Bangla Choty Golpo

গল্প: শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:১৮)


লেখিকা:সুরভী‌ আক্তার

পর্ব:১৮



-------------------



সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে নিলো শ্যামা ।

অলকাও উঠেছেন । মা মেয়ে একসাথে ওযু করে যে যার

ঘরে গিয়ে নামাজ আদায় করে নিলো । আজ আর

সংগ্রাম কে ডাকে নি শ্যামা । সে ঘুমোচ্ছে উবু হয়ে শুয়ে ।

সারারাত শ্যামা কে বুকে জড়িয়ে ছিল । এক মুহুর্তের

জন্যেও ছাড়ে নি । আলগা করে নি হাতের বাঁধন । উঠার

সময় শ্যামা কোনো রকমে হাত ছাড়িয়ে উঠেছে ।


সব গুলো পর্বের লিঙ্ক
 


নামাজ শেষে শ্যামা একবার বাইরের দিকে তাকালো ।

শীত পড়ছে , আঁধার আছে এখনো । এখন বাইরে গিয়ে

লাভ নেই । শ্যামা আবারো উঠে পড়লো খাটে । সংগ্রামের

পাশে আধশোয়া হয়ে বসে রইলো । নিগুড় অনুভূতি পূর্ণ

চোখে তাকিয়ে রইলো ঘুমন্ত সংগ্রামের পানে । ঠোঁটের

কোণে হাসি ঝুলছে । সংগ্রামের ঠোঁটের কোণের উপরের

কালো আঁচিল টা জ্বল জ্বল করছে । শ্যামা এক চিলতে

হাসলো । একটু ঝুঁকে নিজের শাহাদাৎ আঙ্গুলের ডগা

দিয়ে আলতো করে ছুঁইয়ে দিলো আঁচিল টা । ঠান্ডা স্পর্শে

অমনি ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে উঠলো সংগ্রাম । তৎক্ষণাৎ

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সরে আসলো শ্যামা । 


আলো ফুটছে বাইরে । অলকা রান্না বসিয়েছেন । শ্যামা

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে ঠিক আগের মতোই আম্মার পাশে

গুটিয়ে বসে আছে । রুপার ঘুম ভাঙ্গে নি এখনো । বালা বা

সংগ্রাম কেউই এতো সকালে ওঠে না । 


শ্যামার মনে দ্বিধা কাজ করছে । খচখচ করছে সে । দ্বিধা

কাটিয়ে শ্যামা প্রশ্ন করলো…



" আব্বা কেমন আছে আম্মা ? কাইল থাইকা একবারও

দেখলাম না তারে ! 







অলকার কর্মরত হাত দুটো থমকে যায় । চোখ মুখ শক্ত

হয়ে যায় তার । কপালে ভাঁজ পড়ে কয়েক স্তর । তিনি এই

বাড়িতে আসার পরই তুমুল কথা কাটাকাটি হয়েছে

মোখলেছের সাথে । ভুল টা মোখলেছের, তবুও নিজের

ভুল স্বীকার করতে নারাজ তিনি । উল্টে দম্ভ খাটান তিনি ।

অলকা একে একে অনেক প্রশ্ন করেছেন তাকে । উত্তর

পায় নি । উত্তর করার প্রয়োজন বোধ করে নি মোখলেছ । 


হাল ছেড়েছেন অলকা । রুপার মুখ পানে তাকিয়ে আর

ঝামেলা বাড়ান নি । 


শ্যামা আম্মার উত্তর না পেয়ে আবারো প্রশ্ন করে…



" কি হইলো আম্মা ? আব্বা কেমন আছে ? 



অলকা হাতের কাজ চালিয়ে শক্ত কন্ঠে উত্তর করলেন…



" আব্বা কইবি না ,

আব্বা ডাক শোনার যোগ্যতা তার নাই । 



" তুমি এই কথা কইতাছো আম্মা ?



" হ কইতাছি । তোর দিক দিয়া তার সাথে আব্বা তুল্য

সম্মান সূচক ডাকটা যায় না । হেয় তোর বাপ না , হেয়

ময়না আর রুপার বাপ । 



কথাটা একটুও বাঁধলো না অলকার মুখে । শ্যামা খানিক

চুপ থেকে আহত স্বরে বলল…




" আব্বার কোনো দোষ নাই আম্মা । বিপদে পইড়া আব্বা

এমনটা করছিলো । টাকা পাইতো জাফর ব্যাপারি ।

আমারে দিয়া উশুল করতে চাইছিল । টাকার পরিমাণ

অনেক । এই পদ্ধতিটা তো কামে আইলো না । এখন কি

করবো আব্বা ? কি কইরা এতগুলা টাকা দিবো ঐ জাফর

ব্যাপারিরে ? 



অলকা খানিক থমকালেন । জাফর ব্যাপারির কথাটা

মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিলো পুরোপুরি । তিনি ভাবেন নি

তার বিষয়ে ! কি হলো তার ? কোনো খোঁজ নেই কেন ?

বাড়িতে এসে অলকা জানতে পারে গ্রামের নতুন মাতব্বর

নিয়োগ সম্পর্কে ।

 জাফর ব্যাপারি কোথায় গেলো তাহলে ?

 অলকা ভাবতে ভাবতে শ্যামা কে আনমনে প্রশ্ন করেন…



" জাফর ব্যাপারির কি হইছে কিছু শুনছোস শ্যামা ? ছোট

জমিদার কি করছেন ওনার লগে ? 



শ্যামা কপাল কুঁচকে শুধালো...


' মানে ? 


অলকা খুলে বললেন সবটা । শ্যামা অবাক হলো । বললো

না কিছু । বালা ঘুম থেকে উঠে বাইরে বেরিয়েছে । শ্যামা

ওর দিকে নজর যেতেই হাসি ফুটালো মুখে । বললো…



" ওঠে পড়েছো ? ঘুম হয়েছে ঠিক মতো ? 



বালা উত্তর করলো…



" অনেক দিন পর অনেক শান্তিতে ঘুম হয়েছে কাল । 



শ্যামা আলতো হাসলো । একটু পর সংগ্রাম উঠবে হয়তো ।

অলকা চা বসিয়েছেন । বালা কে নিয়ে শ্যামা কল'পাড়ের

দিকে গেছে । এর মধ্যেই উঠে পড়েছে সংগ্রাম । নিজে

থেকেই বেরিয়েছে বাইরে । এদিক ওদিক তাকিয়ে অলকা

কে চুলার পাশে দেখে কল'পাড়ের দিকে এগোলো সে ।

শ্যামা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে । মাথা বাড়িয়ে অল্প বিস্তর

দেখতে পারছে তার প্রিয় নদীর ঘাট টাকে । ঘাটের দিকে

আরো কয়েক পা এগোলো সে । ফাঁকা জায়গা হওয়ার

ঠান্ডার মাঝে নদীর পাড়ের একটা দমকা হাওয়া ছুঁইয়ে

দিলো তাকে । শ্যামা দীর্ঘ শ্বাস টানলো । শাড়ির আঁচল

মাথায় নেই । পিছন থেকে ওর মাথায় আঁচল টেনে তুলে

দিলো সংগ্রাম । তাৎক্ষণিক পিছন ফিরলো শ্যামা । সংগ্রাম

কে দেখে এক চিলতে হাসলো । সংগ্রাম আলতো চুমু

আঁকলো ওর কপালে । শান্ত স্বরে বলল…



" বালা উঠেছে ? 



" হুম ! আপনি হাত মুখ ধুয়ে ঘরে যান । আমি চা নিয়ে

আসছি । 




সংগ্রাম বাঁশের কঞ্চি ভেঙে দাঁত মাজতে মাজতে এগোলো

ঘাটের দিকে । বালা বেরিয়েছে ততক্ষণে । শ্যামা ওকে

নিয়ে ঘরে গেছে । রুপাও উঠেছে । খাটে বসেই সবকিছু

করতে হয় ওকে । খাট থেকে নামতে গেলে আরেক

বিপাকে পড়েতে হয় নয়তো । নিজের শরীরের অল্প ভার

টুকু সামলানোর মতো শক্তি টুকুও

অবশেষ নেই ওর মাঝে ।

শারীরিক,

মানসিক দুদিক থেকেই জর্জরিত হয়ে আছে সে ।

 অলকা মেয়েকে হাত মুখ ধুইয়ে দিয়ে খাবার ব্যবস্থা

করে দিলেন । শ্যামা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো সংগ্রামের
জন্য । সে এখনো আসেনি ঘাট থেকে । শ্যামা বসলো

রুপার কাছে । বালা,রুপা, শ্যামা তিনজনেই আছে ঘরে ।

শ্যামা আকস্মিক প্রশ্ন করলো…



" দুলাভাই কবে আইবো আপা ? এই মূহুর্তে তোমার

সবচাইতে দুলাভাইরে বেশি প্রয়োজন ।





রুপার মুখ ভঙ্গিমা বদলে গেলো । চোখ মুখ থির হয়ে

আসলো ওর । রুপার বাচ্চা মরা ব্যতীত শ্যামা আর কিছুই

জানে না । বাচ্চা মারা যাওয়ার পর রুপা কে ওর শশুর

বাড়ি থেকে নানান কটু কথা শোনানো হয়েছে । কটুক্তি

করা হয়েছে ওর মাতৃত্ব নিয়ে । গর্ভাবস্থায় রুপার যত্নের

কোনো ত্রুটি ছিল না । ওর শশুর বাড়ির সবাই ওকে

অনেক বেশি ভালোবাসতো । শশুর শাশুড়ি ওকে যত্নে

রাখতো সবসময় । রুপার স্বামী জাভেদ ও কম নয় । সেও

কল্পনার থেকেও বেশি ভালোবাসে রুপা কে । তবে সেই

ভালোবাসার ভাঙ্গন ধরেছে ওর বাচ্চা দুটো মারা যাওয়ার

পর । বাচ্চা মৃত হয়ে জন্ম নেয় নি । জন্ম হওয়ার পর মৃত্যু

হয়েছে তাদের । এর মুল কারনটা যথা সময়ের আগেই

তাদের জন্ম । সম্পুর্ন আট মাস হওয়ার আগেই জন্ম

হয়েছিল বাচ্চাদের । এক্ষেত্রে একটা বাচ্চা হলে বাঁচার

সম্ভবনা ছিল পুরোপুরি । তবে দুটো বাচ্চা হওয়ার দরুন

দুটোই পুষ্টি হীনতা এবং অপরিপক্ক ভাবে জন্ম নিয়েছিল ।

হাসপাতালে জরুরি অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও বাঁচানো যায় নি

তাদের । 



এতে রুপার কোনো হাত ছিল না । তবুও এটা মানতে

নারাজ রুপার শশুর শাশুড়ি । তারা তাদের দুই নাতনির

মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন রুপা কে । অলুক্ষণে,অপয়া,

নানান অপবাদ দিয়েছে রুপা কে । রুপার মুখ অবধি

দ্বিতীয় বার দেখতে চান না তারা । ওর মৃত বাচ্চাদের মুখ

অবধি দেখতে দেওয়া হয় নি রুপা কে । বিভিন্ন ভাবে

ভর্তসনা করা হয়েছে ওকে । হাসপাতাল থেকে ওকে আর

শশুর বাড়িতে ফিরতে দেওয়া হয় নি । রুপার শশুর

শাশুড়ি কড়া ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন তারা রুপা কে আর

কখনো গ্রহণ করবেন না । এমনকি জাভেদের সাথেও


সমস্ত যোগাযোগের পথ তারা নিজেরাই বন্ধ করে


দিয়েছেন । বাচ্চা মারা যাওয়ার পর হাসপাতালে একটা

বারের জন্যেও রুপার সাথে দেখা করতে আসে নি কেউ ,

এমনকি জাভেদ কেও কসমের ভার দেখিয়ে রুপার কাছে

যেতে দেওয়া হয় নি । হাসপাতালের সমস্ত খরচা বহন

করেছে সংগ্রাম । সংগ্রাম নিজেই মাধবপুরে ওদের নিয়ে

আসার ব্যবস্থাও করে দিয়েছে । এসব বিষয়ে অবগত ছিল

না শ্যামা । তবে এখন রুপা সবটা খুলে বললো ওকে ।

শ্যামা অনুভুতি হীন হয়ে শুনে গেলো সবটা । বলতে বলতে

পানি গড়ালো রুপার চোখ দিয়ে । শ্যামার চোখ দুটোও

ছলছল করে উঠছে । বালা পাশে বসে অবাক হয়ে শুনে

যাচ্ছে । সবটা বলে স্থির হয়ে গেল রুপা । শ্বাস টানলো বুক

ভরে । বুকে পাথর চাপিয়ে রাখার মতো অসম্ভব যন্ত্রনা

হচ্ছে । শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে । শ্যামা বাক্ রুদ্ধ হয়ে

পড়লো । এই কদিনে এতো সব কিছু হয়ে গেছে ? ওর

আপার সাথে এতো কিছু হয়ে গেছে ? 


শ্যামা চোখ নামাতেই পলক পড়ার সাথে সাথে টুপ করে

কয়েক ফোঁটা পানি গড়ালো । কিছু বলার আগেই দরজা

মাড়িয়ে ঘরে আসলেন অলকা ।

 পিছন থেকেই বললেন…সংগ্রাম ঘরে গেছে,

 শ্যামা কে চা নিয়ে যেতে বললেন তিনি ।

 বলেই বেরিয়ে গেলেন । শ্যামা চোখ তুলে তাকালো

আপার দিকে । রুপা চোখে পানি নিয়েই শ্যামার দৃষ্টি দেখে

মুচকি হাসলো । চোখের ইশারায় বোঝালো যেতে । শ্যামা

খানিক নিস্তেজ হয়ে বসে থেকে ঘর থেকে বের হলো ।

একবার ইচ্ছে জাগলো আপাকে

 শক্ত করে জড়িয়ে ধরার।

 কিন্তু ধরলো না । 


এক কাপ চা নিয়ে ঘরের দিকে এগোলো । সংগ্রাম পাঞ্জাবি

পরিবর্তন করে পাঞ্জাবির হাতা গুলো কনুই পর্যন্ত

গোছাচ্ছে খাটের পাশে দাঁড়িয়ে । শ্যামা কে দেখে স্বভাব

সুলভ হাসলো ও । শ্যামা এগিয়ে গিয়ে চায়ের কাপ সামনে

রাখলো । স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সংগ্রামের দিকে ।

আপা কত সুন্দর , তবুও যদি ওর সাথে ওর শশুর বাড়ির

লোক এমন করতে পারে তাহলে শ্যামার সাথে ও তো

করতে পারে ! শ্যামা কালো, সবাই বলে । আহামরি সুন্দর


নয় ও । সংগ্রামের চোখে ও কেমন সেটা ও জানে না !

সংগ্রামের ওর থেকে মুগ্ধতার তৃপ্তি সরে গেলে কি হবে ?

সংগ্রাম ছেড়ে দেবে ওকে ? তার উপর ওরা জমিদার,

ওদের ব্যবহার্য এক জিনিসে মায়া থাকে কম । আসক্তি

কেটে যায় কম সময়ের মধ্যেই । 


উল্টো পাল্টা চিন্তা মনে আসতেই আঁতকে উঠলো শ্যামা ।

শব্দ করে হেঁচকি তুললো একটা । সংগ্রাম তাৎক্ষণিক

তাকালো । শ্যামার হাবভাব দেখে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো…



" কি হয়েছে বেগম ? কি দেখছো এভাবে ? খুব বেশি

ভালো লাগছে আমায় ? 



" সবসময়ই ভালো লাগে আপনাকে !



" তোমাকেও ! 



বলেই ঠোঁট চেপে হাসলো সংগ্রাম । চায়ের কাপ হাতে

তুলে বসলো । শ্যামা অসার কন্ঠে বলে বসলো…



" আমার উপর আসক্তি কেটে গেলে আমাকে ছেড়ে

দেবেন আপনি ? 



তব্দা খেলো সংগ্রাম । বিস্ময় স্বরে শুধালো…


" কি বলছো এসব ?

 তোমাকে আমি ছাড়তে যাবো কেনো ‌? 



" দুলাভাই বলেছিল আপাকে কখনো ছাড়বে না । উনি

অনেক ভালোবাসতেন আপাকে । তবুও আপাকে একলা

ছাড়লো যে ? এলো না কেনো ? আপা তো সুন্দর , তবুও

এমনটা হলো । আর আমি ? আমি তো ,, আমাকেও

আপনি একসময় ছেড়ে দেবেন তাই না? 



সংগ্রামের চোয়াল শক্ত হলো শ্যামার কথায় । তবে ওর

ভয়ের কারণ বুঝতে পেরে স্বভাবিক হলো সংগ্রাম । শ্যামা

কে টেনে ওর পাশে বসালো । মোলায়েম কন্ঠে বলল…



" তোমাকে ছাড়বো একদিন । যেদিনের পর আমার আর

নিঃশ্বাস চলবে না । যেদিন এই নিঃশ্বাস থেমে যাবে সেদিন

ছাড়বো তোমায় , তবে সেটা শুধু এই জগতে । পরের

জগতে আবারো ধরবো তোমায়, সেই জগতের কিন্তু

কোনো শেষ নেই । 



" আমার উপর মায়া হয় তাই না ? তাই এসব বলেন ? 



" হয় তো , ভীষণ মায়া হয় । সেই মায়ার জ্বালে আটকে

পড়েছি আমি । 



" মায়া কিন্তু কেটে যায় একসময় !



" তোমার প্রতি আমার মায়া কখনো কাটবে না, বেগম !

মায়া গাছের শেকড়ের ন্যায় , যত লালন করবো ততই

বাড়বে । 



শ্যামা চোখ নামালো । চোখ দুটো ভেজা ‌। সংগ্রাম ওর

চিবুক ধরে মুখটা উঁচিয়ে বললো…



" ভয় পাও আমাকে হারানোর ? আমার থেকে দূরে সরে

যাওয়ার ভয় পাও ? 



" নিজের দূর্বলতার কথা কাউকে বলতে নেই । মানুষ

মানুষের দূর্বলতা কে কাজে লাগায় । 



" আমি তোমার দূর্বলতা ? আমি যদি তোমার দূর্বলতা হোই

তাহলে তুমিও কিন্তু আমার দূর্বলতা । সংগ্রাম জোয়ার্দার

নিজের দূর্বলতা কে নিজের শক্তিতে রূপান্তরিত করে ‌। যে

শক্তি কখনোই হারাতে দেয় না নিজের কাছ থেকে ।

তোমাকেও দেবে না । 


তোমার দূর্বলতা তুমি প্রকাশ করো চোখের পানি দিয়ে ।

অথচ সংগ্রাম জোয়ার্দারের শক্তি দূর্বল হয় তার বেগমের

চোখের পানি দেখলে । শুনেছি স্বামী আর স্ত্রী কে - হাত

আর চোখের সাথে তুলনা করা হয়েছে । হাতে ব্যথা পেলে

চোখে পানি আসে । আর সেই চোখের পানি কিন্তু হাতই

মুছিয়ে দেয় । আমি যদি তোমার ব্যথার কারণ হোই

তাহলে তুমি কাঁদো , আমি মুছিয়ে দেবো তোমার চোখের

পানি । একটু ও কপটতা করবো না এতে । 



শ্যামা এ পর্যায়ে কাঁদল না । ভেজা চোখ ভেজাই রইলো ।

পানি গড়ালো না । ভাবনায় অন্য কিছু আসতেই প্রসঙ্গ

পাল্টালো সে…

" ছোট জমিদার সাহেব…

" হুম, বেগম…

" জা.. জাফর ব্যাপারি কোথায় ? ওনার কোনও খোঁজ নেই কেনো ? 

" উনি ওনার কর্মফল ভোগ করছেন । ওনার জায়গাতেই আছেন উনি , যেখানে ওনার থাকার কথা সেখানেই । 

" কি করেছেন আপনি ওনার সাথে ? 

" কিছুই করি নি । শুধু শাস্তি দিয়েছি একটা । যেটার যোগ্য ছিলেন উনি । ওনার প্রাপ্য টুকু বুঝিয়ে দিয়েছি ওনাকে…

" কি শাস্তি ? 

সংগ্রাম আলগোছে শ্যামার ছোট ছোট চুল গুলো ওর কানের পাশে গুজে দিল । হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেয়ে বললো…

" তোমাকে ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না । তুমি শুধু আমাকে নিয়ে ভাববে । আর আমি তুমি সহ বাকি সবকিছু সামলে নেবো ।

শেষের কথাটা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অলকার কানে পৌঁছালো । চোখ মুখ ভরে উঠলো তার । শীতলতায় ছেয়ে গেলো মাতৃ হৃদয় । আজ ভীষণ সুখ লাগলো অলকার । বুকটা ভরে উঠলো সুবাসে । একজন মায়ের কাছে তার মেয়ের জন্য এর থেকে বড় চাওয়া আর কি হতে পারে ? চাওয়ার থেকেও অনেক বেশি পেয়েছেন অলকা । এসব কি কখনো ভেবেছিলেন তিনি ? 
দুপুরের দিকে ফুলি এসেছে । কাল রাতেই খবর পেয়েছিল সে । তবে আসতে পারে নি । আজ দিন আগের ভাগেও আসতে পারে নি । এখন একটু ফাঁক পেতেই ছুটে এসেছে । আহাদের সাথে এসেছে সে । 
আহাদ আসা মাত্রই সংগ্রাম বেরিয়ে গেছে ওর সাথে । ফুলি এক চিৎকার করে বাড়িতে হুড়মুড়িয়ে ঢুকেছে । শ্যামা বালা সহ সবে ঘর থেকে বেরিয়েছিল । ফুলির চিৎকারে হকচকিয়ে যায় শ্যামা । দুজনের দৃষ্টি মিলতেই মুহূর্তেই মিলিত হয় দুই বান্ধবীর দুটি প্রাণ । একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওরা । বালা হাসে পাশ থেকে । চোখ ভরে দেখে দুজনকে । শ্যামা কে ওর আসলেই ভাগ্যবতী মনে হয় । ফুলি শ্যামা কে একটু ছেড়ে উত্তেজিত হয়ে বলে…

" শ্যামা, প্রাণ আমার । কেমন আছোস তুই ? 

শ্যামা ও একই উত্তেজিত স্বরে উত্তর করে…

" আমি ভালো আছি ফুলি , তুই ? তুই কেমন আছোস ? আমার কথা মনে পড়ে নাই তোর ? সেই দিনের পর একবারও গেলি না ক্যান আমার কাছে ? 

ফুলি হেসেই উত্তর দেয়…

" আমি যামু ক্যামনে ? আম্মা অসুস্থ । মনে হয় আর বাঁচবো না । হেরে রাইখা যাই ক্যামনে ? দেখ তুইও চইলা গেলি , আম্মাও চইলা যাইবো । আমার আর কেউ রইলো না রে । 

শ্যামার মুখটা মলিন হলো । হাসি চুপসে গেল । চাপা স্বরে বললো…

" কাকির কিচ্ছু হইবো না । তার আগে, তোরে বিয়া দিমু এবার । আইজ ছোট জমিদার আসুক , আমি কথা কমু তার লগে । আহাদ ভাইয়ের লগে হেয় বিয়া দিবো তোর । খুব ভালো হইবো তাইলে…

ফুলি বললো…

" ঘাটে যাই চল । কতো দিন যাই না । তোরে ছাড়া কিচ্ছু ভালো লাগে না । বাড়ি থাইকাই এখন আর বাইর হইতে ইচ্ছা করে না আমার । 

শ্যামা, ফুলি ,বালা সহ ঘাটে গেলো তিনজন । নিচের সিঁড়িতে পানিতে পা ডুবিয়ে বসলো তিনজনে । বালা এখনো দেখছে ওদের দুজন কে । শ্যামা আর ফুলি গাঁ ঘেঁষে বসেছে । বালা একটু ফাঁক । শ্যামা ওকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসলো । ওর হাতটা শক্ত করে ধরলো । অন্য হাত দিয়ে ফুলির হাত শক্ত করে ধরলো । 



" আজ থেকে আমরা তিনজন সই ।



বালা অদ্ভুত স্বরে প্রশ্ন করলো…



" আমিও ? 



ফুলি বলে উঠলো…



" হুম, তুমিও । তয় তুমি আমার সাথে সই পাতাও আগে ।

শ্যামার তো বিয়া হইয়া গেছে । ওয় থাকবো ওর ছোট

জমিদারের লগে ।

আর তুমি আর আমি এক লগে থাকমু।

 গেরাম ঘুরবা ? চলো তোমারে গেরামে ঘুরাইয়া লইয়া

আহি । 



বালা খুশি হলো । গ্রামে ঘোরা হয় না তেমন । আর এই

মাধবপুরে তো কোনো দিন আসে নি বালা । সে উচ্ছাসিত

কন্ঠে বলল…



" যাবো আমি । নিয়ে যাবে ? শ্যামা, তুমিও চলো , খুব

মজা হবে । 



শ্যামা মাথা নাড়ালো । নিচু স্বরে বলল…



" আমি বাইরে যাই না বালা । আর এখন তো আরো যাবো

না । তুমি যাও ফুলির সাথে । ও তোমাকে পুরো গ্রাম

ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে । 



" তাহলে থাক , তুমি না গেলে আমিও যাবো না । অনেক

দিন পর সখিকে কাছে পেয়েছো , গল্প করো ওর সাথে ।

আমি শুনি তোমাদের গল্প । 



ফুলি গল্প জুড়ে দিলো । বকবক করতে একটুও ক্লান্তি

আসে না ওর । শ্যামা আর বালা নীরবে শুনছে ওর কথা । 


দুপুরের সময় টা অনেকটা গড়িয়েছে । ওরা তিনজন

এখনো সেই একই ভাবে বসে আছে । 


বাড়ির ভেতরে এই সময় আঙ্গিনায় কেউ নেই । রুপা আছে

ঘরে । নামাজের পর মেয়েকে দুপুরের খাবার খাইয়ে

দিচ্ছেন অলকা । ঘরে আছে দু'জনে । দরজায় ধপ করে

একটা শব্দ হতেই তড়িৎ বেগে দু'জনেই চমকে তাকালো

সেই দিকে । 


দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ময়না । চোখ দুটো স্থির হয়ে

তাদের দিকেই নিবদ্ধ । অলকা আর রুপা অবিশ্বাস্য নয়নে

একে অপরের দিকে তাকালেন । পুনরায় তাকালেন

ময়নার দিকে । ময়না কাতর হয়ে ঠোঁট দুটো প্রসারিত

করলো । এগিয়ে আসলো দরজা থেকে । হাতের ছোট্ট

কাপড়ের ব্যাগ টা পাশে রেখে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…



" কেমন আছো আম্মা ? 



অলকা এখনো কিংকর্তব্য বিমূঢ় । চোখে অবিশ্বাস ।

ময়নাও কেমন শুকিয়ে গেছে । ফর্সা ধবধবে মসৃণ মুখের

আদল পাল্টে গেছে । চোখের নিচের চামড়ায়‌ কালি

পড়েছে । অলকার সম্বিত ফিরতেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি ।

অবিশ্বাস নিয়েই শুধালেন…



" ময়না তুই ? 



" আমি আসমু এইটা আশা করো নাই তাই না আম্মা ? 



" না , মা । কেমন আছোস তুই ? 



" আমি ভালো আছি আম্মা । তুমি ? আর আপা , আপা

কেমন আছো তুমি ? 



রুপা ঘৃনিত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো । ময়নার সাথে অনেক

দিন পর দেখা হলো । তবুও মনে পড়লো পুরোনো ঘটনা ।

রুপা দৃষ্টি সরাতেই ময়না হেসে ফেললো । অলকা কে

জড়িয়ে ধরলো ।

চোখ বন্ধ করে অনুভব করলো আম্মাকে ।

 অথচ এতো দিন, এতো বছর এমন অনুভূতি কখনো

আসেনি । অলকা মেয়েকে ছেড়ে জিজ্ঞেস করলেন…



" জামাই আইছে ? 



'' না , আম্মা । তয় , আফতাব সাহেব আইছে । ওনার

লগেই আইলাম আমি । আইজ তো আওনের কথা

আছিলো তার । সময়,ঘটনা, অবস্থা সবকিছু পাল্টাইলেও

তিনি আইছেন । 



অলকা ছ্যাঁত করে উঠলো । দ্রুত বের হলো বাইরে ।

উঠানের ঠিক মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে আছে আফতাব ।

অলকা কে দেখে মুচকি হাসলো সে । সালাম দিলো

স্বাভাবিক ভাবেই । অলকা শুল্ক ঢোক গিললেন ।



" ভালো আছেন আম্মা ? 



" জ.. জ্বি বাবা । কিন্তু তুমি ? তুমি এইহানে ক্যান আইছো

বাবা ? ময়নারে দিতে আইছো?



" না আম্মা । আমি শ্যামার কাছে এসেছি । বসতে বলবেন

না ? 



অলকা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন । আফতাব নিজে গিয়ে

উঠে বসলো বারান্দায় । অলকার অবস্থা বুঝেও জিজ্ঞেস

করল…



" শ্যামা কোথায় আম্মা ? শুনলাম কাল এসেছে ! 



" সবটা জাইনাও ক্যান আইছো বাবা ? 



" ঐ যে বললাম, শ্যামার কাছে এসেছি । ওর সাথে

একবার দেখা করতে চাই আমি । আমি তো কথা

দিয়েছিলাম ঠিক চৌদ্দ দিন পর আজকের এই শুক্রবারের

দিন আসবো আমি । কথা দিয়ে কথা না রাখা মুনাফিকের


কাজ । আমি মুনাফিক হতে চাই না আম্মা । তাই এসেছি…



" যে অছিলায় আওনের কথা আছিলো সেই হেতু

পরিবর্তন হইয়া গেছে বাবা । তুমি জানো সবটা । শ্যামার

বিয়া হইয়া গেছে । ও এখন বিবাহিত । 



" জানি আম্মা । সবটা জানি । আপনাকে আম্মা ডাকের

অধিকার পেয়েছিলাম । যে কারণে অধিকারটা পেলাম,

দেখুন সে কারনটা সেই সম্পর্কটা অসম্পূর্ণ থেকে গেলো । 



" আমাদের হাত আছিলো না কোনো কিছুতে । আমারে

ক্ষমা কইরা দিও বাবা । 




" না আম্মা, এভাবে বলবেন না । ভাগ্যরেখা নিজ কেন্দ্র

বিন্দুতে চলমান । এতে হাত থাকে না কারোর । দেখুন,

ভাগ্যে ছিলো বলে একবার আমার আব্বার দ্বারা

আপনারা ঠকলেন । আর এবার ভাগ্যের দ্বারা আমি

হারলাম । তবে আমি খুশি হয়েছি আম্মা । আপনার

মেয়ের জমিদারের ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে । প্রশন্য

ভাগ্য তার । আমার সাথে থাকলে ভাতের অভাব হতো । 



অলকা বললেন না কিছু । আফতাব উঠে দাঁড়ালো ।

শ্যামার ঘরের দিকে তাকালো একবার । চোখ সরিয়ে

বললো…



" যদি অনুমতি দেন তাহলে আপনার মেয়ের সাথে আমি

একবার দেখা করতে চাই আম্মা । কোনো অসৎ উদ্দেশ্য

নয় । শুধু কয়েকটা কথা বলবো । সে এখন পরনারী ,

আমি বেগানা পুরুষ । তবুও দুটো কথা বলার সুযোগ করে

দিতেন যদি ! 



অলকা আহত স্বরে বললেন…



" ছোট জমিদার মানে শ্যামার স্বামী বাড়িতে নেই । শ্যামা

ও ঘরে নেই । ও ……



" ঘাটে আছে আপনার মেয়ে । ওদিক থেকে নদী পারের

সময় দেখলাম । 



অলকা কে থামিয়ে বললো আফতাব । অলকা কথা না

বাড়িয়ে এগোলো ঘাটের দিকে । ওর ইচ্ছে করলো না

আফতাব কে না করতে । শ্যামা বাদে পিছন থেকে বালা

আর ফুলি কে ডাকলো অলকা । শ্যামা উঠে আসতে নিলে

অলকা শক্ত কন্ঠে বলল…



" মাথায় ঘোমটা টান শ্যামা । এইহানেই থাক । কেউ

একজন আইবো তোর লগে দেখা করতে । 



শ্যামা বুঝলো না কিছু । অলকা চলে যেতেই শ্যামা ঘোমটা

টেনে নিচ থেকে ঘাটের উপরে আসলো । দাঁড়ালো

সেখানে । মনটা খচখচ করছে । আম্মা কি বললো ? কে


আসবে ? ছোট জমিদার সাহেব ? কিন্তু তিনি এভাবে

আসবেন কেনো ? 


শ্যামার ভাবনার ছেদ ঘটলো পুরুষালি কাতর কন্ঠে…


" ভালো আছেন শ্যামা ?



হকচকিয়ে পিছন ফিরতে গিয়েও অনুচ্চারিত দ্বিধায়

ফিরলো না শ্যামা । বক্ষ স্থল আঁতকে উঠলো অলকার

মতোই । কন্ঠের মালিক পরিচিত । একদিনের পরিচয় তার

সাথে । এক পলকের সাক্ষাতের পরিচিত তিনি । 


শ্যামা ঘন পলক ফেললো এদিক ওদিক । জোরে জোরে

শ্বাস টানতে লাগলো । আফতাব আবারো বললো…



" জিজ্ঞেস করছিই বা কেনো ? আপনি তো ভালোই

আছেন । দেখতেই পারছি । 


শ্যামার পড়নে দামি শাড়ি ।

হাতে একজোড়া চিকন বালা । 




শ্যামার মুখ না দেখেই বললো…


" আমার সাথে জড়ালে বোধহয়

ভালো থাকতেন না শ্যামা ।

 তাই আল্লাহ সরিয়ে দিয়েছেন আপনাকে ।



শ্যামা কথা ফোটালো মুখে…



" আপনি এখানে ? 



" হুম, আসার কথা ছিল তো আজ , মনে নেই ? বলে

গেছিলাম আপনাকে , ঠিক চৌদ্দ দিন পর আসবো । তাই

এসেছি…



" আপনার এখন এখানে আসার মানে নেই কোনো । 


" জানি, সবটা জেনেই এসেছি । 



" তাহলে আসতে গেলেন কেনো ? 



" সবকিছুর যে মানে খুঁজতে নেই । ঐ যে বললাম, আসতে

চেয়েছিলাম , তাই এসেছি । 



শ্যামা নিশ্চুপ । আফতাবের কথা গুলো কাতর শোনাচ্ছে ।

এতক্ষণ অলকার সামনে যখন কথা বলছিল, তখন গলা

কাঁপে নি । এখন কাঁপছে । কম্পিত হয়ে উচ্চারিত হচ্ছে


প্রতিটা শব্দ । শ্যামা তাকায় নি একবারও । আফতাবের

চোখের দৃষ্টি লক্ষ্য করে নি । লক্ষ্য করলে হয়তো বুঝতো

ওর অক্ষি যুগলও ভেজা । আফতাব ভেজা কন্ঠে কেমন

করে যেন বললো…



" সারাজীবন সামলে রাখলেন নিজেকে । অথচ, আমার

জন্য নিজেকে এই চৌদ্দ টা দিন সামলে রাখতে পারলেন

না শ্যামা ? আমাকেও দায়িত্ব টা দিলেন না আপনাকে

সামলানোর । 



" এসব কথার কোনো মানে নেই জনাব । 



আফতাব হাসলো । 



" বললাম তো , সবকিছুর মানে খুঁজতে নেই । 



" আমি এখন অন্যের স্ত্রী । 


" জানি । সংগ্রাম জোয়ার্দারের স্ত্রী আপনি , দেখেছি আমি

আপনার স্বামী কে । অত্যাধিক সুপুরুষ তিনি । 



".....



শ্যামা বেশি কথা বলে না আফতাব জানে । আর এই

ধরনের কথায় শ্যামার পাল্টা উত্তর আশা করাও যায় না ।

আফতাব নিজে থেকেই বললো…



" আজকেও চোখ এড়িয়ে চলতে হচ্ছে আপনাকে ।

অথচ, কথা ছিলো হালাল ভাবে চোখে চোখ রেখে কথা

বলার । 



" আপনার সাথে এখন কথা বলাটাও হারাম । 



" তাহলে হারাম কাজে জড়াতে হবে না আপনাকে ।

সবসময় ভালো থাকবেন শ্যামা । সুখি হোন নিজের

সংসারে । ভালো থাকুন সবসময় । নিজের স্বামী সংসার

নিয়ে থাকুন আপনি । আমি শুধু একটা বার দেখতে

আসলাম । দোয়া করি অনেক । 


আচ্ছা শ্যামা , আপনি কি মনে রাখবেন আমায় ? আমি

কিন্তু মনে রাখবো । কখনো ভুলবো না । মানুষ তো কতো

কিছুই মনে রাখে , সেই তালিকায় রেখে হলেও মনে

রাইখেন আমায় । কেউ একজন আপনার জন্য সবসময়

দোয়া করবে এটাও মনে রাইখেন । আজ আসি, এ

জীবনে আর দেখা নাও হতে পারে ।


ভালো থাকবেন…




কথা শেষ করে এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে পিছন

ফিরলো । ছলছল চোখ মুছে সামনে তাকাতেই পা থমকে

গেলো আফতাবের । ঠিক পেছনে একটু দূরে সংগ্রাম

দাঁড়িয়ে আছে স্বভাব সুলভ পিছনে হাত গুটিয়ে । চোখ

মুখের ভঙ্গিমা স্বাভাবিক । আফতাব ওকে দেখেছিল

একবার । শ্যামার বিয়ের খবর পেয়েই সে এসেছিল এই
গ্রামে । সবকিছু জেনে জমিদার গ্রামেও গিয়েছিল ।


সেখানে দেখেছে সংগ্রাম কে । সংগ্রাম আফতাব কে চেনে

কি না জানা নেই তার । সংগ্রামের তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে

আফতাব জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলো । 



" সালাম নেবেন জমিদার সাহেব ! 



 জমিদার সাহেব সম্বোধন শুনে শ্যামা পিছন ফিরলো

তাৎক্ষণিক । সংগ্রাম চাইলো ওর পানে । চোখাচোখি হলো

দুজনের । শ্যামা পল্লব দ্বয় কাঁপলো অজানা আশঙ্কায় ।

তবে শ্যামার ভাবনা কে ভুল প্রমাণিত করে সংগ্রাম

আফতাবের দিকে তাকিয়ে হাসলো । সালামের উত্তর

করলো স্বাভাবিক ভাবেই । শান্ত স্বরে বলল…



" চিনি আপনাকে । 



আফতাব হাসার চেষ্টা করলো । বিরতি হীন বললো…



" চেনার কথা ছিলো না ।

তবুও চেনেন, জেনে খুশি হলাম ।

 আমায় চেনা টা বোধহয় উচিত ছিল । কিছু মনে করবেন

না, আপনার অনুমতি ব্যতীত আপনার স্ত্রীর সাথে

কয়েকটা কথা বললাম । হাহহ.. ভালো থাকবেন জমিদার

সাহেব । ভালো রাখবেন আপনার স্ত্রী কে । আমি তো

পেলাম না । আপনি পেয়েছেন, অযত্ন হতে দিয়েন না । 



 শেষ হতেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত গটগট

পা ফেলে বাড়ির পিছনের দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল সে ।

ভিতরেও ঢুকলো আর । সদর ঘাটের দিকে এগোলো ।

একবারও পিছু টানে ফিরলো না শ্যামার দিকে । অধিকার

ব্যতীত কোনো প্রকার পিছুটান থাকাটাও ঠিক নয় । 


আফতাব যেতেই সংগ্রাম চোখ ফিরিয়ে তাকালো শ্যামার

দিকে । নরম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । শ্যামা আগে থেকেই

তাকিয়ে ছিলো । দুজনের দৃষ্টিই শীতল । সংগ্রাম এগিয়ে

গিয়ে বড় আম গাছটার নিচে বসলো । দীর্ঘ তপ্ত শ্বাস

ফেললো একটা । শ্যামা অচল পায়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ।

নিস্তব্ধতা বিরাজমান পুরো ঘাটে । কারোর মুখে কোনো রা

নেই । দু একটা পাখির ডাক ভেসে আসছে গাছের উপর

থেকে । নদীর পাড়ের শিরশির হাওয়া বইছে । ঘাটে ঢেউ

আছড়ে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে অল্প বিস্তর । শ্যামার শ্বাস

জোড়ালো হচ্ছে । সংগ্রাম তাকিয়ে আছে নদীর পানে ।

সংগ্রাম কি ওকে ভুল বুঝলো ? 


শ্যামা দাঁড়িয়ে না থেকে এগোলো দৃঢ় পায়ে । কিছু বলার

জন্য উদ্যত হতেই সকল নিস্তব্ধতার মাঝে কোথাও থেকে

পুরুষালি ভাঙ্গা কন্ঠের স্বরে গানের আওয়াজ ভেসে

আসলো ঢেউয়ে ঢেউয়ে…...


নদীর কলকল ঢেউয়ের শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে কানে

এসে ধরা দিলো....



" মেঘের উপর আকাশ ওড়ে..নদীর ওপার পাখির বাসা !!


মনে বন্ধু বড় আশা..যাও পাখি যারে উড়ে...


তারে কইয়ো আমার হয়ে, চোখ জ্বলে যায় দেখবো

তারে...


মন চলে যায় অদূর দূরে..


যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে...

সুখে থেকো, ভালো থেকো, মনে রেখো এই আমারে....


চলবে......

 

Share:

0 comments:

Post a Comment

Xgossip. Bangla Choty Golpo

Tags

Xgossip— Bangla Choty Golpo. Powered by Blogger.

Ad Space

Featured post

গ্রাম্য জীবনের সুখ দুঃখে মা ও ছেলে(১৫)

  পর্ব:১৫ বাবা- কি বলব বাবা তোকে, আসলে তোর মাকে বকা ঝকা করেছি তার কারন আছে তুই আমার ছেলে তোকে কি বলব সব তো খুলে বলা যায়না। আমি- কেন বাবা আমি...

Search This Blog

🔞 ১৮% সতর্কবার্তা

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন।

About Us

About Us
এই খানে পাবেন বিভিন্ন লেখকদের বিভিন্ন ক্যাটাগরির চটি গল্প।

Translate

Popular Posts

Popular Posts