![]() |
লেখক:DRM Shohag
-------------------হাদি বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে হৃদয়ের দিকে। নিজের জিনিসের উপর রা'গ মিটিয়েছে মানে কি? যে মেয়েকে দু'দিন আগেও তারা কেউ চিনতো না, সে নাকি এই হৃদয়ের নিজের মানুষ। হাদি মাথায় হাত দিয়ে বলে, “জলজ্যান্ত এক অচেনা মেয়ে মানুষ একদিনেই তোর নিজের মানুষ হয়ে গেল মামা?” হৃদয়ের ভাবলেশহীন উত্তর, “হ্যাঁ হয়ে গেল। তো?” হাদি হেসে বলে, “এতো দ্রুত স্বীকার করে নিলি মামা? ভালো ভালো। তোকে ক'ষ্ট করে থুতু চেটে খেতে হবেনা। তুই স্বীকার করলি এতেই আমি বহুত খুশি। তুই শুধু মেয়েটাকে নিজের মানুষ ভেবে উহুম উহুম করিস। এভাবে মারলে তো ও বাঁচতে পারবে না। গাল দু'টো পুরো ফুলকো লুচি বানিয়ে দিয়েছিস, দেখেছিস?” হৃদয় রে'গে হাদির পাঞ্জাবির কলার ধরে রে'গে বলে, “তাতে তোর কি? ও জা’হা’ন্না’মে গিয়ে ট্যুর দিয়ে আসুক। ওকে নিয়ে ভাবার তুই কে?” হাদি মেকি হেসে বলে, “কেউ না মামা। আমি কেউ না। তোর মানুষকে নিয়ে আমি ভাবার কেউ না। কিন্তু মেয়েটার নিষ্পাপ গালদু'টো….” হৃদয়ের কড়া দৃষ্টি দেখে হাদি মুখের লাগাম টানে। দ্রুত দু’হাতে গাল ঢেকে অসহায় কণ্ঠে বলে, “ঠিক আছে ঠিক আছে। তুই চাইলে তোর নিজের মানুষকে গিয়ে আরও দশটা মেরে আয়। আমি কিছু বলব না। কিন্তু আমায় মারিস না৷ তোর এই পালোয়ান এর মতো শরীর দিয়ে এক থাবা খেলে আমি তিনদিন গোস্ত খেতে পারিনা। আমার উপর একটু দয়া কর মামা।” হৃদয় বিরক্ত হয়ে হাদির কলার ছেড়ে দেয়। আর দু'এক মিনিটের মধ্যেই ট্রেনটি থামবে সামনের এক স্টেশনে। যার জন্য হৃদয় অপেক্ষা করছে। হৃদয়ের থেকে ছাড়া পেয়ে হাদি পাঞ্জাবির কলার টেনেটুনে ঠিক করল। এরপর হৃদয়ের দিকে একটু ঝুঁকে নিচু গলায় বলে, “বলছি, যারা নিজের মানুষ হয়, তাদের আ'ঘা'ত করলে তো নিজেরই ব্য’থা লাগে৷ মেয়েটাকে মে'রে তোর ব্য’থা লাগলো না?” হৃদয়ের লালিত চোখদু’টো বাইরের অন্ধকারে নিবদ্ধ ছিল। হাদির কথাটা কানে পৌঁছাতেই আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় কাজ করল। এমনিতেই রজনীকে মেরে এসে তার রাগ কমার বদলে কয়েকশো গুণ বেড়ে গিয়েছে। তার উপর হাদির এই কথা। সে আবারও দু'হাতে হাদির পাঞ্জাবির কলার ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তোর সাহস কি করে হলো, ওকে মারার দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখার? আমাকে আটকাসনি কেন? বল বে'য়া'দ'ব?” হাদি বোবা চোখে চেয়ে আছে হৃদয়ের দিকে। মানে ও যে রজনীকে এতোগুলো মারলো, তাতে দোষ নেই। সে আটকালো না কেন, এটাই না-কি তার দোষ? অসহায় কণ্ঠে বলে, “লে আলু,, তুই সেই সুযোগটাই তো দিসনি মামা। আমি তোকে আটকাবো টা কখন? হৃদয় দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “তুই কখন আটকাবি সেটা তোর ব্যাপার। বাট তুই থাকতে ও আমার হাতে মার খাবে কেন? হোয়াই?” হাদি হতভম্ব চোখে চেয়ে রইল। এটা কি আলুর লজিক দেয় এই বেদ্দপ হৃদয়হরণ? তার ইচ্ছে করল আলু গাছের সাথে গলায় দড়ি দিতে। এ কি আধপা’গল হলো নাকি পুরো পা'গ'ল হলো? ততক্ষণে একটি স্টেশনে এসে ট্রেনের গতি একেবারে কমে গিয়েছে। ব্যাপারটি হৃদয়ের নজরে আসলে সে হাদির কলার ছেড়ে দিয়ে ট্রেন থেকে নেমে নামার প্রস্তুতি নেয়। একদম গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হাদি দু'হাত কোমরে রেখে হৃদয়কে দেখছে। এই হৃদয়ের হাবভাব ইদানিং কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। হৃদয় নামার জন্য ট্রেনের বাইরে পা রাখতে নিলে হাদি হৃদয়ের হাত টেনে ধরে বলে, “রাত-বিরাতে কোথায় নেমে কোথায় যাবি। তার চেয়ে বরং তোর নিজের মানুষের ফুলকো গাল দু’টো দেখে যা। হৃদয়হরণের হৃদয়টাও ঠান্ডা হবে, রাগটাও পড়ে যাবে৷ দুঃখ, ক'ষ্ট সব মুছে যাবে। আয় মামা। নিজের মানুষকে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আয় আয় দেখে যা।” হৃদয় ঝাড়া মেরে হাদির হাত সরিয়ে দেয়। হাদির দিকে ডান হাতের আঙুল উঁচিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে, “আমার ওকে দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। তবে তুই দেখলে তোর চোখদু'টো তুলে তোর গ্রামের ছেলেদেরকেই মার্বেল খেলতে দিয়ে আসবো। এটুকু বলে একবার শ্বাস নিয়ে আবারো একই স্বরে বলে, আর আমার কারো জন্য দুঃখ, ক'ষ্ট কিচ্ছু হয় না। কাউকে খু'ন করলেও বিন্দুমাত্র অনুতাপ হয়না আমার। আর সেখানে ওই গাইয়া মেয়েকে মাত্র ছয়টা থা'প্প'ড় মেরে আমি ক'ষ্ট পাবো? নেভার এভার। মাইন্ড ইট।” কথাটা বলে হৃদয় আর এক মুহূর্ত এখানে দাঁড়ালো না। ব্যস্ত পায়ে ট্রেন থেকে নেমে গেল। হৃদয়ের প্রথম কথাগুলো শুনে হাদি কিছু সময়ের জন্য স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তবে রজনীকে নিয়ে বলা কথা শুনে তার কেন যেন হাসি পেল। সে নিজেকে সামলালো। দেখা যাক কি হয়! ছোট স্টেশন হওয়ায় এখানে ট্রেন বেশিক্ষণ থামেনি। হৃদয় নেমে যাওয়ার পর পরই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। হাদি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে উল্টো ঘুরে কয়েক পা সামনে এগোলে চোখে পড়ে হিয়া ছলছল দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। ফর্সা গালে থা'প্প'ড়ের ছাপ স্পষ্ট চোখে পড়ল। হাদির মুখে মলিনতার ছাপ ফুটে উঠল। সে খুব ভালো করেই জানে হিয়া একটা থা'প্প'ড় খেয়ে কাঁদার মতো মেয়ে নয়। এতোগুলো ভাইবোন থাকতেও হৃদয় নামক ভাইয়ের এক টুকরো ভালোবাসার জন্য মেয়েটির কত দুঃখ! এই যে এখন হিয়ার চোখের কোণে জলকণা জমেছে, এটা হৃদয়ের অবহেলার কারণে। যা বুঝতে হাদির বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। হাদিরাই বা কি করবে? তারা সব ফ্রেন্ডরা হৃদয়কে কম তো বোঝায়নি। কিন্তু হৃদয় কি কারো কথা শোনার মানুষ? উল্টে তারা বন্ধুরা হৃদয়কে বোঝাতে গিয়ে ওই পালোয়ান ছেলের হাতে বেহিসাব থা'প্প'ড় খেয়ে হতাশ হয়ে একজন আরেকজনের উপর পড়ে থেকেছে। হাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হিয়ার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে হিয়াকে পাস কাটিয়ে যেতে নিলে হিয়া ভাঙা গলায় ডাকে, “হাদি ভাই?” হাদির পা থেমে যায়। সামনে তাকায় না। উল্টো ঘুরেই সময় নিয়ে ছোট করে উচ্চারণ করে, “বলো।” হিয়া নাক টেনে বলে, “হৃদয় ভাই আমাকে আর আম্মুকে একটুও ভালোবাসে না কেন? বাবাকে একটু-আধটু সহ্য করতে পারলেও আমাকে আর মাকে কেন এতো ঘৃণা করে?” হাদি শুকনো ঢোক গিলল। পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছে উত্তর দেয়, “জানি না।” সাথে সাথে হিয়া দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “আপনি সব জানেন। আপনারা সবাই সব জানেন। শুধু কেউ আমাকে জানান না। কেন এমন করেন?” হাদি কি বলবে বুঝল না। এই বাচ্চা মেয়ে এতো পাকা পাকা কথা হুট করে কোথা থেকে শিখে আসলো? হাদি কিছু না বলে সামনে এগোতে নিলে হিয়া আবারও বলে, “আম্মু আর আমি হৃদয় ভাইয়ের সৎ মা-বোন, তাইনা হাদি ভাই?” কথাটা শুনতেই হাদি সাথে সাথে হিয়ার দিকে ফিরে ডান হাত উঠিয়ে মারার ভঙ্গি করে রাগান্বিত স্বরে বলে, “একটা থা'প্প'ড় খাবে বে'য়া'দ'ব মেয়ে। এসব ফা'ল'তু কথা কোথায় পেয়েছ?” হিয়া একটু ভ'য় পেল। তবে জায়গা থেকে সরলো না। মেয়েটা ঝাপসা দৃষ্টিতে হাদির দিকে চেয়ে রইল। হিয়ার দৃষ্টি দেখে হাদি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে হাত নামিয়ে নিয়ে আড়চোখে হিয়ার দিকে চেয়ে বলে, “তোমার ভাইয়ের মতো আমি ওমন পালোয়ান নই৷ গায়ে ওতো জোর নেই আমার। ফাও ভ'য় পাচ্ছো কেন? আর চোখ নিচে নামাও, আমি তোমার বড়, আমার সাথে সবসময় মাথা নিচু করে কথা বলবে, মনে থাকবে?” হিয়া সাথে সাথে মাথা নিচু করে নেয়। মাথা নেড়ে বোঝায়, তার মনে থাকবে। হাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “এসব সৎ অসৎ এর ব্যাপার তোমার মাথায় যে ঢুকিয়েছে ওর মাথায় একটা বারি দিবে। তোমাদের পরিবারের সবাই আপন। হৃদয়ের মাঝে একটু ঝামেলা আছে। সময় দাও, ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।” হিয়া মাথা তুলে জিজ্ঞেস করে, “কবে ঠিক হবে?” হাদি উত্তর করতে পারলো না। হিয়ার চোখের কোণে আবারও জলকণা ভরে ওঠে। সে খুব ভালোই জানে কখনোই কিছু ঠিক হবে না। সবাই তাকে বাচ্চা ভেবে শুধু সান্ত্বনা দেয়। কেউ বুঝতেই চায় না, সে আর বাচ্চা নেই। হিয়া আবারও জিজ্ঞেস করে, “হৃদয় ভাইয়ের মাঝে কি ঝামেলা আছে হাদি ভাই?” হাদি বিরক্ত হলো কিছুটা। মেয়েটা এমন খোঁচাচ্ছে কেন কে জানে! সে বিরক্তি নিয়েই বলে, “আগে বড় হও। তারপর সব এমনিই জানতে পারবে।” হিয়ার উৎফুল্ল কণ্ঠ, “আমি অনেক বড় হয়ে গেছি হাদি ভাই। একবার দেখুন না আমাকে!” এতক্ষণ হাদি হিয়ার দিকে তাকালেও এবার সে আর মেয়েটির দিকে তাকালো না। হিয়ার কথার অর্থ সে খুব ভালো করেই বুঝেছে। ভীষণ রাগ হলো তার। মাথা নিচু করে ডান হাতে কপাল ঘষল দু'বার। এই বাচ্চা মেয়েকে কিভাবে সিধে করব সেটাই ভাবছে। অতঃপর মাথা নিচু রেখেই অত্যন্ত রূঢ় কণ্ঠে বলে, “আমি মেয়ে মানুষদের ওভাবে দেখিনা হিয়া, তুমি যেভাবে মিন করছ। তুমি কি এখান থেকে যাবে না-কি আমি তোমার হৃদয় ভাইকে নালিশ করব?” কথাটা শুনতেই হিয়া ভ'য়ে কেঁপে উঠল৷ হৃদয়ের কানে সবাই তাকে নিয়ে এতো ভালো ভালো কথা বলার পরও তার প্রতি হৃদয়ের আচরণ ভীষণ কঠোর। সেখানে তার ব্যাপারে নালিশ করলে হৃদয় ভাই বোধয় তাকে মে'রেই দম নিবে। মেয়েটা হাদির দিকে চেয়ে মলিন গলায় বলতে নেয়, “আপনি…. হাদি কঠোর স্বরে ধমকে ওঠে, “যাবে তুমি?” হিয়া ঝাঁকি দিয়ে ওঠে৷ এবার মেয়েটির চোখদু'টো হাদির কারণেই ভরে ওঠে। সে যা চায়, বেছে বেছে সেসবই পায় না। তার ভাগ্য এমন কেন? মেয়েটি আর দাঁড়ালো না। চলন্ত ট্রেনেই ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গেল দাদুর দিকে। দাদুকে বলে এসেছিল, ওয়াশরুমে যাবে। কিন্তু মাঝপথে হৃদয় আর হাদিকে দেখে তার যাওয়া হয়নি। হাদি বা হাত চাপ দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে বিরক্তির শ্বাস ফেলে বলে, “বা'ল! যতসব উটকো ঝামেলা।” কথাটা হিয়ার কানে আসে। মেয়েটির দলা পাকিয়ে কান্না আসে, কিন্তু সে খুব ক'ষ্টে নিজেকে সামলে পায়ের গতি বাড়ায়। . . রজনী জানালার পাশে একটি সিটে বসে আছে। অপর পাশের সিটে আরমান নওরোজ। ভদ্রলোক রজনীকে শুধু ছোট করে বলেছিল, ‘আমার নাতির হয়ে আমি খুব স্যরি রে দিদিভাই!’ রজনী কি বলবে বুঝে পায়নি৷ এতোগুলো থা'প্প'ড় খেয়ে বেচারির মাথা এমনিতেই ভনভন করে ঘুরছিল, দু’কানে কম শুনছিল, তার মধ্যেও ওতো বড় মানুষ অর্থাৎ আরমান নওরোজ এর মুখ থেকে স্যরি শুনে রজনীর খারাপ লাগে। নাতিটা ভালো না হলেও দাদুটা খুব ভালো মানুষ। রজনী ব্যথা লুকিয়ে খুব ক'ষ্ট করে মুখে একখানা হাসি ফুটিয়েছিল। যেন ভদ্রলোকের আর অনুতাপ হতে না হয়। কিন্তু নাতিটা একটু বেশিই খারাপ। তার হাতের ক্ষ'ত শুকাতে না শুকাতেই গাল দু'টোসহ কান দু'টোও পুরো বয়রা বানিয়ে দিয়েছে। মাথা ব্য’থা করছে। কিন্তু সে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। পাছে তার সামনে বসা আরমান নওরোজ আবার না তাকে স্যরি বলতে লেগে যায়। কিন্তু হৃদয়ের কথা মনে হতেই মেয়েটার এতো রা'গ লাগছে, তা বোধয় সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না। গ্রাম ছেড়ে নতুন শহরে এসে কিছু চিনতো না বলে সে সব সহ্য করেছে। তবে গ্রামে গিয়ে কখনো সুযোগ হলে এই ভালো দাদুর ওই নাতিকে খুব করে শায়েস্তা করে দিবে। রজনী এতক্ষণে আরমান নওরোজের থেকে জানতে পেরেছে আরমান নওরোজ, হৃদয় তারা নাকি সবাই তাদের গ্রামে যায়৷ কিন্তু বেচারি এখনো জানেনা, এদের সম্পর্ক চেয়ারম্যান বাড়ির লোকের সাথে। জানলে হয়ত এখানে বসার সাহস পেত না। সে জেনেছে হৃদয় তাদের গ্রামে যায়, এর মানে রজনী ওই লোকটার একটা ব্যবস্থা করবেই করবে। সে নিজের গ্রামে শুধু একবার ফিরুক। তখন দেখাবে। তার গ্রামে তার সাথে কেউ পারেনা। কথাটা ভেবে রজনী নিজে নিজেই একটু ভাব নেওয়ার চেষ্টা করল। আর বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো, “আপনি আমাদের গ্রামে পা রাখলেই আমি আপনাকে নাকাকি-চুবানি খাওয়াবো, সব শোধ তুলব, হুহ,, খাটাশ লোক একটা!” পাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে, “কে খাটাশ লোক?” রজনী ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ডানদিকে ফিরলে হাদিকে দেখে রজনী ঢোক গিলল। ট্রেনের সিটগুলো বড় হওয়ায় হাদি রজনীর থেকে দূরত্ব রেখে বেশ আয়েশ করেই সিটে বসেছে। আরমান নওরোজ চোখ বুজে রাখতে রাখতে চোখ লেগে এসেছে। তাই সে হাদির কথা শুনতে পেল না। আর হিয়া মাথা নিচু করে রেখেছে। মেয়েটি চোখের জল লুকতাে ব্যস্ত। রজনীকে চুপ দেখে হাদি মৃদুস্বরে বলে, “আমি কিন্তু জানি, তুমি কথাটা আমার বন্ধুকে বলেছ।” রজনী শুকনো ঢোক গিলে অসহায় কণ্ঠে বলে, “উনাকে বলবেন না। আমি আর এসব বলব না।” হাদি খেয়াল করল রজনীর ঠোঁটের কোণে এখনো র'ক্ত লেগে আছে। সে পকেট থেকে টিস্যু বের করে রজনীর দিকে এগিয়ে দিয়ে হেসে বলে, “চিন্তা নেই। ওকে বলব না। তাছাড়া তুমি ঠিকই বলেছ, ও খাটাশ মাটাশ সবই। নয়তো ফুলের মতো তোমাকে কি এভাবে মারতে পারতো?” এ পর্যায়ে রজনীর ভীতি কমলো। হাদি তার মানে ওই খাটাশ লোকের বিপক্ষের লোক। বোকা মেয়েটি সব ভুলে মৃদু হাসে নিজের সঙ্গী পেয়েছে ভেবে। হাদি হাতের টিস্যু আরেকটু এগিয়ে দিয়ে বলে, “তুমি টিস্যু দিয়ে র'ক্তটুকু মুছে নাও। এমন সুন্দর মেয়ের মুখে কি র'ক্ত মানায়?” রজনী হাদির আচরণে আবারও হাসল। হাদির হাত থেকে টিস্যু নিয়ে হেসে বলে, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।” হাদির হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠ, “তুমি খুব সুন্দর করে হাসো। তোমাদের গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে বোধয় তুমি-ই, তাইনা?” রজনীর মাঝে একদমই জড়তা দেখা গেল না। বরং হাদিকে সে নিজের সঙ্গী ভেবে অনায়াসে উত্তর করে, “জ্বি। আমাদের গ্রামে আমাকেই সবাই সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে বলে। যে-ই দেখে সেই পছন্দ করে ফেলে। এই যেমন আপনিও আমাকে পছন্দ করে ফেলেছেন। আমারও আপনাকে খুব পছন্দ হয়েছে।” কথাটা শুনে হাদি কেশে ওঠে। লে আলু, সে কখন এই মেয়েকে পছন্দ করল? আবার এই মেয়েও না-কি তাকে পছন্দ করে ফেলেছে। কি সাংঘাতিক! হৃদয় শুনলে সত্যি সত্যি না আবার তার চোখ তুলে তার গ্রামের ছানাপোনাদের মার্বেল খেলতে দেয়। ছেলেটার দৃষ্টি সামনে বসা হিয়ার দিকে পড়লে দেখল হিয়ার দৃষ্টি তারই দিকে। দু'চোখ লাল টকটকে হয়ে আছে। যে চোখদু’টো বেয়ে একটু পর পর নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। হাদি দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। মেয়েটাকে দেখলে তার বিরক্তি ছাড়া কিছুই আসেনা। এই বাচ্চাকে তার পিছু সে ছাড়াবেই ছাড়াবে৷ অতঃপর সে রজনীর উদ্দেশ্যে বলে, “শুনেছি তুমি না-কি চকলেট অনেক পছন্দ করো?” রজনী মাথা নেড়ে বোঝায়, “জ্বি আমি লজেন্স খুব পছন্দ করি।” হাদি ট্রেন এর কেবিনেট এর উপর ইশারা করে একটি বড়সড় বক্স দেখিয়ে বলে, “এইজন্য ওই বক্সভর্তি তোমার জন্য চকলেট এনেছি আমি। ওগুলো সব তোমার, তুমি তোমার বাড়ি নিয়ে যেও কেমন?” রজনীর চোখদু'টো চকচক করে উঠল। সে শব্দ করে বলে ওঠে, “আচ্ছা আচ্ছা নিয়ে যাবো। আপনি খুব ভালো ভাইয়া।” হাদি মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। হৃদয়ের ক্রেডিট সে নিয়ে নিল। ভালোই লাগলো। সাথে সামনে বসা হিয়াকে সামান্য ডোজ দেওয়া হলো। এক ঢিলে দুই পাখি মেরে দিয়েছে। এতক্ষণ এক্টিং করে বেশ ক্লান্ত লাগছে। দৃষ্টি সরিয়ে আনতে গেলে আরমান নওরোজ এর হাস্যজ্জ্বল মুখের দিকে চোখ পড়লে হাদি থতমত খেয়ে তাকায়। দাদু একবার তার দিকে তো আরেকবার রজনীর দিকে তাকাচ্ছে। হাদি মেকি হেসে বলে, “দাদু ঘুমান, এখনো অনেক পথ বাকি।” ভদ্রলোক কিছু বললেন না। হাদি আর রজনীর দিকে চেয়ে কেবল হেসে আবারো চোখ বুজল। হাদি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। চোখে পড়ল হিয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হঠাৎ-ই জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উল্টোপথে পা বাড়ালো। হাদি ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল ক'সেকেন্ড। এরপর সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে নিল। যেন তার হিয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র যায় আসেনা। হিয়া কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে থেমে যায়। তাকায় হাদির দিকে৷ হাদিকে এই প্রথম কোনো মেয়ের সাথে এভাবে কথা বলতে দেখল সে। একটি মেয়ের পাশে বসতেও দেখল এই প্রথম। হিয়া রজনীর দিকে তাকালো একবার। মেয়েটা সত্যিই খুব সুন্দর। আর তাই হাদি ভাই একেবারে গলে গেল? হিয়ার হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। পাষাণ হৃদয় ভাই আর তার আরেক বন্ধু পাষাণ হাদি, কেউ তাকে একটুও ভালোবাসেনা। হিয়া খুব করে চাইলো হাদি একবার দেখুক তার দিকে। অন্তত এটা দেখতে একবার চোখ খুলে তাকাক যে, সে ঠিক আছে কি-না! কিন্তু হাদিকে নির্বিকার দেখে মেয়েটার বুক ভেঙে আসে। ধীরে পায়ে উল্টোদিকে হাঁটে আর নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে। __________________ নিলয় নীতির সামনের দাঁড়িয়ে গা টানা দিয়ে বলে, “সকালের পর থেকে কিছু খাইনি। যা ভাত এনে আমাকে খাইয়ে দে তো নীতিমালা।” নীতি আড়চোখে একবার নিলয়ের দিকে তাকালো। এরপর মুখ ফুলিয়ে বলে, “পারবো না। তোমার হাত দিয়ে তুমি খাও।” কথাটা নিলয়ের বিন্দুমাত্র পছন্দ হলো না। রেগে বলে, “আবার আমার মুখে মুখে তর্ক করছিস? সকালে যে আমার মায়ের হাতে ভাত খেয়ে পেট ভরালি ওসব খাবার উগলে দে বে'য়া'দ'ব।” নীতি উত্তরে বলে, “আমি আমার বড় আম্মুর হাতে খেয়েছি। তোমার হাতে তো আর খাইনি।” নিলয় হঠাৎ-ই মাথা সামান্য নিচু করে নীতির দিকে ঝুঁকে মৃদুস্বরে বলে, “তুই কি আমার হাতে খেতে চাইছিস নীতিমালা?” মুখে সামনে নিলয়ের মুখ দেখে নীতি শুকনো ঢোক গিলল। নিলয় মনে মনে হেসে বলে, “আমি খুব দয়ালু জানিস তো? আজ শুধু আমার হাতের থা'প্প'ড় খাইয়েছি। সময় করে তোকে লাথি, ঘু'ষি, উষ্টা আরও অনেক আইটেম খাওয়াবো। মন খারাপ করিস না, কেমন?” এরপর নিলয় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, “ফ্রেশ হয়ে আসছি। পাঁচ মিনিটে ভাত মাখবি। এক্ষুনি আসছি আমি।” নীতি কটমট দৃষ্টিতে নিলয়ের দিকে চেয়ে রে'গে শব্দ করে বলে ওঠে, “আমার ঠ্যাকা লাগেনি যে তুমি আমাকে মারবে আর আমি তোমাকে তুলে খাওয়াবো।” নিলয় মিটিমিটি হেসে বলে, “তোর ঠ্যাকাই লেগেছে। এবার চুপচাপ আমার জন্য ভাত এনে মাখতে বোস। আমি তোকে মার খাওয়াবো, আর তুই আমাকে খাবার তুলে খাওয়াবি, শোধবোধ।” নীতি কটমট চোখে তাকালো নিলয়ের দিকে। এরপর ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে আসে নিলয়ের পিছু পিছু। নিলয় ঘরের বাইরে পা রাখা মাত্রই নীতি ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয়। শব্দ পেয়ে নিলয় দ্রুত উল্টোঘুরে তাকালে দরজা বন্ধ দেখে রেগে গেল। কি পরিমাণ বে'য়া'দ'ব হয়েছে এটা ভাবা যায়? ডান হাত তুলে দরজায় থা'প্প'ড় দিতে দিতে রাগান্বিত স্বরে ডাকতে লাগলো, “বে'য়া'দ'ব দরজা আটকালি কেন? খোল বলছি। হাতের কাছে পেলে এক আছাড় মে'রে নাড়িভুড়ি সব বের করব বলে দিলাম। ওপাশ থেকে সাড়া নেই। নিলয় দাঁত কিড়মিড় করে বলে, নীতির বাচ্চা তুই দরজা খুলবি নাকি আমি দরজা ভাঙবো?” পিছন থেকে নিলয়ের বাবা ইমাম পাটোয়ারী গম্ভীর গলায় বলে, “রাত-বিরেতে কি ঘরে বসেই গু’ন্ডামি করবি তুই?” বাবার কণ্ঠে নিলয় বিরক্ত হলো। উল্টো ঘুরে বলে, “হ্যাঁ অবশ্যই করব। তোমরা বে'য়া'দ'ব মেয়ে পেলেপুষে বড় করলে আমাকে তো ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে।” ইমাম পাটোয়ারী রে'গে বলে, “তোর মতো বে'য়া'দ'ব ছেলে এই পুরো গ্রামে আর একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, বুঝলি?” নিলয়ও ভ্রু কুঁচকে বলে, “তুমি শিইওর আমি বে'য়া'দ'ব?” ইমাম পাটোয়ারীর দৃঢ় কণ্ঠ, “অবশ্যই।” নিলয় মৃদু হেসে বলে, “ঠিক বলেছ, আমি আসলেই বে'য়া'দ'ব। বাপ চরম বে'য়া'দ'ব হলে ছেলে কিভাবে আদবওয়ালা হবে বলো? শরীরে বাপের র'ক্ত নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে ছেলে তো বাপের মতোই হবে, স্বাভাবিক। তুমি একদম কারেক্ট আছো বাবা। আমি খুবই বে'য়া'দ'ব বুঝলে?” কথাগুলো বলে নিলয় তার ঘরের দিকে পথ ধরে। ইমাম পাটোয়ারী ছেলের স্বীকারোক্তিতে প্রথমে ভারী অবাক হয়। এই ছেলে এতো সহজে নিজেকে বে'য়া'দ'ব বলে মেনে নিল? এটা ভাবতে গিয়ে তার এটা বুঝতেই দেরি হয়ে গেছে যে, ছেলেটা নিজেকে বে'য়া'দ'ব বললেও তাকে চরম বে'য়া'দ'ব বলে গেছে। ব্যাপারটি বোঝার সাথে সাথেই ইমাম পাটোয়ারী রে'গে বলেন, “তুই কি আমাকে ইনডিরেক্লি চরম বে'য়া'দ'ব বলে গেলি?” নিলয় বাবার দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে, “না তো। ডিরেক্লি বলেছি। কেন তোমার জঙ ধরা মাথায় ঢুকছে না?” ইমাম পাটোয়ারী রা'গে ফুঁসছেন। সামনে স্ত্রী নিলুফাকে দেখে তিনি রাগান্বিত স্বরে বলেন, “নিলুফা তোমার ছেলেকে কিছু বলো। ওকে যাস্ট নিতে পারছি না আমি।” নিলয় মায়ের উদ্দেশ্যে বলে, “মা তোমার স্বামী বাড়ির কর্তা হয়ে মাথায় জঙ ধরিয়ে ফেলেছে। তাই সে বহুত দুঃখ পেয়েছে। তুমি তার দুঃখটা একটু কমিয়ে দিও কেমন?” কথাটা বলে নিলয় মিটিমিটি হাসে। নিলুফা পাটোয়ারী ছেলের পিঠে চাপড় মারতে নিলে নিলয় তার ঘরে দৌড় দেয়। ভদ্রমহিলা হতাশ চোখে ছেলের প্রস্থান দেখলেন এরপর রাগান্বিত স্বামীর পানে তাকালেন। এই দুনিয়ায় এরাই বোধয় একমাত্র বাপ-ছেলে আছে, যারা দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা সতীন এর মতো একে-অপরের পিছে লেগে থাকে। আর মাঝখানে তার হয়েছে যত জ্বালা। ______________ গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রজনীদের প্রায় সকাল হয়ে গিয়েছে। রজনীকে হাদি আর আরমান নওরোজ তার বাড়ি পৌঁছে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু রজনী বলেছে, সে একাই যেতে পারবে। কাউকে তার বাড়ি পর্যন্ত যেতে হবে না৷ এমন করলে বেশি ভালো হবে। রজনীর কথা মেনে তারা আর রজনীর পিছু আসেনি। একবার যখন গ্রামে ঢুকে পড়েছে তখন আর ভ'য় নেই। এইজন্য হাদি আর আরমান নওরোজ জোর করেননি। ধরনীর বুকে মৃদু আলো ফুটতে শুরু করেছে। একদিন গ্রামে ছিল না, তাতেই রজনীর মনে হচ্ছে সে একবছর পর তার গ্রামে পা রাখলো। গ্রামের মাটিতে পা রাখতেই যেন রজনী বড্ড চঞ্চল হয়ে উঠল। হাতে তার কাপড়ের ছোট ব্যাগ আর চকলেটের একটি বড় বক্স, যেটা রজনীকে হাদি ধরিয়ে দিয়েছে। বক্সটি মোটামুটি ভারি। তবে রজনীর একটু ক'ষ্ট হলেও সে বহন করতে পারছে। আজ রজনীর সবার আগে আব্বা মা আর ছোট বোনকে দেখতে ইচ্ছা করছে সবার আগে। কিন্তু সে বাড়ি যেতে ভ'য় পাচ্ছে। সে যে গ্রাম থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তার আব্বা মা তাকে অনেক বকবে না তো? মারবে না তো? এসব ভাবনা রজনীকে তার বাড়ি দ্রুত ফিরতে বাঁধা দিচ্ছে। আপাতত রজনী এসব ভাবনা চেপে রাখলো। মেয়েটির মাঝে বাচ্চাসুলভ ভাব বেশি। সে এখন যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, সে রাস্তাটি কাঁচা মাটির মিডিয়াম সাইজের একটি রাস্তা। বেলা বাড়লে যে দিক দিয়ে সাইকেল আর ভ্যান যাতায়াত করে। রাস্তার দু'পাশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালি। সকালের স্নিগ্ধ মিটিমিটি বাতাস বাতাস রজনীর গা ছুঁয়ে দেয়৷ গ্রামের কোমল মাটি, খুঁটি হীন বিশাল এই নীল আকাশ, চারিদিকে পাখির কিচির-মিচির ডাক, এমন প্রকৃতিতে রজনী নিজেকে মাতিয়ে রাখতে বড্ড পছন্দ করে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মায়ের বকুনিকে পরোনা না করে এসব মাঠ-ঘাটে এসে দৌড়ে বেড়ায় সে। যার লোভ রজনী আজও দমাতে পারলো না। একটি গাছের গোড়ায় হাতের কাপড়ের ব্যাগ আর চকলেট বক্সটি রাখে, সাথে পায়ের জুতো খুলে রাখে। এরপর পরনের বোরখা আর হিজাব খুলে ব্যাগের মধ্যে রেখে, শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে নেয়। তারপর গ্রামের আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা ধরে খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করে। দু’হাত মেলে আঁকাবাঁকা পথ ধরে কখনো হাঁটে আবার কখনো দৌড়ায়। নরম মাটির উপর খালি পায়ে হাঁটার মাঝে রজনীর মনে আনন্দের মেলা ভীর করে। গ্রামীণ মাটিতে অদ্ভুত ঘ্রাণ মেশানো থাকে যা মেয়েটাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে, এ কথা রজনী তার খেলার সাথীদের বললে তারা রজনীকে নিয়ে হাসে। রজনী বোকার মতো চেয়ে দেখে জেদ করে বলে, ‘মাটির গন্ধ আছে মানে আছেই৷ আর মাটির গন্ধ তার খুব পছন্দের।’ রজনী আপাতত তার সাথে ঘটা কান্ড সব ভুলে বসল। হাঁটতে হাঁটতে চিকন আইলে এসে পৌঁছালো। এরপর সে আইলের উপর উঠে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো। কখনো বা দৌড়ালো। দূর থেকে দু'একজন কৃষক দেখা যায়, যে যার নিজস্ব কাজে ব্যস্ত। অনেক সকাল হওয়ায় গ্রামের সব মানুষ এখনো বাড়ি থেকে বের হয়নি। রজনী আইল পেরিয়ে একটি ছোটোখাটো মাঠে এসে পৌঁছায়। যেখানে তারা বান্ধবীরা প্রতিদিন কিতকিত বা এক্কা-দোক্কা খেলে। খেলাটি খেলার জন্য এখনো আয়তাকার ঘর আঁকা আছে। আছে ছোট্ট একটি মাটির হাঁড়ির টুকরো। গত দু'দিন না খেলে রজনীর যেন তৃষ্ণা পেল খেলার। সে শাড়ির আঁচল আরেকটু ভালোভাবে কোমরে গুঁজে গুটি দাগ কাটা ঘরে ফেলে। এরপর রজনী দু'হাতে শাড়ি ধরে সামান্য উঁচু করে ডান পা উঁচু করে কিতকিত বলে একা একাই খেলতে শুরু করে। এভাবে পুরো দাগ কাটা সব ঘর ঘুরে এসে শেষ মাথায় থামে। এভাবে পুরো খেলাটা রজনী পুরো তিনবার খেলে হাঁপিয়ে গিয়েছে। বেলা বাড়তে শুরু করেছে, সাথে গ্রামের মানুষ৷ রজনী ভ'য় পেল। গ্রামের মানুষ তাকে দেখলেই চিনে ফেলবে। মেয়েটি যেখানে ছিল, সেখান থেকেই দৌড় লাগালো সেই গাছের দিকে, যেখানে তার ব্যাগ, বক্স, জুতা রেখে এসেছে। মাঠ আর সেই গাছের মাঝখানে ছোটোখাটো একটি পুকুড় ছিল, ওপাশ থেকে এপাশে দেখা যায়। রজনী এক দৌড়ে মাঠ থেকে গাছের এখানে এসে দাঁড়ালো। এরপর ব্যস্ত হয়ে বোরখা আর হিজা কাপড়ের ব্যাগের মধ্যে রাখে। মাটিতে বসে জুতা পরে। সবকিছু ঠিকঠাক করে গুছিয়ে নিচ্ছে বাড়ি যাবে বলে। এই গ্রামের মানুষের চেয়ে বাড়ির মানুষ ভালো। রজনীর আপাতত এটাই মনে হচ্ছে। রজনীকে একবার কেউ দেখলে রাস্তাতেই থুতু ছুঁড়তে শুরু করবে। রজনী যে গাছের নিচে বসা, সেখান থেকে ডানদিকে প্রায় পাঁচ হাত দূরত্বে হৃদয় দাঁড়ানো। ডান পা উঠিয়ে গাছের সাথে ঠেকিয়ে রেখে পিঠ গাছের সাথে হেলান দিয়ে রেখেছে। বাম পা মেলে রাখা। হৃদয়ের দৃষ্টি রজনীর পানে। হাতে একটি কাগজ, যেখানে সাদা আর গোলাপি রঙের মিশ্রণের কয়েকটি ফুল এঁকেছে হৃদয়। যে ফুলের নাম ‘প্যারট-ফ্লাওয়ার’। যে ফুলগুলো দেখতে একদম তোতাপাখির মতো। যার ফলে এর নাম দেয়া হয়েছে প্যারট-ফ্লাওয়ার। ফুলগুলোর মাঝ বরাবর রজনীর একটি ছবি পিছন থেকে এঁকেছে হৃদয়। যখন রজনী এক্কা-দোক্কা খেলছিল, তখনকার ছবি। যেখানে রজনীর এক পা উঁচু, আরেক পা দিয়ে গুটি এগিয়ে নিচ্ছিল। মূলত রজনীর পরনে গোলাপি আর সাদা রঙের মিশ্রণ কালারের একটি শাড়ি পরা। যা দেখে হৃদয়ের সর্বপ্রথম গোলাপি-সাদা রঙের সংমিশ্রণে ‘প্যারট-ফ্লাওয়ার’ ফুলটির কথাই মাথায় এসেছে। আঁকাআঁকি হৃদয়ের র'ক্তে মিশে আছে, হুটহাট রাস্তায় বসে আঁকায় ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার স্বভাব আছে হৃদয়ের। আর হৃদয়ের আঁকার হাত-ও নজর কারা। এই যে গোলাপি-সাদা রঙের মিশ্রণ কালারের এতোগুলো ‘প্যারট-ফ্লাওয়ার’ ফুলের মাঝে গোলাপি-সাদা রঙে মিশ্রিত শাড়ি পরিহিত রজনীর ছবি এঁকেছে, দু'টোই ভীষণ-ই জীবন্ত মনে হচ্ছে। রজনীর ছবির উপরে লেখা, ‘Wow! You look really like a Parrot-flower. I love it.’ হৃদয় আঁকার সব জিনিসপত্র পিঠের ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছে অনেক আগেই। পুরো শরীরে বালু মাখানো। একদম মাথা থেকে পা পর্যন্ত। মাথা ভরৃতি বালু, গা ভর্তি বালু। গা চিটচিটে হয়ে আছে। কিন্তু হৃদয়ের সেসবে হেলদোল নেই। এভাবে সে খুব মন দিয়ে ছবিগুলো এঁকেছে। গম্ভীর মুখাবয়ব এখনো রজনীর পানে। দৃষ্টি জুড়ে শীতলতা। হঠাৎ-ই পাশ থেকে নিলয়ের বিস্ময় কণ্ঠে হৃদয়ের ধ্যান ভাঙে, “কি রে ভাই? কে তুই? দখতে তো একদম আমার বন্ধু হৃদয়ের মতোই লাগছে। কিন্তু তোকে দেখে মনে হচ্ছে তুই সারারাত বালুর মধ্যে গড়াগড়ি করে এসেছিস। আর আমার বন্ধু হৃদয় বালুর একটা দানা তার শরীরে পেলে ও নাক সিটকে দশবার গোসল করতে দৌড়ায়।” হৃদয় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত চোখে তাকায় নিলয়ের দিকে। রে'গে বলে, “থা'প্প'ড় খেতে না চাইলে মুখ বন্ধ রাখ।” নিলয় ভ্রু কুঁচকে বলে, “নাহ্ তুই আমার গোমরামুখো বন্ধু হৃদয়-ই। কিন্তু তোর এ অবস্থা কেন রে? তোর দাদুরা কি সুন্দর পরিপাটি হয়ে আমাদের বাড়ি ফিরল। আর তুই গায়ে বালু মাখিয়ে দিব্যি এখানে দাঁড়িয়ে আছিস। ভাই তুই পা'গ'ল টা'গ'ল হয়ে যাসনি তো?” হৃদয়ের দৃষ্টি তখনো রজনীর দিকে। নিলয়ের কথায় তার কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে উঠেছে। তবে সে নিলয়ের দিকে মনোযোগ দিল না। নিলয় হৃদয়ের সাড়া না পেয়ে ওতো গুরুত্ব দিল না। এ তো এমনই। কিন্তু তার দৃষ্টি হৃদয়ের ধরে রাখা কাগজের দিকে যায়। যেখানে কয়েকটি পাখির মতো ছবি আঁকা, তার মাঝে একটি মেয়ের ছবি আঁকা। নিলয়ের বুঝতে একটু দেরি হয়না, এই নিখুঁত আঁকা ছবি হৃদয়ের হাতের আঁকা। এ পর্যন্ত নিলয় স্বাভাবিকভাবেই নিল। এ আঁকতে আঁকতে কি কি যে আঁকে নিজেও জানেনা। তবে মেয়েদের তো আঁকেনা। তবুও নিলয় ধরেই নিল, প্রকৃতির সৌন্দর্য ফোটাতে গিয়ে মনের ভুলে নাহয় এঁকে ফেলেছে। তবে মেয়েটির ছবির উপর কি যেন লেখা। নিলয় পড়তে নিল, ‘Wow! You look really like a Parrot…. বাকিটুকু পড়ার আগেই হৃদয় কাগজটি গুটিশুটি মেরে হাতের মুঠোয় পুড়ে উল্টোদিকে ছুঁড়ে ফেলে নিলয়ের দিকে রেগে তাকায়। নিলয় শব্দ করে বলে ওঠে, “আরে আরে দেখতে দে। প্যারট এর পর কি যেন লেখা…. হৃদয় রে'গে বলে, “আমার পার্সোনাল জিনিসের দিকে নজর দেয়ার সাহস কোথায় পেয়েছিস?” নিলয় তব্দা খেয়ে বলে, “লে খালু, তোর আবার পার্সোনাল জিনিস কবে থেকে হলো ভাই? তোর সবই তো আমরা জানি দেখি। শুধু ইয়েটা দেখাই বাকি ছিল। তুই ঘুমিয়ে গেলে ওটাও নাহয় সময় করে একবার দেখে নিতাম।” হৃদয় নিলয়ের গালে একটা থা'প্প'ড় মেরে দেয়। হৃদয় গালে হাত বুলায় আর অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়, “ওমাগো, আমার চাপাটা গেল রে!” হৃদয় রজনীর দিকে তাকালো। যে ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সে আর এখানে দাঁড়ালো না। উল্টোদিকে পথ ধরল৷ উদ্দেশ্য শহরে যাওয়া। হৃদয়ের বাড়ির উল্টোপথে যেতে দেখে নিলয় দ্রুত হৃদয়ের পিছু পিছু আসতে আসতে বলে, “আরে ভাই যাচ্ছিস কোথায়? আর তোর গায়ে এতো বালু কেন রে?” হৃদয়ের বিরক্তি কণ্ঠ, “বালুর ট্রাকে এসেছি তাই।” নিলয় বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকালো হৃদয়ের দিকে। গ্রামে এর কি এমন কাজ পড়েছিল যে বালু দেখে নাক সিটকানো মানুষ বালুর ট্রাকে করে তাদের গ্রামে এসেছে। তাও আবারও যে গ্রাম এই হৃদয়ের অপছন্দের জায়গা, সেখানে। নিলয় মাথা চুলকে বলে, “আচ্ছা এসব পরে শুনব। এখন বাড়ি চল। ওদিকে কই যাস?” হৃদয়ের গম্ভীর কণ্ঠ, “কাজ শেষ।” নিলয় ভ্রু কুঁচকে বলে, “কি কাজে এসেছিলি রে? গ্রামে আসতে না আসতেই শেষ হয়ে গেল?” হৃদয় ছোট করে বলে, “নিজের জিনিস দেখতে এসেছিলাম।” নিলয় বিস্ময় কণ্ঠে বলে, “কিহ্ এই গ্রামে তোর নিজের জিনিস আছে? এরপর নিলয় দাঁড়িয়ে গিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে বলে, ইয়া আল্লাহ, পা'গ'ল আমি হলাম না-কি এই হৃদয়হরণ হলো? প্লিজ আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দাও। ও পাগল হলে আজকের সূর্যটা পশ্চিম দিকে উঠিয়ে দিও। তাহলেই হবে। অতঃপর আবারও এক দৌড়ে হৃদয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে, “ভাই তোর নিজের মানুষটা কে একটু বল। নয়তো আমার এক্ষুনি বদ-হজম হয়ে যাবে।” হৃদয় পায়ের গতি বাড়ায়। উত্তরে বলে, “প্যারট-ফ্লাওয়ার।’ নিলয় দাঁড়িয়ে যায়। ওই ছবির উপর এরকম কিছু একটা লেখা দেখেছিল মনে হলো না? নিলয় মাথা চুলকে বলে, “এই প্যারট-ফ্লাওয়ার টা আবার কি রে? খায় না মাথায় দেয়?” হৃদয় হাঁটতে হাঁটতে পিছু ফিরে একবার তাকায়। অনেক দূরে এগিয়ে যাওয়া রজনীর পানে দৃষ্টি রেখে সূক্ষ্ম হেসে উচ্চারণ করে, “She is a cute girl.” চলবে .... ….... |

0 Comments