গল্প: মেঘবরণ প্রেম পর্ব - ০৫
লেখা - আসফিয়া রহমান
-------------------- ১১
. "আরে ভাইয়া, আপনি?"
অর্ক চেয়ারে বসে গেম খেলছিল।
আচমকা নক করার শব্দে দরজার দিকে তাকিয়ে অবাক হলো ও।
শুভ্র ভেতরে আসতে আসতে বলল,
"হ্যাঁ, এলাম আরকি! ইরা নামিয়ে দিতে বলল এখানে,
তাই ভাবলাম আমিও একটু দেখেই যাই।
" শুভ্র আশেপাশে নজর বুলাতে বুলাতে বলল,
"তোমার আপু কোথায়?"
"আপু একটু ওয়াশরুমে গিয়েছে।
বসুন ভাইয়া!" বলে অর্ক উঠে দাঁড়ালো।
শুভ্র চেয়ারটায় বসতে বসতে অর্ককে জিজ্ঞেস করল,
"জ্বর কি আছে এখনো?"
"না ভোরের দিকেই জ্বর নেমে গেছে। ডক্টর রিলিজ দিয়ে দিয়েছে।
বাসায় যাচ্ছি আমরা..."
শুভ্র কিছু বলার আগেই ভেতরের দরজাটা খুলে অনিন্দিতা বেরিয়ে এলো।
ওর পরনে একটা হালকা গোলাপি কুর্তি।
শুভ্রর চোখ আটকে গেল মেয়েটার স্নিগ্ধ বদনে।
সদ্য ধোয়া মুখশ্রীতে জলকণা চিকচিক করছে।
অনিন্দিতার দৃষ্টি প্রথমে অর্কর দিকে,
তারপর শুভ্রর ওপর এসে স্থির হলো।
দু’জনের চোখ মিলল এক মুহূর্তের জন্য।
তারপরেই অনিন্দিতা আবার অর্কর দিকে তাকালো প্রশ্নবোধক চাউনিতে।
অর্ক বোনের চাউনির অর্থ ধরতে পেরে ঝটপট বলল,
"আপু উনি শুভ্র ভাই..."
ফরমাল ড্রেসআপে থাকা সুদর্শন পুরষটার দিকে দ্বিতীয়বারের মতো
তাকালো অনিন্দিতা।
ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে পুরুষটা।
উচ্চতায় অনিন্দিতার থেকে অনেকটাই লম্বা সে।
অনিন্দিতা নিজেকে কেমন যেন বাচ্চা বাচ্চা লাগল লম্বা মানুষটার
সামনে! কী যেন একটা মনে পড়তে পড়তেও পড়লো না ওর!
মনে না পড়া কথাটা জোর করে মনে করবার জন্য অনিন্দিতা যখন
নিজের মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করছে তখনই ভেসে এলো সুদর্শন পুরষটার
ভরাট পুরুষালি কন্ঠস্বর,
"হাই!"
আচমকা ভাবনার জগৎ থেকে বেড়িয়ে এলো অনিন্দিতা।
বক্ষস্থলে কেমন যেন কাঁপুনি উঠল পুরষটার ভরাট পুরুষালি কন্ঠস্বরে।
"হ্যালো! আপনি ইরার কাজিন?"
শুভ্র মাথা নাড়ল, "ইরা আমার খালাতো বোন।
কালকে খালামনির বাসায় আপনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন...
আমি তখন ছিলাম ওখানে...
ইরাদের সাথে আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছিলাম..."
শুভ্রর কথা শেষ হতেই অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে অর্ক বলল,
"আপু, তোমরা কথা বলো,
আমি একটু বাইরে থেকে আসছি..."
অর্ক বেড়িয়ে যেতেই অনিন্দিতা শুভ্রর দিকে তাকিয়ে দ্বিধান্বিত কন্ঠে
জিজ্ঞেস করল,
"আম... আমি কি কাল রাতে কিছু বলেছি আপনাকে?
মানে উল্টাপাল্টা কিছু?"
শুভ্র অপ্রস্তুত হয়ে গেল মেয়েটার প্রশ্নে,
"আপনার মনে নেই কিছু?"
অনিন্দিতা শুভ্রর প্রশ্ন শুনে ভ্রু কুঁচকে ফেলল,
“মনে থাকা উচিত, এমন কিছু বলেছি কি?”
শুভ্র মৃদু হাসল, নিঃশব্দ হাসি।
অনিন্দিতার হৃদযন্ত্রটা যেন স্পন্দিত হতে ভুলে গেল কিয়ৎক্ষণের জন্য।
“না,” শুভ্র ধীরে বলল,
“তেমন কিছু না।”
অনিন্দিতা এদিক-ওদিক চেয়ে দৃষ্টি লুকাল।
যেন মানুষটার ওই গভীর চোখদুটোয় চোখ পড়লেই ধরা পড়ে যাবে
কিভাবে ওর হৃদযন্ত্রটা ওর সাথে বেইমানি করছে।
শুভ্র কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হাসিটা এখন পুরোপুরি
মিলিয়ে গেছে ওর ঠোঁট থেকে,
কিন্তু চোখে রয়ে গেছে অদ্ভুত এক শান্ত দৃষ্টি।
অনিন্দিতা নিজেকে ধাতস্থ করে
কৌতূহলী চোখে তাকালো পুরুষটার পানে
“তেমন কিছু না, তবে কেমন কিছু?"
শুভ্র মুহূর্তখানেক চুপ করে রইল।
তারপর কিয়ৎক্ষণ পূর্বে অনিন্দিতার হৃদয় তোলপাড় করা সেই ক্ষীণ
হাসিটা আবার ফিরল ওর ঠোঁটের কোণে ,
“আপনি বলছিলেন— ‘শুভ্ররা তো চশমা পরে..
. তোমার চশমা কোথায়, শুভ্র?'"
এক মুহূর্তের জন্য অনিন্দিতা স্তব্ধ হয়ে গেল।
চোখের পাতা কাঁপল ওর।
তারপর অপ্রস্তুত গলায় চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
“আমি এমন বলেছি?
সিরিয়াসলি?”
“হ্যাঁ,” শুভ্র মাথা নাড়ল, “খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে।
যেন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ চশমা না পরা!”
অনিন্দিতা বিব্রত হলো ভীষণ।
ঠোঁটের কোণে অপ্রস্তুত হাসি ফুটিয়ে খুব নিচু গলায় আবার জিজ্ঞেস
করল,
“আর কী বলেছি?”
শুভ্র এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল অস্বস্তির ভারে নত
ঘন কৃষ্ণ পল্লববিশিষ্ট আঁখিযুগলে।
তারপর ধীর কন্ঠে বলল, “আরো বলছিলেন—
‘শুভ্র… তুমি চলে যাবে না তো?’”
মেয়েটা চোখ বন্ধ করে ফেলল এবার।
মানুষটার ধীর কন্ঠস্বর অনিন্দিতার বুকের ভেতর মৃদু কম্পন তুলল
। ও কথা খুঁজে পেল না কিছুক্ষণ।
তারপর আস্তে করে বলল,
“আমি এমন বলেছি?”
"জ্বরের ঘোরে বলেছেন।
আমি কিছু মনে করিনি।
তাই এগুলো নিয়ে এত অস্বস্তিতে পরার কিছু নেই।”
ঠিক তখনই একটা হাসির আওয়াজ শোনা গেল।
অনিন্দিতা চমকে তাকাল দরজার দিকে,
শুভ্র সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
"কিরে, কালকে জ্বরের ঘোরে এসব বলেছিস ভাইয়াকে?
" ইরা হাসতে হাসতে ভেতরে ঢুকল।
পেছনে প্রীতি। প্রীতিও হাসছে।
অনিন্দিতা লজ্জায় জ মে গেল এবার। ওর পাকানো চোখের দৃষ্টি ছুটল ইরার মুখ থেকে প্রীতির মুখে—
তারপর ধীরে ধীরে গিয়ে স্থির হলো শুভ্রর শান্ত মুখটায়।
শুভ্র কিছু বলল না, ছোট্ট করে হাসল।
সেই ছোট্ট হাসিটা অনিন্দিতার বুকের ভেতর তীব্র শিরশিরে একটা ব্যথা
ছড়িয়ে দিল আবারও।
ইরা চেয়ারের উপর ওর ব্যাগটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল
,“যেভাবে তাকিয়ে আছিস,
আমার ভাইয়ের প্রেমে-ট্রেমে পড়ে গেলি নাকি অনু...?"
“ইরা!”
"ইরা!" অনিন্দিতা তীব্র চোখে তাকাল ওর দিকে,“
একদম বাজে কথা বলবি না!”
ইরা ঠোঁট কামড়ে হাসিটা চাপতে চেষ্টা করল, তারপর নিরীহ মুখ করে
বলল,
“বাজে কথা হতে যাবে কেন!
তোর তাকানোর ভঙ্গি দেখে তো সেরকমই মনে হচ্ছে..."
অনিন্দিতা চোখ কটমট করে তাকালো।
প্রীতি এবার মুখে হাত চাপা দিয়ে হেসে ফেলল,
“ইরা, থাম তো!”
তিন বান্ধবীর এমন ধারা কথাবার্তায় শুভ্র পড়ল বেজায় অস্বস্তিতে।
এই অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে বাঁচতে মাঝপথে গলা খাঁকরি দিল ও,
"এহেম!
বলছি, আমার অফিসে যেতে লেট হচ্ছে।
আসছি আমি..." তারপর অনিন্দিতার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল,
"ভালো থাকবেন মিস অনিন্দিতা।
নিজের খেয়াল রাখবেন...
অহেতুক জেদ বজায় রাখতে গিয়ে নিজের ক্ষতি করবেন না।"
অনিন্দিতা হালকা করে মাথা নাড়লো।
শুভ্র বেরিয়ে যেতেই কেবিনের বায়ুচাপটা যেন হঠাৎ বদলে গেল।
গোয়েন্দার মত ওকে ঘিরে ধরল দুই বান্ধবী।
যেন কোনো অপরাধের সাক্ষীকে জেরা করতে যাচ্ছে।
দুজন মিলে একসাথে বলে উঠলো,
"কী ব্যাপার, মিস অনিন্দিতা?"
অনিন্দিতা থতমত খেয়ে তাকালো ওদের দিকে,
"কোথায় কী?"
ইরা অনিন্দিতার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো,
"ভাইয়া যখনই সকালে এখানে আসতে চাইল,
আমি তখনই বুঝেছিলাম 'ডাল মে কুচ কালা তো জরুর হে!"
ইরার কথার অর্থ বুঝতে পেরে অনিন্দিতা এবার আগুন চোখে তাকালো,
"সকাল সকাল এসব ফালতু কথা বলার জন্য এসেছিস তুই?
" তারপর প্রীতির দিকে ঘুরে বলল,
"প্রীতি তুইও?"
"যাক বাবা! আমি আবার কি করলাম!"
এতক্ষণ ইরার সাথে তাল মেলালেও
এখন হঠাৎ করেই প্রীতি অবুঝ সাজার ভান করল।
"ইশ্! ছিঃ ছিঃ ছিঃ তোদের জন্য উনি আমাকে কি না কি ভাবলেন আল্লাহই জানেন...!"
অনিন্দিতা মাথা নাড়ল দুপাশে।
ইরা দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
"তোর এই 'উনি'টা আমার ভাই!
চিন্তা করিস না আমি বুঝিয়ে বলব ভাইয়াকে..
." বলেই চোখ টিপল ও।
অনিন্দিতা চোখ বড় বড় করে অমনি তেড়ে এলো ইরার দিকে
"আর একটা উল্টাপাল্টা কথা বললে আজকে তোর একদিন কি আমার
একদিন, ইরা..."
প্রীতি ইরার সামনে এসে দাঁড়ালো তাড়াতাড়ি,
"আরে আরে অনু, তুই সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছিস কেনো!
আমরা তো মজা করছি..."
"তোদের এই মজার চক্করে যে আমার বেইজ্জতি হলো,
তার বেলা?"
অনিন্দিতার গলায় বেজায় ক্ষোভ।
"আরে, অনু রিল্যাক্স! ভাইয়া অমন মানুষ নয়।
ও আমাদের এসব কথা পাত্তাই দেয়নি!
আর তাছাড়া ভাইয়ার তো গার্লফ্রেন্ড আছে
গার্লফ্রেন্ডের জ্বালায় অতিষ্ঠ জীবনে এসব ছোটখাটো কথা পাত্তা দেওয়ার
সময় কোথায় ওর!"
ইরার কথাগুলো শুনতেই আচমকা অনিন্দিতার মাথায় যেন বিনা মেঘে
বজ্রপাত হলো।
সব কথা বাদ দিয়ে ইরার বলা ওই অর্ধেক লাইনটাতেই আটকে গেল ও-
'ভাইয়ার তো গার্লফ্রেন্ড আছে,'
অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ইরার দিকে তাকিয়ে রইল ও।
খানিক পরে নিজের মনে মাথা নাড়িয়ে চোখ সরিয়ে ফেলল অন্যদিকে।
ওএত অবাক হচ্ছেই বা কেন?
এমন একজন সুদর্শন পুরুষের গার্লফ্রেন্ড থাকাটা আহামরি আশ্চর্যের
কিছু নয়।
বরঞ্চ না থাকলেই ব্যাপারটা আশ্চর্যের হতো।
"আপু, বাসায় যাবে না?"
অর্কর কণ্ঠে অনিন্দিতা চমকে বাস্তবতায় ফিরল।
“হুঁ… আমি রেডি, চল যাই।”
"চলো, এদিকের ফরমালিটিস ডান।"
"হুঁ..."
অনিন্দিতার কণ্ঠস্বর প্রাণহীন।
শুভ্র ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ডের কথাটা শোনার পর থেকেই অনিন্দিতার
চোখমুখে যে সূক্ষ্ম পরিবর্তনটা এসেছে,
সেটা চোখ এড়ায়নি প্রীতির।
তবে ও প্রকাশ করল না সেটা।
অনিন্দিতাদের সাথে নিঃশব্দে ত্যাগ করলো হসপিটালের কেবিন।
To be continued...
ভালোভাবে প্রেমে পড়ার আগেই মাসুম মেয়েটাকে ছ্যাকা দিয়ে দিলাম গাইজ! ক্যাইসা লাগা? 😼 |
0 Comments