গল্প: শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:০৯)

 


লেখিকা:সুরভী আক্তার
 পর্ব:০৯


রাতে মোখলেছ বাড়ি ফেরে নি । কেনো ফেরে নি খবর নেই । আড়তেই ছিল । খুব বেশি কাজ থাকলে মাঝে মাঝে আড়তেই থাকতে হয় তাকে । অলকা অনেক রাত অবধি জেগে ছিলেন । তবে মোখলেছ বাড়ি ফেরে নি, আর না কোনো বার্তা পাঠিয়েছে । 

সকাল সকাল উঠতে একটু দেরি হয়েছিল অলকার । একে তো ঠান্ডার মৌসুম । কম্বল মুড়ি দিয়ে একবার শুয়ে পড়লে আর উঠতে ইচ্ছে করে না কারোই । তার উপর আবার রাতে ঘুম হয় নি । ফজরে শ্যামা উঠেছিল নামাযের জন্য , আম্মা কে ডাকতে চেয়েছিল , তবে আম্মার ঘুমে বিভোর মায়াবী মুখটা দেখে আর ডাকে নি । নামাজ পড়ে আবার আম্মা কে জড়িয়ে শুয়েছিল । 

অলকার উঠতে উঠতে ভোরের আলো ফুটে গেছে । ভোরের পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে তার । উঠেই তড়িঘড়ি করে রান্না বসিয়েছেন । নামাজ আর হয় নি , আলো ফুটেছে । শ্যামার আর ঘুম ধরে নি, শুয়ে ছিল কিছুক্ষণ । তারপর উঠে আম্মার পাশে এসে বসে । আম্মা রান্না করছে , আর শ্যামা চাদর মুড়ি দিয়ে চুলার আগুনে হাত শেকছে । শ্যামার গায়ের রং শ্যামলা হলেও ঠোঁট জোড়া গোলাপী, ওর গোলাপি ঠোঁট'দ্বয় ঠান্ডায় তিরতির করে কাঁপছে ।‌ মাঝে মাঝে দাঁত কপাটি একে অপরের সাথে ঠোকা খেয়ে শব্দ হচ্ছে ‌। অলকা মাঝে মাঝে মেয়েকে দেখে মুচকি হাসছেন । 

ময়না কখন ওদের পাশ কাটিয়ে কলপাড় থেকে হাত মুখ ধুয়ে এসেছে বুঝতেই পারে নি ওরা ‌। হাতমুখ ধুয়ে একটা পিড়ি নিয়ে শ্যামার পাশে বসে ময়না । ময়না কে দেখে বড়সড় ভাবে অবাক হয় শ্যামা আর অলকা । ময়না কখনোই সকালে ঘুম থেকে উঠে না । ঠান্ডার সময় তো আরোই ওঠে না । এই নিয়ে অলকা কম বকাবকি করে নি মেয়েকে । 

তবে ময়না কে দেখে প্রথমে অবাক হলেও পরমুহূর্তে স্বাভাবিক হন অলকা । ময়নার এখন বিয়ে হয়েছে , নিজের সংসার হয়েছে , স্বামীর সংসারে নিশ্চয়ই বেলা করে ঘুমায় না ময়না । সংসারের আলাদা একটা দায়িত্ব আছে তার কাঁধে । হয়তো এখন সকালে ওঠাটা অভ্যাস হয়ে গেছে ময়নার । 

ময়না কে দেখে অলকা বলেন...


" এতো সকালে ওঠোনের দরকার আছিলো না তোর , আর একটু ঘুমাইতে পারতি । চোখের নিচে কালি পইড়া গেছে, সংসারের এতো চাপ যে ঠিকমতো ঘুমাইতেও পারোস না ? 


ময়না নিষ্ক্রিয় হাসে । হাঁটুতে থুতনি রেখে হাত শেকতে শেকতে বলে....


" বাড়ির একমাত্র বউ আমি আম্মা, চাপ তো থাকবোই । 


কোথা থেকে খরগোশটা লাফিয়ে লাফিয়ে আসে শ্যামার কাছে । শ্যামা এটার একটা নামও রেখেছে-- 'গলু' । ঠান্ডার কারণে ছেঁড়া কাঁথার এক টুকরো অংশ খোরগোশটার গায়ে জড়িয়ে বেঁধে দিয়েছে । শ্যামা গলু'কে কোলে নেওয়ার আগে ময়না হাত বাড়িয়ে কোলে নেয় ওকে । শ্যামা মুচকি হাসে । ময়না গলু'র গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে....


" এইটারে কোই পাইছো আপা ? 


" জঙ্গলে...


" তুমি লইয়া আইছো ? 


" হুম...


" বাইরেও যাও আইজ-কাইল ? 


" গেইছিলাম কয়দিন আগে ! 


ময়নার প্রশ্নের পরপর উত্তর দেয় শ্যামা । ময়না আর কিছু বলে না । 

সে কখনোই এভাবে শ্যামার সাথে কথা বলে নি । অলকা বারবার ধাক্কা খাচ্ছেন ময়নার ব্যবহারে । ময়নার পরিবর্তন তার অকল্পনীয় ।‌ ময়না আগের থেকে বদলে গেছে । অলকার কাল রাতের কথা মনে পড়ে...


কাল রাতে শ্যামা আর অলকা কেবল শুয়েছে, এমন সময় দরজায় টোকা দেয় ময়না । অলকা দরজা খুলে দিতেই ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ভেতরে ঢোকে ও । রাতে শোয়ার জন্য কাকড়ি বুড়ি ওকে নিয়ে গেছিলেন নিজের ঘরে । সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে ময়না । ময়না মায়ের দিকে করুন চোখে তাকিয়ে কেমন আবদারের সুরে বলে....


" আমি তোমাগো কাছে থাকি আম্মা ? শুই তোমাগো কাছে ? নিবা আমারে ? 


অলকার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে মেয়ের কথায় । শ্যামা শোয়া থেকে উঠে বসে । অলকা ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা মেয়েকে উষ্ণ বুকে জড়িয়ে বলেন...


" শুইবি আমাগো কাছে ? এইটা কওন লাগবো তোরে ? দেখতো কেমন ঠান্ডায় কাপতাছোস,, যা তাড়াতাড়ি গিয়া আপার পাশে শুইয়া পড় ‌। 


মায়ের আদেশ পাওয়া মাত্রই সবেগে খাটের উপর শুয়ে পড়ে ময়না ‌। অলকা দুইবোনের মাঝে শুতেই শ্যামা জড়িয়ে ধরে অলকাকে । রোজ রোজ তার মাকে জড়িয়ে শোয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে । শ্যামাকে দেখে ময়নাও জড়িয়ে ধরে মাকে । 


অলকার ভাবনার ছেদ ঘটে ময়নার মৃদু 'আব্বা' ডাক শুনে । অমনি ময়নার দৃষ্টি লক্ষ্য করে চকিতে তাকান তিনি । পিছনে পুরো ভেজা শরীর নিয়ে জুবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোখলেছ । রিতিমত ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছেন তিনি । সকালে তীব্র শীতের মধ্যে নদীতে নেমে মাছ ধরেছেন । অন্য কামলারা মাছ নিয়ে আড়তে গেছে । মোখলেছ কাল থেকে বাড়িতে ফেরে নি , তাই এখন আড়তে না গিয়ে বাড়িতে এসেছেন তিনি । পুরো শরীর ভিজে আছে । 

ময়না আব্বা কে দেখে গলু'কে কোল থেকে নামিয়ে দৌড়ে যায় । ভেজা আষ্টে গন্ধ যুক্ত শরীরেও জড়িয়ে ধরে আব্বা কে । আচমকা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে ময়না । মোখলেছ ভাবেলাশহীন কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । 

অলকা, শ্যামা হঠাৎ ময়না ফুপানোর শব্দে দাঁড়িয়ে যায় । ময়না আব্বা কে ছাড়ে । মোখলেছ কিছু বলেন না । পুরো শরীর কাঁপছে তার । তিনি ময়নার মাথায় হাত রেখে ইশারায় বোঝান...


" কি হইছে ? 


ময়না পিছন ফিরে অলকা আর শ্যামা কে দেখে কান্না চেপে বলে....


" কিছু হয় নাই আব্বা । আমি সেই কাইল আইছি , একবারও দেখি নাই তোমারে , এই লাইগা কষ্ট হইতাছিল । 


মোখলেছ তবুও কিছু বলেন না । ইশারায় কিছু একটা বোঝান । সবাইকে এড়িয়ে কলপাড়ে যান গোসল করতে ‌। অলকা শুকনো ধানের আটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে । মোখলেছ গোসল সেরে আগুন পোহায় । কারোর সাথে একটা কথাও বলে না । আপন মনে গিয়ে শুয়ে পড়ে নিজের ঘরে ।

দুপুর পর্যন্ত ঘুমায় মোখলেছ । সকাল থেকে পেটে কিছু পড়ে নি । ক্ষুধার চোটে ঘুম ভেঙ্গে যায় তার । ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে বসেন তিনি । শ্যামা গোসল সেরে উঠানে কাপড় মেলে দিচ্ছিলো । ময়না গোসল করতে গেছে । অলকা ও নেই আসেপাশে । কাউকে না পেয়ে শেষ মেষ মোখলেছ বাঁধ ভেঙে শ্যামা কে উদ্দেশ্য করে খ্যাঁটখ্যাঁটে স্বরে বলেন....


" ঐ ছেড়ি ,, ভুক লাগছে আমার , চাইরটা খাইতে দে তো । 


শ্যামা চমকে তাকায় । মোখলেছের বিষ মাখানো তাচ্ছিল্যের কথাও মধুর লাগে শ্যামার কাছে ‌ । শ্যামা এলোমেলো পায়ে ছুটে যায় রান্না ঘরে । থালা ভর্তি ভাত বেড়ে, জগে পানিসহ নিয়ে আসে মোখলেছের জন্য । বারান্দায় আব্বার সামনে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে ভাতের থালা এগিয়ে দেয় । 

মোখলেছ এক ঝটকায় শ্যামার হাত থেকে থালাটা নিয়ে নেয় । ক্ষুধার পেটে মুহুর্তেই সব ভাত শেষ করেন তিনি । কোন রকমে হাত ধুয়ে গলায় গামছা ঝুলিয়ে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে । 


বিকেলের দিকে শ্যামা দের বাড়িতে আসে মানিক । শ্যামা নিজের ঘরেই ছিলো । বাইরে বের হয় নি । মানিক কে বসতে দেওয়া হয় মোখলেছের ঘরে । 

অলকা ভেবেছিলেন ময়না কয়টা দিন থাকবে তাদের কাছে । কিন্তু মানিক এসেই তাড়া লাগিয়েছে, সে আজকেই ময়না কে নিজের সাথে নিয়ে যাবে । 

মোখলেছ আসেন খানিক বাদে ‌। আর আড়তে যান নি তিনি । জামাই শশুর মিলে ঘরে কথা বলছে । অলকা বাড়ির একটা মুরগি জবাই করেছিলেন । সেটা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় মানিক কে । 

শ্যামা নিজের ঘরে বসে আছে । ময়না কালকের বের করে রাখা কাপড়গুলো আবারো ব্যাগে গুছিয়ে রাখছে । 

শ্যামা নিগুড় চোখে ময়নার পানি তাকিয়ে বলে...


" আবার কবে আইবি ময়না ? 


ময়না শ্বাস ফেলে জবাব দেয়...


" জানি না আপা , হয়তো খুব তাড়াতাড়ি আইমু । জানো আপা,,তোমগোরে আমার খুব মনে পড়ে , ইচ্ছে করে আর ফিইরা না যাই, তোমাগোর সাথেই থাকি । 


শ্যামা মুচকি হেসে বলে....


" আমার কথাও মনে পড়ে তোর ? 


ময়না অদ্ভুত স্বরে উত্তর দেয়...


" সব থাইকা বেশি । তোমার সাথে তো কম খারাপ ব্যবহার করি নাই আমি , এখন আফসোস হয় । আমারে ক্ষমা কইরা দিও আপা, দুনিয়ার শাস্তি মানুষ দুনিয়াতেই পায় , আমারো অনেক শাস্তি পাওনা আছে । 


শ্যামার কপালে ভাঁজ পড়ে ‌ । ময়না কেমন নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে । শ্যামা উঠে গিয়ে ময়নার হাত ধরে বিছানায় বসায় । ময়নার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে...


" তোর ওপর আমার কোনো দিন কোনো অভিযোগ আছিলো না ময়না । তুই তো আমার বোইন । ক্যান শাস্তি পাইবি তুই ? আল্লাহ তোর জীবন ফুলের মতো কইরা সাজায় দিক, শান্তিতে ভরপুর থাকুক তোর জীবন । সুখে থাক তুই । 


" অন্যের সুখ কাইড়া নিয়া কখনো সুখে থাকা যায় না আপা ।


কথাটা মনে মনে বলে ময়না ‌।‌ 

বাইরে থেকে মানিক তাড়া দিচ্ছে । দ্রুত ব্যাগ হাতে গায়ে মাথায় চাদর পেঁচিয়ে ঘর থেকে বাইরে বের হয় ময়না ‌। 

মোখলেছ নিরিহ মুখে দাঁড়িয়ে আছেন । ময়না কে বাইরে আসতে দেখে মানিক চাক্ষুস হাসে । শ্যামা ভেতরের জানালা দিয়ে একটু উঁকি দেয় । অলকা বারান্দায় জড়িয়ে ধরেন ময়না কে । কাকড়ি বুড়ি নাকে কান্না কাঁদছে আঁচলে মুখ গুজে । 

ময়না মাকে ছেড়ে কাকড়ি বুড়ির কাছে যায় । নরম কন্ঠে বলে....


" এবার আব্বার লগে আমার বাড়ি যাইয়ো দাদি । আব্বা যাইবো কয়দিন পর । 

কাইনন্দো না, আমি যাই । 


বাইরে ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে । মানিক আগেই গিয়ে বসে পড়েছে । ময়না পিছু পিছু গিয়ে বসে ‌। ভ্যান চলতেই আবারো পিছন ফিরে ছলছল নয়নে তাকিয়ে দেখে আপন মানুষদের ।

ভ্যান অদূরে চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত অলকা দেওড়ির খুঁটি ধরে তাকিয়ে দেখেন । 



আরো দুটো দিন কেটে যায় । 

সন্ধ্যার আজান পড়ার আগেই অলকার রাতের রান্না বান্না শেষ । শীত পড়ছে বাইরে । ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে চারপাশ । একহাত দুরে কি আছে সেটাও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না শীতের কারনে । 

কাকড়ি বুড়ির বুড়ো হাড় কাঁপছে শীতে । সন্ধ্যাতেই কম্বলের উপর লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছেন তিনি । অলকা ভাত আর ওযুর পানি রেখে আসে তার ঘরে । 

মোখলেছ আজো আড়তে থাকবে । একথা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন । অলকা দেউড়ির খিড়কি ভালো করে লাগিয়ে দিয়ে ঘরে আসে । 

শ্যামা কাঁথা জড়িয়ে হারিকেনের আলোয় বসে আছে ‌ । শ্যামার উষ্ণ কোলে ঠান্ডায় গুটিয়ে আছে গলু । 

মাগরিবের আজান পড়লো সবে , শ্যামা আর অলকা একসাথে ওযু করে এসে নামাজ পড়ে নেয় । এখুনি খেয়ে শুয়ে পড়বে । পুরো গ্রাম ইতিমধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে । সবাই ঠান্ডার প্রকোপে যে যার ঘরে ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে । এবার যেমন গরম পড়েছিল, ঠান্ডাও পড়েছে ঠিক তেমনি । 

অলকা গরম ভাত মেখে শ্যামাকেও খাইয়ে দেয়,নিজেও খায় একই সাথে । 

খেয়ে দেয়ে মা মেয়ে মিলে শুয়ে পড়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে । খাটের পাশে একটা ক্যারেটের ভিতর গলুকে রেখে শুয়ে পড়ে শ্যামা ‌। ক্যারেটে পুরোনো অনেক কাপড় রেখে গলুর থাকার জায়গাটা গরম করে দিয়েছে সে । 

হারিকেনের আলো পুরোপুরি নেভায় না অলকা । আলো একটু কমিয়ে দেয় । একটু পর আবার এশা'র নামাজের জন্য উঠতে হবে ‌। সবে চোখ বুজেছিল দু'জনে এমন সময় বাড়ির বাইরে কারোর গমগম পায়ের শব্দে চোখ খোলে অলকা । কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে । বাড়ির বাইরের খিড়কিতেও টান পাওয়ায় শব্দ শোনা যাচ্ছে । অলকা উঠে বসেন । মাকে দেখে শ্যামা ও উঠে বসে ।

অলকা খাট থেকে নামার আগে বাড়ির বাইরে থেকে কোনো পুরুষালি নিরেট কন্ঠ ভেসে আসে....


" মোখলেছ মিয়া,, বাড়ি আছেন ? 


অলকা তড়িৎ খাট থেকে নিচে নামেন । শ্যামা উঠে গলুকে ক্যারেট থেকে তুলে কোলে নেয় । অলকা শাড়ির আঁচলে মাথা ঢেকে হারিকেন হাতে তুলে নেয় । শ্যামার উদ্দেশ্যে বলে...


" এইহানেই থাক,, আমি আইতাছি । 


শ্যামা মাথা নাড়ায় । অলকা হারিকেন হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে যান । ঘরে এখন পুরোপুরি অন্ধকার । শ্যামা গলু'কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আরো গুটিয়ে বসে । 

অলকা বাইরে বেরিয়ে খিড়কি খুলে দেন । একসাথে কয়েকজন পুরুষ নজরে আসে তার । সবার হাতেই বড় বড় বৈদ্যুতিক লাইট । লাইটের আলোয় চোখ পিটপিট করে তাকান অলকা । 

সবার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে দেখে অলকা মাথা নুইয়ে সালাম দেন । উত্তরে ব্যাক্তিটি ঠান্ডা কন্ঠে বলেন....


" আমি আপনার বয়সে অনেক ছোট হবো, এভাবে অভিবাদন জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই । 


অলকা মাথা তুলে নিচু স্বরে বলেন....


" ভেতরে আইসেন ছোট জমিদার ! 


অলকা আগে আগে এগিয়ে যান । পেছন পেছন এগিয়ে যায় বাদবাকিরা । এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে বাড়িটা ভালো করে নজর ঘুরিয়ে দেখে নেয় সবাই । অলকা বারান্দায় চেয়ার পেতে বসতে দেন সবাইকে । নিচু স্বরে বলেন....


" আপনাগোরে কোই যে বইতে দেই ? বহেন ছোট জমিদার । 


লোকটি আবারো ঠান্ডা কন্ঠে বলে ওঠে....


" এতো ব্যস্ত হবেন না । আমরা বসতে আসি নি । 


" হঠাৎ আমাগোর মতো এই গরিবের বাড়িতে কি মনে কইরা আইলেন ছোট জমিদার ? 


" আমি - সংগ্রাম জোয়ার্দার । আমাকে বার বার ছোট জমিদার বলবেন না । আমার নাম ধরে ডাকতে পারেন আপনি । আমাকে আপনি করে বলার ও কোনো প্রয়োজন নেই । আপনি আমার মায়ের মতোই হবেন, আমাকে ছেলে হিসেবে নাম ধরেই ডাকতে পারেন । 


অলকা স্মিথ হাসেন । পাশের বাড়ির বিদ্যুতের আলো ভেসে আসছে উঠানে । এখানেও সবার হাতে লাইট আছে । অলকা একবার ঘরের দিকে তাকান । ঘরে পুরো অন্ধকার । শ্যামা একা আছে । অলকা সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি রেখেই বলে...


" তোমরা বহো বাবা , আমার মাইয়াটা অন্ধকার ঘরে একলা আছে । আমি ওরে গিয়া হারিকেন টা দিয়া আহি । 


কথাটা বলেই অলকা ঘুরে দাঁড়ান ঘরে যাওয়ার জন্য ‌ । তিনি পা বাড়ানোর আগে শ্যামা হুড়মুড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । গলু'কে কোলে নিয়ে অন্ধকারে টাল সামলাতে না পেরে দরজায় হোঁচট খেয়ে সামনে বারান্দা থেকে নিচে ছিটকে পড়ে । মুখে মৃদু চিৎকার দিয়ে ওঠে শ্যামা । শ্যামা মাটিতে পড়ার আগে দুটো হাতের বাঁধনে আটকা পড়ে ও । শ্যামার ফিনফিনে পাতলা শরীর কারোর হাতের মালিকানায় বন্দী হয়ে যায় । শ্যামা চোখ মুখ খিচে একহাতে গলু'কে আঁকড়ে ধরে, অন্যহাতে কারোর পাঞ্জাবি খামচে ধরে । 

অলকা ভয়ে উঁচু গলায় ডেকে ওঠেন...


" শ্যামা....


অলকার ডাকে পরিস্থিতি ধ্যানে আসতেই শ্যামা ছিটকে সরে যায় । সামনের ব্যাক্তি কে দেখার আগেই পায়ের আঙ্গুলে ব্যথা অনুভব হতেই আবারো চোখ মুখ খিচে বারান্দায় ধপ করে বসে পড়ে । মাথায় হাত খোঁপা করা চুল গুলো এলোমেলো হয়ে খুলে যায় শ্যামার । লম্বা ঘন চুল গুলো আঁচড়ে পড়ে মাটিতে, শ্যামার মুখ ঢেকে যায় চুলে । গলু'কে পাশে রেখে পা উঠিয়ে বারান্দায় রাখে । ডান পায়ের কনিষ্ঠা আঙ্গুল হোঁচট খেয়ে পুরো থেঁতলে গেছে । ব্যথায় 'আম্মা' বলে কুকিয়ে ওঠে শ্যামা । অলকা হুড়মুড়িয়ে মেয়ের পাশে বসেন । হারিকেনের আলোয় দেখেন পা টা । আঙ্গুল থেঁতলে রক্ত গলগলিয়ে বেরিয়ে আসছে । শ্যামা হাত দিয়ে পা চেপে ধরে রক্ত আটকায় । অলকা ব্যস্ত কন্ঠে বলেন.....


" দেইখা হাটবি না শ্যামা , আমি তো আলো লইয়া ঘরেই যাইতাছিলাম । তুই এমন হুড়মুড় কইরা বাইরে আইতে গেলি ক্যান ? দেখতো এখন পা টার কি অবস্থা । 


শ্যামা জড়ানো কন্ঠে বলে....


" কিচ্ছু হয় নাই আম্মা । অস্থির হইয়ো না ।


কথাটা বলেই চকিতে পিছন ফিরে তাকায় শ্যামা । তখন সে কার গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো ? পিছনে তাকাতেই পিলে চমকে যায় শ্যামার । বুকটা কেঁপে ওঠে । পায়ের ব্যথা ভুলে যায় সে । সেই দিনের জঙ্গলে দেখা সেই ছোট জমিদার । সেই দিনের মতোই সাদা পাঞ্জাবি, পা-জামা পড়নে , পাঞ্জাবির উপরে সাদা শাল জড়ানো । পেছনে হাত গুটিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে । আবছা অন্ধকারেও তার উজ্জ্বল মুখশ্রী পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে । তার পাশে লুঙ্গি ফতুয়া পড়া বেশ কয়েকজন লোক । তাদের হাতে সেইদিনের মতোই লাঠি । 

শ্যামা লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় । আচমকা দাঁড়াতেন পায়ের ব্যথা আবারো চিনচিন করে ওঠে । চোখ খিচে আবারো গুঙ্গিয়ে উঠে মাটিতে বসে পড়ে শ্যামা । অলকা সব ভুলে হারিকেন হাতে দৌড়ে যান ঘরের পেছনে । ঘরের পেছনে শ্যামার করা একটা ছোট্ট বাগান আছে । শ্যামা বেশ কিছু ফুলের চারা লাগিয়েছে সেখানে । রোজ রোজ যত্ন করে সেগুলোর । সেখানে গাঁদা ফুলের গাছও আছে । গাঁদা ফুলের গাছের পাতা রক্ত বন্ধ করতে কার্যকরী ঔষধি । অলকা যেতেই সংগ্রাম পাশে থাকা লাঠিয়ালদর ইশারা করতেই ওরা দুরে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ায় । সংগ্রাম শ্যামার দিকে তাকিয়ে নিরেট কন্ঠে বলে....


" শরীর থেকে রক্ত ঝড়ানো কোনো সাধারণ সমস্যা নয় মেয়ে । শরীরের এক ফোঁটা রক্ত তৈরিতেও ৭০ দিন সময় লাগে । আর তুমি এক মুহুর্তেই শত ফোঁটা রক্ত ঝড়ালে ? 


শ্যামা কেঁপে ওঠে । শরীরে শিহরণ খেলে যায় । চাদরটাও ঘরে রেখে এসেছে , শরীরে এখন উষ্ণ কোনো কাপড় নেই । ঠান্ডা আর পুরুষালি নিরেট কন্ঠে নড়ে ওঠে শ্যামার ফিনফিনে পাতলা দেহ । শ্যামা আড়চোখে একবার তাকায় সংগ্রামের দিকে । তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে শুল্ক ঢোক গেলে শ্যামা । অলকা ঘরের পেছন থেকে দৌড়ে আসেন । গাঁদা'র পাতা ডলে শ্যামার ক্ষততে লাগিয়ে দিতেও চিনচিনে ব্যথা শ্যামার মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করে । 

অলকা সাথে সাথে ফুঁ দিয়ে কাপড় বেঁধে দেন শ্যামার পায়ে । 

শ্যামা কোন রকমে এক পায়ে ভর করে দাঁড়ায় । সংগ্রাম এখনো হারিকেনের হলদে আলোয় এলোমেলো কেশি শ্যামার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । শ্যামা চুল গুলো হাত খোঁপা করে নেয় । ওরনাটা টেনে নেয় মাথায় । 

বারান্দায় গলু'র দিকে তাকায় । অমনি আঁতকে ওঠে । গলু নেই সেখানে । শ্যামা চঞ্চল চোখ ফিরিয়ে আশেপাশে তাকায় । অলকা মেয়েকে দেখে বলেন...


" কি খুজতাছোস ? 


শ্যামা ক্ষীন স্বরে কাঁপা গলায় বলে....


" গলু...? 


অলকা এদিক ওদিক তাকান । সংগ্রামের পায়ের কাছে গুটিয়ে বসে আছে গলু । অলকার নজর বুঝে শ্যামা সংগ্রামের পায়ের দিকে তাকায় । গলু'কে দেখে একবার করুন চোখে সংগ্রামের দিকে তাকায় । সংগ্রাম শ্যামার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিজের পায়ের দিকে তাকায় । পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে বসে আছে একটা সাদা খরগোশ । এটাকে চিনতে অসুবিধা হয় না সংগ্রামের । সংগ্রাম আবারো সরু দৃষ্টিপাত করে শ্যামার দিকে । শ্যামা কিছু না ভেবেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে যায় । সংগ্রামের পায়ের কাছ থেকে গলু'কে উঠিয়ে কোলে নেয় । কোন রকমে পা বাড়িয়ে বারান্দায় উঠে ঘরের দিকে পা বাড়ায় । আর কোনো দিকে তাকায় না । শ্যামা যতক্ষণ না ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে ততক্ষন অবধি সংগ্রাম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শ্যামার দিকে ।

অলকা শ্যামার দিক থেকে চোখ সরিয়ে সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলে...


" ক্ষমা কইরা দিও বাবা । তোমরা বহো না,,খাড়ায় আছো ক্যান ? 


" বসতে হবে না ,, যে দরকারে আসা সেটা বলি ? 


অলকা কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলেন....


" আমগো বাড়ি এতো রাইতে এই ঠান্ডার মধ্যে কি দরকারে আইছো বাবা ? 


সংগ্রাম খানিক চুপ থাকে । কথা গুছিয়ে বলে....


" কাল আমাদের জমিদার বাড়িতে বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে । আমার ভাইপোর মুখে ভাত কাল । সব আড়ত থেকে কাল ভোরেই মাছ যাবে আমাদের বাড়িতে । মাধবপুর আড়তের দায়িত্ব মোখলেছ চাচার উপর । ভোরের আলো ফোটার আগেই যেন সব মাছ জমিদার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় । এটা জানাতেই এসেছিলাম ।


অলকা বলেন...


" কিন্তু উনি তো বাড়িত নাই বাবা ! জমিদার বাড়িত মাছ পৌঁছান লাগবো,হের লাইগাই হয়তো আইজ বাড়িত আহে নাই । 


সংগ্রাম অলকার থেকে চোখ সরিয়ে দরজার পানে তাকায় । অমনি দরজা থেকে সরে যায় শ্যামা ‌। এতক্ষণ দরজা থেকে মাথা বাড়িয়ে একটু উঁকি দিয়ে বাইরের পরিস্থিতি দেখছিলো শ্যামা । শ্যামা কে দরজা থেকে সরে যেতে দেখে আপনা আপনি একটু হেসে ওঠে সংগ্রাম । তবে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় ওর এই হাসি । 

সংগ্রাম বলে....


" তাহলে আমি আসি ? এতো রাতে আপনাদের বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা করবেন ! 


" ছিঃ ছিঃ বাবা , এইসব ক্যান কইতাছো , বিরক্ত হমু ক্যান । 


" আমার জন্য হয়তো আপনার মেয়ের পা কেটে গেলো ,, যত্ন নেবেন তার । 


অলকা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেন...


" আমি তোমারে আগে অনেকবার দেখছি বাবা , কিন্তু কথা হয় নাই কোনো দিন । তুমি অনেক ভালো বাবা । ভালো থাইকো...


সংগ্রাম এবার আলোকচিত্রের ন্যায় হাসে.. 


" ভালো থাকবেন আপনারাও । আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ । আজ আসি....


সংগ্রাম তার দলবল নিয়ে ঠিক যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই দৃঢ় পায়ে বাড়ি থেকে বের হয় । অলকা দেওড়ি পর্যন্ত এগিয়ে যায় । বাইরে রাস্তায় বড় কালো জিপ দাঁড়িয়ে আছে । সেটায় উঠে শব্দ তুলে নিমিষেই চোখের আড়াল হয়ে যায় ওরা । অলকা আবার খিড়কি লাগিয়ে ঘরে আসেন । 

শ্যামা হারিকেনের আলোয় পায়ের কাঁটা ঘাঁ দেখছে । কাঁটা অংশে বাঁধা কাপড় খুলে ফেলেছে । রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে এখন । আজান পড়েছে, নামাজ পড়তে হবে এখন । নামাজ শেষে অলকা তেল গরম করে মেয়ের কাঁটা পায়ে লাগিয়ে দেন , আবারো বেঁধে দেন কাপড় দিয়ে । বেঁধে দিতে দিতে শ্যামার উদ্দেশ্যে বলেন....


" যিনি আইছিলো,, চিনিস ওনারে ? 


শ্যামা চুপ থেকে মিহি কন্ঠে জবাব দেয়...


" হুম, আমাগোর জমিদারের পোলা । 


" আগে দেখছিস কোথাও ? 


" হুম দেখছিলাম...


কোথায় দেখেছে অলকা তা জিজ্ঞেস করেন না । বরং বলে....


" পোলাটা সটান গম্ভীর , আগে যখন দেখছিলাম তখন ভাবছিলাম অহংকার আছে বোধহয় । মাঝে মাঝে জিপ লইয়া আহে গেরামে ঘুরতে । জঙ্গলে বেশি থাকে স্বীকারের লাইগা । কথা কোই নাই কোন দিন ‌। আইজ প্রথম বার কথা কইয়া মনে হইলো - হেয় ভালা মানুষ । আর যাই হওক মানুষরে সম্মান দিতে জানে ।


শ্যামা একটু হাসে । আর কোনো কথা বলে না । দুই মা-মেয়ে মিলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে । 

ঠান্ডার সময়,, একটু কাঁটা ছেড়া হলেই ব্যথায় টেকা যায় । শ্যামার আঙ্গুলটা তো পুরো থেঁতলে গেছে । ঠান্ডা লেগে আরো বেশি ব্যথা বেড়েছে । সারারাত ঘুমোতে পারে নি মেয়েটা । ব্যথায় ছটফট করেছে । 

ভোরের আগে আগে একটু ঘুমিয়েছিল । সকালে নামাজও পড়তে পারে নি । অলকাও ডাকে নি আর । উঠতে উঠতে শ্যামার দেরি অনেকটা দেরি হয়ে গেছে । ঘড়িতে তখন সময় ৯ টা । শ্যামা ঘুম থেকে উঠে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কলাপাড় থেকে হাতমুখ ধুয়ে আসে । 

মেয়ের পায়ে আবারো তেল পুড়ে লাগিয়ে দেন অলকা । গ্রামের সরকারি ডাক্তারের কাছ থেকে ঔষধও আনিয়ে নিয়েছেন তিনি । 

মোখলেছ বাড়িতে ফেরেনি এখনো ‌। জমিদারের বাড়িতে গেছে হয়তো । অলকা শ্যামা কে খাবার খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দেন ‌। 

অলকার কাজ আছে অনেক । ধান ভানতে হবে ‌। শ্যামা দের বাড়ি থেকে দুটো বাড়ি পেরোলে মিল আছে । সেখানে ধান ভানা হয় । মিলে পুরুষ কর্মচারীর থেকে মহিলা কর্মচারীর সংখ্যা বেশি । গ্রামের আরো অনেক মহিলারা যুক্ত আছেন এই কাজে । অলকা মেয়েকে খাইয়ে বাকিসব কাজ সেরে নিজে চলে গেছে মিলে ।

শ্যামা গলু'কে নিয়ে ঘাটে গিয়ে বসে । তিন দিন থেকে ফুলির দেখা । রোজ একবার হলেও আসে । কিন্তু তিন দিন থেকে ওর টিকিটাও দেখা যাচ্ছে না । শ্যামা নদীর পাড়ে বসে অভিমানী মনে ভাবছে - ওর একমাত্র আপন হলো এই ধরলা নদী , যে কখনো ওকে ছেড়ে চলে যায় না । শুকিয়ে যায়, উছলে যায়‌, তবুও ছেড়ে যায় না । সবসময় শ্যমাকে ঘিরে থাকে । শ্যামার একলা সময়ে সঙ্গী হয়ে থাকে । 

শ্যামা গলু'কে কোলে নিয়ে বরাবরের মতো এক ধ্যানে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে । 

আজ একটু সূর্যের দেখা মিলেছে । তবে সূর্যের তীব্রতা নেই । শ্যামার উপর তীব্রতা হীন আলো ফেলে মাথার উপর বসে আছে সূর্যি মামা । 

হঠাৎই শ্যামার পাশে কেউ ধপ করে বসে ‌। শ্যামা চমকে তাকায় । ফুলি এসেছে । এইতো একটু আগে ফুলির কথা মনে পড়ছিলো । এখন ফুলি এসে হাজির । শ্যামা দের বাড়ি থেকে ফুলির বাড়ি একটু দূরে । 

ফুলির চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আছে । শ্যামা ভেবে নিয়েছে সে ফুলির সাথে কথা বলবে না । কিছুক্ষণ হয়ে গেল । ফুলিও কোনো কথা বলছে না । শ্যামা তাকায় ফুলির দিকে । ফুলি কেমন শুকনো নিস্তেজ হয়ে বসে আছে । বাধ্য হয়ে শ্যামা নিজেই ফুলিকে ঝাঁকিয়ে অভিমানী কন্ঠে বলে...


" গত তিন দিন থাইকা আসোস নাই ক্যান ‌? আমি কিন্তু রাগ কইরা আছি তোর উপর । 


ফুলি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে জবাব দেয়...


" আম্মার শরীরটা ভালো নাই শ্যামা । তুই তো সবই জানোস । 

তিন দিন থাইকা অসুখ বাড়ছে । বিছানা থাইকা উঠতে পারে নাই । 


শ্যামা কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে...


" কি কস ? কাকির অসুখ বাড়ছে ? ডাক্তার দেখাস নাই ? 


" আহাদ ভাই বড় ডাক্তার লইয়া আইছিলো । ঐ আগের মতো ঔষধ দিছে । খাইলে ভালো, আর না খাইলে আবার আগের মতো । 

অনেক টাকা লাগে রে , আমি তো কিছু করি না । আর না আমাগো কিছু আছে । বাপও নাই । কি হইবো আমাদের ? 


শ্বাস ছেড়ে ভেজা কন্ঠে কথা গুলো বলে ফুলি ‌। শ্যামা ফুলির ঘাড়ে হাত রেখে আলতো হেসে বলে....


" ক্যান,, তোর আহাদ ভাই‌ তো আছে ! 


ফুলি শ্যামার দিকে তাকায়, চোখ দুটো ছলছল করছে ওর । শ্যামার হাসি দেখে ফুলিও হাসার চেষ্টা করে বলে....


" উনিই তো ভরসা আমাগো । আমাগোর লাইগা শহরের বড় কামটাও ছাইড়া দিছে , এখন জমিদারগো বাড়িত কামলা খাটে । 


শ্যামা নীরব থাকে খানিকক্ষণ । 

ফুলিও আর কিছু বলে না । নীরবতা ভেঙে শ্যামা ক্ষীন স্বরে বলে ওঠে.....


" আমাগো জমিদারের পোলারে তুই ক্যামনে চিনোস ফুলি ? 


ফুলি ভ্রু কুঁচকে চকিতে তাকায় । চোখ সরু করে বলে...


" হঠাৎ জমিদারের পোলার কথা জিগাইলি ক্যান ? কি ব্যাপার ক দেখি ? তোর আবার জমিদারের পোলারে মনে ধরছে নাকি ? 


ঠোঁট বাঁকিয়ে আহ্লাদি স্বরে কথাটা বলে ফুলি । শ্যামা তড়িৎ বাঁধ সেধে বলে...


" ছিঃ ছিঃ ফুলি,, এইটা কি কস ? 


" তাইলে জিগাইলি ক্যান ? 


শ্যামা তাচ্ছিল্য হেসে ফুলির প্রশ্নের উত্তর না করে বলে....


" যারে মনে ধরে, তারে ভাগ্যে ধরে না ফুলি । আমার ভাগ্যেই যদি কাউরে না ধরে তাইলে মনে ধরাইয়া লাভ কি ? 


ফুলি নড়ে ওঠে । কথা কাটিয়ে বলে...


" জমিদারের পোলারে অনেক বার দেখছিলাম আমি । আহাদ ভাই যখন থাইকা জমিদার বাড়িতে কাম করে , হের পর থাইকা আহাদ ভাইয়ের লগেও অনেক কয়বার দেখছি‌ । হেয় ভালো মানুষ । আগে থাইকাই শুনতাম, হেয় মাইনষের উপকার করে অনেক । একদিন আমগোর বাড়িতেও আইছিল,, আগের বার আম্মার যখন অসুখ বাড়লো তখন তিনি খবর পাইয়া নিজে ডাক্তার পাঠাইছিলেন । তখন থাইকা আরো ভালো কইরা চিনি । 

মানুষটা উপর থাইকা যেমন কাঠখোট্টা, ভিতর থাইকা ঠিক তেমনটাই নরম । 


শ্যামা নীরবে শোনে । আর একটা কথাও বলে না ।

শ্যামার পায়ের দিকে আচমকা নজর যায় ফুলির । অমনি আঁতকে ওঠে ও । সিঁড়ি থেকে দুধাপ নিচে নেমে শ্যামার পায়ের কাছে বসে । কাপড়ে বেঁধে রাখা পায়ে আলতো হাত বুলিয়ে চিন্তিত কন্ঠে বলে.....


" পায়ে কি হইছে শ্যামা ? অ্যামনে বাইন্ধা রাখছোস ক্যান ? 


শ্যামা একবার পায়ের দিকে তাকায় । তারপর ফুলির দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলে...


" একটু কাইটা গেছে । আর তেমন কিছু না । 


" ক্যামনে কাটলো ? 


শ্যামা একটু ভাবে কালকের ঘটনা । তারপর বলে...


" আন্ধারে পইড়া গেছিলাম । বেশি কাঁটে নাই,, ভাবিস না ! 


ফুলি উঠে এসে আবার শ্যামার পাশে বসে । দুই বান্ধবী মিলে আরো কিছুক্ষণ গল্প করে । 


আজ শুক্রবার । শ্যামার পা এখন অনেকটা ঠিক হয়ে গেছে । এই কদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছে মেয়েটা । আবার রাত হলে ব্যথায় ঘুমাতে পারে নি । তবে এখন কাঁটা অংশ অনেকটা শুকিয়ে গেছে । টান টান হয়েছে । তবুও ব্যথা হয় । আজান পড়েছে অনেক আগে । শুক্রবার হওয়ায় তাড়াতাড়ি আজান দিয়েছে । মোখলেছ বাড়ি এসে গোসল করে নামাজে গেছেন । আর বাদ বাকি দিন গুলো বাদ । শুধু মাত্র শুক্রবারের জুমার নামাজ আদায় করেন তিনি । 

শ্যামা গোসল শেষে নামাজে বসেছে । অলকা এখনো নামাজ পড়েন নি । জুমার নামাজ শেষ হয়েছে । মোখলেছের ফেরার সময় হয়ে গেছে । তিনি ফিরলে তাকে খাবার দিয়ে তার পর নামাযে বসবেন অলকা । 

অলকা অপেক্ষা করছে মোখলেছের জন্য । তবে তার দেখা নেই । অলকা বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকাচ্ছে মাঝে মাঝে । বারবার দেওড়ির দিকে তাকাচ্ছে । 

হঠাৎ পায়ের শব্দে চোখ তুলে তাকান তিনি । তবে সামনে থাকা ব্যক্তিকে দেখে মোটেও খুশি হননি অলকা । তিনি চোখ মুখ কুঁচকে ফেলেন । মাথার কাপড় ঠিক করে অন্যদিকে ফিরে তাকান । সামনে জাফর ব্যাপারি । সাথে আছে আরো দুজন । এরা সবসময় তার সাথেই থাকে । 

অলকা কে দেখে জাফর ব্যাপারি ৩২ পাটি বের করে অদ্ভুত হাসেন । এই লোকটাকে দেখলে, লোকটার চাহনি দেখলে গাঁ গুলিয়ে ওঠে অলকার । শ্যামার উপর তার কুনজর আছে, এই কারনে অলকা তাকে আরো বেশি সহ্য করতে পারেন না । তবে সম্পর্কে ভাসুর হন , তার উপর আবার গ্রামের সবথেকে ধনী মাতব্বর । তাই না চাইতেও তার সাথে একটু সম্মান দিয়ে কথা বলেন অলকা । এমনিতেও তার কাছ থেকে অনেক সময় অনেক সাহায্য পাওয়া যায় , মোখলেছ অনেক সময় ধার দেনা করেন তার কাছে । 

অলকা জবানে বাঁধ দিয়ে কিছু বলেন না । জাফর ব্যাপারি একহাতে লুঙ্গির এককোনা উঁচিয়ে ধরে ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় বলে...


" মোখলেছ বাড়িত নাই , বউ ? 


অলকা না ফিরেই শক্ত কন্ঠে জবাব দেন..


" না , নাই । নামাজ পড়তে গেছে । 


জাফর ব্যাপারি একজনকে ইশারা করতেই সে বারান্দা থেকে একটা চেয়ার নামিয়ে দেয় । জাফর ব্যাপারি পায়ের উপর পা তুলে বসেন । অলকা দাঁতে দাঁত পিষে না চাইতেও ফিরে তাকায় । জাফর ব্যাপারি থুতনি চুলকাতে চুলকাতে ঘরের দিকে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছেন । তার দৃষ্টি ভালো নয় । দৃষ্টিতে লোলুপতা । তার দৃষ্টি দেখে অলকা চোখ মুখ শক্ত করে দাঁতে দাঁত পেষেন । একটু পিছিয়ে ঘরের দরজা বাইরে থেকে টেনে দেন । ভেতরে শ্যামা নামাজ পড়ছে । অলকা দরজা টেনে দিতেই সেদিক থেকে চোখ ফেরায় ব্যাপারি । অলকার পানে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবারো দাঁত কেলিয়ে বলে....


" তা ,, তোমাগো মাইয়াটার তো বিয়া টা ভাইঙ্গা গেলো । শুনছি অনেক আগে, শান্তনা দেওনের লাইগা আইতে চাইছিলাম । সময় পাই নাই । 

কিছু মনে কইরো না বউ ! 


" আপনার শান্তনার কোনো দরকার নাই, ভাই সাহেব । আমার মাইয়া আর আমরা সবাই শান্তই আছি । আলগা শান্তনার দরকার নাই । 


জাফর ব্যাপারি অদ্ভুত হাসেন । বলেন...


" তা ,, মাইয়ারে লইয়া কি চিন্তা করলেন ? বিয়া টিয়া তো দেওন লাগবো নাকি ? আর কতো দিন অ্যামনে ঘরে বসাইয়া রাখবেন ? 

আপনারা চাইলে,, আমি একটা ব্যবস্থা করতে....


" থাক ,, থাক ভাই সাহেব । আমার মাইয়ারে লইয়া কষ্ট কইরা আপনার ভাবোন লাগবো না । আমার মাইয়ার চিন্তা আছে আমার । আমি বুইঝা নিমু ।


চলবে.......

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×