গল্প:শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:০২)

 

 


  

লেখিকা:সুরভী আক্তার 
 
পর্ব:০২





- "ফুলি".. তুই ..? আমি তো ভয় পাইয়া গেছিলাম । এমনে কইরা হঠাৎ কেউ ধাক্কা দেয়..?

ভয় মিশ্রিত কন্ঠে ফুলিকে কথা গুলো বলে শ্যামা ‌। শ্যামার চোখে আতঙ্কের রেশ । শ্যামার একমাত্র প্রিয় বান্ধবী ফুলি,, গায়ের রং শ্যামার মতোই । তবে ফুলি মোটেই শ্যামার মতো শান্ত আর ভিতু স্বভাবের মেয়ে নয়,, বরং সে বাস্তববাদী স্বভাবের, সাথে বড্ড চঞ্চল ,, যেখানে শ্যামা সারাদিন ঘর আর নদীর ঘাট ছাড়া কোথাও বের হয় না,, সেখানে ফুলি সারাদিন টোইটোই করে পুরো গ্রাম লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ঘুরে বেড়ায় । 

শ্যামার কথায় ফুলি শ্যামার পাশে বসতে বসতে বলে..

- তুই এতো ভয় পাস ক্যান হ্যাঁ ? আর কি এমন ভাবনায় ডুইবা আছিলি,যে আমার আসার শব্দ শুনতে পাইলি না । তুই তো কইস আমি নাকি ধপাস ধপাস কইরা হাঁটি ।

- "হ আমি তো ঠিকই কই । তোর‌ ধুপধাপ হাটোনের আওয়াজ শুইনা আমার মনে হয় কোই যেনো ভূমীকম্প হইতাছে ‌। "ঠোঁট টিপে হাসি আটকে বলে শ্যামা,,,

শ্যামার আহ্লাদি করা কথা শুনে ফুলি স্বস্থি পায় ,, সচরাচর শ্যামার মুখে হাসি লক্ষ্য করা যায় না ‌। ফুলি শ্যামার মুখটা আলগোছে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলে...

- "কি ব্যাপার শ্যামা..? আইজ-কাইল তোর নাকটা একটু বেশি ঘামতাছে ,, তুই জানোস যার নাক ঘামে তারে নাকি তার স্বামী খুব বেশি আদর করে,,আমাগো জামাই বাবু মনে হয় তোরে একটু বেশি মনে করতাছে। "

 বলতে বলতে ফুলি মুখ চেপে খিক খিক করে হাসতে শুরু করে দেয় । 
ফুলির কথায় শ্যামাও হেসে ফেলল,, তবে সেই হাসি ছিল শান্ত, কোনো অনুভূতি ছিল না হাসিতে । গুমরে গুমরে ফুল ফোটা হাসি।
শ্যামা কথা ঘুরিয়ে নিরস স্বরে বলে...

- জানোস ফুলি ,, মাঝে মাঝে নদীর পানির দিকে তাকাইয়া থাকলে মনে হয়, আমি যদি ঐ নদীর পানি হইতে পারতাম তাইলে ঢেউয়ে ঢেউয়ে কোই থাইকা কোই চইলা যাইতাম,, আমারে কেউ আটকাইতে পারতো না আর । 

শ্যামার কথা শেষ হতেই পিছন থেকে অলকানন্দা জবাব দেয়...

- তোরে এখন কেডায় আটকায়..? তোর জীবনের ঢেউয়ে আমি তো বাঁধ দেই নাই,, আর না তোরে খাঁচায় বন্দী কইরা রাখছি । 

-" আমার জীবনে বাঁধ দেওয়ার মতো মাইনষের অভাব নাই আম্মা । উদাস জবাব শ্যামার ,,

- ভাঙ্গতে পারবি না সেই বাঁধ ..?

- " পারমু ? পারতে হইবো না আমারে । শুধু তুমি সাথে থাইকো আম্মা । তাইলেই হইবো । 

★★★

এদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ফুলি চলে যায় । শ্যামা নামাজ শেষে আঙ্গিনার দড়িতে রাখা শুকনো কাপড় গুলো ভাজ করছে । অলকানন্দা গেছেন বাড়ির পেছনে 'কচু' কাটতে,, আজকে কচু শাক রান্না হবে । এমন সময় দেওড়ি থেকে 'আম্মা,আম্মা' বলে একটানা কারোর চিৎকার ভেসে আসে । শ্যামা হাতে রাখা কাপড় গুলো আবারো দড়িতে রেখে দৌড়ে যায় দেওড়ির কাছে । শ্যামার মুখ দিয়ে হাঁসফাঁস করে বেরিয়ে আসে--'ময়না' ,,হালকা গোলাপি রঙের স্যালোয়ার-কামিজ পরা ,, ঠোঁটে উৎফুল্ল হাসি ,,সেই চিরচেনা মুখ । শ্যামা একটানে বুকে জড়িয়ে ধরে বোনকে । 

- কেমন আছিস ময়না..? আর আপায় কেমন আছে ..? 

- উফ্,,আপা ছাড়ো তো । আপার কি হইবো,,হেয় ভালো আছে । তুমি এই ব্যাগ গুলো লইয়া যাও ,, ঘরে গিয়া রাখো ।  

বিরক্তি মাখা কন্ঠে কথা গুলো বলে শ্যামার হাতে ভারি ভারি দুটো কাপড়ের ব্যাগ ধরিয়ে দেয় ময়না । ময়নার কথায় শ্যামার হাসি হাসি মুখটা চুপসে যায় । চুপচাপ কাপড়ের ব্যাগ গুলো ঘরে গিয়ে রাখে। 
ময়নার কন্ঠ শুনে কাকরি বুড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন । 

- আমার ময়না পাখি আইছোস নি ..? কয়দিন হইলো তোরে দেহি না ,,আয় দেহি আমার কাছে আয় । 

ময়না বিরক্তিতে কপাল কিঞ্চিত জড়ো করে এগিয়ে যায় ..

- কি হইছে বুড়ি..? তাড়াতাড়ি কও । 

- " তোরে কতবার কইছি না বুড়ি কইবি না,,হেয় দাদি হয় তোর । "

মায়ের কথায় শুকনো ঢোক গেলে ময়না । ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে পেছনে অলকানন্দা দাঁড়িয়ে আছেন ,, হাতে বঁটি নিয়ে । মায়ের হাতে বঁটি দেখে চোখ গোল গোল হয়ে যায় ময়নার,, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে...

- আ..আমি আর বুড়ি কমু না আম্মা । 

বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবটা দেখে শ্যামা । কচু কেটে এসে সোজা ময়নার কাছে এসেছিলেন অলকানন্দা,, হাতের বঁটি টাও রাখেন নি । আর মায়ের হাতে এই বঁটি দেখে ময়না ভয়ে কাঁপছে । ময়নার ভীতু চেহারা দেখে শ্যামা ফিক করে হেসে উঠলো,, শ্যামার হাসি দেখে অলকানন্দা ও ঠোট ভেঙ্গে হাসেন । মাকে সবচেয়ে বেশি ভয় ময়না,, সেটা কারোর অজানা নয়। আজ ১৬ দিন পর বড় আপা রুপার শশুর বাড়ি থেকে বাড়ি ফিরলো ময়না,,রুপা ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর পেয়ে ওর বাড়িতে গেছিলো সে । অলকা মেয়ের অবস্থা বুঝতে পেরে হাতে থাকা বঁটিটা পাশে রাখেন । হাসি আটকে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করেন..

- রুপায় কেমন আছে ..? মাইয়াডা ঠিকঠাক মতো খাইতে পারে তো ?

ময়না স্বস্তি নিয়ে বলে ..

 " আপায় তো খালি বমি করে আম্মা । "

ময়নার কথায় তপ্ত শ্বাস ফেলেন অলকানন্দা । এই সময় তো এমনটা হওয়ারই কথা । ময়নার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলেন...

- অনেক হইছে মেহমানদারি,, এবার গিয়া ঠিকমতো পড়াশোনায় মনোযোগ দে ,,, কয়েক মাস পর যে তোর মেট্রিক পরীক্ষা সেটা কি ভুইলা গেছোস ..? 

ময়না ক্ষিপ্ত হয়ে মিনমিনে গলায় বলে.... 

" এই পড়াশোনা করতে আমার একদম ভালো লাগে না " 

- কি কইলি ..? 

অলকার কন্ঠে রাগ ...
মায়ের রাগি কন্ঠ শুনে ময়না দুই কদম পিছিয়ে যেতেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়,, তবে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে দৌড়ে ঘরে চলে যায় সে ।


সেইদিন সৈয়দ ঘটকের আসার পর চারদিন কেটে গেছে । আজ মোখলেছ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে । মোখলেছ আসার পর অলকা তার কাছে তাড়াতাড়ি আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন.....

- সাত গ্রাম মিলা আড়ং ( মেলা ) শুরু হইতাছে আইজ থাইকা ,,, পুরা দুই মাস ধইরা থাকবো এই মেলা । আমাগো জমিদার 'লতিফ জোয়ার্দার' নিজে এই মেলার উদ্বোধন করতাছে। ঐ খানেই যাওন লাগবো,,এই লাইগা তাড়াতাড়ি আইলাম । 

একটু শ্বাস নিয়ে আবারো বলেন..

- তুমি ময়নারে তৈরি হইতে কও,,, ওরে লইয়া যামু । 

স্বামীর কথায় অলকা কিছু বলেন না ,, দুই দিকে মাথা নেড়ে চলে যায় সেখান থেকে । 
একটু পর মোখলেছও ময়নাকে নিয়ে বেরিয়ে যায় মেলার উদ্দেশ্যে । শ্যামা বারান্দার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে বাবা আর বোনের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে । 
সন্ধ্যায় মোখলেছ ময়নাকে নিয়ে বাড়িতে ফেরে,, সাথে ময়নার জন্য অনেক ধরনের সাজগোজের জিনিস নিয়ে আসে । খাটের উপর সব কিছু ঢেলে ময়না এক এক করে সবকিছু দেখছিলো,, নতুন লিপস্টিক,ক্রিম ,কাজল, টিপের পাতা থেকে সবকিছুই ইতিমধ্যে মুখে লাগিয়ে ফেলেছে ময়না । পাশে বসে শ্যামা ওর এসব সাজগোজ মনযোগ দিয়ে দেখে । 
এসব সাজগোজের জিনিস পাওয়ার আশা কোন দিনই‌ করে না শ্যামা । চোখে কাজল ব্যতীত অন্য কোন কিছুর উপর আগ্রহ নেই তার। তবে আজ বোনের এতো সব জিনিস দেখে শ্যামার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো,, মেলা থেকে ময়নাকে কতো কিছু কিনে দিয়েছে আব্বা । অথচ শ্যামা..? ওর জন্য কি কিছু আনতে পারত না তিনি ..? 
শ্যামার চোখের কোনায় পানি চিকচিক করে ওঠে । তবে আজ শ্যামা কাঁদে না ,, এতো ছোট বিষয় নিয়ে কেউ কাঁদে নাকি..? 
'আম্মা' বলে..... 
মাইয়া মাইনষের নাকি সহজে কাঁনতে নাই । কিন্তু শ্যামা যে ওর কষ্ট গুলা প্রকাশ করতে পারে না ,, মনের কষ্ট গুলো চোখের পানি হয়ে ঝরে পড়ে । 

চোখের পানির সাথে আড়ি করে ঘুমিয়ে যায় শ্যামা । 

★★

মাঝখানে কেটে গেছে আরো ৭ টা দিন । আজ আবারো সৈয়দ ঘটকের আগমন ঘটেছে বাড়িতে । তবে তিনি আজ একা আসেন নি । সাথে নিয়ে এসেছেন আরো দুইজন কে । অলকা সৈয়দ ঘটক কে দেখে বিরক্ত হলেও সেই বিরক্তি প্রকাশ করেন না । দুপুরে খাবার খেতে আসার পর কাকরি বুড়ি মোখলেছকে আর আড়তে যেতে দেন নি ,, মা-ছেলে মিলে অনেক আলাপ-আলোচনা করেছে,, সৈয়দ ঘটকের আসার বিষয়ে তারা অবগত । এই সবকিছুই চলেছে অলকা'র অজান্তে, কিন্তু অলকা'র চোখ ফাঁকি দিতে পারে নি কাকরি বুড়ির চালাকি । 

সৈয়দ ঘটকের সাথে যে দুজন এসেছে তারা নাকি পাত্রের কাকা আর মামা । দেখে বেশ সম্ভ্রান্ত আর রুচিশীল মনে হচ্ছে তাদের । কাকরি বুড়ি আর মোখলেছ তাদের সাথে বেশ খাতির করে কথা বলছে । মোখলেছ পাশ কাটিয়ে এসে অলকা'কে ক্ষীণ স্বরে বলেন...

- মাইয়াডারে নিয়া আওনের ব্যবস্থা করো ,, ওনারা আইজ ওরে দেইখা যাইবো । 

অলকা একবার তাকায় মোখলেছের দিকে । চোখের দৃষ্টি শান্ত তবে শান্ত দৃষ্টিতেই যেন নীরব প্রতিরোধ । 
শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ পর্যন্ত বড় ঘোমটা টেনে নিয়ে পাত্র পক্ষের দিকে এগিয়ে যায় অলকা । অলকা কে দেখে সৈয়দ ঘটক পান চেবাতে চেবাতে অস্পষ্ট স্বরে বলেন...

" বউমা,, তাড়াতাড়ি শ্যামারে লইয়া আহো ... হেরা আর কতক্ষন বইসা থাকবো " 

" আপনারা সবকিছু জাইনা শুইনা আইছেন তো ..? 

অলকার শক্ত প্রশ্নে পাত্রের কাকা ভদ্রভাবে হেসে বলেন...

" আপনি চিন্তা কইরেন না আপা ,, আমরা সব জাইনা শুইনাই আইছি । আপনি শ্যামারে লইয়া আহেন । 

অলকা কিছু বলেন না,, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে নেন সবাইকে । ঘোমটা ঠিক করে ধীরে ধীরে চলে যায় শ্যামার ঘরে । ঘরে ঢুকেই শ্যামার মুখশ্রী দেখে অলকা বুঝে যান যে শ্যামার কিছু জানতে বাকি নেই । মেয়েটার মুখ নিঃশব্দ কান্নায় ফিকে হয়ে গেছে, চোখে পানি টলটল করছে । পাশেই থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছে ফুলি । অলকা মেয়ের পাশে বসে গলা নামিয়ে বলেন...

" কানতাছোস ক্যান..? ভয় পাস না,, আমি তোর লগে আছি । ভাগ্য আমার হাতে নাই কিন্তু সিদ্ধান্ত আমার হাতে আছে ,, তোর জীবনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সিদ্ধান্তটাই আমি নিমু । 

ওদিকে কাকরি বুড়ি অধৈর্য হয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে না .. বিরক্তি মাখা কন্ঠে তিনি বলেন…

" কি হে অলকা ,, এতো দেরি করতাছোস ক্যান? লোকে কি ভাববো ? মাইয়াডারে একটু সাজাইয়া লইয়া আয় । 

অলকা মেয়ের মাথায় ওড়না তুলে দিতে দিতে বলেন...

" ও সাজবো না আম্মা ,, এমনেই যাইবো ।

বুড়ি নাক শিটকে বেরিয়ে যেতে নিলে অলকা ফুলিকে বলেন...

" ফুলি তুইও শ্যামার লগে চল ।

" হেয় যাইবো মানে ,,, বিয়ার কইন্যার লগে অবিআইত্তা জোয়ান মাইয়া যাইবো ? হেগোর যদি ওরে পছন্দ হয় , তখন কি হইবো ? 

বুড়ির খ্যাক খ্যাক করে বলা কথায় ফুলি মুখ বাঁকিয়ে উত্তর দেয়...

" কি যে কও খুঁড়ি,, শ্যামার লগে আমার তুলনা দেও ..। আমাগো গায়ের রং এক হইতে পারে কিন্তু এই গায়ের রংয়ের মধ্যে শ্যামা লাখে একটা । ওর দিকে একবার চোখ গেলে আমার দিকে তাকাইবার সময় পাইবো না । 

" আদিখ্যেতা.... - মুখ ভেংচিয়ে বলে বুড়ি

লাল-সাদা স্যালোয়ার কামিজে পাত্র পক্ষের সামনে এসে দাঁড়ায় শ্যামা । 
হাত পা ক্রমাগত কাঁপছে। শ্যামার কম্পিত হাত শক্ত করে ধরে ফুলি, চোখের ইশারায় শান্তনা দেয় শ্যামাকে । লজ্জা ও ভয়ে মাথা নুইয়ে আছে শ্যামা, চেহারায় কোন সাজগোজ প্রসাধনি নেই । 



চলবে.....

 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×