![]() |
লেখিকা: সুরভী আক্তারপর্ব:২০---------------------------সেই তখন থেকে ঘরে পায়চারি করছে শ্যামা । অপরাধ বোধ লাগছে ভীষণ । ওর জন্য বাড়ির কেউ সকালের খাবার টুকু খেতে পারলো না । সাথে সাথে রান্না বসানো হয়েছে পরে , তবে দেরি হওয়ায় লতিফ জোয়ার্দার না খেয়ে গ্রাম টহলে বেরিয়েছেন । এদিকে খাবারে অতিরিক্ত নুন হলো কি করে এটা নিয়ে সন্দিহান শ্যামা । সে নিজেই সমস্ত খাবার রান্নার পর চেখে দেখেছিল । তখন তো ঠিক ছিল সবটা । তবে পরে এমনটা কেনো হলো ? আর যাই হোক শ্যামা এটা নিয়ে কারোর বিষয়ে কোনো মন্দ ধারণা পোষণ করতে চায় না । তবে মন মানছে না , নিজের প্রতি অপরাধ বোধ কাজ করছে । এক চিন্তা ঘোরপাক খাচ্ছে মন , মস্তিষ্কে । শ্যামা দম টেনে নিলো বুক ভরে । বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো । দুপুর হওয়ায় জমিদার বাগানের ফুল গাছ গুলো নেতিয়ে পড়েছে রুষ্ট রোদের সোনালী আলোয় । ফুল মুড়িয়ে গেছে গাছ গুলোর । শুকনো হয়ে ঝড়ে পড়ছে অনেক পাপড়ি । শ্যামা উপর থেকে সুক্ষ্ম নেত্রে পরখ করলো গাছ গুলো কে । এমনিতে সে কখনো উড়নচণ্ডী ছিল না , নিজ বাড়িতে থাকতেও বাইরে বের হওয়ার ইচ্ছে জাগতো না কখনো । তবে আজ ইচ্ছে জাগলো একটু বাইরে বেরিয়ে রুক্ষ বাগান টায় যাওয়ার । ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করলো গাছ গুলোকে । শ্যামা কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে ভাবলো । বাইরে বের হওয়াটা অস্বাভাবিক দেখায় , বাড়ির গিন্নিরা কারণ ব্যতীত বাইরে বের হন না । শ্যামা ও বের হয় নি কারণ ব্যতীত । একা তো একেবারেই নয় । যে দুদিন বের হয়েছিল তা সংগ্রামের আশ্রয়ে । শ্যামা ভাবলো আরো কিছুক্ষণ । মনের বিরুদ্ধে যেতে ইচ্ছে করছে না আজ । তাই মস্তিষ্কের বিরুদ্ধে গিয়ে মনকে সায় দিলো শ্যামা । সবার চোখ চুরিয়ে নিচে নামলো । দুপুর হওয়ায় নিচে কেউ নেই । সদর দরজা লাগানো । শ্যামা নিঃশব্দে পা ফেলে গুটি গুটি পায়ে এগোলো । দরজা খুলে বের হলো বাইরে । বেরোতেই সামনে ক'জন লোক নজরে আসলো , হয়তো বাড়ির কর্মচারী । কোমরে গামছা পেঁচানো তাদের । গোয়াল ঘরের দিকে তারা চলে যেতেই শ্যামা দ্রুত পায়ে এক প্রকার ছুট লাগালো বাগানের দিকে । ফুল গাছ গুলোর আড়াল হয়ে লম্বা শ্বাস টানলো স্বস্তিতে । ঠোঁটে উৎসুক হাসি ফুটলো ওর । এতক্ষণের ভার হৃদয় হালকা হলো ঠান্ডা মৃদু শীতলতায় । শ্যামা ঘুরে ঘুরে দেখলো পুরো বাগান টা । ছুঁইয়ে দিলো সবগুলো গাছ । নেতিয়ে থাকা ফুলগুলোর সুবাস টেনে নিলো । একটা লম্বা মতো গাছে বেগুনি ডালিয়া ফুটে আছে । ওটার কাছে গিয়ে থামলো শ্যামা । কিছু ভেবে মুচকি হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোণে । বিশাল ডালিয়ার নরম লম্বা পাপড়ি গুলো মৃদু হাওয়ায় দোল খাচ্ছে খানিক । নড়ছে এদিক ওদিক । চারদিকে তো অনেক প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে । তবে ডালিয়া ফুলটায় কয়েকটা প্রজাপতি বসে আছে । উড়ছে না তারা । শ্যামা ফুলটায় হাত ছোঁয়াতেই একটা প্রজাপতি উড়ে এসে বসলো শ্যামার আঙ্গুলের ডগায় । আশ্চর্য হয়ে এক চিলতে হাসলো শ্যামা । আঙ্গুল টা সামনে ধরে নাড়ালো, উড়লো না প্রজাপতিটা । এক আঙ্গুল থেকে আরেক আঙ্গুলে ঠাই নিলো । শ্যামা ওটাকে চোখের সামনে এনে খুব কাছ থেকে ভালো করে পরখ করলো । কিছু মুহূর্ত পর হাত ফাঁক করে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলো প্রজাপতিটা । ডালিয়া ফুলটা থেকে কয়েকটা পাপড়ি ছিঁড়ে হাতে নিলো । এমন সময় পিছন থেকে শান্ত কন্ঠের একটা ডাক ভেসে আসলো… " ডালিয়া ! শ্যামা তৎক্ষণাৎ জবাব করলো… " হ্যাঁ !! পিছন ফিরলো সাথে সাথে । সংগ্রাম স্বভাব সুলভ পেছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা । শ্যামা থতমত খেলো খানিক । পল্লব ঝাপটালো ঘনঘন । সংগ্রাম এগিয়ে গিয়ে পেছনে হাত গুটিয়েই একটু ঝুঁকে পড়লো শ্যামার মুখ বরাবর । চিবুক গলায় ঠেকিয়েছে শ্যামা । সংগ্রাম বাঁকা হাসলো । শ্যামা হাতের তালুর উপর ফুলের পাপড়ি গুলো দেখে শীতল প্রশ্ন সূচক কন্ঠে বলল… " আমার ডালিয়া ? শ্যামা মুখ ফেরালো বাঁ দিকে । সংগ্রাম আবারো বললো… " কি হলো ডালিয়া, কথা বলছো না যে ? শ্যামা সোজাসুজি বললো… " ডালিয়া নামে আমায় কেউ ডাকে না ! " কিন্তু তোমার নাম তো ডালিয়া , আমার ডালিয়া তুমি ! শ্যামা চোখে চোখ স্থির করলো । তাচ্ছিল্য স্বরে বলল… " জন্মের আগে ডালিয়া ছিলাম , জন্মের পর শ্যামা হয়ে গেছি । সেই ডালিয়া ঝড়ে গেছে ! " উহু ,, আমার জীবনে আসার পর আবারো ডালিয়া তুমি , অপরূপ লাবণ্য ও প্রাচুর্যে মহিমান্বিত স্নিগ্ধ সতেজ ডালিয়া তুমি । আমার ডালিয়া , আমার বেগম, আমার অর্ধাঙ্গিনী , আমার শ্যাম কন্যা , আমার শ্যামা সুন্দরী , প্রেম আমার , আমার ইস্কে আশিকি, আমার মাহাব্বাত, আমার প্রভাত জ্যোতি , আমার বন্ধুক/দুপুরচন্ডি , আমার মাধবীলতা , আমার সন্ধ্যা মালতী , আমার জুঁই-শিউলি- গন্ধরাজ-বেলি-রজনীগন্ধা- ব্রহ্মকমল , হাসনা-হেনা, সব তুমি । সবটাই শুধু সংগ্রাম জোয়ার্দারের । শ্যামা বিমূঢ় নেত্রে তাকিয়ে শুনলো সংগ্রামের হিমশীতল শিহরণ তোলা কথা গুলো । তীক্ষ্ণ ধারালো চাহনি সংগ্রামের, যা তীরের ন্যায় বিঁধছে শ্যামার হৃদয়ে । শ্যামা আপ্লুত কন্ঠে প্রশ্ন করলো… " ডালিয়া না হয় মানলাম , কিন্তু বাকি গুলো ? অসম্পূর্ণ হলেও ডালিয়ার সাথে নামের দিক দিয়ে তুলনা করাটা সইলাম । বাকি গুলোর সাথে বোধহয় তুলনা করাটা মানায় না । " মানায় দেখেই তুলনা করলাম । তবে তোমার সাথে কিন্তু কোনো কিছুরই তুলনা পোষায় না আমার । কারন আমার কাছে তুলনাহীন তুমি । বাকি সব মুল্যহীন তোমার তুলনায় । ফুল আলাদা , তাইতো প্রত্যেকটা ফুলের পাপড়ি বিন্যাসে খোঁজার চেষ্টা করলাম তোমায় । আমার প্রত্যেক সকালের স্নিগ্ধ শোভন পাপমুক্ত প্রভাত জ্যোতি তুমি । যাকে দিয়ে আমার মনের বাগানের সকাল শুরু হয় । আমার প্রত্যেক দুপুরের দুপুরচন্ডি তুমি , যা আমার ক্লান্তির অবসান ঘটায় । আমার প্রত্যেক মধ্যাহ্নের মাধবীলতা তুমি , যা আমার চোখের প্রশান্তি । আমার প্রত্যেক সন্ধ্যার সন্ধ্যা মালতী তুমি , যার শীতলতায় আমার মনের গহীনে ঝংকার ওঠে । আমার প্রত্যেক রাতের গন্ধরাজ তুমি, যার সুগন্ধে ভীষণ প্রেম প্রেম পায় আমার । যে প্রেম আমার প্রত্যেক রাত্রির অবসান ঘটায় । কথাটা শেষ করেই ঠোঁট কামড়ে হাসলো সংগ্রাম । শ্যামা লাজুকতায় মাথা নোয়ালো । লাজুক আভায় রক্তিম বর্ন ধারন করেছে শ্যামার শ্যামলা মুখ খানা । শ্যামা কে এভাবে দেখতে ভীষণ ভালো লাগে সংগ্রামের কাছে । চোখ জুড়িয়ে আসে আবেশে । এমতাবস্থায় ভীষণ আবেদনময়ী লাগে শ্যামা কে । সংগ্রাম পলক বিহীন চোখ ভরে দেখলো শ্যামার নাজুক চেহারায় নত মুখ খানা । আঙ্গুল বাড়িতে নাকের ডগায় টোকা মারলো আলতো । শ্যামা আরো নুইয়ে পড়লো , চিবুক নামালো গলায় । সংগ্রাম নেশাক্ত কন্ঠে বলল… " বেগম ডালিয়া , এতোটা লজ্জা পেয়ে অসংযত করবেন না আমায় । আমি কিন্তু সংযত আছি যথেষ্ট । শ্যামা চোখ বন্ধ করে পিছন ফিরলো । ওনার দিকে মুখ করে থাকাটাও মারাত্মক ভাবে দায় হয়ে পড়েছে । চোখ তুলে তাকানো তো দূরের কথা । শ্যামার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে দ্বিগুণ গতিতে । শ্যামা এবার সামলে নিলো নিজেকে । গলার স্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললো… " আপনি কি করে জানলেন আমার নাম ডালিয়া ? এই নামে তো আজ পর্যন্ত কেউ ডাকে নি আমায় ! " আমার বেগম তুমি , আর আমি জানবো না ! ডালিয়া নামে বিয়ে করেছি তোমায় । বিয়ের খুতবায় আমার ডালিয়া তুমি আর আমি তোমার সংগ্রাম জোয়ার্দার । শ্যামা সংগ্রামের মুখোমুখি ফিরলো । লাজুক হেসে শুধরে দিলো… " উহুম… আপনি আমার 'ছোট জমিদার সাহেব'… হেসে ফেললো সংগ্রাম । শ্যামা চেয়ে দেখলো । কি সুন্দর হাসি তার ! হাসলে কতোই না সুন্দর লাগে । এই হাসি, হাসির কারন, হাসির মালিক, সবকিছুই শ্যামার । ভাবতেই অবাক লাগে । অবিশ্বাস্য লাগে সবকিছু । ওর বিশ্বাসের পাল্লা ভারী করে সংগ্রাম ওর গালে হাত রেখে বলল… " আর তুমি আমার 'সাহেবান'… এবার হেসে ফেললো দু'জনে । দোতলার ঘর থেকে দুই সাহেব-সাহেবানে'র উৎফুল্ল চিত্তের হাসি টুকু নজর কাড়লো সুরবালা'র । কথাগুলো কানে পৌছায় নি হয়তো , তবে ওদের নিঃশব্দ হাসির ঝংকার মন অবধি পৌঁছে গেছে । যা বরাবরের মতোই চিনচিনে ব্যাথার সৃষ্টি করলো, ক্ষত ঝালাই করার জন্য বারবার এই অবাধ্য নজর টাই যথেষ্ট । যা নিজে থেকেই বারবার খুঁজে নেয় নিজের ব্যথার কারণ । ব্যাথা হলেও হাসি তো আছে ব্যথা লুকানোর জন্য । সেটা মিছে হোক , তবুও ব্যথা ঢাকার জন্য যথেষ্ট নয় কি ? শ্যামা আর সংগ্রাম জোয়ার্দার কে একসাথে দেখলে ব্যাথা হলেও নয়ন তৃপ্ত হয় সুরবালার । এবারো হলো । সুরবালা তৃপ্ত নয়নে চেয়ে কৃত্রিম হাসলো । অতঃপর বারান্দা ছাড়লো । পাশের লোহার শিকের খোপ খোপ জানালা গলিয়ে আরো কয়েক জোড়া কালো মনি যুক্ত ক্ষুব্ধ অতৃপ্ত নয়নও একই সাথে সাক্ষী হলো শ্যামা আর সংগ্রাম জোয়ার্দারের এই হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্ত টুকুর । যা বোধহয় মোটেও সহ্য হলো না সেই অক্ষি দ্বয়ের । ক্ষুব্ধ থেকে ক্ষুব্ধ'তর হলো তাদের অক্ষি যুগল । ★ শ্যামা যে অন্দর থেকে বেরিয়েছে এটা নিয়ে রুষ্ট হলেও সেটা প্রকাশ করে নি সংগ্রাম । কথাও বলে নি এই নিয়ে । বরং শ্যামা কে হাসি মুখে সায় দিয়েছে সে । কয়েক টা ফুল ছিড়ে শ্যামার খোঁপা তেও গুজে দিয়েছে নিজ হাতে । অথচ এই সংগ্রাম ফুল ছেড়া মোটেও পছন্দ করে না । ফুল কর্তন করা তার কাছে সবচেয়ে তিক্ত কাজের মধ্যে একটা । এই ফুল ছেড়া নিয়ে ছোট বেলায় বালা কে কতোই না বকা শুনতে হয়েছে সংগ্রামের কাছে । কান মোলা খেয়েছে অনেক । রুষ্ট কন্ঠের হাজারো ঝাড়ি খেয়েছে বালা । মেয়েদের বরাবরই পছন্দ ফুল । বালার ও তাই । সংগ্রামের নজর এড়িয়ে চুপিসারে বাগানে এসে ফুল তুলে ঘরের কোনায় বসে মালা গাঁথা ছিল বালার বড্ড সখের । যে সখ নির্দ্বিধায় ছাড়তে হয়েছে সংগ্রামের প্রিতিকর খুশির জন্য । সখ ছাড়ার পর থেকে বাগান টাতেও আর কখনো তেমন পা রাখেনি বালা । বাগানে যাওয়া হয় নি আজ কত বছর । নিজের পছন্দের ফুল ছুঁয়ে দেখা হয় নি , ঘ্রাণ নেওয়া হয় বুক ভরে । ফুলের মালা গেঁথে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয় নি । আগে কত শত মালা গেঁথে দেয়ালে জুড়ে টাঙ্গিয়ে রাখতো বালা । মালা টাঙ্গানো সেই দেয়ালটা এখন ফাঁকা । আগের শুকনো ফুলের মালা গুলো দেয়াল থেকে সরানো হয়েছে আজ কত দিন হলো ! তারপর থেকে দেয়াল পুরো ফাঁকা । শ্যামা কে দেখে আজ বালার ও ইচ্ছে জাগলো বাগানে যাওয়ার । তবে এখন নয় , সবার আড়ালে । সবাইকে ছাপিয়ে চুপিসারে বাগানে যাবে আগের মতো । সন্ধ্যায় যাওয়া টা ঠিক হবে । সন্ধ্যাতেও ফুল ফোটে অনেক । আজ না হয় আবারো মালা গাঁথবে বালা , তবে উদ্দেশ্য আর উদ্দেশ্যের সারথি আলাদা হবে । আগে সখের পাশাপাশি উদ্দেশ্য ছিল এখন উদ্দেশ্য হীন হবে । বিকেলের দিকে সংগ্রামের সাথে জিপে করে জমিদার বাড়িতে এসেছে কয়েকজন । তারা মূলত পর্যটক । বিশের দশকের শেষের দিকে এখনো জমিদারি আছে এটা অপার্থিব । অনেকের ধারনার বাইরে এটা । আশেপাশের সাত গ্রাম মিলে এখনো জমিদারি প্রথা কে অটূট রেখেছেন লতিফ জোয়ার্দার । সাত গ্রামের জমিদার তিনি । তাকে সবাই সম্মান ও মর্যাদা করে অনেক । জমিদারি প্রথা আর সংস্কৃতি কে তুলে ধরতে,আর পর্যবেক্ষণ করতে প্রত্যেক বছর একের পর এক একাধিক পর্যটক বা ভ্রমন কারী আসেন জমিদার গ্রামে । জমিদারের ঐতিহ্য জানতে এবং গ্রামীণ মানুষের জীবন বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করাই তাদের লক্ষ্য । এমনিতেও জমিদারের সাত গ্রাম স্বাপ্নিক সৌন্দর্যে ভরপুর । কৃষি এবং ধরলা নদীর মৎস নির্ভর সবাই । তবে জমিদার গ্রাম বাকি ছয় গ্রামের তুলনায় অধিক । যেকোনো পর্যটক বা ভ্রমন কারী আসলে তাদের ঠাঁই হয় জমিদার গ্রামে জমিদার বাড়িতে । অবশ্য অন্দরে প্রবেশ নিষিদ্ধ সবার । প্রধান ফটকের ভেতরে গোয়াল ঘর গুলোর ডান দিকে অর্থাৎ বাগানের পাশে একাধিক অতিথি শালা আছে । বাইরের যেকোনো অতিথি দের জন্য সেখানেই থাকার ব্যবস্থা করা হয় । এবার যারা এসেছেন সংগ্রাম নিজে তাদের গ্রামের মোড় থেকে নিয়ে এসেছে জমিদার বাড়িতে । তারাও চার চাকা গাড়ি নিয়ে এসেছেন সাথে । সেই গাড়ি সহ সংগ্রামের জিপে চেপে এসেছে সবাই । মোটে সাত জনের মতো । একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছেন তারা । চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী ওরা । বেশ রুচিশীল সম্ভ্রান্ত পরিপাটি তারা । শহুরে মানুষ, চেহারার আলাদা ঝিলিক । তিন জন মেয়ে আছে তাদের মধ্যে , বাকি চার জন ছেলে । ছেলে বলতে তারা বেশ দাম্ভিক পুরুষ । সংগ্রাম মেয়ে ব্যতীত একে একে পর্যবেক্ষণ করেছে সবাইকে । জানতে পেরেছে মেয়ে তিন জনের মধ্যে এক জন চারজন ছেলের মধ্যে একজনের স্ত্রী । তবে তারা পরস্পর সহপাঠীও বটে । তাই আর এতে আলাদা কোনো চিন্তার প্রয়োজন নেই । সংগ্রাম পরিচিত হয়েছে সবার সাথেই । অন্যসব পর্যটকদের মতো তারাও বেশ কদিন থাকবেন গ্রামে । অতিথি শালার আলাদা আলাদা ঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সংগ্রাম । খাওয়ার ব্যবস্থা অন্দর থেকে করা হবে । সংগ্রাম সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিয়ে বাইরে বেরিয়েছে । সবাই আলাদা আলাদা ভাবে গুছিয়ে নিয়েছে নিজেদের । বিকেলের শেষ ভাগে ছেলে মেয়েদের মধ্যে ছয় জন বেরিয়েছে নিজেদের ঘর থেকে । আর একজন অনুপস্থিত । বাইরে বেরিয়ে অন্দরের বিশাল অট্টালিকা ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে দেখে নিলো সবাই । ভেতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ । তবে সবার মনেই আকাঙ্ক্ষা জাগলো ভেতরে পা রাখার । আকাঙ্ক্ষা কে দূরে ঠেলে আপাতত তারা সবাই যাবে নদীর পাড়ের দিকে । সন্ধ্যা গড়াবে একটু পর , গ্রামে আবার তাড়াতাড়ি অন্ধকার নেমে আসে । আজ আর গ্রামের বাইরে কোথাও যাওয়া হবে না । আজ বিশ্রাম নিয়ে সবাই কাল বেরোবে গ্রাম ঘুরতে । তবে এই বিকেলের সময় টুকু ঘরে বসে না থেকে নদীর পাড়ে গেলে মন্দ হয় না । পাশেই তো নদী , গ্রামের অর্ধেক সৌন্দর্য এটাই বহন করে । শহরে এসব দেখা যায় না , দেখা গেলেও শহুরে আভিজাত্যের ছোঁয়া লেগে আছে সেই নদীতে । গ্রামের মতো সৌন্দর্য নেই । উক্ত সাত জনের মধ্যে যে মেয়ে তিনটে আছে তাদের নাম, রিক্তা , তহুরা , আর জবা । ওদের মধ্যে রিক্তাই বিবাহিত, নিজেদের মাঝে একজন কে না দেখে রিক্তা বলে উঠলো… " অংকুর কোথায় ? ওকে তো দেখছি না ! রিক্তার কথায় সজাগ হলো সবাই । নিজেদের মধ্যে চাওয়া চাওয়ি করলো সবাই । রিক্তার স্বামী আরশ ওর হাত ধরে দুদিকে মাথা নেড়ে বললো… " ওর আবার কোথায় থাকবে ! আছে হয়তো নিজের কাজ নিয়ে ! ওটা ছাড়া ওর জীবনে আর কি আছে ? আরশের কথা বুঝতে অসুবিধা হলো না কারোর । সবাই এগোলো বাগানের দিকে । বাগানের ঠিক একপাশে ফুল গাছ গুলোর আড়ালে একটা চেয়ারে বসে আছে অংকুর । বাবরি চুল গুলো ভেজা, আর এলোমেলো । সামনে ছবি আঁকার ক্যানভাস । পাশেই ছবি আঁকার জন্য প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র , রং, তুলি, ইজেল, বোর্ড, চারকোল, সবকিছুই । এক ধ্যানে ক্যানভাসে হাত চালাচ্ছে অংকুর । আর কোন দিকে মনযোগ নেই তার । তুলি পরে আছে পাশে, তুলির জায়গায় নিজের হাত ব্যবহার করছে সে । সামনের বাগানের দৃশ্য আঁকায় ব্যাস্ত , জমিদার বাড়ির অর্ধেক অংশ দৃশ্যমান ছবিতে , অর্ধেকটা শেষ হয়েছে সবে । ওকে আর ওর আঁকা ছবি দেখে ভ্রু উঁচালো সবাই । ছেলেটা বেশ ভালো আঁকে , ভালো বিশেষণ টা কম হয়ে যায়, যাকে বলে একেবারে অমায়িক - অসাধারণ আঁকে । পড়াশোনার থেকে ছবি আঁকাটাতেই ওর অগ্রাধিকার অত্যাধিক । ওর এই গ্রামে আসার কারণ মূলত এই ছবি আঁকাটাই , গ্রামিন দৃশ্য ধারণ করা নিজের ক্যানভাসে । ওর আঁকা ছবি টা দেখে জবা উৎসুক হয়ে বলে উঠলো… " আরে বাহ্ রে অংকুর , এই সাধারণ বাগান টা তো তোর ক্যানভাসে আরো সুন্দর করে ধরা দিচ্ছে । তবে একটা জিনিসের কমতি আছে , ফাঁকা ফাঁকা লাগছে ! অংকুর নিজের চলমান হাত থামালো । না তাকিয়েই ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বললো… " কিসের কমতি ? " আরে , এতো সুন্দর ফুলের বাগান অথচ বাগানে কোনো পুষ্পরাণী নেই, এটা বেমানান । আমি বরং সামনে গিয়ে দাঁড়াই , তুই আমার একটা ছবি এঁকে বসিয়ে দে ফুলগুলোর মাঝে । তাহলে পরিপূর্ণতা পাবে । আমিও তো একটা জবা ফুল নাকি ? অংকুর কথা টা কানে তুলেও প্রতিক্রিয়া দেখালো না । উপেক্ষা করে আবারো মনযোগ দিলো নিজ কাজে । এটা ওর বরাবরের স্বভাব । জবা অপেক্ষায় আছে বোধহয় কোন কিছু শোনার জন্য । ওদের মধ্যে পাশ থেকে রিদান বলে উঠল… " ওর ক্যানভাসে কোন পুষ্পরাণী আশা করাটাই বেমানান । চিনিস না ওকে , ওর চোখ ভুলবশত কোনো মেয়ের দিকে গেলেও, ওর আঙ্গুলের রং আজ পর্যন্ত ক্যানভাসে কোনো মেয়ের 'ম' ও আঁকে নি । আর তুই আশা করিস , আস্ত একটা তুই স্থান পাবি ওর ক্যানভাসে ! আরশ ওদের থামিয়ে অংকুর কে উদ্দেশ্য করে বললো… " আমরা নদীর ঘাটে যাচ্ছি , সন্ধ্যা নামতে নামতে ফিরবো। যাবি তুই ? অংকুরের গম্ভীর জবাব… " তোরা যা , আমি এটা আঁকা শেষ করে আসার চেষ্টা করবো । আর কথা বাড়ালো না কেউ । বেরিয়ে পড়লো সবাই । অংকুরের ছবি আঁকা প্রায় শেষ । শুধু একবার নজর বুলিয়ে দেখেছিল বাগান টাকে । আর দ্বিতীয় বার দেখার প্রয়োজন হয় নি । এক দেখায় পুরোটা শেষ করেছে সে । একেবারে শেষ করে দম ছাড়লো । নজর বুলিয়ে দেখলো নিজের হাতে আঁকা দৃশ্যটা । আনমনে এক চিলতে হাসি ফুটলো এতক্ষণের গম্ভীর মুখায়বে । শ্যামলা মুখশ্রীর ঘন দাঁড়ির আড়ালে সূক্ষ টোল পড়লো গালে । রঙের বাক্স বন্ধ করলো সে । এখন উদ্দেশ্য ঘরে যাওয়া । সন্ধ্যা নামার ঠিক আগ মুহূর্তে বিকেলের একেবারে শেষ ভাগে সূর্য অস্ত গেছে কেবল । আকাশে এখনো গেরুয়া রঙের আভা লক্ষনীয় । অন্ধকার নামছে চারদিকে । আলো জ্বালানো হয়েছে পুরো জমিদার বাড়িতে । বাগানের দিকটাতে ও আলো আছে । বালা সবার নজর চুরিয়ে গুটি গুটি পা ফেলে বাগানে এসেছে । হাতে একটা বেতের ডালা । কোমর ছাড়ানো চুলগুলো মোটা বেনি'তে আবদ্ধ । নুপুরের রিনিঝিনি শব্দ তুলে বালা ছোট ছোট পা ফেলে এগোলো ফুল গাছ গুলোর দিকে । খালি পা , পায়ে জুতো বা চপ্পল নেই । বাগানের সবুজ ঘাসের উপর বিন্দু বিন্দু শীত পড়েছে । ঠান্ডা শিশিরে পা পড়তেই কেঁপে উঠলো বালা । চাদর নেই গায়ে । ওরনাটা জড়ালো ভালো করে । সন্ধ্যা হওয়ায় নেতিয়ে পড়া গাছগুলো এখন সতেজতা ফিরে পেয়েছে পুনরায় । ফুল ও ফুটেছে অনেক । এক পাশের সারির রক্তিম গাঁদা ফুল গুলো নজর কাড়লো সুরবালা'র । সে এগিয়ে কয়েকটা ফুল তুলে ডালায় রাখলো । হলুদ গাঁদা ফুল ও তুললো কয়েকটা । এবার এগোলো বড় বড় গাছ গুলোর দিকে । অলকানন্দা গাছে একাধিক ফুল ফুটেছে । বালা কয়েকটা তুলে নিলো । এগুলো সখের, এগোলো দিয়ে মালা গাঁথার জন্য নয় । একটা হলদে অলকানন্দা কানে গুজে নিলো বালা । অন্যসব ফুলগুলো দেখতে দেখতে শিশিরের উপর ঝিনঝিন শব্দ তুলে হাঁটলো কিছুক্ষণ । চারদিকে নীরবতা । আকাশ থমকে আছে নিজ জায়গায় । বালা নরম আবেশে হাঁটছে খোলা আকাশের নিচে । ফুলের পাপড়িতে হাত ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে আবেশে হাসলো,,নীরবতা ছাপিয়ে গুনগুন করে গান ধরলো বালা… " আমার একলা আকাশ থমকে গেছে রাতের স্রোতে ভেসে,, শুধু তোমায় ভালোবেসে… আমার দিনগুলো সব রং চিনেছে তোমার কাছে এসে,, শুধু তোমায় ভালোবেসে… তুমি চোখ মেললেই ফুল ফুটেছে আমার ছাদে এসে,, ভোরের শিশির মুখ ছুঁয়ে যায় তোমায় ভালোবেসে… আমার একলা আকাশ থমকে গেছে রাতের স্রোতে ভেসে,, শুধু তোমায় ভালোবেসে… গান থামিয়ে আরো ক্ষীন স্বরে গুনগুন করতে লাগলো বালা । মনটা ফুরফুরে লাগছে এখন । হেঁটে বেড়ানোর মাঝে এদিক ওদিক তাকানোতে নজর আটকালো সামনে । অচেনা কাউকে দেখে থমকালো বালা । বাগানের একপাশের একটা উঁচু খুঁটিতে হলদে লাইট জ্বলছে । সেই খুঁটির নিচে সটান হয়ে দাড়িয়ে আছে একটা ছেলে । মাথার বাবরি চুল গুলো দিয়ে কপাল ঢেকে আছে । একহাতে উঁচু একটা ইজেল বোর্ড , সেটাকে উঁচিয়ে ধরে এদিকেই তাকিয়ে আছে ছেলেটা । বালা সঙ্কিত হয়ে কপাল কুঁচকালো । ছেলেটার নজর তীক্ষ্ণ । পড়নে ঢোলা ঢালা একটা লম্বা হাতা ওয়ালা পাতলা গেঞ্জি আর প্যান্ট । বালা কয়েক মুহূর্ত পর তড়িঘড়ি করে চোখ সরালো । হাতের ডালা টা শক্ত করে চেপে ধরে দ্রুত পা চালালো অন্দরের দিকে । একেবারে থামলো ভেতরে গিয়ে । তপ্ত শ্বাস ফেললো অতঃপর । চোখ কুঁচকে ভাবলো ছেলেটা কে হতে পারবে ? ভাবনায় কোন কিছুই ধরা দিলো না । এমনকি ছেলেটার মুখশ্রী টাও মনে পড়লো । অথচ কয়েক দন্ড আগেই দেখলো ছেলে টাকে । এই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মুখের অবয়ব সম্পুর্ন ভুলে গেছে বালা । মনে করার চেষ্টা করলে , শুধু মনে পড়লো ছেলেটার এলোমেলো লম্বা মতো বাবরি চুলের কথা । অহেতুক আর কিছু মনে করার চেষ্টা চালালো না বালা । ধ্যান কাটালো । হাতের ফুলগুলো দেখে এক গাল হাসলো । পর মুহুর্তে উঠে গেল নিজের ঘরে । ★ সকাল সকাল গায়ে একটা সাদা শাল জড়িয়ে অন্দর .. থেকে সবে বেরিয়েছে সংগ্রাম । ভোরের আলো ফুটেছে , শীত পড়ছে অল্প বিস্তর । কাছে থাকতে বোঝা যাচ্ছে না , দূরে তাকালে অস্পষ্টতা দেখে বোঝা যাচ্ছে এখনো শীত পড়ছে । ঠান্ডা কাল কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে । কেবল সুর্য উঁকি দিচ্ছে মেঘের ফাঁকে । সংগ্রাম গায়ের শালটা ভালো করে জড়াতে জড়াতে বাগানের দিকে এগোচ্ছে । বাগানের পাশে ওর জিপ রাখা । কোথাও বেরোবে এই মুহূর্তে । আহাদ আসে নি , সবে সকাল সাড়ে সাতটা । ও আসবে আটটার দিকে । তবে সংগ্রাম কে কোনো কারনে এখনই বেরোতে হবে । তাই একাই বেরোচ্ছে । বাগান পেরিয়ে জিপের দিকে এগোনোর সময় পিছন থেকে ওকে ডাকলো কেউ… " সংগ্রাম ,, শুনছেন ? কারোর মুখে নিজের নাম সম্বোধন শুনে কপাল কুঁচকে থমকে দাঁড়ালো সংগ্রাম । তাও আবার কোনো মেয়েলি কন্ঠে নিজের নাম শুনলো । বিরক্ত হয়ে তড়িৎ বেগে পিছন ফিরলো । পেছনের মেয়েটা কে দেখে আরো বেশি কপাল কুঁচকে আসলো সংগ্রামের । তিন স্তর ভাঁজ পড়লো কপালে । মেয়েটা এক গাল হেসে আবারো বললো… " আমাকে মনে নেই ? আমি তহুরা ! কাল তো বোধহয় ঠিক ভাবে দেখেন নি । এখন দেখুন ! আচ্ছা, এই ভোরে আপনি কোথাও যাচ্ছেন সংগ্রাম ? কোথায় যাচ্ছেন ? সংগ্রাম বিরক্ত হলো অতিরিক্ত মাত্রায় । হাত মুঠো করে পিছনে হাত গুটালো । চোখ মুখ শক্ত করে নিরেট কন্ঠে বললো… " প্রথম কথা আমি কাউকে কৈফিয়ত দেই না । আর দ্বিতীয় কথা এই সাত গ্রামে- জমিদার রাজত্বে কারোর দুঃসাহস ও নেই আমার নাম ধরে ডাকার ! তোমার সাহস কি করে হলো আমার নাম মুখে আনার ? তহুরা'র হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেল মুহুর্তেই । সোজাসাপ্টা তীক্ষ্ণ অপমান বোধে ভ্যাবাচ্যাকা খেলো খানিক । অপ্রস্তুত হাসার চেষ্টা করে অধর ভেজালো জিভে । আমতা আমতা করে বলল… " তাহলে কি বলে ডাকবো ? সংগ্রামের কঠিন জবাব… " আমাকে ডাকার কোনো কারণ আছে ? কোনো দরকার আছে আমার সাথে ? কোনো দরকার থাকার তো কথা নয় , তাহলে ডাকবে কেনো ? তহুরা ফের তুতলিয়ে বলতে চাইলো… " না মানে… সংগ্রাম বাঁধা দিয়ে বললো… " যদি প্রয়োজন না থাকে তাহলে আমার ত্রিসীমানায় আসার ও চেষ্টা করবে না মেয়ে । অতিথি তুমি , যদি প্রয়োজন হয় তাহলে বাড়িতে অনেকে আছে, তাদের জানাবে । আমাকে নয় । সংগ্রামের সাথে এই প্রথম কথা হলো তহুরা'র । তাও আবার এমন অপ্রত্যাশিত ভাবে । কাল সংগ্রামকে দেখার পর চোখে ধরেছে ওর । সংগ্রামের কঠোর পৌরুষত্ব আর সৌন্দর্য যে কোনো মেয়েকেই আকৃষ্ট করতে সক্ষম । তহুরা'র ক্ষেত্রে ও আলাদা কিছু হলো না । প্রথম দেখাতেই সংগ্রাম কে বেশ ভালো লেগেছে ওর । তবে কাল একবারও সংগ্রাম ফিরেও তাকায় নি ওর দিকে । ওর গাম্ভীর্যতা আর উপেক্ষা মূলক আচরন আরো বেশি ভালো লেগেছে তহুরা'র কাছে । সে একটা সু্যোগে ছিলো কথা বলার । এখন ঘুম থেকে উঠে ঘরের জানালা দিয়ে সংগ্রাম কে বাইরে যেতে দেখে এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে কথা বলার লোভ সামলাতে না পেরে বেরিয়ে এসেছে সে । তবে সংগ্রামের এমন গুরু গম্ভীর আচরণ কল্পনাও করতে পারে নি ও । সে সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে ফের হাসার চেষ্টা করলো । কন্ঠ খাদে নামিয়ে হালকা নিচু কন্ঠে বলল… " ঠিক আছে ! কিন্তু, বাইরে যাচ্ছেন আপনি ? আমাকে নিয়ে যাবেন ? আপনাদের গ্রাম , আপনার সাথে ঘুরে দেখলে মন্দ হয় না । এখনও তো সবাই ঘুমিয়ে । নিয়ে চলুন আমায় , এই সুযোগে আপনার সাথে সময় কাটানো ও হবে । কিছুটা উৎসুক হয়ে কথা গুলো বললো তহুরা । এহেন কথায় সংগ্রাম চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষলো । চোখ তুলে তাকালো দোতলায় নিজের ঘরের বারান্দার দিকে । শ্যামা নিরিহ চোখে এদিকেই তাকিয়ে আছে । সংগ্রাম বেরোনোর সাথে সাথে ও বারান্দায় দাঁড়িয়েছে উপর থেকে সংগ্রাম কে দেখার জন্য । তবে যা দেখলো তা বোধহয় সহ্য হলো না । উপর থেকে দেখতে পেল মেয়েটা সুন্দর । সংগ্রাম কি নিয়ে এতো কথা বলছে মেয়েটার সাথে , আর কেনোই বা বলছে ? অজানা ভয় আর আশংকারা ঘিরে ধরলো শ্যামা কে । থমথমে অসহায় হলো মলিন মুখ খানা । সংগ্রাম তাকিয়ে থেকে মনে মনে নিঃশব্দে হাসলো । অতঃপর চোখ ফিরিয়ে আবারো দৃষ্টি নিরেট করলো । রুষ্ট কন্ঠে এক প্রকার ধমকে বলল… " কেনো ? আমার সাথে কেনো ? সময় কাটানোর জন্য বন্ধুরা কম পড়েছে ? ফের থতমত খেলো মেয়েটা । মুখে বলতে পারলো না কিছু । সংগ্রাম ভারী গলায় বলল… " অতিথি আছো, অতিথির মতোই থাকো । আমার কাছে আসার চেষ্টা করো না । অপমানিত হতে এসো না । এরপর যদি সামনে আসো, তাহলে এভাবে রসিয়ে কথা বলবে না, বুঝেছো ? নিজের সীমায় থাকো । বলেই হনহনিয়ে পা বাড়ালো জিপের দিকে । মুহূর্তেই জিপ স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল লোহার গেট পেরিয়ে । তহুরা'র কাছে আরো বেশি দাম্ভিক লাগলো সংগ্রাম কে । অহংকারী ও লাগলো । জমিদার মানুষ , অহংকার, অহমিকা থাকা টা দোষের নয় । এটা আরো বেশী মুগ্ধ করলো তহুরা কে । ঠোঁট চেপে ফিক করে হাসলো সে । চলবে……… |

0 Comments