![]() |
লেখিকা : আসফিয়া রহমানপর্ব - ১১-----------------১৯. "বিয়ে করে নিজের বউয়ের কোলে শুয়ে থাকো গে, যাও! আমার বউকে দখল করে রেখেছ কেন?" সোনালি বেগম চোখ রাঙালেন স্বামীর পানে চেয়ে। বুড়ো বয়সে এসে ভীমরতিতে ধরল নাকি লোকটাকে! ছেলের সামনে এসব কী অসভ্য কথাবার্তা! তবে শুভ্র নির্বিকার। ও গম্ভীর গলায় মা-বাবা দুজনের উদ্দেশ্যে বলল, "তবে বিয়ে করাচ্ছো না কেন?" আজিজ সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। ছেলে-মেয়েদের বিন্দুমাত্র লজ্জা শরম নেই যেন! বাবা- মায়ের সামনে কী অবলীলায় নিজের বিয়ের কথা বলছে! ওদিকে সোনালী বেগম ছেলের চুলের ভাঁজে হাত বুলাতে বুলাতে আহ্লাদী গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "সত্যি বিয়ে করবি, শুভ্র? মেয়ে দেখব?" শুভ্র চুপ করে রইলো। অনিন্দিতার কথাটা বাবা মাকে জানিয়ে দেবে কিনা ভাবল একবার। মা তখন আবারও তাড়া দিলেন, "কিরে আসলেই মেয়ে দেখব কিনা বল, তাহলে ফোন দিয়ে ঘটককে আসতে বলি..." শুভ্র এবার ভ্রু কুঁচকে মাথা তুলে মায়ের মুখে তাকালো, "ঘটকের নাম্বার কী রেডি করে রেখেছো নাকি, আম্মু?" "আরে না... তোর খালামণি ইরার জন্য সম্বন্ধ দেখছে না? ওর কাছে ফোন করলেই তো পাওয়া যাবে।" শুভ্র অবাক হয়ে বলল, "খালামণি ইরার সম্বন্ধ দেখছে? কই আমাকে বলো নি তো!" "বলি নি? একটা ছেলেকে পছন্দ হয়েছে তোর খালামণির। পরশু ওরা ইরাকে দেখতে আসবে..." শুভ্রর চোখের ভাঁজে কৌতুহল ফুটে উঠল, “মানে, আমাদের ছোট্ট ইরার বিয়ে ঠিক হয়ে যাচ্ছে, আম্মু?” সোনালি বেগম মুখ টিপে হাসলেন, “ঠিক তো এখনো হয়নি, তবে ছেলেটা শুনলাম বেশ ভালোই। একটা প্রাইভেট হসপিটালের ডাক্তার।” আজিজ সাহেব বালিশে হেলান দিতে দিতে বললেন, “ডাক্তার বলেই যে ভালো হবে তার গ্যারান্টি কী? আজকালকার ডাক্তাররা বড্ড ব্যস্ত। পরিবারকে সময় দেওয়ার সময় পায়না।" সোনালি বেগম চট করে স্বামীর দিকে তাকালেন, "ডাক্তাররা ব্যস্ত থাকে, আচ্ছা! তবে তুমি তো ডাক্তার না, এতগুলো বছরে আমাকে নিয়ে ক'বার ঘুরতে গেছ, বলতে পারবে?" আজিজ সাহেব গম্ভীর মুখে বেডসাইড টেবিল থেকে পত্রিকা হাতে নিয়ে মেলতে মেলতে বললেন, “আমিও তো ব্যস্ত মানুষ, বিজনেসের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে অন্যকিছুর সময় পেলাম কোথায়! আর এই যে তোমার এক গুণধর ছেলে, এই বয়সে এসে যে তার ওপরে দায়িত্ব দিয়ে একটু নিশ্চিন্ত হব, সে উপায় আছে? আহ্লাদ দিয়ে মাথায় তুলেছ, একটা কথা শোনে না। নিজের যা মন চাইবে তাই..." "আরে, আরে! কথা হচ্ছিলো তোমাদের দুজনের মধ্যে, মাঝখানে আমাকে টানছো কেন!" "কথা ঘোরানোর ধান্দা সব!" সোনালী বেগম অভিমানে অন্যদিকে মুখ ফেরালেন। বিপজ্জনক আবহাওয়া বুঝে আস্তে করে মায়ের কোল থেকে মাথা উঠিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল শুভ্র। আজিজ সাহেব থমথমে চোখে ছেলের চলে যাওয়া দেখলেন। পাজি ছেলে এতক্ষণ তো দিব্যি মায়ের কোলে শুয়ে আদর খাচ্ছিল। যেই এখানে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হলো, অমনি কেমন সুযোগ বুঝে কেটে পড়লো, দেখো! তারপর চোখ ফিরিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন স্ত্রীর পানে। যে এই মুহূর্তে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। খবরের কাগজটা আগের মতো টেবিলে ভাঁজ করে রেখে আজিজ সাহেব ধীরে ধীরে এসে স্ত্রীর কাছ ঘেঁষে বসলেন। "রাগ করেছ, বউ?" সোনালি বেগম খানিকটা সরে বসলেন, ওভাবেই জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, “নাহ্, রাগ করব কেন? তুমি তো এমনিই... কাজের দোহাই দিয়ে সব দায় এড়িয়ে যাও।” “এভাবে বলছো কেন, সোনা? আমি তো...” সোনালি বেগম ঝাড়া মেরে স্বামীর হাত সরিয়ে দিলেন, "একদম ঢং করবে না, দূরে সরো!" আজিজ সাহেব আহত দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকালেন, "এমন করো কেন, বউ!" "আমি এমনই! আমি সবসময় এমনই করি! ভালো লাগে না তাইনা?" বলতে বলতে কন্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এলো সোনালি বেগমের। অবস্থা বেগতিকের দিকে যাচ্ছে দেখে আজিজ সাহেব তড়িৎ গতিতে স্ত্রীকে বুকে টেনে নিলেন, "আমি বলেছি, ভালো লাগে না? তুমিই তো আমার প্রিয়তমা, তোমাকে ভালো না লাগলে কাকে ভালো লাগবে, বলো।" বলতে বলতে তিনি চুমু খেলেন স্ত্রীর চুলের ভাঁজে। হুঁশ ফিরে পেতেই সোনালি বেগম এক ঝটকায় সরে গেলেন, চোখ রাঙিয়ে তাকালেন স্বামীর পানে, "ছেলে আছে পাশের ঘরে, বুড়ো বয়সে ভীমরতিতে ধরেছে সাহেবকে!" ২০. "ওহ্ মাই গড, অনু! তোরা খালামণির বাসায় শিফট করেছিস, কবে? জানাস নি কেন আমাকে?" ফোনের ওপারে ইরার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর। এপাশ থেকে অনিন্দিতা বলল, "তাড়াহুড়ো করে বাসা শিফট করতে হয়েছে রে। তুই আয়, এলে সব বলছি..." "ওক্কে বস! আমি এসে পড়েছি প্রায়, জাস্ট পাঁচ মিনিট..." টিং টং... অনিন্দিতা দ্রুত উঠে গেল দরজার খুলতে। দরজা খুলতেই দেখা মিলল ইরার মুখে প্রশস্ত হাসি, "তোরা তাহলে সত্যিই এখানে শিফট করেছিস! আমি একবারের জন্য ভেবেছিলাম তুই মজা করছিস আমার সাথে..." অনিন্দিতা হাসলো, "ভেতরে আয়!" অনিন্দিতার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ইরা বলল, "ভাইয়ার সাথে দেখা হয়েছে তোর?" শুভ্র কথা উঠতেই অনিন্দিতার মুখভঙ্গি বদলে গেল খানিকটা, "হ্যাঁ, সে তো হয়েছেই। প্রথম বার দেখে চমকে গিয়েছিলাম, জানতাম না এটা ওনাদের বাসা..." ইরা হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, "তাহলে ভাইয়াও তো বোধহয় চমকেছিল, না?" অনিন্দিতা মাথা দোলালো। তারপর বলল, "তুই বস, আমি একটু চা করে আনি..." ------ — মানে কী আম্মু? আমি অনিন্দিতার বাসায় এসেছি, এখন কিভাবে যাব! — না, পারব না! আগে থেকে কোন প্রিপারেশন ছাড়া এভাবে হয় নাকি, আশ্চর্য! — মানা করে দাও! ইরা বিরক্ত মুখে ফোন কেটে দিল। অনিন্দিতা ট্রে-টা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে রে? কার সাথে কথা বলছিলি?" ইরা ফুশ করে বিরক্তির শ্বাস ছাড়লো, "আম্মুর সাথে।" "কী বলেছেন আন্টি?" "আম্মু ছেলে দেখছিল, বলেছিলাম না? পরশু ওদের আসার কথা আমাদের বাসায়। কিন্তু ছেলে আগেই চাইছে আমার সাথে দেখা করতে, এবং সেটা আজই!" "কী বলছিস? সত্যিইইই?" ইরা বিরক্ত চোখে তাকালো, "না, আমি মশকরা করছি..." "চল যাই!" চকিতে চোখ বড় করে তাকালো ইরা, "মানে?" "মানে হলো, চল দেখা করতে যাই। আমি অনেক এক্সাইটেড, ইরাআআআ..." "অসম্ভব! তুই যা, আমি যাচ্ছি না..." "কী আশ্চর্য! দেখা করতে চাইছে তোর সঙ্গে, না গেলে বেচারা মন খারাপ করবে তো..." ইরা চোখ কুঁচকে তাকাল, "বেচারা?" অনিন্দিতা মুখটা ভীষণ গম্ভীর করে বলল, "বেচারাই তো! হবু বউয়ের সঙ্গে কত আশা নিয়ে দেখা করতে চেয়েছে, লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে বড়দের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছে। এখন এত কিছুর পর হবু বউ যদি দেখা করতে রাজি না হয়, তাহলে বেচারা মন খারাপ করবে না, বল?" ইরা হাত গুটিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "তাহলে ভাইয়াকে নিয়ে যাব!" চকিতে অনিন্দিতা হকচকিয়ে উঠল, "এর মধ্যে আবার তোর ভাই এলো কোথা থেকে!" ইরা নির্লিপ্ত মুখে বলল, "আকাশ থেকে!* অনিন্দিতা চোখ বড় বড় করে তাকালো, "তুই বড় ভাইকে নিয়ে পাত্রের সঙ্গে দেখা করতে যাবি? লজ্জা লাগবে না তোর? ছিঃ..." "না, লাগবে না..." বলতে বলতে ইরা শুভ্রর নাম্বারে কল দিল। শুভ্রর নামটা শুনতেই অনিন্দিতার বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠলো। মানসপটে ভেসে উঠল সেই দিনের সাক্ষাৎটা, সেই অপ্রস্তুত মুহূর্তটা... কথা বলে ইরা ফোনটা কাটতেই অনিন্দিতা আমতা আমতা বলল, “আমি যাচ্ছি না, ইরা।” ইরা অবাক হয়ে তাকাল, “কেন?” অনিন্দিতা চোখ নামিয়ে নিল, "এমনি, ইচ্ছে করছে না।" "আরে! ইচ্ছে করছে না মানে কী! এই মাত্রই তো তুই কতোটা এক্সাইটেড ছিলি। এরই মধ্যে কী হলো?" অনিন্দিতা চুপ। ইরা বিরক্ত হয়ে ওর হাত ধরে টান দিল, “না মানে কী, হ্যাঁ? মানে যেতেই হবে! তুই না গেলে আমি একা একা কী করব? চল, রেডি হ।” “ইরা, আমি—” “কোনো ‘আমি-তুমি’ না! আমি ভাইয়াকে বলে দিয়েছি, রেডি হচ্ছে। এক্ষুনি চলে আসবে।" ইরা একরাশ উত্তেজনায় অনিন্দিতাকে টেনে নিয়ে গেল আলমারির দিকে। অনিন্দিতা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, বুকের ভেতর এখনো ধুকপুক করছে— শুভ্র যাচ্ছে, মানে... আবার দেখা হবে। ২১. ইরা প্রায় টেনে-হিঁচড়ে অনিন্দিতাকে নিয়ে গেল গাড়ির দিকে। অস্বস্তিতে অনিন্দিতার পা জোড়া চলছে না। গাড়িতে ওঠার আগ মুহূর্তেও ও শেষ চেষ্টা করল, "ইরা, আমি না যাই, প্লিজ?" ইরা এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো, "বাই এনি চান্স, তুই কি ভাইয়ার জন্য যেতে চাইছিস না, অনু?" অনিন্দিতা দ্রুতগতিতে মাথা নাড়লো, "না, না, তেমন নয়!" ইরা চোখ ছোট করে তাকালো, "তাহলে কেমন?" অনিন্দিতা ফুস করে দম ফেলল, "কিছু না, চল যাই..." গাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই নাসারন্ধ্রে হানা দিল মেনস পারফিউমের তীব্র গন্ধ। সামনে চোখ তুলে তাকাতেই দৃষ্টির সাথে মিলল দৃষ্টি। বেজায় অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে গেল অনিন্দিতা। “রেডি, লেডিজ?” শুভ্রর গলা স্বাভাবিক, যেন কিছুই হয়নি। যেন ও আগে থেকেই জানতো অনিন্দিতা আসবে। "ইয়েস!" ইরার একক কণ্ঠস্বর কানে আসতেই শুভ্র চোখের কোণা দিয়ে তাকাল অনিন্দিতার দিকে। মেয়েটা নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে— চোখে বিরাজমান অন্যমনস্কতার রেখা। সেদিকে চেয়ে একটা মুচকি হাসি খেলে গেল শুভ্র ঠোঁটে, দারোয়ান চাচাকে ইশারা করে ফুরফুরে মেজাজে গাড়ির স্টার্ট দিল ও। To be continued... |

0 Comments