গল্প: শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:১৭)


লেখিকা:সুরভী আক্তার

পর্ব:১৭

--------------------------


লাজুক আভা ফুটলো শ্যামার মুখে ।

চোখ নামিয়েছে লজ্জায় ।

ওর লাজুকতা দেখে ঠোঁট

 চেপে হাসলো সংগ্রাম ।

শ্যামার শ্যামলা মুখশ্রী কেমন লাল বর্ন ধারন করেছে ।

সংগ্রামের চাহনি আরো বেশ

 অসস্থিতে ফেলছে শ্যামা কে ।



সব গুলো পর্বের লিঙ্ক



সংগ্রাম আলতো হাতে শ্যামার চিবুক ধরে মুখখানি উঁচু

করার চেষ্টা করলো । সহসা সরে আসলো শ্যামা । ঘন

পল্লব ঝাপটে দুরে সরে দাঁড়ালো । সংগ্রাম মৃদু হেসে

আচমকা বলল……



" বাড়িতে যাবে ? 



তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরলো শ্যামা ।

চোখ মুখ জ্বল জ্বল করে উঠলো ।

 আঁতকে উঠলো খুশির ছোঁয়ায় । আবারো

এগিয়ে এসে উত্তেজিত কন্ঠে বলল…



" বাড়িতে নিয়ে যাবেন আমায় ? 



" হুম ! 



" আমার আম্মা আর আপা এসেছে ?

কবে এসেছে ওরা ? 



" কাল এসেছে !



" সত্যি ? তার মানে আপনি এবার নিয়ে যাবেন আমায় ?

আজ যাবো আমরা ? কখন যাবো বলুন না ? আপনি

আমায় আগে বললেন না কেনো ? 



বাচ্চাদের মতো খুশিতে চোখ মুখ ভরে উঠেছে শ্যামার ।

চিকচিক করছে ডাগর চোখ দুটো । হাঁসফাঁস করছে সে ।

সংগ্রাম নিঃশব্দে হাসলো । মোলায়েম কন্ঠে বলল…



" আজ বিকেলে যাবো আমরা । আর তোমায় আগে

বললে কি হতো ? কালকেই যেতে ? কাল গেলে আমাদের

একে অপরের সাথে কাটানো মধুর মূহুর্ত গুলো কোথায়

পেতাম আমি ?



সংগ্রামের কথায় শ্যামা আবারো চোখ নামালো । হাত

কচলাতে কচলাতে মৃদু স্বরে বলল…



" তাড়াতাড়ি যাবো কিন্তু ! 



" আচ্ছা ! 



বাড়িতে যাওয়ার খুশিতে উড়ু উড়ু করছে শ্যামার মন ।

বিকেল গড়িয়েছে । সেই সকাল থেকেই উৎকণ্ঠায় ভরে

আছে শ্যামা । সংগ্রাম বেরিয়েছিল সকালে, দুপুরের দিকে

ভ্যান ভর্তি বাজার সামগ্রী নিয়ে এসেছে সে । লতিফ

জোয়ার্দার নিজেই ব্যবস্থা করেছেন এসবের । জমিদারি

আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য হলেও এসবের প্রয়োজন

ছিল । বিকেলের দিকে রওনা হবে ওরা । সেই অনুযায়ী

শ্যামা কে আরো বেশি গয়না-গাটি দিয়ে বেশ ভুশায়

সাজিয়ে দিয়েছে শবনম । গয়নায় মুড়িয়ে ফেলেছে পুরো । 


বিয়ের পর এই প্রথম বাপের বাড়িতে যাচ্ছে সে , জমিদারি

হাবভাব প্রকাশ না পেলে চলে না । খানিক বাদ রওনা

দেবে ওরা । শ্যামার আর তর সইছে না । ধড়ফড় করছে

বুক খানা । কতদিন পর নিজের বাড়িতে যাবে , আম্মার

সংস্পর্শে যাবে, দেখতে পাবে আম্মা আর আপাকে । স্থির

হয়ে বসে থাকতে পারছে না সে । পায়চারি করছে ঘরে ।

বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে । সংগ্রাম এসে নিয়ে যাবে

ওকে । 


আচমকা শ্যামার মাথায় কিছু একটা চাপতেই থমকে

গেলো সে । স্থির হলো পা দুটো । কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে

নিজেই বের হলো ঘর থেকে । মাথায় ভালো করে ঘোমটা

টেনে নিলো । গুটি গুটি পা ফেলে গিয়ে থামলো লতিফ

জোয়ার্দারের ঘরের সামনে । তিনি এখন ঘরে নেই । টহলে

বেরিয়েছেন গ্রামে । শ্যামা ঢোক গিললো । হাত পা

শিরশির করছে ওর । ঘামছে হাতের তালু । সালেহা ঘরেই

আছেন । আজ কাল ঘর থেকে বের হন না তিনি । এর

কারণটা শ্যামা । শ্যামার মুখ দর্শন অবধি করতে চান না

তিনি । শ্যামা এই কদিনে এক শব্দেও কথা বলে নি তার

সাথে । আজ সে সাহস জোগালো নিজেকে । লম্বা শ্বাস

টেনে দরজায় কড়া নাড়লো । খানিক বাদ গম্ভীর স্বরে

সাড়া এলো ভিতর থেকে……



" আয় ভেতরে…



শ্যামা পুনরায় ঢোক গিললো । সালেহা হয়তো ভেবেছেন

অন্য কেউ এসেছে হয়তো । 


শ্যামা দরজা ঠেলে ভেতরে পা বাড়ালো । কম্পন অনুভূত

হচ্ছে হাঁটুতে । সালেহা তার বিশাল আলমারি খুলে তার

সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা খুঁজছেন হয়তো । শ্যামা

পিছন থেকে কাঁপা গলায় ডাকলো…



" আম্মা…



তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরলো সালেহা । অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ

করলো শ্যামার পানে । শ্যামা ভাবান্তর দেখালো না ।

সালেহা এক ঝটকায় এগিয়ে এসে খ্যাট খ্যাট স্বরে চেঁচিয়ে

উঠলো…



" এই মেয়ে ,

তোর সাহস কি করে হয় আমার ঘরে পা রাখার ?

 কোন সাহসে এসেছিস এখানে ? বল ? অপবিত্র মেয়ে,

আমার ছেলের গলায় ঝুলে পড়েও শান্তি হয় নি তোর ?

ঐ নোংরা শরীর নিয়ে কি করতে এসেছিস এখানে ? 



শ্যামা মলিন হাসলো । শান্ত কন্ঠে বলল…



" আজ যাচ্ছি আম্মা । আপনিও তো আমার মা । মায়ের

কাছ থেকে দোয়া নিতে আসলাম । দোয়া করবেন না

আমায় ? 



" তোর জন্য আমার জবান থেকে দোয়া বেরোবে না

কখনো । তবে বদ'দোয়া অবশ্যই দেবো তোকে । আমার

ছেলেকে ফাঁসিয়েছিস না ? তোর ঐ কুৎসিত গায়ের

রংয়েও পাগল বানিয়েছিস আমার ছেলেকে ! 



" আমি কাউকে ফাঁসাই নি আম্মা ! 



" চুপ, খবরদার তোর ঐ মুখে আম্মা ডাকবি না আমায় ।

বল কি চাই তোর ? টাকা, পয়সা, গহনা-গাটি , সোন-

গয়না, কি চাই তোর বল ? কি পেলে আমার ছেলের

জীবন থেকে সরবি তুই ? আমাকে ছেলেকে নিস্তার দিবি

কি পেলে, বল ? লোভে পড়ে তো বিয়ে করেছিস

জমিদারের ছেলেকে । লোভ সামলাতে পারিস নি

জমিদারি দেখে ? বল কত টাকা চাই তোর ? 




আঙ্গুল তুলে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে কথা গুলো বলে

থামলো সালেহা । রাগে রিতিমত গজগজ করছেন তিনি ।

শ্যামা নির্বাক হয়ে শুনে গেলো । চোখ ভরাট হয়ে আসছে

ওর । ওর নিরবতা দেখে সালেহা কুটিল হাসলেন । পিছন

ফিরে আলমারি থেকে বের করলেন কিছু । অতঃপর

শ্যামার সম্মুখে অগ্রসর হলেন । কিছু কাগজের মুল্যবান

নোট ছুঁড়ে মারলেন শ্যামার মুখে । মুখ ফিরিয়ে নিলো

শ্যামা । সালেহা শব্দ করে হেসে বললেন…



" এটার জন্যই এসেছিস আমার কাছে , তাই না ? মুখে

বলতে পারছিলি না বুঝি ? লজ্জা করছিল? গুনে নে ,

অনেক টাকা আছে এখানে,

দেখেছিস কখনো এতো টাকা ?

 তোর এই জীবনটা উপভোগ করতে পারবি এসব দিয়ে ।

প্রয়োজন হলে আরো দেবো , তবুও ছেড়ে দে আমার

ছেলেকে । এই যে আজ যাচ্ছিস , পুনরায় যেন এই

বাড়িতে পা না পড়ে তোর ! তোর ঐ অলক্ষ্যুনে মুখ যেন

দ্বিতীয় বার দেখতে না হয় আমাকে ! নে , টাকা তোল

আর বিদায় হ এখান থেকে । 



শ্যামা নিরুত্তর । ছলছল করছে চোখ দুটো ।

কি বলবে সে ?

কিন্তু বলতে তো হবেই । শ্যামা নিরেট কন্ঠে বললো…



" এসবের প্রয়োজন নেই আমার আম্মা । এতো টাকা

আমি কখনো দেখিনি এটা ঠিক । কিন্তু এই কাগজের

নোট গুলোর প্রতি কোনো চাহিদা নেই আমার । আপনার

ছেলের স্ত্রী আমি, তিনি নিজেই স্ব-জ্ঞানে বিয়ে করেছেন

আমায় । আমি যে আর তাকে ছাড়তে পারবো না । আমি

সংসার করতে চাই তার সাথে আম্মা । একমাত্র তিনি যদি

আমাকে না ছাড়েন, তাহলে মরণ ব্যতীত অন্য কোন কিছু

তার থেকে আমাকে ছাড়াতে পারবে না । 


আজ আসি আম্মা ! দোয়া করবেন…



শ্যামা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে পিছন ফিরলো ।

সালেহা তেঁতে উঠলেন…



" তাহলে বদ'দোয়া দিলাম তোকে, তোর মরণ'ই তোকে

ছাড়াবে আমার ছেলের থেকে । তুই সংসার করতে পারবি

না আমার ছেলের সাথে । তোকে সংসার করতে দেবো না

আমি । 



শ্যামা বুকটা কেঁপে উঠলো । এক মুহুর্তের জন্য পা থমকে

গেলেও পরমুহূর্তে দ্রুত গতিতে বের হলো ঘর থেকে ।

বাইরে বেরোতেই মুখোমুখি হলো সংগ্রামের সাথে । আজ


বৃহস্পতিবার, সংগ্রামের পড়নে আজ কালো একটা

পাঞ্জাবি । উপরে সাদা শাল আড়াআড়ি ভাবে জড়ানো ।

ফর্সা শরীরে কালো পাঞ্জাবি ধবধবে হয়ে ফুটে উঠেছে ।

সংগ্রাম ভ্রু কুঁচকে পেছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দরজা

থেকে কয়েক পা দূরে । ভেতরের কথা গুলো তার কানে

পৌঁছেছে কি না জানা নেই শ্যামার । সংগ্রাম কে দাঁড়িয়ে

থাকতে দেখে থতমত খেলো শ্যামা । হাসার চেষ্টা করলো ।

নিরস স্বরে বলল…



" আপনি এখানে ? চ.. চলুন ! আমি তৈরি ! 



" আম্মা কি বললো তোমায়…? 


ঘন পল্লব ঝাপটে ঢোক গিললো শ্যামা ।

মিথ্যে বলে না ও ।

গলায় বাঁধে । তবুও সে বাহানা দিলো…



" দোয়া দিলো আম্মা আমায় । আর বললো তাড়াতাড়ি

যেন ফিরে আসি । চলুন যাই…



বলেই মাথা নামিয়েই পা বাড়ালো শ্যামা । সংগ্রাম একই

অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে ওর হাত ধরলো পিছন থেকে ।

হাত টেনে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে মুচকি হাসলো ।

শ্যামার মুখখানা আগলে নিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল…



" সংসার আমার সাথে করবে তুমি । আমি তোমার স্বামী,

আর তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী । অর্ধাঙ্গিনী মানে বোঝো ?

আমার জীবনের অর্ধেক অস্তিত্ব তোমার সাথে মিশে গেছে

শ্যামা । আমি তোমাকে চাই,

সাথে থাকবো আমি তোমার ।

আর কে থাকলো না থাকলো তাতে কিচ্ছু এসে যায় না

আমার । আম্মার কথায় কিছু মনে করো না ।

আমারথেকে কেউ দূরে সরাতে পারবে না তোমায় ।

কোনো দিন

না ! মরণ ব্যতীত আমাকে তোমার থেকে কেউ দূরে

সরাতে পারবে না । আর না তোমাকে আমার থেকে ।

বুঝেছো ? 



মাথা নামিয়ে আলতো ঘাড় কাত করলো শ্যামা । সংগ্রাম

বললো…



" বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, চলো…



শ্যামা পা বাড়িয়ে আবারো থামলো । বালার কথা মাথায়

আসতেই বললো…



" একবার বালার সাথে দেখা করে আসি ? 



" হুম, চলো…



বালার ঘরের সামনে এসে থামলো সংগ্রাম । শ্যামা ভেতরে

ঢুকলো । খাটের উপর গলুর সাথে বাচ্চাদের মতো খেলায়

মজেছে বালা । শ্যামা কে দেখে চোখ তুললো ও । মুচকি

হেসে বললো…



" এখনো যাও নি ? 



" নাহ , তোমার সাথে দেখা করতে আসলাম ।

এখন যাবো । 



এগোতে এগোতে বললো শ্যামা । বালা আবারো মুচকি

হেসে বললো…



" তাড়াতাড়ি আসবে কিন্তু । তোমাকে খুব মনে পড়বে

আমার ।



" হুম, খুব তাড়াতাড়ি আসবো । 




শ্যামার কথার মাঝেই সংগ্রাম ঢুকলো ঘরে । ঘরে ঢোকার

ইচ্ছে ছিল না । অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঢুকলো । সহসা বালার

সাথে চোখাচোখি হলো ওর । মুখের হাসি টুকু নিমিষেই

গায়েব হলো বালার । দৃষ্টি কেঁপে উঠলো । দৃষ্টি আরো

বেশি গাঢ় হওয়ার আগে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো বালা । সংগ্রাম

এগিয়ে এসে বালার উদ্দেশ্যে গম্ভীর কন্ঠে বলল…



" তুই ও তৈরি হয়ে নে । তুই ও যাবি আমাদের সাথে ! 



দীর্ঘ কয়েক দিন পর বালা কে উদ্দেশ্য করে কথা ছুঁড়লো

সংগ্রাম ।

 ওর কথাটা শুনে খুশি হলো শ্যামা ।

উৎসুক হয়ে
বললো…



" হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমিও চলো । অনেক ভালো হবে তাহলে । আমি

তোমার কাপড় বের করে দিচ্ছি । তৈরি হয়ে নাও

তাড়াতাড়ি । 



বালা তাচ্ছিল্য হেসে বলল…



" না শ্যামা , তোমরা যাও ।

আমি তোমাদের মাঝে যেতে চাই না ।

আর এমনিতেও আমি গিয়ে কি করবো ওখানে ? 



সংগ্রাম আবারো বলে উঠলো……
 


" শ্যামা, ওর কাপড় গুছিয়ে ওকে তৈরি করাও । গাড়ি

অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য । 



" আমাকে জোর করবেন না সংগ্রাম ভাই । আমি বাধ্য

নোই আপনার কথা শুনতে । আমি যাবো না , আপনাদের

মাঝে জড়াবেন না আমায় ।



জ্ঞান বোধ হওয়ার পর বোধ হয় এই প্রথম সংগ্রাম কে ভাই

বলে সম্বোধন করলো বালা । ছোট বেলায় সবসময়

সংগ্রাম ভাই সংগ্রাম ভাই বলে বলে কানের পোকা নাড়িয়ে

দিতো । পিছু পিছু ঘুরতো সবসময় ।

লতিফা যখন এই বাড়িতে আসে তখন

 বালার বয়স ছিল সবে মাত্র দুই বছর ।

সংগ্রাম তুলনামূলক দশ বছরের বড় ওর থেকে । জুনাইদ

আর সংগ্রাম সমবয়সী । জুনাইদের সাথে সাথে সংগ্রাম

কেও সবসময় ভাই ভাই বলে ডেকে বেড়াতো বালা । তবে

বড় হওয়ায় সাথে সাথে সংগ্রাম কে ভাই ডাকা থেকে

বেরিয়ে এসেছে বালা । বোধ শক্তি হওয়ার পর আলাদা

অনুভুতি কাজ করেছে সংগ্রামের প্রতি । কিশোরি বয়সে

সেই অনুভূতি গুলো বাঁধ ভেঙেছে । অনুভূতি গুলোর মানে

বুঝতে শিখেছে সে । যার ফলে কখনো ভাই সম্বোধন টা

মুখেও আসে নি । গলায় আকটাতো দ্বিধায় । আহ্লাদ করে

সংগ্রাম জোয়ার্দার বলে ডাকতো সংগ্রাম কে । এই নিয়ে

লতিফার কতোই না বকা শুনতে হয়েছে ওকে । সংগ্রামের

কাছেও ঝাড়ি খেয়েছে অনেক । এই ভাই ডাকটা শোনার

জন্য কত-শত বকাবকি করেছে বালা কে । 


কিন্তু বালা দ্বিতীয় বার আর ভাই বলে সম্বোধন করে নি ।

কখনো ভাইয়ের জায়গায় কল্পনাও করতে পারে নি

সংগ্রাম কে । যে জায়গায় কল্পনা করতো সে জায়গা টা

ছিল সম্পুর্ন বিপরীত ।

যেটা শুধুমাত্র কল্পনাতেই ঠাই পেলো ।

যেটা বর্তমান বাস্তব হওয়াটা কল্পনাতেও আসে না ।

কল্পনার কল্পলোকে কল্পিত কল্পনারা ওর কল্পনাতেই

কাল্পনিক হয়ে রইলো । 


মানুষ কল্পনাতে সুখি । যে সুখ বাস্তবের থেকে অধিক

অনুভূতি সম্পন্ন । বাস্তবতা তো ভিন্ন । সবকিছু বাস্তব হয়

না , কিন্তু কল্পনায় সবকিছুই কল্পনা করা যায় । 


দীর্ঘ অনেক বছর পর বালার মুখে ভাই ডাকটা শুনে বক্ষ

স্থল ধক্ করে উঠলো সংগ্রামের । আঁতকে উঠলো সে ।

বালার কষ্ট টা তো ভালো করেই জানে । মনে প্রশ্ন জাগে,

সে কি কখনো পারতো না বালাকে আপন করতে ? উত্তর

খুঁজে দেয় মন নিজেই , না সে পারতো না । কারন বালা

শুধু ওর কাছে বোন ছিল । বোন ব্যতীত অন্য কোন দৃষ্টিতে

বালা কে কখনো উপলব্ধি করতে পারে নি সংগ্রাম । বোন

হিসেবে ওর আহ্লাদ সহ্য করেছে সবসময় , শাসন ও

করেছে । ভুল ছিল একটাই, সেটা হলো বালাকে না

বোঝাতে পারা । মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কিছু গড়ে

তোলা সম্ভব নয় কখনো । সংগ্রাম পারে নি নিজের মনের

বিরুদ্ধে যেতে । বালাও তো পারে নি । 


সংগ্রাম লম্বা শ্বাস টানলো । বুকের ভেতরটা কেমন ভার

হয়ে আসছে । সে হাসার চেষ্টা করলো । এগোলো দৃঢ়

পায়ে । শ্যামা কে বললো বালার কাপড় গুছিয়ে দেওয়ার

জন্য । শ্যামাও কথা বাড়ালো না । বালা একা একা থাকে

সবসময় । লতিফা কে বালার কাছে একটা বারের জন্যেও

দেখে নি শ্যামা । মেয়ের কাছে দুদণ্ড বসতেও দেখা যায় না

তাকে । 


বালার একা একা থাকার চেয়ে ভালো হবে শ্যামা দের

সাথে যাওয়াটা । শ্যামা উঠে গেলো আলমারির দিকে ।

কাপড় বের করতে লাগল সে । বালা নিরুদ্বেগ হয়ে চেয়ে

আছে । গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না । 


সংগ্রাম নিঃশব্দে বসলো ওর পাশে । খানিক চুপ থেকে

অপরাধী নরম স্বরে বলল…



" আমাকে ক্ষমা করে দিস বালা, তোকে জড়াতে পারলাম

না আমার জীবনের সাথে । ভালোবাসতে পারলাম না

তোকে । তোর মতো নিষ্পাপ ফুলের সাথে আমি জড়ায়

নি, শুকরিয়া আদায় কর । 



" শ্যামা ও তো নিষ্পাপ । 



পরম আবেশে চেয়ে আচমকা কথা টা বললো বালা ।

সংগ্রাম তাৎক্ষণিক উত্তর করার মতো ভাষা হারালো ।

সময় নিয়ে বললো…

" ওর আসার কথা ছিল আমার জীবনে । বাম পাজরের

হাড় দিয়ে রেখেছিলাম যে , তার একটা টান তো আছেই । 



" আপনাকে হারালাম এই নিয়ে আমার আমার কোনো

আফসোস নেই সংগ্রাম ভাই । আফসোস একটাই থেকে

গেলো , আপনাকে পেলাম না , আর কখনো পাবো ও না ।

আর সারাজীবন এই আফসোস টা রয়েই যাবে ,

আপনার সাথে আমার কল্পনায়

সাজানো কল্পিত সংসার টা হলো না । 



" কথাটা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে হলেও একি হলো না ? আমি

তোর সম্পর্কে ভাই হোই বালা । সারা জীবন তোকে

বুঝিয়েছি এটা । বুঝতে চাস নি তুই । 



" সেটাই তো সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আমার ! কখনো

বুঝতে পারলাম না আমি । আরে আমাদের জীবনটাই তো

বিচিত্র ময় । অসম্ভবের প্রতি আমাদের অসম্ভব টান

জন্মায় ।

 অধিকার নেই এমন নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মায়া

জন্মায় । 


জানেন সংগ্রাম ভাই , আমার জীবনে যদি কোন কিছু

নিজের করে পাওয়ার সুযোগ থাকতো , তাহলে আমি

আপনাকে চেয়ে নিতাম । এই চোখ দুটোতে আজ কাল

পানি আসে খুব , এই পানির ধারা বন্ধ করার জন্য হলেও

আপনাকে চাইতাম । কিন্তু আর চাইবো না । সুখি হোন

আপনি । এটাই চাইবো এখন । 



" জটিল জটিল অনেক কথাই শিখেছিস দেখছি ! 



" আমার জীবন এখন আমায় অনেক জটিলতায় ফেলে

দিয়েছে সংগ্রাম ভাই । আমার জীবনের গল্প টা তো ভিন্ন

হলেও পারতো বলুন ! যদি জানতাম এই জীবনের গল্পের

শেষে আপনাকে পাবো না, তাহলে জীবনের এই গল্পটা

শুরুই করতাম না ।



" গল্প তো সবে শুরু হলো । ভুল মানুষকে সরিয়ে সঠিক

মানুষ বাছাই করে গল্পের পূর্ণতা দেওয়া আল্লাহর হাতে ।

তোর জীবনে আমি ছিলাম না কখনো , যে আসবে সেই

ছিল তোর পুরো অস্তিত্ব জুড়ে । ভুলে যা আমায় , আমি

তোর জীবনের কোন অস্তিত্বেই নেই । যদি থাকতাম,

তাহলে শ্যামার জায়গায় তুই থাকতি । 



" আমি ভুলতে চাই সবটা । বিশ্বাস করুন , প্রতিদিন


নিজের মাথায় নিজেই বারি মারি । অসভ্য চোখ দুটো

জ্বলে অনেক । ভোলার চেষ্টায় গেলে পানি আসে চোখে ।

আবারো সেই পানি টুকু মুছতে মুছতে ভাবি ভুলে যাবো

সব , কিন্তু এই ভাবনা থেকে আবারো চোখে পানি আসে ।

কি করবো আমি সংগ্রাম ভাই ? 



সংগ্রাম বাক্ হারালো । গলা কাঁপছে । বালার চোখ দিয়ে

পানি গড়াচ্ছে আপনা আপনি । শ্যামা ওদের কথা বলার

সুযোগ করে দিয়েছে । কাপড় গুছিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে

আছে । সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসছে চারদিকে । সংগ্রাম

নিরবতা ভেঙ্গে উঠে দাঁড়ালো । স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…



" দেখিস রাজপুত্র আসবে তোর জন্য ।

তুই তো রাজকন্যা ।

রাজকন্যার জন্য শুধু রাজপুত্র কেই মানায় । যে কখনো

তোর চোখে পানি আসতে দেবে না । খুব বেশি

ভালোবাসবে তোকে । 



" সে আপনার মতো হবে তো সংগ্রাম ভাই ? 



নিস্তেজ আহত স্বরে প্রশ্ন করলো বালা । সংগ্রাম হেসে

উত্তর করলো…



" আমার থেকেও হাজার হাজার গুণ ভালো হবে । আমি

তো কিছুই নোই । 



" উঁহু…আপনি অনেক কিছুই ছিলেন ।



" হুম হয়েছে , এবার যা দেখি । তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে

নে । কতক্ষন ধরে বকবক করছি তোর সাথে । তুই তো

ভারী চঞ্চল হয়েছিস । যেতে হবে তো আমাদের,

তাড়াতাড়ি যা । 



বালা মুচকি হাসলো । বুকের ভেতর জমানো ভার টুকু

হালকা হয়েছে অনেকটা । 


সংগ্রাম আশেপাশে চোখ বুলিয়ে শ্যামা কে দেখতে না

পেয়ে বারান্দার দিকে পা বাড়ালো । বারান্দায় শ্যামা কে

দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিঃশব্দে হাসলো । বারান্দার কর্নিশ

ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে তার সহধর্মিণী । সংগ্রাম পেছন থেকে

আলতো করে জড়িয়ে ধরলো ওকে । আচমকা স্পর্শে

চমকিত হলো শ্যামা ।

সংগ্রামের গায়ের পুরুষালি গন্ধ নাসারন্ধ্রের ভিতরে হানা

দিতেই আবেশে চোখ বুজলো সে ।

সংগ্রাম শ্যামার ঘাড়ে চিবুক ঠেকিয়ে নরম শীতল কন্ঠে

বলল…



" মন খারাপ ? 



শ্যামা ক্ষীন স্বরে উত্তর করলো …



" মন খারাপ হবে কেনো ? 



" দেরি হয়ে গেলো আমাদের । বালা তৈরি হচ্ছে । ও যাবে

আমাদের সাথে । বালার বিষয় টা নিয়ে ভাবছো তাই না ? 



শ্যামা নিজের থেকে আলতো হাতে সংগ্রামের হাত

ছাড়ালো । পিছন ফিরে মুখোমুখি দাঁড়ালো । সংগ্রামের

কপালে ভাঁজ পড়েছে । শ্যামা আলতো হেসে বলল…



" ভালোবেসে আগলে রাখা যেমন কঠিন , ভালোবাসার

মানুষ কে ত্যাগ করা তার থেকেও বেশি কঠিন ছোট

জমিদার সাহেব । বালার অবস্থা উপলব্ধি করতে পারছি

আমি । ওর সদ্য জীবনের প্রথম ভালোবাসা আপনি । ওর

সাথে এমনটা না হলেও পারতো । আপনি চাইলেই কিন্তু

ওকে ভালোবাসতে পারতেন । ও সব দিক থেকেই

আপনার যোগ্য ছিলো । আমি ছিলাম না…



শ্যামা কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সংগ্রাম বলে

উঠলো…



" কালকের পর ও এই কথাটা বলছো ? 



শ্যামা ওর কথার অর্থ বুঝলো তৎক্ষণাৎ । মাথা নুইয়ে

ফেললো সে । সংগ্রাম মুচকি হাসলো তা দেখে । 


বালাকে তৈরি করে শ্যামা আর সংগ্রাম নিচে এসেছে ।

বসার ঘরে সবাই উপস্থিত ছিল । লতিফ জোয়ার্দার সবে

এসে বসলেন সোফায় । বালা কে শ্যামা আর সংগ্রামের

সাথে যেতে দেখে কোন প্রকার ভ্রু'ক্ষেপ দেখালো না

লতিফা । কথাও বললো না একটাও । শবনম আর

আতিয়া বেগম খুশি হয়েছেন বালা কে দেখে । শ্যামা

বিদায়ের আগে সালাম করলো সবাই কে । লতিফ

জোয়ার্দার শ্যামার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে আদর করে

বললেন…



" তাড়াতাড়ি ফিরে এসো আম্মা । আমার ঘরের আলো

তুমি । এই আলো যেন সারাটা জীবন আলোকিত করে

রাখে আমার ঘর । অন্ধকার সইবে না জমিদার বাড়িতে ।

তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, কেমন ? 



ঘাড় কাত করে সম্মতি দিলো শ্যামা । 


অতঃপর বেরিয়ে আসলো সদর দরজা পেরিয়ে । প্রধান

ফটকের বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল । সংগ্রামের সেই কালো

জিপ । আহাদ আছে গাড়ির চালক হিসেবে । শ্যামার

মাথায় অদুর পর্যন্ত ঘোমটা টানা । ঘোমটার আড়ালে

আহাদ কে দেখে চিনতে অসুবিধা হলো না শ্যামার ।

একবার দেখেছিল সে আহাদ কে । মনে আছে মুখশ্রী ।

অনেক আগে দেখেছিল । তখনকার থেকে এখন অনেক

পরিবর্তন এসেছে আহাদের মাঝে । এখন সে লম্বা চওড়া

সুপুষ্ট দেহি একজন সুঠাম পুরুষ । গায়ের রং শ্যামলা ।

শ্যামা কথা চেপে রাখতে পারলো না । উত্তেজিত কন্ঠে

শুধালো…



" আপনি আহাদ ভাই , তাই না ? আহাদ ভাই , ফুলি

কেমন আছে আহাদ ভাই ? ওকে আমার কাছে নিয়ে

আসেন নি কেনো ? 



আহাদ প্রফুল্ল হাসলো । তৎক্ষণাৎ বললো…



" ফুলি ভালো আছে শ্যামা । তুমি জানো , তোমার সখি

প্রতিদিন নিয়ম করে তোমার খোঁজ নেয় । সারাদিন

তোমার কথা বলে……



বলতে বলতে সংগ্রামের পানে চেয়ে থেমে গেল আহাদ ।

মাথা নামিয়ে ফেললো সহসা । অনুনয় মিশ্রিত কন্ঠে

বলল…



" আপনার স্ত্রী কে নাম ধরে ডাকার জন্য ক্ষমা করবেন

ছোট জমিদার । আর ভুল হবে না……


সংগ্রাম কপাল কুঁচকে বললো…


" তাতে কি হয়েছে ? তুমি ওকে নাম ধরেই ডাকতে পারো ।

তোমরা পূর্ব পরিচিত । আর তোমাকে কতবার বলবো

আমাকে ছোট জমিদার না ডাকতে । নাম ধরে না ডাকো ,

তবে তোমাকে বলেছি না ভাই সম্বোধন করতে । ভুলে যাও

কেনো এটা…



নোয়ানো মাথা তুললো আহাদ । হাসি ফুটলো মুখে । মাথা

চুলকালো সে । ছোট জমিদার ডাকটা অভ্যাস হয়ে গেছে ।

ছাড়তে সময় তো লাগবেই ।




শ্যামা দের বাড়ির সামনে জিপ থামতেই হুড়মুড়িয়ে জিপ

থেকে নেমে পড়ে শ্যামা ।

 বুকটা ধড়ফড় করছে তার । আর তর সইছে না ।

চোখ দুটো কাঙাল হয়ে আছে আম্মা

কে এক পলক দেখার জন্য । 

শ্যামা গাড়ি থেকে নেমেই হিতাহিত

 জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে ।

 সে সব ভুলে আশেপাশে না তাকিয়ে এক ছুট লাগায়

বাড়ির ভেতরে । চারদিকে বেশ অন্ধকার । অন্ধকারেই

ছুটে চলেছে সে । থামলো বাড়ির ভেতরে এসে । পাশের

বাড়ি থেকে আসা বৈদ্যুতিক হলদে আলোয় বোঝা যাচ্ছে

পুরো বাড়ি । তিন দিকে তিন ঘরে হারিকেন জ্বলছে । চোখ

বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস টানলো শ্যামা । চিরচেনা মাটির

গন্ধ ঠেকলো নাকে । শ্যামা বাইরে থেকেই উত্তেজিত কন্ঠে

গলা উঁচিয়ে কাঁপা স্বরে ডাকলো…

" আম্মা...



কয়েক মুহূর্তের মাথায় চোখের সামনের ঘর থেকে

ধড়ফড়িয়ে বেরিয়ে আসলেন অলকা । মেয়ের ডাকে মাতৃ

হৃদয় ছ্যাঁত করে উঠেছে তার । আম্মা কে দেখে টলমল

করে ওঠে শ্যামার অক্ষি যুগল । চোখের পানি অথচ মুখে

হাসি নিয়ে মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে আম্মার বুকে । হাউমাউ

করে কেঁদে ওঠে আচমকা ।

 অলকা থমকে যান ক্ষীয় কাল ।

 চোখ ভিজে এসেছে তার । শ্যামার কান্নার শব্দে ঘর

থেকে বেরিয়ে আসেন কাকড়ি বুড়ি । শ্যামা কে দেখে

তাচ্ছিল্য করে নাক সিঁটকান তিনি । মোখলেছ বাড়ি নেই ।

ফিরবে হয়তো একটু পর । 


শ্যামা আহাজারি করছে আম্মা কে জড়িয়ে । কান্নারত

অস্থির কন্ঠে বলছে…



" ওরা আমারে কেউ কোনো দিন ভালোবাসলো

 না আম্মা।

ভালো চাইলো না আমার । আব্বা আমারে

ভালোবাসলো কোনো দিন ।

তোমার মতো কেউ হইলো না ।

 তুমি যাওয়ার পর আমার জীবনটা নষ্ট করার পাঁয়তারা

করলো ওরা । সুযোগ নিলো তোমার অনুপস্থিতির ।

তোমার অবর্তমানে আমি নিঃস্ব ছিলাম আম্মা । তোমার

তুলনা কারোর সাথেই হয় না । 


আব্বা ক্যান এমনটা করলো আম্মা ? ক্যান করলো


এমন……



শ্যামার চোখের পানিতে অলকার বুক ভিজে গেছে ।

বহুদিন পর মায়ের বুকে মাথা রেখে সকল কষ্ট জেঁকে

উঠেছে পুনরায় । যে কষ্ট গুলো কান্নার মাধ্যমে উন্মোচন

করছে শ্যামা । অলকা নিরুত্তর । সংগ্রাম আর বালা বাড়ির

ভিতরে ঢুকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দেখছে তাদের । বালা

অবাক লোচনে তাকিয়ে আছে । সে দেখছে শ্যামা কে তার

মাকে জড়িয়ে ধরতে । মাকে জড়িয়ে কাঁদতে দেখছে । 

শ্যামা চুপ করে ফোপাচ্ছে এখন । অলকা ভেজা কন্ঠে

ডাকলেন……



" শ্যামা…


ওঠ , দেখ জামাই আইছে । দাঁড়াইয়া আছে ওরা…

তৎক্ষণাৎ উঠলো শ্যামা ।

কান্নার ফলে হেঁচকি উঠে গেছে ।

 নাক টানছে বারবার ।

অলকা ভেজা চোখ আড়াল করে

হাসার চেষ্টা করলেন ।

শ্যামার চোখ মুছিয়ে দিলেন দুহাতে।

 কপালে চুমু খেয়ে নরম কন্ঠে বললেন……



" যা হয় ভালোর জন্যই হয় । সব ভুইলা যা শ্যামা ।

মানুষের অতীত থাকে কিন্তু সেই অতীতে ডুইবা থাকতে

নাই । এহন তোর বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়া ভাব । কিচ্ছু

খারাপ হয় নাই তোর লগে ‌ । বিয়া হইছে তোর , সংসার

হইছে । এবার তুই অনেক সুখি হইবি দেখিস । 



শ্যামা ফুঁপিয়ে উঠলো । অলকা সংগ্রাম কে দেখে মুচকি

হাসলেন । সংগ্রাম এগিয়ে সালাম জানালো । অলকা উত্তর

করে মোলায়েম কন্ঠে বললেন…



" ওদিকে দাঁড়াইয়া আছো ক্যান বাবা । ঘরে আহো …



এদিকে কাঁকড়ি বুড়ি সংগ্রাম কে দেখা মাত্রই যেন চুপসে

গেলেন । চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো ।

অজানা ভয়ে ভীত হয়ে সিটিয়ে গেলেন তিনি । শুল্ক ঢোক

গিললেন । সেদিনের পর জাফর ব্যাপারির খোঁজ পাওয়া

যায়নি আর । মাধবপুরে নতুন মাতব্বর নিয়োগ দেওয়া

হয়েছে মৌলভী সাহেব কে । পরদিনই সংগ্রাম নিজে

দাঁড়িয়ে থেকে দায়িত্ব সঁপেছেন তার হাতে ।

 জাফর ব্যাপারির কি হলো এটা নিয়ে

 কোনো প্রশ্ন তোলে নি কেউ ।

এই নিয়ে দুঃসাহস দেখায় নি কেউ । 


সংগ্রামের নজরে পড়ার আগেই কাঁকড়ি বুড়ি কোনো

রকমে কাঁপা পায়ে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন । বাইরে ভ্যানে

যত মালামাল ছিলো, সংগ্রামের আদেশ মোতাবেক সব

ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয় । 


আপার কথা ধ্যানে আসতেই শ্যামা দ্রুত

 পায়ে ঘরে ঢোকে । বিছানায় শুয়ে আছে রুপা ।

চোখ দুটো চঞ্চল । এতক্ষণ

শ্যামার অপেক্ষায় ছিলো সে । নিজের দূর্বলতার কারনে

খাট থেকেও নামতে পারছে না সে ।

হাঁটাহাঁটি তো দূরের কথা ।

আপাকে দেখে পুনরায় ডুকরে কেঁদে উঠলো শ্যামা ।

রুপা শুকিয়ে গেছে কয়েক দফা । চেহারায় মলিনতা

বেড়েছে । বাচ্চা মারা যাওয়ার শোকে কাতর হয়ে পড়েছে

সে । শ্যামা কে দেখে সেও কেঁদে উঠলো । শ্যামা ভাষা

হারালো কিছু বলার মতো । কি বলবে সে । কি বলে

শান্তনা দেবে আপাকে ?


একে অপরকে জড়িয়ে কাঁদলো দুবোন । রুপা থামলো

একটু । শ্যামা কে নতুন রূপে দেখে চোখ জুড়িয়ে আসছে

ওর ‌। শ্যামার শরীর পুরো গহনায় সাজিয়ে দেওয়া । নাকে

নতুন নাকফুল । হাত,কান,গলায় ভারী ভারী গহনা । রুপা

শ্যামার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললো…



" তুই ভালো আছিস শ্যামা ? 



শ্যামা কান্না ভেজা কন্ঠে উত্তর করলো…



" আমি অনেক ভালো আছি আপা । কিন্তু তুমি , তোমার

লগে এইটা কি হইলো আপা ? ক্যান হইলো এমন ? 



রুপা হাসলো । ভরাট চোখ দুটো থেকে পানি গড়িয়ে

পড়লো । দরজার কাছে চোখ যেতেই বালা নজরে

আসলো । দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ও । রুপা ভেজা চোখ

নিয়েই মুচকি হাসলো । ইশারা করে কাছে ডাকলো বালা

কে । বালা দ্বিতীয় বার অবাক হলো রুপা কে দেখে ।

শ্যামা কে ওরা এতো ভালোবাসে । বালা এগিয়ে এসে

বসলো দুজনের মাঝে । শ্যামা বালা'কে পরিচয় করিয়ে

দিল রুপার সাথে । বালা অদ্ভুত স্বরে বলে উঠলো…



" তুমি আসলেই অনেক ভাগ্যবতী শ্যামা । আমি কিন্তু

এমনি এমনি বলি নি । তোমায় সবাই কতো ভালোবাসে ! 



হেসে ফেললো শ্যামা । তাচ্ছিল্য করে বললো……


" মাত্র দুজনের ভালোবাসা দেখেই এই কথা বলছো ? তুমি

জানো , এই দুজন মানুষ আর ফুলি ছাড়া আমাকে আর

কোন দিন কেউ ভালোবাসে নি । উৎকৃষ্ট আমার জীবনে

এক আকাশ পরিমাণ অভিযোগ , একটা মানুষের হাতেও

পাঁচটা আঙুল থাকে । অথচ আমার জীবনে, সেই পাঁচটা

মানুষ ও নেই যারা আমাকে ভালোবাসে । 



বালা বাঁধ সাধলো তৎক্ষণাৎ…



" উঁহুম… ভুল বললে । একজনের কথা ভুলে গেলে ।

সংগ্রাম জোয়ার্দার , তার কথা বললে না যে ? উৎকৃষ্ট

তোমার জীবন ধন্য তার ভালোবাসা পেয়ে । তার .

ভালোবাসার তুলনা কিন্তু আর কারোর সাথেই হয় না । 



রুপা মুগ্ধ নয়নে চেয়ে হাসলো ‌। শ্যামার মুখে শুদ্ধ ভাষা

শুনে খানিক অবাক হলো বটে । 


রাতের খাবার শেষে ঘরে একা একা বসে আছে সংগ্রাম ।

বিদ্যুৎ নেই এই বাড়িতে ‌ । হারিকেনের আলোয় আবছা

আলো আবছা অন্ধকার ঘরে । একটু আগে ঘাটে

অনেকক্ষণ যাবত পায়চারি করেছে একা একা । শ্যামার

নাগাল পায় নি এসেছে থেকে ‌ । খাবার সময় কয়েক

পলক দেখেছে । 



খাবার শেষে আবারও আম্মার ঘরে গিয়ে বসেছে সে ।

বালা ও আছে ওদের সাথে । মায়ের কোলে মাথা রেখে

শুয়ে নিরবে আঁধারে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে শ্যামা । মায়ের

গায়ের সেই চিরচেনা ঘ্রাণ প্রাণ ভরে টেনে নিয়েছে নিজের

মাঝে । বাল একপাশে বসে হাঁটুতে মাথা রেখে স্থির দৃষ্টিতে

দেখছে তিন মা মেয়ে কে । মোখলেছ এসে ঠাই নিয়েছে

কাকড়ি বুড়ির ঘরে । সেও পড়ে নি সংগ্রামের সামনে । 


রাত বাড়ছে । অলকা মৃদু স্বরে মেয়েকে ডাকলেন…




" শ্যামা , ঘরে যা । ছোট জমিদার একলা আছেন । নতুন

জায়গা, অসুবিধা হইবো তার । রাইত হইছে অনেক ।

গিয়া, ঘুমা । 



শ্যামা সময় নিয়ে উঠলো । কথা বাড়ালো না । বালা কে

দেখে আলতো হেসে বলল…



" তোমার কোনো অসুবিধা হবে না তো বালা ? 



" উঁহু… কোনো অসুবিধা নেই । তুমি যাও । এখানে তো

আপা আর আম্মা আছে ‌। আমি থাকবো ওদের সাথে । 



শ্যামা বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । অলকা স্মিথ হেসে

বললেন …



" ঘুমাইবা না , মা ? 


অনেক রাইত হইছে তো । আসো , এইহানে আমার পাশে

শুইয়া পড় । 



বালা এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে অলকার পাশে তড়িৎ

বেগে শুয়ে পড়লো । রুপা চোখ বুঝেছে । অলকা ওর

মাথায় কয়েক বার হাত বুলিয়ে দিলেন । বালা চেয়ে থেকে

হঠাৎ বলে উঠলো…



" আম্মা , আমার মাথাতেও হাত বুলিয়ে দেবেন একটু ? 



অলকা অবাক হলেন । বালার কথাটা কেমন আহত

শোনালো । অলকা ওর মাথাতেও আলতো পরশে হাত

বুলিয়ে দিলেন । গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দিলেন ভালো করে ।

বালা কেমন যেন কেঁপে উঠলো । মায়ের পরশ এমন হয়

বুঝি ? সে তো কখনো মায়ের পরশ পায় নি । কাছে পায়

নি মাকে কখনো । ওর মা ওকে কখনো জড়িয়ে ধরে নি ‌।

আদর করে কথা বলে নি , অলকার মতো করে কপালে

চুমু খায় নি ।

 জ্বরের ঘোরেও কখনো কাছে পায় নি মা কে ,

 মাথায় জ্বর পট্টি দেওয়ার জন্য লতিফা কখনো কাছে

আসে নি মেয়ের । এই কদিনে বালা কত কষ্টে ছিলো,

লতিফা তো জানতো সবটা । তবুও কখনো এক বাক্যের

শান্তনা টুকুও তিনি দেন নি মেয়েকে ‌‌। মাথায় হাত রেখে

শান্তনা দেন নি । চোখের পানি মুছিয়ে দেন নি । একটা

বারের জন্যেও ঘরের দরজা মারিয়ে ভেতরে গিয়ে কোনো

খোঁজ নেন নি মেয়ের । সে বাঁচলো কি মরলো এই নিয়ে

কখনো মাথা ঘামায় নি লতিফা । 


বালা ও ছোট বেলা থেকে মায়ের সঙ্গ পায় নি কখনো ।

তাই মায়ের কাছ থেকে এই নূন্যতম আশা টুকুও রাখে নি

সে । এই নিয়ে কখনো কোনো আক্ষেপ বা কষ্ট জন্মায় নি

বালার মনে ‌ । তবে আজ কেনো যেনো ইচ্ছে করছে

মায়ের সান্নিধ্য পেতে । ওর মা কি পারতো না অলকার

মতো হতে । অলকার মতো ভালোবাসতে । 


চোখ দিয়ে গরম পানি গড়ালো বালার ।


এদিকে ঘরে এসে খট করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে শ্যামা

। দরজার শব্দে সংগ্রাম তাকালো সেদিকে ‌। হারিকেনের

আলতো আলোয় দেখলো তার শ্যামা সুন্দরী কে ।

পরমুহূর্তে কপাল কুঁচকে চোখ ফেরালো সে । শ্যামা পাশে

গিয়ে বসলো । সংগ্রাম মুখ ফিরিয়ে বললো…



" বাপের বাড়ি এসে দেখি আমাকে একদম বেমালুম ভুলে

গেছো । 



" ভুলিনি তো । আপনাকে কি ভোলা সম্ভব ? 



" তা এতোক্ষণ কি করছিলে ঐ ঘরে ? 



" কিছু না , অনেক দিন পর আম্মার কোলে মাথা রেখে

শুয়ে ছিলাম একটু । 



সংগ্রাম ইশারা করে ডাকলো ' এদিকে এসো ' । ঘুম পাচ্ছে

ভীষণ , শ্যামা খাটের উপর উঠে ওর পাশে গিয়ে পাশ

ফিরে শুয়ে পড়ল ।

সংগ্রাম ভ্রু যুগল জড়ো করে তাকালো ।

অতঃপর শ্যামার বাহু ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ওকে

তুললো । শ্যামা চমকে তাকালো । সংগ্রাম ভাবান্তর না

দেখিয়ে শ্যামা কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো । শ্যামার

মাথাটা রাখলো নিজের প্রশস্ত বুকে । দুহাতে জড়িয়ে ধরে

চোখ বুজে মোলায়েম স্বরে বলল…



" এবার ঘুমাও । 



মুচকি হাসলো শ্যামা । সংগ্রাম চোখ খুলে দেখলো ওর

হাসি টুকু । হারিকেনের টিমটিমে আলোয় শ্যামার নাক

ফুলটা চকচক করছে । সংগ্রাম একহাত ছেড়ে শ্যামার

মাথাটা আলগা করে তুললো । নিজের ওষ্ঠ এগিয়ে

 আলতো পরশ আকলো শ্যামার নাক ফুলে । তৎক্ষণাৎ

চোখ বন্ধ নিলো শ্যামা । সংগ্রাম নীরবে হেসে আবারো

জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে আলতো স্বরে বলল…

" সন্তানের জন্য মায়ের কোল , আর একজন স্ত্রীর জন্য স্বামীর বুক সর্বোৎকৃষ্ট স্থান বেগম । তোমার স্থান আমার বুকে। ঘুমাও তুমি……আমি আছি তোমাকে আগলে রাখার জন্য । 

#চলবে……

 

 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×