![]() |
লেখিকা: সুরভী আক্তার পর্ব :১৯ -------------------------সন্ধ্যা গড়িয়েছে । সংগ্রাম আবারো বেরিয়েছে আহাদের সাথে । মোখলেছ বাড়ি ফিরেছেন আঁধার হতেই । শ্যামা, বালা, রুপা নিজেদের ঘরেই আছে । ময়নাও আছে । সে থাকবে কিছুদিন । বিয়ের পর তো আর এসে থাকা হয় নি তেমন । মোখলেছ ফিরে নিজের মতো করেই গোসল সেরে কাকড়ি বুড়ির ঘরে ঢুকেছে । গলা খাঁকারি দিয়ে একবার বার্তা পাঠিয়ে জানান দিয়েছে নিজের বাড়ি ফেরার কথা । অলকা মেয়েদের পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন । তার ঘরেই আছে সবাই । তিনি বেরিয়ে এসে খাবার বেড়ে কাকড়ি বুড়ির ঘরে নিয়ে আসেন । মোখলেছ একবার চোখ তুলে তাকান তার দিকে । অলকা কথা না বলে খাবারের প্লেট রেখে নিজের মতো করেই বেরিয়ে আসার জন্য পা বাড়ান । মোখলেছের সাথে কোনো কথা বলার রুচি বা ইচ্ছে কোনটাই নেই তার । তিনি পা বাড়াতেই মোখলেছ খ্যাঁটখ্যাঁটে তিরষ্কারের স্বরে বলে ওঠে..... " কবে যাইবো তোর ঐ মাইয়া ? থাকবো আর কয়দিন ? এতো কিছুর পরেও আমার এই বাড়িত আইতে সরম করলো না ? অলকা থমকে দাঁড়ালো । চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল নিমিষেই । ঝট করে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি । কাকড়ি বুড়ি একপাশে আছেন । তার মুখ অবয়বে স্পষ্ট বিরক্তি । অলকা ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠলেন.... " আপনার সরম করলো না এতো কিছুর পরেও এই কথা কইতে ? ছিঃ... মোখলেছ কটমট করে দাঁতে দাঁত পিষলেন । অলকার কথা টা বেশ গায়ে লাগলো তার । এমনিতেই শ্যামা কে তিনি দু চোক্ষে দেখতে পারেন না । তার উপর ওর জন্য গতকাল থেকে এক প্রকার পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে । সংগ্রামের সামনে কিছুতেই পড়তে চান না তিনি । এখন সংগ্রাম বাড়িতে নেই । একটু দম্ভ খাটাতেই পারেন এখন । জমিদারের ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে বলে কি ঐ মেয়েকে নিয়ে কিছু বলা যাবে না নাকি ? বলার সুযোগ যেহেতু পেয়েছেন এটা হাতছাড়া করা যায় না । মোখলেছ গজগজ করে বললেন.... " যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঐ মাইয়ারে এই বাড়ি থাইকা চইলা যাইতে কইবি । জমিদারের পোলার লগে বিয়া হইছে তো , কপাল খুলছে না ? আবার ক্যান আইছে এইহানে ? আমার বাড়ির অন্ন্য ধ্বংস করতে আইছে দলবল নিয়া ? নাকি জমিদার মুখ দেইখা বাড়ি থাইকা বাইর কইরা দিছে ? জমিদারের পোলা আবার স্বাদ মিটলে ছাইড়া দিবো না তো ? অলকার ঘৃনা লাগলো মোখলেছের কথায় । রি রি করে জ্বলে উঠলো গাঁ । নাক মুখ কুঁচকে ফেললেন তিনি । ঘৃনিত কন্ঠে বললেন... " ছিঃ,,,এই আপনি তিন মাইয়ার বাপ ? লজ্জা করে না আপনার ? ওরা অন্ন্য ধ্বংস করতে আইছে আপনার , আরে ওরা তো নিজেদের অন্ন্যের ব্যবস্থা নিজেরা কইরা লইয়াই আইছে । আপনার বাড়ির এক দানা অন্ন্য গেলার রুচি টুকুও নাই ওনাগো । নিজে পুরা গেরামে যে বুক ফুলাইয়া ঘুইরা বেড়াইতাছেন , কার লাইগা ? বলেন ? এই ভাবে বুক ফুলাইয়া, মাইনষের সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা আছে আপনার ? গত এক সপ্তাহ থাইকা কার লাইগা পাইতাছেন এই সম্মান, এই মর্যাদা ? কন ? মোখলেছ থতমত খেলো । তৎক্ষণাৎ কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলার মতো ভাষা পেলো না । তবুও নড়লো না নিজ ভাবনা থেকে । আবারো বললো... " দেখমু কতো দিন থাকে তোর ঐ মাইয়া ঐ জমিদারের সংসারে ? এবার কাকড়ি বুড়ির উদ্দেশ্য বললো... " আম্মা, শুনলাম ময়না আইছে । কোই হেয় ? আমার কাছে আইলো না তো একবারও ? কার লগে আইলো মাইয়াডা ? ঠিক আছে তো সব ? আওনের পর খাইছে কিছু ? অলকা স্থির হলেন । কাতর হয়ে আসলো পুরো শরীর । দৃষ্টি কাঁপল । এভাবে যদি শ্যামার বিষয়ে ভাবতো ? এটা বোধহয় বাস্তব হতে পারতো না কখনো ! অলকা আর কিছু বললেন না । বড় বড় কদম ফেলে দ্রুত বেরিয়ে আসলেন ঘর থেকে । ময়না কে দেখে শ্যামা বেশ খুশি । ময়না চঞ্চল ছিল সর্বদা । তবে এখন পাল্টেছে অনেক । গায়ের চামড়ায় কালচে কড়া পড়েছে । আগের তুলনায় শুকিয়েছে । শ্যামা বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো ময়না কে । কেমন যেন খুঁত খুঁত লাগছে মনে । আনচান করছে ভেতরটা । ময়নার হাবভাব, কথাবার্তা, চেহারা সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে । বিয়ের পর পরিবর্তন আসে , তবে ময়নার পরিবর্তন আলাদা । শ্যামা পুরোনো ঘটনা ঘেঁটে আন্দাজে আঁতকে উঠছে নিজে নিজেই । ময়না কে নিয়ে সন্দিহান সে । অনেক সময় ধরেই কথার মাঝে ময়নার চালচলন লক্ষ্য করলো শ্যামা । ওদের গল্পের মাঝেই সংগ্রাম আসলো বাড়িতে । শ্যামা উঠে গেলো নিজের ঘরে । সেই বিকেলের পর বেরিয়েছিলো সংগ্রাম । তখন থেকে শ্যামার সাথে একটা কথাও বলে নি । জমিদারদের রাতের খাবারের সময় হয় নি এখনো । তবে শ্যামা দের বাড়িতে সন্ধ্যা হতেই রাতের খাবার খাওয়া শেষ হয়ে যায় সবার । সবাই খেয়েছে রাতের খাবার । শ্যামা খায় নি । সংগ্রাম আসতেই অলকা খাবার বেড়ে পাঠিয়েছেন । শ্যামা আগ বাড়িয়ে বলছে না কিছু । অজানা আশঙ্কায় ছটফট করছে মনটা । তখন সংগ্রাম ওকে ভুল বুঝলো না তো ? সংগ্রামের ভাব ভঙ্গিমা দেখেও কোনো কিছু বোঝার উপায় নেই । বরাবরের চোখ মুখ শক্ত তার । তবে শ্যামার সামনে শক্ত থাকতে পারে না সে , কোমল হয়ে আসে । খাবার বেড়ে সামনে বসে আছে শ্যামা । সংগ্রাম ও কিছু বলছে না । অবশেষে শ্যামার নীরবতা দেখে সংগ্রাম নিজেই বলে উঠলো.... " কি হলো ? খাবে না ? " আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেনো ? " এইতো বললাম ! এতক্ষণ তো ছিলাম না , কখন কথা বলবো ? " আমাকে ভুল বুঝবেন না , আমি ওনার সাথে কথা বলতে চাই নি । আমি জানতাম না উনি আসবেন ! মাথা নুইয়ে রেখেছে শ্যামা । হাত দুটো কচলা কচলি করছে । সংগ্রাম কপাল কুঁচকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো । শান্ত কন্ঠে বললো.... " কে বললো , আমি তোমায় ভুল বুঝেছি ? শ্যামা তাকালো । কাঁপা গলায় বললো... " সেই কখন বেরিয়ে গেছিলেন , যাওয়ার আগে একবারও বলে যান নি আমায় । কথাও বলেন নি । " তাই ভাবলে আমি রেগে গেছি ? হ্যাঁ বলতে না পেরে শ্যামা চোখ সরালো । সংগ্রাম আবারো বললো... " আমি জানতাম আফতাব আসবেন । তাই মাঝপথে ফিরে এসেছিলাম । চাইলে আটকাতে পারতাম তাকে , আটকাই নি । বলেছিলাম না , আমার শ্যামা সুন্দরীর সৌন্দর্য যে পুরুষকে আকৃষ্ট করতে পারবে না সে কোনো পুরুষই নয় । আফতাব পুরুষ বটে , তাইতো আবারো এসেছিল আজ । সে তোমাকে না দেখেই পছন্দ করেছিল , রাজি হয়েছিল বিয়েতে, এটাও জানি । শ্যামা অবাক হলো । বিস্ময় স্বরে শুধালো... " এতো কিছু কিভাবে জানলেন ? সংগ্রাম হাসলো । শ্যামার কপালের পাশের চুল গুলো আলতো স্পর্শে কানের পাশে গুজে দিয়ে বললো.... " শোনো বেগম , আমি সংগ্রাম জোয়ার্দার ! তুমি নিজেকে গত ঊনিশ বছরে যতটা চেনোনি , এই কদিনে আমার জীবনে আসার পর তোমায় তার থেকেও অধিক বেশি ভালো করে চিনে ফেলেছি আমি । তোমার জীবনের এক একটা মুহূর্ত সম্পর্কে জানি আমি । শ্যামার অনুভূতি এই সময় কি হওয়া উচিত বুঝলো না সে । ভাবনায় ডুবলো সে । সংগ্রাম ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে ডাকলো.... " কি হলো বেগম ? খাবে না ? ক্ষিদে পেয়েছে আমার ! " হুম ? খেয়ে নিন । " আজ না হয় তুমি খাইয়ে দাও । আমার হাতে তো খেয়েছো ! আজ তোমার হাতে খাবো আমি । নিজের এমন একটা বেগম থাকলে নিজের হাতে খেতে আলসেমি তো লাগবেই ! বলেই ঠোঁট কামড়ে ভ্রু নাচালো । মুচকি হাসলো শ্যামা । মাঝে মাঝে কেমন ঘোর লাগে । এমনটা কি সত্যিই ওর জীবনে হচ্ছে ? ঘটছে এমন ঘটনা ? নাকি সব ভ্রম ? এখনো ভ্রম মনে হয় এসব কিছু । মনে হয় কোন এক খড়া পড়া সকালে ঘুম ভাঙ্গলে স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলে সব শেষ । আর থাকবে না । খাওয়ার পালা চুকিয়ে এবার ঘুমোনোর পালা । সংগ্রামের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে শ্যামা । সংগ্রামের বক্ষ স্পন্দন স্পষ্ট কর্ণ কুহরে পৌঁছাচ্ছে । ঢিপঢিপ করে শব্দ হচ্ছে । শ্যামার এক হাত ধরে সেই তখন থেকে উল্টে পাল্টে দেখছে সংগ্রাম । দু'জনেই নীরব । হারিকেনের আলো পুরোপুরি নেভায় নি । আবছা আলো জ্বলছে ঘরে । ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে ঘরের পিছনে । শ্যামা নীরবে অনুভব করছে সংগ্রামের গায়ের পুরুষালি ঘ্রান । আম্মার শরীরের ঘ্রাণের পর এই ঘ্রাণটাই মন মাতিয়ে দেয় শ্যামার । তবে এটা আলাদা । অদ্ভুত এক মাদকতা আছে এই ঘ্রাণে । শ্যামা চোখ বুজে অনুভব করছে । ঘুম ধরা দিচ্ছে চোখে । সংগ্রাম ভাবছে কি যেনো । ভাবতে ভাবতে ভাবনার সমাপ্তি ঘটিয়ে শ্যামার হাতের উল্টো পিঠে একটা চুমু খেলো শব্দ করে । কাঁচা ঘুমের ঘোরেই আলতো হাসলো শ্যামা । সংগ্রাম ডাকলো... " বেগম ,, ঘুমের ঘোরে উত্তর করলো শ্যামা... " হুম ! " কাল কিন্তু চলে যাবো আমরা ! তৈরি থেকো ! শ্যামা শোনা মাত্রই সবেগে চোখ খুললো । ঘুমে আচ্ছন্ন চোখ দুটো অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে বড় বড় করে তাকালো । সংগ্রাম চোখে পলক ফেলে বলল.... " কাল বিকেলের দিকে চলে যাবো । শ্যামা উদ্বিগ্ন স্বরে বলল.... " কাল কেনো ? আর কটা দিন থাকি ! " থাকলে তো ! নিজের বাড়িতে ফিরতে হবে না ? কাল যাবো , আবার তো নিয়ে আসবো পরে ! তৈরি থেকো আর বালা কেও জানিয়ে দিও ! শ্যামার মনটা ভার হয়ে আসলো আবারো । তবে প্রকাশ করলো না । জমিদার বাড়ি এই দুদিন শান্ত ছিল । বাড়িতে এমনিতেই হাতে গোনা কয়েকটা মানুষ । এই কজনের মধ্যে আবার তিন জন নেই দুদিন ধরে । সালেহা বেশ বিরক্ত সংগ্রামের উপর । ক্ষনে ক্ষনে তার বিরক্তি আর ক্ষিপ্ততার মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য লতিফা সবসময় সজাগ । সালেহার কানে যথাসম্ভব বিষ ঢেলেছেন এই দুদিনে । শ্যামা যে ফিরবে এটা তারা নিশ্চিত । সালেহা অত্যন্ত রাগি আর জেদি স্বভাবের । লতিফ জোয়ার্দার তাকে কোনো ভাবে বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করেন নি । কেননা তার বোঝানোর মাধ্যমে সালেহার চিন্তার পরিবর্তন আসবে না । সালেহা একরোখা । শ্যামা দের বাড়ি থেকে জমিদার বাড়িতে আসতে আসতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে । আঁধার নামছে কেবল । পুরো রাস্তায় নীরবে চোখের পানি ফেলেছে শ্যামা । আসার সময় আম্মা আপা কারোর চোখের দিকে তাকাতে পারে নি । অলকা দুঃখে কাঁদেন নি মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় । বরং প্রশান্তিতে চোখের কোনে অশ্রু জমেছিল তার । আহাদ জিপ চালাচ্ছে । ওর পাশে বসে আছে সংগ্রাম । মুহূর্তে মুহূর্তে পিছন ফিরছে বারবার । শ্যামা বালার হাত ধরে বসে আছে । মাথায় ঘোমটা টানা কপাল পর্যন্ত । চোখ দুটো ফোলা ফোলা । তিন গ্রাম পেরিয়ে জমিদার গ্রামে এসে পৌঁছায় গাড়ি । বিশাল লোহার গেট মুহুর্তেই খুলে দেওয়া হয় গাড়ির শব্দে । গাড়ি ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলে সংগ্রাম নেমে পড়ে প্রথমে । পিছনে দু-কদম পিছিয়ে গাড়ি থেকে নামার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয় শ্যামার উদ্দেশ্যে । বেখেয়ালে হওয়ায় লক্ষ্য করে নি শ্যামা । বালা এক পলক তাকায় বাড়ানো হাতের দিকে । বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠে , হুঁ হুঁ করে জেঁকে ওঠে পুরনো দগ্ধা ব্যাথা গুলো । এই দুদিন তো ভুলে ছিলো সবকিছু । আপন খেয়ালে ছিল । সংগ্রাম বালার চাহনি দেখে হাত বাড়িয়ে ইশারা করে স্বাভাবিক ভাবেই বললো... " তুই আগে নেমে আয় । বালার সম্বিত ফিরতেই হাত থেকে চোখ সরালো । আড়াল করলো চক্ষু দ্বয় । সংগ্রামের বাড়ানো হাত উপেক্ষা করে নিজে থেকে গাড়ি থেকে নামলো । কোনো দিকে না তাকিয়ে অতি সন্তর্পণে পা বাড়ালো বাড়ির ভেতরে । সংগ্রাম উপেক্ষা বুঝে কপাল কুঁচকে তাকালো । বালা বড় বড় কদম ফেলে অন্দরে প্রবেশ করেছে ইতিমধ্যে । ভেতরে ঢুকেই সদর দরজা থেকে সরে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকালো । মাথা উঁচু করে চোখ বুজে শ্বাস টানলো । একটা মানুষ কে ভোলা কি এতোটাই সোজা ? দূরে গেলে না হয় মানা যায় ! কিন্তু যাকে প্রতিটা মুহূর্ত নিজের চোখের সামনে দেখতে হচ্ছে , তাও আবার অন্যকারোর সাথে, তাকে ভোলা যায় কি করে ? বালা তো ভুলে যেতে চায় সবকিছু , কারন মনে রাখার মতো কোনো অস্তিত্ব নেই । কিন্তু ভুলে যাওয়াও তো সোজা নয় , ভুলে যাওয়া যদি এতোই সোজা হয় তাহলে চোখ পানি ঝড়াতো না । বালা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলো... " আপনার হাতটা যদি আমার হতো, তাহলে ধরতাম । যেখানে আপনি আমার হলেন না সেখানে এই ক্ষীয় কালের জন্য আপনার হাত ধরে লাভ কি ? স্বার্থ থাকলে ধরলে সারা জীবনের জন্য ধরতাম । আবারো দীর্ঘ শ্বাস ফেললো বালা । অন্দরে কেউ নেই । এখনি সবাই নিচে আসবে হয়তো । এই ফাঁকে বালা কারো নজরে পড়ার আগে সবার চোখ চুরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো দ্রুত পায়ে । দুদিন পর নিজের ঘরে এসে বুক ভরে শ্বাস টানলো । পুরো ঘরের প্রিয় জিনিস গুলোতে হাত ছোঁয়ালো একবার করে । টেবিলের সামনে চেয়ারটা টেনে বসলো । মোটা খাতাটা টেনে বের করলো বইয়ের ভাঁজ থেকে । যেটাতে আবদ্ধ আছে ওর হাজারো দিনলিপি । যেগুলোর সূচনা হয়েছিল সংগ্রাম জোয়ার্দার কে ঘিরে । প্রত্যেক টা পৃষ্ঠা উল্টানোর মাঝে মাঝে বালা তাচ্ছিল্য হাসলো । এগুলো শুধু খাতার সাদা পৃষ্ঠায় কালো কালি হয়ে আবদ্ধ হয়ে রইলো , বাস্তবে আর হলো কোই ? কালি ভরা পৃষ্ঠা শেষ । শেষে আর কয়েকটা ফাঁকা সাদা পৃষ্ঠা আছে । যেগুলোতে এখনো লেখা বাকি ! আরো কোন ঘটনা ঘটলে হয়তো এগুলো ফাঁকা থাকতো না । দুটো পৃষ্ঠা আছে বোধহয় । এগুলো ফাঁকা রাখলে বালার স্বপ্নেও অপূর্ণতা আসবে । বাস্তবে আসে আসুক । খাতার পৃষ্ঠা গুলোকে অন্তত সাক্ষী রাখা যায় ওর অসমাপ্ত অনুভূতি সম্পর্কে । বালা অনুভুতি হীন হাসলো । কলম হাতে লিখতে আড়ম্ভ করলো.... " আচ্ছা সংগ্রাম ভাই , আপনাকে পেয়ে গেলে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো ? ওও..হাসি পেলো লিখতে গিয়ে, এটা বোধহয় আমার খাতার প্রথম পৃষ্ঠা , যেখানে আপনাকে ভাই বলে সম্বোধন করলাম । বাদ দিন , আচ্ছা আমায় বলুন তো - আমি ভুলবো কি করে আপনায় ? অনেক কিছুই তো শিখলাম এই কদিনে , কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনাকে ভোলার উপায় টা পেলাম না । শিখলাম না আপনাকে ভুলতে । সবকিছু বদলেছে, শুধু অভ্যাসটা বদলায় নি ,, আপনাকে মনে রাখার অভ্যাসটা । সময় অনেক কিছুই শেখায় , কিন্তু মনের বিপরীতে গিয়ে মনের মানুষকে ভুলে যেতে শেখায় না । আমিও পারলাম না মনের বিপরীতে যেতে ! মানুষ হয়তো পারে , তাই না ? আপনিই তো পারলেন । এইতো ভুলে গেলেন আমায় । আমি কি একটুও ছিলাম না আপনার জীবনে ? এতো বছরে একটুও অনুভূতি জাগে নি আমায় নিয়ে ? জাগে নি হয়তো , জাগলে হয়তো আজ অনেক কিছুই বিপরীতে মোড় নিতো । আমি কিন্তু আর কাঁদবো না , এই বলে ভাববেন না ভুলে যাবো আপনায় । ভুলে যেতে পারি নি,আর পারবোও না । তাই ঠিক করলাম , আপনার স্মৃতি গুলোকে সাজিয়ে রাখবো মনের আলমারিতে । ঠিক এই খাতাটার মতোই । একটাই চাওয়া,, আপনাকে ঘেরা এই স্মৃতি গুলো যেন শান্ত থাকে , অপ্রাপ্তি হলেও যেনো এগুলো আমাকে আর কষ্ট না দেয় । অন্তত ভুলে যাওয়ার চেয়ে স্মৃতি নিয়ে বাঁচাটা কম কষ্টের । কাঁদবো না কেনো বললাম ? কাঁদবো না তো এই জন্য , কারন বুঝে গেছি , কাঁদলেই সবকিছু পাওয়া যায় না । কি অদ্ভুত না , মানুষ তার জন্যই কাঁদে , যে তাকে কাঁদিয়েছে । দেখুন কিছুই বদলাবে না আর , কেঁদে কি লাভ ? সময় সব ভুলিয়ে না দিলেও আমার কান্না থামিয়ে দিয়েছে । লিখে খাতাটা বন্ধ করলো । শেষের পৃষ্ঠায় আর কিছু লেখার আগ্রহ জাগলো না । সেটা রেখে দিলো অন্য কোন দিন লেখার জন্য । বন্ধ খাতাটা গোপন করে মোটা মোটা বইয়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখলো সন্তর্পণে । ★ সংগ্রাম'রা এসেছে অনেকক্ষণ হলো । শ্যামার মন খারাপ লক্ষ্য করে শবনম কথা বলে সময় পার করছে ওর সাথে । আবারো বেরিয়েছে সংগ্রাম । আতিয়া বেগম দুদিন পর নাত বৌ কে কাছে পেয়ে বেশ খুশি । সৈকত কে নিয়ে অনেকক্ষণ যাবত শ্যামার ঘরে ছিল শবনম । সৈকত ঘুমিয়েছে এখন । সংগ্রামের আসার নাম নেই । শ্যামা শবনমের অবস্থা বুঝে ওকে ঘরে যেতে বললো । শবনম ও কথা না বাড়িয়ে ঘুমন্ত ছেলে কে নিয়ে ঘরে চলে গেছে । শ্যামা কাপড় ছেড়ে অপেক্ষা করলো কিছুক্ষণ । বসে না থেকে এবার বেরোলো ঘর থেকে । এসেছে থেকে আর বালার সাথে দেখা হয় নি । এখন ঘরে একা একা বসে না থেকে ওর সাথে সময় কাটালে মন্দ হয় না । সংগ্রামের ঘরটা একদম সিঁড়ির সামনে । পুরো জমিদার বাড়িটা এখনো পরিচিত নয় শ্যামার কাছে । দোতলার এই কয়েকটা ঘর ব্যতীত অন্য কোথাও এখনো পা রাখে নি শ্যামা । তাই নখদর্পণে আসার কথাও নয় । দোতলায় একাধিক ঘর । এর মধ্যে বেশির ভাগ ঘরই বন্ধ । মানুষ কম হওয়ায় পরে আছে সেগুলো । ঘর আছে তবে থাকার মানুষ নেই । তালা বদ্ধ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে সেগুলো । প্রতি সপ্তাহে প্রত্যেকটা ঘর পরিষ্কার করানো হয় । সংগ্রামের ঘর থেকে ডান দিকে তিনটে ঘর পেরিয়ে বালার ঘর । এই তিনটে ঘরের মধ্যে একটা তে আতিয়া বেগম থাকেন । বাকি দুটো তালা বদ্ধ । তারপর বালার ঘর । বালার ঘরের পাশের ঘরটায় লতিফা থাকেন । জমিদার বাড়ি বরাবরের মতোই আলোকিত । শ্যামা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা চাপিয়ে দিলো । নিঃশব্দে পা বাড়ালো বালার ঘরের দিকে । আতিয়া বেগমের ঘরের সামনে গিয়ে একবার দাঁড়ালো । কি ভেবে যেন একটু ধাক্কা দিলো দরজায় , ভেতর থেকে লাগানো হয়তো । তাই খুললো না । শ্যামা পিছিয়ে আসলো । এক কদম পা বাড়াতেই যেন মনে হলো পিছন থেকে দৌড়ে সরে গেলো কেউ । দমকা হাওয়া লাগলো একটা । শ্যামা চমকে ঝট করে তাকালো পিছনে । এক মুহুর্তে আঁতকে উঠলো ওর ভীতু নারী সত্ত্বা । পিছনে তো কেউ নেই , শ্যামা চঞ্চল চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকালো । না , কেও নেই । তাহলে মনে হলো কেনো যে কেউ দৌড়ে সরে গেলো । হয়তো মনের ভুল । শ্যামা গলা শুকিয়ে এসেছিলো মুহূর্তেই । কাউকে না দেখে শ্যামা তৃপ্ত শ্বাস ফেললো । আবারো ঘুরলো বালার ঘরের দিকে । কিন্তু এবারও এক কদম বাড়াতেই মনে হলো আবারো কেউ পিছন থেকে দৌড়ে এক দিক থেকে অন্য দিকে সরে গেল । সেই আগের মতোই । ভয়ে আবারো আঁতকে উঠলো শ্যামা । এবারও কেউ নেই । পুরো করিডোর ফাঁকা । উজ্জ্বল আলোয় স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে চারপাশ । তবে আশপাশটা নিস্তব্ধ । যে যার ঘরে আছে এই মুহূর্তে । শ্যামার ভয় বাড়লো এবার । কপালের পাশে ঘাম জমেছে বিন্দু বিন্দু । এখানে যে কেউ ছিলো শ্যামা পুরোপুরি নিশ্চিত । দু-দুবার তো আর মনের ভুল হতে পারে না । শ্যামার কাছে কেমন সন্দেহ জনক গুমোট লাগছে চারদিক । মনে হচ্ছে কেউ আছে ওর আশেপাশে । গলা শুকিয়ে আসছে শ্যামার । হাত পা শিরশির করছে । শ্যামা সবকিছু ঝেড়ে আর পিছন ফিরলো না । বালার ঘরে না গিয়ে দ্রুত পা চালালো নিজের ঘরের দিকে । এবার মনে হলো কেউ পিছু পিছু হাঁটছে শ্যামার । বক্ষ স্পন্দন বাড়ছে শ্যামার । পা দুটো চালানোর চেষ্টা করছে দ্রুত গতিতে , তবে মনে হচ্ছে পা দুটো যেন আটকে আছে এক জায়গায় । এই কয়েক মুহূর্তেই চারদিক কেমন গোলক ধাঁধার মতো লাগছে । শ্যামা কে মাঝখানে রেখে দুদিকের দেয়াল যেন ঠেসে ধরতে আসছে ওকে । ধুপধাপ কারোর পায়ের শব্দে এবার জোরে ছুট লাগালো শ্যামা । নিঃশ্বাস আটকে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঘরের দরজার কাছে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল । শক্ত মার্বেল পাথরের মেঝেতে পড়ে ব্যথায় কুকিয়ে উঠলো মৃদু স্বরে । এমন সময় সংগ্রামের উদ্বিগ্ন কন্ঠের ডাক ভেসে আসলো.... " শ্যামা... পড়া অবস্থায় চোখ তুললো শ্যামা । সংগ্রাম এগিয়ে এসে একটানে তুললো ওকে । চোখে মুখে ঘাম জমেছে শ্যামার । আতঙ্কের রেশ স্পষ্ট লক্ষনীয় । শ্যামা কে এমতাবস্থায় দেখে সংগ্রাম দুহাতের আজলে ওর মুখ আগলে নিলো । উত্তেজিত কন্ঠে বলল... " কি হয়েছে বেগম ? এমন অবস্থা কেনো তোমার ? পড়ে গেলে কি করে ? সামনে বাস্তবে সংগ্রাম আছে এটা বোধগম্য হতেই শ্যামা দুহাতে জাপটে ধরলো সংগ্রামের গলা । গলায় মুখ গুজে ফুঁপিয়ে উঠলো । কাঁপা স্বরে বলল.... " এ..এখানে, এখানে কেউ ছিলো ! কেউ ছিল এখানে । শ্যামা কে এভাবে দেখে বিস্মিত হলো সংগ্রাম । শ্যামা কে শক্ত করে জড়িয়ে বললো... " কি হয়েছে আগে বলো আমায় ? তাকাও আমার দিকে ! বেগম, দেখো.. কি হয়েছে ? শ্যামা আলগা হলো । চোরা চোখে ভীত নয়নে এদিক ওদিক দেখলো । সংগ্রামের পাঞ্জাবি আঁকড়ে ধরে বললো.... " এখানে আমি কারো পায়ের শব্দ শুনলাম । কেউ ছিল এখানে । সংগ্রাম আশ্বাস জোগালো.... " আমি তো নিচ থেকে আসলাম । হয়তো আমার পায়ের শব্দ পেয়েছো তুমি । নাকোঁচ করলো শ্যামা । মাথা ঝাঁকিয়ে বললো… " না , কেও ছিলো এখানে । আপনি আসার আগেও আমি কারোর উপস্থিতি টের পেয়েছি । মনে হলো কেউ দৌড়ে পালালো এখান থেকে । সংগ্রাম কপাল কুঁচকালো । কড়া পাহারা পেরিয়ে বাইরের কেউ অন্দরে প্রবেশ করতে পারবে না । সংগ্রাম সন্দিহান হয়েও কোমল কন্ঠে বলল... " কেউ থাকলে তো তাকে দেখতে পেতে । কেউ নেই এখানে । কেউ থাকলেই বা কি । আমি এসেছি তো । ঘরে চলো... সংগ্রামের বাহু আঁকড়ে ঘরে ঢুকলো শ্যামা । বুকটা এখনো ঢিপঢিপ করছে ভয়ে । শ্যামা কে একহাতে জড়িয়ে রেখে দরজা আটকে দিল সংগ্রাম । দরজা আটকানোর কয়েক মুহূর্ত পর ছায়া মতো কিছু একটা সরে গেলো দরজার পাশ থেকে । যেটা কারোর নজরে আসলো না । শ্যামা কে বসিয়ে সংগ্রাম নরম চোখে চেয়ে মৃদু স্বরে বলল.... " বাইরে গেছিলে কেনো ? শ্যামা সোজাসুজি উত্তর করলো.... " বালার ঘরে যেতে চেয়েছিলাম । কিন্তু বিশ্বাস করুন , ওখানে অন্য কেউ ছিল । আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি । সংগ্রাম সরু চোখে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । বোঝার চেষ্টা করলো । অতঃপর শ্যামা কে আর কিছু বলতে দিলো না । দরজা খুলে পুরো করিডোর চক্কর কাটলো একবার । ঘুরে ঘুরে দেখলো আশপাশ টা । আবারো ঘরে আসলো । শ্যামা গুটিয়ে আছে । এখন স্বস্তি লাগছে একটু । ভয় কেটেছে । সংগ্রাম পাশে বসে বললো... " বাইরে কেউ নেই বেগম । মনের ভুল হয়তো তোমার । এমনিতেও বাইরের কেউ অন্দরে প্রবেশ করতে পারবে না কখনো । তাই ভয় পেও না । ভয় পেয়েছিলে খুব ? এখনো ভয় লাগছে ? শ্যামা মাথা নাড়ালো । মোলায়েম কন্ঠে বলল... " আপনি সাথে থাকলে একটু ও ভয় করে না আমার ! সংগ্রাম এক চিলতে হাসলো । শীতল কন্ঠে বলল… " আমি সবসময় এভাবেই সাথে থাকবো তোমার । ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই । ভয় ডর, বিপদ আপদ কোনো কিছু ছুঁতেও পারবে না তোমায় ! ★ সকালের রান্নায় সাহায্য করেছে শ্যামা । ফজরের পর উঠে আর ঘুমোনোর অভ্যাস নেই । নিচে নেমে দেখে রান্নার যোগান দিচ্ছে গৃহকর্মীরা । শ্যামাও লেগে পড়ে তাদের সাথে । বাঁধা দিলেও শোনে নি । সমস্ত খাবারের পদ রান্নায় হাত লাগিয়েছে । খাবারেরসময় হতেই নিজে সমস্ত খাবার গুছিয়ে রেখেছে টেবিলের উপর । সকালের খাবার খেতে বসেছে সবাই । লতিফ জোয়ার্দার আছেন সবার মাঝে । বাড়ির সবাই উপস্থিত । শ্যামা অতি উৎসুক হয়ে হাসি মুখে খাবার বেড়ে দিলো সবার পাতে । চোখে মুখে একরাশ আনন্দ ওর । সালেহা কে বেড়ে দেওয়ার সময় একবার চোখাচোখি হয়েছিল তার সাথে । সালেহার চোখে মুখে কেমন অদ্ভুত স্থিরতা । অন্যসময় চোখ মুখ শক্ত থাকে শ্যামার সামনে । চোখ তুলেও তাকান না পর্যন্ত । তবে আজ বেশ কয়েকবার তাকিয়েছেন । শ্যামা সবাইকে খাবার বেড়ে দিয়ে সংগ্রামের পাশে দাঁড়ালো । শ্যামা আর শবনম বাদে সবাই বসেছে । শবনম ও দাঁড়িয়ে আছে নিজের স্বামীর পাশে । সবাই এক লোকমা মুখে তুলেই থমকে গেল । মুখ ভঙ্গিমায় বদল আসলো সবার । তিক্ততায় ভারী গোঁফের আড়ালে লতিফ জোয়ার্দারের মুখ বিকৃত হয়ে আসলো । মুখে খাবার রেখেই সংগ্রাম তৎক্ষণাৎ তাকালো শ্যামার দিকে । শ্যামা বুঝে উঠতে পারলো না হঠাৎ এমন চাহনির মানে । সালেহা আর লতিফা একই সাথে খাবারের প্লেট ঝটকা মেরে ঠেলে সরিয়ে দিলেন । অন্যান্য বাসনের সাথে টোকা লেগে শব্দ হলো বিকট । শ্যামা চমকে উঠলো । সালেহা আর লতিফা দাঁড়িয়ে গিয়ে থুঁ থু করে ফেলে দিলেন মুখের খাবার টুকু । চোখ টাটিয়ে কটাক্ষ করে গর্জে উঠলেন সালেহা.... " এমন অখাদ্য রান্না কে করেছে আজ ? শ্যামা থম মেরে দাঁড়িয়েই চমকে উঠলো । দৃষ্টি অবুঝের মতো । অবুঝের মতোই সাদাসিধে ভাবে প্রশ্ন করলো... " কেনো আম্মা ? কি হয়েছে ? ভালো হয় নি রান্না ? সালেহা চোখ পাকিয়ে তাকালেন । তিরষ্কারের সুরে বললেন.... " তুই হাত লাগিয়েছিস রান্নায় ? তাই তো ভাবি, আজ পর্যন্ত জমিদার বাড়িতে এমনটা হয়েছে কখনো ? এমন নুনে পোড়া রান্না কেউ খেয়েছে ? নিজের মনের সমস্ত বিষ ঢেলেছিস রান্নায় ? শ্যামার রান্নার কথা শুনে লতিফ জোয়ার্দারের শক্ত মুখশ্রী কোমল হলো । সালেহা কে উদ্দেশ্য করে শান্ত নিজামী স্বরে বললেন.... " আহ্ সালেহা , কি বলছো না বলছো ? মাথা ঠিক আছে তোমার ? লতিফা ফোড়ন কাটল.... " ভাবি তো ঠিকি বলতেছে ভাইজান । আমাদের রান্নার লোকেরা তো সারাজীবন রান্না করে আসছে , এমনটা হয়েছে কখনো ? এই মেয়ে আজই হাত লাগিয়েছে, আর আজই এমনটা হতে হলো ! প্রত্যেক টা রান্নাই নুনে পোড়া । কুকুর জানোয়ারের মুখেও রুচবে না । এই মেয়ে বাপের জন্মে দেখেছিস এমন পদের রান্না ? খেয়েছিস কখনো, যে স্বাদ বুঝবি ! যেমন চেহারা তেমন বিদঘুটে হাত, এই হাতের রান্না আর কতো ভালো হবে ? সংগ্রামের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো এহেন কথায় । টেবিলের আড়ালে হাত মুঠো করে নিলো সে । লতিফ জোয়ার্দার লতিফার কথায় বিরক্তিতে নাক মুখ সাংঘাতিক কুঁচকে ফেললেন । এমন আজগুবি কথার কোনো মানে নেই । শ্যামা এখনো অবুঝের ন্যায় বললো... " আমি তো খাবারে পরিমাণ মতোই সবকিছু দিয়েছিলাম । নুন ও তো ঠিক ছিল সব কিছুতে । আমি নিজেই খেয়ে দেখেছি । সালেহা কটমট করে উঠলেন... " তো আমরা কি মিথ্যে বলছি তোকে । খাবারে নুন ঠিক আছে। দাঁড়া দেখাচ্ছি... কথাটা বলেই গরম তরকারির ছোট বাটিটা হাতে তুলে নিলো সালেহা । গটগট পায়ে এগিয়ে গিয়ে থামলো শ্যামার সামনে । শ্যামার নরম চোয়াল শক্ত হাতে চেপে ধরলো । বাটিটা মুখে লাগানোর আগেই শ্যামার হাতে হ্যাঁচকা টান দিয়ে শ্যামা কে সালেহার সামনে থেকে নিজের কাছে টেনে নিলো সংগ্রাম । এতক্ষণ বসে থাকা সবাই দাঁড়িয়ে গেল হুট করে । সংগ্রামের চোখ মুখে রাগ ঠিকরে পড়ছে । আম্মার সামনে যথাসম্ভব সংযত করলো নিজেকে । ভারী গলায় বলল... " খাবারে নুন হয়েছে, খেতে হবে না কাউকে । তবুও আমার স্ত্রী কে কথা শোনানোর অধিকার কারোর নেই । ওকে ছোঁয়া তো দূরের কথা । " তোর বউকে কথা শোনাচ্ছি না , ভুল ধরিয়ে দিচ্ছি । নুনে পোড়া রান্না করেছে , এতো গুলো খাবার নষ্ট হলো । কি হবে এখন এগুলোর । লতিফার কথায় সংগ্রামের কপালে ভাঁজ পড়লো । আবারো কিছু বলার আগেই শ্যামা বলে উঠলো.... " কিন্তু আমি তো নুন একদম পরিমাণ মতো দিয়েছিলাম, বিশ্বাস করুন । সবাই দেখেছে ,এমনকি আমি নিজেও চেখে দেখেছি । সালেহা হুংকার দিলেন.... " চুপ কর অপয়া মেয়ে । সকাল সকাল সবার রুচি নষ্ট করে দিলি তো । কে বলেছিল তোকে রান্না ঘরে ঢুকতে , বাড়িতে থাকতে দিয়েছি এতে শান্তি হয় নি । সবার শান্তি নষ্ট করছিস এখন । কে খাবে এখন এতো গুলো খাবার ? শ্যামা দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝানোর উদ্দেশ্যে কিছু বলতে উদ্যত হলো । তবে বলতে পারলো না । লতিফ জোয়ার্দার বলে উঠলেন... " চুপ করো সবাই । একটা ছোট্ট তিলকে তাল করা বন্ধ করো । শ্যামা মা তুমি আর কিচ্ছু বলবে না । রান্না খারাপ হতেই পারে , সব নষ্ট হোক তাতে কিছু যায় আসে না আমার । পুনরায় রান্না করা হোক, তারপর খাবে সবাই । এখন যাও এখান থেকে । সালেহা আর লতিফা এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে মুখ ঝামটা দিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন । ইচ্ছে ছিলো শ্যামা কে আরো কথা শোনানোর । কিন্তু পারলো না । চলবে...... |

0 Comments