গল্প : শ্যামা সুন্দরী (পর্ব :১৩)

 


লেখিকা:সুরভী আক্তার

পর্ব ১৩




বলতে বলতে শ্যামার গলা বিবস হয়ে আসে । নিজের কাছেই নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে । ওর কথায় আতিয়া বেগম আর শবনম একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলেন । সংগ্রাম পেছনে গোটানো হাত দুটো ছেড়ে দেয় । শান্ত চোখে তাকায় শ্যামার দিকে । 
আতিয়া বেগম গলা নামিয়ে বললেন....

" ছিঃ ছিঃ ছিঃ..
ক্ষমা কর নাত বৌ... তোর খাওয়ার মাথায় আসে নাই আমগো । ভাবছিলাম এক লগে খামু । তুই যে কাইল থাইকা কিছু খাইস নাই , জানতাম না বুবু । 
তুই আগে কইবি না, যে তোর ভুক লাগছে । ছিঃ.. কি কান্ড ক দেখি...

শ্যামা পেট চেপে মাথা নুইয়ে রেখেছে । শবনম বলে ওঠে....

" ইশশশ...
আমিও কিভাবে ভুলে গেলাম বলো তো তোমার খাওয়ার কথা ? খুব ক্ষুধা পেয়েছে বোন ? 
তুমি বসো আমি এক্ষুনি খাবার নিয়ে আসছি তোমার জন্য । এই যাবো আর এই আসবো....

বলেই তড়িঘড়ি করে খাট থেকে নেমে দ্রুত পায়ে ঘর ত্যাগ করলো শবনম ।‌ আতিয়া বেগম সংগ্রাম কে উদ্দেশ্য করে বলেন....

" দাদু ভাই ,, 
তুই নাত বৌ এর লগে একটু বস দেহি । একলা ছাড়িস না ওরে । আমি আইতাছি । 

কথাটা বলে আতিয়া বেগম ও বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে । শ্যামা আরো গুটিসুটি হয়ে বসলো । মুড়িয়ে নিলো নিজেকে । সংগ্রাম চেয়ে রইল খানিক ক্ষণ । তারপর বসলো খাটের উপর । শান্ত কন্ঠে শুধালো....

" ক্ষিদে পেয়েছে আগে বলো নি কেনো ? ভাবি কে বলতে পারতে অন্তত । ঠিক মতো খাও না তুমি , না কি তোমার বাড়িতে কেউ খেতে দিতো না তোমায় ? না খেয়ে খেয়ে কি অবস্থা করেছো নিজের শরীরের , একটা ফুঁ দিলেই তো উড়ে যাবে ।‌

শ্যামা কিছু বললো না । কথা আসছে না গলা দিয়ে । শরীর টনটন করছে দুর্বলতায় । 
সংগ্রাম চেয়ে থাকলো শ্যামার শুকনো ভীত মুখশ্রীর পানে । কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শবনম আসলো খাবার নিয়ে । একটা বড় ট্রে তে করে, প্লেটে ভাত, আর কয়েকটা বাটিতে তরকারি সহ নিয়ে এসেছে । 
এসেই তাড়াহুড়ো করে বললো....

" ভাই...
শ্যামা কে খাইয়ে দাও তো....
সৈকত কাঁদছে, সকাল থেকে কাছে পায় নি আমায় । আমি একটু ওর কাছে যাই । 

বলেই হাতের ট্রে খাটের উপর রেখে তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল শবনম । 
শ্যামা চোরা চোখে তাকালো সংগ্রামের দিকে । ঢোক গিললো শুকনো । ক্ষীয় কাল বাদ সংগ্রাম খাবারের প্লেট হাতে তুলে নিলো । হাত ধুয়ে নিলো পানিতে । 

শ্যামা কাঁপা কাঁপা হাত এগিয়ে দিয়ে বলল...

" আ..আমারে দেন...
আমি একা খাইতে পারমু...! 

সংগ্রাম ভ্রু কুঁচকালো । তাকালো শ্যামার কাঁপা কাঁপা হাতের দিকে । গুরুত্ব দিলো না ওর কথায় । ভাত মেখে শ্যামার মুখের সম্মুখে ধরে বললো....

" হাঁ করো....

মুখ ফিরিয়ে নিলো শ্যামা । অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে পুরো শরীরে । চোখ তুলে তাকাতে পারছে না । সংগ্রাম শ্যামার মুখের সামনে ভাতের লোকমা ধরেই বললো....

" স্বামীর হাতে খাওয়া সুন্নত,, মেয়ে....
সবার ভাগ্যে কিন্তু এমন স্বামী জোটে না, যে তাকে এতো এত যত্ন সহকারে ভালোবেসে খাইয়ে দেবে । তুমি কিন্তু ভাগ্যবতী আছো বলতে হবে....
নিজে থেকে তোমার স্বামী খাইয়ে দিচ্ছে তোমায় । আর কি চাই তোমার..? 

শ্যামার মুখে কথা ফুটলো এবার...
তাচ্ছিল্য হেসে ও ক্ষীন স্বরে বললো...

" ভাগ্যের কথা আমারে কইয়েন না ছোট জমিদার সাহেব..! ভয় পাই আমি আমার ভাগ্য'রে । 

সংগ্রাম কথা ঘোরালো....

" আমি খাইয়ে দিলে কি খুব বেশি অসুবিধা হবে ? খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি....

শ্যামা কথা বাড়ালো না । অস্বস্তি নিয়েই মুখে নিল ভাতের লোকমা । দু-একবার খেয়ে এক গ্লাস পানি ঢক ঢক করে খেয়ে নিল । এতেই পেট ভরে গেছে । অতিরিক্ত ক্ষুধার পেটে অল্পতেই তৃপ্তি মিটেছে ।
দুদিকে মাথা নেড়ে বললো....

" আর খামু না....

সংগ্রাম তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল....

" এই টুকুতেই পেট ভরে গেল ‌? কি খাও তুমি ? ক্ষিদে পেয়েছিল তো ভীষণ ? এমন পাখির আদারের মত খাবার খেলে শরীর তো দূর্বল হবেই ? 

কথা শেষ করেই প্লেটের বাকি খাবার টুকু নিজেই খেতে শুরু করলো সে । শ্যামা আশ্চর্য স্বরে বলল....

" এইগুলা আপনি খাইতাছেন ক্যান..? 

" ক্ষিদে পেয়েছে, তাই খাচ্ছি ...!

দায়সারা জবাব সংগ্রামের । সে আপন মনে খাওয়ায় ব্যাস্ত । শ্যামা মিনমিন স্বরে বলল....

" এইগুলা তো আমার এঁটো খাবার...

" তো কি হয়েছে...? 
স্বামী-স্ত্রী একই প্লেটে খাওয়া সুন্নত...!

বার বার সংগ্রামের মুখে 'স্বামী-স্ত্রী' সম্বোধন টা গায়ে কাঁটা ফেলছে শ্যামার । 
সংগ্রাম সব খাবার টুকু শেষ করে হাত ধুয়ে আবারো শ্যামার পাশে বসলো । 
এবার একটু কাছাকাছি বসলো । পুরুষালি কড়া আতরের ঝাঁজালো গন্ধে চোখ বন্ধ করে নিলো শ্যামা । শ্বাস টেনে অনুভব করলো তীব্র গন্ধ টাকে । 
সংগ্রাম কাছাকাছি বসায় দুরে সরে আসলো সে । সংগ্রাম শান্ত কন্ঠে বললো....

" তোমাকে তখন একা রেখে যাওয়াটা উচিত হয়নি আমার । একটা জরুরী কাজে গিয়েছিলাম । 
আম্মার কথায় কিছু মনে করো না । আমি ওনার একমাত্র ছেলে, অনেক স্বপ্ন ছিল আমার বিয়ে নিয়ে, কাল হঠাৎ আমাদের বিয়ে টা হয়েছে তো, তাই ওনার মানতে অসুবিধা হচ্ছে । 
ওনাকে একটু সময় দাও, ধীরে ধীরে ঠিক মেনে নেবেন উনি ।

" কাউরে কিচ্ছু মানতে হইবো না, এই সম্পর্কে থাকমু না আমি । আ.. আপনি আমারে আমার আম্মার কাছে দিয়া আহেন । আমি বাড়ি যামু ।‌ 

শ্যামার জোরালো কন্ঠে বলা কথায় সংগ্রামের কপালে ভাঁজ পড়ে । সে গলা একটু ভারী করে বলে....

" থাকবে না মানে..? এই খানে থাকবে না তো কোথায় যাবে তুমি ? এখন থেকে এটাই তোমার বাড়ি, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে তোমায়, এটাই তোমার শেষ ঠিকানা, আমৃত্যু পর্যন্ত এখানেই বাস করতে হবে তোমায় । ঐ বাড়িতে কেউ আপন নেই তোমার....

" নাহ...
কইলাম তো আমি এইহানে থাকমু না...
বাড়ি যামু আমি...আম্মা ছাড়া কেউ আপন নাই আমার । আমি আম্মার কাছে যামু...

শ্যামার খানিক তেজি স্বরে সংগ্রাম বিরক্তি প্রকাশ করে.....

" দেখো মেয়ে...
রাগিও না আমায়..! কোথাও যাবে না তুমি ! 

" আপনি কে আমারে বাঁধা দেওয়ায় ? জোর খাটাইবেন না আমার উপর..! 

সংগ্রাম শ্যামার দু বাহু টেনে নিজের অনেকটা কাছাকাছি নিয়ে আসে । চোখে পানি টলটল করছে শ্যামার । হিসহিসিয়ে ওঠে সংগ্রাম....

" আমি কে সেটা আমাকে জানাতে এসো না মেয়ে । তুমি জেনে রাখো, স্বামী হোই আমি তোমার । তোমার উপর জোর খাটানোর অধিকার আমার আছে । বাধ্য করো না আমাকে জোর খাটাতে । 
আর মাঝে মাঝে কি হয় বলতো তোমার..? হঠাৎ হঠাৎ এমন ফোঁস করে ওঠো কেনো ? এমনিতে তো সবসময় ভয় পাও ? মাঝে মাঝে কি সব ভয় ডর ভুলে যাও নাকি..? 

শ্যামার চোখের কর্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়েলো । সংগ্রাম সেদিকে খেয়াল করে নরম চোখে তাকিয়ে হাতের বাঁধন আলগা করে । শ্যামা সংগ্রামের চোখে চোখ রেখে ভেজা অসহায় কন্ঠে বলে....

" কোনো জোর খাটানো সম্পর্কে থাকতে চাই না আমি । দয়া দেখাইছিলেন না আমারে.. ? দয়া কইরা বিয়া করছিলেন তো ? ছাইড়া দেন আমারে..আপনার কোন সহানুভূতির দরকার নাই আমার । 
এই ধরা বাঁধা সম্পর্কে থাকতে হইবো না আপনারে । 

সংগ্রাম সহসা ছেড়ে দিল শ্যামার বাহু । পিছিয়ে গেল শ্যামা । চোখ ফিরিয়ে নিলো সংগ্রামের চোখ থেকে । খানিক চেয়ে থেকে সংগ্রাম বলে উঠলো.....

" তাকাও আমার দিকে...

শ্যামা তাকালো । আবারো দুজনের চোখ স্থির হলো একে অপরের দিকে । সংগ্রাম বলল...

" শোনো মেয়ে.....আমার কাছে এই বিয়েটা ধরা বাঁধা নয় । আর না তোমাকে সহানুভূতি দেখিয়ে এই বিয়েটা করেছি আমি । এই সম্পর্কের যথার্থ সম্মান আমি করি । তোমাকে স্ত্রী হিসেবে মানি আমি । 
সম্পুর্ন স্ব-জ্ঞানে সবাইকে সাক্ষী রেখে কালিমা পড়ে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি আমি । তুমি অঙ্গাত থাকলেও আমি ছিলাম না । জেনে রাখো-- ইহ'জনমে এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি পাবে না তুমি ! আর না পর'জনমে । আমার সাথেই থাকতে হবে তোমায় ‌। ছাড়া পাবে না আমার হাত থেকে । 

বলেই খাট থেকে নেমে গটগট পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে ‌ । আর তাকালো না কোন দিকে । শ্যামা কে কিছু বলার সুযোগ ও দিলো না । শ্যামার চোখ থেকে অনাড়গল পানি গড়িয়ে পড়ছে । 
দু-হাঁটুর মাঝে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে ওঠে সে । 
সময় গড়াচ্ছে । বিকেল হয়ে গেছে । ঘর থেকে আর বের হয় নি শ্যামা । দুপুরে গোসল সেরে নামাজ পড়ে নিয়েছে । এরমধ্যে আতিয়া বেগম আর শবনম অনেকটা সময় দিয়েছে ওকে । আসরের নামাজ শেষে শ্যামা একটু হাঁটাহাঁটি করে পুরো ঘরে । কোন জিনিস স্পর্শ না করে পুরো ঘর ভালো মতো দেখে নেয় । ঘরে অনেক দামি দামি জিনিস পত্র । সবগুলোতেই রুচিশীল রাজকীয়তা প্রকাশ পাচ্ছে । যা কখনো চোখের দেখাও দেখে নি শ্যামা । একপাশে একটা টেবিল ভর্তি অনেক ধরনের বই । 
ঘরের দেয়াল জুড়ে সংগ্রামের অনেক অনেক ছবি টাঙানো আছে । রঙিন রং তুলিতে আঁকা ছবি আছে অনেক । জমিদারি হাবভাব প্রকাশ পাচ্ছে সব চিত্রতেই । প্রত্যেক টা ছবিতেই গায়ে সাদা, কালো শাল জড়ানো । একদিকের দেয়ালে একটা ধনুক ঝুলছে । 
একটু পায়চারি করতে করতে শ্যামা বারান্দার দিকে পা বাড়ায় । বারান্দায় যেতেই একটা দমকা হাওয়া ছুঁয়ে দেয় শ্যামা কে । ঠান্ডায় কেঁপে ওঠে ও । গায়ে ভারী কাপড় নেই । শুধু শাড়ি,,গায়ের সমস্ত গয়নাও খুলে রেখেছে । আছে শুধু দুহাতে দুটো চিকন চিকন চুড়ি । শ্যামা শাড়ির আঁচল জড়িয়ে বারান্দার কিনার ঘেঁষে দাঁড়ায় । আশেপাশে অনেক গাছ-গাছালি । নিচের দিকে চোখ যায় শ্যামার । নিচে বাগান । বাগানের পাশে বৈঠক বসেছে । জমিদারি বৈঠক ‌। অনেক লোকের উপস্থিতি সেখানে । কোন কিছু নিয়ে বিচার বসেছে হয়তো । সবার সামনে একটা সিংহাসনের মতো চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে টানটান গম্ভীর হয়ে বসে আছেন লতিফ জোয়ার্দার । সংগ্রাম পাশেই পিছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । 
সেই যে বেরিয়ে গেল, আর তখন থেকে ঘরে আসে নি সে । এই লোকটার বিষয়ে কোনো ধারণা নেই শ্যামার ‌ । কেমন এই লোকটা ? কি চায় উনি ? কি আছে এই লোকটার মনে ? কেনোই বা আটকাচ্ছে শ্যামা কে ? শ্যামার মতো সাধারণ মেয়েকে বিয়ে করলো কেনো ? ওকে বিয়ে করার তো কারন বা জোর ছিল না ওনার কাছে ?
এতো সুদর্শন পুরুষ হয়েও কেন নিজের জীবন কে জড়ালো শ্যামার সাধারণ উচ্ছিষ্ট জীবনের সাথে ? কেনো ? শ্যামার উপর দয়া দেখিয়ে ? জমিদারের ছেলে বলে , নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য দয়া করলো শ্যামা কে ? প্রশ্ন জাগে শ্যামার মনে -- আবার উত্তর খুঁজে দেয় নিজের মন- উনি যে বললেন দয়া দেখায় নি ! 
তাহলে শ্যামা কে বিয়ে করার কারণ কি ? কোন দিক থেকেই তো শ্যামা ওনার যোগ্য নয় ? শ্যামার থেকে দ্বিগুণ উজ্জ্বল ওনার গায়ের রং ! চেহারা তে আভিজাত্যের অন্যতম একটা ছাপ । সৌন্দর্যে তুলনা হীন ! এমন সুদর্শন , দাম্ভিক পুরুষ জীবনে দুটো দেখে নি শ্যামা ! প্রথম যেদিন জঙ্গলে দেখেছিল - চোখ আটকে গেছিলো শ্যামার ! 
প্রথম বার কোন পুরুষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তার । প্রথম বার হবে না তো কি ? শ্যামা তো কোন পুরুষের সম্মুখীন হয় নি কখনো । 
শ্যামা উপর থেকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে সংগ্রামের দিকে । 
এই লোকটাকে দেখে তার হাবভাব বোঝা মুশকিল । 

" শ্যামা...

সুপরিচিত কন্ঠে শ্যামা চকিতে তাকায় পিছনে । চোখ চিকচিক করে ওঠে ওর । জোরে শ্বাস টেনে হাঁসফাঁস করে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে ফুলি কে । কেঁদে ওঠে আচমকা । শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত কন্ঠে বলে.....

" ফুলি...
তুই আইছোস ফুলি ? আমার আম্মা কোই ফুলি ? আম্মা..? আমি আম্মার কাছে যামু ফুলি..! তুই আমারে আমার আম্মার কাছে নিয়া চল... আমি থাকমু না এইহানে....

ফুলি শ্যামা কে ছাড়ায় নিজের থেকে । ওর চোখেও পানি চিকচিক করছে । ভেজা কন্ঠে বলে.....

" কাকি আহে নাই শ্যামা..! 
জানানো হয় নাই এহনো কাকি রে ! 
তুই ক দেহি... কেমন আছোস তুই...? 

শ্যামা ফুঁপিয়ে উত্তর দেয়.....

" আ..আমি ভালো আছি...! 
কিন্তু তুই.. তুই এইহানে আইলি ক্যামনে ..? 

" আহাদ ভাই এর‌ লগে..! 
সকাল সকাল আইতে চাইছিলাম, কিন্তু একলা আইতে পারি নাই । সাহস কুলায় নাই আওনের । ছোট জমিদার একটু আগে আহাদ ভাই'রে পাঠাইছিলো আমারে আনার লাইগা । তাই আইলাম....

শ্যামা খানিক বিস্মিত হয় । ফুলিকে নিয়ে বসে খাটে । ফুলি এদিক ওদিক আশ্চর্য নয়নে চেয়ে বলে.....

" এইটা তোর ঘর শ্যামা..? আরে বাপরে.. কি বড় ঘর ! কত জিনিস পত্র ঘরে । 
জানোস... জমিদার বাড়ি বাইরে থাইকা দেখছি সবসময়, ভিতরে আহি নাই কখনো, আওনের একটা ইচ্ছা আছিলো সবসময়, আইজ প্রথম বার আইলাম, তাও তোর কল্যাণে । 
কি সুন্দর বাড়ি.. আওনের সময় দেখলাম । কতো বড় অন্দরমহল...! কতগুলা ঘর... 

শ্যামা বললো না কিছু । শুয়ে পড়ল খাটে । মাথা রাখলো ফুলির কোলে । চোখ বুজে অসহায় কন্ঠে আবদার করলো....

" আমার মাথায় একটু হাত বুলাইয়া দিবি ফুলি..? যন্ত্রণা হইতেছে খুব..! 

ফুলি স্মিথ হাসলো । হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল....

" ছোট জমিদার অনেক ভালো,, তাই না শ্যামা ? 

শ্যামা উত্তর করলো না । সহসা চোখ দুটো খুললো । ফুলি আবারো শুধালো....

" এই বাড়ির সবাই কেমন শ্যামা ? মাইনা নিছে তোরে ? 

শ্যামা চুপ থেকে উত্তর করলো...

" সবাই অনেক ভালো..! 

ফুলি মুচকি হাসলো । 

" তুই এবার অনেক সুখি হইবি শ্যামা.. দেখিস, অনেক সুখি হইবি তুই । 

শ্যামার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো । জড়ানো কন্ঠে বলল....

" আমার জীবনটা এমন ক্যান হইলো ফুলি ? ক্যান আমারে এতো অবহেলা করলো সবাই ? কেউ কোন দিন ভালোবাসলো না ক্যান আমারে ? আমি কি এতটাই খারাপ,এতটা অবহেলা করলো ক্যান সবাই আমারে ? আমার ভাগ্য টা এমন ক্যান..? 
আল্লাহ আমারে এমন নসিব দিয়া দুনিয়াতে পাঠাইয়ো ক্যান, কইতে পারিস ? আমার খুব কষ্ট হয় ফুলি.. কাঁদলেও কষ্ট হয় । কান্না আসে সবসময় । 
আমার জীবনটা আর সবার মতো হইলো না ক্যান ? ওরা আমার কোন দিন আপন হইলো না... ভালোবাসলো না কোনো দিন আমারে...

বাইরে দাঁড়িয়ে সবটা শুনলো সংগ্রাম । ভেতরে আসতে চেয়েছিল, আসলো না । বাইরে থেকে আবারো বড় বড় পা ফেলে চলে গেল নিচে । 
শ্যামার সাথে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় কাটালো ফুলি । সন্ধ্যায় সংগ্রাম আসলো ঘরে । আহাদ অন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে । পরপুরুষের ভেতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ । ফুলি কে নিয়ে সে চলে যাবে এখন । 
ফুলিকে কাছ ছাড়া করতে চাইছে না শ্যামা । বাচ্চাদের মতো ফুলির জামার অংশ খামচে ধরে আটকে রেখেছে । সংগ্রামের সামনে বলতেও পারছে না কিছু । শুধু তাকিয়ে আছে নিরিহ চোখে । ফুলি সবটা বুঝে নিচু স্বরে বলে....

" আমি আবার আসমু শ্যামা....
আইজ যাই..? তুই তো জানিস আম্মার শরীর ভালো না ! ফের আইমু আমি....

শ্যামা ঠোঁট উল্টে ছেড়ে দিল ফুলি কে । ফুলিও কথা না বাড়িয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসার জন্য পা বাড়াল । একটু থেমে পিছন ফিরে চেয়ে দেখলো শ্যামা কে । সংগ্রাম স্থির নিরেট ভাবে দাড়িয়ে আছে । ফুলি মাথা নুইয়ে গলা খাদে নামিয়ে বলল....

" শ্যামা কে দেইখা রাইখেন ছোট জমিদার..। ওয় কোনো দিন কারোর যত্ন ভালোবাসা পায় নাই, ওরে একটু যত্ন কইরা আগলে রাইখেন সবসময় । অনেক কষ্ট করছে ও জীবনে, আর কষ্ট পাইতে দিয়েন না । 

বলেই এক মুহুর্ত ব্যায় না করে বেরিয়ে গেল ফুলি । নিচে আহাদ দাঁড়িয়ে আছে । শ্যামা চঞ্চল পায়ে গিয়ে দাঁড়ালো বারান্দায়, উপর থেকে নিচটা সম্পূর্ণ বোঝা যায় ।‌ জমিদার বাড়ির বিশাল অলংকৃত গেট পেরিয়ে জিপে করে আহাদের সাথে চলে গেল ফুলি । সন্ধ্যার আবছা আলোয় অদুর পর্যন্ত ওদের যাওয়ার পানে চেয়ে থাকলো শ্যামা । ঠান্ডা লাগছে,, শিরশির বাতাসে আরো বেশি ঠান্ডা অনূভুত হচ্ছে । শ্যামার কাছে কোনো ভারী কাপড় নেই । পড়নে শুধু একটা শাড়ি , সেটাই গায়ের মধ্যে জড়িয়ে রেখেছে ও । সংগ্রাম ঘরে আছে, এটা ভেবে ঘরের দিকে আর পা বাড়ালো না শ্যামা । ঠান্ডায় দাঁত চেপে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল বারান্দায় । ঝিঁঝিঁ পোকারা এক নাগাড়ে ডেকে যাচ্ছে । এই বারান্দা থেকে জমিদার বাড়ির মেইন দরজা আর বাগান ছাড়া ওদিকের আর তেমন কিছুই দেখা যায় না । 
শ্যামা অন্ধকারেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছে । মশা ভনভন করছে আশেপাশে । আড়ষ্টতায় ঘরে যাওয়ার সাহস কুলোচ্ছে না শ্যামার ।‌ শাড়ির আঁচল ভালোভাবে জড়িয়ে বারান্দার কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে । অন্ধকারে কোন এক দিকে স্থির দৃষ্টি বজায় রেখেছে । 
হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একটা উষ্ণ শাল জড়িয়ে দিলো শ্যামার গায়ে । অকস্মাৎ পিছন ফিরলো শ্যামা । সংগ্রাম শাল জড়িয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । সংগ্রাম কে দেখে চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে নিলো শ্যামা । গায়ের শাল'টা সিল্কে পড়ে যেতে নিলে, সেটাকে দুহাতে ধরে আটকালো । ভালোভাবে জড়িয়ে নিল গায়ে । শাল থেকে মন মাতানো পুরুষালি সেই কড়া আতরের ঘ্রাণ ভেসে আসছে । শ্যামা চোখ বন্ধ করে নিলো আতরের ঘ্রাণে । অদ্ভুত অনুভূতি জাগলো শ্যামার কোমল হৃদয়ের কোণে । 

" ঠান্ডা লাগছে না মেয়ে...? এখানে এভাবে ঠান্ডায়, মশার রাজ্যে দাঁড়িয়ে আছো কেনো ? 

সহসা চোখ খুললো শ্যামা । সামনে তাকাতেই চোখাচোখি হলো সংগ্রামের সাথে । সংগ্রাম বরাবরই তীক্ষ্ণ চোখা । সরু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সবসময় । শ্যামা গলা ভেজালো ঢোক গিলে । শ্যামার উত্তর না পেয়ে সংগ্রাম আরো সরু চোখে চাইলো । স্বাভাবিক কন্ঠে বলল...

" মশার থেকে আমি উত্তম আছি । 
ঘরে এসো...! 
কেউ একজন অপেক্ষা করছে তোমার জন্য ..! 

শ্যামা প্রশ্ন সূচক নয়নে তাকালো এবার । সংগ্রাম বাঁকা হেসে সোজাসুজি শ্যামার হাত ধরলো । টেনে নিয়ে আসলো ঘরে । শ্যামা ও বাঁধা হীন পায়ে এগিয়ে আসলো পিছু পিছু । ঘরে কেউ নেই । ওরা দুজন ব্যতীত কোন মানুষের অস্তিত্ব নেই । দরজা চাপানো । শ্যামা ভ্রু কুঁচকে তাকালো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম ভ্রু উঁচিয়ে চোখ দিয়ে কিছু একটা ইশারা করলো । ইশারা অনুযায়ী শ্যামা তাকালো সেদিকে । নরম গদির উপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে সাদা একটা খরগোশ । শ্যামা অবিশ্বাস্য চোখে চাইলো খরগোশটার দিকে । মুহুর্তেই সংগ্রামের হাত থেকে নিজের হাতে ছাড়িয়ে দৌড়ে গিয়ে কোলে জড়িয়ে নিলো ওকে । মুখে ফুটলো উচ্ছাসিত হাসি । দুহাতে খরগোশটাকে আঁকড়ে বুকে জড়ালো । চুমু খেলো কয়েক দফা । 
এদিকে সংগ্রাম বিমোহিত চোখে চেয়ে আছে শ্যামার দিকে । চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছে যেন । এই প্রথম শ্যামার মুখে হাসি দেখলো সে । পাতলা গোলাপী অধরের রিনঝিনে হাসি মুগ্ধ করলো সংগ্রাম কে । 
শ্যামা প্রফুল্ল কন্ঠে সংগ্রাম কে শুধালো....

" এরে কোই পাইলেন আপনি ? 

" ফুলি নিয়ে এসেছে আসার সময় , এতক্ষণ আমার কাছেই ছিল ! 

" আগে দিলেন না ক্যান আমারে ? 

শ্যামার কন্ঠে খানিক অভিমানী সুর বাজলো । সংগ্রাম এগোতে এগোতে বলল....

" আগে এমনি দেই নি । আটকে রেখেছিলাম নিজের কাছে । এখন আর আটকে রাখতে পারলাম না, তাই নিয়ে আসলাম তোমার কাছে । কাঁদছিল তোমার কাছে আসার জন্য । 

সংগ্রামের রসিক স্বরে ফিক করে একটু হাসলো শ্যামা । হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো গলু'র গায়ে । সংগ্রাম এগিয়ে গিয়ে বসলো একপাশে । স্নিগ্ধ কোমল স্বরে বলল....

" আরে বাহ্,, হাসতেও পারো তুমি ? জানতাম না তো । কিন্তু তোমার ঠোঁটে হাসি টা কিন্তু বেশ ভালোই শোভা পায় মেয়ে..! তোমার হাসি চোখেও ফুটে ওঠে । তোমার চোখে কান্না আর ভয় মানায় না, মানায় হাসি । হাসলে কিন্তু ভালোই লাগে তোমায় ।

সহসা চুপসে গেল শ্যামা । হাসি টুকু নিমিষেই গায়েব হয়ে গেল । সংগ্রাম মুচকি হাসলো এবার । হাত বাড়িয়ে গলু'র গায়ে হাত রাখলো । মেকি স্বরে বলল....

" কি রে,, মাকে পেয়ে শান্ত হয়ে গেলি যে ? বাবার কাছে থাকতে ইচ্ছে করছিল না বুঝি ? 

শ্যামা কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল....

" মানে ? ওর মা-বাবা কেডায় ? 

" কেনো,, তুমি আর আমি !! ভুলে গেলে , আমার কারনেই ওকে পেয়েছিলে তুমি । আর ওর কারনে আমি তোমায় । 
তবে একটা খরগোশের মা হওয়ার থেকে মানুষের মা হওয়া কিন্তু বেশি সৌভাগ্যের । আমি কিন্তু বাবা হতে রাজি... 

শ্যামা হতভম্ব হয়ে চোখ গোল গোল করে চাইলো । শুকনো কাশি দিয়ে উঠলো তৎক্ষণাৎ । সংগ্রাম চোখ ফিরিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসছে । দরজায় টোকা পড়তেই কাশি বন্ধ হয়ে যায় শ্যামার । দু'জনেই চকিতে তাকায় দরজার দিকে । 
শবনম এসেছে খাবার নিয়ে । শ্যামা নিচে নামেনি আর । আতিয়া বেগম বারন করেছেন নিচে যেতে । সালেহার রাগ না কমা অবধি শ্যামা কে আগলে রাখার দায়িত্ব তাদের । নিচে গেলেই সালেহা আর লতিফা মিলে যেকোনো বিপত্তি বাঁধাবে । তাই শ্যামা কে নিচে যেতে দেওয়া হয় নি আর । আতিয়া বেগম ওর খাবার উপরে পাঠিয়ে দিয়েছেন । শবনমের সাথে পুঁচকে একটা বাচ্চাও এসেছে । ছোট ছোট দু'পায়ে থপথপ করে হাঁটতে হাঁটতে ঘরে ঢুকলো সে । ও সৈকত । শবনম আর জুনাইদ এর ছেলে । বয়স সবে মাত্র দেড় বছর । হাঁটা শিখেছে কেবল । সৈকত সংগ্রাম কে দেখে বাবা বাবা দৌড়ে গেল ওর কাছে । সংগ্রাম কোলে নিলো ওকে । দু'গালে চুমু খেলো শব্দ করে । 
শবনম খাবারের প্লেট রাখতে রাখতে রসিক স্বরে বলল...

" আরে ভাই...
তুমি তো দেখি একদিনেই বদলে গেলে ! বউকে কাছ ছাড়া করছো না দেখি ! বউকে ছাড়া থাকতে ইচ্ছে করছে না বুঝি ? 
এই সময় তো তোমার বাড়িতে থাকার কথা নয় ! আজ ঘুরতে যাবে না গ্রামে ? রোজ তো যাও...

সংগ্রাম গলা ঝেড়ে খানিক আমতা আমতা করতে করতে বলল....

" আজ না হয় নাই গেলাম । আর এমনিতেও আজ যেতে ইচ্ছে করছে না ভাবি !! 

বলেই সৈকত কে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো ও । শবনম মুচকি হাসলো ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে । তারপর বসলো শ্যামার পাশে । কোলে খরগোশ টাকে দেখে নিচু স্বরে শুধালো.....

" এটা তোমার পোষা..?

" হুম..! 

" খুব সুন্দর...
কিন্তু ভাই তো এসব প্রাণী পছন্দ করে না ! বিরক্ত হয় এসব দেখলে । 

শ্যামা চকিতে তাকালো । শবনম হেসে বলল....

" ভাইয়ের কি কি পছন্দ অপছন্দ ধীরে ধীরে জেনে যাবে তুমি । অনেক কিছুই পছন্দ করে না ভাই । অনেক অভ্যাস আছে ওর । বদ অভ্যাস ও আছে অনেক,, এই যেমন, প্রত্যেক রাতে জিপ নিয়ে টোই টোই করে ঘুরে বেড়ায় গ্রামে । কখন বাড়িতে ফেরে কে জানে । মাঝে মাঝে তো ফেরেই না । রাতের খাবার তো কখনোই খায় না সবার সাথে । 
আজ তুমি আছো, তাই আর গেলো না । নয়তো এই সময় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না জমিদার গন্ডিতে । 
তোমার স্বামীর পছন্দ অপছন্দ জানা প্রয়োজন তোমার । ভাইয়ের পছন্দ অপছন্দ সবকিছু সম্পর্কে ভালো মতো জানি না আমি । তবে বালা জানে । ও তোমায় সবটা বুঝিয়ে দেবে । 

শ্যামা ক্ষীন স্বরে শুধালো....

" বালা কে..? 

" ও তুমি জানো না ? 
বালা আসে নি তোমার সাথে দেখা করতে ? 

শ্যামা মাথা নাড়ালো দুদিকে । শবনম বললো....

" ওও...
আসলে সুরবালা আমার ননদ । ভাইয়ের বিষয়ে সবকিছু ওই ভালো জানে‌ । আগে সবসময় খেয়াল রাখতো ভাইয়ের । এখন তো তুমি এসে গেছো, এখন এটা তোমার দায়িত্ব । 
ও তোমায় বুঝিয়ে দেবে সবটা...
আসলে কাল রাত থেকে ও বলছিল মাথা যন্ত্রণা করছে ওর । আজও সারাদিন ঘর থেকে বের হয় নি । তাই হয়তো আসতে পারে নি । 

" আইচ্ছা...

শ্যামার ছোট্ট কথায় শবনম শ্যামার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিলো । মোলায়েম কন্ঠে বলল.....

" জমিদার বাড়ির একমাত্র বউ তুমি । জমিদার বাড়িতে দাদি জান ব্যতীত অন্য কেউ এইরকম আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে না । তিনি আগের মানুষ,তাই আঞ্চলিকতা ছাড়তে পারেন নি । 
শুধু জমিদার বাড়িতে নয় , এই জমিদারের পুরো গ্রামে কেউ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে না । তোমার মুখে আঞ্চলিকতা মানায় না । ভবিষ্যত জমিদার গিন্নি তুমি । এখন থেকে শুদ্ধ বাক্যে কথা বলবে,, শুদ্ধ ভাষা আয়ত্ত করবে । বুঝলে..?

শ্যামা ঘাড় কাত হয়ে সম্মতি দিলো....

" আইচ্ছা....

" উমমমম...!

" আ.. আচ্ছা...! 

মুচকি হাসলো শবনম । দরজার বাইরে পুরুষালি গলা খাঁকারির শব্দে চমকে উঠলো দুজনে । জুনাইদের গলা, বুঝতে বাকি রইলো না শবনমের । সে ইঙ্গিতে ডাকছে শবনম কে । শবনম শ্যামার দিকে চেয়ে বলল....

" একা থাকতে পারবে ঘরে..? ভয় করবে ? 

" পারমু....না মানে,, পারবো...! 

" তাহলে একটু বসো,, খেয়ে নাও আপাতত । ভাই আসবে একটু পর ।

শবনম ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই গলু'কে পাশে রেখে শ্যামা তড়িঘড়ি করে খেয়ে নিল । ওযু করে এসে নামাজ পড়ে নিল । সংগ্রাম আসে নি এখনো । শ্যামার বুক ঢিপঢিপ করছে । 
ও আসার আগেই ঘুমিয়ে যেতে চায় শ্যামা । খাটের সোজা বরাবর টেবিলের পাশে একটা বড় আরাম কেদারা আছে । শ্যামার শোয়ার জন্য একদম উপযুক্ত । খাটের উপর থেকে চাদরটা নিয়ে সেই আরাম কেদারায় গুটিয়ে শুয়ে পড়ে শ্যামা । পুরো শরীর ঢেকে নেয় চাদরে । শোয়ার জন্য অল্প জায়গা হলেই চলে ওর । শ্যামার ফিনফিনে পাতলা শরীর তলিয়ে যায় আরাম কেদারায় । অস্বস্তি নিয়েই চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় শ্যামা । এমনিতেই সন্ধ্যা হতেই ঘুমানোর অভ্যাস । তাতে আজ অনেকটা দেরি হয়ে গেছে । শোয়ার সাথে ঘুমে বিভোর হয়ে যায় শ্যামা । তলিয়ে যায় অতল ঘুমের সাগরে । মা থেকে পা অবধি ঢেকে রেখেছে কম্বলে । 
অনেকটা সময় পর সংগ্রাম ঘরে আসে । এতক্ষণ ছাদে ছিল । ঘরে এসে প্রথমেই চোখ যায় খাটের দিকে । খাটের উপর নেই শ্যামা । আশেপাশে তাকায়, কোথাও নেই । ভ্রু কুঁচকে আসে সংগ্রামের । 
আচমকা নজর যায় টেবিলের পাশের হাতল চেয়ারের দিকে । চাদর মুড়ি দিয়ে গুটিয়ে আছে শ্যামা । চাদরের ফাঁক গলিয়ে একটা হাত বাইরে বেরিয়ে এসেছে । 
শ্যামা কে এভাবে দেখে কুঁচকানো ভ্রু আরো বেশি নেত্রদ্বয়ের নিকট কুঁচকে আসে তার । গটগট পায়ে এগিয়ে যায় শ্যামার কাছে । সম্মুখ বরাবর হাঁটু মুড়ে বসে । হাত এগিয়ে মুখের কাছ থেকে সরিয়ে দেয় চাদর । 
অমনি ভ্রু যুগল শিথিল হয়ে আসে ওর । শ্যামার ঘুমে বিভোর শিশু সুলভ নিষ্পাপ শ্যামলা মুখশ্রীর পানে চেয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে আসে সংগ্রামের দৃষ্টি । শোয়ার ফলে খোঁপা খুলে লম্বা লম্বা চুল গুলো এলোমেলো হয়ে গেছে শ্যামার । মুখের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চুলগুলো । 
মুহুর্তের পর মুহূর্ত একই ভাবে অপ্রতিভ দৃষ্টিতে শ্যামার পানে চেয়ে থাকলো সংগ্রাম । তাকিয়ে থেকেই বসলো মেঝেতে । হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দিল মুখের উপর ছড়িয়ে থাকা চুল গুলো । শ্যামা নড়ে উঠলো একটু । ঘুমের ঘোরেই পাশ ফিরতে চাইলো । ছোট্ট কেদারায় জায়গার সংকুলানে ঠিকমতো নড়তেও পারছে না । ঘুমের মাঝেই চোখ মুখ কুঁচকালো সে । 
সংগ্রাম চেয়ে থেকেই মুচকি হাসলো । উঠে দাঁড়ালো এবার । আলতো হাতে একটানে শ্যামার পাতলা শরীরটাকে তুলে নিলো নিজের আয়ত্তে । 
নড়ে চড়ে উঠে সংগ্রামের গলা জড়িয়ে ধরলো শ্যামা । মাথা রাখলো প্রশস্ত বুকে । 
সংগ্রাম অতি যত্ন সহকারে শ্যামা কে খাটে শুইয়ে দিলো । চাদর টেনে দিলো গায়ে । 
ঠোঁট এগিয়ে আলতো ছুঁইয়ে দিলো শ্যামার কপাল । 
নিজে ঘুরে এসে শুয়ে পড়লো পাশে ।



সকালের আজান কানে আসতেই ঘুম ছুটে যায় শ্যামার । কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায় ‌। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে । চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে । হাত খোঁপা করে নেয় সেগুলো । হাঁটুতে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে থাকে আরো কিছুক্ষণ । 
নামাজের ধ্যান মাথায় আসতেই চোখ খোলে এক ঝটকায় । 
চোখ খুলতেই আরো বড় ঝটকা খায় । ও খাটে এলো কি করে ? কাল তো এখানে শোয় নি । শ্যামা নিজেকে দেখলো ভালো করে । 
পাশ ফিরলো এবার । সংগ্রাম উবু হয়ে শুয়ে আছে । গলা অবধি চাদর টানা । তব্দা খেলো শ্যামা । শুকনো গলায় ঢোক গিললো । 
ঘুমে বিভোর হয়ে আছে সংগ্রাম । ঘুমকাতুরে মুখটা মলিন দেখাচ্ছে । শ্যামা চোখ সরিয়ে হুট করে নেমে পড়লো খাট থেকে । 
এলোমেলো শাড়ি ঠিক করে ছুটে গেল গোসল খানার দিকে । ওযু করে এসে নামাজ পড়ে নিলো । সংগ্রাম হয়তো নামাজ পড়ে না । শ্যামা পড়তে দেখে নি । সংগ্রাম কে ডাকতে গিয়েও ডাকলো না সে । 



চলবে.............

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×