গল্প : শ্যামা সুন্দরী (পর্ব :১৪)


লেখিকা :সুরভী আক্তার

পর্ব :১৪

_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-




সংগ্রামের ঘুমন্ত মুখ পানে চেয়েই পুরো শরীরে শিহরণ খেলে গেল শ্যামার । ধড়ফড় করে উঠলো কোমল হৃদয় । শ্যামার তাকিয়ে থাকার মাঝেই সংগ্রামের ঘুম জড়ানো হাস্কি স্বর ভেসে আসলো....

" এভাবে আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে তাকিয়ে থেকো না মেয়ে,, নজর লেগে যাবে তো আমার !  

শ্যামা অকস্মাৎ চমকে উঠলো । চোখ বড় বড় করে চাইলো সংগ্রামের দিকে । এখনো চোখে দুটো বোজা ওর । নড়চড় নেই একটুও । চোখ বন্ধ অবস্থায় কি করে বুঝলো যে শ্যামা চেয়ে আছে তার দিকে ? শ্যামা মাথা হেলিয়ে আরো একটু ভালো করে দেখার চেষ্টা করলো । 
আকস্মিক উঠে বসলো সংগ্রাম । তড়িঘড়ি করে হকচকিয়ে পিছিয়ে এলো শ্যামা । একহাত বুকে রেখে শ্বাস টানলো জোরে । ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নিলো । ঘুম ঘুম চোখে পিটপিট করে সরু নেত্রে চেয়ে আছে সংগ্রাম । মাথার চুল গুলো এলোমেলো । পড়নে একটা সাদা ফতুয়া । 
শ্যামা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচু স্বরে বলল...

" আপনি ঘুমান নাই ..? 

স্বশব্দে নিরেট কন্ঠে জবাব দিলো সংগ্রাম....

" কেনো ? ঘুমিয়ে থাকলে তোমার সুবিধা হতো বুঝি ? তোমার আমাকে দেখার জন্য আমার ঘুমানো প্রয়োজন ?

শ্যামা দুহাত নেড়ে অস্থির কন্ঠে বলল...

" না না,, আমি আপনারে দেখতে যামু...
না মানে.. দেখতে যাবো কেনো ? আমি তো.. দেখছিলাম আপনি ঘুমাইছেন নাকি ? 

শ্যামার মুখে শুদ্ধ ভাষা শুনে কপাল কুঁচকায় সংগ্রাম । পরক্ষনেই শিথিল হয়, পড়াশোনা করেছে শ্যামা, শুদ্ধ ভাষা আয়ত্তে আনতে সময় লাগার কথা নয় ওর । 
সংগ্রাম গম্ভীর গলায় বলে...

" অযুহাত দিও না মেয়ে,, । স্বামী কে দেখতে হলে এমনিতেই দেখতে পারো , যদি বলো তাহলে সারাদিন বসে থাকবো তোমার সামনে । মন ভরে দেখে নিও । 

" আ.. আমি দেখি নাই আপনারে..! 
আমি খাটে আইলাম ক্যামনে ? 

" তুলে এনেছি..! যেভাবে আগের দিন এনেছিলাম ।

আশ্চর্য হলো শ্যামা । এই লোকটা কোন ভনিতা ছাড়াই সব কথার কেমন সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়ে দেয় । এই লোকটার মুখে এই ধরনের কথা কখনো কল্পনাও করতে পারে না শ্যামা । 
অস্বস্তিতে আনচান করছে শ্যামা । 
সংগ্রাম ধারালো তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে । শ্যামা কথা ঘোরালো.....

" না.. নামাজ পড়েন না আপনি ? 

" না...

" ক্যান ? 

" সবসময় পড়ি না, মাঝে মাঝে পড়ি ? 

" সবসময় পড়েন না ক্যান ? 

সংগ্রামের চাহনি আরো বেশি তীক্ষ্ণ হলো । দম খিচে আরো পিছনে পিছিয়ে এলো শ্যামা । সংগ্রাম ভারী গলায় শুধালো....

" নামাজ পড়লে কি হবে ? 

 কাঁপা গলায় উত্তর করলো শ্যামা....

" জান্নাতে যাবেন । 

" তুমি তো নামাজ পড়ো , তারমানে তুমি জান্নাতে যাবে ? 

শ্যামা চোখ খাড়া করলো এবার । একটু আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল...

" নামাজ পড়ি আমি ,, আমার নামাজে যদি কোন খাদ না থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই জান্নাতে যাবো ! 

" শুধু নামাজ পড়লেই জান্নাতে যাওয়া যায় ? 

" আল্লাহর বিধান মানতে হয়...

" তুমি মানো..? 

শ্যামার ভ্রু কুঁচকে আসলো এবার । সে প্রশ্ন করলো...

" মানে ? 

" মানে...
আমি তো জানি, আল্লাহর বিধানে স্ত্রী দায়িত্ব পালন করা , মানে স্বামীর সেবা করার কথাও লেখা আছে ! তুমি তো স্বামীর সেবা করো না..! স্ত্রী দায়িত্ব পালন করো না তুমি..! 

শ্যামা ভাব ভঙ্গি পাল্টে গেল সংগ্রামের কথা শুনে । ও হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম নিঃশব্দে হেসে গাঁ মুড়িয়ে বলল...

" তুমি বরং আজ থেকে স্ত্রী দায়িত্ব পালন করা শুরু করে দাও । জান্নাতে যাবে তুমি , আর আমাকে না হয় তোমার আঁচলে বেঁধে নিয়ে যেও । এটা মন্দ হয় না । কি বলো..?

শ্যামা জবাব দিলো না । ‌সংগ্রাম খাট থেকে নেমে পড়লো । চোখ কচলে গেলো গোসল খানার দিকে । শ্যামা ওর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে খাটে এসে হাঁটু জড়িয়ে গুটিসুটি হয়ে বসলো । এখনো ভোরের আলো ফোটেনি সম্পুর্ন । শীত পড়ছে বাইরে । কুয়াশায় ঢেকে আছে চারপাশ । কাল থেকে সংগ্রামের একটা শাল জড়ানো আছে শ্যামার গায়ে । 
ক্ষীয় কাল বাদ হাত মুখ ধুয়ে বের হলো সংগ্রাম । শ্যামা আড়চোখে তাকালো ওর দিকে । সংগ্রাম মাথায় টুপি পড়ে নিলো একটা । জায়নামাজ বেছালো মাটিতে । নামাজে দাঁড়ালো ও । শ্যামা এবার পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো । নামাজ পড়ছে সংগ্রাম । 
নামাজ শেষে আবারও জায়নামাজ গুটিয়ে রাখলো । মাথার টুপি খুলতে খুলতে আবারো এসে শুয়ে পড়লো । আধশোয়া হয়ে শ্যামার পানে তাকিয়ে বলল....

" কি বলো তো , জান্নাতের প্রথম চাবিটা গুছিয়ে রাখলাম । আর দ্বিতীয় টা তোমার হাতে । যদি আমার এইটুকু আমলে জান্নাতে যেতে না পারি তাহলে তুমি না হয় টেনেটুনে নিয়ে যেও আমায় । 
পরপারেও তো আমার সাথেই থাকতে হবে তোমায় । একসাথে জান্নাতে যেতে হবে দু'জনকে । তোমাকে ছাড়া জাহান্নামে থাকতে ইচ্ছে করবে না । তাই নামাজ শুরু করলাম, পর'জগতে যেন এর অছিলায় থাকতে পারি তোমার সাথে ।

আকাশ থেকে পড়লো শ্যামা । বিস্ময় আর অবিশ্বাস্য চোখ গোল গোল করে চাইলো । শ্যামার ডাগর ডাগর চোখের চাহনি দেখে সংগ্রাম বলল...

" এভাবে তাকিও না তো..! 

শ্যামা চোখ ফেরালো তৎক্ষণাৎ । ঘন পল্লব ঝাপটে বাঁকা চোখে তাকালো । হুট করে শ্যামার থেকে দুরত্ব ঘুচে ওর কোলে মাথা রাখলো সংগ্রাম । ভিমড়ি খেলো শ্যামা । হাত পা স্থির হয়ে জমাট বেঁধে গেল মুহুর্তেই । 
সংগ্রাম চোখ বুজে দীর্ঘ শ্বাস টেনে মোলায়েম কন্ঠে বলল....

" মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও তো , ঘুম পাচ্ছে ভীষণ । 

শ্যামা শ্বাস ভারী হয়ে আসছে । হাত পা স্থির তবে ভেতরে ভেতরে কম্পন অনুভব করছে শ্যামা । গলা শুকিয়ে আসছে , ঢোক গিলে গলা ভেজালো ও । কম্পিত ক্ষীন স্বরে বলল....

" সরুন ছোট জমিদার... 

সংগ্রাম চোখ বুজেই খানিক বাদ মাথা একটু দুলিয়ে বলল...

" উহুম....
যা বলছি তাই করো । আরাম লাগছে না আমার, ঘুম পাচ্ছে, মাথায় হাত বুলিয়ে দাও একটু । 

শ্যামা শ্বাস টানলো । কিছু সময় পর কাঁপা কাঁপা হাত রাখলো সংগ্রামের চুলের ভাঁজে । ধীরে ধীরে হাত চালালো চুলের মধ্যে । বিলি কেটে, হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো মাথায় । চোখ বন্ধ রেখেই মৃদু হাসলো সংগ্রাম । শীতল কন্ঠে বলল...

"শোনো মেয়ে,,আজ থেকে অভ্যাস করে নাও এটা, রোজ রোজ এভাবেই তোমার নরম নরম দুহাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হবে আমার । 
অভ্যাসের তালিকায় যোগ করে রাখো এটা ।

মাথায় হাত বোলানোর পর খানিক উষ্ণতা পেতেই ঘুমিয়ে যায় সংগ্রাম । শ্যামা আবারো ঘুমানোর সুযোগ নিলো সংগ্রামের । এক দৃষ্টিতে নিষ্পলক চেয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । সংগ্রামের কথা গুলো মনে আসতেই পল্লব ঝাপটে চোখ ফিরিয়ে নিলো । সংগ্রামের মাথায় হাত রেখেই নিজে পেছনের দিকে একটু হেলে মাথা এলিয়ে দিলো । চোখ দুটো বুজে এলো আপনা আপনি । 

ভোরের আলো ফুটেছে সম্পুর্ন । বারান্দা দিয়ে আলো পৌঁছেছে ঘরে । 
দরজায় কারো কড়া নাড়ার শব্দে তড়িঘড়ি করে চোখ মেলে শ্যামা । সে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানে না । একটু চোখ বুজে এসে ছিল, আর ঘুমিয়ে পড়েছে । 
শ্যামা চোখ কচলে সংগ্রামের দিকে তাকালো । না ডেকে ওর মাথাটা তুলে বালিশের উপর রাখলো । নিজে নেমে পড়লো খাট থেকে । পড়নের শাড়ি ঠিক করে আঁচল টেনে নিল মাথায় । এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল । দরজার ওপারে হাসি হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শবনম । শ্যামা কে দেখে আরো বেশি প্রসারিত হলো ওর হাসি । উৎফুল্ল কন্ঠে বলল...

" ঘুম হয়নি এখনো ? আর কতো ঘুমাবে ? 

শ্যামা আমতা আমতা করে বলল....

" ঐ , ফজরের পর কখন ঘুমাইয়া পড়ছিলাম খেয়ালই আছিল না । চোখ লাইগা আইছিল একটু । 

শবনম চোখ সরু করে তাকালো । শ্যামা তৎক্ষণাৎ দুদিকে মাথা নেড়ে বললো...

" না..আর বলবো না, এভাবে কথা । 

হেসে ফেললো শবনম । 

" এতো দিন এভাবেই কথা বলেছো । তাই অভ্যাস হয়ে গেছে, অভ্যাস পরিবর্তন হতে সময় লাগবে । ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে সবটা । 
এখন যাও দেখি, শাড়ি বদলে তৈরি হয়ে নাও । দাদি জান নিচে নিয়ে যেতে বলেছে তোমায় !

শ্যামা ঘাড় কাত করে সম্মতি দিলো । শবনম চলে যেতেই ও দরজা চাপিয়ে শাড়ি বদলে নিলো । সংগ্রাম ঘুমিয়ে আছে এখনো । শ্যামা ডাকলো এবার...

" শুনছেন, ছোট জমিদার সাহেব...! 
উঠুন ,, সকাল হয়ে গেছে । 

সংগ্রাম একটু নড়ে উঠে কাতর স্বরে বলল...

" হুম...? 

শ্যামা আর কিছু বলার আগেই আতিয়া বেগম দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন । সংগ্রাম কে এখনো শোয়া অবস্থায় দেখে উঁচু স্বরে বলতে লাগলেন...

" দাদুভাই,, কি রে ? তুই এহনো ঘুমাইতাছোস ? কি ব্যাপার ক দেহি ? রাইতে কি গরু চুরি করতে যাইস নাকি ? এতো বেলা অবধি তো তুই ঘুমাইস না কোন দিন ? 

সংগ্রাম পাশ ফিরলো । উঠলো না তবুও । আতিয়া বেগম শ্যামা কে দেখে বললেন....

" তুই আয় দেহি নাত বৌ, হেয় ঘুমাক । ঘুমের কামডা হইয়া গেছে একদম । আয় দেহি....

বলেই শ্যামার হাত ধরে ঘর ত্যাগ করলেন তিনি । আজ দ্বিতীয় বার ঘর থেকে বের হলো শ্যামা । অন্দরের বসার ঘরে পায়ের উপর পা তুলে চোখ মুখ শক্ত করে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন সালেহা বেগম । শ্যামা কে দেখে কটমট করে তাকালেন তিনি । রাগ ঠিকরে বেরোচ্ছে চোখ দিয়ে । 
শ্যামা আজ চোখ সরালো না তার দিক থেকে । সাহস জোগালো নিজেকে । 
আতিয়া বেগম সালেহার দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বললেন...

" বউ মা, আইজ আমার নাত বৌ পায়েস রান্না করবো । নতুন বউ আইছে থাইকা কোন রীতি পালন করা হয় নাই, আইজ হইবো । 
পায়েস রাইন্ধা হেয় খাওয়াইবো হঙ্গোলরে । 

সালেহা তেঁতে ওঠেন । যেন একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি । সেটা পেয়ে গেল বোধহয় ‌। দাঁত পিষে খিটখিটে স্বরে বলে ওঠেন...

" ঐ কলঙ্কিনী মেয়ে যদি আমার হেঁশেল ঘরে এক পা ও রাখে তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না বলে দিলাম । 
আমার সংসারের কোনো জিনিসে যদি ওর স্পর্শ লাগে, তাহলে সেই সব কিছুতে আগুন লাগিয়ে দেবো আমি । 

আতিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকালেন । তীক্ষ্ণ স্বরে জবাব দিলেন...

" এহনো বাঁইচা আছি আমি , মরি নাই । সংসার তোমার হওনের আগে আমার । আর তোমার পর আমার নাত বৌ এর । আমাগো হজ্ঞলের সমান অধিকার আছে এই সংসারে । 
আমি কইছি যখন আমার নাত বৌ রাইন্ধা খাওয়াইবো তখন তাই হইবো । 
চল নাত বৌ...

বলেই শ্যামার হাত ধরে হেঁশেল ঘরে ঢুকলেন তিনি । ফোঁস করে উঠলো সালেহা । 
হেঁশেলে আগে থেকেই পায়েস রান্নার সমস্ত ব্যবস্থা করা ছিল । শ্যামা দেখে নিল সবটা । নিশ্চল চোখে আতিয়া বেগমের দিকে তাকালো । শবনম আসলো খানিক বাদ । ওদের দাঁড়িয়ে থাকার মাঝেই শ্যামার পায়েস রান্না শেষ হলো । লতিফ জোয়ার্দার শাল পেঁচিয়ে সবে এসে বসেছেন তার জন্য দলিল করা চেয়ারে । জুনাইদ ও আছে তার সাথে । আতিয়া বেগমের সাথে শ্যামা হেঁশেল থেকে বেরিয়ে পায়েসের বাটি এগিয়ে দেয় তাদের দিকে । লতিফ জোয়ার্দার এক গাল হেসে পায়েসের বাটি হাতে নেন । উৎসুক স্বরে শ্যামা কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করেন....

" আরে আম্মা , তুমি পায়েস রান্না করছো ? বাহ্ বাহ্.. আমার মেয়ের হাতের প্রথম রান্না দেখি কেমন হয়েছে খেতে । 

বলতে বলতে এক চামচ মুখে তুললেন তিনি । স্বাদে মিষ্টতায় ভরপুর হয়ে উঠলো তার মুখ । তিনি উচ্ছাসিত কন্ঠে বললেন...

" আরে বাহ্...
একদম অমৃত হয়েছে আম্মা । তোমার রান্নার হাত তো খুব ভালো । 
তাই না জুনাইদ..? 

জুনাইদ খেতে খেতে মাথা নাড়ালো । এসেছে থেকে জুনাইদের মুখে একটা কথাও শোনেনি শ্যামা । শ্যামার দিকে চোখ তুলেও তাকায় নি কখনো । 
লতিফ জোয়ার্দারের প্রশংসায় লাজুক মাথা নুইয়ে নিলো শ্যামা । সালেহা এখন নেই বসার ঘরে । লতিফা কেও দেখা যাচ্ছে না কোথাও । এতো বড় জমিদার বাড়িতে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন । পুরো ফাঁকা ফাঁকা লাগে বাড়িটা । ঘর অনেক , তবে থাকার মানুষ নেই । পুরো জমিদার বাড়ি টা এখনো দেখেনি শ্যামা । উপর থেকে নিচে আসার সময় লক্ষ্য করেছে আশপাশ টা । বাইরের আলো বাতাস তো কখনোই অন্দরে প্রবেশ করে না । বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত থাকে সবসময় । 
আতিয়া বেগম ও পায়েস খেয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ । অনেক প্রশংসা করলেন তিনি । শবনম একটা ট্রে তে দুটো পায়েসের বাটি আর এক কাপ চা এনে শ্যামার হাতে দিলো । বলল...

'' এগুলো ঘরে নিয়ে যাও । ভাই উঠে পড়েছে হয়তো । সকাল সকাল চা না হলে চলে না ভাইয়ের । তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও । আর এখানে থাকতে হবে না তোমায় । ঘরে গিয়ে তুমিও খেয়ে নিও । 

শ্যামা গলা নামিয়ে প্রশ্ন করলো...

" আম্মা খাবে না ? 

শ্যামার ইঙ্গিত বুঝেও শবনম জানতে চাইলো..

" কে মামি ? 

" হুম ! 

শবনম আতিয়া বেগমের দিকে তাকালো একবার । চোখ ফিরিয়ে হাসার চেষ্টা করে বললো...

" আমি ওনাকে ঘরে গিয়ে দিয়ে আসব । তুমি ঘরে যাও...

" আমি দিয়ে আসি ? 

লতিফ জোয়ার্দার বলে উঠলেন...

" না আম্মা , তোমার শাশুড়ি এখনো রেগে আছে সংগ্রামের উপর । আর সেই রাগ ঝাড়ছে তোমার উপর । তুমি এখন ওর সামনে যেও না । ও সবটা বুঝুক আগে, তার পর দেখা যাবে । 

শ্যামা আর কিছু বললো না । শবনম ইশারা করতেই ও সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল ।
ঘরে গিয়ে দেখলো সংগ্রাম খাটের উপর নেই । উঠে পড়েছে হয়তো । হাতের ট্রে টা টেবিলের উপর রাখলো শ্যামা । পিছন ফিরতেই নজরে আসলো সংগ্রাম । চোখ মুখ মুছতে মুছতে গোসল খানা থেকে বের হলো সংগ্রাম । পড়নে একটা সাদা লুঙ্গি ব্যতীত কিছু নেই । সংগ্রামের ফর্সা শক্ত পোক্ত উন্মুক্ত বাহু ঠিকড়ে মাংস পেশী বাইরে বেরিয়ে চাইছে যেন । হাঁ বনে গেলো শ্যামা । 
সংগ্রামের চোখে চোখ পড়তেই তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে নিলো ও । পিছন ঘুরলো তাৎক্ষণিক । সংগ্রাম এগিয়ে এসে বলল...

" আমার পড়ার কাপড় বের করে দাও তো বেগম । ঠান্ডা লাগছে..

বেগম শব্দটা ঝংকার তুললো শ্যামার কানে । বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো । 
খাটে বসলো সংগ্রাম । ট্রে থেকে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে আবারো বলল...

" কি হলো , তাড়াতাড়ি দাও । নাকি এভাবেই থাকবো ..? চোখ ফিরিয়ে আছো যে , দেখতে ভালো লাগছে না নিশ্চয়ই ? তাড়াতাড়ি দাও...

শ্যামা না তাকিয়েই বলল...

" কাপড় কোথায় আপনার ? 

" আলমারি তে ...

শোনা মাত্রই শ্যামা দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল আলমারির দিকে । বড় আলমারি টার পাশের অন্য আলমারি টা খুললো । সাদা কালো পোশাকে ভরপুর পুরো আলমারি । সাদা কালো ব্যতিত অন্য কোন রঙের ছিটে ফোঁটাও নেই । সবগুলো পাঞ্জাবি আর পা-জামা । এক তাকে কয়েকটা ফতুয়াও আছে । শ্যামা একটা কালো পাঞ্জাবি বের করে মাথা নিচু করে এগিয়ে দিলো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম হাতে নিলো সেটা । গায়ে জড়াতে জড়াতে পুনরায় বলল...

" শাল নিয়ে এসো..

শ্যামা এবার চোখ তুলে তাকালো । আলমারিতে শাল নজরে আসে নি ওর । 
নিজের দিকে একবার তাকালো ও । সংগ্রামের একটা শাল ওর গায়ে জড়ানো । আর একটা খাটের উপর । ওটা কাল পড়েছিল ও । আজ আর নিশ্চয়ই পড়বে না ওটা । 
শ্যামার চাহনি বুঝে সংগ্রাম মোলায়েম কন্ঠে বললো....

" বড় আলমারি তে আরো শাল আছে । নিয়ে এসো । 

শ্যামা আবারো গুটি গুটি পায়ে আলমারির দিকে এগোলো । এবার আলমারি খুলতেই হতবাক হয়ে গেল ও । চোখ গোল গোল করে চাইলো । বিশাল আকৃতির পুরো আলমারি টা জুড়ে সাদা কালো শাল পরিপূর্ণ । একদিকে সাদা অন্যদিকে কালো । সব শাল সুন্দর করে ভাজ করে অতি যত্নে গুছিয়ে রাখা । শাল ব্যতীত অন্য কিছু নেই আর । 
কতগুলো হবে হিসেব নেই । 
সংগ্রাম এগিয়ে আসলো শ্যামার দিকে । পুরু কন্ঠে জিজ্ঞেস করল....

" কি হলো ? কি দেখছো ? 

শ্যামা অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে শুধালো...

" এতো গুলো শাল , সব আপনার ? 

" হুম , আজ থেকে তোমার ও । ঠান্ডা লাগলে এখান থেকে যখন যেটা ইচ্ছে পড়ে নিও । 

শ্যামা পুনরায় অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল...

" কতগুলো আছে এখানে ? 

" হবে হাজার খানেক ! 

তব্দা খেলো শ্যামা । হাজার খানেক ! এটা ধারনার বাইরে । শুকনো কেঁশে উঠলো শ্যামা । সংগ্রাম অবস্থা বুঝে মুচকি হেসে বলল...

" শোনো বেগম..
সংগ্রাম জোয়ার্দারের অর্ধাঙ্গিনী তুমি । জোয়ার্দার পরিবারের একমাত্র বউ । আর এইটুকু তেই এতো অবাক হচ্ছো । এই শাল জমিদার বংশের ঐতিহ্য । এখানে তো শুধু হাজার খানেক আছে , আরো ছিল বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে সেগুলো । পরের সপ্তাহে আরো আসবে । 

ঢোক গিললো শ্যামা । দ্বিধাহীন প্রশ্ন করলো..

" কিন্তু, শুধু সাদা-কালো কেনো ?  

" কারণ আমার জীবন সাদা কালো তাই । রঙের ছোঁয়া লাগে নি জীবনে । এখনো রঙিন হয় নি আমার জীবন । তবে হতে দেরি নেই আর । তুমি তো এসেছো , রঙিন করে সাজিয়ে দিও আমার জীবন । আমি কিন্তু অপেক্ষায় আছি...

শ্যামার দিকে খানিক ঝুঁকে আবেশিত কন্ঠে কথা গুলো বলল সংগ্রাম । শ্যামা চোখ সরিয়ে চিবুক গলায় নামালো । বাঁকা হাসলো সংগ্রাম । একটা শাল বের করে জড়িয়ে নিল গায়ে । আবারো গিয়ে বসলো খাটে । পায়েসের বাটি হাতে নিয়ে খেতে খেতে বলল...

" তুমি বানিয়েছো এটা ? 

শ্যামা ঘাড় ঘুরিয়ে জবাব দিলো...

" হুম..! 

ছোট্ট জবাব দিয়ে শ্যামা নিঃশব্দে খাটের পাশে এসে দাঁড়ালো ।
খানিক চুপ থেকে জড়ানো গলায় বলল...

" আ.. আমি বাড়ি যাবো । আমার আম্মার কাছে যাবো আমি । আপনি আমাকে রেখে আসুন । 

সহসা খাওয়া থামিয়ে নিরেট দৃষ্টি পাত করলো সংগ্রাম ‌। শ্যামার চিবুক গলায় ঠেকানো । তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকলো সংগ্রাম । চোখ নামিয়ে তপ্ত স্বরে বলল...

" এক সপ্তাহ পর নিয়ে যাবো । 

" নাহ, আজকেই যাবো আমি । আমি থাকবো না এখানে । 

সংগ্রামের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো এবার । দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে সংযত করলো নিজেকে । স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে বলল...

" তোমার আপার অবস্থা ভালো নয় । তার বাচ্চা গুলো মারা গেছে । তার নিজের শরীরের অবস্থাও ভালো নয় । তোমার আম্মা আসে নি এখনো । কার কাছে যাবে তুমি ? 

থমকালো শ্যামা । গুড়িয়ে আসলো পা দুটো । রুপার বাচ্চা দুটো মারা গেছে ? কি হয়েছে ওর সাথে ? কবে হলো এসব ? আর শ্যামা, ও জানে না কেন কিছু ? ওর আপা'র গর্ভের ধন আর নেই ? শ্যামা আর কিছু ভাবতে পারলো না ‌ । মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আসছে । গুলিয়ে যাচ্ছে সবটা ‌ । কান গরম হয়ে আসছে ওর । 
চোখ ভরে আসলো শ্যামার । পিছিয়ে গেল দু'কদম । চোখের পানি গড়ালো গাল বেয়ে । শরীরের ভার হারিয়ে পিছনে টলে পড়তে যাচ্ছিল ও । সংগ্রাম তাৎক্ষণিক উঠে দাঁড়িয়ে বাহু টেনে ধরল শ্যামার । টেনে আনলো নিজের কাছে । শ্যামা ভেজা ঝাঁপসা চোখে চাইলো । গলায় কান্না আটকে অবিশ্বাস্য স্বরে বলল...

" আপনাকে কে বলল, আমার আপার বাচ্চা মারা গেছে ? ব.. বলুন ? আপনি কি করে জানলেন ? মিথ্যে বলছেন আপনি, তাই না ? কিচ্ছু হয় নি আমার আপার । ওর বাচ্চারা একদম ঠিক আছে , তাই না ? এইতো সেদিন ওর বাচ্চা হলো , এতো তাড়াতাড়ি ওরা মারা যায় কিভাবে ? জন্মই তো হলো কেবল । ওদের কি এখনো মরার বয়স হয়েছে ? 

বলতে বলতে অঝোর ধারায় পানি গড়াচ্ছে শ্যামার চোখ দিয়ে । সংগ্রাম নরম চোখে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছে দিলো । মোলায়েম কন্ঠে বলল...

" আমি মিথ্যে বলছি না , কাল হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তোমার আপার দুটো বাচ্চাই মারা গেছে । এতক্ষণে কবরও দেওয়া হয়েছে তাদের । তোমার আপাও জানে না এই বিষয়ে , ওকে জানানো হয় নি কিছু । 
তোমার আপা এখনো হাসপাতালে ভর্তি । 

শ্যামা ঝটকা মেরে সংগ্রামের হাত ছাড়িয়ে দেয় নিজের বাহু থেকে । 

" নাহ.. আমি বিশ্বাস করি না । 
আমার আপার লগে কিচ্ছু হয় নাই এমন । আমার আপা ঠিক আছে । ওর বাচ্চাগোর কিচ্ছু হয় নাই । আপনি জানেন আমার আপা কত ভালো ! আমার আপার মতো ভালো মানুষের লগে এমনটা হইতেই পারে না । 
আমার আপা.. কত খুশি আছিলো ওর বাচ্চার লাইগা । ক্যান এমন হইবো ওর লগে..? 

উত্তেজিত হয়ে পড়লো শ্যামা । সংগ্রাম জানতো এমনটাই হবে । তাই আগে জানা সত্ত্বেও কিছু বলে নি শ্যামা কে । জানাতে চায় নি কিছু । তবুও দোটানা ছিল মনে , পড়ে জানালে যদি শ্যামা ওকে ভুল বোঝে ! তাই জানিয়ে দিলো সবটা ।
শ্যামা আবারো বলতে লাগলো...

" আপনি আমারে নিয়া চলেন..
আমি আমার আম্মা আর আপার কাছে যামু । 

সংগ্রাম আবারো বাহু টেনে নিজের কাছে টেনে নিলো শ্যামা কে । দুহাতে মুখ আগলে বলল..

" বললাম তো, এক সপ্তাহ পর নিয়ে যাবো । তোমার আম্মা আসুক, তার পর নিয়ে যাবো তোমায় । এখন তো উনি তোমার আপার সাথে আছেন । ওনার ওখানে থাকাটা বেশি প্রয়োজন । তোমার সাথে তো আমি আছি..

শ্যামা ফুঁপিয়ে উঠে সংগ্রামের দুহাতের উপর নিজের হাত রাখলো । কান্নারত ভেজা কন্ঠে ফিসফিস করে বললো...

" ক্যান আমাগোর সাথে এমনটা হয় কইতে পারেন ? আমার আপার লগে ক্যান এমনটা হইলো ? আপনি জানেন.. 
আমার আপা আমারে অনেক বেশি ভালোবাসে । এই দুনিয়ায় আমার কেউ নাই , যারা আছে তারা আমারে কোন দিন ভালোবাসে নাই । কিন্তু আপা তো আমারে ভালোবাসতো , তাইলে ওর লগে ক্যান এমনটা হইলো ? 
আমারে নিয়া চলেন দয়া কইরা, আমি যামু আমার আপার কাছে । ও জানলে অনেক কষ্ট পাইবো..! 

সংগ্রাম বললো না কিছু । চেয়ে আছে নীরবে । শ্যামা চোখ মুছে ঢোক গিলে আবারো বললো...

" আপনি আমারে খালি একবার দিয়া আহেন । আমি আর আইমু না , সত্যি কইতাছি আমি আসমু না আপনার জীবনে । 
মানতে হইবো না আমারে , আমি কাউরে কমু না কিছু । কোন দাবি রাখমু না আপনার কাছে । আপনি খালি আমারে একবার রাইখা আসেন । আর আনতে হইবো না..! 

" আবারো এক কথা বলছো ? 
তোমাকে বলেছি না , মেনে নিয়েছি আমি তোমায় । ছাড়বো না আমি তোমায় ,, মুক্তি পাবে না তুমি ! কোন দিন না ! 
যত তাড়াতাড়ি তুমি এটা মানবে তত তাড়াতাড়ি ভালো । আর একটা বারের জন্যেও তোমার মুখে এই ধরনের কথা শুনতে চাই না আমি । 

" হোক , আর কমু না আমি , আপনি এখন নিয়া চলেন আমারে..! 

" এখন না , এক সপ্তাহ পর । 

সংগ্রামের আবারো একই কথায় শ্যামা এবার এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো সংগ্রামের হাত । গর্জে উঠলো...

" তাইলে ছাড়ুন আমারে, আমি একাই যামু , লাগবো না আপনারে...

বলেই পা বাড়ালো । সংগ্রাম আবারো ওর বাহু ধরে এক টানে আনলো নিজের কাছে । এবার আঁকড়ে ধরলো বুকে । শক্ত করে চেপে ধরলো দুহাতে । নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করলো শ্যামা । তবে পারলো না । সংগ্রামের শক্তির কাছে ওর শক্তি নিতান্তই তুচ্ছ । স্থির হলো সে । 
রুপার কথা মনে পড়তেই সংগ্রামের পাঞ্জাবি খামচে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো । কষ্ট হচ্ছে ভীষণ, বুকটা ফেটে যাচ্ছে । হাহাকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে । কেনো এমন হয় ওর সাথে ? কেনো ? 
কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি রাও বেইমানি করছে ওর সাথে । পানি আসছে না চোখে । 
শান্ত হলো শ্যামা । থমকে স্তব্ধ হয়ে রইল । সংগ্রাম নিশ্চুপে জড়িয়ে আছে ওকে । ওর চোখের পানিতে সংগ্রামের বুকের কাছের পাঞ্জাবির অংশ ভিজে গেছে । শ্যামা ছেড়ে দিলো ওকে । সংগ্রাম ও হাতের বাঁধন আলগা করলো । শ্যামার চিবুক ধরে ওর নিচু মাথা উঁচু করে দিলো । চোখের পানি মুছিয়ে দিলো আলগোছে । দু'গাল আগলে নিয়ে ওর কপালে চুমু খেলো শব্দ করে । সুপ্ত অনুভূতিতে চোখ বন্ধ করে নিলো শ্যামা । প্রথম কোনো পুরুষের ঠোঁটের স্পর্শে কেঁপে উঠলো । তবে অনুভূতি গুলো কষ্টের মাঝে চাপা পড়লো মুহুর্তেই । সংগ্রাম পরপর কয়েকটা চুমু খেয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলল...

" আর কেঁদো না । সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগমের চোখে অশ্রু মানায় না । 
আমি তো বলেছি, আমি তোমাকে নিয়ে যাবো , একটু সময় দাও আমায় । বিশ্বাস রাখো আমার উপর । তোমার আম্মা আর আপাকে খুব তাড়াতাড়ি আনানোর ব্যবস্থা করছি আমি । তোমার আপা একটু সুস্থ হোক , তার পর নিয়ে আসবো তোমার কাছে ‌ । 

শ্যামা কথা বললো না , আবারো মাথা নামিয়ে পিছিয়ে গেল । সংগ্রাম হাঁফ ছেড়ে পায়েসের বাটি ইশারা করে বললো...

" তুমি খেয়ে নাও...
আমি বাইরে যাচ্ছি একটু । কাজ আছে আমার । খুব তাড়াতাড়ি ফিরবো । আর কাঁদবে না কিন্তু...

শ্যামা স্থির দাঁড়িয়ে রইল । না কথা বলল আর না সাঁড়া দিলো । চোখের কোনে শুকনো পানি জমে আছে । সংগ্রাম তাকিয়ে থেকে এগিয়ে গিয়ে আবারো শ্যামার মুখ দুহাতের আজলে আগলে ধরলো । চোখ তুললো না শ্যামা । সংগ্রাম কিছু মুহূর্ত চেয়ে থেকে এবার চুমু খেলো দু'চোখের পাপড়ি তে । শ্যামা চোখ খিচে জোরে শ্বাস টেনে সরে এলো সংগ্রামের সামনে থেকে ।
খাটের অন্য পাশে গিয়ে পিছন ফিরে দাঁড়ালো । সংগ্রাম মুচকি হাসলো এতে । 
অতঃপর বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । 


দুপুর গড়িয়েছে অনেক আগে । নামাজ শেষ করেই শ্যামা সেই যে হাঁটু মুড়ে বসে আছে , আর নামে নি খাট থেকে । 
বাইরেও বের হয় নি , কেউ ডাকতেও আসে নি । শবনম সকালের খাবার রেখে গেছিল ঘরে । সংগ্রাম যাওয়ার আগে বলেছিল ঘরেই খাবার পৌঁছে দিতে । 
সংগ্রামের কথা অনুযায়ী তাই করেছে শবনম । কিন্তু শ্যামা সেই খাবার গুলো ছুঁয়েও দেখে নি । যেভাবে রেখে গেছে, সেভাবেই ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে । এখন দুপুর গড়িয়েছে । আজ ক্ষিদে পাচ্ছে না শ্যামার । সকালেও খায় নি কিছু । একগ্লাস পানি খেয়েছিল শুধু, সেটাও আটকাচ্ছিলো গলায় । 
শ্যামা উদাসীন হয়ে বসে আছে । মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে রুপার কথা । বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে বারবার । তবুও হালকা হচ্ছে না বুকের ভার । গোটা ঘরের মেঝেতে আপন মনে নেচে বেড়াচ্ছে গলু । 
দরজা ঠেলে হঠাৎ প্রবেশ করলো কেউ । নুপুরের রিনিঝিনি শব্দে ঘোর কাটে শ্যামার । চোখ ফেরায় দরজার দিকে । একটা সুন্দর, মিষ্টি মেয়ে মুখে মলিন হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার চৌকাঠে । পড়নে সফেদ রাঙা পোশাক । চোখ দুটো স্থির শ্যামার দিকে । হাতে হয়তো খাবারের প্লেট । লক্ষ্য করলো শ্যামা - মেয়েটার চেহারা ফর্সা ধবধবে, সমস্ত মুখশ্রীতে অদ্ভুত লাল আভা । এতো ফর্সা যে , টোকা দিলেই রক্ত গড়াবে মনে হচ্ছে । মেয়েটার চোখ দুটো শ্যামার মতোই ডাগর ডাগর । তবে চোখের নিচে কালি জমেছে, মনে হচ্ছে দীর্ঘ রাত ঘুমায় নি সে । এক টুকরো চাঁদে গ্রহণ লেগেছে সেই কালিতে । 
ওদের একে অপরের চোখ একে অপরের দিকে শান্ত স্থির । শ্যামা পলক ঝাপটে একটু হাসার চেষ্টা করলো । নেমে পড়লো খাট থেকে । 
মেয়েটা এখনো অদ্ভুত নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্যামার পানে । 
শ্যামা কোমল কন্ঠে বলল...

" ভেতরে এসো , বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেনো ? 

তৎক্ষণাৎ একই দৃষ্টি বজায় রেখে ভেতরে ঢুকলো মেয়েটা । ওর চোখের পলকও পড়ছে না । শ্যামা হকচকিয়ে আবারো বলল...

" তুমি বালা..? 

মেয়েটা চেয়ে থেকেই জবাব দিলো ...

" হুম ..! 

ওর দৃষ্টিতে এবার অস্বস্তি হলো শ্যামার । শ্যামা আলতো হেসে বলল...

" কি দেখছো এভাবে ? 

অদ্ভুত হাসলো বালা । একই স্বরে বলল...

" দেখছি, ভাগ্যবতীরা বুঝি তোমার মতোই হয় ?



চলবে..........

 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×