লেখিকা:সুরভী আক্তার পর্ব:০৪
দেখতে দেখতে কেটে গেছে ছয় দিন । কাল শ্যামার বিয়ে,,আজ গায়ে হলুদ । মোখলেছের সামর্থের চেয়েও খুব ছোট পরিসরে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে । যাকে বলে একেবারে ঘরোয়া ভাবে হচ্ছে শ্যামার বিয়ে । আশেপাশে সব জায়গায় , বলা যায় পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে বিয়ের খবর । সকাল দশটা বাজে,, আর একটু পর শ্যমাকে হলুদ লাগানো হবে । নিয়ম অনুযায়ী গায়ে হলুদের পর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত মেয়েদের নাকি বাড়ির বাইরে বের হতে নেই,, দোষের হাওয়া লাগে । তাই হলুদের আগে শেষবারের মতো নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্থান - নদীর ঘাটে এসে বসেছে শ্যামা । সাথে আছে প্রাণ প্রিয় বান্ধবী ফুলি । ঘাটের দুই দিকে দুই প্রান্তে বসেছে দুজন । দুজনেরই মুখ ভার ,, কারোর মুখে কোন কথা নেই । দৃষ্টি অদূরে সীমাবদ্ধ। সামনে বহমান নদী , গায়ে ঠান্ডা বাতাস , নদীর পানির কল কল ধ্বনি ভেসে আসছে । শ্যামা চুপ করে জল রেখার দিকে তাকিয়ে আছে । ফুলি একবার তাকায় শ্যামার দিকে, শ্যামার কোমল হৃদয়ের উথাল পাতাল ঢেউ বুঝতে বাকি নেই ফুলির । ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে শ্যামার মুখশ্রীর দিকে ,,শ্যামার পড়নে কাঁচা হলুদ রঙা স্যলোয়ার কামিজ । কেমন যেন নতুন নতুন লাগছে শ্যামাকে । সবাই বলে বিয়ের বাতাস পাইলে মেয়েদের নাকি সৌন্দর্য বাড়ে । ফুলি উঠে এগিয়ে যায় শ্যামার কাছে, নিঃশব্দে পাশে বসে । শ্যামা নরম দৃষ্টিতে তাকায় ফুলির দিকে ,, তবে ফুলির ঠোঁট টিপে হাসার কারন বুঝতে না পেরে ভ্রু যুগল কুঁচকে যায় শ্যামার । নিজের দিকে একবার তাকিয়ে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করে নেয় শ্যামা । পরমুহূর্তে বলে…
" আমার দিকে তাকায়া ওমনে হাসতাছোস ক্যান ?
" তোকে তো দেখি এখন থাইকাই কেমন বউ বউ লাগতাছে শ্যামা,, তোর গায়ে আমি কেমন নতুন বউ নতুন বউ গন্ধ পাইতাছি ।
" এইটা আবার কেমন কথা ..?
ফুলি শ্যামার মুখের দিকে অনেকটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে...
" এইটাই তো কথা নতুন বউ । তুই জানোস কালকে কি হইবো ? তোর বিয়া হইবো,,বিয়া মানে কি বুঝোস ? ....... তোকে আর মানিক বদনের ছবির দিকে চাইয়া থাকোন লাগবো না । প্রতিদিন মানিক বদনের ছবি লুকাইয়া লুকাইয়া দেখা, মুচকি মুচকি হাসা, সবকিছুই কিন্তু আমি দেখছি ।
ফুলির কথায় শ্যামা খানিক লজ্জা পায় । নাজুক চেহারাটা লজ্জায় লাল হয়ে যায় শ্যামার। ফুলি ঠোঁট চেপে আবারো বলে…
" আহারে আমার লজ্জাবতী সখিরে । কাল তোর লজ্জা কই যাইবো... আয় হায় ভাবতেই আমার কেমন যেন লাগতাছে......
শ্যামা ঠোঁট ফুলিয়ে মাথা নিচু করে ফুলিকে বলে...
" দেখ ফুলি ভালো হইবো না কিন্তু , তোরে না আমি আর কোনদিন কিছু কমু না ।
শ্যামার বোকা বোকা কথায় ফুলি এবার ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে ফেলে । এমন সময় পিছন থেকে কারো কন্ঠ ভেসে আসে.....
" শ্যামা....."
চেনা কন্ঠে শ্যামার নাম শুনে ফুলি আর শ্যামা দুজনেই হকচকিয়ে পেছন ফিরে তাকায় । ঘাটের উপরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে রুপা । রুপাকে দেখে শ্যামার ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে, মুহূর্তেই বসা থেকে উঠে দৌড়ে যায় আপার কাছে । আপাকে জড়িয়ে ধরে সে । বোনের পরশে ফিরে পাওয়া ভালবাসার এক আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে যেন ।
" কেমন আছো আপা ? কতো দিন হইলো তোমারে দেখি না ,,এতো দিনে তোমার আসার সময় হইলো বুঝি..?
রুপা আলতো হেসে বোনের মাথায় হাত রাখে । মিহি স্বরে বলে…
" আমিও তো তোরে কতদিন ধইরা দেখি না রে । তোর এই মায়াভরা মুখটা দেখার লাইগা আমার ভেতরটা কেমন ছটফট করে তুই জানিস ?
শ্যামা এবার রুপাকে ছেড়ে দেয়,, চোখ তুলে ঠিকমতো তাকায় রুপার দিকে । নদীর পাড়ের নরম রোদের ঝিলিক এসে পড়েছে রুপার উজ্জ্বল মুখশ্রীতে । আবেগ ও উত্তেজনার বশে রুপার গর্ভাবস্থার কথা বেমালুম ভুলে গেছিলো শ্যামা। রুপার পেটের দিকে তাকাতেই চোখমুখে আবারো হাসি ফুটে ওঠে শ্যামার । রুপার গর্ভাবস্থার পাঁচ মাসে পরেছে,, পেটটা কেমন ফুলে উঠেছে । শ্যামা হাত রাখে রুপার পেটের উপর....
" আপা,,,আপা তুমি মা হইবা আপা..?
রুপা উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে শ্যামার হাতের উপর হাত রাখে । তারপর ফুলির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে....
"কেমন আছিস ফুলি ?
" আমি ভালো আছি আপা । ভালো থাকমু নাই বা ক্যান,,, আমার শ্যামার যে বিয়া ।
ফুলির মুখে বিয়ের কথা শুনে শ্যামা লাজুকতায় মাথা নিচু করে নেয় । শ্যামা কে দেখে রুপা আর ফুলি একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে ঠোঁট কামড়ে হাসতে থাকে । হাসতে হাসতেই রুপার চোখ চিকচিক করে ওঠে , শ্যামার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে । শ্যামার থেকে মুখ ফিরিয়ে চোখের পানি আটকে নিজেকে শান্ত করে নেয় ।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কারো কর্কশ গলায় হাঁকডাক ভেসে আসে...
" এই শ্যামা , তুই এখনো এইহানে আছোস ? হলুদের সময় হইয়া গেছে । তোর যে বিয়া সেই খেয়াল আছে ?
তিনজনই একসাথে চকিতে তাকায় । ততক্ষণে মোখলেছের বড় বোন 'মোমেনা' তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে । শ্যামার যেদিন বিয়ে ঠিক হয় ,, ঠিক তার পরদিনই মোমেনা তার ১২ বছরের ছেলেকে নিয়ে হাজির হয় এই বাড়িতে । তবে উদ্দেশ্যে শ্যামার বিয়ে নয় ,, বরং স্বামীর সাথে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন তিনি । এটা প্রায়শই ঘটে থাকে ,, মাসে দুই থেকে তিন বার মাতাল স্বামীর সাথে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি ।
" আরে ফুফু,,, তুমি কোন দিন আইছো ?
রুপার কথায় ওর দিকে তাকায় মোমেনা । তাকাতেই প্রথমে নজর যায় পেটের দিকে । নাক সিঁটকায় মোমেনা । মুখে বলে…
" আমি তো কয়দিন হইলো আইছি । কিন্তু তুই আওনের লগে লগে এই অবস্থায় এইহানে চইলা আইছোস ,,ভয় ডর নাই মনে ?
তারপর শ্যামার দিকে তাকিয়ে খ্যাক খ্যাক করে বলে..
" আর এই মাইয়া ,, তোরে না হাজার বার বারন করলাম ঘাটে আইবি না । ওদিকে মানুষজন আইয়া পড়ছে । চল আমার সাথে ।
বলেই শ্যামার হাতে হ্যাঁচকা টান দেয় মোমেনা । শ্যামা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে নেয়, তবে হাত ধরে আগলে নেয় রুপা । শক্ত কন্ঠে বলে…
" শ্যামার হাত ছাড়ো ফুফু,, আল্লাহ পা দিছে ওরে , হাঁটতে পারে ও । ও হাঁইটা চইলা যাইতে পারবো ।
মোমেনা শ্যামার হাত ছেড়ে মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করতে করতে বাড়ির ভেতরে চলে যায় । শ্যামা রুপার দিকে তাকিয়ে হাসে , তবে হাসিতে উচ্ছাস নেই । সে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় ।
বাড়ি ভর্তি লোকজন,হইচই আর হুল্লোড় । অল্প খরচে হলেও মেয়ের বিয়েতে অলকা কোন কমতি রাখতে দিচ্ছেন না । এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছেন তিনি । গ্রামের বুড়িরা এসে জট পাকিয়েছে শ্যামাকে ঘিরে ,, শুরু করে দিয়েছে তাদের গিতের আসর । উঠানের এক কোনায় চৌকিতে বসানো হয়েছে শ্যামাকে । পড়নে হলুদ রঙা নতুন থানের শাড়ি । লম্বা ঘন কালো চুল গুলো মাঝ দিয়ে সিঁথি করে খুলে রাখা । ঘাড়ে একটা গামছা ঝোলানো । শ্যামা মাথা নিচু করে বসে আছে ।
উঠানের ঠিক মাঝখানটায় সুন্দর করে আলপোনা আঁকা হয়েছে । কাঁচা হলুদ আর চন্দনের ঘ্রাণে ভরে উঠেছে চারদিক । শ্যামা কে এখনো কেউ হলুদ লাগায়নি । সবাই অপেক্ষা করছে অলকার জন্য । নিয়ম অনুযায়ী মেয়ের গায়ে সবার আগে মা হলুদ ছোঁয়ায় । তারপর সবাই । অলকা গুটি গুটি পায়ে এসে দাঁড়ায় ভিরের মাঝে । শ্যামার নরম- কোমল মুখশ্রীর দিকে তাকাতেই বুকের ভেতর ধক্ করে ওঠে । তিনি একটা শুকনো ঢোক গিলে এগিয়ে যান । বুকের ভেতরটা কেমন শুন্য শুন্য অনুভব হয় অলকার, মেয়েকে নিয়ে অজানা ভয় গ্রাস করে তাকে ।
অলকা হাতে একটু হলুদ নিয়ে ছুঁইয়ে দেয় মেয়ের গালে । মায়ের পরশ পেয়ে চোখ তুলে তাকায় শ্যামা । চোখে পানি টলটল করছে শ্যামার । টুপ করে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে । অলকা নিজেকে সামলাতে পারেনা আর , শাড়ির আঁচলে মুখ চেপে দৌড়ে চলে আসেন সেখান থেকে । মা চলে যেতেই শ্যামার গলা দিয়ে ক্ষীণ স্বরে বেরিয়ে আসে " আম্মা ,,যেয়ো না আম্মা " । তবে কোলাহলে সেই কথা মিলিয়ে যায় ।
একে একে সবাই হলুদ মাখায় শ্যামাকে । হলুদের পর গোসল করিয়ে লাল-হলুদ রঙের মিশ্রণের একটা শাড়ি পড়ানো হয় শ্যামাকে । শ্যামার ভেজা চুল গুলো গামছা দিয়ে এখনো বেঁধে রাখা । উঠানের মধ্যে ছোট বাচ্চারা কালি দিয়ে মাখামাখি করছে । গ্রামের মহিলারা একে অপরকে হলুদ মাখিয়ে ভুত বানিয়ে দিয়েছে । বারান্দায় চেয়ারে বসে এসব দেখছে শ্যামা । অলকা একগ্লাস শরবত নিয়ে আসে মেয়ের জন্য ।
শরবতের গ্লাসটা শ্যামার হাতে দেওয়ার আগেই দেওড়ির কাছ থেকে একটা পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসে । অলকা ভ্রু কুঁচকে তাকায় সেদিকে । উঠানের সব বাচ্চা এবং মহিলারা আওয়াজ পেয়ে একপাশে সরে দাড়ায় । দু-একজন ফিসফিস করে বলে ওঠে --- জাফর ব্যাপারি এইহানে ক্যান আইছে ..?
জাফর ব্যাপারিকে গ্রামের মাতব্বর বলা চলে । বয়স ৬০ পেরিয়েছে ,, চুল দাড়িতে পাক ধরেছে । তবুও তেজ কমেনি । পুরো গ্রামে তিনি তার দম্ভ খাটান । তিন-তিনটে বিয়ে করার পরেও খান্ত হননি তিনি । শ্যামার উপর আগে থেকেই তার কুদৃষ্টি ছিল । গ্রামের এক মুরুব্বিকে দিয়ে শ্যামার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে ছিলেন একবার । কিন্তু অলকা কঠোর ভাবে না করে দিয়েছিল প্রস্তাবে ,,,অলকা'র জন্য এগোতে পারেননি তিনি ।
অলকা শ্যামার পাশে বারান্দায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন । জাফর ব্যাপারির আসায় কোন প্রতিক্রিয়া দেখান না তিনি ।
জাফর ব্যাপারির সাগরেদ মোখলেছকে ডাকতে ডাকতে ব্যাপারি সহ বাড়ির ভেতর প্রবেশ করেন । জাফর ব্যাপারি পান চেবাতে চেবাতে এগিয়ে যান বারান্দার দিকে । কেউ একজন একটা চেয়ার এনে দেয় বসার জন্য । জাফর ব্যাপারি শ্যামা কে লোলুপ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে করতে পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ে চেয়ারে,, মাথার উপর ছায়া থাকা সত্ত্বেও তার সাগরেদ মাথার উপর একটা ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছে । ব্যাপারির দৃষ্টি অনুসরণ করে অলকা শ্যামা কে আড়াল করে সামনে দাঁড়ান ।
এতে ব্যাপারি একটু বিরক্ত হয় বটে । প্যাঁচ করে পানের পিক ফেলেন অলকা'র পায়ের কাছে । অলকা একবার তাকায় পায়ের দিকে, আবারো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় ব্যাপারির দিকে । অলকা'র দৃষ্টি দেখে ব্যাপারি নিঃশব্দে গা দুলিয়ে হাসেন । তিনি ভ্যাঙ্গানো গলায় বলেন...
" অবশেষে মাইয়ার বিয়া দিতাছেন ,, বাহ্ ... খুব খুশি হইলাম আমি । তাইতো মাইয়ারে আশির্বাদ করতে আইলাম ।
অলকা গম্ভীর হয়ে জোরপূর্বক বলেন...
" ধন্যবাদ ভাই সাহেব । আপনি আইছেন আমরা খুশি হইছি । শ্যামা তো আপনার মাইয়ার মতোই আপনার আশির্বাদ তো ওর কাছে পিতার আশির্বাদ স্বরূপ ।
অলকা'র তীক্ষ্ণ খোঁচা দেওয়া কথায় জাফর ব্যাপারির গাঁ রি রি করে জ্বলে ওঠে । দাঁতে দাঁত পিষে, হাত মুঠো করে নেন তিনি । পেছনে কাউকে ইশারা করতেই,, একজন একটা প্যাকেট নিয়ে এগিয়ে যায় শ্যামার দিকে । শ্যামা গুটিয়ে যায় মায়ের পেছনে । অলকা মেয়েকে আড়াল করে সামনে এগোয় । হাতে প্যাকেট থাকা লোকটি দাঁড়িয়ে যায়,, তারপর ব্যপারির ইশারা পেতেই হাতের প্যাকেটটা এগিয়ে দেয় অলকা'র দিকে ।
★
বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে । কিছুক্ষণের মধ্যে বরপক্ষ চলে আসবে । বাড়িতে কাছের সব আত্নীয় স্বজন এবং গ্রামের মানুষদের ভীর জমেছে । শ্যামা কে সাজানোর আগে রূপা নিজের হাতে বোনকে ভাত মেখে খাইয়ে দিচ্ছে । শ্যামার চোখ ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে । কাল অনেক রাত পর্যন্ত শ্যামা , রুপা , ফুলি ,অলকা এবং বাকিরা মিলে গল্প করে কাটিয়েছে । অলকা অনেক বার শ্যামা কে ঘুমাতে বলেছিলেন কিন্তু শ্যামা কথা শোনেনি ,,অলকা ও আর বেশি জোর করে নি । সবাই ঘুমিয়ে গেলেও শ্যামার ঘুম আসছিল না । অবশেষে রাতের শেষ ভাগে একটু ঘুমিয়ে ছিল শ্যামা । আবার ফজরের সময় উঠতে হয়েছে । ঠিকঠাক ঘুম হয়নি । চোখের পাতা আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসছে ঘুমের তাড়নায় । রুপা শ্যামাকে খাইয়ে দিয়ে ,, চোখ মুখে একটু পানি ছিটিয়ে দেয় শ্যামার । এতে শ্যামার ঘুমের রেশ একটু কেটে যায় । এবার শ্যামা কে সাজানোর পালা । বরপক্ষ আসতে বেশি সময় নেই আর । রুপা আর ফুলি মিলে শ্যামা কে লাল টকটকে বেনারসী পড়িয়ে দেয় । মাঝবরাবর সিঁথি করে মাথায় একটা খোঁপা বেঁধে দেয় । খোঁপায় বেঁধে দেয় গাঁদা ফুলের মালা । চোখে গাড় কাজল, কপালে টিপ, ঠোঁটে হালকা ঠোঁট রঞ্জন , পায়ে আলতা সাথে হালকা পাতলা গয়না গাটি । লাল বেনারসীর সাথে মাথায় লাল ওরনা । খুব বেশি ভারী সাজগোজ নয় ,, তবে এই প্রথম এতো সাজগোজ করলো শ্যামা । শ্যামা কে সাজানোর পর রুপা আর ফুলি হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে শ্যামার দিকে । রুপা শ্যামার কনিষ্ঠা আঙ্গুলে একটা কামড় দিয়ে নজর কাটিয়ে দেয় । শ্যামার গালে আলতো হাত রেখে বলে...
" আরে বাহ্,, আমার বোনটারে তো একদম রাজরাণির মতো লাগতাছে । তোকে খুব সুন্দর লাগতাছে শ্যামা । আমি এক্ষুনি আম্মারে ডাইকা আনতাছি দাঁড়া ।
বলেই রুপা ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় । এদিকে ফুলি এখনো হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে শ্যামার দিকে । শ্যামা তাকায় ফুলির দিকে,, মিষ্টি হাসে শ্যামা । ফুলি এগিয়ে এসে শ্যামার হাত ধরে । কাজলের টিকা লাগিয়ে দেয় শ্যামা কে । হঠাৎ হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে ফুলি । শ্যামা চমকে যায় ফুলির কান্ডে । কাঁদতে কাঁদতে ফুলি বলে...
" আমারে ছাইড়া চইলা যাইবি শ্যামা ..? তুই তো জানোস তুই আর আম্মা ছাড়া আমার আর কেউ নাই,, কেউ দাম দেয় না আমাগোরে । তোকে ছাড়া আমি কেমনে থাকমু রে ? আমার বকর বকর গুলা সারাদিন কেডায় শুনবো ? কেডায় আমার মাথায় যত্ন করে তেল দিয়া দিবো ? কেডায় আমার লগে গল্প করবো ? বল না শ্যামা ... তোকে আমার খুব মনে পড়বো রে ।
ফুলির কান্নায় শ্যামা বিচলিত হয়ে পড়ে । দুই হাতে আগলে নেয় ফুলির মুখশ্রী । শ্যামার চোখ দিয়ে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে ফুলির মুখের উপর । ফুলি চকিতে তাকায় সেদিকে । শ্যামাকে কাঁদতে দেখে ফুলি হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে নেয় । গলা ভারি হয়ে আসে ওর । ফুলি বলে...
" খবরদার কান্দবি না শ্যামা । এক্ষুনি তোর আম্মা আইয়া পড়বো, তোরে কান্দতে দেখলে উনি কষ্ট পাইবো কিন্তু । আমার চোখে তো খুশিতে পানি চইলা আইছিলো । কিন্তু তুই একদম কান্দবি না ।
শ্যামা ফুঁপিয়ে ওঠে । এমন সময় ঘরের দরজায় কারোর পায়ের শব্দ শুনে দুজনেই সচকিত হয়ে ফিরে তাকায় সেদিকে । রুপা অলকা'র হাত ধরে টানতে টানতে ঘরের ভেতর নিয়ে আসছে । অলকা পেছন থেকে সাবধানি স্বরে বলছেন..
" আস্তে হাঁট রুপা ,,এই অবস্থায় তোর এমন দৌড়া দৌড়ি করা একদম ঠিক না আম্মা,, আস্তে হাঁট ।
রুপা মাকে শ্যামার সামনে এনে দাড় করান । মাকে দেখে শ্যামা চোখের কোনে জমে থাকা পানি টুকু মুছে নেয়,,ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে সে । শ্যামা কে দেখে অলকা চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে থাকেন । ধীরে ধীরে এগিয়ে যান শ্যামার কাছে ,, আলতো চুমু খান মেয়ের কপালে ।
" আমার শ্যামা সুন্দরীরে তো পুরাই পরীরা মতো লাগতাছে রুপা । কারোর যেন নজর না লাগে ।
ময়না ঘরে এসে শ্যামা কে দেখে কোন রকমে বলে...
" তোমারে তো ভালোই লাগতাছে আপা ।
সবাই তাকায় ময়নার দিকে,,এই প্রথম শাড়ি পরেছে ময়না সাথে ভারী সাজগোজ । এমনিতেই ময়না সুন্দরী তার উপর এতো সাজগোজে আরো অনেক সুন্দর লাগছে ওকে । অলকা গম্ভীর গলায় বলেন...
" তুই এতো সাজগোজ করছোস কেন ? তুই জানিস না এইসব আমার পছন্দ নয় ?
" ক্যান আম্মা ,, আপা ও তো সাজগোজ করছে, তুমি আপারে রে তো কিছু কইলা না ।
" ওর আইজ বিয়া ,,তাই ও সাজছে ।
ময়না ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় । শ্যামা চোখ সরিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে...
" আমারে সত্যি ভালো লাগতাছে আম্মা ?
" নিজেরে দেখিস নাই এহনো ?
শ্যামা দুই দিকে মাথা নাড়ায় । অলকা মুচকি হেসে একটা আয়না ধরে মেয়ের সামনে । শ্যামা নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নেয় । ফুলি বলে..
" তুই আয়নায় দেখ নিজেকে,, আর বল তুই কতটা সুন্দর । তুই বল আমি সুন্দর কারন তুই সুন্দর ,, অনেক সুন্দর,,মনেও আর মুখেও । তোর মতো সুন্দর মাইয়া আমি অনেক কম দেখছি রে । তোর এই কোমল মুখশ্রী, নরম চাওনি, শান্ত পুকুরের মতো গভীর দুইটা চোখ,সব মিলিয়ে তুই অনেক সুন্দর শ্যামা ।
শ্যামার চোখ ছলছল করে ওঠে । টুপ করে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। এতো দিনের সব অপমান মনে পড়ে যায় ওর । অলকা শ্যামাকে শান্তনা দেয় না । শেষবারের মতো কাঁদতে দেয় তিনি শ্যামা কে । অলকা'র চোখও চিকচিক করে ওঠে । মেয়ের সামনে কাঁদতে চায় না অলকা । কিন্তু চোখের পানিও বাধা মানতে চায় না । খুব কষ্ট হয় অলকার,, বুকের উপর যেন কেউ পাথর চাপিয়ে দিয়েছে ।
বাইরে থেকে শোরগোল শোনা যায় । " বর আইছে ,বর আইছে " -- অনেকের সম্মিলিত কন্ঠ ভেসে আসে একসাথে । অলকা চোখের পানি মুছে নিয়ে বর বরণ করতে চলে যায় । ফুলি শ্যামার বাহুতে হালকা ধাক্কা দেয় ,, রুপা যাতে শুনতে না পায় তাই মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠে...
" আইছে রে তোর মানিক বদন ..আইজ মানিক বদন তোরে দেইখ্যা পুরাই পাগল হইয়া যাইবো ।
বলেই ফিক করে হেসে দিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ফুলি ,,, ফুলি বেরিয়ে যেতেই রুপা নীরবে শ্যামার পাশে এসে বসে । শ্যামার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নেয় ।
" তুই এই বিয়েতে খুশি তো শ্যামা ?
শ্যামা হাসে,,নরম কন্ঠে জবাব দেয়...
" আম্মার প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ততে আমি খুশি আছিলাম আপা । আম্মা আমার জন্য যেইটা করবো ঐটার থাইকা ভালো আমার জন্য আর কিছুই হইবো না ।
রুপা তৃপ্ত শ্বাস ফেলে হাসে ।
বাড়ির বাইরে থেকে কোলাহল ভেসে আসছে । বোঝাই যাচ্ছে অনেক মানুষের সমাগম ঘটেছে বাড়িতে । শ্যামার বুক অজানা ভয়ে ঢিপঢিপ করছে । ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে সে ।
অলকা এই প্রথম দেখলো মানিককে । প্রথম দেখাতেই চোখ আটকে যায় অলকার । ছবির থেকে বাস্তবে অনেক বেশি সুদর্শন মানিক । আশেপাশের সবাই এসে ভিড় জমিয়েছে বরকে দেখার জন্য । আড়ালে আবডালে অনেকেই অনেক কথা বলাবলি করছে । অলকা কোন কিছুকে পাত্তা না দিয়ে মিষ্টি খাইয়ে জামাইকে বরন করে নেন । রঙিন কাপড়ে ঘেরা একটা জায়গায় চৌকির উপর মানিককে বসানো হয় । প্রথম থেকেই মানিকের থমথমে মুখশ্রী নজরে আসে অলকার । তিনি পাত্রপক্ষের সবার বসার জায়গা করে দেন । শুরু হয় তাদের আপ্যায়ন । পাত্র পক্ষ আসার পর থেকে মোখলেছের দেখা মিলছে না । কাকরি বুড়ি তো সেই দুপুরে ঘরের ভেতর ঢুকেছেন,,আর বের হননি । অলকাও ওনাকে বের করার চেষ্টা করেননি । কিছুক্ষণ পর মোখলেছের দেখা মেলে । পাত্রের মামার সাথে এককোণে কিছু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে মোখলেছ । অলকা এগিয়ে যান সেদিকে ,,অলকাকে দেখে পাত্রের মামা এবং মোখলেছ দু'জনেই তাদের কথা থামিয়ে দেন । অলকা পাত্রের মামার সাথে কুশল বিনিময় করেন । তবে তার আচরণ এবং কথাবার্তা অলকার কাছে কেমন যেন লাগলো । মনে হলো পাত্রের মামা কোনো কিছু নিয়ে অসন্তুষ্ট । অলকা তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন ...
" কি হয়েছে ভাই সাহেব ? আমাদের আয়োজন কি আপনাগো পছন্দ হয় নাই ?
অলকা'র প্রশ্নের কোন উত্তর করেন না পাত্রের মামা । তিনি একবার মোখলেছের দিকে তাকিয়ে সেখান থেকে হাত গুটিয়ে চলে আসেন । অলকা মোখলেছকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলে তিনিও রাগি দৃষ্টিতে অলকার দিকে একবার তাকিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন ।
বিয়ে বাড়ির হইহুল্লোড়ে কেটে গেল কিছুক্ষণ । বরপক্ষের প্রায় সবারই খাওয়া দাওয়া শেষ । এবার বিয়ে পড়ানোর পালা । কাজি , মওলানা সবাই হাজির বিয়ে পড়ানোর জন্য । পাত্র তখন থেকে সেই এক ভঙ্গিতে বসে আছে । কাজি বিয়ে শুরু করতে চাইলে, পাত্রের মামা বারবার বারন করছেন তাকে । অলকা'র মন কেমন কু গাইছে । অস্থির হয়ে যাচ্ছেন অলকা । বারবার মোখলেছের সাথে পাত্রের মামা কোনো কিছু নিয়ে তর্ক করছেন সবার আড়ালে । এবার মোখলেছ ,কাকড়ি বুড়ি আর পাত্রের মামাকে গেটের বাইরে যেতে দেখে পাত্রের কাকা বিয়ে শুরু করার হুকুম দেন । কাজি সাহেব বিয়ের জন্য সমস্ত কিছু তৈরি করে ফেলেন । এবার শুধু পাত্র-পাত্রির সম্মতি নেওয়ার পালা । প্রথমে শ্যামার সম্মতি নেওয়ার জন্য কাজি সাহেব এবং মওলানা সহ বাকিরা উঠে দাঁড়ায় । শ্যামা ঘরে খাটের মাঝবরাবর গুটি শুটি হয়ে বসে আছে । অলকা আশেপাশে চোখ বুলিয়ে মোখলেছকে খুঁজতে থাকে,, কিন্তু তাকে না পেয়ে নিজেই সবাইকে নিয়ে এগোয় ঘরের দিকে ।
সবাই বারান্দায় পা ফেলতেই একটা হুংকার শুনতে পায়...
" থামো সবাই ,,এই বিয়া হইবো না......
#চলবে…........ |
0 Comments