গল্প: শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:০৭)

 


লেখিকা:সুরভী আক্তার
পর্ব:০৭

 

শ্যামার আজকাল বড্ড একা একা লাগে । দুদিন ধরে রুপা নেই । শ্যামাকে আলাদা করে সময় দেওয়ার মতো ও কেউ । অলকা থাকেন নিজের কাজে ব্যাস্ত , নতুন করে ধান ভানার কাজ শুরু করেছেন তিনি ।‌ আগেও করতেন,কদিন বন্ধ ছিল । এতে সংসারে দু পয়সা আসে । যা দিয়ে অলকা শ্যামার যাবতীয় খরচ অনায়াসে চালিয়ে নিতে পারেন ‌।‌ মোখলেস কখনোই শ্যামার জন্য এক টাকাও ব্যয় করেন না । এতে নাকি তার সংসারের ঘাটতি হয় । অপয়া-অলক্ষুনে মেয়ের পেছনে অর্থ ব্যয় তার কাছে অপচয় ছাড়া আর কিছু নয় । অলকাও কখনো হাত পাতে নি মোখলেছের কাছে । শ্যামার অতি স্বল্প চাহিদা পূরণের জন্য অলকা একাই যথেষ্ট ‌। স্বল্প চাহিদা টুকুও শ্যামা প্রকাশ করে না কখনো । 

রুপা নিজের শশুর বাড়ি গেছে আজ দুই দিন হলো । দুই দিন আগে রুপার স্বামী 'জাভেদ' এসে ওকে নিয়ে গেছে । বেচারি রুপার শরীরের অবস্থা ভালো না । এই গর্ভাবস্থায় কিছু একটা খেলে হজম হওয়ার আগেই তা পেট থেকে বেরিয়ে আসে ‌। হাঁটা চলাতেও অসুবিধা হয় ‌। এই ছয় মাসেই পেটটা অনেক উঁচু হয়েছে রুপার । সবাই বলছে ওর নাকি দুটো বাচ্চা হবে ।‌ রুপা এতে বেজায় খুশি । রুপা কে নিয়ে জাভেদ বা ওর পরিবারের কেউ কোন ঝুঁকি নিতে চায় না । আরো বেশি দেরি হলে, রুপার শরীরের অবনতি হবে ‌। তাই জাভেদ রুপাকে আর থাকতে দেয়নি বাপের বাড়িতে । রুপা চলে যাওয়ার শ্যামা একা হয়ে গেছে । মায়ের পরে রুপা'ই ওর কাছে সব । এই কদিনে রুপার সাথে থেকে শ্যামা সেই আগের মতো ছোট্ট শ্যামায় পরিনত হয়ে গেছিল ‌ ।

রুপার চলে যাওয়ায় শ্যামা আবার সেই আগের মতো চুপচাপ হয়ে গেছে । হাতে গোনা কথা বলে মাত্র, তাও আবার সেগুলো মায়ের সাথে । 

যোহরের নামাজ শেষে শ্যামা ঘাটে গিয়ে বসেছে । কয়েক দিন ধরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে । ধরলা নদীর পানি বেড়েছে অনেকটা ‌। আবহাওয়া বেশ শীতল । ঠান্ডা হাওয়া বইছে । মাঝে মাঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামছে । শ্যামা ঘাটের উপরের সিঁড়িতে বসে বরাবরের মতো এক দৃষ্টিতে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে । 

নদীর নতুন পানিতে মাছ বেড়েছে । মোখলেছ জালে অনেক মাছ পেয়েছেন আজ । একটা বড় রুই মাছ রেখে বাকি গুলো নিয়ে আড়তে গেছেন তিনি । অলকা কল'পাড়ের বাইরে বসে মাছ কাটছেন । কচুমুখী দিয়ে রুই মাছ শ্যামার বড্ড পছন্দ । মেয়ের পছন্দে আজ কচুমুখী দিয়ে রুই মাছ রাঁধবেন তিনি । মোখলেছ বাবা হয়েও আজো জানে না শ্যামার রুই মাছ পছন্দ । জানলে হয়তো তিনি এই মাছ রাখতেন না খাওয়ার জন্য  ।  অলকা আফসোস করছেন আর মাছ কাটছেন । রুপার ও পছন্দ রুই মাছ,, আজ রুপা থাকলে মেয়েটা খেতে পারতো । 

মোমেনা বাড়িতে নেই । পাড়া বেড়াতে গেছে কাকড়ি বুড়ি সহ । এই নিয়ে দু'বার মোমেনার স্বামী এসেছিল ওকে নিতে । তবে মোমেনা যায় নি । মোমেনা পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে ও আর ঐ মাতালের বাড়িতে ফিরবে না ।‌ প্রত্যেক বার মোমেনা একই কথা বলে, তবে বেশি দিন এই কথা ধরে রাখতে পারে না সে । নিজেই আবার হাজির হয় স্বামীর ঘরে । 


শ্যামা পরিষ্কার পানির স্রোতের দিকে তাকিয়ে আছে । পিছন থেকে মুহিত ডেকে বলে...


" শ্যামা আপা, ও‌ শ্যামা আপা, আমি পেয়ারা খামু । একটা পেয়ারা পাইড়া দাও না‌ আমারে  । 


শ্যামা চকিতে তাকায় মুহিতের দিকে । মুহিত ঘাটের উপরে দাঁড়িয়ে আছে ‌। শ্যামা উঠে যায় ওর কাছে । শ্যামা ওর সামনে যেতেই মুহিত আবারো বলে...


" আপা দেহো.. কত বড় বড় পেয়ারা ধরছে গাছে ‌। ঐ গুলা পাইকা পোকা ধইরা নষ্ট হইয়া যাইবো ‌।‌ তার থাইকা ভালো আমি খাইয়া ফেলাই । তুমি আমারে পাইড়া দেও । 


শ্যামা একবার পেয়ারা গাছের দিকে তাকায় । অনেক বড় বড় পেয়ারা ধরছে, কিছু পেয়ারা সাদা হয়ে গেছে বাইরে থেকে । বোঝাই যাচ্ছে পোকা ধরেছে । শ্যামা মুহিতের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বলে...


" ওটা যে দাদির পেয়ারা গাছ ভাই,, দাদিরে না কইয়া পেয়ারা খাইলে দাদি বকবো ‌। 


" ধুর ... ঐ বুড়ি তো কিপ্টা । ও নিজে কোন দিন খাইবো না আমাগোরেও খাইতে দিব না  । উল্টা পোকারে খাওয়াইবো । ওয় এহন বাড়িত নাই । এই সুযোগে চল আমরা পেয়ারা খাই ‌। 


" বুড়ি কইতে নাই ভাই ,, হেয় না তোর নানি হয় ।  বড় মানুষগোরে সম্মান দিয়া কথা কইতে হয় । আচ্ছা এক কাম কর , আমারে একটা কোটা আইনা দে , আমি তোরে পেয়ারা পাইড়া দিতাছি ‌। 


শ্যামার কথা শেষ হতেই মুহিত দৌড়ে যায় কোটা আনতে । কোটা নিয়ে আসতেই শ্যামা আলগোছে চারটা পেয়ারা পেড়ে নেয় । পাশে কোটা রেখে পিছনে তাকিয়ে দেখে মুহিত নেই ‌। 

বাড়ির ভেতর থেকে দৌড়ে আসে মুহিত । হাতের মুঠোয় কিছু একটা আছে । শ্যামা মুহিতকে হাঁপাতে দেখে জিজ্ঞেস করে...


" কোই‌ গেছিলি ভাই ? 


মুহিত হাতের মুঠো খুলে বাড়িয়ে দিয়ে বলে..


" নুন আনতে গেছিলাম , নুন দিয়া পেয়ারা খাইতে জব্বর লাগে । চলো...


মুহিত আর শ্যামা দুজনেই ঘাটে বসে । মুহিত শ্যামার দিকে দুটো পেয়ারা বাড়িয়ে দেয় । শ্যামা ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলে..


" আমি খামু না , তুই খা । 


মুহিত আপন মনে পেয়ারা খাচ্ছে ‌।


শ্যামা তাকিয়ে আছে নদীর পানির দিকে । এমন সময় শ্যামার নজর যায় একটা নৌকার দিকে ‌। একটা নৌকা আসছে শ্যামা'দের ঘাট বরাবর ‌। নদী দিয়ে সচরাচর নৌকা চলাচল করে । তবে শ্যামা দের ঘাটে ভেড়ে না কখনো ‌। নৌকায় কে আছে তা দেখা যাচ্ছে না । নৌকায় অচেনা অজানা মানুষ থাকতে পারে এই ভেবে শ্যামা উঠে দাঁড়ায় ঘাট থেকে চলে আসার জন্য । তবে শ্যামা পিছন ফেরার আগেই ফুলির কন্ঠ ভেসে আসে.....ফুলি উচ্চস্বরে ডাকছে...


" শ্যামা রে... এটা আমি , তোর ফুলি । যাইস না ঐখান থাইকা , আমি আইতাছি । 


ফুলির কন্ঠ শুনে শ্যামা স্ববেগে তাকায় ।

নৌকা সহ ফুলি এসে থামে ঘাটে । ফুলিকে নৌকা চালাতে দেখে শ্যামা খানিক অবাক হয় । ফুলি বৈঠা রেখে , উঠে গলুই এর উপর দাঁড়ায় ।  শ্যামার সামনা সামনি দাড়িয়ে কোমড়ে হাত রেখে ভ্রু নাচিয়ে বলে...


" দেখছোস ? আমি নৌকা চালাইতাছি , এহন আমি নৌকা চালান শিইখা গেছি ‌। 


" কার নৌকা এইটা ? কোই পাইলি তুই ? 


" মাঝি কাকা নৌকা রাইখা দুপুরের খাওন খাইতে গেছে , এই ফাঁকে আমি নৌকা লইয়া চইলা আইছি । এহন তোরাও ওঠ,, আইজ তোগো নদী ভ্রমণ করতে লইয়া যামু । 


" কি কস..? মাঝি কাকারে না কইয়া নৌকা লইয়া আইছিস ? মাঝি কাকা নৌকা খুজবো না ‌? 


" খুঁজলে খুজবো ,, আমি কি হের নৌকা খাইয়া ফেলাইতাছি নাকি ? একটু পর তার নৌকা তারে আবার নৌকা ফেরত দিয়া দিমু ।‌


" এমনে না কইয়া মাইনষের জিনিস লইয়া আইসা তোর মোটেও ঠিক হয় নাই ফুলি । 


" যাহ্ বাবা.. যার লাইগা করলাম চুরি হেই কয় চোর । আমি তো তোর লাইগাই নৌকা লইয়া আইলাম । ঘাটে পানি বাড়ছে, আমি জানতাম তুই ঘাটে আছোস, তাই নৌকা লইয়া আইলাম তোরে এই পানিতে ঘোরানোর লাইগা । আয় না , উইঠা পড় । এই মুহিত তুই ও আয় । 


অনেক দিন ধরে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো বা নদীর ওপাড়' টায় যাওয়া হয় না শ্যামার । শ্যামা একটু ভেবে বলে...


" আচ্ছা খাঁড়া, আমি আম্মা রে কইয়া আইতাছি..


" তোর আম্মারে কওন লাগতো না , তাড়াতাড়ি উইঠা আয় তো । দেরি হইয়া যাইতাছে । 


ইতিমধ্যে মুহিত নৌকায় উঠে পড়েছে । ফুলি শ্যামার হাত ধরে নৌকাতে টেনে নেয় । নৌকাটা দুলে ওঠে খানিক । শ্যামা ভয়ে ভয়ে ফুলিকে বলে....


" দেখ ফুলি,, ভালো কইরা নৌকা চালাইবি কিন্তু  । নদীতে পানি বাড়ছে, আমাদের লগে মুহিত ও আছে । সাবধানে চালাইবি... 


" উফফ ভয় পাইস না তো ,, আমি তো আছি ‌ । 


ফুলি ঘাট থেকে নৌকা ঘোরায় । ফুলি দক্ষ হাতে বৈঠা বাইছে । গলুই এর অন্য প্রান্তে বসে আছে শ্যামা । নৌকার মাঝামাঝি বসে আপন মনে পেয়ারা খাচ্ছে মুহিত । নতুন পানিতে চিকচিক করছে নদী । অপর পাশে নদী ভাঙ্গন হয়েছে । দুপুর হওয়ায় নদীতে আর কোনো নৌকা নেই । ঠান্ডা বাতাস বইছে ।‌ নদীর স্রোতের সাথে সাথে দোল খাচ্ছে নৌকা' টাও । আজ কতদিন পর বাড়ির বাইরে বের হলো শ্যামা । কতদিন পর শ্যামার আজ নিজেকে মুক্ত পাখির মতো লাগছে । বাতাসের মিষ্টতা শ্যামার নরম কোমল হৃদয়ে মিশে যাচ্ছে । শ্যামার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে । শ্যামা মিটিমিটি হেসে হাত বাড়িয়ে ছুঁইয়ে দেয় নদীর পানি । বাতাসের বেগে খোঁপা করা চুল গুলো খুলে যায় শ্যামার । লম্বা চুল গুলো ছড়িয়ে পড়ে গলুইয়ের উপর । শ্যামা সেগুলো আর বাধার চেষ্টা করে না । যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি ‌ । আকাশে মেঘ জমেছে ‌।  নদীর পাড়ের গাছগুলো সবুজে ছেয়ে গেছে । সব মিলিয়ে শ্যামার চোখে প্রকৃতি আজ নতুন রুপে নতুন করে ধরা দিচ্ছে । শ্যামা আজ হাসছে, মন খুলে হাসছে । শ্যামার নিগুড় অনুভূতিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে বেরিয়ে এসেছে । ধীরে ধীরে বৈঠা বাইছে ফুলি । ফুলি অদ্ভুত শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্যামার দিকে । শ্যামা নদীর পানিতে নিজের পা ডুবিয়ে দেয় । নদীর ছলাৎ ছলাৎ পানি ছুঁইয়ে দিচ্ছে অনবরত । শ্যামার মুখের প্রাণবন্ত হাসির দিকে অপলক চেয়ে ফুলি বলে.....


" শ্যামা,, তোর হাসিটা অনেক সুন্দর । তুই সবসময় ক্যান এমনে হাসোস না ? 


" হাসি তো..! 


" ঐ হাসিতে প্রাণ আছে ? আমি জানি শ্যামা, তোর কষ্ট হয় । আমিও তো তোর মতোই একটা মাইয়া, তোর কষ্টগুলো আমি বুঝি রে । 


" কেডায় কয় আমার কষ্ট হয় ? না , না হয় তো ,, আমার তো কষ্ট হয় । খুব কষ্ট হয় জানিস ,, কিন্তু এই কষ্ট গুলা এখন আমারে আর ছুঁইতে পারে না । ঐ যে কয় না - বিষে বিষে বিষক্ষয়,, আমার কষ্ট গুলাও তেমন, ওরা নিজেরা নিজেরাই ক্ষয় হইয়া যায় এখন । এখন ক্যান জানি আমার আর দুঃখ কষ্ট অনুভব হয় না । সব সইয়া যায় । 


বলতে বলতে বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে শ্যামার । ফুলি ধীর কন্ঠে বলে....


" দীর্ঘশ্বাস তো মাইনষের মনকে হালকা করতে পারে শ্যামা । মাইনষের মনের কষ্টগুলারে কি মুছতে পারে..? 


শ্যামা কিছু বলে না । ফুলি আবারো বলে...


" নিজেই নিজেরে শান্তনা দিতে পারাটা সবচেয়ে জটিল ক্ষমতা শ্যামা ।


" জানিস ফুলি ,,, আমার কাছে এখন সবকিছুই কেমন শূন্য লাগে ,, নিজেই নিজেরে চিনতে পারি না ‌। মাঝে মাঝে মনে হয়,, যদি রূপকথার মতো আমার জীবনটা পাল্টাই যাইতো, তাইলে কতোই না ভালো হইতো বল । আমাকে যদি সবাই ভালোবাসতো,তাইলে আমার আর কিচ্ছু লাগতো না রে । 


" দেখিস তোর জীবনে এমন একজন কেউ আইবো, যে তোরে রানি বানাইয়া রাখবো । তোর জীবনের ভালোবাসার অভাব টুকু পুরন কইরা দিবো । তোরে অনেক বেশি ভালোবাসবো । 


শ্যামা হাসে । শুকনো হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়ায় গলুই'য়ের উপর । দুহাত মেলে আলিঙ্গন করে প্রকৃতিকে । 

দুর একটা বেশ বড় ট্রলারের শব্দ ভেসে আসছে ।‌ শ্যামা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবারো বসে । ট্রলার টা কাছে আসছে । শ্যামা মাথায় কাপড় দিয়ে নিজেকে আড়াল করে নেয় ।‌ ট্রলারের ভেতরে কয়েকজন দেখা যাচ্ছে ‌।‌ তাদের সাথে অনেক বড় বড় বাক্স । শ্যামা অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নেয় । ট্রলারটা পাশ কাটিয়ে দ্রুত গতিতে চলে যায় । শ্যামা চোখ ঘুরিয়ে আবারো তাকিয়ে দেখে দুরে যাওয়া ট্রলারটাকে । চোখ সরিয়ে ফুলির দিকে তাকিয়ে বলে...


" এটা কোই যাইতাছে ফুলি..? 


" ওটা জমিদারগো বাড়ি যাইবো । দেখলি না কতো মালপত্র । ঐ সব জমিদারগো বিলাসীতার জিনিস পত্র ‌। প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে ট্রলার ভর্তি কইরা গাদা গাদা মালামাল আহে শহর থাইকা । 


শ্যামা আবারো দেখে ট্রলার'টিকে ।‌ 

আকাশের মেঘ ঘন হচ্ছে । যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে । নদীর স্রোত বাতাসের বেগে বাড়ছে । এই সময় নদীতে নৌকা নিয়ে থাকাটা ঠিক হবে না । ফুলি নৌকা ঘুরিয়ে নিয়ে আসে শ্যামা দের ঘাটে । শ্যামা আর মুহিত কে নামিয়ে দিয়ে ফুলি চলে গেছে ইতোমধ্যে । শ্যামা মুহিতকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই তেড়ে আসে মোমেনা । হাতের কাঁচা কন্চি দিয়ে সপ করে মার বসায় মুহিতের পিঠে । মুহিত কুকিয়ে উঠে শ্যামার পিছনে লুকায় । শ্যামা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরো একটা মার বসায় মোমেনা । মারের সাথে গর্জে ওঠেন তিনি....


" চামারের বাচ্চা ,, কোই গেছিলি তুই ? বাড়িত যাইবি না ? কতদিন আর অন্যের বাড়ির অন্ন্য ধ্বংস করবি ? বাপের মতো হইছোস,, সারাদিন ঢ্যাং ঢ্যাং কইরা ঘুইরা বেড়াইবি  ? 


বলতে বলতে মোমেনা আবারো একটা মার বসাতে যায় , তবে সেই মার মুহিতের গায়ে পড়ার আগেই আটকে দেয় শ্যামা । শ্যামার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায় মোমেনা । শ্যামা মোমেনার দিকে তাকিয়েই বলে...


" ও আমার সাথে আছিলো ফুফু । ওরে মাইরো না ‌। 


" ঢিংঙ্গী মাইয়া ,, তোর সাহস তো কম না । কোন সাহসে তুই বাড়ির বাইরে পা রাখছিস ‌? লজ্জা করে নাই এই মুখ নিয়া মাইনষের সামনে যাইতে ? 


কাকড়ি বুড়ির তীক্ষ্ণ কথায় শ্যামা কঠোর গলায় বলে...


" আমি তো কারোর সামনে যাই নাই দাদি  । আর লজ্জা করবো ক্যান আমার ? লজ্জা তাগো থাহে যারা লজ্জা পাওয়ার মতো কাম করে । আমি তো তেমন কিছু করি নাই দাদি । আমি ক্যান লজ্জা পামু..? 


" মুখে মুখে তর্ক করতাছোস ? চোপা বাড়ছে মুখের ?


শ্যামা ওদের কথায় কান না দিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ায় । অলকা ঘরের দরজা থেকে সব দেখেছেন । শ্যামা কে দেখে তিনি ঘরের ভেতর ঢুকে যান । শ্যামা ঘরে ঢুকতেই অলকা স্বভাবিক কন্ঠে বলেন....


" কোই গেছিলি..?


" ফুলি নৌকা লইয়া আইছিলো আম্মা ,, নদীর পানি বাড়ছে তো ,তাই নৌকা কইরা একটু ঘুরতে  গেছিলাম । 


অলকা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন মেয়ের দিকে । শ্যামা আসলেই বদলে গেছে । আগের মতো আর কথা ঘোরায় না ‌। শক্ত কন্ঠে সোজাসাপ্টা উত্তর দেয় । আগের মতো গলা কাঁপে না আর ।‌ ভেঙে পড়া মানুষ শক্ত হলে পাথর' কেও হার মানায় । শ্যামার ক্ষেত্রে এখন এটা প্রযোজ্য । অলকা নিষ্পলক চেয়ে থেকে বলেন...


" আসরের আযান পড়ছে,, যা ওযু কইরা আয় ।


শ্যামা চলে যায় কলপাড়ে । নামাজ শেষে বেরিয়ে শ্যামা আর মুহিত বা মোমেনা কাউকে দেখতে পায় নি ও । ওরা চলে গেছে নিজেদের বাড়ি  । যাওয়ার আগে একবারও শ্যামা বা অলকা কে বলার প্রয়োজন বোধ ও করে নি । 



আজকাল শ্যামা বেশ উড়নচণ্ডী হয়েছে ।‌ যে মেয়ে সব সময় নিজেকে বন্দি করে রাখতো সেই মেয়ে এখন ফুলির সাথে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায় । নিজেকে মুড়িয়ে রাখা শ্যামা খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে এসেছে ।‌ 

ফুলি রোজ রোজ দুপুর বেলা নৌকা নিয়ে আসে ঘাটে । সেই নৌকায় করে দুই বান্ধবী মিলে ঘুরে বেড়ায় ।

আজ ও তার ব্যতিক্রম হয় নি । ফুলি এসেছে নৌকা নিয়ে । তবে আজকে ঘাটে শ্যামা কে পায় নি সে । ফুলি ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে শ্যামা কে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভেতরে ঢোকে । ফুলির ডাক শুনে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে শ্যামা । ফুলি আজ শাড়ি পড়েছে ,, রং চটা একটা ফিনফিনে সুতির শাড়ি । সাথে পায়ে মোটা করে আলতা, হাতে কাঁচের রিনিঝিনি চুড়ি ‌। শ্যামা ফুলিকে দেখে হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ফুলি মিটি মিটি হেসে শ্যামা কে নিয়ে ঘরে ঢোকে ।‌ 

শ্যামা এখনো তাজ্জব বনে তাকিয়ে আছে । ফুলির শাড়ির আঁচলে কিছু একটা মোড়ানো । ফুলি ধীরে ধীরে আঁচলের ভাঁজ খুলে একটা আলতার কৌটা আর লাল টুকটুকে ডজন খানেক কাঁচের চুড়ি বের করে ‌ । কাঁচের চুড়ির ঝনঝন শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে শ্যামার । শ্যামা চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে বলে....


" তুই শাড়ি পড়ছোস ফুলি । কি সুন্দর লাগতাছে তোরে..! 


ফুলি লাজুক ভঙ্গিতে একটু হাসে । চুড়ি আর আলতার কৌটা শ্যামার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে...


" এই গুলা তোর । 


শ্যামা একটু অবাক হয়ে বলে...


" আমি এই গুলা কি করমু ? আর তুই এই গুলা কোই পাইলি..? 


" সাত গ্রামের মেলা থাইকা একজন আইনা দিছে । 


লাজুক হেসে মাথা নুইয়ে কথাটা বলে ফুলি । শ্যামা চোখ সরু করে ফুলির দিকে তাকিয়ে বলে...


" কেডায় আইনা দিছে..? 


ফুলি মিনমিন কন্ঠে বলে...


" 'আহাদ' ভাই..


" মানে তোর ঐ দুঃসম্পর্কের মামাতো ভাই ? 


" হুম..


" কিন্তু তুই তো কইছিলি উনি শহরে কাম করে । গায়ে থাকে না । 


" এহন শহর থাইকা একেবারে চইলা আইছে,, আর যাইবো না । জমিদারগো বাড়িত কাম পাইছে একটা । হেইডাই করবো । 


" বাবা.. ফুলি ,, তুই এমন লজ্জা পাইতাছোস ক্যান ? কি ব্যাপার ক দেখি ?  তোরে মেলা থাইকা, আলতা, চুড়ি, শাড়ি আইনা দিলো - এমনি এমনি..? 


" ধ্যাত.. জানি না আমি..


লজ্জায় লাল হয়ে গেছে ফুলির শ্যামলা মুখশ্রী । শ্যামা ঠোঁট টিপে মিটি মিটি হেসে বলে...


" এই গুলা তো তোরে আইনা দিছে,, আমারে দিতাছোস ক্যান ? আমি এই গুলা দিয়া কি করমু ? 


" এই গুলা তোর জন্য । এহন তুই এইগুলা পড়বি । আইজ আমরা পুবের জঙ্গলে যামু । জানোস.. পুবের জঙ্গলের দিকে পদ্ম ফুটছে ‌। আইজ পদ্ম আনতে যামু । 


" কিন্তু...


" কোন কিন্তু না... চল তো ..


শ্যামা কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওর হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসে ফুলি । বাইরে বের হতেই মুখোমুখি হয় অলকার । অলকা ফুলিকে আগাগোড়া দেখে জিজ্ঞেস করেন....


" আরে ফুলি ,, তুই ? শাড়ি পড়ছোস ? কোথাও যাইতেছোস ? 


ফুলি শ্যামার হাতটা ভালো করে ধরে ঢোক গিলে বলে...


" ঐ কাকি,,, আসলে আমরা একটু পুবের জঙ্গলের দিকে যাইতাম পদ্ম আনতে..! শ্যামা রে লইয়া যাই..? 


অলকা চোখ সরু করে তাকায় শ্যামার দিকে । শ্যামা মাথা তুলে ভেজা কন্ঠে বলে...


" যামু আম্মা..? 


অলকা মুচকি হেসে বলেন...


" যা,, তয় জঙ্গলের বেশি ভিতরে যাইস না ‌ । আর তাড়াতাড়ি ফিইরা আইবি । 


" আচ্ছা আম্মা । 


বলেই দুই বান্ধবী দ্রুত গতিতে দৌড় লাগায় ঘাটের দিকে । চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত অলকা তাকিয়ে থাকেন শ্যামার উৎফুল্ল চিত্তের দিকে । 

শ্যামা কে ঘাটে বসিয়ে ফুলি ওর পায়ে মোটা করে আলতা পড়িয়ে দেয় । শ্যামার চিকন চিকন হাতে কাঁচের চুড়ি পড়িয়ে দেয় । শ্যামা ওর হাতের চুড়ি গুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে । শ্যামা ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে কয়েকবার হাত ঝাঁকায় ।

চুড়ির রিনিঝিনি শব্দের সাথে শ্যামার মুখেও প্রস্তর হাসি ফুটে ওঠে । শ্যামা ফুলির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে চোখের ইশারায় চুড়িগুলো দেখায় । ফুলি মৃদু হেসে বৈঠা হাতে নেয় । আজ ওরা পুবের জঙ্গলে যাবে । এই সময়টাতে ঐ দিকে পদ্ম ফোটে অনেক । নদীর পাড়ের বিশাল বিল পদ্মতে ভরে যায় । শ্যামা গলুইয়ের উপর শুয়ে নদীর পানি ছুঁইয়ে দেয় নরম আবেশে । 


এদিকে শ্যামা বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর অলকা নামাজ পড়ে উঠানে আসে ‌ । গোসলের পর ভেজা কাপড় মেলে দেওয়া হয় নি এখনো । বাইরের আবহাওয়া ভালো নয় , রোদ নেই ।  অলকা আকাশের দিকে চেয়ে ভেজা কাপড়গুলো মেলে দিচ্ছিলেন বারান্দায় । হঠাৎ পুরুষালি কারোর গলা খাঁকারির শব্দে চমকে যান অলকা ‌।‌ দেওড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন মানিকের কাকা দাঁড়িয়ে আছেন । মানিকের কাকা'কে দেখে অলকার চোখ মুখ শক্ত হয়ে যায় ‌। মানিকের কাকা মাথা নিচু করে এগিয়ে আসেন । স্বভাবিক কন্ঠে বলেন...


" আসসালামুয়ালাইকুম আপা । ভালো আছেন ? 


অলকা মুখ ফিরিয়ে দৃঢ় কন্ঠে জবাব দেয়...


" ওয়ালাইকুমুস সালাম... ভালো আছি না খারাপ আছি এইটা দেখতে আইছেন ? 


মানিকের কাকা'র নিচু মাথা আরো‌ বেশি নিচু হয়ে যায় । তার মুখে অনুশোচনার ছাপ স্পষ্ট ফুটে ওঠে । অলকা তার দিকে ঘুরে বারান্দায় একটা মোড়া এগিয়ে দিয়ে বলেন...


" আপনি আমাগো অতিথি , অতিথি নিয়ামত স্বরূপ , দাঁড়ায় থাইকবেন না, বসেন । 


মানিকের কাকা মাথা নিচু করেই বসেন । অলকা তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । অলকা তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলেন...


" ভুল সময়ে আইছেন ভাই সাহেব ‌, একটু আগে আইলে দেখতে পাইতেন আমার মাইয়া কতটা ভালো আছে ।‌


" খোঁটা দিতাছেন আপা ? 


" দেওয়ার কথা নয় কি..? 


" বিশ্বাস করেন আপা,, আমি যৌতুকের বিষয়ে কিছুই জানতাম না ।‌ আমিও আপনাগো মতো বিয়ের দিনই জানছি । যদি আগে জানতাম তাইলে শ্যামা মা'য়ের জীবনটা এমনে নষ্ট হইতে দিতাম না ।‌ 


" কে কইলো আমার মাইয়ার জীবন নষ্ট হইছে ? নষ্ট তো হয় নাই , বরং নষ্ট হওয়ার হাত থাইকা বাইচা গেছে । 


" আমারে ক্ষমা কইরে দিয়েন আপা । 


মানিকের কাকা'র চোখে আত্মগ্লানি লক্ষনীয় । যা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন অলকা ।‌ অলকা কন্ঠ নরম করে বলেন....


" আপনার ক্ষমা চাওয়ার কোন দরকার নাই ভাই সাহেব ‌। চিন্তা করবেন না, আমার মাইয়া অনেক ভালোই আছে । শ্যামার জীবনে এমন বড় একটা ধাক্কা আসা দরকার আছিলো । এই ধাক্কাটা ওর জীবনে পরিবর্তন আইনা দিছে ‌। কিছু কিছু কষ্ট মাইনষেরে এমন ভাবে পরিবর্তন কইরা দেয় যে মাইনষে আর আগের মতো থাহে না । নরম হৃদয়ও শক্ত হইয়া যায় , সহ্য ক্ষমতা বাড়ে , অনুভূতিরা কঠিন হইয়া যায় । 


" আমি ভুল করছি আপা , আমি সঠিক সময়ে সব কিছু বুঝতে পারলে হয়তো এমন কিছু হইতো না  । 


" ভাগ্যের উপর কারো হাত থাহে না ভাই । আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী ‌, আমার মাইয়ার ভাগ্যে উনি যতটুকু সুখ লিইখা রাখছেন ততটুকু সুখ আমার মাইয়ার জীবনে নিশ্চয়ই আইবো । কেউ আটকাইতে পারবো না । 


" সেই সুখের সন্ধান যদি আমি দিতে পারি আপনারে....


অলকা চকিতে তাকায় । মানিকের কাকা মাথা নেড়ে বলেন...


" আইজ আমি আপনের কাছে একখান প্রস্তাব নিয়া আইজি আপা । দয়াকরে আমারে ফিরায় দিয়েন না । শ্যামা মা'রে আমি আমার ছেলের বউ হিসাবে আপনার কাছে চাইতে আইছি । দেবেন আমায় ? হয়তো মানিক'দের মতো অতো ধনসম্পদ আমার নাই , কিন্তু আপনার মাইয়ারে দুবেলা দুমুঠো খাওন আর কাপড়ের যোগাড় দিতে পারমু আমরা । এই টুকু ভরসা আমাগো উপর রাখতে পারেন । 


অলকা দিপ্ত নয়নে তাকিয়ে আছেন । মানিকের কাকা আবারো বলেন...


" আমার কোন মাইয়া নাই আপা ,, আপনার মাইয়া আমাগো কাছে নিজের মাইয়ার মতোই থাকবো, বিশ্বাস করেন । আমার ছেলে 'আফতাব' দুমাসের মধ্যে দেশে আইবো । যদি আপনি রাজি থাহেন তাইলে আপনার মাইয়ারে আমি আমার মাইয়া রুপে ঘরে তুলতে চাই ‌ ।


অলকা চোখ নামিয়ে শুকনো একটা ঢোক গেলেন । তৎক্ষণাৎ জবাবে কি বলবেন ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি । 


এদিকে শ্যামা আর ফুলি জঙ্গলের কিনারে এসে থামে । এই জায়গাটায় নদীর পুরো অংশ লাল পদ্মে ভরপুর । নদীর বুকে যেন লাল স্বপ্ন জন্ম নিয়েছে । চারদিক নিস্তব্ধ । পুবের জঙ্গলের দিকে তাকালে গাঁ ছমছম করে উঠছে । ঘন জঙ্গলের ভিতর কালো অন্ধকার । জঙ্গলের মাঝ দিয়ে মানুষ হেঁটে যাওয়ার মতো সরু একটা আলে'র মতো রাস্তা । এদিকটায় মানুষ আসে না তেমন ‌। নিস্তব্ধ জঙ্গল থেকে মাঝে মাঝে দু-একটা পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে । ফুলির বৈঠা ছলাৎ ছলাৎ করে আঘাত করছে পানিতে । শ্যামা জঙ্গলের দিক থেকে চোখ সরিয়ে শুকনো একটা ঢোক গেলে । নদীর পদ্ম গুলোর দিকে তাকাতেই শ্যামার কোমল হৃদয় প্রফুল্লতায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে । দুপুর হওয়ায় কিছু পদ্ম মুড়িয়ে গেছে । তবে আবহাওয়ার শীতলতার কারনে শত শত পদ্ম ফুটিয়ে তুলেছে নিজের সৌন্দর্য কে । বৃষ্টি ভেজা নরম আলোয় পদ্ম গুলো রং ছড়িয়ে বসে আছে । নদীর মৃদু ঢেউয়ে পদ্ম ফুলের পাপড়ি গুলো কেঁপে উঠছে ।‌ নদীর জলের প্রতিবিম্বে ভেসে উঠেছে হাজার হাজার পদ্ম । ফুলি ধীরে ধীরে বৈঠা বাইছে । শ্যামা নরম হাতে ছুয়ে দিচ্ছে ফুল গুলোকে ‌। শ্যামার স্পর্শে লাজুক ভঙ্গিতে কেঁপে উঠছে ফুল গুলো ।‌ ফুলি শ্যামার দিকে তাকিয়ে বলে... 


" কয়েকটা ফুল তাড়াতাড়ি তুইলা নে শ্যামা ,, এইহানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হইবো না । 


শ্যামা শীতল কন্ঠে বলে...


" দেখনা ফুল গুলো কত‌ সুন্দর ,, এই গুলারে তুলতে ইচ্ছা করতাছে না রে । ওদের সৌন্দর্য তো এইহানেই । 


" তাইলে এইহানে আইলি ক্যান ‌? ফুল তোলার জন্যে তো আইছোস নাকি ? কয়েকটা ফুল তুলে নে, এমনিতেও এইগুলো মাইনষে আইসা তুইলা নিয়া যাইবো । 


শ্যামার ঠোঁট উল্টে ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে নরম হেসে কয়েকটা ফুল তুলে নেয় । ফুলি নৌকা টাকে পাড়ের কাছাকাছি নিয়ে যায় । পাড়ে নৌকা থামিয়ে শ্যামার কাছে যায় । হাত বাড়িয়ে নিজে কয়েকটা ফুল তুলে নেয় ও । সেই ফুল গুলো একটার সাথে আরেকটা পেঁচিয়ে মাথার মুকুটের মতো বানিয়ে শ্যামার মাথায় পড়িয়ে দেয় । শ্যামা অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে । ফুলি শ্যামার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকায় । শ্যামার দিকে তাকালে অদ্ভুত শীতলতা জাগে মনে । শ্যামার হাতে একাধিক পদ্ম ফুল , মাথায় পদ্মের মুকুট , চোখে ঘন কাজল , হাতে লাল টকটকে পদ্মের ন্যায় কাঁচের চুড়ি , পায়ে গাড় লাল আলতা , সব মিলিয়ে শ্যামার অপরুপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে । ফুলি শ্যামার দিকে হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে । ফুলিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচায় শ্যামা । ফুলি অপলক চেয়ে বলে....


" তুই কি সুন্দর শ্যামা  !


শ্যামা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে । ফুলি আবারো বলে...


" দেখিস তোরে যে পাইবো সে হইবো দুনিয়ার সবচেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ । 


" আমারে পাইয়া কেউ কোন দিন ভাগ্যবান হইবো না ফুলি ,, কারন ভাগ্যবান হওয়ার মতো কোন রুপ বা গুন আমার নাই ‌। আর আমার ভাগ্য ও অতটা ভালো নয় যে কেউ আমারে পাইয়া ভাগ্যবান হইবো ।‌ 


শ্যামার কথা শেষ হতে না হতেই কোন কিছুর শব্দ ভেসে আসে জঙ্গলের দিক থেকে । শ্যামা ফুলি দু'জনেই চমকে উঠে চকিতে তাকায় পেছনের দিকে ।‌ জঙ্গলের কোন একটা পশুর মৃদু আওয়াজের শব্দ ভেসে আসছে । শব্দটা ক্ষীন শোনা যাচ্ছে । কোন ছোট খাট প্রাণির মৃদু আর্তনাদ শোনা মাত্রই শ্যামা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় । শ্যামা কে দাঁড়াতে দেখে ফুলি বলে...


" এইহানে থাকাটা ঠিক হইবো না শ্যামা । তাড়াতাড়ি বস আমি নৌকা ঘোরাই । 


" কিন্তু ঐ দিক থাইকা...


" হয়তো কোন শিকারীর ফাঁন্দে শিকার পড়ছে । 


" চল না দেখি...


" না শ্যামা । জমিদাররা শিকার করতে বাইর হয় এই সময় ,, আমরা যদি যাই তাইলে আমগো বিপদ হইতে পারে । 


শ্যামা ফুলির বারন না মেনে আচমকা নৌকা থেকে নেমে পড়ে । মৃদু গোঙানির শব্দ লক্ষ্য করে ছুট লাগায় সেই দিকে । শ্যামা কে দৌড়াতে দেখে ফুলিও পিছন থেকে শ্যামা কে ডাকতে ডাকতে নৌকা থেকে নেমে পড়ে । শ্যামা দ্রুত পায়ে দৌড়ে গিয়ে একজায়গায় থামে । এই জায়গা থেকে ঘন জঙ্গলের শুরু । ভেতরের দিকে কুচকুচে অন্ধকার । শ্যামা এদিক ওদিক চোখ ঘোরায় । আশপাশ কোথাও থেকে আওয়াজ টা ভেসে আসছে । শ্যামা চোখ বন্ধ করে কান খাঁড়া করে বোঝার চেষ্টা করে । কিছু একটা বুঝে ডানদিকে এগিয়ে যায় । কয়েক পা এগোতেই একটা রক্তাক্ত খরগোশ ছানা নজরে আসে শ্যামার । খরগোশ ছানাটার পেটের দিকে পায়ের উপরের অংশে তীর বিদ্ধ হয়ে আছে । শ্যামা হুড়মুড়িয়ে বসে , পাশে ফুলগুলো রেখে খরগোশটাকে কোলে নেয় । রক্ত দেখে ভয়ে আর সংশয়ে গা গুলিয়ে ওঠে শ্যামার । শ্যামা চোখ বন্ধ করে একটানে তীরটা বের করে নেয় । তীরটাকে ছুড়ে ফেলে অনেক দূরে । তীরের মাথার অল্প অংশ ঢুকে গেছিল খরগোশটার পেটের কাছে । শ্যামা খরগোশটার গায়ে আলতো হাত বুলিয়ে দেয় ।  এমন সময় শ্যামার পেছন থেকে শুদ্ধ বাক্যে একটা শক্ত পুরুষালী ভরাট কন্ঠ ভেসে আসে...


" এই মেয়ে কে তুমি ? তোমার সাহস কি করে হয় আমার শিকারকে মুক্ত করার ? 


চলবে......

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×