গল্প: শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:০৮)


 

লেখিকা:সুরভী আক্তার


পর্ব:০৮


 

ভীত শ্যামার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে । পিছন ফেরার আগে ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়ায় খরগোশটাকে কোলে নিয়ে । এতক্ষণে নজরে আসে চারপাশটা । সামনে ঘন জঙ্গল । বন্য গাছপালায় ছেয়ে আছে চারপাশ । বিশাল বিশাল গাছের ছায়ায় দুপুরের সময়টাকেও সন্ধ্যার মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে ‌। শ্যামার ভীত চোখ দুটো গোল গোল হয়ে যায়, কোলের খরগোশটাকে একবার দেখে শুকনো ঢোক গেলে শ্যামা । হাতে তাজা রক্ত লেগে আছে । শ্যামা খরগোশটাকে দেখার মাঝেই পিছন থেকে আবারো একটা শক্ত কন্ঠ ভেসে আসে.. দাঁতে দাঁত পিষে কেউ বলে উঠলো...


" কথা কানে যাচ্ছে না ? কে তুমি ? আমার শিকারকে মুক্ত করার সাহস কোথা থেকে পেলে তুমি ? 


শ্যামার বক্ষ স্থল ধক্ করে ওঠে । সম্বিত ফিরে আসে । ধীরে ধীরে শরীর ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকায় শ্যামা । সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত সুঠাম দেহি এক সুপুরুষ নজরে আসে শ্যামার । সাদা পাঞ্জাবির উপর কালো মোটা শাল আড়াআড়ি ভাবে কাঁধে জড়িয়ে রাখা । পিছনে দুহাত গুটিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে ।‌ কিছু মুহূর্তের জন্য শ্যামার চোখ আটকে যায় তার উপর । উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রঙের লোকটার নাকের ঠিক পাশে ঠোঁটের কোণের একটু উপরে কালো একটা আঁচিল । ঘন চাপ দাঁড়ি সহ পাকানো গোঁফ । মাথার চুল গুলো সযত্নে এঁটে রাখা । লোকটি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে শ্যামার দিকে । ক্রমান্বয়ে সরু হচ্ছে তার চাহনি । শ্যামার তাকিয়ে থাকার মাঝে ধমকে ওঠেন তিনি । 


" বয়রা তুমি ,, কানে শুনতে পাও না ? 


শ্যামা চমকে উঠে খরগোশটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দু'পা পিছিয়ে যায় । পুরো শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে শ্যামার । পুরুষালি কর্কশ শব্দে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় । শ্যামা ঘন ঘন চোখ ঝাপটে বাঁকা চোখে এদিক ওদিক তাকায় । শ্যামা এখন কোথায় আছে জানা নেই ওর । এলোপাথাড়ি দৌড়ে কোথায় এসে পৌঁছেছে নিজেও বুঝতে পারছে না । শ্যামা জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে । আম্মা বলেছিল জঙ্গলের ভিতরে না যেতে । এদিকে ফুলিও নেই । শ্যামা কখনো একা একা এদিকে আসে নি । সামনে এক অচেনা অজানা পুরুষ দাঁড়িয়ে । অজানা আশঙ্কারা হানা দেয় ভাবনার মাঝে । জঙ্গলের কালো অন্ধকার বাড়ছে ধীরে ধীরে । শ্যামা চঞ্চল চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে তাকায় । শ্যামার মনে হচ্ছে এক্ষুনি জঙ্গলের কালো অন্ধকার গ্রাস করে নেবে ওকে । শ্যামা ঢোক গিলে মৃদু স্বরে ফুলিকে ডাকে....


" ফু..ফুলি.....


লোকটার সরু চাহনির সাথে সাথে ভ্রু যুগল কুঁচকে যায় । তীক্ষ্ণ চোখে শ্যামা কে আপাদমস্তক দেখে নেয় । পাতলা ছিপছিপে গড়নের শ্যামলা রঙের মেয়েটার পড়নে ধূসর রঙা অতি সাধারণ পোশাক । গায়ে ওরনা জড়ানো । মাথায় পদ্মের মুকুট , পায়ে আলতা, হাতে রিনিঝিনি কাঁচের চুড়ি, চোখে ভয়, চোখ তুলে তাকানোর ফুরসৎ পাচ্ছে না । খরগোশটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে । শ্যামা কে খুঁটিয়ে দেখার মাঝেই পিছন থেকে ফুলির কন্ঠ ভেসে আসে । অস্ফুট স্বরে হাঁসফাঁস করে শ্যামার নাম ধরে ডাকে ফুলি....


" শ্যামা.....


শ্যামা চকিতে তাকায় । লোকটাকে পাশ কাটিয়ে ফুলি ছুটে আসে শ্যামার কাছে । ভীত হয়ে শ্যামা লুকায় ফুলির পেছনে । ফুলির পিছন থেকে  ভয় ভয় চোখে দৃষ্টিপাত করে লোকটার দিকে । লোকটা এখনো একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে । এক চুলও পরিবর্তন আসে নি তার মাঝে । তার ধারালো দৃষ্টি শ্যামার দিকে নিবদ্ধ । শ্যামা আরো গুটিসুটি হয়ে লুকায় ফুলির পেছনে । ফুলি লোকটার দিকে ঘুরে মাথা নিচু করে কুর্নিশ জানানোর ভঙ্গিতে বলে...


" সালাম নেবেন ছোট জমিদার....


লোকটা হাত উঁচিয়ে মাথা নাড়িয়ে কিছু একটা বোঝায় । ফুলি মাথা নিচু রেখেই বলে...


" ক্ষমা কোইরেন ছোট জমিদার.... আমরা পদ্ম তুলতে আইছিলাম । এইহানে আওনের আর কোন হেতু আছিল না আমগো । 


লোকটি শ্যামা কে ইশারা করে দৃঢ় কন্ঠে বলে....


" কে ও‌..?


" ও শ্যামা । ও বুঝতে পারে নাই কিছু,, জন্তুর ডাক শুইনা এইহানে আইছে । ওরে মাফ কইরা দেন ছোট জমিদার । আর কোন দিন এমন ভুল হইবো না । 


শ্যামা কে ভয় পেতে দেখে লোকটি কন্ঠে একটু কোমলতা টেনে বলে...


" এই মেয়ে , ভয় পাচ্ছো কেন তুমি ? আমি তোমাকে কিছু বলেছি ? 


শ্যামা ফুলির কাঁধের ফাঁক গলিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে । ফুলি ধীর কন্ঠে শ্যামা কে বলে...


" ভয় পাস না শ্যামা,, উনি আমগো জমিদারের পোলা,, ছোট জমিদার । আমাগো কোন ক্ষতি করবো না উনি । ভয় নাই । 


শ্যামা ধীরে ধীরে ফুলির পিছন থেকে সামনে আসে । মাথা নিচু করে দাঁড়ায় । লোকটির পিছনে দুজন লুঙ্গি আর ফতুয়া পরিহিত মোটা তাজা শক্তিশালী লাঠিয়াল এসে দাঁড়ায় ।‌ দুজনের হাতেই লম্বা লাঠি । লাঠির মাথা তীরের মতো সূচালো । অল্প চাপেই কারোর শরীরে বিদ্ধ হতে সময় লাগবে না । একজনের কাঁধে একটা বড় ধনুক । 

শ্যামা কে সামনে আসতে দেখে লোকটি কন্ঠে কঠোরতা বজায় রেখেই বলে...


" নাম কি তোমার ? 


শ্যামা চোখ তুলে তাকিয়ে আবারো চোখ নামিয়ে নেয় । ভেজা কন্ঠে মিনমিন করে বলে...


" শ্যা..শ্যামা ....


" কোন গ্রাম তোমাদের ?


" মা.. মাধবপুর । 


" এখানে কেন এসেছিলে ? 


শ্যামা তাকায় ফুলির দিকে । ফুলি শ্যামার হাত ধরে লোকটিকে বলে...


" পদ্ম তুলতে আইছিলাম ছোট জমিদার । 


" তোমাকে বলতে বলেছি ..? ওকে জিজ্ঞেস করেছি , ওকেই বলতে দাও । বলো তুমি ....


কড়া কন্ঠে চুপসে যায় ফুলি । শ্যামা চোখ বন্ধ করে নিজেকে সাহস যুগিয়ে চোখ রাখে লোকটার চোখে । চোখে চোখ রেখেই কন্ঠ ভারী করে জবাব দেয়...


" পদ্ম নিতে আইছিলাম ,, নৌকা থাইকা এই খরগোশটার গোঙানির শব্দ শুইনা এইহানে আইছি । দেহেন তো এই অবলা জন্তুটার কি অবস্থা । শিকার করার লাইগা এই অবলা জন্তু গুলারে খুঁইজা পান আপনারা ? মায়া দয়া নাই ? আপনাগো তো কোন কিছুর অভাব নাই ছোট জমিদার সাহেব । তাইলে এই পশু গুলারে শিকার কইরা কি পান আপনেরা ? 


হঠাৎ শ্যামার জবানে এতগুলো কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে যায় লোকটির । লোকটি জবাবে বলে...


" এতক্ষণ তো ভয় পাচ্ছিলে , হঠাৎ সাহস জেগে উঠলো যে ? সাহস দেখাচ্ছ মেয়ে ? কৈফিয়ত চাইছো আমার কাছে ? 


" আপনার প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করলাম । আপনি কৈফিয়ত ভাবতেই পারেন । উত্তর দেওয়া না দেওয়া আপনের ইচ্ছে । 


ফুলি শ্যামার হাত খামচে বাঁধা প্রদান করে শ্যামা কে । ফিসফিস করে বলে...


" শ্যামা উনি আমগো জমিদারের পোলা,, ওনার লগে এমনে কথা কওন ঠিক হইবো না । চল এখন, দেরি হইয়া যাইতাছে । 


" ওর কথায় কিছু মনে কইরেন না ছোট জমিদার,, আমরা এহন আহি ? 


শ্যামার হাত ধরে মাথা নিচু করে প্রস্থানের জন্য পা বাড়ায় ফুলি । কয়েক পা এগোতেই অসাবধানতাবশত ভেজা পাতায় পা পিছলে সামনে একটা গাছের সাথে বাড়ি খায় শ্যামা । ব্যথায় মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে আহ্ সূচক মৃদু শব্দ বেরিয়ে আসে । হাতের কয়েকটা চুড়ি গাছের সাথে লেগে ভেঙ্গে গুড়িয়ে পড়ে জঙ্গলের মাটিতে । একহাতে খরগোশটাকে ধরে অন্য হাতে কপাল চেপে ধরে শ্যামা । ফুলি ব্যতিব্যস্ত হয়ে শ্যামা কে ঘুরিয়ে বলে...


" কি হইলো শ্যামা ..? ব্যাথা পাইলি ? দেখি দেখি...


কপালের একটু অংশ কেটে গেছে । শ্যামা হাত সরিয়ে ফুলিকে বলে...


" কিছু হয় নাই.. চল এইহান থাইকা । 


" কিছু হয় নাই কইলেই হইলো , দেখতো রক্ত বেরাইতাছে মাথা থাইকা । 


" এই টুকুতে কিচ্ছু হইবো না ‌। চল...


শ্যামা আর ফুলি একটু এগোতেই লোকটির গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসে...


" ফুলগুলো নিয়ে যাও মেয়ে,, এইগুলোই তো নিতে এসেছিলে, রেখে যাচ্ছ যে ? 


শ্যামা আর ফুলি চকিতে পেছন ফিরে তাকায় । লোকটি একজন লাঠিয়াল কে ইশারা করতেই তিনি ফুলগুলো মাটি থেকে তুলে এগিয়ে দেয় শ্যামার দিকে । ফুলি তার হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে অপ্রস্তুত একটু হাসে ।


তড়িঘড়ি করে শ্যামার হাত ধরে সেখান থেকে চলে আসে ফুলি । নৌকা ঘুরিয়ে দ্রুত বৈঠা চালিয়ে জঙ্গলের দিক থেকে বেরিয়ে আসে । শ্যামা খরগোশটাকে জড়িয়ে ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । 

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শ্যামা দের ঘাটে নৌকা এসে পৌঁছায় । শ্যামা নৌকা থেকে নেমে ফুলির দিকে ঘুরে বলে...


" কালকে আর নৌকা লইয়া আসিস না ফুলি ,, আর যামু না কোথাও । 


" জমিদারের পোলার লগে এমনে কথা কওয়া তোর মোটেও ঠিক হয় নাই শ্যামা । 


শ্যামা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে...


" ক্যান ? আর কি এমন কইলাম আমি ? 


" ওনাগো ক্ষমতা অনেক শ্যামা.. আশেপাশের সাতটা গাঁয়ের জমিদার ওনারা । সবাই সম্মান করে তাগো ,, তাদের লগে কেউ চোখ তুইলা তাকাইয়া কথা কওনের সাহস পায় না ‌। 

আইচ্ছা বাদ দে এইসব.. তুই এখন এই খরগোশটারে লইয়া কি করবি ? 


" ওরে পালমু আমি ? আঘাত কম পাইছে , খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হইয়া যাইবো । 


" বুড়ি কিছু কইবো না ? 


" কইলে কইবো,, হের কাজই তো আমারে কথা শোনানো । 


" আইচ্ছা শ্যামা ,, আমি যাই । এই শাড়ি পইড়া বেশিক্ষণ থাকলে দম বন্ধ হইয়া যাইবো আমার । 


" আইচ্ছা যা ...


" তুই কিন্তু মনে কইরা মাথায় ব্যথার তেল লাগাইবি , ফুইলা গেছে কপাল খানা । 


শ্যামা মুচকি হেসে বাড়িতে ঢোকে । ওরনা দিয়ে খরগোশটাকে আড়াল করে দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতর হুড়মুড়িয়ে ঢোকে ।‌ অলকা আসরের নামাজ পড়ছেন । সিজদায় মাথা নত করেছেন অলকা । শ্যামা সিজদায় রত মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে । খরগোশটাকে একটা ক্যারেটের ভিতর রেখে কল'পাড়ের দিকে যায় । জঙ্গলের ভেজা মাটির কাঁদা লেগে আছে পায়ে, এতক্ষনে শুকিয়ে গেছে । হাতে ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে , কপাল কেটে সেখানে কয়েক ফোঁটা রক্ত শুকিয়ে গেছে । শ্যামা পোশাক পরিবর্তন করে ভালো করে হাতমুখ ধুয়ে নামাজ পড়ে নেয় । অলকা রাতের রান্না বসিয়েছেন বাইরের চুলায় । শ্যামা নামাজ শেষে খরগোশটাকে নিয়ে বাইরে বের হয় । কাকড়ি বুড়ি ঘরে আছেন । আর বের হবেন না তিনি । শ্যামা চুলার কাছে মায়ের পাশে বসে । শ্যামার হাতে খরগোশটাকে দেখে অলকা কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন...


" এইটারে আবার কোই পাইলি শ্যামা..? 


" জঙ্গলে পাইছি আম্মা ,, শিকারির তীর বিদ্ধ ছিল , বেশি আঘাত পায় নাই । আমি এইটারে পালমু কিন্তু...


" জঙ্গলের ভেতর গেইছিলি..? 


" হুম,, তয় বেশি ভিতরে যাই নাই । 


অলকা মুচকি হাসেন । শ্যামা গরম তেল পুড়ে খরগোশটার ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দিচ্ছে  ‌। মেয়ের কপালে একটু কাঁটা দাগ দেখে অলকা চোখ সরু করে বলেন...


" কপাল কাটলো ক্যামনে ? 


শ্যামা খরগোশটাকে টাটকা কলমি শাকের ডাটা খেতে দিয়ে নিচু স্বরে বলে...


" একটু পিছলা পড়ছিলাম আম্মা , তয় বেশি ব্যথা লাগে নাই বিশ্বাস করো । 


অলকা মেয়ের দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলেন । 


রাতের খাবার খেয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে শ্যামা । পাশে খরগোশটাকে নিয়ে ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে  । অলকা এক ধ্যানে মগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে কোন এক দিকে ।‌ অলকার উদাসীন মনভাব নজরে আসে শ্যামার । মোখলেছ খেয়ে দেয়ে নিজের ঘরে শুয়েছেন । অলকা শ্যামার কাছে ঘুমায় । মোখলেছের সাথে খুব কম কথা হয় অলকার । হাতে গোনা কয়েকটা দরকারি কথা ছাড়া মোখলেছ নিজেও আগ বাড়িয়ে কোন কথা বলেন না অলকার সাথে । শ্যামার দিকে তো ঘুরেও তাকায় না । কথা বলা তো অনেক দুরের কথা । শ্যামা ভুলক্রমেও মোখলেছের সামনে যায় না । অলকা যেতেও দেয় না । 

দুই মা মেয়ের মাঝে অনেকক্ষণ ধরেই নীরবতা চলছে । শুধু শোনা যাচ্ছে তাদের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ । ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে বাড়ির পিছনের দিক থেকে । নিরবতা ভেঙ্গে অলকা গম্ভীর শ্বাস ফেলে শ্যামার মাথায় হাত রেখে বলেন...


" তোরে আইজ একটা গল্প শোনাই শ্যামা ‌? 


শ্যামা চকিতে তাকায় মায়ের দিকে । অলকা মুচকি হাসেন মেয়ের তাকানো দেখে । ছোট বেলার কথা মনে পড়ে যায় শ্যামার । ছোট বেলায় ওদের তিন বোনকে পাশাপাশি শুইয়ে ঘুম পাড়ানোর জন্য গল্প বলতো আম্মা ‌। রুপা বড় ছিল তবুও প্রতিদিন মায়ের কাছে গল্প শোনার জন্য বায়না করতো । 

শ্যামা গদগদ হয়ে চোখ বন্ধ করে মায়ের কোলের গন্ধ টেনে বলে...


" শোনাও আম্মা...


অলকা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলা শুরু করেন...


" জানিস.. একদিন অনেক  বনিকেরা  মিইলা জাহাজে কইরা অনেক মালপত্র লইয়া বাড়ি ফিরতাছিল ‌ ‌। কিন্তু পথে, বিশাল এক সমুদ্রের ঝড়ের সম্মুখীন হয় তারা । সেই ঝড়ে হেগো জাহাজটা চুর্নবিচুর্ন হইয়া ডুইবা যায় । জাহাজে যত মালপত্র আছিলো সব ডুইবা যায়, সাথে সাথে জাহাজের সব মানুষ গুলাও মইরা যায় । কিন্তু একটা মানুষ ভাগ্যক্রমে ভাসতে ভাসতে সমুদ্রের মাঝখানের একটা দ্বীপে গিয়া পৌঁছায় । সেই মানুষটা আল্লাহর কাছে সারাদিন দোয়া করতো যে - আল্লাহ আমারে এইহান থাইকা উদ্ধার করো । একটা জাহাজ পাঠাও , যেটা আমারে উদ্ধার কইরা লইয়া যাইবো । এভাবে লোকটা সেই দ্বীপে কোনো রকমে, এক দিন কাঁটায়, দুই দিন কাঁটায়, তিন দিন কাঁটায়, এমন করতে করতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে করতে সেই দ্বীপে একটা কাঠ-খড়ের ঘর বানাইয়া থাকতে শুরু করে । একদিন সেই লোকটা মাছ ধইরা ঘরে ফেরার সময় দেখতে পাইলো তার ঘরে আগুন লাগছে । ধাঁধা আগুনে পুইড়া ছাই হইয়া যাইতাছে তার ঘর । ক্যামনে আগুন লাগলো কে জানে ? তখন লোকটা হতাশ হইয়া ধপ কইরা মাটিতে বইসা পড়ে । আল্লাহর কাছে হাত তুইলা আল্লাহকে বলে - আল্লাহ, আমার তো একটাই ঘর আছিলো, তুমি এইটাও আমার কাছ থাইকা কাইড়া নিলা । 


অলকা থামেন । শ্যামা আগ্রহ নিয়ে বলে...


" তারপর..? 


অলকা আবারো মুচকি হেসে বলতে শুরু করেন..


" লোকটা এমনে বিলাপ করতে করতে আফসোস করতে থাকে । শেষমেষ বাঁচার আশা ছাইড়া দিয়া মরার সিদ্ধান্ত নেয় । নিজেরে শেষ কইরা দেওনের লাইগা সমুদ্রের দিকে পা বাড়ায় । হেয় যখন সমুদ্রের পাড়ে যায়, তখন হেয় অবাক হইয়া দেখতে পাইলো একটা নাবিক জাহাজ লইয়া তার কাছেই আসতাছে । সেই মানুষটা  অবাক হইয়া তাকাইয়া থাকে জাহাজের পানে । জাহাজটা কাছে আইতেই লোকটা নাবিকরে জিজ্ঞেস করে - আমি এতদিন থাইকা এইহানে আছি, কেউ আমারে বাচাইতে আইলো না , আপনি কে ভাই , আপনি ক্যামনে এইহানে আইলেন ? তখন নাবিক তারে কইলো - এইহান থাইকা ধোঁয়া ওঠা দেইখা আমরা এইহানে আইছি সাহায্য করোনের লাইগা । তখন সেই লোকটা আসমানের দিকে তাকায় । বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার ‌ । হেয় দুহাত তুইলা শুকরিয়া আদায় করে আল্লাহর কাছে । 


শ্যামা মনযোগ দিয়ে শুনতে থাকে মায়ের কথা । অলকা কথা শেষ করে শ্যামার দিকে তাকায় । শ্যামা নিরবে তাকিয়ে আছে । অলকা শ্যামা কে ঝাঁকিয়ে বললো...


" এই গল্প থাইকা কি বুঝলি ক দেহি ? 


" আমাগোর জন্য আল্লাহর নেওয়া প্রত্যেকটা সিদ্ধান্তই আমগোর মঙ্গলের লাইগাই হয় । 


" আর..? 


" আল্লাহর সেই সিদ্ধান্তের লাইগা আমাগোরে অপেক্ষা করতে হইবো ।‌‌ বিশ্বাস রাখতে হইবো আল্লাহর উপর । 


" পৃথিবীর সব থাইকা দামি জিনিস হইলো - বিশ্বাস আর অপেক্ষা । এই দুইটা জিনিস কখনো নিজের থাইকা হারাইতে দেইস না শ্যামা ।  জীবন সহজ নয় শ্যামা,, সহজ কইরা নিতে হয় । কিছুটা অপেক্ষা আর কিছুটা ধৈর্য ধইরা ।


" ধৈর্যের কথা আমারে কইতাছো আম্মা ? হুহ.. ধৈর্য আমার রুহ জ্বালাইয়া দিছে আম্মা, আর কত অপেক্ষা করলে সুদিন আইবো কোন দেহি ?  কিন্তু হ্যাঁ ঐ যে কইলা বিশ্বাস - আমি বিশ্বাস রাখি আমার রবের উপর । 


" আমার একটা ভুল সিদ্ধান্তের লাইগা তোরে অনেক বড় মাশুল দিতে হইছে শ্যামা । 


" কি কইতাছো আম্মা ? তোমার সিদ্ধান্ত তো ঠিকি আছিল , খারাপ তো আছিলো আমার ভাগ্য ।  


" ভাগ্যরে দোষ দেইস না শ্যামা । ভাগ্য নির্ধারণ করে আমাগো ঐ ভাগ্য বিধাতা । ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষমতা আমার ছিল না কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমার আছিলো । আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিছিলাম , কিন্তু আর না ।


শ্যামা নিরব হয়ে যায় । অলকা একটু সময় নিয়ে শ্যামা কে ডাকেন...


" শ্যামা...


" হ্যাঁ আম্মা.....


" জীবন থেকে কোন কিছু চইলা গেইলে কখনো জীবন শেষ হইয়া যায় না মা , বরং আরো সুন্দর হইয়া যায় । তোর জীবনে যার থাকার কথা সে যত দূরেই থাকুক না কেন, সবসময় তোর কাছেই ফিইরা আইবো । 


" হঠাৎ এই কথা কইলা যে ?


অলকার মনে ঘুরছে মানিকের কাকা'র‌ বলা কথা গুলো । তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না এই বিষয়ে ‌। দোটানায় ভুগছেন । তিনি কি আবারো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন ?  মানিকের কাকা ভালো মানুষ । তার প্রস্তাব কি মেনে নেওয়া যায় না ? অলকার মনে প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছে । শ্যামার জন্য নেওয়া আর কোন সিদ্ধান্তই ভুল নিতে চান না তিনি । এবার চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন তিনি । অলকার নিস্তব্ধতার মাঝে শ্যামা ডাকে..


" আম্মা...


অলকা নড়ে চড়ে ওঠেন । চোখ নামিয়ে বলেন..


" হুম..? 


শ্যামা আর কথা বাড়ায় না । অলকা কে বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে । চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে । শ্যামা মুচকি হেসে বলে...


" ঘুমাইবা না ? 


" হুম ,, তুই ঘুমা  । 


অলকা শ্যামার পাশে শুয়ে পড়ে । মাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে শ্যামা । 


ময়নার বিয়ের এক মাসের মধ্যে ময়না আর আসেনি বাপের বাড়িতে ‌। কোন খোঁজও পাওয়া যায় নি ওর । ক'দিন আগে মোখলেছ একবার গিয়েছিলেন ময়নাকে দেখতে । তিনি ফিরে এসেছেন থেকে তার ব্যবহারে বেশ পরিবর্তন এসেছে ‌ । কাকড়ি বুড়ি অনেক বার জিজ্ঞেস করেছেন ময়নার ব্যপারে, মোখলেছ উত্তরে বলেছেন ময়না অনেক সুখে আছে ।‌ সুখের সাগরে ভাসছে ও । তবে মোখলেছের এমন পরিবর্তনের কারণ সবার অজানা । সারাদিন আড়তে থেকে অনেক রাতে বাড়ি ফেরেন । আজকাল কাজের চাপ বেড়েছে । 

অগ্রহায়ণ মাসের শেষ । ঠান্ডা পড়েছে । সকাল সকাল শীতে মুড়িয়ে থাকে পুরো গ্রাম । শীতের সকাল মানেই গ্রামিন জীবনে এক অন্যরকম শান্তি আর ধীরলতার ছোঁয়া । 

অলকা বা শ্যামা কেউই ফজরের পর আর ঘুমায় না । অলকা ফজরের পর রান্না বসান । শ্যামা মায়ের পাশে বসে চুলার কাছে আগুন পোহায় । শীতের কুয়াশামাখা ভোরে গ্রামের মানুষেরা ছুটে চলে তাদের নিজ নিজ কাজে । তাদের জীবন শুরু হয় এই কুয়াশাকে ভেদ করে । বসে থাকে না কেউই । নিজেদের জীবিকা নির্বাহের জন্য ছুটে চলে সবাই ‌ । মোখলেছ ভোরে যান মাছ ধরতে । শীতের সকালে কাঁপতে কাঁপতে নদীর ঠান্ডা পানিতে মাছ ধরতে হয় তাকে । শীতের কাঁপুনি সয়ে মাথায় গামছা বেঁধে নিজ কাজে লেগে পড়েন তিনি । 

কাকড়ি বুড়ি সকালে ঘর থেকে বের হন না । বেলা উঠলে তবেই বের হন । শীতের সকালে চাদর মুড়ি দিয়ে মায়ের পাশে বসে রান্না করা দেখে শ্যামা । অলকা মেয়েকে রান্নায় হাত লাগাতে দেন না । সামনে শ্যামা কে বসিয়ে রেখে নিজেই করেন সব টা । 

সকাল বেলা শীতের তীব্রতা মুছে গিয়ে সুর্যি মামা উঁকি দিচ্ছেন মেঘের ফাঁক গলিয়ে । সূর্যের তীব্রতা নেই । ঘড়িতে সময় তখন এগারোটা । পুর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে । সূর্যের মিষ্টি আলোয় বারান্দায় বসে আছে শ্যামা । রোদ পোহাচ্ছে বসে বসে । দুই হাঁটুতে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে গুটিয়ে বসে আছে । নরম রোদের ঝিলিক এসে পড়েছে শ্যামার শ্যামলা মসৃণ মুখের উপর । ঝিকঝিক করে জ্বলছে রোদের কোমল ঝিলিক । পাশেই ঠান্ডায় গুটি শুটি মেরে বসে আছে খরগোশটা । সে এখন পুরোপুরি সুস্থ । অলকা পাশে বসে কাঁথা সেলাই করছেন । কাকড়ি বুড়ি একটা রং ওঠা পুরোনো শাল গায়ে জড়িয়ে এসে দাঁড়ায় বারান্দার সামনে । কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ । তাকে দেখে শ্যামা জড়োসড়ো হয়ে বসে । অলকা মনযোগ দিয়ে সেলাই করছেন । কাকড়ি বুড়ি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় বলেন....


" ঐ ছেমড়ি,, একে তো তুই কালা, তার উপর আবার এমন রোইদের মধ্যে বইসা আছোস , কালা'র থাইকা আরো বেশি কালা হওয়ার ইচ্ছা জাগছে মনে ? 


অলকা তড়িৎ বেগে তাকান কাকড়ি বুড়ির দিকে । চোখ মুখ শক্ত হয়ে যায় তার । শ্যামার ভঙ্গিমায় কোন পরিবর্তন হয় না । এসব তো নিত্যদিনের ঘটনা । মাঝে কয়েক দিন বন্ধ ছিল । আবার শুরু হয়েছে । অলকার আড়ালে শ্যামা কে কথা শোনাতো কাকড়ি বুড়ি । কিন্তু আজ অলকার সামনেই শোনাচ্ছে । ঝগড়া বাঁধানোর জন্য মুখ চুলকোচ্ছে তার । শ্যামা কে কথা শোনাতে না পারলে যেন পেটের ভাত হজম হয় না । 

অলকা কন্ঠ শক্ত করে নিজের কাজ করতে করতে বলেন...


" রোইদের আলোয় অনেক উপকারিতা আছে আম্মা । রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় রোইদের আলো । শ্যামারে কুটনি কথা না কইয়া আপনিও একটু রোইদের মধ্যে বোইতে পারেন । ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমবো এতে । ডায়াবেটিসের লাইগা তো মিষ্টি খাইতে পারেন না, এই লাইগা মনে হয় মুখ দিয়া মিষ্টি কথাও বাইর হয় না । 


কাকড়ি বুড়ি ভাঙ্গা দাঁত পিষে অলকার দিকে তাকান । অলকার কন্ঠে তীক্ষ্ণ ঝাঁজ । কাকড়ি বুড়ি কথা খুঁজে না পেয়ে খরগোশটাকে ইশারা করে খ্যাক করে উঠেন...


" নিজে তো ১৯ টা বছর ধইরা বাপের অন্য ধ্বংস করতাছিস, এখন আবার আর একটা অপয়া জানোয়ার জুটাইয়া আনছোস, আমি কইয়া রাখতাছি আমার সংসার থাইকা একটা বাড়তি শস্য ও আমি নষ্ট হইতে দিমু না কিন্তু । 


বুড়ির কথা শেষ না হতেই খরগোশটা লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে যায় । কি বুঝলো কে জানে । শ্যামা খরগোশটার যাওয়া দেখে উঠে দাঁড়িয়ে কম্পন হিন কন্ঠে স্পষ্ট ভাবে বলে...


" আমারে লইয়া কথা কওন শেষ দাদি ? এবার এই অবলা প্রানিটারে লইয়া পড়লা ..? আমারে কওনের লাইগা আর কথা খুঁইজা পাইতাছো না ? মাত্র ১৯ বছরে সব শেষ ? 


" তোরে লইয়া আর কি কমু ? কইয়া লাভ আছে নাকি ? না ঘাড় থাইকা নামবি আর না মরবি, আপদ হইয়া ঘাড়ের উপর চাইপা আছোস । মাইনষেরে মুখ দেখাইতে পারি না তোর লাইগা ।  আমার সোনার সংসারে অন্ধকার নামাইয়া রাখছোস তুই । তুই যদি আমার পোলার মাইয়া না হইতি তাইলে তোর ঠাই হইতো না এই ঘরে । 


" তোমার পোলার মাইয়া হওয়াটা তাইলে আমার ভাগ্যের ব্যাপার, তাই না দাদি ? 


" ভাগ্য তো তোর ভালো , খারাপ তো আমার পোলার । তোরে না বাড়ি থাইকা বাইর করতে পারে আর না কিছু কইতে পারে । 


" আপনার পোলার পরিচয়ে ও বড় হয় নাই আম্মা , ও বড় হইছে আমার পরিচয়ে । অলকানন্দা'র মাইয়া হিসেবে ও বড় হইছে ‌।

আপনার পোলার উপর ওর কোন ভার নাই, আর না ও‌ আপনার পোলার বোঝা হইয়া আছে । সবকিছু ভুইলা যাইয়েন না । 


" ভুলমু ক্যামনে ? আর আমার পোলার পরিচয়ে ও বড় হইবো ক্যান ? হেয় কি আমগো....


" আম্মা....


কাকড়ি বুড়ির কথার মাঝে উচ্চস্বরে ঝাঁজিয়ে ওঠেন অলকা । বুড়ি বাকি কথা শেষ করতে পারে না । অলকা হাতের কাজ থামিয়ে চোখ বড় বড় করে পূর্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন কাকড়ি বুড়ির দিকে । বুড়ির ঝুলন্ত চোয়াল চুপসে যায় নিমেষেই । চোখ গোল গোল করে অলকা আর কাকড়ি বুড়ি একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে । অলকার দৃষ্টি ধারালো । 

শ্যামা চোখ সরু করে মায়ের দিকে তাকায় । দাদি কি এমন বলতে গেছিলো যে অলকা মাঝপথে থামিয়ে দিলেন ? শ্যামা কেনো আব্বার পরিচয়ে বড় হতে পারে নি ? অলকার ক্রোধিত দৃষ্টির‌ দিকে পলক বিহীন তাকিয়ে আছে কাকড়ি বুড়ি ‌। যেন অলকার দৃষ্টিতে কিছু পড়ছেন তিনি । অলকার চোখের চাহনি তাকে কিছু বলছে । শ্যামা মায়ের পাশে গাঁ ঘেঁষে বসতেই পলক ফেলে দৃষ্টি সংযত করেন অলকা ‌। হাতে সুঁই তুলে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে আবারো সেলাইয়ে মনোনিবেশ করেন ।‌ শ্যামা কোমল কন্ঠে প্রশ্ন করে...


" দাদি কি কইতে গিয়া থাইমা গেলো আম্মা ‌? তুমি দাদির কথা আটকাই দিলা ক্যান ? ক্যান আমি আব্বার পরিচয়ে বড় হইতে পারমু না ? 


কাকড়ি বুড়ি শ্যামার দিকে মুখ ঝামটে নিঃশব্দে স্থান ত্যাগ করেন । বুক ধকধক করছে তার । তার ভয় পাওয়ার জন্য অলকার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিই যথেষ্ট ‌। অলকা দাঁতে দাঁত চেপে বাঁকা চোখে তাকিয়ে দেখেন কাকড়ি বুড়ির যাওয়ার পথ । সময় নিয়ে কন্ঠ কঠোর করে ভ্রু জড়ো করে দ্রুত গতিতে বলেন..


" তোর বাপ তোরে সহ্য করতে পারে ? কোন দিন বাপের আদর পাইছোস ? বাপের কোলে উঠছিলি কোন দিন ? তোর বাপ তোর নাম ধইরা ডাকছে কোন দিন ? তোর মুখের দিকে ফিইরা চাইছে কোন দিন ? কোন দিন তুই তোর বাপেরে আব্বা কইয়া ডাকতে পারছোস ? বাপের আদর ভালোবাসা কারে কয় তুই জানোস ? -- সব কিছু থাইকা তো বঞ্চিত হইয়া আইছোস  ! তাইলে বাপের পরিচয় দিয়া কি করবি ? এই টুকু অধিকার না হইলেও চলবো । 


মায়ের দিকে শ্যামার চাহনি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয় ‌।‌ শ্যামা অনুভুতি'হীন নিগুড় চোখে চেয়ে বলে....


" আমার গায়ের রংটাই কি সব কিছুর কারণ আম্মা ? নাকি অন্যকিছু ? শুধু আমার এই গায়ের রংয়ের কারনেই কি আব্বা আমারে পছন্দ করে না ? 


শ্যামার প্রশ্নে অলকার ঠোঁট জোড়া কেঁপে ওঠে । চোখের চাহনি থেমে থেমে কেঁপে ওঠে । প্রশ্নের উত্তর করেন না তিনি । পলক ফেলে হাতের কাজের গতি বাড়িয়ে দেন । মায়ের উত্তর না পেয়ে শ্যামা নিশ্চুপ থেকে ঢোক গিলে বলে...


" আমি কে আম্মা ? আমি কি তোমাগো সন্তান নোই ?


শ্যামার কথা শেষ হতে না হতেই অলকার রাগান্বিত চোখের দৃষ্টি নিক্ষেপিত হয় শ্যামার উপর । সাথে সাথে মুখে শ্যামার নাম উচ্চারণ করে শ্যামার উপর হাত উঠাতে উদ্ধত হন অলকা, কিন্তু শ্যামার গায়ে হাত পড়ার আগেই থমকে যায় সেই হাত । চমকে উঠে পিছন দিকে হালকা ছিটকে পড়ে শ্যামা ।‌ অলকার চোখে মুখে রাগ ঠিকরে পড়ছে ।‌ রিতিমত ক্রোধে কাঁপছেন তিনি । চোখ দুটো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লাল হয়ে গেছে মুহুর্তেই । শ্যামা পিছিয়ে মাটিতে শব্দ করে বসে । অলকা উত্তেজিত হাত নামিয়ে মাথা নিচু করে চোখ খিচে বন্ধ করে নেন । শ্যামা অবাক নয়নে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে । জন্মের পর থেকে শ্যামা কখনো মায়ের হাতে মার কিংবা মায়ের বকা অবধি শোনে নি ‌। এই প্রথম শ্যামার উপর হাত উঠাতে উদ্ধত হয়েছিলেন অলকা । যে অলকা কখনোই শ্যামার সাথে অতিরিক্ত রাগান্বিত স্বরে কথা বলেন নি সেই অলকা আজ শ্যামার উপর হাত তুলতে চেয়েছিলেন । অলকা বরাবরই সবার সাথে গম্ভীর স্বরে কথা বলে , তবে শ্যামার সাথে গম্ভীর স্বরে কথা বললেও কন্ঠে কোমলতা থাকে । শ্যামা বিস্মিত হয়ে তাকিয়েই রইলো । অলকা বন্ধ চোখে শ্বাস টেনে দ্বিগুন ভারী কন্ঠে বলেন....


" আর কোনো দিন যেন তোর মুখে এইরকম কথা না শুনি শ্যামা । তুই আমার মাইয়া । আমার সোনার টুকরা মাইয়া, আমার মানিক, আমার যক্ষের ধন তুই ‌। আমার পৃথিবী তুই । তোর মা আমি । আর কেউ নয় । তুই শুধু আমার মাইয়া । 

 তুই ক্যামনে এমন কথা ভাবতে পারলি শ্যামা ? আইজ প্রথম আর‌ আইজই শেষ, আর জীবনেও যেন তোর মুখে এমন কথা না শুনি আমি । 


বলতে বলতে অলকার কন্ঠ ভেঙ্গে পড়ে । চোখের জল টলমল করছে । যেন গড়িয়ে পড়বে মুহুর্তেই । অলকা নিজেকে আড়াল করে সেই জল গাল বেয়ে গড়ানোর আগেই শাড়ির আঁচলে মুছে নেন  । শ্যামা কিছু না বুঝলেও এটা বুঝতে পারে যে সে ভুল প্রশ্ন করেছে । মায়ের দুর্বলতা শ্যামা । শ্যামা এটা খুব ভালো করেই জানে ‌। শ্যামার গলা কাঁপছে । মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে । এই সময় পানি পেলে ভালো হতো । শ্যামা ঢোক গিলে মায়ের হাত জড়িয়ে বলে....


" আর কোন দিন কমু না আম্মা । আমি জানি তো তুমি আমার আম্মা । আমি তোমার মাইয়া । তোমার গর্ভের নাড়ি ছেঁড়া ধন আমি ।


অলকা চোখ বুজে শ্যামার মাথায় হাত রাখতে গিয়েও রাখে না । শ্যামা অলকার কাঁধে মাথা রেখেছে ‌ । অলকা কাঁথা গুছিয়ে শ্যামা কে আলতো হাতে সরিয়ে উঠে ঘরে চলে যায় । শ্যামা ঠোঁট ফুলিয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের চলে যাওয়ার পানে ।


বিকেলের‌ শেষভাগ ,, সন্ধ্যা নামার আগ মুহূর্তে অলকায় চুলায় জ্বাল ধরিয়ে ভাত বসিয়েছেন, পাশে বসে আলু কাটছেন রান্নার জন্য ‌।  শ্যামা আছে ঘরে । অলকা আপন মনে নিজের কাজ করছে । 

হঠাৎ কেউ তাকে কাতর কন্ঠে ডাকে...


" আম্মা....


অলকার বুকটা ধক্ করে ওঠে ‌। চকিতে তাকায় পেছনে । ময়না দাঁড়িয়ে আছে । পড়নে শাড়ি । গায়ে মোটা সাদা শাল জড়ানো । মাথাটা শাড়ির আঁচলে ঢেকে রাখা ‌। কপালের উপরে একটু সিথি দেখা যাচ্ছে । হাতে একটা ব্যাগ ঝুলছে । 

অলকা হাতের আলু রেখে, বঁটি ফেলে তড়িৎ বেগে উঠে দাঁড়ায় । প্রায় এক মাস পর ময়নাকে দেখলেন তিনি । বাচ্চারা যেমন মা'কে পেলে খুশি হয় - অলকার চোখে মুখে তেমন খুশি ফুটে ওঠে । ঠোঁট আপনা আপনি প্রসারিত হয়ে যায় । অলকা সন্নিকটে এগিয়ে আসে ময়নার দিকে । ময়না নিস্তেজ চোখে তাকিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে । অলকা হাত বাড়িয়ে ময়নার থেকে দুহাত সামনে এসে থেমে যান । মুখের হাসি মুছে যায় তার । বাড়ানো হাত থেমে যায় । 

চোখ ফিরিয়ে থাকেন কয়েক মূহুর্ত । পরমুহূর্তে ময়নার দিকে চোখ ফেরানোর আগেই আচমকা অলকাকে জড়িয়ে ধরে ময়না । অলকা পিছনের দিকে একটু পিছিয়ে যায় । অলকা নিজেকে সামলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ময়না  নমনীয় স্বরে বলে...


" তোমারে খুব দেখতে ইচ্ছা করতাছিল আম্মা । তোমারে খুব মনে পড়ছে আমার । তোমার গায়ের এই মা মা গন্ধটারে খুব মনে পড়ছে । 


অলকা অবাক হয়ে যান ময়নার কথায় । ময়না কখনোই মা ভক্ত ছিল না । মাকে জড়িয়ে কখনোই কোন আবেগ মাখা কথা বলে নি । অনুভূতি সমেত মাকে কখনো জড়িয়েও ধরে নি । মায়ের গায়ের গন্ধ অনুভব করে নি । রুপা আর শ্যামার মতো মায়ের পূজারি নয় ময়না । ময়নার বলা এই কথা গুলো আজই প্রথম । অলকা তাজ্জব বনে যান । আলতো হাত রাখেন মেয়ের পিঠে । কাছে থাকলে কোন কিছুরই কদর বোঝা যায় না । দূরে গেলে বোঝা যায় । শূন্যতা অনুভব হয় । ময়নাও হয়তো এখন মায়ের অভাব বুঝতে পারছে । টানা এক মাস দুরে থেকেছে, মাকে চোখের দেখাও দেখতে পায় নি । তাই হয়তো মাকে খুব মনে পড়েছে । অলকা সব ভুলে মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলেন । হাজার হোক নাড়ির টান তো আছে । মা তো মা'ই হয় । মা কখনো সন্তানকে দূরে ঠেলতে পারে না । ময়না মাকে ছেড়ে মায়ের মুখের দিকে তাকায় । অলকার মনে হলো ময়নার চোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে । অলকা দুহাতে মেয়ের আদল জড়িয়ে বলেন...


" কেমন আছিস মা ? 


" আমি ভালো আছি আম্মা । খুব ভালো আছি । কিন্তু তুমি কেমন জানি শুকায় গেছো আম্মা । 


" অনেক দিন পর দেখলি তো, তাই এমন মনে হইতাছে ‌। তা তুই একাই আইছোস ‌? আর কেউ আহে নাই ? 


" না আম্মা , আর কেউ আহে নাই । আমারে গাড়িতে তুইলা দিছিলো, আমি একাই আইছি । তোমাগো জামাই পরে আইয়া আমারে নিয়া যাইবো ‌। 

ময়না একটু থেমে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে...


" ঘরে যামু আম্মা । আ..আপা কোই আম্মা ‌?


অলকা ভ্রু কুঁচকায় । সময় নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলেন...


" ঘরেই আছে । ঘরে যা.. । তা কোন ঘরে যাইবি ‌? দাদির ঘরে ? 


ময়না অদ্ভুত হাসে । কোন এক দিকে তাকিয়ে বলে..


" আমাগো বোনদের জন্যে তো একটা ঘর বরাদ্দ আছে আম্মা, ঐ ঘরেই যামু । আচ্ছা আমি ঘরে যাই এহন । 


বলেই ব্যাগ হাতে ঘরের দিকে যায় । অলকা দিপ্তীহিন চোখে তাকিয়ে দেখেন ।

সবসময় বসে থাকতে ভালো লাগে না শ্যামার । আজ খুঁজে খুঁজে নিজের পুরনো বইগুলো বের করেছে । অলকা তার মেয়েদের পড়াশোনা করাতে চেয়েছিলেন । রুপা কে মাধ্যমিক এর পর বিয়ে দিয়েছেন । শ্যামা কেও পড়িয়েছেন মাধ্যমিক অবধি । শ্যামা তেমন স্কুলে যায় নি । বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করেছে । পরীক্ষার সময় হলে পরীক্ষা দিয়েছে । গ্রামের সরকারি স্কুল নদীর ওপারে । নদী পেরিয়ে যেতে হয় । শ্যামা কে কথা শোনানোর মানুষের অভাব নেই । ছোট বেলা থেকেই অনেক কথা শুনেছে শ্যামা । তাই অলকা মেয়েকে তেমন বাইরে বের হতে দিতেন না ‌ । রুপা, ময়না আর শ্যামা আগে একসাথে স্কুলে যেতো । রুপা সবার বড় হওয়ায় - বোনদের আগলে নিয়ে যেতে পারতো ‌। মাধ্যমিকের পর রুপার বিয়ে হয় , এরপর শ্যামাকে আর একা একা স্কুলে যেতে দিতেন না অলকা । মোখলেছ ময়না কে স্কুলে নিয়ে যেতেন ছোট কালে । বড় হওয়ার পর ময়না একাই‌ যেতো । 

শ্যামা নিজের পুরনো বইগুলো বের করে । ধুলো জমেছে । ধুলো ঝেড়ে বইগুলো পরিষ্কার করে ‌। পোকায় কেটেছে বইগুলো । মাঝের পাতা গুলো এবড়োথেবড়ো হয়ে ঝুড়ঝুড়ে হয়ে গেছে । শ্যামা খুঁজে খুঁজে একটা গল্পের বই পায় । অলকার ভাই কাদেরের বই ।‌ শ্যামার কাছে ছিল একসময় । এই বইটা শ্যামা কতবার পড়েছে হিসেব নেই । সময় কাটানোর জন্য বারবার পড়েছে । শ্যামা বইটা মুছে পাশে রাখে । বাকি বইগুলো আবার আগের অবস্থায় রাখে ‌ । তারপর বইটা নিয়ে জানালার কাছে বসে । বইয়ে মলাট নেই ‌। কয়েকটা ছোট ছোট গল্পের সমন্বয়ে একটা বই । বইটির নাম --‌ 'অলকা' । শ্যামার নিজের মায়ের নামে বইটির নাম । মূলত এই কারণেই শ্যামা অনেক আগ্রহ নিয়ে বারবার বইটি পড়েছে । সমাজবাস্তবতা , ভালোবাসা, ব্যক্তি জীবনের টানা পোড়ান , পারিবারিক সুখ দুঃখ , নারীর মন ,প্রেম, আবেগ , সবকিছুর মিশেলে সহজ ভাষার একটি বই । শ্যামা বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টায়.. অনেক গুলো পৃষ্ঠা নেই ‌ । মাঝের কোন একটা পৃষ্ঠায় চোখ যায় শ্যামার । সেখানে একটা লাইন চোখে পড়ে... শুদ্ধ ভাষায় একটা বাক্য... যেটার অর্থ এমন ছিল...


" আকাশের দিকে তাকালে যেমন তার অসীমতা বোঝা যায় , তেমনি মানুষের নিগুড় মনের দিকে তাকালে তার অগাধ দুঃখের স্রোত সম্পর্কে অবগত হওয়া যায় । 


শ্যামা কিছুক্ষণ নীরব থেকে চেয়ে দেখে বাক্যটি । অন্য এক পৃষ্ঠায় লেখা..


" অলকা শুধু একটা নাম নয় , এক মধুর স্মৃতি, যে স্মৃতিকে যত মুছতে চাইবে ততই গাঢ় হবে । 


শ্যামা মুচকি হাসে এটা পড়ে ।‌ 

ময়না নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে হাতের ব্যাগটা খাটের একপাশে রাখে । গায়ের শাল খুলে সেটাও একপাশে রাখে । মাথা থেকে শাড়ির আঁচল নামায় । ময়নার হাতে দুটো চুড়ি একে অপরের সাথে ঠোকা খেয়ে শব্দ করে । সেই শব্দ কানে যেতেই শ্যামা চকিতে তাকায় ‌ । সামনে বোনকে দেখে খেই হারিয়ে বই রেখে উঠে দাঁড়ায় । জড়িয়ে ধরতে গিয়েও ধরে না । মুখে বলে..


" ময়না ,, কখন‌ আইলি তুই ? কেমন আছিস বোইন ? 


ময়না স্বাভাবিক কন্ঠে জবাব দেয়...


" এইতো একটু আগেই আইলাম । আমি ভালো আছি । তুমি কেমন আছো ‌? 


শ্যামা বোধহয় ময়নার মুখে এমন কথা আশা করে নি । খানিক অবাক হলেও বেশি খুশি হয় শ্যামা । কোমল হেসে বলে...


" আ..আমিও ভালো আছি ।


শ্যামার কিছু মনে পড়তেই মুখের হাসি মুছে যায় । ভ্রু যুগল জড়ো করে কন্ঠের বাঁধা ঠেলে প্রশ্ন করে...


" সত্যিই ভালো আছিস তো ময়না । 


অদ্ভুত ভাবে শব্দ করে হাসে ময়না ‌। শ্বাস ফেলে বলে...


" ক্যান আপা ? আমার কি খারাপ থাকার কথা ? 


" না , না বোইন ... তুই খারাপ থাকবি ক্যান ? তুই অনেক সুখে থাকবি । 


ময়না কিছুক্ষণ বিচিত্র নয়নে তাকিয়ে থাকে শ্যামার দিকে । শ্যামা বোনের চাহনি দেখে অপ্রস্তুত ভাবে মুচকি হাসে ‌। 


এর মধ্যেই কাকড়ি বুড়ি ময়নাকে নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দিয়েছে । ময়না তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না তাতে । বুড়ি ময়নাকে নিজের ঘরে ডেকে হাবিজাবি কত কথা বলছে, কিন্তু ময়না তেমন উত্তর করছে না । অন্যসময় হলে হয়তো ঝাড়ি মেরে বুড়ি কে চুপ করাতো ‌ । তবে এখন করছে না । অন্যমনস্ক ভাবে বুড়ির কথায় হু-হা উত্তর দিচ্ছে ‌। 


চলবে.....

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×