখে দৃষ্টি ঘোরায়। হৃদয়ের

মনে হলো, তার সামনে একটা মিনি পুতুল দাঁড়িয়ে আছে।

মেয়েটা যে এর আগে কখনো বোরখা পরেনি তা হৃদয় দেখেই

বুঝেছ। হিজাবটা টোটালি বাঁধেনি। কোনোরকমে মাথায় দিয়ে

রেখেছে। মাথার অর্ধেক চুল-ই বের হয়ে আছে। রজনীর

এরকম অবস্থায় মেয়েটার উপর প্রচন্ড বিরক্ত হলো সে। 



মুখের উপর হৃদয়কে এভাবে ঝুঁকে থাকতে দেখে রজনী

বারবার শুকনো ঢোক গিলল। হৃদয়ের শরীর থেকে একটি

তীব্র সুগন্ধি রজনীর নাকে এসে লাগে৷ যেটা রজনীর ভীষণ

ভালো লাগলো। এরকম ঘ্রাণ তার কাছে একেবারেই পরিচিত।

মেয়েটা নিজে নিজেই বিড়বিড় করে,


“গু'ন্ডাদের শরীরেও এতো সুন্দর ঘ্রাণ থাকে?”



কথাটা হৃদয় শুনতে পেয়ে গম্ভীর গলায় বলে,

“হুম থাকে।”



রজনী থতমত খেয়ে যায়। কান্নামাখা গলায় বলে, “আমাকে

যেতে দিন।”



হৃদয়ের চোখ রজনীর ভেজা চোখে নিবদ্ধ, ছেলেটার দৃষ্টি

স্থির, হৃদয় নিজেও স্থির, সাথে হৃদয়ের ভেতরে বিদ্যমান

হৃদয়টাও থমকানো। সে মোলায়েম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, 


“কোথায় যেতে চাও?”



রজনী ট্রেনের দরজার সাথে হেলান দেয়া। মাথাটাও দরজায়

ঠেকানো। ওভাবেই মাথা উঁচু করে রেখে তার দিকে ঝুঁকে থাকা

হৃদয়ের দিকে চেয়ে নাক টেনে বলে,

“আমাদের গ্রামে, আমার আব্বার কাছে।”



হৃদয় একই স্বরে উত্তর করে,

“আমি তোমাকে তোমার বাসস্থানে রেখে আসবো।”



রজনী অসহায় কণ্ঠে বলে,

“কিন্তু আমি আপনার সাথে যেতে চাইনা।”



হৃদয়ের কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে ওঠে৷ কিন্তু সে রা’গ’লো

না। রা'গ’লো না বললে ভুল হবে। আসলে তার রা'গ আসছে

না। হৃদয় রজনীর দু'পাশ থেকে তার দু'হাত সরিয়ে আনে।

এরপর রজনীর মাথার উপর টানা হিজাব, যেটি রজনীর মাথা

থেকে প্রায় পড়ে যাওয়ার পথে, সেই হিজাবটি হৃদয় দু'হাতে

টেনে রজনীর পুরো মাথা ঢেকে দিয়ে রজনীর বাদামি চোখে

চোখ নরম স্বরে বলে,



“উল্টাপাল্টা কথা বলো না। আমি রা'গ’তে পারছিনা তোমার

জন্য। আর এজন্য আমার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। আমি যখন

বলেছি, তুমি আমার সাথে যাবে, এর মানে তোমাকে আমার

সাথেই যেতে হবে। আগামীকাল সকাল পর্যন্ত তুমি আমার

সামনে পুতুলের মতো বসে থাকো। এরপর আর কখনো

তোমার সামনে আসবো না, আই প্রমিস ইউ।”


চলবে .......

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×