গল্প: মেঘবরণ প্রেম (পর্ব:০৪)




লেখিকা:আসফিয়া রহমান
 
পর্ব - ০৪


 


 ------------------



৯.


রাবেয়া বেগম হন্তদন্ত হয়ে কেবিনে ঢুকলেন। পিছে পিছে

ঢুকলো অর্ক, ইরা আর প্রীতি। শুভ্র আলগোছে অনিন্দিতার

হাতটা ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো। রাবেয়া বেগম মেয়ের কাছে

এসে অস্থির হয়ে কপালে হাত ছোঁয়ালেন।জ্বর বোধহয় কিছুটা

কমেছে। তারপর ইরা আর প্রীতির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস

করলেন, "আজকে রাতটা কি এখানেই থাকতে হবে?" 

"হ্যাঁ আন্টি, ডাক্তার তো তাই বলল।"

রাবেয়া বেগম এবার শুভকে খেয়াল করলেন। শুভ্র সালাম দিল ওনাকে,

"আসসালামুয়ালাইকুম আন্টি!" 

"ওয়ালাইকুম আসসালাম। তুমি ইরার ভাই?" 

"জ্বী আন্টি।" 

"তোমাদেরকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব বাবা..."

ইরা এগিয়ে এলো রাবেয়া বেগমের কাছে। 

"এভাবে বলছ কেন আন্টি? অনু আমাদের বান্ধবীর চেয়ে বেশি বোন। ওর

পাশে আমরা থাকবো না তো, কে থাকবে?"



রাবেয়া বেগম ইরার পিঠে হাত বুলিয়ে অনিন্দিতার দিকে তাকালেন,

"মেয়েটা এত জেদি হয়েছে, কি বলবো...

 কোনো কথা শোনে না।

 নিজে যা বুঝবে তাই।

বিকেলে আমি বারবার নিষেধ করলাম, যেও না।

 এই জ্বর গায়ে নিয়ে বের হইও না।

 কোন কথা যদি শোনে সে..."



প্রীতি যোগ দিল ওনার সাথে, "কথা না শুনেই তো নিজের এই অবস্থা

করেছে।

 কালকে আমার বাসা থেকে যখন বের হলো,

আমি বারবার বললাম গাড়িটা নিয়ে যেতে।

কোন কথা না শুনে হনহন করে বের হয়ে গেল।

 তারপর মাঝ রাস্তায়

বৃষ্টির মধ্যে ফেঁসে গেল!"



ইরা বলল, "আমার বাসায় আসার পর যখন দেখলাম গায়ে এখনো জ্বর,

রেস্ট করতে বললাম, কিন্তু না... সে রেস্ট করবে না! তার এখনই

অ্যাসাইনমেন্ট করা লাগবে! পরে আমি আর প্রীতি জোর করে

শুইয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ করে জ্বর কি করে যে এত বাড়লো..."



শুভ্র চুপচাপ দাঁড়িয়ে অনিন্দিতার বিরুদ্ধে সবার অভিযোগ শুনছিল।


অনিন্দিতার ওপর সবাই যখন অভিযোগের ঝড় তুলছে,

 সেসব শুনে বেশ অবাক হয়েছে ও।

 ‘জেদি? এতটা জেদি হতে পারে মেয়েটা? সেদিনও তো বৃষ্টির ভেতর

 কেমন চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে ছিল....

শুভ্র মাথা নাড়ল। তখনই ওর দৃষ্টি পড়ল অর্কর দিকে।

 ছেলেটা এক কোণায় গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে, কিছু বলছে না।

 শুভ্র এগিয়ে গেল ওর কাছে।

“তুমি...?”

"আমি অর্ক। অনিন্দিতা আপুর ছোট ভাই।"

শুভ্র অবাক হয়ে তাকালো, "অনিন্দিতা?"

অনিন্দিতার নামটা প্রথম শুনলো ও।

এতক্ষণ সবাই অনু বলে ডাকছিল।

পুরো নামটা শুভ্র একবারও শোনেনি।

ওর বুকের ভেতর যেন হালকা ধাক্কা লাগল।

 যার হাত ধরে রেখেছিল কিছুক্ষণ আগেই,

 তার নামটাও এই পর্যন্ত জানত না! নামটা বারকয়েক মনে মনে আওড়াল ও—


“অনিন্দিতা… নামটা কি ওর মতোই দৃঢ় শোনাচ্ছে?”



“অনিন্দিতা…” শুভ্র আস্তে করে নামটা উচ্চারণ করল,

“তোমরা সবাই ওকে অনু বলে ডাকো?”

অর্ক মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ।”

“ও… সবসময়ই কি এমন একগুঁয়ে?” 

অর্ক ছোট্ট করে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, সবসময়।

ওর মত পাল্টানো খুব কঠিন।”

শুভ্র তাকালো মেয়েটার দিকে।

গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এখন সে।

"ভাইয়া, বাসায় যাবে না?" 

ইরার কন্ঠে ফিরে তাকালো শুভ্র, "হ্যাঁ, যাবো চল..."

রাবেয়া বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শুভ্র, ইরা বেরিয়ে পড়ল।

 প্রীতিও কাল আসবে বলে চলে গেলে রয়ে গেল রাবেয়া বেগম আর অর্ক। 

অনিন্দিতার জ্বর নেমে গেল মাঝরাতে।

গরমে হাঁসফাঁস করে উঠে বসলো ও।

অন্ধকার ঘরটা অপরিচিত ঠেকছে।

মৃদু আলোয় আশেপাশে তাকিয়ে অনিন্দিতা বুঝলো এটা হসপিটাল।

 অবাক হলো মেয়েটা। 

"এখানে কিভাবে এলাম আমি?"

অনিন্দিতা উঠে বসতে গিয়ে হাতে টান খেল।

 মেয়েটা কেঁপে উঠল ব্যথায়। "আহ্!"

ততক্ষণে পাশের চেয়ার থেকে অর্ক লাফিয়ে উঠে এসেছে,

“আপু! উঠো না, স্যালাইন লাগানো আছে!”

অনিন্দিতা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের দিকে,

“তুমি এখানে? আমি… হসপিটালে কেন?”


অর্ক ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল,

“তোমার জ্বর ১০৪ ডিগ্রিতে উঠেছিল।

 ডাক্তার বলেছিল রাতে অবজারভেশনে রাখতে।”

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

 "আমাকে এখানে এনেছে কে?

আমি তো ইরার বাসায় ছিলাম!”

অর্ক হেটে গিয়ে কেবিনের সাদা লাইটটা জ্বালালো,

 “ইরা আপু আর প্রীতি আপু।

ওরা রাতেই চলে গেছে।”

অনিন্দিতা বালিশে হেলান দিয়ে বসল।

মাথাটা ভারী লাগছে, চোখ ঝাপসা। অর্ক বসে আছে পাশের চেয়ারে।

রাবেয়া বেগমকে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে ও।

শুধু শুধু দুটো মানুষের হসপিটালে থাকার কোন মানে নেই।

অনিন্দিতা আহামরি এমন কোন অসুস্থ হয়নি!

“আপু, পানি খাবে?” 

অর্কর কথা শুনে অনিন্দিতা পাশ ফিরে তাকালো ভাইয়ের দিকে।

মাথা নাড়িয়ে বলল, “না… ঠিক আছি।”


তারপর একটু থেমে জিজ্ঞেস করল,

“অর্ক… কাল রাতে কে ছিল এখানে?”

অর্ক অবাক হয়ে তাকাল, “কে মানে?”

“মানে… কারো হাত… মানে আমার হাতটা কেউ ধরে ছিল মনে হয়…

” ওর কণ্ঠে বিভ্রান্তি,

“আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম নাকি?”

অর্ক প্রথমে অবাক হলো। তারপর ওর মনে পরলো,

 কাল রাতে ওরা যখন হসপিটালে এসেছিল,

কেবিনে তখন অনিন্দিতার পাশে শুভ্র বসা ছিল।

ওদেরকে ঢুকতে দেখেই শুভ্র অনিন্দিতার হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। 

"শুভ্র ভাই ছিল।”



“শুভ্র ভাই? এই 'শুভ্র'টা আবার কে? সে আমার হাত ধরতে যাবে কেন?

” অনিন্দিতা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে হড়বড় করে কথাগুলো বলতেই অর্ক তাড়াতাড়ি বলল,


 "রিল্যাক্স, রিলাক্স আপু! শুভ্র ভাই তোমার বান্ধবী ইরা আপুর কাজিন..."

অনিন্দিতা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো অর্কর দিকে,

 "ইরা আপুর কাজিন মানে? সে এখানে আসবে কোত্থেকে?"

অর্ক একটু গলা খাঁকারি দিল,

অপ্রস্তুত গলায় বলল,

“মানে... ইরা আপু বলছিল, শুভ্র ভাই ওদের বাসায় এসেছিল,

তখনই তোমার জ্বর বেড়ে যায়। তো,

তখন ওরা একসাথে তোমাকে ক্লিনিকে নিয়ে আসে।”

অনিন্দিতা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল অর্কর দিকে।

কথাগুলো কিছুই পুরোপুরি ধরতে পারছে না ও।

“মানে, আমি ওর বাসায় গিয়েছিলাম…

তারপর জ্বর… তারপর ক্লিনিক… শুভ্র…

” ওর ঠোঁট থরথর করে কেঁপে উঠল,

 হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়েছে।

অন্ধকার ঘরে আবছা আলোয় চেয়ারে বসা একটা ছায়ামূর্তি,

সে ফিসফিশিয়ে বলছে—

"আমি এখানেই আছি…"

অনিন্দিতার বুকের ভেতর একটা ধাক্কা খেল। ও চোখ নামল নিচে।

 শিরায় টানটান স্যালাইনের সূচটা যেন হঠাৎ করে ভারী মনে হলো।

 সেদিকে তাকিয়ে ও ঠোঁট নাড়ল প্রায় নিঃশব্দে, “শুভ্র…”

অর্ক ওর হাতের ওপর হাত রাখল,

 “কী হলো আপু, চুপ করে গেলে যে?"

“কিছু না,” অনিন্দিতা ফিসফিস করে বলল,

 “আমার মনে হচ্ছে কেউ আমার হাত ধরে রেখেছিল অনেকক্ষণ… খুব নরম…

শান্ত গলায় কথা বলছিল।"

অর্ক একটু হেসে ফেলল, “তাহলে হয়তো স্বপ্নই, আপু!

শুভ্র ভাই তো তোমার পাশে চুপচাপ বসে ছিল, কথা পর্যন্ত বলছিল না।”

অনিন্দিতা কিছু বলল না। ওর দৃষ্টি হারিয়ে গেল জানালার বাইরে।

ভোরের আবছা আলোয় আকাশটা কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে।

ওর মনে হচ্ছে—

ওটা স্বপ্ন না, খুব বাস্তব কিছু। ওর হাতের ভেতরে যে উষ্ণতাটা এখনো লেগে আছে,

সেটা কল্পনা হতে পারে না।

মেয়েটা ধীরে ধীরে চোখ বুজল।

শুনতে পেল সেই কণ্ঠস্বরটা আবার—

"আমি এখানেই আছি…"

ও অস্ফুট স্বরে ফিসফিসিয়ে ঠোঁট নাড়াল,

“কে আপনি, শুভ্র?”


১০.



শুভ্র সারারাত ঘুমাতে পারেনি। ইরাকে নামিয়ে দিয়ে ও যখন বাসায় ফিরেছে,

তখন রাত প্রায় দুটো ছুঁইছুঁই। ঘরে ঢুকে ও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল সোফায়।

ঘরের বাতি নেভানো থাকলেও বিশাল জানালাটার গ্রিলের

ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় ঘরটা আবছা আলোকিত।


শুভ্র সোফায় গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করল।

 সাথে সাথেই অনিন্দিতার মুখটা ভেসে উঠল মানসপটে। সেই নিস্তেজ মুখটা,

 ক্লান্ত চোখদুটো, আর ফিসফিসে কণ্ঠস্বরটা—


"শুভ্র… তুমি চলে যাবে না তো?"

শুভ্রর বুকের ভেতর কেমন হাহাকার করে উঠল আচমকা।

একজন প্রায় অপরিচিত মেয়ে, যাকে দু’দিন আগেও চিনত না ও, তার একটা শব্দ,

একটা স্পর্শ— এতটা গভীরে গিয়ে ছুঁয়ে ফেলতে পারে কাউকে?

আবছা আলোয় ওর দৃষ্টি পড়ল নিজের হাতে।

মেয়েটা কতক্ষণ ওর হাতটা ধরে রেখেছিল ঠিক মনে নেই,

 কিন্তু সেই উষ্ণতা এখনো টের পাচ্ছে ও।

আঙুল দিয়ে আলতো করে ছুঁল হাতটা, যেন আবার অনুভব করতে চাইছে সেই মুহূর্তটা।

ওর মাথার ভেতর তখন ক্রমশ বেজে চলেছে অনিন্দিতার জ্বরতপ্ত কণ্ঠস্বর— 


"তুমি আমার আব্বু না? তাহলে তুমি কে?"


"শুভ্ররা তো সবসময় চশমা পরে... তোমার চশমা কোথায়, শুভ্র?"

ওর ঠোঁটে অজান্তেই একরাশ মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

“হুমায়ূনের শুভ্র…”

ও নিজের মনে ফিসফিসিয়ে বললো,

“কীভাবে আচমকাই একটা মেয়ের স্বপ্নের ভেতর ঢুকে গেলাম আমি!”


ও উঠে জানালার কাছে গেল।

 অক্টোবরের ঠান্ডা বাতাসে খানিকটা শীত শীত অনুভব হলো। 

"অনিন্দিতা..." ফিসফিস করে একবার নামটা উচ্চারণ করল শুভ্র,

 “মেয়েটা ঘুমাচ্ছে বোধহয় এখন, জ্বর কমে গেছে হয়তো,

” ভাবতে ভাবতে ঠিক পরের মুহূর্তেই একটা অদ্ভুত চিন্তা মাথায় এল ওর—

“যদি আবার ওর জ্বর বাড়ে?

ও যদি আবার আমাকে খোঁজে?”


ওর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কিসের টানে, কে জানে?



To be continued...


যারা পড়বেন সবাইকে রেসপন্স করার অনুরোধ রইল। 

শুভ্র-অনিন্দিতাকে কেমন লাগছে?

 নতুন গল্প শুরু করেছি, আপনাদেরকে পাশে না পেলে আগাতে পারব না প্রিয়রা 😟


 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×