পর্ব - ০৯
লেখা - আসফিয়া রহমান
-----------------------
১৬. দরজার বাইরে সিঁড়িতে পা রেখে ঝুঁকে জুতোর ফিতে বাঁধছিল
অনিন্দিতা। ঠিক তখনই উপর থেকে কারো পদধ্বনি শোনা
গেল, দৃপ্ত পদধ্বনি।
অনিন্দিতার হাত অবচেতনে থেমে গেল এক মুহুর্তের জন্য,
দৃষ্টি হলো সহসাই স্থির। চোখ তুলে তাকাতেই সিঁড়ির ধাপ
দৃশ্যমান একটা লম্বা ছায়া। এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল
অনিন্দিতা।
ধূসর শার্ট পরিহিত মানুষটার বাঁ হাতে কালো ব্লেজার,
গতকালের এলোমেলো চুলগুলো আজ পরিপাটি ভীষণ। ডান
হাতে ফাইল, কাঁধে ঝুলছে ল্যাপটপ ব্যাগ।
"সকাল সকাল কোথায় যাওয়া হচ্ছে, ম্যাডাম?"
অনিন্দিতা দ্রুতগতিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তারপর আশেপাশে
তাকালো একবার।
"কী হলো?" নামতে নামতে শুভ্র দাঁড়িয়ে পড়লো অনিন্দিতার
থেকে দুটো সিঁড়ি উপরে।
আগে-পিছে তাকিয়ে অনিন্দিতা অবুঝের মত প্রশ্ন করল,
"আমায় বলছেন?"
অনিন্দিতাকে নকল করে শুভ্রও আশেপাশে তাকালো
একবার, "আপাতত আপনি ছাড়া তো আর কাউকে চোখে
পড়ছে না!"
"আমি... ওই তো ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছি, ক্লাস আছে..."
"চলুন, আমি ড্রপ করে দিচ্ছি..."
অনিন্দিতা চমকে তাকালো, "কাকে? আমাকে?"
শুভ্র বিরক্ত চোখে তাকালো, "আপনার সাথেই তো বোধহয়
কথা বলছি, তাই না?"
"না, মানে... আসলে কেউ দেখলে কী ভাববে! তারচেয়ে
দরকার কী, আমি চলে যেতে পারব..."
" কেউ দেখলে কী ভাববে?" বলতে বলতে শুভ্র একটা সিঁড়ি
নিচে নামলো।
অনিন্দিতা চোখ বড় বড় করে আশেপাশে তাকালো।
"লুক অ্যাট মি!"
"হ-হু?"
শুভ্র শেষ সিঁড়িটাও অতিক্রম করে ফেলল। দুজনের মাঝে
দূরত্ব এখন সামান্যই। অনিন্দিতা ঘাবড়ে গিয়ে হড়বড় করে
বলল, "আ-মি... আ-আমার দেরি হচ্ছে, আমি গেলাম..."
শুভ তড়িৎগতিতে মেয়েটার হাত ধরে ফেলল। হঠাৎ করে
অচেনা উষ্ণতা ছুঁয়ে গেল অনিন্দিতার কব্জি। চমকে উঠল
মেয়েটা।
"আমি এখনো কথা শেষ করিনি, মেঘফুল।" শুভ্রর কণ্ঠ নিচু,
তবে দৃঢ়তা বিদ্যমান সেথায়।
অনিন্দিতা মাথা নিচু করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল, “শুভ্র,
কেউ দেখে ফেললে…”
"দেখুক," শুভ্র শান্ত গলায় বলল, "আজ নয় কাল দেখবেই।
আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউটট ইট! অ্যান্ড ইউ অলসো ডোন্ট!"
অনিন্দিতা হতভম্ব হয়ে তাকালো ওর দিকে, “আপনি পাগল
নাকি? কী বলছেন এসব!"
শুভ্র হঠাৎ করে ফুঁ দিল অনিন্দিতার মুখে। হঠাৎ এমন করায়
মেয়েটা ভয় পেয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল।
চোখ খুলে তাকাতেই অনিন্দিতা দেখতে পেল শুভ্রর ঠোঁটের
কোণে দুষ্টু হাসির আভা। শুভ্রর মুখটা এতটাই কাছে যে, ওর
নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অনিন্দিতার গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে।
"ভয় পেলেন, মেঘফুল?" ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল শুভ্র।
অনিন্দিতা চোখ ফিরিয়ে নিল দ্রুত, গলাটা শুকিয়ে কাঠ, "আ-
আমার সত্যিই দেরি হয়ে যাচ্ছে, শুভ্র..."
শুভ্র একটু হেসে সরে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো
অনিন্দিতা। তারপর কোনোদিক না তাকিয়ে দ্রুত পা চালাল।
বুকের ভেতরটা ধকধক করছে এখনো। পেছন ফিরে
তাকানোর সাহস হলো না ওর। গেটের বাইরে এসে কিছুক্ষণ
দাঁড়াতেই একটা ফাঁকা রিকশা পাওয়া গেল। ও উঠে বসলো
তাতে।
"আমি আসবো?"
অনিন্দিতা ভ্রু কুঁচকে তাকালো শুভ্রর দিকে, "কোথায়?"
শুভ্র চোখে ইশারা করে বলল, "আপনার পাশে..."
অনিন্দিতা কড়া চোখে তাকালো, "নিজের কাজে যান!"
শুভ্র ঠোঁট উল্টালো বাচ্চাদের মতো, "পাষাণ মেঘফুল..."
অনিন্দিতা ঠোঁট টিপে হাসলো। রিকশাওয়ালা টান দিল
প্যাডেলে। রিকশা ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল গেট ছেড়ে।
পেছনে দাঁড়িয়ে শুভ্র দু’হাত পকেটে ঢুকিয়ে চেয়ে রইল
রিকশাটার চলে যাওয়ার পানে। সেদিকে তাকিয়ে
অনিচ্ছাকৃতই একটা দীর্ঘশ্বাস পরলো ওর।
"আমি কি ভুল করছি? তমা-অনিন্দিতা দুজনার সাথেই?"
শুভ্র চোখ বন্ধ করল। মনে পড়ল তমার মুখটা, সেই অসংখ্য
ঝগড়া, অভিযোগ, অকারণ সন্দেহের দিনগুলো।
ওর কথার ঝাঁজে প্রতিবার ক্লান্ত হয়ে পড়ত শুভ্র— কিন্তু তবুও
থেকে গিয়েছিল। তবুও থেকে গিয়েছিল এই আশায়, হয়তো
একদিন ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু।
কিন্তু হয়নি। কিছুই ঠিক হয়নি। ভালোবাসা হারিয়ে গিয়েছিল
অনেক আগেই, বাকি ছিল শুধু দায়বদ্ধতা, মিথ্যে মোহের বসে
ভালোবাসা স্বীকার করার দায়বদ্ধতা।
“ভুলটা হয়তো এতদিন করে এসেছি, নন্দিতা… নিজের
শান্তিটাকে নষ্ট করে।”
পকেটে হাত রেখে ও একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল পথের মিলিয়ে
যাওয়া ধুলার রেখার দিকে। ভালোবাসা যদি কেবল দায়িত্বের
খাতায় থেকে যায়, তবে সেটা ভালোবাসা নয়, বন্দিত্ব।
হঠাৎ পকেটে অনবরত ভাইব্রেশনে চমক ভাঙল ওর। ফোনটা
বের করে রিসিভ করতে করতে গ্যারেজের দিকে এগোলো ও।
"বলো..."
"বলো মানে? কোথায় তুমি? তোমার জন্য মিটিং আটকে
আছে এখানে। ওদিকে বসে বসে কী এমন রাজকার্য করছো
যে এখনো অফিসে এসে পৌঁছাতে পারলে না?"
বিরক্তি মাখানো কন্ঠটা শুনে আরেকটা দীর্ঘশ্বাস পরলো
শুভ্রর, গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে বলল, “পৌঁছাচ্ছি, দশ
মিনিট।"
"এখনো দশ মিনিট? কী আশ্চর্য! তুমি আসলে কোথায়
বলোতো?"
"আসছি তো, আব্বু! ফোন রাখো..."
“তোমার বয়সে আমি যদি এত ঢিলেমি দেখাতাম, তাহলে আর
বিজনেস আজকে এই জায়গায় আসতো না। তোমাদের এই
জেনারেশনটা আসলে কোন বিষয়েই সিরিয়াস হতে জানে না,
বুঝলে।"
"আহ্ আব্বু, বললাম তো আসছি! ড্রাইভ করছি, ফোন
রাখো..."
আজিজ রায়হান কিছু না বলে ফোন কেটে দিলেন। ছেলের
উপর বড্ড বিরক্ত তিনি। আজকালকার ছেলেমেয়েদের দিয়ে
কোন কাজই ঠিকভাবে হয় না। এরা সারাদিন কী যে করে,
এরাই ভালো জানে!
১৭.
রায়হান ক্রিয়েশনস-এর সাথে আমান বুটিক হাউস-এর নতুন
প্রজেক্ট বিষয়ক মিটিংটা শেষ হতে হতে দুপুর একটা বাজল।
মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে নিজের কেবিনে এসে বসতে না
বসতেই শুভ্রর ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা পকেট থেকে
বের করে টেবিলের উপর রাখতেই চোখ পরল স্ক্রিনে। নামটা
জ্বলজ্বল করছে — “তমা কলিং…”
শুভ্র গভীর নিঃশ্বাস নিল। কলটা ধরবে কি ধরবে না মনে
হলেও পর মুহূর্তেই মনে হলো, ধরা উচিত। তমার সাথে
ব্যাপারটা পরিষ্কার করা দরকার।
— তুমি আজকাল এতই ব্যস্ত যে একটা ফোন করারও সময়
পাও না, শুভ্র?
তমার কণ্ঠে সেই চেনা ঝাঁজ।
— ফোন করব কেন?
নির্লিপ্ত কন্ঠ শুভ্রর।
তমা আশ্চর্য হয়ে গেল,
— মানে?
— মানে, যার সাথে কোন সম্পর্কই নেই, তাকে শুধু শুধু
প্রতিদিন ফোন করতে যাব কেন!
— তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, শুভ্র?
— ছিল হয়তো কোন এক সময়। তুমি নিজে হাতে সেটাকে
ধ্বংস করেছ।
— নতুন কাউকে পেয়ে গেছো তাই না? এতদিনে আমার
সন্দেহ সত্যি হলো, দেখলে?
— তোমার এই টক্সিসিটি-ই আমাদের সম্পর্কটাকে তিলে
তিলে শেষ করে ফেলেছে, তমা। এই সন্দেহ, এই
পসেসিভনেস, নিজের মতো করে আমাকে আটকে রাখার
চেষ্টা… এই সবকিছু। এত কিছু সত্বেও এতদিন যেটা ছিল,
সেটা আর যাই হোক, ভালোবাসা নয়। কোন এক সময়
তোমাকে দেখে আমি প্রেমে পড়েছিলাম হয়তো, সেটা ছিল
কেবলই ইনফ্যাচুয়েশন। তোমার টক্সিসিটির কারণে
ভালোবাসাটা হয়ে ওঠার সময়ই পেল না, তমা।
তমা নিশ্চুপ। শুভ্র আবারো বলল,
— তুমি আমাকে ভালোবাসো কিনা আমি জানিনা, কখনো
জানতেও চাইবো না। তবে আমি হয়তো তোমাকে সত্যিকার
অর্থে ভালবাসতে পারিনি কোনদিন। ভালোবাসার যে নিখাদ
অনুভূতিটা, তোমার সাথে সম্পর্কে থাকাকালে আমি
কোনদিনই সেটা অনুভব করতে পারিনি। একপাক্ষিক আর
যাই হোক, ভালোবাসাটা হয় না, তমা। আমার মনে হয়,
তোমার, আমার দুজনেরই মানসিক শান্তিতে থাকার অধিকার
আছে। আমি সেই মানসিক শান্তিরটাই চাইছি। আশা করছি
তুমিও ভালো থাকবে এতে।
অন্য প্রান্তে নিস্তব্ধতা। তারপর হঠাৎ তমা বলল,
— তুমি তাহলে আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ?
শুভ্র চোখ বন্ধ করে ক্লান্তিতে মাথাটা এলিয়ে দিল চেয়ারে,
— আমি স্রেফ এই দমবন্ধ করা সম্পর্কটা থেকে নিজেকে মুক্ত
করতে চাই, তমা। ক্লান্ত হয়ে গেছি আমি।
— নতুন কাউকে পেয়েছ, তাই না?
শুভ্র চুপ রইল। এই প্রশ্ন নতুন নয়। প্রতিবারের মতোই ঠান্ডা
সুরে বলল,
— প্লিজ তমা, জাস্ট স্টপ ইট!
তমা থামলো না, ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে গেল একনাগাড়ে,
— ওই মেয়ে কী আমার থেকেও সুন্দর? রূপের আগুন
দেখিয়ে পাগল করেছে তোমাকে? তুমি তো কখনোই আমার
সাথে এই টোনে কথা বলতে না, শুভ্র! আজ ওই মেয়ের জন্য
তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলছো? আমাদের এতদিনের
সম্পর্কটাই ভেঙে দিতে চাইছ? ওই দুইদিনের মেয়ে....
— তমা!
বাজখাঁই ধমকে মাঝপথে থেমে গেল তমা।
— ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু ইন্টারফেয়ার ইন মাই পার্সোনাল
লাইফ! আমি কার সাথে প্রেম করবো, কাকে বিয়ে করবো,
সেটা নিশ্চয়ই তোমার থেকে অনুমতি নিয়ে করব না? দ্যাট
ইজ নান অফ ইয়োর বিজনেস। অ্যান্ড লিসেন, কান খুলে শুনে
নাও, তোমার সাথে আমার কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। সো,
ফারদার ডোন্ট কল মি, ওকে?
ঠাস করে লাইনটা কেটে দিল শুভ্র। ফোনটা ছুড়ে মারল
টেবিলের উপর। দুই হাত মুখে বুলিয়ে চুল টেনে ধরল শক্ত
করে। দ্যাট ফাকিং শিট! পুরো লাইফটাকে হেল করে, এখন
গলাবাজি করছে! কত্ত বড় সাহস, অনিন্দিতাকে বলছে দুই
দিনের মেয়ে?
আচমকাই কাঁচের টেবিলে বাড়ি মারলো শুভ্র। কাঁচটা মোটা
হওয়ায় টেবিলের কিছুই হলো না, তবে টেবিলের ওপর থাকা
ফাইল, কলম, ল্যাপটপ, ফ্লাওয়ার ভাস- সব কেঁপে উঠল
ভয়াবহভাবে। ফ্লাওয়ার ভাসটা উল্টে গেল মেঝেতে। শুভ্রর
অ্যাসিস্ট্যান্ট সৌরভ সেইসময় কেবিনে ঢুকছিল। আচমকা
কাঁচ ভাঙার শব্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলো। তারপর হতবিহ্বল
দৃষ্টিতে তাকালো শুভ্রর দিকে। ওদের শান্তশিষ্ট ছোট স্যার এত
রেগে গেল কীভাবে?
টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে
থাকা সৌরভকে পাশ কাটিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল শুভ্র।
বিস্মিত দৃষ্টিতে ছোট স্যারের যাওয়ার পানে চেয়ে রইল
সৌরভ।
১৮. অনিন্দিতার ক্লাস শেষ কিছুক্ষণ আগে। বান্ধবীদের সাথে
আইস্ক্রিম খেতে খেতে গেট দিয়ে বের হচ্ছিল, এমন সময় চোখ
পরল গেটের বিপরীতে খানিকটা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো
গাড়ির সামনে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধূসর শার্ট পর
মানুষটি। সানগ্লাস চোখে তার দৃষ্টি এদিকেই কোথাও।
অনিন্দিতাকে দেখতেই সে সানগ্লাস খুলে ফেলল। চোখে
ইশারা করলো কাছে আসার জন্য।
পাশ ফিরে একবার প্রীতির দিকে তাকালো অনিন্দিতা। ও
তখনও খেয়াল করেনি। আপন মনে বকে যাচ্ছে নিজের
প্রেমের গল্প। অনিন্দিতা ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিল হঠাৎই,
"ইয়ে.. প্রীতি, বলছি কী... আমার না আজকে একটু
তাড়াতাড়ি যেতে হবে। কাল তোর বাকি কথা শুনবো, কেমন?"
কথার মাঝে বাধা পেয়ে প্রীতি বিরক্ত চোখে তাকানো, আরে
শোন না! অর্ধেক কাহিনী কালকে বললে মজা পাবি না!"
অনিন্দিতা ধূসর শার্ট পরা মানুষটার দিকে তাকালো। এই
লোক এখানে এসেছে কেন? আশ্চর্য! তারপর প্রীতির দিকে
ফিরে তাকিয়ে বলল, "প্লিজ, প্লিজ! আমি যাই? কালকে
শুনবো, পাক্কা!"
প্রীতি চোখ ছোট করে তাকালো, "এমন করছিস যেন তোর
প্রেমিক তোকে নিতে এসে দাঁড়িয়ে আছে?"
অনিন্দিতা কেশে উঠলো আচমকাই। প্রীতি যদি একবার
দেখতে পায়, খবর আছে আজকে!
"কিরে, আইসক্রিম খেতে খেতে বাচ্চাদের মতো নাকে মুখে
মাখিয়ে ফেলছিস কেন!"
"আমি গেলাম, টাটা..."
অনিন্দিতা তড়িঘড়ি করে চলে গেল। অনিন্দিতা চলে যেতেই
প্রীতিও চলে গেল নিজের গাড়ির দিকে।
"এই যে মশাই! আপনি এখানে কেন? এখানে কী কাজ
আপনার?"
শুভ্র আশেপাশে তাকাতে তাকাতে বলল, "ইরাকে দেখছি না
যে? ও-কেই তো নিতে এলাম..."
অনিন্দিতা চোখ ছোট করে তাকিয়ে হাত ভাঁজ করে দাঁড়ালো,
"তাই, না? তা, আপনার বোন যে আজকে ইউনিভার্সিটিতেই
আসেনি, সেটা না জেনেই নিতে চলে এসেছেন? বাহ্..."
শুভ্র ফেঁসে গিয়ে মনে মনে নিজের মাথায় বাড়ি দিল, "ইশ্,
ইরাটা না এসে এইভাবে ফাঁসিয়ে দিল!"
তারপর গলা খাঁকরি দিয়ে প্যাসেঞ্জার সিটের দরজাটা খুলল,
"চলুন, একসাথে যাওয়া যাক!"
"সকালবেলা গাড়িতে উঠতে রাজি হইনি বলে ছুটির সময়
চলে এসেছেন? আপনার কাজকর্ম নেই নাকি? অফিসের বস
এমনি এমনি বেতন দেয়?" তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
অনিন্দিতা।
"জি হ্যাঁ, নিজের অফিস তো... তাই কাজ না করেই ইচ্ছেমত
বেতন নিয়ে নেই, বুঝলেন? গাড়িতে উঠুন!"
শুভ্র ঘুরে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। গাড়িতে উঠতে যাবে
এমন সময় অনিন্দিতার চোখ পড়ল হাতে থাকা
আইসক্রিমটার দিকে। বেচারা আইসক্রিম অবহেলায় গলে
গিয়ে টপাটপ মাটিতে পড়ছে। সাধের আইসক্রিমের এই দশা
দেখে অনিন্দিতা আর্তনাদ করে উঠলো,
"আ... আমার আইস্ক্রিম!!"
ভ্রু কুঁচকে জানালা দিয়ে তাকালো শুভ্র, "হোয়াট হ্যাপেন?"
শুভ্রর দিকে কটমট চোখে তাকালো মেয়েটা, "চুপ করুন
বজ্জাত লোক! আপনার সাথে কথা বলতে বলতে আমার
আইসক্রিম গলে গেছে... আহ্ আমার ফেভরেট ডিস্কোন!"
বলতে বলতে অনিন্দিতা মুখ ভার করে ফেলল।
শুভ্র একবার অনিন্দিতা, আরেকবার মাটিতে গলে পড়া
আইসক্রিমটার দিকে তাকিয়ে দরজাটা খুলে বের হলো গাড়ি
থেকে। তারপর কিছু না বলেই সোজা হেঁটে গেল সামনের
দিকে।
অনিন্দিতা হতবাক হয়ে গেল, "আরে এই, কোথায় যাচ্ছেন,
শুভ্র! বজ্জাত বলেছি দেখে রাগ করলেন নাকি...? আরে,
শুভ্র..."
শুভ্র ততক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেছে ওর চোখের সামনে থেকে।
অনিন্দিতা কিছুই বুঝতে পারল না। হঠাৎ করে কী বলল এই
ছেলের? ডোর খুলে প্যাসেঞ্জার সিটে বসলো ও। তারপর
মিনিট দুয়েক পরেই চোখের সামনে দু-দুটো ডিস্কোন দেখে
চমকে উঠলো। দুটো আইসক্রিম ধরে থাকা হাতের মালিকের
দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল
মেয়েটার।
"আপনি আইসক্রিম আনতে গিয়েছিলেন?"
শুভ্র মাথা নাড়ল। আইসক্রিম দুটো নিতে নিতে অনিন্দিতা
বলল, "আমি ভেবেছি আপনি রাগ করে চলে গেছেন..."
শুভ্র অবাক হয়ে তাকালো, "রাগ করবো কেন?"
অনিন্দিতা মিনমিন করে বলল, "আপনাকে আমি বজ্জাত
বললাম যে!"
শুভ্র এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গিয়ে পরমুহূর্তেই হো হো
করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে
বসলো। অনিন্দিতা চোখ-মুখ লাল করে একটা আইসক্রিম
এগিয়ে দিল শুভ্রর দিকে। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে শুভ্র ওর
দিকে তাকালো, "এটা তোমার মেঘফুল..."
"এখানে তো দুটো আছে, দুটো আমি একা খাব কী করে! গলে
যাবে তো..."
শুভ্র দুষ্টু হাসলো, "তাহলে খাইয়ে দাও..."
To be continued...
ডিস্কোন-ময় পর্ব কেমন লাগলো প্রিয়রা? এখনো পুরোটা শেষ হয়নি কিন্তু! বাকিটা পরের পর্বে, আজকের পর্ব বিশাল বড়
হয়ে গেছে। বিশাল পর্বে কিন্তু সবার রেসপন্স চাই, ওকে?
সবার রেসপন্স পেলে ডিস্কোন-ময় পর্বের বাকিটা তাড়াতাড়ি
দিয়ে দেব। সো... 😗
বাই দ্য রাস্তা, গত পর্ব পড়ে যাদের মনে হয়েছিল শুভ্র তমাকে
চিট করছে, আজকে তোমাদের মতামত কী? তমার মতো
টক্সিক মেয়ের শুভ্রর সাথে সম্পর্কটা কন্টিনিউ করা উচিত
ছিল? |
0 Comments