গল্প শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:১৯)


লেখিকা: সুরভী আক্তার
পর্ব :১৯


-------------------------


সন্ধ্যা গড়িয়েছে । সংগ্রাম আবারো বেরিয়েছে আহাদের সাথে ।

মোখলেছ বাড়ি ফিরেছেন আঁধার হতেই ।

শ্যামা, বালা, রুপা নিজেদের ঘরেই আছে ।

ময়নাও আছে । সে থাকবে কিছুদিন ।

বিয়ের পর তো আর এসে থাকা হয় নি তেমন ।


সব গুলো পর্বের লিঙ্ক
 


মোখলেছ ফিরে নিজের মতো

করেই গোসল সেরে কাকড়ি বুড়ির ঘরে ঢুকেছে ।

গলা খাঁকারি দিয়ে একবার বার্তা পাঠিয়ে

জানান দিয়েছে নিজের বাড়ি ফেরার কথা ।

অলকা মেয়েদের পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে

বেরিয়ে আসেন । তার ঘরেই আছে সবাই ।

তিনি বেরিয়ে এসে খাবার বেড়ে কাকড়ি

 বুড়ির ঘরে নিয়ে আসেন ।


মোখলেছ একবার চোখ তুলে তাকান তার দিকে ।

অলকা কথা না বলে খাবারের প্লেট রেখে নিজের

মতো করেই বেরিয়ে আসার জন্য পা বাড়ান ।

মোখলেছের সাথে কোনো কথা বলার রুচি

বা ইচ্ছে কোনটাই নেই তার ।

 তিনি পা বাড়াতেই মোখলেছ খ্যাঁটখ্যাঁটে

তিরষ্কারের স্বরে বলে ওঠে.....

" কবে যাইবো তোর ঐ মাইয়া ? থাকবো আর কয়দিন ?

এতো কিছুর পরেও আমার এই

বাড়িত আইতে সরম করলো না ? 

অলকা থমকে দাঁড়ালো ।

চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল নিমিষেই ।

ঝট করে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি ।

 কাকড়ি বুড়ি একপাশে আছেন ।

তার মুখ অবয়বে স্পষ্ট বিরক্তি ।

অলকা ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠলেন....

" আপনার সরম করলো না এতো কিছুর পরেও

এই‌ কথা কইতে ? ছিঃ...



মোখলেছ কটমট করে দাঁতে দাঁত পিষলেন ।

অলকার কথা টা বেশ গায়ে লাগলো তার ।

এমনিতেই শ্যামা কে তিনি দু চোক্ষে দেখতে পারেন না ।

তার উপর ওর জন্য গতকাল থেকে এক

প্রকার পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে ।

সংগ্রামের সামনে কিছুতেই পড়তে চান না তিনি ।

এখন সংগ্রাম বাড়িতে নেই ।

একটু দম্ভ খাটাতেই পারেন এখন ।

জমিদারের ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে বলে

কি ঐ মেয়েকে নিয়ে কিছু বলা যাবে না নাকি ?

বলার সুযোগ যেহেতু পেয়েছেন এটা হাতছাড়া করা যায় না ।

মোখলেছ গজগজ করে বললেন....

" যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঐ মাইয়ারে এই বাড়ি থাইকা চইলা

যাইতে কইবি । জমিদারের পোলার লগে বিয়া হইছে তো ,

 কপাল খুলছে না ? আবার ক্যান আইছে এইহানে ? আমার

 বাড়ির অন্ন্য ধ্বংস করতে আইছে দলবল নিয়া ? নাকি

 জমিদার মুখ দেইখা বাড়ি থাইকা বাইর কইরা দিছে ?

 জমিদারের পোলা আবার স্বাদ মিটলে ছাইড়া দিবো না তো ? 



অলকার ঘৃনা লাগলো মোখলেছের কথায় ।

রি রি করে জ্বলে উঠলো গাঁ ।

নাক মুখ কুঁচকে ফেললেন তিনি । ঘৃনিত কন্ঠে বললেন...



" ছিঃ,,,এই আপনি তিন মাইয়ার বাপ ? লজ্জা করে না

 আপনার ? ওরা অন্ন্য ধ্বংস করতে আইছে আপনার , আরে

 ওরা তো নিজেদের অন্ন্যের ব্যবস্থা নিজেরা কইরা লইয়াই

 আইছে । আপনার বাড়ির এক দানা অন্ন্য গেলার রুচি টুকুও

 নাই ওনাগো । নিজে পুরা গেরামে যে বুক ফুলাইয়া ঘুইরা

 বেড়াইতাছেন , কার লাইগা ? বলেন ? এই ভাবে বুক ফুলাইয়া,

মাইনষের সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা আছে আপনার ? গত এক

সপ্তাহ থাইকা কার লাইগা পাইতাছেন এই সম্মান, এই মর্যাদা ? কন ? 

মোখলেছ থতমত খেলো । তৎক্ষণাৎ কথার পরিপ্রেক্ষিতে

বলার মতো ভাষা পেলো না । তবুও নড়লো না নিজ ভাবনা

থেকে । আবারো বললো...



" দেখমু কতো দিন থাকে তোর ঐ মাইয়া ঐ‌ জমিদারের

সংসারে ? 

এবার কাকড়ি বুড়ির উদ্দেশ্য বললো...



" আম্মা, শুনলাম ময়না আইছে । কোই হেয়‌ ? আমার কাছে

আইলো না তো একবারও ? কার লগে আইলো মাইয়াডা ?

ঠিক আছে তো সব ? আওনের পর খাইছে কিছু ? 



অলকা স্থির হলেন । কাতর হয়ে আসলো পুরো শরীর ।

দৃষ্টি কাঁপল । এভাবে যদি শ্যামার বিষয়ে ভাবতো ?

এটা বোধহয় বাস্তব হতে পারতো না কখনো !

অলকা আর কিছু বললেন না ।

বড় বড় কদম ফেলে দ্রুত বেরিয়ে আসলেন ঘর থেকে । 


ময়না কে দেখে শ্যামা বেশ খুশি । ময়না চঞ্চল ছিল সর্বদা ।

 তবে এখন পাল্টেছে অনেক । গায়ের চামড়ায় কালচে কড়া

 পড়েছে । আগের তুলনায় শুকিয়েছে ।


শ্যামা বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো ময়না কে । কেমন যেন খুঁত

 খুঁত লাগছে মনে । আনচান করছে ভেতরটা ।

ময়নার হাবভাব, কথাবার্তা, চেহারা

সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে ।

বিয়ের পর পরিবর্তন আসে , তবে ময়নার পরিবর্তন আলাদা ।

 শ্যামা পুরোনো ঘটনা ঘেঁটে আন্দাজে আঁতকে উঠছে নিজে

 নিজেই । ময়না কে নিয়ে সন্দিহান সে । 


অনেক সময় ধরেই কথার মাঝে ময়নার

চালচলন লক্ষ্য করলো শ্যামা ।

 ওদের গল্পের মাঝেই সংগ্রাম আসলো বাড়িতে ।

শ্যামা উঠে গেলো নিজের ঘরে ।

 সেই বিকেলের পর বেরিয়েছিলো সংগ্রাম ।

তখন থেকে শ্যামার সাথে একটা কথাও বলে নি । 


জমিদারদের রাতের খাবারের সময় হয় নি এখনো ।

তবে শ্যামা দের বাড়িতে সন্ধ্যা হতেই রাতের খাবার

খাওয়া শেষ হয়ে যায় সবার ।

 সবাই খেয়েছে রাতের খাবার ।

শ্যামা খায় নি । সংগ্রাম আসতেই অলকা খাবার বেড়ে

 পাঠিয়েছেন । শ্যামা আগ বাড়িয়ে বলছে না কিছু । অজানা

 আশঙ্কায় ছটফট করছে মনটা । তখন সংগ্রাম ওকে ভুল

 বুঝলো না তো ? সংগ্রামের ভাব ভঙ্গিমা দেখেও কোনো কিছু

 বোঝার উপায় নেই । বরাবরের চোখ মুখ শক্ত তার । তবে

 শ্যামার সামনে শক্ত থাকতে পারে না সে , কোমল হয়ে আসে । 


খাবার বেড়ে সামনে বসে আছে শ্যামা । সংগ্রাম ও কিছু বলছে

 না । অবশেষে শ্যামার নীরবতা দেখে সংগ্রাম নিজেই বলে

 উঠলো....



" কি হলো ‌? খাবে না ? 

" আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেনো ? 

" এইতো বললাম ! এতক্ষণ তো ছিলাম না , কখন কথা বলবো ? 

" আমাকে ভুল বুঝবেন না ,

 আমি ওনার সাথে কথা বলতে চাই নি ।

আমি জানতাম না উনি আসবেন ! 



মাথা নুইয়ে রেখেছে শ্যামা । হাত দুটো কচলা কচলি করছে ।

 সংগ্রাম কপাল কুঁচকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো ।

শান্ত কন্ঠে বললো....



" কে‌ বললো , আমি তোমায় ভুল বুঝেছি ? 



শ্যামা তাকালো । কাঁপা গলায় বললো...



" সেই কখন বেরিয়ে গেছিলেন ,

যাওয়ার আগে একবারও বলে যান নি আমায় ।

কথাও বলেন নি । 


" তাই ভাবলে আমি রেগে গেছি ? 


হ্যাঁ বলতে না পেরে শ্যামা চোখ সরালো ।

সংগ্রাম আবারো বললো...


" আমি জানতাম আফতাব আসবেন । তাই মাঝপথে ফিরে

 এসেছিলাম । চাইলে আটকাতে পারতাম তাকে ,

আটকাই নি । বলেছিলাম না , আমার শ্যামা সুন্দরীর সৌন্দর্য

 যে পুরুষকে আকৃষ্ট করতে পারবে না সে কোনো পুরুষই নয় ।

 আফতাব পুরুষ বটে , তাইতো আবারো এসেছিল আজ । সে

 তোমাকে না দেখেই পছন্দ করেছিল , রাজি হয়েছিল বিয়েতে,

 এটাও জানি । 


শ্যামা অবাক হলো । বিস্ময় স্বরে শুধালো...



" এতো কিছু কিভাবে জানলেন ? 



সংগ্রাম হাসলো । শ্যামার কপালের পাশের চুল গুলো

আলতো স্পর্শে কানের পাশে গুজে দিয়ে বললো....



" শোনো বেগম , আমি সংগ্রাম জোয়ার্দার ! তুমি নিজেকে গত

 ঊনিশ বছরে যতটা চেনোনি , এই কদিনে আমার জীবনে

 আসার পর তোমায় তার থেকেও অধিক বেশি ভালো করে

 চিনে ফেলেছি আমি । তোমার জীবনের এক একটা মুহূর্ত

 সম্পর্কে জানি আমি ।



শ্যামার অনুভূতি এই সময় কি হওয়া উচিত বুঝলো না সে ।

 ভাবনায় ডুবলো সে । সংগ্রাম ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে ডাকলো....



" কি হলো বেগম ? খাবে না ? ক্ষিদে পেয়েছে আমার ! 

" হুম ? খেয়ে নিন । 



" আজ না হয় তুমি খাইয়ে দাও । আমার হাতে তো খেয়েছো !

 আজ তোমার হাতে খাবো আমি । নিজের এমন একটা বেগম

 থাকলে নিজের হাতে খেতে আলসেমি তো লাগবেই ! 



বলেই ঠোঁট কামড়ে ভ্রু নাচালো । মুচকি হাসলো শ্যামা ।

মাঝে মাঝে কেমন ঘোর লাগে ।

এমনটা কি সত্যিই ওর জীবনে হচ্ছে ?

ঘটছে এমন ঘটনা ? নাকি সব ভ্রম ?

এখনো ভ্রম মনে হয় এসব কিছু ।

মনে হয় কোন এক খড়া পড়া সকালে ঘুম ভাঙ্গলে স্বপ্ন

শেষ হয়ে গেলে সব শেষ ।

আর থাকবে না । 

খাওয়ার পালা চুকিয়ে এবার ঘুমোনোর পালা । সংগ্রামের বুকে

 মাথা রেখে শুয়ে আছে শ্যামা । সংগ্রামের বক্ষ স্পন্দন স্পষ্ট

 কর্ণ কুহরে পৌঁছাচ্ছে । ঢিপঢিপ করে শব্দ হচ্ছে । শ্যামার এক

 হাত ধরে সেই তখন থেকে উল্টে পাল্টে দেখছে সংগ্রাম ।

 দু'জনেই নীরব । হারিকেনের আলো পুরোপুরি নেভায় নি ।

 আবছা আলো জ্বলছে ঘরে । ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে ঘরের

 পিছনে । শ্যামা নীরবে অনুভব করছে সংগ্রামের গায়ের

 পুরুষালি ঘ্রান । আম্মার শরীরের ঘ্রাণের পর এই ঘ্রাণটাই মন

 মাতিয়ে দেয় শ্যামার । তবে এটা আলাদা । অদ্ভুত এক মাদকতা

 আছে এই ঘ্রাণে । শ্যামা চোখ বুজে অনুভব করছে । ঘুম ধরা

 দিচ্ছে চোখে । সংগ্রাম ভাবছে কি যেনো । ভাবতে ভাবতে

 ভাবনার সমাপ্তি ঘটিয়ে শ্যামার হাতের উল্টো পিঠে একটা চুমু

 খেলো শব্দ করে ।

কাঁচা ঘুমের ঘোরেই আলতো হাসলো শ্যামা ।

সংগ্রাম ডাকলো...

" বেগম ,,

ঘুমের ঘোরে উত্তর করলো শ্যামা...

" হুম ! 

" কাল কিন্তু চলে যাবো আমরা ! তৈরি থেকো !

শ্যামা শোনা মাত্রই সবেগে চোখ খুললো ।

 ঘুমে আচ্ছন্ন চোখ দুটো অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে বড় বড় করে

 তাকালো । সংগ্রাম চোখে পলক ফেলে বলল....

" কাল বিকেলের দিকে চলে যাবো । 

শ্যামা উদ্বিগ্ন স্বরে বলল....

" কাল কেনো ? আর কটা দিন থাকি ! 

" থাকলে তো ! নিজের বাড়িতে ফিরতে হবে না ? কাল যাবো ,

 আবার তো নিয়ে আসবো পরে ! তৈরি থেকো আর বালা কেও

জানিয়ে দিও !



শ্যামার মনটা ভার হয়ে আসলো আবারো ।

তবে প্রকাশ করলো না । 


জমিদার বাড়ি এই দুদিন শান্ত ছিল । বাড়িতে এমনিতেই হাতে

 গোনা কয়েকটা মানুষ । এই কজনের মধ্যে আবার তিন জন

 নেই দুদিন ধরে । সালেহা বেশ বিরক্ত সংগ্রামের উপর । ক্ষনে

 ক্ষনে তার বিরক্তি আর ক্ষিপ্ততার মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য

 লতিফা সবসময় সজাগ । সালেহার কানে যথাসম্ভব বিষ

 ঢেলেছেন এই দুদিনে । শ্যামা যে ফিরবে এটা তারা নিশ্চিত ।

 সালেহা অত্যন্ত রাগি আর জেদি স্বভাবের । 


লতিফ জোয়ার্দার তাকে কোনো ভাবে বোঝানোর বৃথা চেষ্টা

 করেন নি । কেননা তার বোঝানোর মাধ্যমে সালেহার চিন্তার

 পরিবর্তন আসবে না । সালেহা একরোখা । 


শ্যামা দের বাড়ি থেকে জমিদার বাড়িতে আসতে আসতে

 বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে । আঁধার নামছে কেবল ।

পুরো রাস্তায় নীরবে চোখের পানি ফেলেছে শ্যামা । আসার

 সময় আম্মা আপা কারোর চোখের দিকে তাকাতে পারে নি ।

 অলকা দুঃখে কাঁদেন নি মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় । বরং

 প্রশান্তিতে চোখের কোনে অশ্রু জমেছিল তার । আহাদ জিপ

 চালাচ্ছে । ওর পাশে বসে আছে সংগ্রাম । মুহূর্তে মুহূর্তে পিছন

 ফিরছে বারবার । শ্যামা বালার হাত ধরে বসে আছে । মাথায়

 ঘোমটা টানা কপাল পর্যন্ত । চোখ দুটো ফোলা ফোলা । 

তিন গ্রাম পেরিয়ে জমিদার গ্রামে এসে পৌঁছায় গাড়ি । বিশাল

 লোহার গেট মুহুর্তেই খুলে দেওয়া হয় গাড়ির শব্দে ।


গাড়ি ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলে সংগ্রাম নেমে পড়ে প্রথমে ।

 পিছনে দু-কদম পিছিয়ে গাড়ি থেকে নামার জন্য হাত বাড়িয়ে

 দেয় শ্যামার উদ্দেশ্যে ‌। বেখেয়ালে হওয়ায় লক্ষ্য করে নি শ্যামা

 । বালা এক পলক তাকায় বাড়ানো হাতের দিকে । বুকের

 ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠে , হুঁ হুঁ করে জেঁকে ওঠে পুরনো

 দগ্ধা ব্যাথা গুলো । এই দুদিন তো ভুলে ছিলো সবকিছু ।

 আপন খেয়ালে ছিল । সংগ্রাম বালার চাহনি দেখে হাত বাড়িয়ে

 ইশারা করে স্বাভাবিক ভাবেই বললো...



" তুই আগে নেমে আয় । 



বালার সম্বিত ফিরতেই হাত থেকে চোখ সরালো । আড়াল

 করলো চক্ষু দ্বয় । সংগ্রামের বাড়ানো হাত উপেক্ষা করে নিজে

 থেকে গাড়ি থেকে নামলো । কোনো দিকে না তাকিয়ে অতি

 সন্তর্পণে পা বাড়ালো বাড়ির ভেতরে । সংগ্রাম উপেক্ষা বুঝে

 কপাল কুঁচকে তাকালো । বালা বড় বড় কদম ফেলে অন্দরে

 প্রবেশ করেছে ইতিমধ্যে । ভেতরে ঢুকেই সদর দরজা থেকে

 সরে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকালো । মাথা উঁচু করে চোখ বুজে

 শ্বাস টানলো । একটা মানুষ কে ভোলা কি এতোটাই সোজা ?

 দূরে গেলে না হয় মানা যায় ! কিন্তু যাকে প্রতিটা মুহূর্ত নিজের

 চোখের সামনে দেখতে হচ্ছে , তাও আবার অন্যকারোর সাথে,

 তাকে ভোলা যায় কি করে ? বালা তো ভুলে যেতে চায় সবকিছু

 , কারন মনে রাখার মতো কোনো অস্তিত্ব নেই । কিন্তু ভুলে

 যাওয়াও তো সোজা নয় , ভুলে যাওয়া যদি এতোই সোজা হয়

 তাহলে চোখ পানি ঝড়াতো না ‌। বালা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বিড়বিড়

 করলো...



" আপনার হাতটা যদি আমার হতো, তাহলে ধরতাম । যেখানে

 আপনি আমার হলেন না সেখানে এই ক্ষীয় কালের জন্য

 আপনার হাত ধরে লাভ কি ? স্বার্থ থাকলে ধরলে সারা

 জীবনের জন্য ধরতাম । 

আবারো দীর্ঘ শ্বাস ফেললো বালা । অন্দরে কেউ নেই । এখনি

 সবাই নিচে আসবে হয়তো ‌। এই ফাঁকে বালা কারো নজরে

 পড়ার আগে সবার চোখ চুরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো দ্রুত

 পায়ে । দুদিন পর নিজের ঘরে এসে বুক ভরে শ্বাস টানলো ।

 পুরো ঘরের প্রিয় জিনিস গুলোতে হাত ছোঁয়ালো একবার করে

 । টেবিলের সামনে চেয়ারটা টেনে বসলো । মোটা খাতাটা টেনে

 বের করলো বইয়ের ভাঁজ থেকে । যেটাতে আবদ্ধ আছে ওর

 হাজারো দিনলিপি । যেগুলোর সূচনা হয়েছিল সংগ্রাম

 জোয়ার্দার কে ঘিরে । প্রত্যেক টা পৃষ্ঠা উল্টানোর মাঝে মাঝে

 বালা তাচ্ছিল্য হাসলো । এগুলো শুধু খাতার সাদা পৃষ্ঠায়

 কালো কালি হয়ে আবদ্ধ হয়ে রইলো , বাস্তবে আর হলো কোই

 ? কালি ভরা পৃষ্ঠা শেষ । শেষে আর কয়েকটা ফাঁকা সাদা পৃষ্ঠা

 আছে । যেগুলোতে এখনো লেখা বাকি ! আরো কোন ঘটনা

 ঘটলে হয়তো এগুলো ফাঁকা থাকতো না । দুটো পৃষ্ঠা আছে

 বোধহয় । এগুলো ফাঁকা রাখলে বালার স্বপ্নেও অপূর্ণতা

 আসবে । বাস্তবে আসে আসুক । খাতার পৃষ্ঠা গুলোকে অন্তত

 সাক্ষী রাখা যায় ওর অসমাপ্ত অনুভূতি সম্পর্কে । বালা

 অনুভুতি হীন হাসলো । কলম হাতে লিখতে আড়ম্ভ করলো....



" আচ্ছা সংগ্রাম ভাই , আপনাকে পেয়ে গেলে কি খুব বেশি

 ক্ষতি হতো ? ওও..হাসি পেলো লিখতে গিয়ে, এটা বোধহয়

 আমার খাতার প্রথম পৃষ্ঠা , যেখানে আপনাকে ভাই বলে

 সম্বোধন করলাম । বাদ দিন , আচ্ছা আমায় বলুন তো - আমি

 ভুলবো কি করে আপনায় ? অনেক কিছুই তো শিখলাম এই

 কদিনে , কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনাকে ভোলার উপায় টা

 পেলাম না । শিখলাম না আপনাকে ভুলতে । সবকিছু বদলেছে,

 শুধু অভ্যাসটা বদলায় নি ,, আপনাকে মনে রাখার অভ্যাসটা ।

 সময় অনেক কিছুই শেখায় , কিন্তু মনের বিপরীতে গিয়ে মনের

মানুষকে ভুলে যেতে শেখায় না । আমিও পারলাম না মনের

বিপরীতে যেতে ! মানুষ হয়তো পারে , তাই না ? আপনিই তো

পারলেন । এইতো ভুলে গেলেন আমায় । আমি কি একটুও

ছিলাম না আপনার জীবনে ? এতো বছরে একটুও অনুভূতি

জাগে নি আমায় নিয়ে ? জাগে নি হয়তো , জাগলে হয়তো

আজ অনেক কিছুই বিপরীতে মোড় নিতো । আমি কিন্তু আর

কাঁদবো না , এই বলে ভাববেন না ভুলে যাবো আপনায় । ভুলে

যেতে পারি নি,আর পারবোও না । তাই ঠিক করলাম , আপনার

স্মৃতি গুলোকে সাজিয়ে রাখবো মনের আলমারিতে । ঠিক এই

খাতাটার মতোই । একটাই চাওয়া,, আপনাকে ঘেরা এই স্মৃতি

গুলো যেন শান্ত থাকে , অপ্রাপ্তি হলেও যেনো এগুলো আমাকে

আর কষ্ট না দেয় । অন্তত ভুলে যাওয়ার চেয়ে স্মৃতি নিয়ে

বাঁচাটা কম কষ্টের । 


কাঁদবো না কেনো বললাম ? কাঁদবো না তো এই জন্য , কারন

বুঝে গেছি , কাঁদলেই সবকিছু পাওয়া যায় না । কি অদ্ভুত না ,

মানুষ তার জন্যই কাঁদে , যে তাকে কাঁদিয়েছে । দেখুন কিছুই

বদলাবে না আর , কেঁদে কি লাভ ? সময় সব ভুলিয়ে না দিলেও

আমার কান্না থামিয়ে দিয়েছে ।



লিখে খাতাটা বন্ধ করলো । শেষের পৃষ্ঠায় আর কিছু লেখার

আগ্রহ জাগলো না । সেটা রেখে দিলো অন্য কোন দিন লেখার

জন্য । বন্ধ খাতাটা গোপন করে মোটা মোটা বইয়ের আড়ালে

লুকিয়ে রাখলো সন্তর্পণে । 



সংগ্রাম'রা এসেছে অনেকক্ষণ হলো । শ্যামার মন খারাপ লক্ষ্য

করে শবনম কথা বলে সময় পার করছে ওর‌ সাথে । আবারো

বেরিয়েছে সংগ্রাম । আতিয়া বেগম দুদিন পর নাত বৌ কে

কাছে পেয়ে বেশ খুশি । সৈকত কে নিয়ে অনেকক্ষণ যাবত

শ্যামার ঘরে ছিল শবনম । সৈকত ঘুমিয়েছে এখন । সংগ্রামের

আসার নাম নেই । শ্যামা শবনমের অবস্থা বুঝে ওকে ঘরে যেতে

বললো । শবনম ও কথা না বাড়িয়ে ঘুমন্ত ছেলে কে নিয়ে ঘরে

চলে গেছে । শ্যামা কাপড় ছেড়ে অপেক্ষা করলো কিছুক্ষণ ।

বসে না থেকে এবার বেরোলো ঘর থেকে । এসেছে থেকে আর

বালার সাথে দেখা হয় নি । এখন ঘরে একা একা বসে না থেকে

ওর সাথে সময় কাটালে মন্দ হয় না । সংগ্রামের ঘরটা একদম

সিঁড়ির সামনে । পুরো জমিদার বাড়িটা এখনো পরিচিত নয়

শ্যামার কাছে । দোতলার এই কয়েকটা ঘর ব্যতীত অন্য

কোথাও এখনো পা রাখে নি শ্যামা । তাই নখদর্পণে আসার

কথাও নয় । দোতলায় একাধিক ঘর । এর মধ্যে বেশির ভাগ

ঘরই বন্ধ । মানুষ কম হওয়ায় পরে আছে সেগুলো । ঘর আছে

তবে থাকার মানুষ নেই । তালা বদ্ধ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে

আছে সেগুলো । প্রতি সপ্তাহে প্রত্যেকটা ঘর পরিষ্কার করানো

হয় । 


সংগ্রামের ঘর থেকে ডান দিকে তিনটে ঘর পেরিয়ে বালার ঘর ।

এই তিনটে ঘরের মধ্যে একটা তে আতিয়া বেগম থাকেন । বাকি

দুটো তালা বদ্ধ । তারপর বালার ঘর । বালার ঘরের পাশের

ঘরটায় লতিফা থাকেন । 


জমিদার বাড়ি বরাবরের মতোই আলোকিত । শ্যামা নিজের ঘর

থেকে বেরিয়ে দরজা চাপিয়ে দিলো । নিঃশব্দে পা বাড়ালো

বালার ঘরের দিকে । আতিয়া বেগমের ঘরের সামনে গিয়ে

একবার দাঁড়ালো । কি ভেবে যেন একটু ধাক্কা দিলো দরজায় ,

ভেতর থেকে লাগানো হয়তো । তাই খুললো না । শ্যামা পিছিয়ে

আসলো । এক কদম পা বাড়াতেই যেন মনে হলো পিছন থেকে

দৌড়ে সরে গেলো কেউ । দমকা হাওয়া লাগলো একটা । শ্যামা

চমকে ঝট করে তাকালো পিছনে । এক মুহুর্তে আঁতকে উঠলো

ওর ভীতু নারী সত্ত্বা । পিছনে তো কেউ নেই , শ্যামা চঞ্চল চোখ

ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকালো । না , কেও নেই । তাহলে মনে

হলো কেনো যে কেউ দৌড়ে সরে গেলো । হয়তো মনের ভুল ।

শ্যামা গলা শুকিয়ে এসেছিলো মুহূর্তেই । কাউকে না দেখে

শ্যামা তৃপ্ত শ্বাস ফেললো ।

 আবারো ঘুরলো বালার ঘরের দিকে । 


কিন্তু এবারও এক কদম বাড়াতেই মনে হলো আবারো কেউ

পিছন থেকে দৌড়ে এক দিক থেকে অন্য দিকে সরে গেল ।

সেই আগের মতোই । ভয়ে আবারো আঁতকে উঠলো শ্যামা ।

এবারও কেউ নেই । পুরো করিডোর ফাঁকা । উজ্জ্বল আলোয়

স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে চারপাশ । তবে আশপাশটা নিস্তব্ধ । যে

যার ঘরে আছে এই মুহূর্তে । শ্যামার ভয় বাড়লো এবার ।

কপালের পাশে ঘাম জমেছে বিন্দু বিন্দু । এখানে যে কেউ

ছিলো শ্যামা পুরোপুরি নিশ্চিত । দু-দুবার তো আর মনের ভুল

হতে পারে না । শ্যামার কাছে কেমন সন্দেহ জনক গুমোট

লাগছে চারদিক । মনে হচ্ছে কেউ আছে ওর আশেপাশে । গলা

শুকিয়ে আসছে শ্যামার । হাত পা শিরশির করছে । শ্যামা

সবকিছু ঝেড়ে আর পিছন ফিরলো না । বালার ঘরে না গিয়ে

দ্রুত পা চালালো নিজের ঘরের দিকে । এবার মনে হলো কেউ

পিছু পিছু হাঁটছে শ্যামার । বক্ষ স্পন্দন বাড়ছে শ্যামার । পা

দুটো চালানোর চেষ্টা করছে দ্রুত গতিতে , তবে মনে হচ্ছে পা

দুটো যেন আটকে আছে এক জায়গায় । এই কয়েক মুহূর্তেই

চারদিক কেমন গোলক ধাঁধার মতো লাগছে । শ্যামা কে

মাঝখানে রেখে দুদিকের দেয়াল যেন ঠেসে ধরতে আসছে

ওকে ।


ধুপধাপ কারোর পায়ের শব্দে এবার জোরে

ছুট লাগালো শ্যামা ।
নিঃশ্বাস আটকে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঘরের দরজার কাছে

গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল । শক্ত মার্বেল পাথরের মেঝেতে পড়ে

ব্যথায় কুকিয়ে উঠলো মৃদু স্বরে । এমন সময় সংগ্রামের উদ্বিগ্ন

কন্ঠের ডাক ভেসে আসলো....



" শ্যামা...



পড়া অবস্থায় চোখ তুললো শ্যামা । সংগ্রাম এগিয়ে এসে

একটানে তুললো ওকে । চোখে মুখে ঘাম জমেছে শ্যামার ।

আতঙ্কের রেশ স্পষ্ট লক্ষনীয় । শ্যামা কে এমতাবস্থায় দেখে

সংগ্রাম দুহাতের আজলে ওর মুখ আগলে নিলো । উত্তেজিত

কন্ঠে বলল...



" কি হয়েছে বেগম ? এমন অবস্থা কেনো তোমার ? পড়ে গেলে

কি করে ? 



সামনে বাস্তবে সংগ্রাম আছে এটা বোধগম্য হতেই শ্যামা দুহাতে

জাপটে ধরলো সংগ্রামের গলা । গলায় মুখ গুজে ফুঁপিয়ে

উঠলো । কাঁপা স্বরে বলল....


" এ..এখানে, এখানে কেউ ছিলো ! কেউ ছিল এখানে । 

শ্যামা কে এভাবে দেখে বিস্মিত হলো সংগ্রাম । শ্যামা কে শক্ত

করে জড়িয়ে বললো...

" কি হয়েছে আগে বলো আমায় ? তাকাও আমার দিকে !

বেগম, দেখো.. কি হয়েছে ? 


শ্যামা আলগা হলো । চোরা চোখে ভীত নয়নে এদিক ওদিক

দেখলো । সংগ্রামের পাঞ্জাবি আঁকড়ে ধরে বললো....

" এখানে আমি কারো পায়ের শব্দ শুনলাম । কেউ ছিল এখানে । 

সংগ্রাম আশ্বাস জোগালো....

" আমি তো নিচ থেকে আসলাম । হয়তো আমার পায়ের শব্দ পেয়েছো তুমি ।

নাকোঁচ করলো শ্যামা । মাথা ঝাঁকিয়ে বললো…

" না , কেও ছিলো এখানে । আপনি আসার আগেও আমি

কারোর উপস্থিতি টের পেয়েছি । মনে হলো কেউ দৌড়ে

পালালো এখান থেকে । 



সংগ্রাম কপাল কুঁচকালো । কড়া পাহারা পেরিয়ে বাইরের কেউ

অন্দরে প্রবেশ করতে পারবে না । সংগ্রাম সন্দিহান হয়েও

কোমল কন্ঠে বলল...



" কেউ থাকলে তো তাকে দেখতে পেতে । কেউ নেই এখানে ।

কেউ থাকলেই বা কি । আমি এসেছি তো । ঘরে চলো...



সংগ্রামের বাহু আঁকড়ে ঘরে ঢুকলো শ্যামা । বুকটা এখনো

ঢিপঢিপ করছে ভয়ে । শ্যামা কে একহাতে জড়িয়ে রেখে দরজা

আটকে দিল সংগ্রাম । দরজা আটকানোর কয়েক মুহূর্ত পর

ছায়া মতো কিছু একটা সরে গেলো দরজার পাশ থেকে । যেটা

কারোর নজরে আসলো না । 


শ্যামা কে বসিয়ে সংগ্রাম নরম চোখে চেয়ে মৃদু স্বরে বলল....


" বাইরে গেছিলে কেনো ? 



শ্যামা সোজাসুজি উত্তর করলো....



" বালার ঘরে যেতে চেয়েছিলাম । কিন্তু বিশ্বাস করুন , ওখানে

অন্য কেউ ছিল । আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি । 



সংগ্রাম সরু চোখে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । বোঝার চেষ্টা

করলো । অতঃপর শ্যামা কে আর কিছু বলতে দিলো না ।

দরজা খুলে পুরো করিডোর চক্কর কাটলো একবার । ঘুরে ঘুরে

দেখলো আশপাশ টা । আবারো ঘরে আসলো । শ্যামা গুটিয়ে

আছে । এখন স্বস্তি লাগছে একটু । ভয় কেটেছে । সংগ্রাম পাশে

বসে বললো...



" বাইরে কেউ নেই বেগম । মনের ভুল হয়তো তোমার ।

এমনিতেও বাইরের কেউ অন্দরে প্রবেশ করতে পারবে না

কখনো । 


তাই ভয় পেও না । ভয় পেয়েছিলে খুব ? এখনো ভয় লাগছে ?



শ্যামা মাথা নাড়ালো । মোলায়েম কন্ঠে বলল...



" আপনি সাথে থাকলে একটু ও ভয় করে না আমার ! 



সংগ্রাম এক চিলতে হাসলো । শীতল কন্ঠে বলল…



" আমি সবসময় এভাবেই সাথে থাকবো তোমার । ভয় পাওয়ার

কোন কারণ নেই । ভয়‌ ডর, বিপদ আপদ কোনো কিছু ছুঁতেও

পারবে না তোমায় ! 




সকালের রান্নায় সাহায্য করেছে শ্যামা । ফজরের পর উঠে

আর ঘুমোনোর অভ্যাস নেই । নিচে নেমে দেখে রান্নার যোগান

দিচ্ছে গৃহকর্মীরা । শ্যামাও লেগে পড়ে তাদের সাথে । বাঁধা

দিলেও শোনে নি । সমস্ত খাবারের পদ রান্নায় হাত লাগিয়েছে ।‌

খাবারেরসময় হতেই নিজে সমস্ত খাবার গুছিয়ে রেখেছে

টেবিলের উপর ।


সকালের খাবার খেতে বসেছে সবাই । লতিফ জোয়ার্দার

আছেন সবার মাঝে । বাড়ির সবাই উপস্থিত । শ্যামা অতি

উৎসুক হয়ে হাসি মুখে খাবার বেড়ে দিলো সবার পাতে । চোখে

মুখে একরাশ আনন্দ ওর । সালেহা কে বেড়ে দেওয়ার সময়

একবার চোখাচোখি হয়েছিল তার সাথে । সালেহার চোখে মুখে

কেমন অদ্ভুত স্থিরতা । অন্যসময় চোখ মুখ শক্ত থাকে শ্যামার

সামনে । চোখ তুলেও তাকান না পর্যন্ত । তবে আজ বেশ

কয়েকবার তাকিয়েছেন । শ্যামা সবাইকে খাবার বেড়ে দিয়ে

সংগ্রামের পাশে দাঁড়ালো । শ্যামা আর শবনম বাদে সবাই

বসেছে । শবনম ও দাঁড়িয়ে আছে নিজের স্বামীর পাশে । 

সবাই এক লোকমা মুখে তুলেই থমকে গেল । মুখ ভঙ্গিমায়

বদল আসলো সবার । তিক্ততায় ভারী গোঁফের আড়ালে লতিফ

জোয়ার্দারের মুখ বিকৃত হয়ে আসলো । মুখে খাবার রেখেই

সংগ্রাম তৎক্ষণাৎ তাকালো শ্যামার দিকে । শ্যামা বুঝে উঠতে

পারলো না হঠাৎ এমন চাহনির মানে । সালেহা আর লতিফা

একই সাথে খাবারের প্লেট ঝটকা মেরে ঠেলে সরিয়ে দিলেন ।

অন্যান্য বাসনের সাথে টোকা লেগে শব্দ হলো বিকট । শ্যামা

চমকে উঠলো । সালেহা আর লতিফা দাঁড়িয়ে গিয়ে থুঁ থু করে

ফেলে দিলেন মুখের খাবার টুকু । চোখ টাটিয়ে কটাক্ষ করে

গর্জে উঠলেন সালেহা....



" এমন অখাদ্য রান্না কে করেছে আজ ? 

শ্যামা থম মেরে দাঁড়িয়েই চমকে উঠলো । দৃষ্টি অবুঝের মতো ।

অবুঝের মতোই সাদাসিধে ভাবে প্রশ্ন করলো...


" কেনো আম্মা ? কি হয়েছে ? ভালো হয় নি রান্না ?



সালেহা চোখ পাকিয়ে তাকালেন । তিরষ্কারের সুরে বললেন....



" তুই হাত লাগিয়েছিস রান্নায় ? তাই তো ভাবি, আজ পর্যন্ত

জমিদার বাড়িতে এমনটা হয়েছে কখনো ? এমন নুনে পোড়া

রান্না কেউ খেয়েছে ? নিজের মনের সমস্ত বিষ

ঢেলেছিস রান্নায় ? 

শ্যামার রান্নার কথা শুনে লতিফ জোয়ার্দারের শক্ত মুখশ্রী

কোমল হলো । সালেহা কে উদ্দেশ্য করে শান্ত নিজামী স্বরে

বললেন....



" আহ্ সালেহা , কি বলছো না বলছো ? মাথা ঠিক আছে

তোমার ? 



লতিফা ফোড়ন কাটল....



" ভাবি তো ঠিকি বলতেছে ভাইজান । আমাদের রান্নার

লোকেরা তো সারাজীবন রান্না করে আসছে , এমনটা হয়েছে

কখনো ? এই মেয়ে আজই হাত লাগিয়েছে, আর আজই

এমনটা হতে হলো ! প্রত্যেক টা রান্নাই নুনে পোড়া । কুকুর

জানোয়ারের মুখেও রুচবে না । 


এই মেয়ে বাপের জন্মে দেখেছিস এমন পদের রান্না ?

খেয়েছিস কখনো, যে স্বাদ বুঝবি ! যেমন চেহারা তেমন

বিদঘুটে হাত, এই হাতের রান্না আর কতো ভালো হবে ?



সংগ্রামের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো এহেন কথায় । টেবিলের

আড়ালে হাত মুঠো করে নিলো সে । লতিফ জোয়ার্দার

লতিফার কথায় বিরক্তিতে নাক মুখ সাংঘাতিক কুঁচকে

ফেললেন । এমন আজগুবি কথার কোনো মানে নেই । শ্যামা

এখনো অবুঝের ন্যায় বললো...



" আমি তো খাবারে পরিমাণ মতোই সবকিছু দিয়েছিলাম । নুন

ও তো ঠিক ছিল সব কিছুতে । আমি নিজেই খেয়ে দেখেছি । 

সালেহা কটমট করে উঠলেন...

" তো আমরা কি মিথ্যে বলছি তোকে ।

খাবারে নুন ঠিক আছে।

দাঁড়া দেখাচ্ছি...



কথাটা বলেই গরম তরকারির ছোট বাটিটা হাতে তুলে নিলো

সালেহা । গটগট পায়ে এগিয়ে গিয়ে থামলো শ্যামার সামনে ।

শ্যামার নরম চোয়াল শক্ত হাতে চেপে ধরলো । বাটিটা মুখে

লাগানোর আগেই শ্যামার হাতে হ্যাঁচকা টান দিয়ে শ্যামা কে

সালেহার সামনে থেকে নিজের কাছে টেনে নিলো সংগ্রাম ।

এতক্ষণ বসে থাকা সবাই দাঁড়িয়ে গেল হুট করে । সংগ্রামের

চোখ মুখে রাগ ঠিকরে পড়ছে । আম্মার সামনে যথাসম্ভব

সংযত করলো নিজেকে । ভারী গলায় বলল...



" খাবারে নুন হয়েছে, খেতে হবে না কাউকে । তবুও আমার স্ত্রী

কে কথা শোনানোর অধিকার কারোর নেই । ওকে ছোঁয়া তো

দূরের কথা । 



" তোর বউকে কথা শোনাচ্ছি না , ভুল ধরিয়ে দিচ্ছি । নুনে

পোড়া রান্না করেছে , এতো গুলো খাবার নষ্ট হলো । কি হবে

এখন এগুলোর । 



লতিফার কথায় সংগ্রামের কপালে ভাঁজ পড়লো । আবারো

কিছু বলার আগেই শ্যামা বলে উঠলো....



" কিন্তু আমি তো নুন একদম পরিমাণ মতো দিয়েছিলাম,

বিশ্বাস করুন । সবাই দেখেছে ,এমনকি আমি নিজেও চেখে

দেখেছি । 



সালেহা হুংকার দিলেন....



" চুপ কর অপয়া মেয়ে । সকাল সকাল সবার রুচি নষ্ট করে

দিলি তো । কে বলেছিল তোকে রান্না ঘরে ঢুকতে , বাড়িতে

থাকতে দিয়েছি এতে শান্তি হয় নি । সবার শান্তি নষ্ট করছিস

এখন । কে খাবে এখন এতো গুলো খাবার ? 



শ্যামা দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝানোর উদ্দেশ্যে কিছু বলতে

উদ্যত হলো । তবে বলতে পারলো না । লতিফ জোয়ার্দার বলে

উঠলেন...



" চুপ করো সবাই । একটা ছোট্ট তিলকে তাল করা বন্ধ করো ।

শ্যামা মা তুমি আর কিচ্ছু বলবে না । রান্না খারাপ হতেই পারে ,

সব নষ্ট হোক তাতে কিছু যায় আসে না আমার । পুনরায় রান্না

করা হোক, তারপর খাবে সবাই । এখন যাও এখান থেকে । 



সালেহা আর লতিফা এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে মুখ ঝামটা

দিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন । ইচ্ছে ছিলো শ্যামা কে আরো কথা

শোনানোর । কিন্তু পারলো না । 


চলবে......


 

 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×