![]() |
লেখিকা:সুরভী আক্তার পর্ব:১৭ --------------------------চোখ নামিয়েছে লজ্জায় । ওর লাজুকতা দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো সংগ্রাম । শ্যামার শ্যামলা মুখশ্রী কেমন লাল বর্ন ধারন করেছে । সংগ্রামের চাহনি আরো বেশ অসস্থিতে ফেলছে শ্যামা কে । করার চেষ্টা করলো । সহসা সরে আসলো শ্যামা । ঘন পল্লব ঝাপটে দুরে সরে দাঁড়ালো । সংগ্রাম মৃদু হেসে আচমকা বলল…… " বাড়িতে যাবে ? তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরলো শ্যামা । চোখ মুখ জ্বল জ্বল করে উঠলো । আঁতকে উঠলো খুশির ছোঁয়ায় । আবারো এগিয়ে এসে উত্তেজিত কন্ঠে বলল… " বাড়িতে নিয়ে যাবেন আমায় ? " হুম ! " আমার আম্মা আর আপা এসেছে ? কবে এসেছে ওরা ? " কাল এসেছে ! " সত্যি ? তার মানে আপনি এবার নিয়ে যাবেন আমায় ? আজ যাবো আমরা ? কখন যাবো বলুন না ? আপনি আমায় আগে বললেন না কেনো ? বাচ্চাদের মতো খুশিতে চোখ মুখ ভরে উঠেছে শ্যামার । চিকচিক করছে ডাগর চোখ দুটো । হাঁসফাঁস করছে সে । সংগ্রাম নিঃশব্দে হাসলো । মোলায়েম কন্ঠে বলল… " আজ বিকেলে যাবো আমরা । আর তোমায় আগে বললে কি হতো ? কালকেই যেতে ? কাল গেলে আমাদের একে অপরের সাথে কাটানো মধুর মূহুর্ত গুলো কোথায় পেতাম আমি ? সংগ্রামের কথায় শ্যামা আবারো চোখ নামালো । হাত কচলাতে কচলাতে মৃদু স্বরে বলল… " তাড়াতাড়ি যাবো কিন্তু ! " আচ্ছা ! বাড়িতে যাওয়ার খুশিতে উড়ু উড়ু করছে শ্যামার মন । বিকেল গড়িয়েছে । সেই সকাল থেকেই উৎকণ্ঠায় ভরে আছে শ্যামা । সংগ্রাম বেরিয়েছিল সকালে, দুপুরের দিকে ভ্যান ভর্তি বাজার সামগ্রী নিয়ে এসেছে সে । লতিফ জোয়ার্দার নিজেই ব্যবস্থা করেছেন এসবের । জমিদারি আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য হলেও এসবের প্রয়োজন ছিল । বিকেলের দিকে রওনা হবে ওরা । সেই অনুযায়ী শ্যামা কে আরো বেশি গয়না-গাটি দিয়ে বেশ ভুশায় সাজিয়ে দিয়েছে শবনম । গয়নায় মুড়িয়ে ফেলেছে পুরো । বিয়ের পর এই প্রথম বাপের বাড়িতে যাচ্ছে সে , জমিদারি হাবভাব প্রকাশ না পেলে চলে না । খানিক বাদ রওনা দেবে ওরা । শ্যামার আর তর সইছে না । ধড়ফড় করছে বুক খানা । কতদিন পর নিজের বাড়িতে যাবে , আম্মার সংস্পর্শে যাবে, দেখতে পাবে আম্মা আর আপাকে । স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না সে । পায়চারি করছে ঘরে । বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে । সংগ্রাম এসে নিয়ে যাবে ওকে । আচমকা শ্যামার মাথায় কিছু একটা চাপতেই থমকে গেলো সে । স্থির হলো পা দুটো । কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে নিজেই বের হলো ঘর থেকে । মাথায় ভালো করে ঘোমটা টেনে নিলো । গুটি গুটি পা ফেলে গিয়ে থামলো লতিফ জোয়ার্দারের ঘরের সামনে । তিনি এখন ঘরে নেই । টহলে বেরিয়েছেন গ্রামে । শ্যামা ঢোক গিললো । হাত পা শিরশির করছে ওর । ঘামছে হাতের তালু । সালেহা ঘরেই আছেন । আজ কাল ঘর থেকে বের হন না তিনি । এর কারণটা শ্যামা । শ্যামার মুখ দর্শন অবধি করতে চান না তিনি । শ্যামা এই কদিনে এক শব্দেও কথা বলে নি তার সাথে । আজ সে সাহস জোগালো নিজেকে । লম্বা শ্বাস টেনে দরজায় কড়া নাড়লো । খানিক বাদ গম্ভীর স্বরে সাড়া এলো ভিতর থেকে…… " আয় ভেতরে… শ্যামা পুনরায় ঢোক গিললো । সালেহা হয়তো ভেবেছেন অন্য কেউ এসেছে হয়তো । শ্যামা দরজা ঠেলে ভেতরে পা বাড়ালো । কম্পন অনুভূত হচ্ছে হাঁটুতে । সালেহা তার বিশাল আলমারি খুলে তার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা খুঁজছেন হয়তো । শ্যামা পিছন থেকে কাঁপা গলায় ডাকলো… " আম্মা… তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরলো সালেহা । অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো শ্যামার পানে । শ্যামা ভাবান্তর দেখালো না । সালেহা এক ঝটকায় এগিয়ে এসে খ্যাট খ্যাট স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো… " এই মেয়ে , তোর সাহস কি করে হয় আমার ঘরে পা রাখার ? কোন সাহসে এসেছিস এখানে ? বল ? অপবিত্র মেয়ে, আমার ছেলের গলায় ঝুলে পড়েও শান্তি হয় নি তোর ? ঐ নোংরা শরীর নিয়ে কি করতে এসেছিস এখানে ? শ্যামা মলিন হাসলো । শান্ত কন্ঠে বলল… " আজ যাচ্ছি আম্মা । আপনিও তো আমার মা । মায়ের কাছ থেকে দোয়া নিতে আসলাম । দোয়া করবেন না আমায় ? " তোর জন্য আমার জবান থেকে দোয়া বেরোবে না কখনো । তবে বদ'দোয়া অবশ্যই দেবো তোকে । আমার ছেলেকে ফাঁসিয়েছিস না ? তোর ঐ কুৎসিত গায়ের রংয়েও পাগল বানিয়েছিস আমার ছেলেকে ! " আমি কাউকে ফাঁসাই নি আম্মা ! " চুপ, খবরদার তোর ঐ মুখে আম্মা ডাকবি না আমায় । বল কি চাই তোর ? টাকা, পয়সা, গহনা-গাটি , সোন- গয়না, কি চাই তোর বল ? কি পেলে আমার ছেলের জীবন থেকে সরবি তুই ? আমাকে ছেলেকে নিস্তার দিবি কি পেলে, বল ? লোভে পড়ে তো বিয়ে করেছিস জমিদারের ছেলেকে । লোভ সামলাতে পারিস নি জমিদারি দেখে ? বল কত টাকা চাই তোর ? আঙ্গুল তুলে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে কথা গুলো বলে থামলো সালেহা । রাগে রিতিমত গজগজ করছেন তিনি । শ্যামা নির্বাক হয়ে শুনে গেলো । চোখ ভরাট হয়ে আসছে ওর । ওর নিরবতা দেখে সালেহা কুটিল হাসলেন । পিছন ফিরে আলমারি থেকে বের করলেন কিছু । অতঃপর শ্যামার সম্মুখে অগ্রসর হলেন । কিছু কাগজের মুল্যবান নোট ছুঁড়ে মারলেন শ্যামার মুখে । মুখ ফিরিয়ে নিলো শ্যামা । সালেহা শব্দ করে হেসে বললেন… " এটার জন্যই এসেছিস আমার কাছে , তাই না ? মুখে বলতে পারছিলি না বুঝি ? লজ্জা করছিল? গুনে নে , অনেক টাকা আছে এখানে, দেখেছিস কখনো এতো টাকা ? তোর এই জীবনটা উপভোগ করতে পারবি এসব দিয়ে । প্রয়োজন হলে আরো দেবো , তবুও ছেড়ে দে আমার ছেলেকে । এই যে আজ যাচ্ছিস , পুনরায় যেন এই বাড়িতে পা না পড়ে তোর ! তোর ঐ অলক্ষ্যুনে মুখ যেন দ্বিতীয় বার দেখতে না হয় আমাকে ! নে , টাকা তোল আর বিদায় হ এখান থেকে । শ্যামা নিরুত্তর । ছলছল করছে চোখ দুটো । কি বলবে সে ? কিন্তু বলতে তো হবেই । শ্যামা নিরেট কন্ঠে বললো… " এসবের প্রয়োজন নেই আমার আম্মা । এতো টাকা আমি কখনো দেখিনি এটা ঠিক । কিন্তু এই কাগজের নোট গুলোর প্রতি কোনো চাহিদা নেই আমার । আপনার ছেলের স্ত্রী আমি, তিনি নিজেই স্ব-জ্ঞানে বিয়ে করেছেন আমায় । আমি যে আর তাকে ছাড়তে পারবো না । আমি সংসার করতে চাই তার সাথে আম্মা । একমাত্র তিনি যদি আমাকে না ছাড়েন, তাহলে মরণ ব্যতীত অন্য কোন কিছু তার থেকে আমাকে ছাড়াতে পারবে না । আজ আসি আম্মা ! দোয়া করবেন… শ্যামা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে পিছন ফিরলো । সালেহা তেঁতে উঠলেন… " তাহলে বদ'দোয়া দিলাম তোকে, তোর মরণ'ই তোকে ছাড়াবে আমার ছেলের থেকে । তুই সংসার করতে পারবি না আমার ছেলের সাথে । তোকে সংসার করতে দেবো না আমি । শ্যামা বুকটা কেঁপে উঠলো । এক মুহুর্তের জন্য পা থমকে গেলেও পরমুহূর্তে দ্রুত গতিতে বের হলো ঘর থেকে । বাইরে বেরোতেই মুখোমুখি হলো সংগ্রামের সাথে । আজ বৃহস্পতিবার, সংগ্রামের পড়নে আজ কালো একটা পাঞ্জাবি । উপরে সাদা শাল আড়াআড়ি ভাবে জড়ানো । ফর্সা শরীরে কালো পাঞ্জাবি ধবধবে হয়ে ফুটে উঠেছে । সংগ্রাম ভ্রু কুঁচকে পেছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দরজা থেকে কয়েক পা দূরে । ভেতরের কথা গুলো তার কানে পৌঁছেছে কি না জানা নেই শ্যামার । সংগ্রাম কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থতমত খেলো শ্যামা । হাসার চেষ্টা করলো । নিরস স্বরে বলল… " আপনি এখানে ? চ.. চলুন ! আমি তৈরি ! " আম্মা কি বললো তোমায়…? ঘন পল্লব ঝাপটে ঢোক গিললো শ্যামা । মিথ্যে বলে না ও । গলায় বাঁধে । তবুও সে বাহানা দিলো… " দোয়া দিলো আম্মা আমায় । আর বললো তাড়াতাড়ি যেন ফিরে আসি । চলুন যাই… বলেই মাথা নামিয়েই পা বাড়ালো শ্যামা । সংগ্রাম একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে ওর হাত ধরলো পিছন থেকে । হাত টেনে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে মুচকি হাসলো । শ্যামার মুখখানা আগলে নিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল… " সংসার আমার সাথে করবে তুমি । আমি তোমার স্বামী, আর তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী । অর্ধাঙ্গিনী মানে বোঝো ? আমার জীবনের অর্ধেক অস্তিত্ব তোমার সাথে মিশে গেছে শ্যামা । আমি তোমাকে চাই, সাথে থাকবো আমি তোমার । আর কে থাকলো না থাকলো তাতে কিচ্ছু এসে যায় না আমার । আম্মার কথায় কিছু মনে করো না । আমারথেকে কেউ দূরে সরাতে পারবে না তোমায় । কোনো দিন না ! মরণ ব্যতীত আমাকে তোমার থেকে কেউ দূরে সরাতে পারবে না । আর না তোমাকে আমার থেকে । বুঝেছো ? মাথা নামিয়ে আলতো ঘাড় কাত করলো শ্যামা । সংগ্রাম বললো… " বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, চলো… শ্যামা পা বাড়িয়ে আবারো থামলো । বালার কথা মাথায় আসতেই বললো… " একবার বালার সাথে দেখা করে আসি ? " হুম, চলো… বালার ঘরের সামনে এসে থামলো সংগ্রাম । শ্যামা ভেতরে ঢুকলো । খাটের উপর গলুর সাথে বাচ্চাদের মতো খেলায় মজেছে বালা । শ্যামা কে দেখে চোখ তুললো ও । মুচকি হেসে বললো… " এখনো যাও নি ? " নাহ , তোমার সাথে দেখা করতে আসলাম । এখন যাবো । এগোতে এগোতে বললো শ্যামা । বালা আবারো মুচকি হেসে বললো… " তাড়াতাড়ি আসবে কিন্তু । তোমাকে খুব মনে পড়বে আমার । " হুম, খুব তাড়াতাড়ি আসবো । শ্যামার কথার মাঝেই সংগ্রাম ঢুকলো ঘরে । ঘরে ঢোকার ইচ্ছে ছিল না । অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঢুকলো । সহসা বালার সাথে চোখাচোখি হলো ওর । মুখের হাসি টুকু নিমিষেই গায়েব হলো বালার । দৃষ্টি কেঁপে উঠলো । দৃষ্টি আরো বেশি গাঢ় হওয়ার আগে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো বালা । সংগ্রাম এগিয়ে এসে বালার উদ্দেশ্যে গম্ভীর কন্ঠে বলল… " তুই ও তৈরি হয়ে নে । তুই ও যাবি আমাদের সাথে ! দীর্ঘ কয়েক দিন পর বালা কে উদ্দেশ্য করে কথা ছুঁড়লো সংগ্রাম । ওর কথাটা শুনে খুশি হলো শ্যামা । উৎসুক হয়ে বললো… " হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমিও চলো । অনেক ভালো হবে তাহলে । আমি তোমার কাপড় বের করে দিচ্ছি । তৈরি হয়ে নাও তাড়াতাড়ি । বালা তাচ্ছিল্য হেসে বলল… " না শ্যামা , তোমরা যাও । আমি তোমাদের মাঝে যেতে চাই না । আর এমনিতেও আমি গিয়ে কি করবো ওখানে ? সংগ্রাম আবারো বলে উঠলো…… " শ্যামা, ওর কাপড় গুছিয়ে ওকে তৈরি করাও । গাড়ি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য । " আমাকে জোর করবেন না সংগ্রাম ভাই । আমি বাধ্য নোই আপনার কথা শুনতে । আমি যাবো না , আপনাদের মাঝে জড়াবেন না আমায় । জ্ঞান বোধ হওয়ার পর বোধ হয় এই প্রথম সংগ্রাম কে ভাই বলে সম্বোধন করলো বালা । ছোট বেলায় সবসময় সংগ্রাম ভাই সংগ্রাম ভাই বলে বলে কানের পোকা নাড়িয়ে দিতো । পিছু পিছু ঘুরতো সবসময় । লতিফা যখন এই বাড়িতে আসে তখন বালার বয়স ছিল সবে মাত্র দুই বছর । সংগ্রাম তুলনামূলক দশ বছরের বড় ওর থেকে । জুনাইদ আর সংগ্রাম সমবয়সী । জুনাইদের সাথে সাথে সংগ্রাম কেও সবসময় ভাই ভাই বলে ডেকে বেড়াতো বালা । তবে বড় হওয়ায় সাথে সাথে সংগ্রাম কে ভাই ডাকা থেকে বেরিয়ে এসেছে বালা । বোধ শক্তি হওয়ার পর আলাদা অনুভুতি কাজ করেছে সংগ্রামের প্রতি । কিশোরি বয়সে সেই অনুভূতি গুলো বাঁধ ভেঙেছে । অনুভূতি গুলোর মানে বুঝতে শিখেছে সে । যার ফলে কখনো ভাই সম্বোধন টা মুখেও আসে নি । গলায় আকটাতো দ্বিধায় । আহ্লাদ করে সংগ্রাম জোয়ার্দার বলে ডাকতো সংগ্রাম কে । এই নিয়ে লতিফার কতোই না বকা শুনতে হয়েছে ওকে । সংগ্রামের কাছেও ঝাড়ি খেয়েছে অনেক । এই ভাই ডাকটা শোনার জন্য কত-শত বকাবকি করেছে বালা কে । কিন্তু বালা দ্বিতীয় বার আর ভাই বলে সম্বোধন করে নি । কখনো ভাইয়ের জায়গায় কল্পনাও করতে পারে নি সংগ্রাম কে । যে জায়গায় কল্পনা করতো সে জায়গা টা ছিল সম্পুর্ন বিপরীত । যেটা শুধুমাত্র কল্পনাতেই ঠাই পেলো । যেটা বর্তমান বাস্তব হওয়াটা কল্পনাতেও আসে না । কল্পনার কল্পলোকে কল্পিত কল্পনারা ওর কল্পনাতেই কাল্পনিক হয়ে রইলো । মানুষ কল্পনাতে সুখি । যে সুখ বাস্তবের থেকে অধিক অনুভূতি সম্পন্ন । বাস্তবতা তো ভিন্ন । সবকিছু বাস্তব হয় না , কিন্তু কল্পনায় সবকিছুই কল্পনা করা যায় । দীর্ঘ অনেক বছর পর বালার মুখে ভাই ডাকটা শুনে বক্ষ স্থল ধক্ করে উঠলো সংগ্রামের । আঁতকে উঠলো সে । বালার কষ্ট টা তো ভালো করেই জানে । মনে প্রশ্ন জাগে, সে কি কখনো পারতো না বালাকে আপন করতে ? উত্তর খুঁজে দেয় মন নিজেই , না সে পারতো না । কারন বালা শুধু ওর কাছে বোন ছিল । বোন ব্যতীত অন্য কোন দৃষ্টিতে বালা কে কখনো উপলব্ধি করতে পারে নি সংগ্রাম । বোন হিসেবে ওর আহ্লাদ সহ্য করেছে সবসময় , শাসন ও করেছে । ভুল ছিল একটাই, সেটা হলো বালাকে না বোঝাতে পারা । মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কিছু গড়ে তোলা সম্ভব নয় কখনো । সংগ্রাম পারে নি নিজের মনের বিরুদ্ধে যেতে । বালাও তো পারে নি । সংগ্রাম লম্বা শ্বাস টানলো । বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে আসছে । সে হাসার চেষ্টা করলো । এগোলো দৃঢ় পায়ে । শ্যামা কে বললো বালার কাপড় গুছিয়ে দেওয়ার জন্য । শ্যামাও কথা বাড়ালো না । বালা একা একা থাকে সবসময় । লতিফা কে বালার কাছে একটা বারের জন্যেও দেখে নি শ্যামা । মেয়ের কাছে দুদণ্ড বসতেও দেখা যায় না তাকে । বালার একা একা থাকার চেয়ে ভালো হবে শ্যামা দের সাথে যাওয়াটা । শ্যামা উঠে গেলো আলমারির দিকে । কাপড় বের করতে লাগল সে । বালা নিরুদ্বেগ হয়ে চেয়ে আছে । গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না । সংগ্রাম নিঃশব্দে বসলো ওর পাশে । খানিক চুপ থেকে অপরাধী নরম স্বরে বলল… " আমাকে ক্ষমা করে দিস বালা, তোকে জড়াতে পারলাম না আমার জীবনের সাথে । ভালোবাসতে পারলাম না তোকে । তোর মতো নিষ্পাপ ফুলের সাথে আমি জড়ায় নি, শুকরিয়া আদায় কর । " শ্যামা ও তো নিষ্পাপ । পরম আবেশে চেয়ে আচমকা কথা টা বললো বালা । সংগ্রাম তাৎক্ষণিক উত্তর করার মতো ভাষা হারালো । সময় নিয়ে বললো… " ওর আসার কথা ছিল আমার জীবনে । বাম পাজরের হাড় দিয়ে রেখেছিলাম যে , তার একটা টান তো আছেই । " আপনাকে হারালাম এই নিয়ে আমার আমার কোনো আফসোস নেই সংগ্রাম ভাই । আফসোস একটাই থেকে গেলো , আপনাকে পেলাম না , আর কখনো পাবো ও না । আর সারাজীবন এই আফসোস টা রয়েই যাবে , আপনার সাথে আমার কল্পনায় সাজানো কল্পিত সংসার টা হলো না । " কথাটা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে হলেও একি হলো না ? আমি তোর সম্পর্কে ভাই হোই বালা । সারা জীবন তোকে বুঝিয়েছি এটা । বুঝতে চাস নি তুই । " সেটাই তো সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আমার ! কখনো বুঝতে পারলাম না আমি । আরে আমাদের জীবনটাই তো বিচিত্র ময় । অসম্ভবের প্রতি আমাদের অসম্ভব টান জন্মায় । অধিকার নেই এমন নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মায়া জন্মায় । জানেন সংগ্রাম ভাই , আমার জীবনে যদি কোন কিছু নিজের করে পাওয়ার সুযোগ থাকতো , তাহলে আমি আপনাকে চেয়ে নিতাম । এই চোখ দুটোতে আজ কাল পানি আসে খুব , এই পানির ধারা বন্ধ করার জন্য হলেও আপনাকে চাইতাম । কিন্তু আর চাইবো না । সুখি হোন আপনি । এটাই চাইবো এখন । " জটিল জটিল অনেক কথাই শিখেছিস দেখছি ! " আমার জীবন এখন আমায় অনেক জটিলতায় ফেলে দিয়েছে সংগ্রাম ভাই । আমার জীবনের গল্প টা তো ভিন্ন হলেও পারতো বলুন ! যদি জানতাম এই জীবনের গল্পের শেষে আপনাকে পাবো না, তাহলে জীবনের এই গল্পটা শুরুই করতাম না । " গল্প তো সবে শুরু হলো । ভুল মানুষকে সরিয়ে সঠিক মানুষ বাছাই করে গল্পের পূর্ণতা দেওয়া আল্লাহর হাতে । তোর জীবনে আমি ছিলাম না কখনো , যে আসবে সেই ছিল তোর পুরো অস্তিত্ব জুড়ে । ভুলে যা আমায় , আমি তোর জীবনের কোন অস্তিত্বেই নেই । যদি থাকতাম, তাহলে শ্যামার জায়গায় তুই থাকতি । " আমি ভুলতে চাই সবটা । বিশ্বাস করুন , প্রতিদিন নিজের মাথায় নিজেই বারি মারি । অসভ্য চোখ দুটো জ্বলে অনেক । ভোলার চেষ্টায় গেলে পানি আসে চোখে । আবারো সেই পানি টুকু মুছতে মুছতে ভাবি ভুলে যাবো সব , কিন্তু এই ভাবনা থেকে আবারো চোখে পানি আসে । কি করবো আমি সংগ্রাম ভাই ? সংগ্রাম বাক্ হারালো । গলা কাঁপছে । বালার চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে আপনা আপনি । শ্যামা ওদের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে । কাপড় গুছিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে । সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসছে চারদিকে । সংগ্রাম নিরবতা ভেঙ্গে উঠে দাঁড়ালো । স্বাভাবিক কন্ঠে বলল… " দেখিস রাজপুত্র আসবে তোর জন্য । তুই তো রাজকন্যা । রাজকন্যার জন্য শুধু রাজপুত্র কেই মানায় । যে কখনো তোর চোখে পানি আসতে দেবে না । খুব বেশি ভালোবাসবে তোকে । " সে আপনার মতো হবে তো সংগ্রাম ভাই ? নিস্তেজ আহত স্বরে প্রশ্ন করলো বালা । সংগ্রাম হেসে উত্তর করলো… " আমার থেকেও হাজার হাজার গুণ ভালো হবে । আমি তো কিছুই নোই । " উঁহু…আপনি অনেক কিছুই ছিলেন । " হুম হয়েছে , এবার যা দেখি । তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে নে । কতক্ষন ধরে বকবক করছি তোর সাথে । তুই তো ভারী চঞ্চল হয়েছিস । যেতে হবে তো আমাদের, তাড়াতাড়ি যা । বালা মুচকি হাসলো । বুকের ভেতর জমানো ভার টুকু হালকা হয়েছে অনেকটা । সংগ্রাম আশেপাশে চোখ বুলিয়ে শ্যামা কে দেখতে না পেয়ে বারান্দার দিকে পা বাড়ালো । বারান্দায় শ্যামা কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিঃশব্দে হাসলো । বারান্দার কর্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে তার সহধর্মিণী । সংগ্রাম পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো ওকে । আচমকা স্পর্শে চমকিত হলো শ্যামা । সংগ্রামের গায়ের পুরুষালি গন্ধ নাসারন্ধ্রের ভিতরে হানা দিতেই আবেশে চোখ বুজলো সে । সংগ্রাম শ্যামার ঘাড়ে চিবুক ঠেকিয়ে নরম শীতল কন্ঠে বলল… " মন খারাপ ? শ্যামা ক্ষীন স্বরে উত্তর করলো … " মন খারাপ হবে কেনো ? " দেরি হয়ে গেলো আমাদের । বালা তৈরি হচ্ছে । ও যাবে আমাদের সাথে । বালার বিষয় টা নিয়ে ভাবছো তাই না ? শ্যামা নিজের থেকে আলতো হাতে সংগ্রামের হাত ছাড়ালো । পিছন ফিরে মুখোমুখি দাঁড়ালো । সংগ্রামের কপালে ভাঁজ পড়েছে । শ্যামা আলতো হেসে বলল… " ভালোবেসে আগলে রাখা যেমন কঠিন , ভালোবাসার মানুষ কে ত্যাগ করা তার থেকেও বেশি কঠিন ছোট জমিদার সাহেব । বালার অবস্থা উপলব্ধি করতে পারছি আমি । ওর সদ্য জীবনের প্রথম ভালোবাসা আপনি । ওর সাথে এমনটা না হলেও পারতো । আপনি চাইলেই কিন্তু ওকে ভালোবাসতে পারতেন । ও সব দিক থেকেই আপনার যোগ্য ছিলো । আমি ছিলাম না… শ্যামা কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সংগ্রাম বলে উঠলো… " কালকের পর ও এই কথাটা বলছো ? শ্যামা ওর কথার অর্থ বুঝলো তৎক্ষণাৎ । মাথা নুইয়ে ফেললো সে । সংগ্রাম মুচকি হাসলো তা দেখে । বালাকে তৈরি করে শ্যামা আর সংগ্রাম নিচে এসেছে । বসার ঘরে সবাই উপস্থিত ছিল । লতিফ জোয়ার্দার সবে এসে বসলেন সোফায় । বালা কে শ্যামা আর সংগ্রামের সাথে যেতে দেখে কোন প্রকার ভ্রু'ক্ষেপ দেখালো না লতিফা । কথাও বললো না একটাও । শবনম আর আতিয়া বেগম খুশি হয়েছেন বালা কে দেখে । শ্যামা বিদায়ের আগে সালাম করলো সবাই কে । লতিফ জোয়ার্দার শ্যামার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন… " তাড়াতাড়ি ফিরে এসো আম্মা । আমার ঘরের আলো তুমি । এই আলো যেন সারাটা জীবন আলোকিত করে রাখে আমার ঘর । অন্ধকার সইবে না জমিদার বাড়িতে । তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, কেমন ? ঘাড় কাত করে সম্মতি দিলো শ্যামা । অতঃপর বেরিয়ে আসলো সদর দরজা পেরিয়ে । প্রধান ফটকের বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল । সংগ্রামের সেই কালো জিপ । আহাদ আছে গাড়ির চালক হিসেবে । শ্যামার মাথায় অদুর পর্যন্ত ঘোমটা টানা । ঘোমটার আড়ালে আহাদ কে দেখে চিনতে অসুবিধা হলো না শ্যামার । একবার দেখেছিল সে আহাদ কে । মনে আছে মুখশ্রী । অনেক আগে দেখেছিল । তখনকার থেকে এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে আহাদের মাঝে । এখন সে লম্বা চওড়া সুপুষ্ট দেহি একজন সুঠাম পুরুষ । গায়ের রং শ্যামলা । শ্যামা কথা চেপে রাখতে পারলো না । উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো… " আপনি আহাদ ভাই , তাই না ? আহাদ ভাই , ফুলি কেমন আছে আহাদ ভাই ? ওকে আমার কাছে নিয়ে আসেন নি কেনো ? আহাদ প্রফুল্ল হাসলো । তৎক্ষণাৎ বললো… " ফুলি ভালো আছে শ্যামা । তুমি জানো , তোমার সখি প্রতিদিন নিয়ম করে তোমার খোঁজ নেয় । সারাদিন তোমার কথা বলে…… বলতে বলতে সংগ্রামের পানে চেয়ে থেমে গেল আহাদ । মাথা নামিয়ে ফেললো সহসা । অনুনয় মিশ্রিত কন্ঠে বলল… " আপনার স্ত্রী কে নাম ধরে ডাকার জন্য ক্ষমা করবেন ছোট জমিদার । আর ভুল হবে না…… সংগ্রাম কপাল কুঁচকে বললো… " তাতে কি হয়েছে ? তুমি ওকে নাম ধরেই ডাকতে পারো । তোমরা পূর্ব পরিচিত । আর তোমাকে কতবার বলবো আমাকে ছোট জমিদার না ডাকতে । নাম ধরে না ডাকো , তবে তোমাকে বলেছি না ভাই সম্বোধন করতে । ভুলে যাও কেনো এটা… নোয়ানো মাথা তুললো আহাদ । হাসি ফুটলো মুখে । মাথা চুলকালো সে । ছোট জমিদার ডাকটা অভ্যাস হয়ে গেছে । ছাড়তে সময় তো লাগবেই । ★ শ্যামা দের বাড়ির সামনে জিপ থামতেই হুড়মুড়িয়ে জিপ থেকে নেমে পড়ে শ্যামা । বুকটা ধড়ফড় করছে তার । আর তর সইছে না । চোখ দুটো কাঙাল হয়ে আছে আম্মা কে এক পলক দেখার জন্য । শ্যামা গাড়ি থেকে নেমেই হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে । সে সব ভুলে আশেপাশে না তাকিয়ে এক ছুট লাগায় বাড়ির ভেতরে । চারদিকে বেশ অন্ধকার । অন্ধকারেই ছুটে চলেছে সে । থামলো বাড়ির ভেতরে এসে । পাশের বাড়ি থেকে আসা বৈদ্যুতিক হলদে আলোয় বোঝা যাচ্ছে পুরো বাড়ি । তিন দিকে তিন ঘরে হারিকেন জ্বলছে । চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস টানলো শ্যামা । চিরচেনা মাটির গন্ধ ঠেকলো নাকে । শ্যামা বাইরে থেকেই উত্তেজিত কন্ঠে গলা উঁচিয়ে কাঁপা স্বরে ডাকলো… " আম্মা... কয়েক মুহূর্তের মাথায় চোখের সামনের ঘর থেকে ধড়ফড়িয়ে বেরিয়ে আসলেন অলকা । মেয়ের ডাকে মাতৃ হৃদয় ছ্যাঁত করে উঠেছে তার । আম্মা কে দেখে টলমল করে ওঠে শ্যামার অক্ষি যুগল । চোখের পানি অথচ মুখে হাসি নিয়ে মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে আম্মার বুকে । হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে আচমকা । অলকা থমকে যান ক্ষীয় কাল । চোখ ভিজে এসেছে তার । শ্যামার কান্নার শব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন কাকড়ি বুড়ি । শ্যামা কে দেখে তাচ্ছিল্য করে নাক সিঁটকান তিনি । মোখলেছ বাড়ি নেই । ফিরবে হয়তো একটু পর । শ্যামা আহাজারি করছে আম্মা কে জড়িয়ে । কান্নারত অস্থির কন্ঠে বলছে… " ওরা আমারে কেউ কোনো দিন ভালোবাসলো না আম্মা। ভালো চাইলো না আমার । আব্বা আমারে ভালোবাসলো কোনো দিন । তোমার মতো কেউ হইলো না । তুমি যাওয়ার পর আমার জীবনটা নষ্ট করার পাঁয়তারা করলো ওরা । সুযোগ নিলো তোমার অনুপস্থিতির । তোমার অবর্তমানে আমি নিঃস্ব ছিলাম আম্মা । তোমার তুলনা কারোর সাথেই হয় না । আব্বা ক্যান এমনটা করলো আম্মা ? ক্যান করলো এমন…… শ্যামার চোখের পানিতে অলকার বুক ভিজে গেছে । বহুদিন পর মায়ের বুকে মাথা রেখে সকল কষ্ট জেঁকে উঠেছে পুনরায় । যে কষ্ট গুলো কান্নার মাধ্যমে উন্মোচন করছে শ্যামা । অলকা নিরুত্তর । সংগ্রাম আর বালা বাড়ির ভিতরে ঢুকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দেখছে তাদের । বালা অবাক লোচনে তাকিয়ে আছে । সে দেখছে শ্যামা কে তার মাকে জড়িয়ে ধরতে । মাকে জড়িয়ে কাঁদতে দেখছে । শ্যামা চুপ করে ফোপাচ্ছে এখন । অলকা ভেজা কন্ঠে ডাকলেন…… " শ্যামা… ওঠ , দেখ জামাই আইছে । দাঁড়াইয়া আছে ওরা… তৎক্ষণাৎ উঠলো শ্যামা । কান্নার ফলে হেঁচকি উঠে গেছে । নাক টানছে বারবার । অলকা ভেজা চোখ আড়াল করে হাসার চেষ্টা করলেন । শ্যামার চোখ মুছিয়ে দিলেন দুহাতে। কপালে চুমু খেয়ে নরম কন্ঠে বললেন…… " যা হয় ভালোর জন্যই হয় । সব ভুইলা যা শ্যামা । মানুষের অতীত থাকে কিন্তু সেই অতীতে ডুইবা থাকতে নাই । এহন তোর বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়া ভাব । কিচ্ছু খারাপ হয় নাই তোর লগে । বিয়া হইছে তোর , সংসার হইছে । এবার তুই অনেক সুখি হইবি দেখিস । শ্যামা ফুঁপিয়ে উঠলো । অলকা সংগ্রাম কে দেখে মুচকি হাসলেন । সংগ্রাম এগিয়ে সালাম জানালো । অলকা উত্তর করে মোলায়েম কন্ঠে বললেন… " ওদিকে দাঁড়াইয়া আছো ক্যান বাবা । ঘরে আহো … এদিকে কাঁকড়ি বুড়ি সংগ্রাম কে দেখা মাত্রই যেন চুপসে গেলেন । চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো । অজানা ভয়ে ভীত হয়ে সিটিয়ে গেলেন তিনি । শুল্ক ঢোক গিললেন । সেদিনের পর জাফর ব্যাপারির খোঁজ পাওয়া যায়নি আর । মাধবপুরে নতুন মাতব্বর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মৌলভী সাহেব কে । পরদিনই সংগ্রাম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দায়িত্ব সঁপেছেন তার হাতে । জাফর ব্যাপারির কি হলো এটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে নি কেউ । এই নিয়ে দুঃসাহস দেখায় নি কেউ । সংগ্রামের নজরে পড়ার আগেই কাঁকড়ি বুড়ি কোনো রকমে কাঁপা পায়ে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন । বাইরে ভ্যানে যত মালামাল ছিলো, সংগ্রামের আদেশ মোতাবেক সব ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয় । আপার কথা ধ্যানে আসতেই শ্যামা দ্রুত পায়ে ঘরে ঢোকে । বিছানায় শুয়ে আছে রুপা । চোখ দুটো চঞ্চল । এতক্ষণ শ্যামার অপেক্ষায় ছিলো সে । নিজের দূর্বলতার কারনে খাট থেকেও নামতে পারছে না সে । হাঁটাহাঁটি তো দূরের কথা । আপাকে দেখে পুনরায় ডুকরে কেঁদে উঠলো শ্যামা । রুপা শুকিয়ে গেছে কয়েক দফা । চেহারায় মলিনতা বেড়েছে । বাচ্চা মারা যাওয়ার শোকে কাতর হয়ে পড়েছে সে । শ্যামা কে দেখে সেও কেঁদে উঠলো । শ্যামা ভাষা হারালো কিছু বলার মতো । কি বলবে সে । কি বলে শান্তনা দেবে আপাকে ? একে অপরকে জড়িয়ে কাঁদলো দুবোন । রুপা থামলো একটু । শ্যামা কে নতুন রূপে দেখে চোখ জুড়িয়ে আসছে ওর । শ্যামার শরীর পুরো গহনায় সাজিয়ে দেওয়া । নাকে নতুন নাকফুল । হাত,কান,গলায় ভারী ভারী গহনা । রুপা শ্যামার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললো… " তুই ভালো আছিস শ্যামা ? শ্যামা কান্না ভেজা কন্ঠে উত্তর করলো… " আমি অনেক ভালো আছি আপা । কিন্তু তুমি , তোমার লগে এইটা কি হইলো আপা ? ক্যান হইলো এমন ? রুপা হাসলো । ভরাট চোখ দুটো থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো । দরজার কাছে চোখ যেতেই বালা নজরে আসলো । দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ও । রুপা ভেজা চোখ নিয়েই মুচকি হাসলো । ইশারা করে কাছে ডাকলো বালা কে । বালা দ্বিতীয় বার অবাক হলো রুপা কে দেখে । শ্যামা কে ওরা এতো ভালোবাসে । বালা এগিয়ে এসে বসলো দুজনের মাঝে । শ্যামা বালা'কে পরিচয় করিয়ে দিল রুপার সাথে । বালা অদ্ভুত স্বরে বলে উঠলো… " তুমি আসলেই অনেক ভাগ্যবতী শ্যামা । আমি কিন্তু এমনি এমনি বলি নি । তোমায় সবাই কতো ভালোবাসে ! হেসে ফেললো শ্যামা । তাচ্ছিল্য করে বললো…… " মাত্র দুজনের ভালোবাসা দেখেই এই কথা বলছো ? তুমি জানো , এই দুজন মানুষ আর ফুলি ছাড়া আমাকে আর কোন দিন কেউ ভালোবাসে নি । উৎকৃষ্ট আমার জীবনে এক আকাশ পরিমাণ অভিযোগ , একটা মানুষের হাতেও পাঁচটা আঙুল থাকে । অথচ আমার জীবনে, সেই পাঁচটা মানুষ ও নেই যারা আমাকে ভালোবাসে । বালা বাঁধ সাধলো তৎক্ষণাৎ… " উঁহুম… ভুল বললে । একজনের কথা ভুলে গেলে । সংগ্রাম জোয়ার্দার , তার কথা বললে না যে ? উৎকৃষ্ট তোমার জীবন ধন্য তার ভালোবাসা পেয়ে । তার . ভালোবাসার তুলনা কিন্তু আর কারোর সাথেই হয় না । রুপা মুগ্ধ নয়নে চেয়ে হাসলো । শ্যামার মুখে শুদ্ধ ভাষা শুনে খানিক অবাক হলো বটে । রাতের খাবার শেষে ঘরে একা একা বসে আছে সংগ্রাম । বিদ্যুৎ নেই এই বাড়িতে । হারিকেনের আলোয় আবছা আলো আবছা অন্ধকার ঘরে । একটু আগে ঘাটে অনেকক্ষণ যাবত পায়চারি করেছে একা একা । শ্যামার নাগাল পায় নি এসেছে থেকে । খাবার সময় কয়েক পলক দেখেছে । খাবার শেষে আবারও আম্মার ঘরে গিয়ে বসেছে সে । বালা ও আছে ওদের সাথে । মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে নিরবে আঁধারে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে শ্যামা । মায়ের গায়ের সেই চিরচেনা ঘ্রাণ প্রাণ ভরে টেনে নিয়েছে নিজের মাঝে । বাল একপাশে বসে হাঁটুতে মাথা রেখে স্থির দৃষ্টিতে দেখছে তিন মা মেয়ে কে । মোখলেছ এসে ঠাই নিয়েছে কাকড়ি বুড়ির ঘরে । সেও পড়ে নি সংগ্রামের সামনে । রাত বাড়ছে । অলকা মৃদু স্বরে মেয়েকে ডাকলেন… " শ্যামা , ঘরে যা । ছোট জমিদার একলা আছেন । নতুন জায়গা, অসুবিধা হইবো তার । রাইত হইছে অনেক । গিয়া, ঘুমা । শ্যামা সময় নিয়ে উঠলো । কথা বাড়ালো না । বালা কে দেখে আলতো হেসে বলল… " তোমার কোনো অসুবিধা হবে না তো বালা ? " উঁহু… কোনো অসুবিধা নেই । তুমি যাও । এখানে তো আপা আর আম্মা আছে । আমি থাকবো ওদের সাথে । শ্যামা বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । অলকা স্মিথ হেসে বললেন … " ঘুমাইবা না , মা ? অনেক রাইত হইছে তো । আসো , এইহানে আমার পাশে শুইয়া পড় । বালা এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে অলকার পাশে তড়িৎ বেগে শুয়ে পড়লো । রুপা চোখ বুঝেছে । অলকা ওর মাথায় কয়েক বার হাত বুলিয়ে দিলেন । বালা চেয়ে থেকে হঠাৎ বলে উঠলো… " আম্মা , আমার মাথাতেও হাত বুলিয়ে দেবেন একটু ? অলকা অবাক হলেন । বালার কথাটা কেমন আহত শোনালো । অলকা ওর মাথাতেও আলতো পরশে হাত বুলিয়ে দিলেন । গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দিলেন ভালো করে । বালা কেমন যেন কেঁপে উঠলো । মায়ের পরশ এমন হয় বুঝি ? সে তো কখনো মায়ের পরশ পায় নি । কাছে পায় নি মাকে কখনো । ওর মা ওকে কখনো জড়িয়ে ধরে নি । আদর করে কথা বলে নি , অলকার মতো করে কপালে চুমু খায় নি । জ্বরের ঘোরেও কখনো কাছে পায় নি মা কে , মাথায় জ্বর পট্টি দেওয়ার জন্য লতিফা কখনো কাছে আসে নি মেয়ের । এই কদিনে বালা কত কষ্টে ছিলো, লতিফা তো জানতো সবটা । তবুও কখনো এক বাক্যের শান্তনা টুকুও তিনি দেন নি মেয়েকে । মাথায় হাত রেখে শান্তনা দেন নি । চোখের পানি মুছিয়ে দেন নি । একটা বারের জন্যেও ঘরের দরজা মারিয়ে ভেতরে গিয়ে কোনো খোঁজ নেন নি মেয়ের । সে বাঁচলো কি মরলো এই নিয়ে কখনো মাথা ঘামায় নি লতিফা । বালা ও ছোট বেলা থেকে মায়ের সঙ্গ পায় নি কখনো । তাই মায়ের কাছ থেকে এই নূন্যতম আশা টুকুও রাখে নি সে । এই নিয়ে কখনো কোনো আক্ষেপ বা কষ্ট জন্মায় নি বালার মনে । তবে আজ কেনো যেনো ইচ্ছে করছে মায়ের সান্নিধ্য পেতে । ওর মা কি পারতো না অলকার মতো হতে । অলকার মতো ভালোবাসতে । চোখ দিয়ে গরম পানি গড়ালো বালার । এদিকে ঘরে এসে খট করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে শ্যামা । দরজার শব্দে সংগ্রাম তাকালো সেদিকে । হারিকেনের আলতো আলোয় দেখলো তার শ্যামা সুন্দরী কে । পরমুহূর্তে কপাল কুঁচকে চোখ ফেরালো সে । শ্যামা পাশে গিয়ে বসলো । সংগ্রাম মুখ ফিরিয়ে বললো… " বাপের বাড়ি এসে দেখি আমাকে একদম বেমালুম ভুলে গেছো । " ভুলিনি তো । আপনাকে কি ভোলা সম্ভব ? " তা এতোক্ষণ কি করছিলে ঐ ঘরে ? " কিছু না , অনেক দিন পর আম্মার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিলাম একটু । সংগ্রাম ইশারা করে ডাকলো ' এদিকে এসো ' । ঘুম পাচ্ছে ভীষণ , শ্যামা খাটের উপর উঠে ওর পাশে গিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল । সংগ্রাম ভ্রু যুগল জড়ো করে তাকালো । অতঃপর শ্যামার বাহু ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ওকে তুললো । শ্যামা চমকে তাকালো । সংগ্রাম ভাবান্তর না দেখিয়ে শ্যামা কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো । শ্যামার মাথাটা রাখলো নিজের প্রশস্ত বুকে । দুহাতে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে মোলায়েম স্বরে বলল… " এবার ঘুমাও । মুচকি হাসলো শ্যামা । সংগ্রাম চোখ খুলে দেখলো ওর হাসি টুকু । হারিকেনের টিমটিমে আলোয় শ্যামার নাক ফুলটা চকচক করছে । সংগ্রাম একহাত ছেড়ে শ্যামার মাথাটা আলগা করে তুললো । নিজের ওষ্ঠ এগিয়ে আলতো পরশ আকলো শ্যামার নাক ফুলে । তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ নিলো শ্যামা । সংগ্রাম নীরবে হেসে আবারো জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে আলতো স্বরে বলল… " সন্তানের জন্য মায়ের কোল , আর একজন স্ত্রীর জন্য স্বামীর বুক সর্বোৎকৃষ্ট স্থান বেগম । তোমার স্থান আমার বুকে। ঘুমাও তুমি……আমি আছি তোমাকে আগলে রাখার জন্য । #চলবে…… |

0 Comments