লেখিকা:সুরভী আক্তার
পর্ব:০৩
তপ্ত দুপুরের রোদে চারদিক খাঁ খাঁ করছে । প্রচন্ড গরম পরেছে এবার । রোদের তাপে মাটি ফেটে চৌচির । 'ধরলা' নদীর পানি অনেকটা শুষে নিয়ে নিজের তৃষ্ণা মিটিয়েছে সুর্যি মামা । তবুও যেন ক্ষান্ত হননি তিনি, নিজের সবটুকু তেজ বাড়িয়ে দিয়ে শোষণ করছে ধরনী'কে । অন্যসময় ঘাটের সিঁড়িতে বসে নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকা যেত,, কিন্তু এখন ঘাটের সিঁড়ি থেকে কয়েক স্তর নিচে নেমে গেছে সেই পানি । গাছের পাতা গুলোও যেন একে অপরের সাথে 'ছামচি লতা' খেলছে,, কারোর আগে কেউ নড়লেই আউট হয়ে যাবে । এই আউট হওয়ার ভয়ে গাছের একটা পাতা ও নড়ছে না । মাটিতে খালি পায়ে হাঁটা দায় হয়ে গেছে । মাটি এখন গরম তাওয়ার মতো হয়ে আছে, একটুখানি তেল দিয়ে ডিম ভাজাও যাবে বোধহয় । এতোক্ষণ ঘাটের সিঁড়ির উপরের বড় আম গাছটার নিচে বসে ছিল শ্যামা । তবে এই গরমে আর সেখানে বসে থাকা যাচ্ছে না । বিরক্তিতে মাথার ভেজা চুল গুলো খোঁপা বেঁধে উঠে দাঁড়ায় শ্যামা । একবার আকাশের দিকে তাকায় .." নাহ বৃষ্টি আসার কোনো লক্ষণ নেই"। রোদ থেকে বাঁচার জন্য মাথার উপর ওড়না টা ছাতার মতো করে নিয়ে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে সে । ঘরে গিয়ে দেখে,, এই গরমেও চিৎপটাং হয়ে শুয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে ময়না,গরমেও কোন হেলদোল নেই । ফর্সা মসৃন মুখটা ঘামে চিকচিক করছে,, শ্যামার শরীরও ঘেমে একাকার । বিছানার পাশ থেকে হাত পাখাটা নিয়ে বোনকে কিছুক্ষণ বাতাস করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে শ্যামা । মায়ের ঘরে গিয়ে দেখে ঘরে মা নেই,, হয়তো নামাজ শেষ করে বেরিয়েছে । ঘর থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে মাকে খুঁজতে থাকে শ্যামা,, রোদের কারনে ঠিকমতো চোখ মেলে তাকানো যাচ্ছে না, চোখে অন্ধকার নেমে আসছে । শ্যামার ঘোলা চোখের দৃষ্টি হঠাৎ থেমে যায় বারান্দার এক কোণে রোদে বসে থাকা অলকা'র দিকে । রোদ ছাপিয়ে চোখ বড়বড় করে তাকাতেই ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে । এলোমেলো ভাবে দৌড়ে যায় মায়ের কাছে,, নিজের ছায়া দিয়ে যথাসম্ভব মাকে রোদ থেকে আড়াল করার চেষ্টা চালিয়ে যায় । অলকা দুই হাঁটুতে মুখ গুজে বসে আছেন এই রোদের মধ্যে । শ্যামা হাঁটু ভেঙ্গে বসে মায়ের দুই বাহু ঝাঁকিয়ে হাঁসফাঁস করে মাকে ডাকে...
" আম্মা..ও আম্মা,,,কি হইছে তোমার ? এইহানে এমনে বইসা আছো ক্যান আম্মা ? ও আম্মা,,ওঠো না ।
মেয়ের ডাকে নড়েচড়ে বসে অলকা ,, ক্লান্ত দৃষ্টি তুলে তাকায় মেয়ের দিকে । অলকা'র ফর্সা মুখশ্রী রোদের তাপে লাল হয়ে গেছে,, চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঝড়ছে । মায়ের এমন চেহারা দেখে শ্যামা ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে দেয় । ক্রন্দনরত ভেজা কন্ঠে আবারো বলে...
" কি হইছে তোমার আম্মা ? এই কাঠফাঁটা রোইদের মধ্যে তুমি ক্যান এমনে বইসা আছো ?
অলকা কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত কন্ঠে জবাব দেন...
" আমার কিছু হয় নাই মা । মনে হয় ভেতরে ভেতরে জ্বর বইতাছে,, মাঝে মাঝে শরীরটা কেমন কাঁপুনি দিয়া উঠে , তাই এইহানে রোইদে বইসা আছিলাম ।
মায়ের কথায় শ্যামার কান্নার বেগ কমে যায় । একটু শান্ত হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা । অলকা উঠে মেয়েকে নিয়ে বারান্দায় বসেন ,, মেয়েকে বারান্দার নিচে বসিয়ে ওর মাথাটা নিজের কোলে রেখে একহাতে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকেন । এখনো মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে উঠছে শ্যামা । অলকা দৃঢ় কন্ঠে বলেন...
" সব বিষয়ে কান্দোনের অভ্যাস টা বদলায় ফেল শ্যামা । কয়দিন পর মাইনষের বাড়ির বউ হইয়া যাবি,অনেক দায়িত্ব আছে তোর কাঁধে, নিজেরে একটু শক্ত করতে শেখ । সব জায়গায় আমি থাকমু না তোরে সামলানোর লাইগা ।
মায়ের কথায় চকিতে মায়ের দিকে তাকায় শ্যামা । এই পৃথিবীতে সব চেয়ে বড় আশ্রয় যে তার মা ,, মায়ের অস্তিত্ব ভালোবাসা তার কাছে অমূল্য । বাইরের জগতে তো কেউ ওর মা নয় । মনের ভেতর অজানা ভয় জাগে শ্যামার । দুই হাতে আষ্টেপৃষ্ঠে মায়ের কোল জড়িয়ে ধরে সে । নিস্তেজ স্বরে বলে…
" তুমি না থাকলে আমার কি হইবো আম্মা ? তুমি ছাড়া যে আমি সুতা কাটা ঘুড়ির মতোই হতাশ ,, কোথায় গিয়া পরমু আমি নিজেও জানি না ।
" তোর পরবর্তী জীবনে তো আমি থাকমু না ,, আমাকে ছাড়া থাকতে হইবো তোরে । কিন্তু দেখিস তোর জীবনে এমন কেউ আইবো যে তোরে ঘুরির মতোই উড়তে দিবো কিন্তু কখনো সেই ঘুরির সুতা ছিঁড়তে দিবো না । আগলে রাখবো তোরে…
★
মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে । সেইদিন পাত্র পক্ষ চলে যাওয়ার পর আজ চতুর্থ দিন । সেইদিন পাত্র পক্ষ শ্যামা কে দেখার পর নীরব ছিলেন,, বেশি কথা বাড়ায় নি তারা । শ্যামা কে যে তাদের পছন্দ হয়েছে তা বুঝতে পেরেছেন অলকা,, পাত্রের কাকার চোখে শ্যামার প্রতি মুগ্ধতা দেখেছেন তিনি । তবে তারা চলে যাওয়ার পর আর কোন খবর পাওয়া যায়নি তাদের । দুপুর ১২ টা বাজে । অলকা উঠান ঝাড়ু দিচ্ছিলেন । এমন সময় বাড়ির ভেতরে আগমন ঘটে পাঁচ জন পুরুষের । তাদের দেখে অলকা মাথায় ঘোমটা টেনে নেয় । সেই দিনের পাত্রের কাকা মামার সাথে আরো দুইজন এসেছে আজকে সাথে সৈয়দ ঘটক তো আছেই । হঠাৎ ওনাদের আগমনে অলকা একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায় । বারান্দায় বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয় তাদের । কিছুক্ষণের মধ্যে মোখলেছও বাড়িতে আসে,, সৈয়দ ঘটক আগেই খবর পাঠিয়েছিল মোখলেছ কে । অলকা সম্মানের সহিত তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন । নিজে এগিয়ে গিয়ে তাদের প্রশ্ন করেন...
" তা ভাই ,, আপনারা আইজ আবার ...?
পাত্রের মামা বলেন...
" ক্ষমা করবেন আপা ,, সেই দিন বাড়িত যাওয়ার পর একটা ঝামেলায় পরছিলাম , তাই আর কথা আগাইতে পারি নাই । তয় আমাগো আপনার মাইয়ারে পছন্দ হইছে,,আইজ আমরা কথা পাকা করার উদ্দেশ্যেই আইছি ।
অলকা'র কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ পড়ে ,,
" কি কন ভাই সাহেব ..? এখনো তো ছেলে মেয়ে একে অপরকে দেখেই নাই । আমার মাইয়ারে যে আপনাগো ছেলে....
" আহ , অলকা,, এতো কথা বাড়াও ক্যান । ওনারা তো কইতাছেন শ্যামারে ওনাদের পছন্দ হইছে ।
অলকা কে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে মোখলেছ বলেন । পাশ থেকে পাত্রের কাকা বলে ওঠেন...
" আপনি চিন্তা কইরেন না আপা,, আমাগো ছেলে শ্যামার ছবি দেখছে, আর শ্যামারে ওরো ভীষন পছন্দ হইছে । এই লন আমাগো ছেলের ছবি,, আমাগো ছেলে কিন্তু রাজপুত্র । আপনার মাইয়া সুখে থাকবো ।
অলকা'র হাতে একটা ছবি ধরিয়ে দেয় পাত্রের কাকা । পাত্র আসলেই সুদর্শন,, গায়ের রংটাও উজ্জ্বল । ছয়মাস আগে সৌদি থেকে ফিরেছে,,এখন পারিবারিক গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত । অলকা'র সামনে পাত্র পক্ষ জানায় তাদের কোন দাবি দাওয়া নেই । তারা শুধু বাড়ির বউ হিসাবে শ্যামাকে চায় । সবার আলোচনার ভিত্তিতে সাত দিনের মাথায় বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হয় । অলকার কাছে খটকা লাগে সবটা । এতো তাড়াতাড়ি বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা নিয়ে বাঁধা প্রদান করতে চেয়েও করেন না তিনি । কিছুক্ষণ পর পাত্রের মামা আর বাকি দুইজন উঠে মোখলেছকে নিয়ে বাড়ির পিছনের দিকে যায় । সেখানে তাদের মধ্যে কিছু আলোচনা হয় । যা অলকার কান পর্যন্ত পৌঁছায় না । আলোচনা শেষে তারা যখন ফিরে আসেন তখন মোখলেছের থমথমে গম্ভীর মুখশ্রী নজরে আসে অলকার । তাদের আসার পর পাত্রের কাকা বলেন...
" তাহলে আইজ আমরা উঠি,,, আমাগো বউমারে এই সাতদিন আপনাগো হেফাজতে রাইখা গেইলাম ।
পাত্রের কাকার কথায় অলকার ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে । গলা ভারি হয়ে আসে তার । আর শুধু মাত্র সাতদিন তারপর শ্যামা তাকে ছেড়ে চলে যাবে,,তাকে সবসময় আর আম্মা আম্মা বলে ডাকবে না,, ভেতরটা কেমন শুন্য হয়ে যায় অলকার,,যে মেয়েকে কখনো চোখের আড়াল করেন নি সেই মেয়ে কিনা একেবারে দুরে চলে যাবে । যে মেয়েকে এতো দিন আগলে রাখল সেই মেয়ে কিনা এখন অলকার কাছে আমানত । অজান্তেই চোখের কর্নিশ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে ।
সৈয়দ ঘটক সবাইকে নিয়ে উঠে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় । এমন সময় তাদের সামনে পড়ে ময়না । সবে স্কুল থেকে ফিরছিল সে । ময়নাকে দেখে পাত্রের মামা চোখ সরু করে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে নেয় । এদিকে তার এমন দৃষ্টি নজর এড়ায় না অলকার । অলকা'র ভেজা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে সব । সে দ্রুত পায়ে এসে মেয়ের হাত ধরে চলে যায় । ময়না চলে যেতেই পাত্রের মামা মোখলেছকে উদ্দেশ্যে করে বলে উঠলো...
" এইটা তাইলে আপনার ছোট মাইয়া নাকি ..?
" হ,, বেহাই সাহেব । - ছোট করে জবাব দেয় মোখলেছ ।
জবাবে সন্তুষ্ট হয় পাত্রের মামা ।
এদিকে ময়নার হাত ধরে ঘরে আসে অলকা । ঘরে আসতেই নজর যায় শ্যামার দিকে । গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা, চিবুক গলায় নামানো । চোখের পাপড়ি গুলো ভেজা । কোমল মুখশ্রী মলিন হয়ে আছে । অলকা ময়নার হাত ছেড়ে এগিয়ে যায় শ্যামার দিকে । এদিকে হাত ছাড়া পেতেই ময়না কাঁধের ব্যাগটা ধপাস করে রাখে খাটের উপর , মায়ের হাত থেকে পাত্রের ছবিটা ছোঁ মেরে নিয়ে নেয় । ময়নার হঠাৎ কান্ডে শ্যামা এবং অলকা দুইজনই চকিতে তাকায় ওর দিকে...ময়না হা করে তাকিয়ে আছে ছবির দিকে,, ছবির দিকে তাকিয়েই অবাক দৃষ্টিতে বলে.....
" আরে বাহ্ আম্মা ..! এই বেডার লগে আপার বিয়া হইবো ..? এইটা তো পুরাই সিনেমার হিরোর মতো দেখতে । আপার গায়ের রংয়ের সাথে তো একদমই মানাইবো না....
বলতে বলতে থেমে যায় ময়না,, আড়চোখে তাকায় মায়ের দিকে । মায়ের রাগি দৃষ্টি নজরে আসতেই ছবি রেখে দৌড়ে পালায় ঘর থেকে । ময়না চলে যেতেই অলকা দুপাশে মাথা নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন । এগিয়ে গিয়ে বসেন খাটের উপর । শ্যামাকে ইশারায় বসতে বলে তার পাশে। শ্যামা পাশে বসতেই অলকা আলগোছে হাত ধরে মেয়ের,,
" দেখ মা,, তোরে একদিন না একদিন বিয়া দেওনোই লাগতো । মাইয়ারা তো কখনো বাপের বাড়িতে থাকোনের লাইগা জন্মায় না । আমি জানি সবকিছু একটু বেশি তাড়াতাড়ি হইয়া গেছে,, কিন্তু যা হয় ভালোর জন্যই হয় । সেই দিন আমি বুঝতে পারছিলাম ওনারা তোরে পছন্দ করছে ,,তাই তোর 'কাদের' মামারে দিয়া খোঁজ করাইছি, ওনারা অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ, কেউ ওনাগো বিষয়ে কোন কটু কথা কয় নাই । ছেলেও অনেক ভালো শুনছি,, আগে সৌদিতে থাকতো । হের নাম 'মানিক' । তোর ছবি দেইখাই পছন্দ করছে । তার উপর ওদের কোন দাবি নাই ,, ওরা শুধু তোরে চায় । জানিস ওনারা আমারে কি বইলা গেলো -- ওনারা কইলো তুই নাকি এই সাতদিনের জন্য আমার কাছে আমানত, সাতদিন পর ওনারা ওনাদের আমানত বুইঝা নিবো । গত ১৯ টা বছর ধইরা তোরে আগলাই রাখছি আমি আর এই সাতদিনে কিনা তুই পর হইয়া যাবি ।
অলকার কন্ঠ কাঁপছে,, চোখ টলমল করছে.... এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে যান তিনি । শ্যামা মাথা নিচু করে বসে আছে, চোখে জল তার । অলকা কাঁপা হাতে মেয়ের গাল ছুঁয়ে দেয় পরম আবেশে ,,অলকার মন বলে..." আমি যদি পারতাম তাইলে সারাজীবন তোরে বুকের ভেতর আগলাই রাখতাম রে , কেউ তোরে আমার কাছ থাইকা দুরে নিয়া যাইতে পারতো না । " অলকা'র মনের কথা মনেই মিলিয়ে যায়।
চোখে পানি অথচ ঠোঁটে হাসি নিয়ে অলকা বলে..
" মনে রাখিস মা,, তুই তোর মায়ের গর্ব,, তুই আমার থাইকা দুরে চইলা যাইবি ঠিক কিন্তু তোর ছায়াটা প্রতিটা মুহূর্তে আমার নিঃশ্বাসে থাকবো । মায়ের দোয়া কখনো বিফলে যায় না,, দেখিস তোর ঘর হইবো তোর সুখের নীড়।
শ্যামার নিশ্চুপ,মাথাটা এখনো নিচু । অলকা আর কিছু বলে না,হাত বাড়িয়ে খাটের উপর থেকে ছবিটা নেয় ,, একবার ছবিটার দিকে তাকায় আর একবার শ্যামার দিকে । শ্যামার হাতের উপর ছবিটা রেখে নিঃশব্দে ঘর ছাড়েন তিনি । ঘরের বাইরে আসতেই মোখলেছের রাগি চেহারা নজরে পড়ে অলকার । কাকরি বুড়ির ঘর থেকে রাগে গজগজ করতে করতে বেড়িয়ে আসছে মোখলেছ । ভেজা চোখ মুছে নেয় অলকা,, এগিয়ে যায় স্বামীর দিকে । ভারি কন্ঠে পর পর প্রশ্ন করে....
" তখন পাত্রের মামা আপনারে একা ডাইকা লইয়া কি কইছে ? আর এখনি বা কি এমন হইলো যে আপনি আম্মার ঘর থাইকা রাইগা বাইর হইয়া আইলেন ?
মোখলেছের গাঁ রি রি করে জ্বলে ওঠে । রাগে গজগজ করতে করতে কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই পিছন থেকে কাকরি বুড়ি বলে ওঠে...
" কি আর হইবো,, কিছুই হয় নাই । তুই যা অলকা ,, মাইয়াডার লগে লগে থাক । কয়দিন পর তো চইলাই যাইবো ।
হঠাৎ কাকরি বুড়ির এমন বদলে যাওয়া এবং মোখলেছের রাগের কারন কিছুই বুঝে উঠতে পারে না অলকা । তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় কাকরি বুড়ির দিকে ,, তারপর ধীর পায়ে চলে আসে সেখান থেকে । এদিকে অলকা চলে যেতেই কাকরি বুড়ি মোখলেছের হাত ধরে নিচু স্বরে বলেন...
" দেখ এইটাই সুযোগ,,ঐ মাইয়াটারে বিদায় করার,,এই সুযোগ হাত ছাড়া করোন যাইবো না । একবার বিয়াটা হইলে পরে ওর কি হয় হইবো । কোনরকমে খালি বিয়াটা হইয়া যাক,, তারপর ওর জীবনে যা হয় তা হইবো,, তোরে অতো ভাবোন লাগবো না ।
এদিকে শ্যামার ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা । শ্যামার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে শুধু । ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে শ্যামা । হাতটা কাঁপছে ওর ,, হাতের উপর রাখা ছবিটা উল্টো করে রাখা । ছবিটা সোজা করে দেখার মতো যেন কোন শক্তি নেই শ্যামার হাতে । কাঁপা কাঁপা হাতে ছবিটা হাতে নেয় শ্যামা । ভেজা ভেজা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ছবিটার দিকে । এক অদ্ভুত শীতলতা খেলে যায় শ্যামার পুরো শরীরে। এই লোকটার সাথে কিনা শ্যামার বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। এই লোকটা নিজে শ্যমাকে পছন্দ করেছেন ? কেনো যেনো এইসব কিছু স্বপ্নের মতো লাগছে শ্যামার কাছে । ছবিতে থাকা লোকটার সাথে কি শ্যামার গায়ের রংয়ের কোন মিল আছে..? না নেই । ময়না তো ঠিকই বলেছে শ্যামার গায়ের রংয়ের সাথে একদম মানাবে না এই পুরুষটিকে । আর কিছু ভাবে না শ্যামা । ছবিটার দিকে তাকিয়েই অজান্তেই শ্যামার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে ।
সত্যিই কি এখন শ্যামা সুন্দরীর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে ? শ্যামা কি নতুন ঘরে নতুন সুখের নীড়ে সংসার বাঁধতে চলেছে ..?
চলবে.......... |
0 Comments