গল্প: শ্যামা সুন্দরী (পর্ব :১২)

 


লেখিকা: সুরভী আক্তার

পর্ব:১২





" মৌলভী সাহেব.. 
ঘরে যান..! বিয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করুন । আজ এই মুহূর্তে লতিফ জোয়ার্দারের একমাত্র পুত্র সংগ্রাম জোয়ার্দারের সাথে বিয়ে হবে শ্যামার । আর একটা কথাও শুনতে চাই না আমি । 

পুরো বাড়িতে উপস্থিত সবার মাঝে যেন বাজ পড়লো । শান্ত পরিস্থিতিতে কথার রোল দ্বিগুণ বেড়ে গেলো । গলা উঁচিয়ে কথা বলার সাহস পাচ্ছে না কেউ । ফিসফিস করে কানাঘুষো করছে সবাই । মোখলেছের গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না । কাকড়ি বুড়ি সহ তিনি জুবু-থুবু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এতক্ষণ । 

সংগ্রাের কথায় মোখলেছ আর কাকড়ি বুড়ি চোখ গোল গোল করে অবিলম্বে তাকালেন । চোখ কোটড় ফেটে বেরিয়ে আসার দশা । 
মৌলভী সাহেব স্বস্তির হাসি হাসলেন । ফুলিও অবাক লোচনে চেয়ে আছে । শেষ মেষ কিনা শ্যামার সাথে জমিদারের ছেলের বিয়ে ? 
ফুলি সটান দাড়িয়ে থেকে দু'পা পিছিয়ে ঘরে ঢুকলো ।
মোখলেছের দু'পা স্থির হয়ে আটকে আছে । 
রাত গভীর হচ্ছে । হারিকেনের টিমটিমে আলোয় বিয়ে পড়ানো হয় শ্যামা আর সংগ্রাম জোয়ার্দারের । ফুলির আস্থায় অবচেতন অবস্থায় মুখ নেড়ে 'কবুল' বলে শ্যামা । রাতের অন্ধকার, আকাশ বাতাস, আর ঐ উপর আল্লাহ কে সাক্ষী রেখে পবিত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় দুটি প্রাণ,, শ্যামা আর সংগ্রাম জোয়ার্দার । 



ফজরের আজান পড়ছে । প্রতিদিনের মতো স্বাভাব বশত শ্যামার কানে আসছে আজানের ধ্বনি । শ্যামাদের বাড়ি থেকে কয়েকটা বাড়ি পেরোলেই মসজিদ । রোজ রোজ আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙ্গে শ্যামার । চোখ বুজে এক মনে আজান শোনে সে । আজান শেষ হতেই উঠে পড়ে নামাজের জন্য । 
আজও কানে আসছে আজানের ধ্বনি । আজান শেষ হতেই পিট পিট করে চোখ খোলে শ্যামা ।‌ শরীরটা এখনো অবস আর ভারী হয়ে আছে । মাথাটা ঝিমঝিম করছে । শ্যামার মনে হলো ও যেন তুলোর উপর শুয়ে আছে । এতো নরম গদি তো ওর নয় । 
শ্যামা চোখ বন্ধ করে রাখে কিছুক্ষণ । ওর একহাত কোন কিছুতে আবদ্ধ । মাথায় ভেজা ভেজা কিছু অনুভব করে শ্যামা, একহাত বাড়িতে মাথায় রাখে । কপালে একটা ভেজা কাপড় । শ্যামা কাপড়টা সরিয়ে আবারো আধো আধো চোখ খোলে ‌ । চারপাশ ঝাঁপসা লাগছে । শ্যামা আবারো ঝট করে চোখ বন্ধ করে । অন্য হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পারলো না । কোন শক্ত বন্ধনে আটকে আছে ওর হাত । শ্যামা সময়‌ নিয়ে ধীরে সুস্থে চোখ দুটো চোখে । এখনো আলো ফোটেনি বাইরে । শ্যামার ঘরে ফজরের সময়ও অন্ধকার থাকে ,, ফাঁক ফোকর না থাকায় বাইরের আলো ঢুকতে পারে না , যতক্ষণ না জানালা খুলে দেওয়া হয় । শ্যামা দেখতে পেলো আজ ওর ঘরে বাইরের আলো দেখা যাচ্ছে । কোথাও থেকে ভেসে আসছে সকালের পাপমুক্ত স্নিগ্ধ নরম আলো । ঝাপসা চোখ দুটো সম্পূর্ণ খোলার চেষ্টা করে শ্যামা । চারপাশের পরিবেশ নজরে আসতেই মস্তিষ্ক জেঁকে ওঠে শ্যামার । এটা তো ওর ঘর নয় ! শ্যামার নরম হৃদয় আঁতকে ওঠে, থরথর করে কেঁপে ওঠে ও, অজানা আশঙ্কায় শিহরণ বয়ে যায় পুরো শরীরে । এক ঝটকায় উঠে বসে সে । একহাতে টান পড়তেই, থেমে যায় । আচমকা উঠে বসায় মাথা যন্ত্রণায় কুকিয়ে ওঠে । একহাতে মাথা চেপে মুখ লুকায় দুই হাঁটুর ভাঁজে । ভেতর কাঁপছে শ্যামার । শ্যামা এক মুহুর্ত দেরি না করে কোন দিকে না‌ তাকিয়ে এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় । খাট থেকে নামার জন্য উদ্যত হতেই পেছন থেকে কেউ আটকে দেয় ওকে । শ্যামার কোমর পিছন থেকে আঁকড়ে ধরেছে কেউ । 
শ্যামার গলা শুকিয়ে আসছে ভয়ে । ঘরে আবছা অন্ধকার , আবছা আলো । পিছনের ব্যাক্তি কে না দেখে তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ছটফট করতে করতে চেঁচিয়ে ওঠে শ্যামা.....

" ছাড়ুন আমারে... ছাড়ুন....
এই বিয়া মানি না আমি । ঐ নোংরা হাতে স্পর্শ করবেন না আমারে...

শেষের কথাটা দাঁত কিড়মিড় করে বলে শ্যামা । শ্যামার পিঠ ঠেকেছে কোন বলিষ্ঠ বুকের উপর । ওর পাতলা ফিনফিনে শরীর তলিয়ে গেছে একটা সুঠাম দেহের মধ্যিখানে ।‌ যে দুহাতে শক্ত করে আটকে রেখেছে শ্যামা কে । কারোর খোঁচা খোঁচা দাড়ি বিদ্ধ হয় শ্যামার ঘাড়ে । কেঁপে ওঠে শ্যামা । নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছোটাছুটি করতে থাকে সে । নিজের নিস্তেজ শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে যথাসম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছে নিজেকে ছাড়ানোর । তবে পারছে না, কোনো সুপুষ্ট ব্যাক্তির শক্তির কাছে শ্যামা জোর নিতান্তই তুচ্ছ । শ্যামা শক্তি দেখিয়ে হিসহিসিয়ে উঠলো আবারো....

" ছাইড়া দে আমারে....
নয়তো তোর এই হাত কাইটা ফেলমু আমি..

" নিজের স্বামিকে শক্তি দেখাচ্ছ মেয়ে ? 
স্বামীর হাত কেটে ফেলবে ? বুক কাঁপবে না তোমার ? 

ভরাট কন্ঠে তড়িতে ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরলো শ্যামা...। চোখাচোখি হলো সংগ্রামের সাথে । শ্যামার হাত পায়ের ছোটাছুটি বন্ধ হয়ে গেল নিমিষেই । স্থির হলো সে । শ্যামার মুখের খুব কাছাকাছি ওর দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সংগ্রাম । সংগ্রামের দৃষ্টি স্থির । শ্যামার শ্বাস আটকে এলো ।
অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তি কে আবিষ্কার করলো সামনে ।‌ শ্যামা পলক বিহীন নিগুড় চোখে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ । সংগ্রাম একই ধারালো দৃষ্টিতে চেয়ে বাঁকা হেসে বলল....

" কি হলো মেয়ে...? 
ছোটাছুটি বন্ধ করে দিলে যে ? আর কি দেখছো এভাবে ? 
পছন্দ হয়েছে স্বামী কে ? 

শ্যামা নড়ে উঠলো একটু । পুরো শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে গেলো ওর । পলক ফেলে এদিক ওদিক তাকালো । বিলাস বহুল আসবাবপত্রে সমৃদ্ধ ঝকঝকে একটা ঘর । ঘরটা অনেক বড় । পুরো ঘর গোছানো পরিপাটি । বাইরের আসা আলোয় বোঝা যাচ্ছে পুরো ঘর । 
শ্যামা ঢোক গিললো । 
এটা কোথায় আছে ও ? কার ঘর এটা । আর 
সংগ্রাম এখানে কি করছে ? শ্যামা কম্পিত চোখে ফের তাকালো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম এখনো একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । ওর দৃষ্টির মানে বুঝতে পারছে না শ্যামা । সংগ্রামের প্রতিটা শ্বাস প্রশ্বাস অবধি অনুভব করতে পারছে সে । জীবনে প্রথম এতো কাছ থেকে কোন পুরুষ কে চেয়ে দেখলো সে । সংগ্রামের স্পর্শে কম্পন ধরেছে শ্যামার শরীরে । হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে । অস্থির ভাবে ওঠা নামা করছে হৃৎপিণ্ড । সে সংগ্রামের চোখে চোখ রেখেই কাঁপা গলায় বললো....

" ছা..ছাইড়া দেন আমারে....
আমি কোথায় ? আপনি এইখানে ক্যান ? 

সংগ্রাম তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিল শ্যামা কে । শ্যামা বসা অবস্থায় পিছিয়ে গেল একটু । শ্বাস নিলো জোরে জোরে । সংগ্রাম পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে খানিক ভারী গলায় বলল...

" আমার ঘরে আমি থাকবো না তো কে থাকবে ? 

শ্যামা চমকে উঠলো । ঘরটায় চোখ বুলিয়ে নিলো আবারো । এবার তাকালো নিজের দিকে । ওর গায়ে শাড়ির উপর একটা কালো শাল জড়ানো । মিষ্টি আতরের গন্ধ আসছে গাঁ থেকে । শ্যামা নিজেকে দেখে নিচু স্বরে বলল...

" আ..আপনার ঘর মানে..? আমি এইহানে ক্যান ? 

" এইখানে থাকবে না তো কোথায় থাকবে তুমি ? স্বামীর ঘর এটা তোমার !! 

শ্যামা পুনরায় আঁতকে উঠলো । 
দুহাতে মাথা চেপে ধরলো । কি হয়েছিল কালকে ? কিছু মনে নেই কেনো ওর ? কাল রাতে কি এমন হয়েছিল, আর শ্যামা এখানেই বা কি করছে ? মনে করার চেষ্টা করলো শ্যামা ! কিন্তু কিছুই মনে পড়লো না । শ্যামা শব্দ করে উঠলো....

" আহহ্.... 
আমার কিছু মনে পড়তাছে না ক্যান ? আমি এইহানে আইলাম ক্যামনে ? 

সংগ্রাম খাট থেকে নামতে নামতে নিসংকোচে জবাব দিলো...

" আমার কোলে চড়ে এসেছো এখানে ! 

মাথা ছেড়ে চোখ গোল গোল করে তাকালো শ্যামা ।‌ সংগ্রাম হেসে বলল....

" এভাবে তাকিও না মেয়ে ,, স্বামী হোই আমি তোমার,নতুন বউ তুমি, একটু তো লজ্জা করো । 
যাও তাড়াতাড়ি গিয়ে জামাকাপড় বদলে নামাজ পড়ে নাও । 

শ্যামার অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছেছে । কিছু মাথায় ঢুকছে না ওর । গলা শুকিয়ে আসছে । কি হচ্ছে এসব ওর সাথে । শ্যামার অক্ষিপটে ভিজে আসছে । মন বিপরীত সুরে কথা বলছে । শ্যামা চোখ নামিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসলো । সংগ্রাম ওর অবস্থা সরু চোখে পর্যবেক্ষণ করে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেল ওর দিকে । নির্দ্বিধায় হাত বাড়িয়ে কপালে হাত রাখলো শ্যামার । আকস্মিক স্পর্শে এক ঝটকায় পিছে সরে আসলো শ্যামা । সংগ্রাম ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বললো... 

" জ্বরের ঘোরে সারারাত তো বেহুঁশ হয়ে ছিলে, এখন জ্বর কমেছে । তাড়াতাড়ি যাও... নামাজের দেরি হয়ে যাচ্ছে । 

শ্যামা ভেজা কন্ঠে অনুনয়ের স্বরে বলল....

" আমি এখানে ক্যান ? কি হইছে আমার সাথে ? আমার আম্মা কোই ? আমি আম্মার কাছে যামু ! ওরা..ওরা তো আমারে ঐ জাফর ব্যাপারির লগে....

সম্পুর্ন কথা শেষ করার আগে বাঁধ সাধলো সংগ্রাম.....

" চুপ...
কিচ্ছু খারাপ হয় নি তোমার সাথে ! তুমি সম্পুর্ন ঠিক আছো । ওরা কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারে নি । 
তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে ! বিয়ে করেছি আমি তোমায় । সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগম হয়েছো তুমি !

শ্যামার চোখ বেয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো । সবকিছু কেমন এলোমেলো লাগছে । কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো ও । 
সংগ্রাম ভারী গলায় আশ্বাস জোগালো শ্যামা কে....

" সময় বয়ে যাচ্ছে,নামাজ পড়ে নাও আগে । তারপর সবটা বলছি, ঠিক বুঝতে পারবে । 

শ্যামা নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ । সংগ্রাম নিজেই একটা শাড়ি এগিয়ে দিলো ওর দিকে । নিস্তেজ চোখে চাইলো শ্যামা । সংগ্রাম ইশারা করে বললো....

" ওদিকে গোসল খানা আছে,, ওখানে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এটা পড়ে নাও । 

শ্যামা আর কথা বাড়ালো না । ধীরে ধীরে নেমে শাড়ি হাতে এগিয়ে গেলো গোসল খানার দিকে । ঘরের ভেতরেই গোসল খানা । কাপড় বদলে ওজু করে ঘরে আসলো । শাড়ি পরার অভ্যাস নেই শ্যামার । একা একা শাড়ি পরেও নি কখনো । আজ প্রথম । ঠিক মতো পড়তে পারে নি । কুঁচি গুলো এলোমেলো হয়ে আছে । কোন রকমে শরীরে জড়িয়ে রেখেছে শাড়িটা । শ্যামা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো সংগ্রাম নেই । হাঁফ ছাড়ল সে । বিছানার উপর একটা জায়নামাজ রাখা । শ্যামা সেটা বিছিয়ে নামাজ পড়ে নিলো । আজ অনেকটা সময় সিজদায় লুটিয়ে নিঃশব্দে কাঁদলো আল্লাহর কাছে । বাইরে পাখির কিচির মিচিরের শব্দ শোনা যাচ্ছে । শ্যামা জায়নামাজে বসেই আনমনে হাঁটুতে মাথা রেখে মেঝের দিকে চেয়ে রইল । ওর জীবনটা এমন কেনো হলো ? কেনো এই ক্ষুদ্র জীবনে এতো দীর্ঘশ্বাস ? শ্যামার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে অনাড়গল । 
ভোরের আলো ফুটেছে চারপাশে । ঘরে একটা বারান্দা আছে । সেখান দিয়ে আলো আসছে , যে আলোয় পুরো ঘর আলোকিত । 
শ্যামা চোখ বন্ধ করে একই ভঙ্গিতে বসে আছে । হঠাৎ কারোর দরজা খোলার শব্দে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায় শ্যামা । 
দরজা খুলে দুজন প্রবেশ করে ঘরে । 

" কোই আমার নাতবৌ কোই,, ঘুম থাইকা উঠছোস ছেড়ি ? দেহি দেহি, কাইল রাইতে তো ঠিকমতো দেখতেও পারি নাই তোরে ! 

বলতে বলতে একজন বৃদ্ধা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে আসেন শ্যামার দিকে । শ্যামা চোখের পানি টুকু মুছে নেয় হাতের উল্টো পিঠে । শাড়ির আঁচল আগে থেকেই মাথায় টেনে রাখা ছিল, শ্যামা আরো একটু টেনে নেয় আঁচল । বৃদ্ধা শ্যামার সম্মুখে দাঁড়ান । শ্যামা শুকনো ঢোক গেলে তাকে দেখে । এখানে কেউ তার পরিচিত নয় । কেউ আপন নেই এখানে শ্যামার । বুক ফেটে কান্না আসছে শ্যামার । তবুও নিজেকে সামলে রেখেছে সে । আম্মা কোই ? ওর আম্মা থাকলে তো ওর জীবনে এমনটা কখনোই হতো না । শ্যামার চোখ ভরে উঠেছে । চোখের পলক ফেললেই যেনো ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়বে অনায়াসে । বৃদ্ধা সরু চোখে চেয়ে আছেন শ্যামার পানে । ভয়ে দু'কদম পিছিয়ে মাথা নুইয়ে সিটিয়ে দাঁড়ালো শ্যামা । বৃদ্ধা আরো এগিয়ে গেলেন । হাত বাড়িয়ে শ্যামার নরম চিবুক ধরে মুখটা এদিক ওদিক করে ভালো মতো দেখলেন । অকস্মাৎ হেসে উঠলেন তিনি....

" আরে মাইয়া ভয় পাইতাছোস ক্যান ? আমি বাঘ না ভাল্লুক ? আরে আমি তোর দাদি শাশুড়ি হোই বুঝছোস ? 

নরম গলায় শ্যামা একটু স্বস্তি পেলো । লক্ষ্য করে দেখলো বৃদ্ধাকে । বয়স ওর দাদির মতোই । ফর্সা গুলগুলে চেহারা । শরীরের চামড়া ঝুলে পড়েছে দাদির মতোই । দামি মাড় খসা শাড়ি গায়ে জড়ানো । হাত,কান ,গলায় স্বর্নের অলংকার চিকচিক করছে । সাত গ্রামের জমিদার লতিফ জোয়ার্দারের মা আতিয়া বেগম । জমিদার হওয়ার তাগিদে হলেও একটু তো বিলাস পনা থাকবেই । 
আতিয়া বেগম শ্যামা কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন । এক চিলতে হেসে বললেন....

" আরে বাহ্...
তোর চেহারা তো সুন্দর আছে । আমার নাতি এমনি এমনি কাবু হয় নাই তোর উপর । গায়ের রং শ্যামলা হইলেও মেলা মানান‌ আছে তোর চেহারায় । 

শ্যামা অবাক হলো । শ্যামা কে কিনা কেউ সুন্দর বললো । আম্মা, আপা আর ফুলি ব্যাতিত কোন দিন কেউ শ্যামার প্রশংসা করে নি । না করেছে তো - সেইদিন আফতাব ! আফতাব তো সেই দিন প্রশংসা করেছে । আচমকা আফতাবের কথা মনে পড়লো শ্যামার । বুকটা চিনচিন করে উঠলো খানিক । আর কদিন পর তো আফতাবের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ওর । আফতাব বলেছিল চৌদ্দ দিন পর হালাল ভাবে নিয়ে যাবে শ্যামা কে । কিন্তু এই চৌদ্দ দিনের মাঝেই কি হয়ে গেলো এসব ? সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল ।
শ্যামার বুকটা ভার হয়ে আসছে পুনরায় । 

" কি রে মাইয়া, কি ভাবতাছোস এতো ? 

আতিয়া বেগমের ডাকে ধ্যান ভাঙ্গে শ্যামার । চমকে তাকায় ও । 
আতিয়া বেগমের পেছনে নজর যায় ওর । আরো একজন দাঁড়িয়ে আছেন পেছনে । তার পড়নেও দামি শাড়ি সহ ভারী ভারী অলংকার । ফিনফিনে চেহারার কুঁচি করে শাড়ি পরা । মাঝ বরাবর সিঁথি করে চুলগুলো খোঁপা করা, আঁচল ঘাড় থেকে টেনে সামনে এনে রাখা । ফর্সা ধবধবে চেহারায়, শাড়ি গয়নার আবরনে একদম মোমের পুতুলের মতো সুন্দর লাগছে তাকে । শ্যামা নিষ্পলক তাকিয়ে আছে তার দিকে । নজর কাড়া সৌন্দর্যের অধিকারী তিনি । 
শ্যামার দিকে স্মিত হেসে এগিয়ে আসেন তিনি । শ্যামার নজর বুঝে আতিয়া বেগম বলেন...

" হেইডা তোর বড় জা...
আমার বড় নাতি জুনাইদের বউ- শবনম । 
কি রে, শবনম পছন্দ হইছে জা এরে ? 

শবনম হেসে উত্তর দিলো....

" খুব পছন্দ হইছে দাদি জান...
আমার ছোট ভাইয়ের পছন্দ আছে বলতে হবে ? 

শ্যামা আবারো অবাক হলো । কি হচ্ছে এখানে ? সবাই এভাবে কথা বলছে কেনো ? শ্যামার সাথে তো কেউ এভাবে কথা বলে না । এভাবে কারোর কথা শোনায় অভ্যস্ত নয় শ্যামা । এতো সুন্দর মহিলা কি-না শ্যামার প্রশংসা করছে ।
শ্যামা বাক্ হীন কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । শবনম শ্যামার হাত দুটো ধরে । আলতো হেসে বলে....

" নাম কি তোমার ? 

শ্যামা ঢোক গিলে জড়ানো গলায় উত্তর করে...

" শ্যা... শ্যামা...! 

শবনম শ্যামা কে আগাগোড়া দেখে নিলো । শাড়িটা এলোমেলো হয়ে আছে । হেসে ফেললো শবনম । 

" শাড়ি পড়তে পারো না ? কি অবস্থা করেছো শাড়ির ? এলোমেলো হয়ে আছে একদম । 
আর এই শাড়িটা কোথায় পেলে তুমি ? কাল রাতে তো তোমার পড়নে এটা ছিলো না ! 
ভাই দিয়েছে ? 

শ্যামা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো । বুক ধড়ফড় করছে । হাসার চেষ্টা করলো একটু । এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজলো কাউকে । শ্যামার চাহনি বুঝে শবনম চোখ সরু করে বলল....

" ভাইকে খুঁজছো ? 

শ্যামা তৎক্ষণাৎ দুদিকে মাথা নাড়ালো । আতিয়া বেগম আর শবনম দু'জনেই হেসে উঠলো । আতিয়া বেগম ঠোঁট চেপে বললেন....

" তা কাইল রাইতে ঘুম হইছে ঠিক মতো ? না মানে কাইল তো তোগো সোহাগ রাইত আছিলো ! জামাইয়ের কোলে চইড়া ঘরে আইলি, অচেতন আছিলি তো , মনে আছে কিছু ? 

শ্যামা মাথা নুইয়ে নিলো । কোলে চড়ে এসেছে মানে ? শ্যামার অবস্থা বুঝে ঠোঁট কামড়ে হাসছে শবনম আর আতিয়া বেগম । হঠাৎ খট করে দরজায় আওয়াজ হলো । সবাই চকিতে তাকালো সেদিকে । সংগ্রাম দৃঢ় পায়ে ঘরে ঢুকলো । গায়ে সেই আগের মতোই সাদা পাঞ্জাবি,পা-জামা উপরে সাদা শাল জড়ানো । পেছন পেছন মাথা নুইয়ে আরো কয়েক জন মহিলা ঢুকলো । তাঁরা বাড়ির কর্মচারী । সবার হাতেই লাল কাপড়ে ঢাকা বড় বড় থালা । সংগ্রাম ইশারা করতেই তারা সেগুলো খাটের উপরে রেখে মাথা নিচু করে পাশে গুটিয়ে দাঁড়ালো । শবনম হেসে বলল....

" এসেছো ভাই,, তোমার বউ তো তোমাকেই খুঁজছিলো !! 

সংগ্রাম নিঃশব্দে হাসলো একটু । আতিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন....

" এইসব কি...? 

সংগ্রাম ইশারা করতেই একজন এগিয়ে গিয়ে লাল কাপড় গুলো সরিয়ে দিলো । বড় বড় প্রায় সাতটা থালা । সবগুলোই দামি দামি নতুন শাড়িতে পরিপূর্ণ । আতিয়া বেগম হাসলেন এসব দেখে । সংগ্রাম গম্ভীর গলায় আদেশ করলো....

" সবগুলো আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখো । 

তড়িঘড়ি করে সেগুলো ঢুকিয়ে রাখা হলো আলমারিতে । ঘরের একপাশে শালকাঠের কারুকার্য পূর্ণ তিন তিনটা আলমারি । মাঝের টা অনেক বড় । তার দুপাশে দুটোর একটু ছোট । তার মধ্যে একটাতে সবগুলো শাড়ি ঢুকিয়ে রেখে একে একে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । এই সব শ্যামার জন্য । সেটা বুঝতে বাকি রইলো না কারোর । শ্যামা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে । শবনম বললো....

" ভাই....
তোমার বউ তো দেখি শাড়ি পড়তে পারে না । তুমি বাইরে যাও তো এখন, আমি ওকে সুন্দর করে শাড়ি পড়িয়ে সাজিয়ে নিয়ে আসছি । নিচে অপেক্ষা করছে সবাই ওর জন্য । 

আতিয়া বেগম পা বাড়াতে বাড়াতে বললেন...

" ও বাইরে যাইবো ক্যান ? হের স্বামী হয় ও । তুই বাইরে আয়,, ওয় ওর বউরে ঠিক শাড়ি পড়ায় দিবো । 

শ্যামা চকিতে তাকালো । খপ করে ধরলো শবনমের হাত । 

" আপনি এইহানে থাহেন আপা !!

সংগ্রাম পরিস্থিতি সামাল দিতে গলা খাঁকারি দিয়ে শান্ত স্বরে বলল...

" আমি যাচ্ছি, তোমরা যা করার তাড়াতাড়ি করো । 

বলেই গটগট পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে । ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হাসলো শবনম । 
সংগ্রামের পিছু পিছু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আতিয়া বেগম । শবনম দরজা চাপিয়ে নতুন একটা জামদানী শাড়ি পড়িয়ে দিলো শ্যামা কে । চোখে দিয়ে দিলো একটু কাজল । সাজাতে সাজাতে বাড়ির সবার সম্পর্কে কিছু তথ্য জানালো শ্যামা কে । 
খানিক বাদে হাতে একটা গয়নার বাক্স নিয়ে আবারো আসলেন আতিয়া বেগম । বাক্স থেকে সমস্ত গয়না খাটের উপর উপুড় করে ঢাললেন তিনি । মোটা মোটা ভারী কাজের গহনা । 
সোনা বা গহনার প্রতি কখনো কোন আগ্রহ ছিল না শ্যামার । এতগুলো গয়না দেখেও কোন উদ্বেগ জাগলো না ওর মাঝে । আতিয়া বেগম সমস্ত গয়নায় হাত বুলিয়ে ভারী শ্বাস ফেলে বললেন....

" এই গুলা আমাগো জমিদার বাড়ির বউদের গয়না । বংশোদ্ভূত ঐতিহ্য বাহী পারিবারিক গয়না,, এই গয়না গুলা দিয়া বরন কইরা নেওয়া হয় বাড়ির বউ'গো । আমারে বরন করছিলো আমার শাশুড়ি, আমি বরন করছিলাম তোর শাশুড়িরে , তোকেও আমি বরন কইরা নিলাম । 
জমিদার বাড়ির বউ খালি গায়ে থাহে না কখনো। সোনায় মুইড়া থাহে একদম । 
সংগ্রাম এই বাড়ির একমাত্র পোলা, ওর বউয়ের লাইগা তুইলা রাখছিলাম এইগুলা । তুই হের বউ, আইজ থাইকা এই গুলা তোর । 
এই হানেই শেষ নয়, আরো অনেক আছে, ঐ গুলা তোর শাশুড়ির কাছে আছে । হেয় পরে দিয়া দিবো তোরে । 

শ্যামা নীরবে শুনলো কথা গুলো । শবনম সেখান থেকে ভারী ভারী গহনা গুলো অতি যত্নে পড়িয়ে দিলো শ্যামা কে । দুহাতে মোটা মোটা দুটো রুলি - বালা, সাথে চিকন চিকন আরো অনেক চুড়ি, কানে বড় বড় কান পাশা, গলায় ভারী গহনা । সবমিলিয়ে একেবারে সোনায় মুড়িয়ে ফেলা হলো শ্যামা কে । 
ভারী শাড়ির সাথে ভারি ভারি গহনায় তলিয়ে গেছে শ্যামা । দম বন্ধ লাগছে । শরীর ভার লাগছে । একে কাল থেকে শরীর দুর্বল, তার উপর কিছু না খাওয়ার ফলে আরো বেশি ভেঙে পড়েছে শরীর । দুর্বল লাগছে ভীষণ । 
তবুও মুখে কিছু প্রকাশ না করে অনুভূতি হীন স্থির পাথরের মূর্তির মত ঠায় বসে আছে সে । সবশেষে আয়নায় নিজেকে দেখে শ্যামা, আজ পুরো অন্যরকম লাগছে নিজেকে । এই রূপে শ্যামা নিজেও কোন দিন নিজেকে দেখে নি । কপালের কাটা দাগটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এখনো । ঠোঁটের কোণ লালচে হয়ে আছে । 

শ্যামা কে সাজিয়ে ঘর থেকে বের করা হয় । রাজকীয় বিলাস বহুল জমিদার বাড়ি । ইট পাথরের তৈরি বিশাল জমিদার বাড়িতে মোগল শৈলির মিশ্রন আছে এখনো । 
এটা অন্দরমহল । দোতলা বিশাল অট্টালিকা । মার্বেল পাথরের মেঝে । ঝাড়বাতি ঝুলছে উপরে । আলোয় আলোকিত পুরো মহলের প্রতিটি কোনা । সিঁড়ি বেয়ে নিচে নিয়ে আসা হয় শ্যামা কে । অন্দরের বসার ঘরে । একপাশে খাবার টেবিল । বাড়ির কাজের মহিলারা একে একে হেঁশেল থেকে বের হয়ে খাবার সাজিয়ে রাখছে টেবিলের উপর । 
টেবিলের উপর বিভিন্ন ধরনের নানান পদের খাবার । মাঝ বরাবর একটা সিংহাসনের মতো চেয়ারে টান টান হয়ে বসে আছেন লতিফ জোয়ার্দার । স্বাস্থ্যবান সু-পুরুষ বলা চলে তাকে । চুল দাঁড়িতে পাক ধরেছে । পাশের চেয়ারে আরো একজন বসে আছে । ইনি হয়তো জুনাইদ । শবনমের বর্ননা অনুযায়ী আন্দাজ করলো শ্যামা । 
ওদের দেখে মাথা নিচু করে নিলো শ্যামা । মাথায় ঘোমটা টেনে রাখা , শ্যামা ঘোমটা টা আরো নাক অবধি টেনে নিল । 
শ্যামার দিকে ফিরে তাকালেন লতিফ জোয়ার্দার । চোখ সরু করে দেখার চেষ্টা করলেন তিনি । তার দৃষ্টি দেখে আতিয়া বেগম কিছু বলতে উদ্ধত হবেন তার আগেই শ্যামার বাহুতে হেঁচকা টান দিয়ে ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল কেউ । ভিমড়ি খেয়ে গেলো শ্যামা । বুকটা ধক্ করে উঠলো । সামনের জন ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দু'আঙুলে শ্যামার নরম চোয়াল চেপে ধরল । এদিক ওদিক করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল শ্যামা কে । আচমকা ঝাঁজিয়ে উঠলেন তিনি....

" এই মেয়ে আমার সংগ্রামের বউ ? এই কালো মেয়ে ? 
এই মেয়ে কি করে ফাঁসিয়েছিস আমার ভাতিজা কে ? বল ... বল কি এমন যাদু টোনা করেছিস যে কাউকে কিছু না জানিয়ে ও এক রাতেই তোকে বিয়ে করে নিয়ে আসলো ? বল কি করেছিস ? 

শ্যামার ঠোঁটের কোণে কাঁটা অংশে চাপ পড়ে আবারো রক্ত গড়িয়ে পড়লো । আতিয়া বেগম কপাল কুঁচকে শ্যামা কে দুহাতে টেনে নিলেন নিজের কাছে । লতিফ জোয়ার্দার পিছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন । আতিয়া বেগম বলে উঠলেন....

" এইটা কেমন ব্যবহার লতিফা ? হেয় বউ এই বাড়ির , ক্যামনে কথা কইতাছোস ওর লগে ? 

" বউ ? এই বাড়ির বউ ও ? সংগ্রামের বউ ? 
ওর কোনো যোগ্যতা আছে আমার সংগ্রামের বউ হওয়ার ? বলো আম্মাজান..? এই কালো মেয়ের কোনো যোগ্যতা আছে এই জমিদার বাড়ির বউ হবার ? 
চেহারা দেখেছো এই মেয়ের ? আরে এই মেয়ের থেকে তো আমাদের বাড়ির কাজের মেয়েদেরও চেহারা ফর্সা আছে । এই মেয়ের তো আমাদের বাড়ির কাজের মেয়ে হওয়ার ও যোগ্যতা নেই । আর ও কিনা আমাদের বাড়ির বউ ? সংগ্রাম জোয়ার্দারের বউ ?

" লতিফা....
গলা নামিয়ে কথা বল । স্বীকার করিস না করিস, ও আমার ছেলের বউ । ওকে এভাবে অপমান করার কোনো অধিকার তোর নেই । 

লতিফ জোয়ার্দারের শক্ত কন্ঠে চুপসে যায় লতিফা । লতিফ জোয়ার্দারের একমাত্র বোন লতিফা । বিয়ের বারো বছর পর স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে ছেলে মেয়ে নিয়ে জমিদার বাড়িতে আশ্রয় হয়েছে তার । আজ প্রায় আঠারো বছর থেকে এই বাড়িতেই থাকছেন তিনি । তার বড় ছেলে জুনাইদ । আর মেয়ে সুরবালা ।
লতিফ আর‌ লতিফা ব্যাতীত আতিয়া বেগমের আর কোনো সন্তান নেই ।‌ লতিফা রগচটা স্বভাবের । 
লতিফ জোয়ার্দারের শক্ত কন্ঠে বলা কথায় ও গলা নামিয়ে বলে.....

" কেনো ভাইজান ? আমার কোনো অধিকার থাকবে না কেন ? সংগ্রাম কি আমার ছেলে নয় ? ও তো আমার কাছে আমার জুনাইদের মতোই । আমার ছেলের মতোই । ওর ভালো মন্দ দেখার , বিচার করার অধিকার কি আমার নেই ? 

" ও তোর ছেলের মত, কিন্তু ছেলে নয় । ও আমার ছেলে , আর আমার ছেলে নিজের ভালো মন্দ বোঝে । ও বিয়ে করেছে এই মেয়ে কে , এই মেয়ে ওর বিয়ে করা বউ ।
জোয়ার্দার বাড়ির একমাত্র বউ ও ।‌ সংগ্রাম জোয়ার্দারের বউ ।‌ আগামির জমিদার গিন্নি । ওর বিষয়ে আর একটা বাজে মন্তব্য শুনতে চাই না আমি । 

শ্যামা ছলছল চোখে তাকালো লতিফ জোয়ার্দারের দিকে । গ্রামের জমিদার হিসেবে তার দয়া, ভালো মানুষির কথা অনেক শুনেছে । আজ দেখেও নিলো । টুপ করে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো শ্যামার চিবুক বেয়ে । লতিফা গজগজ করতে করতে বললেন....

" আমার অধিকার নাই থাকতে পারে । কিন্তু ভাবির অধিকার আছে । সংগ্রামের গর্ভধারিনী মা ভাবি । ভাবি কিছুতেই এই কালো মেয়ে কে নিজের ছেলের বউ হিসাবে মেনে নেবে না । 

আতিয়া বেগম শান্ত কন্ঠে বললেন....

" মাইনা নিবো না মানে ? ডাক বৌমা রে...
আমিও দেহি ক্যামনে মাইনা না নিয়া থাকতে পারে ? 

লতিফা মুখ ঝামটা দিয়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে চলে যান ।‌ হেঁশেলের দরজার পাশে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সমস্ত কাজের লোক । সবার সামনে লজ্জায় মাথা নুইয়ে আছে শ্যামা । নিজেকে বিকৃত মনে হচ্ছে তার । শবনম শ্যামার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় শান্তনা দিয়ে এগিয়ে গেলো টেবিলের দিকে । প্লেট উল্টে দিলো ভাত বাড়ার জন্য । খাওয়ার সময় এখন সবার । বাড়ির পুরুষেরা আগে খাবার খেয়ে উঠে যায়, তার পর মহিলারা খেতে বসে । একেবারে কড়াকড়ি নিয়ম নয় । তবে এটাই মানে সবাই । বাড়িতে পুরুষ বলতে তো কেবল তিন জন । সংগ্রাম, জুনাইদ আর লতিফ জোয়ার্দার । 
শবনম প্লেটে ভাত দেওয়ার আগে হাত উঁচিয়ে বাঁধ সাধে লতিফ জোয়ার্দার । তিনি শ্যামার পানে তাকিয়ে নরম কন্ঠে ডাকলেন....

" শ্যামা...
এদিকে এসো তো আম্মা ! দেখি আমার বউ মা কে । আজ আমার বউ মার প্রথম দিন এই বাড়িতে , ঐ খাবার পরিবেশন করবে সবাইকে । 

শ্যামা করুন চোখে চেয়ে রইল । ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো টেবিলের দিকে । লতিফ জোয়ার্দার হাত রাখলেন শ্যামার মাথায় । আদুরে কন্ঠে বললেন....

" লতিফার কথায় কিছু মনে করো না আম্মা । ও একটু কড়া স্বভাবের । মুখের উপর কথা বলে দেয় । হঠাৎ তোমাদের বিয়েটা হয়েছে তো , তাই তোমার শাশুড়ি আর ফুফু শাশুড়ির মানতে একটু কষ্ট হচ্ছে । ওদের সময় দাও একটু, সব ঠিক হয়ে যাবে । তোমার শাশুড়ি নিচে আসবে এক্ষুনি, যদি কিছু বলে তাহলে কিছু মনে করো না । 

শ্যামা মাথা দোলালো । লতিফ জোয়ার্দার মুচকি হাসলেন । 

" আমার কোনো মেয়ে নেই মা ,, তুমি আমার মেয়ে হয়েই থাকবে এই বাড়িতে । 
নিজের বাবাকে ছেড়ে এসেছো, আমাকে না হয় তার স্থান দিও । বাবা মনে করো আমায় ‌।

শ্যামার চোখ ভিজে আসলো এবার । ওর বাবা ? বাবার ভালোবাসা তো কখনো পায় নি ও । ওর আব্বার জন্যই তো এসব হয়েছে ‌। 
লতিফ জোয়ার্দার বসলেন আবারো...
পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলো আতিয়া বেগম । সংগ্রামের দেখা নেই । শ্যামা ঘাড় ঘুরিয়ে চোরা চোখে এদিক ওদিক তাকালো ।‌
খাবার টেবিলে বসে আছে তিন জন । খাবার বেড়ে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে তারা । শ্যামা নিঃশব্দে ভাতের বাটি হাতে নিলো ‌। একহাতা ভাত তুলে দিলো লতিফ জোয়ার্দারের প্লেটে । অমনি বিকট ঝনঝনে শব্দে আঁতকে উঠলো সে । টেবিলের উপরে রাখা সমস্ত খাবারের বাটি ঝনঝন শব্দ তুলে নিমিষেই গড়িয়ে পড়লো শান বাঁধানো মেঝেতে । চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো সবাই । শ্যামা সিটিয়ে গেলো পিছনে । চোখ তুলে তাকালো সবটা বোঝার জন্য । টেবিলের অপর পাশে রক্ত চক্ষু নিয়ে শ্যামার দিকে তাকিয়ে আছে সালেহা জোয়ার্দার অর্থাৎ সংগ্রামের মা । তার পিছনে আছেন লতিফা । লতিফার মুখে বক্র হাসি । শ্যামা ঢোক গিললো সালেহা কে দেখে । লতিফ জোয়ার্দার স্বশব্দে উঁচু স্বরে বললেন....

" এটা কি ধরনের ব্যবহার সালেহা ? কি করলে এটা তুমি ? 

" এই মেয়ে এই বাড়িতে কি করছে এখনো ? ওকে কেউ বের করে দেয় নি কেনো এখনো ? এই মেয়ে বের হ আমার বাড়ি থেকে । কোন অধিকারে এই বাড়িতে এখনো আছিস তুই ? বের হ..

বলতে বলতে শ্যামার দিকে গটগট করে এগিয়ে ওর বাহু ধরে এক টানে সদর দরজার দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো সালেহা । শাড়িতে পা জড়িয়ে পড়তে পড়তেও বেঁচে যায় শ্যামা । কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে এক ধাক্কায় শ্যামা কে সদর দরজার বাইরে ছুড়ে মারে সালেহা । হুমড়ি খেয়ে কারোর প্রশস্ত বুকের উপর আছড়ে পড়ে শ্যামা । এমনিতেই কাল থেকে কিছু খাওয়া হয় নি । কাল খেয়েছে সেই সকালে । শরীরে জোর নেই । দূর্বল শরীরে লুটিয়ে পড়ে শ্যামা । 
সামনের জন দুহাতে আগলে নেয় শ্যামা কে । শ্যামা মাথা তুলে ভেজা নিভু নিভু নয়নে তাকায় । সংগ্রাম কে দেখে এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে সালেহা বেগম বলে ওঠেন....

" তুই এসেছিস বাবা ? এই মেয়ে কে বের করে দে এক্ষুনি ! ওকে সহ্য হচ্ছে না আমার ! মানি না আমি ওকে । এই মেয়ে আর এক মুহূর্তও যেনো এই বাড়িতে না থাকে ! 

সংগ্রাম শ্যামা কে দাঁড় করায় । ওর হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে আসে । জোরালো কন্ঠে বলে...

" ও কোথাও যাবে না আম্মা । ও আমার স্ত্রী , এই বাড়িতেই থাকবে ও ! 

" নাহ.. 
ও থাকবে না এই বাড়িতে । এই কালো মেয়ে কে তোর বউ হিসেবে মানি না আমি । এই সামান্য মাছ ধরা জেলের মেয়েকে মানি না আমি । 
তুই জানিস, ওর বিয়ে ভেঙেছিল একবার , লগ্নভ্রষ্ঠা ও । এই মেয়ে কে কিছু তেই মানবো আমি । 

" আমি মানি ওকে , আর সবটা জেনেই ওকে বিয়ে করেছি আমি । 
তিন কবুলে বিয়ে করা সহধর্মিণী ও আমার । কালিমা পড়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি আমরা । ও আমার বিবাহিত স্ত্রী । আমার আমানত । 

কথা শেষ করেই শ্যামার দিকে তাকালো সংগ্রাম 
। শ্যামার চোখ নিভে আসছে । অসার হয়ে আসছে পুরো শরীর । দুর্বলতায় পা ভেঙ্গে লুটিয়ে মাটিতে পড়তে নেয় শ্যামা । তবে মাটিতে পড়ার আগেই ওকে আবারো দুহাতে আগলে নেয় সংগ্রাম । 
আতিয়া বেগম আর শবনম দৌড়ে আসেন শ্যামার কাছে । সংগ্রাম শ্যামার গালে হাত রেখে আলতো চাপড় দিয়ে ডাকে.....

" এই মেয়ে... কি হলো তোমার ? 
ওঠো... চোখ খোলো । 
শ্যামা, এই শ্যামা...

" নাত বৌ ও নাত বৌ, কি হইলো তোর ? 
দাদুভাই.. নাত বৌ যে ঘরে লইয়া যা তাড়াতাড়ি...

সংগ্রাম তড়িঘড়ি করে কোলে তুলে নেয় শ্যামা কে । আশেপাশে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ঘরে চলে যায় । এদিকে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে ওঠেন সালেহা । লতিফা আগুনে ঘি ঢালার মতো করে খুঁচিয়ে বলে....

" দেখছো ভাবি...
এক রাতেই তোমার ছেলে কে কেমন হাত করেছে । সংগ্রাম কেমন মুখে মুখে তর্ক করলো ঐ মেয়ের জন্য । ঐ মেয়ে কে আর থাকতে দিও না এই বাড়িতে । নয়তো কদিন পর তোমার দিকে ফিরেও তাকাবে না তোমার নিজের ছেলে । এর থেকে তো আমার মেয়ের সাথে.....

পুরো কথা শেষ করতে পারলো না লতিফা । তার আগেই সালেহা তড়বড় পায়ে উঠে গেল নিজের ঘরে । ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকালো লতিফা । 
এদিকে শ্যামা কে ঘরে এনে খাটের উপর শুইয়ে দিয়েছে সংগ্রাম । শবনম তড়িঘড়ি করে শ্যামার মুখে পানি ছেটালো । আতিয়া বেগম এক নাগাড়ে ডেকেই যাচ্ছে তখন থেকে । সংগ্রাম পাশে চঞ্চল চোখে চেয়ে আছে শ্যামার পানে । 
পানির ছেটায় চোখ মুখ কুঁচকালো শ্যামা । অর্ধভেজা চোখ দুটো টেনে টুনে খুললো ‌। ওঠার চেষ্টা করলো, পারলো না । শবনম কাঁধ জড়িয়ে টেনে তুললো ওকে । 

" ঠিক আছো তুমি ? 

শ্যামা মাথা নাড়ালো । মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না । পেট চেপে বসে রইল শ্যামা । সংগ্রাম গম্ভীর গলায় বলে উঠলো...

" মুখ দিয়ে কথা বের হয় না তোমার ? 
কথা বলতে পারো না তুমি ? সবসময় এতো চুপচাপ থাকো কেনো তুমি ? 

শ্যামা সরে আসলো শবনমের কাছে । শবনম শ্যামার কাঁধে হাত রাখলো...

" আহ্ ভাই.. 
বকো না তো মেয়ে টাকে ! এমনি তেই আম্মা আর মামি অনেক কথা শুনিয়েছে ওকে । 
ঠোঁট টা কেটে গেছে আবারো ‌। 
কষ্ট হচ্ছে বোন...? 

শ্যামা দুদিকে মাথা নাড়ালো । সংগ্রাম তীক্ষ্ণ সরু চোখে চাইলো আবারো । শ্যামা মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে লজ্জা খুইয়ে নির্লজ্জের মতো বলল....

" ক্ষু...ক্ষুধা লাগছে আমার ! 
কাইল থাইকা কিছু খাই নাই ...!



চলবে..........
 


 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×