লেখিকা:সুরভী আক্তার
পর্ব :১৫
_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_-_
" মানে ?
শ্যামার প্রশ্নে শব্দ করে অদ্ভুত হাসলো বালা । এগিয়ে গিয়ে হাতের খাবারের প্লেট টা খাটের পাশের টেবিলের উপর রাখলো । এক পলক দেখলো আগে রেখে রেখে যাওয়া খাবারের প্লেট টার দিকে । সেটা এখনও ঢাকনা দেওয়া অবস্থায় পড়ে আছে । এবার শ্যামার দিকে ফিরলো বালা । কৃত্তিম হাসলো মনে হলো । যে হাসিতে কোন প্রাণ নেই । কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো....
" বললাম, তুমি অনেক ভাগ্যবতী । আগে কখনো কোনো ভাগ্যবতী দেখি নি তো । এই প্রথম দেখলাম । তোমার মতোই হয় বুঝি ভাগ্যবতীরা ?
" কে বললো আমি ভাগ্যবতী ? আমাকে কোন দিক দিয়ে মনে হলো তোমার ?
" ওমা... কে আবার বলবে ? আর মনে হওয়ার কি আছে ? তুমি তো ভাগ্যবতী , আর তুমি যে কতটা ভাগ্যবতী সেটা তুমি নিজেও জানো না !
বালা'র কথাগুলো কম্পিত শোনালো । হাসলো শ্যামা । সে নাকি ভাগ্যবতী ? তাচ্ছিল্যের স্বরে শ্যামা বললো....
" আমার জীবন, আমার ভাগ্য সম্পর্কে কতটুকু জানো তুমি ?
'' জানি না তো । আমি তোমার অতীত সম্পর্কে জানি না । তবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানি । অতীত দিয়ে কি হবে , তোমার ভবিষ্যৎ তো উজ্জ্বল ।
" জমিদারের ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে বলে আমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ?
" উহুম.. একদম না । জমিদারের ছেলে নয় , সংগ্রাম জোয়ার্দারের সাথে বিয়ে হয়েছে বলে তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল । তাই তো ভাগ্যবতী বললাম , সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগমের অধিকার পেয়েছো তুমি, স্থান পেয়েছো তার জীবনে । এটা ক'জনে পায় বলোতো ? সবাই তো শুধু স্বপ্ন দেখতে পারে , বাস্তবে পায় ক'জনে ?
শ্যামা প্রতি উত্তরে কি বলবে বুঝতে পারলো না । কি বলা উচিত ওর ? এদিকে বালা ধারালো দৃষ্টিতে চেয়ে আছে । চেয়ে থেকেই বলল...
" সেই সকালে খাবার রেখে গেছে , খাও নি কেনো ?
" ক্ষিদে পায় নি ..
ভেজা কন্ঠে উত্তর করলো শ্যামা । বালা হেসে অদ্ভুত স্বরে বলল...
" বসতে পারি তোমাদের খাটে ?
" এভাবে বলছো কেনো ? অনুমতি নিতে হবে না !
শব্দহীন ভাবে খাটে বসলো বালা । বিছানায় হাত বুলিয়ে অসার কন্ঠে বললো....
" সৈকত জ্বালাতন করছে খুব । ভাবি সময় পাচ্ছে না তোমার কাছে আসার । তাই আমি আসলাম । দুদিন হলো তোমাদের বিয়ে হয়েছে , এই বাড়িতে এসেছো দুদিন আগে অথচ একটা বারও দেখা হয় নি তোমার সাথে । কি বলো তো.. দুদিন ধরে একটু কষ্টে ছিলাম তাই আসি নি ।
শ্যামা পাশে বসলো । অবাক স্বরে নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করলো...
" তোমার জীবনেও কষ্ট আছে ? কিসের কষ্ট তোমার ?
" আগে তো ছিল না কষ্ট ! জানো.. দুদিন ধরে খুব কষ্ট হচ্ছে । খুব বেশিই কষ্ট হচ্ছে ! বুকটা ফেটে যাচ্ছে মনে হচ্ছে । গলায় দম বন্ধ হয়ে আসছে । কষ্ট হলে এমন হয় বুঝি ? আগে তো কখনো কষ্ট পাই নি, তাই জানতাম না । সুখের যে এতো মূল্য সেটা দুঃখ না আসলে জানতামই না ।
জড়ানো কন্ঠে কথা গুলো বলতে বলতে চোখ ভরে উঠলো বালা'র । শ্যামা কিঞ্চিত ভ্রু কুঁচকালো । এতো সুন্দর মেয়েটার চোখে পানি একদম মানাচ্ছে না । বড্ড বেমানান দেখাচ্ছে ! কি এমন কষ্ট ওর ? বালা কে দেখে মায়া লাগলো শ্যামার । সে আলতো হাত বাড়িয়ে মুছিয়ে দিলো ওর চোখের পানি । শ্যামার স্পর্শে বালা কোমল দৃষ্টি পাত করলো শ্যামার দিকে । শ্যামা ঠোঁট প্রসারিত করে বললো...
" তুমি আমার বয়সী হবে তাই না ? আমাকে বলতে পারো কি হয়েছে তোমার ? তোমার চোখে পানি একদম মানাচ্ছে না । চোখের নিচেও কেমন কালি পড়েছে , ঘুমাও নি ?
আবারো কোন প্রকার দ্বিধা ব্যতীত সহজ সরল উত্তর করলো বালা....
" উঁহুম.. ঘুমাই নি তো । দুদিন ধরে ঘুমাই নি , ঘুম ধরাই দেয় নি চোখে । একজন মানুষ যখন খুব বেশি সুখে থাকে তখন অতিরিক্ত কামুকতা আর সুখের চিন্তায় তার ঘুম হয় না তার । আর একজন মানুষ যখন খুব বেশি কষ্টে থাকে তখন বুকের উপর যে পাথর চাপা থাকে সেই পাথরের ভারে ঘুম ছুটে যায় তার । নিঃশ্বাস আটকে আসে । আমার সমস্যা দ্বিতীয় টা, তাই ঘুম হয় নি ।
শ্যামা আবারো অবাক হলো । বালার কথা গুলো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে ওর । সহজ সরল উত্তর হলেও কথা গুলোর মারপ্যাঁচ বোধগম্য হচ্ছে না শ্যামার । শ্যামা হাসার চেষ্টা করলো । মন বললো কিছু একটা । বালা কে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করালো শ্যামা । মেয়েটা আসলেই অনেক সুন্দর । শ্যামা সময় নিয়ে কথা ঘোরালো..
" তুমি অনেক সুন্দর বালা । আমি...
" সুন্দর হয়ে কি লাভ হলো ? তোমার কাছেই তো হেরে গেলাম ।
শ্যামার কথা শেষ করার আগেই তৎক্ষণাৎ শান্ত কন্ঠে কথাটা বললো বালা । শ্যামার কপালে ভাঁজ পড়লো আপনা আপনি । দৃষ্টি স্থির হয়ে আসলো । শ্যামার চাহনি দেখে বালা গাঁ দুলিয়ে শব্দ করে হাসলো । শ্যামা চেয়ে থেকেই অবাক স্বরে প্রশ্ন করলো....
" হেরে গেলে ?
বালা চোখের কোনের পানি টুকু মুছে ভাবেলাশ হীন হয়ে বললো...
" গেলাম না , গেলাম তো । বিভৎস ভাবে হেরে গেলাম । এসব বাদ দাও তো । তুমি শুনে রাখো.. তোমার জমিদার স্বামী কিন্তু যে সে ব্যক্তি নন । তার আলাদা আলাদা অনেক পছন্দ অপছন্দ আছে । ভাবি বললো সবটা তোমাকে বুঝিয়ে দিতে । কতদিন আর অন্যের বোঝা নিজের পুঁটলিতে বহন করবো বলো তো । সংগ্রাম জোয়ার্দারের ঘুম থেকে উঠার পর ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই নিজস্ব নিয়ম আছে । এই যেমন ধরো, সকালে ঘুম থেকে উঠার পর তার এক কাপ গরম চা না হলে চলে না । এটা দিয়েই শুরু হয় তার জীবন । তার পর খাবার, সকালের খাবার তিনি সবার সাথেই খান তাই আর আলাদা করে কিছু করার নেই এখানে । তার পর সারাদিন বাড়িতে থাকেন না । যেদিন থাকেন সেদিন আলাদা বিষয় । এখন তো বউ হয়েছে, আগের অভ্যাস বদলাবে নিশ্চয়ই । শুনলাম গত দু'রাত বের হয় নি বাড়ি থেকে । অভ্যাসের পরিবর্তন এসেছে এখন থেকেই । তার পর শুনে রাখো -- তোমার স্বামীর প্রিয় খাবার হলো, গরম ভাত আর মাছের ঝোল । সাথে যেকোনো ভর্তা । এটা হলেই তিনি খুশি । তবে হ্যাঁ , চিংড়ি মাছে এলার্জি আছে তার । সব ভুললেও এটা ভুলো না কখনো । শনি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত তিনি সাদা পাঞ্জাবির সাথে কালো শাল পড়েন , আর বুধ থেকে শুক্রবার পর্যন্ত কালো পাঞ্জাবির সাথে সাদা শাল পড়েন । এটা তার পোশাকের সূচি । গোসলের আগে খাটের উপর তার জন্য পোশাক বের করে রাখতে হয় । এদিক ওদিক হলে চটে যান তিনি । সবসময় ঘর গোছানো পরিপাটি করে রাখতে হয় । এলোমেলো একদম পছন্দ করেন না তিনি । আর বাকি রইলো রাতের খাবার , সেটা বাড়ির কারোর সাথেই খান না তিনি । বাইরে থাকেন, খাবেন কি করে ? তার জন্য আলাদা করে খাবার সাজিয়ে রেখে যেতে হয় । এদিকে আবার ঠান্ডা খাবার খেতে পারেন না , গরম করে দিতে হয় । ঘুমানোর পর একটা বাড়তি আওয়াজও পছন্দ নয় তার । এসব মাথায় রেখো , এতদিন বৃথা সামলেছি এসব দায়িত্ব । ভাবিনি কখনো এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবো । কিন্তু দেখো , পেয়ে গেলাম । আজ থেকে সব দায়িত্ব তোমার । ঠিকঠাক ভাবে সামলে রেখো তাকে ।
বিরতিহীন সব কথা গুলো বলল বালা । শ্যামা আশ্চর্য নিগুড় চোখে চেয়ে আছে । শ্যামার চাহনি দেখে ওর চোখে চোখ রাখলো বালা । চোখ টলমল করছে পানিতে । গলা কাঁপছে । কম্পিত আহত স্বরে বলল...
" কি দেখছো ?
শ্যামা নির্বিকার জবাব দিলো...
" জানি না ,, কিন্তু তোমার উপর চোখ আটকে যাচ্ছে বারবার ।
হাসলো বালা । প্রশ্ন করলো ..
" সৌন্দর্যে ?
উত্তর করলো না শ্যামা । সে একই ভাবে চেয়ে আছে । বালা আবারো আহত স্বরে বলল...
" বাইরের সৌন্দর্য দেখলে , অথচ ভিতরের কষ্টটা দেখলে না ? তুমিও কিন্তু কম সুন্দর নও, তোমার মতো শ্যাম কন্যার সৌন্দর্য আর ভাগ্য এমন হবে জানলে আগেই আল্লাহর কাছে একটু কম সৌন্দর্য আর প্রশন্য ভাগ্য চেয়ে নিতাম । সৌন্দর্য দিয়ে কি হয় , যদি নসিব সুন্দর না হয় । আমার এই সৌন্দর্য দিয়ে কি হলো বলো তো, যা চাইলাম - যাকে চাইলাম সে তো হলো না আমার, সে কখনো আকৃষ্ট হলো না আমার সৌন্দর্যে ।
শ্যামা এবার নড়ে উঠলো । বুকটা কেমন ধক্ করে উঠলো । আন্দাজ করলো কিছু একটা । সে সহসা বালা'র হাত দুটো আঁকড়ে ধরল । শ্যামার ঠান্ডা হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠলো বালা । শ্যামা অনুভব করলো বালার শরীরের তাপমাত্রা । প্রচন্ড গরম হয়ে আছে ওর হাত দুটো । শ্যামা তাৎক্ষণিক ওর কপালে আর গলায় হাত ছোঁয়ালো । উদ্বিগ্ন স্বরে বলল...
" তোমার তো জ্বরে গাঁ পুড়ে যাচ্ছে বালা । হায় আল্লাহ, তুমি বলো নি কেনো ? এতো টা জ্বর এসেছে তোমার ! ঔষধ খাও নি । দেখি দেখি, তুমি এখানে বসো আমি ঔষধ দিচ্ছি তোমায় ।
বলেই বসা থেকে উঠলো শ্যামা । তড়িঘড়ি করে পা বাড়ালো । ওর জ্বরের সময় কিছু ঔষধ এনে দেওয়া হয়েছিল ওকে, জ্বর ঠিক হওয়ায় সেগুলো আর কাজে আসে নি । শ্যামা পা বাড়ানোর আগে বালা ওর হাত ধরলো পিছন থেকে । আধো ভেজা চোখে চেয়ে নিচু স্বরে বলল...
" ঔষধ দিতে হবে না । জ্বর এমনিতেই সেরে যাবে । তুমি একটু বসো আমার কাছে । তোমায় একটু ভালো করে দেখি.. তুমি তো বললে যে তুমি আমার বয়সী, তাহলে তো তুমি আমার বোনের মতো । আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবে ? জানো আমার না খুব কষ্ট হচ্ছে , বুকটা ফেটে যাচ্ছে , কাউকে বলতে বা বোঝাতে পারছি না আমি যে আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে । আমাকে বোঝার মতো কেউ নেই। আমি কাকে বলবো আমার কষ্ট হচ্ছে ? আমি যে শেষ হয়ে যাচ্ছি । তুমি একটু থাকো আমার কাছে । তোমাকে দেখে ভালো লাগছে ।
শ্যামা আচমকা জড়িয়ে ধরলো বালা কে । নিজের বুকেও কষ্ট অনুভব হচ্ছে ওর ।
★
একেবারে এশা'র আজানের পর বাড়ি ফেরে সংগ্রাম । চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হলেও জমিদার বাড়ি বরাবরের মতো আলোকসজ্জায় আলোকিত । দিন রাতের পার্থক্য বোঝার উপায় নেই বাড়ির ভেতর থেকে । সারাদিন বাড়ি ফেরে নি, বাইরেও খাওয়া হয় নি তেমন কিছু । ক্লান্ত হয়ে আছে পুরো শরীর । সংগ্রাম কোন রকমে ধীর গতিতে পা দুটোকে টেনে টুনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে । রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে সবার । নিচে কেউ নেই । যে যার ঘরে আছে । সংগ্রাম গায়ের চাদর খুলতে খুলতে দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে । সামনে খাটের উপর নজর যেতেই আঁতকে ওঠে , খাটের উপর শ্যামা নেই । সংগ্রাম চঞ্চল চোখে এদিক ওদিক চোখ ঘোরায় । ঘরের কোথাও নেই শ্যামা । গোসল খানাতেও নেই । খাটের পাশের টেবিলের দুটো খাবারের প্লেট ঢেকে রাখা । সংগ্রাম ঢোক গিলে দ্রুত বারান্দার দিকে এগোয়, আবছা অন্ধকার বারান্দায় । সেখানেও শ্যামা নেই, শীত পড়ছে, নিচ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার হাক ডাক ভেসে আসছে । সংগ্রাম ভড়কে যায় এবার । বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে । ঘরের কোথাও নেই শ্যামা । সংগ্রাম তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে আতিয়া বেগমের ঘরের দিকে এগোয় । তার ঘরের দরজা চাপানো ছিল, সংগ্রাম দরজা হালকা ফাঁক করে উঁকি দেয় ঘরের ভেতর । উল্টো পিঠ ফিরে শুয়ে আছেন আতিয়া বেগম, ঘুমিয়েছেন হয়তো । এখানেও শ্যামা নেই । ভয় বারে সংগ্রামের , সে সমস্ত ক্লান্তি ভুলে দ্রুত শবনমের ঘরের দিকে এগোয়, ওর ঘরের দরজা ভেতর থেকে লাগানো, জুনাইদ বাড়িতে আছে । তার মানে এখানেও নেই শ্যামা । পুরো শুনশান অন্দরে ধুপধাপ পা ফেলে মুহুর্তেই সবখানে খোঁজা শেষ শ্যামা কে , রান্না ঘর , বসার ঘর , কোথাও নেই শ্যামা । সংগ্রাম শুকনো ঢোক গিলে গলা ভেজানোর চেষ্টা করে । কপাল ও নাকের ডগায় ঘাম জমেছে বিন্দু বিন্দু । শরীর বেয়ে শিরশির করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে এই ঠান্ডা'তেও । হাঁসফাঁস করছে সে । একহাত কোমরে রেখে আরেক হাত দিয়ে নিজের ঘাঢ় চেপে ধরল সংগ্রাম । জোরে জোরে শ্বাস টানলো । কিছু একটা ভেবে আবারো দ্রুত উঠলো উপরে । সব ঘর খোঁজা শেষ , বালার ঘর বাকি । সংগ্রাম এবার থামলো বালার ঘরের সামনে । দরজা চাপানো , কাঁপা হাতে হালকা চাপ দিয়ে ফাঁক করলো দরজাটা । অমনি শিথিল হয়ে আসলো পুরো শরীর । চোখ বন্ধ করে বুকে হাত রেখে লম্বা শ্বাস টানলো সংগ্রাম । দরজা বরাবর সোজা খাটের উপর পিছন দিকে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছে শ্যামা । চোখ দুটো বন্ধ । ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো । বালা কম্বল মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে । শ্যামার এক হাত বালার মাথায় । বালার কপালে জ্বর পট্টি । সংগ্রাম নিঃশব্দে পা ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় খাটের দিকে । দুই রমনীর গরম নিঃশ্বাসে গুমোট হয়ে আছে পুরো ঘর । সংগ্রাম খাটের পাশে দাঁড়িয়ে শ্যামার ঘুমন্ত মুখশ্রীর পানে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । চোখ ফিরিয়ে বালার দিকে তাকালো । জ্বর এসেছে মেয়েটার , দুদিন ধরে সংগ্রামের চোখের সামনে পড়ে নি বালা । সংগ্রাম ও নিজে থেকে কোন প্রকার খোঁজ নেয় নি একবারও । জ্বরের ঘোরে ভারী ভারী শ্বাস ফেলছে মেয়েটা । মুখটা কেমন মলিন দেখাচ্ছে । সংগ্রাম পিছনে হাত গুটিয়ে কিছু মুহূর্ত চেয়ে থাকলো । খাটের পাশের টেবিলের দিকে নজর পড়লো এবার । এখানেও দুটো প্লেটে খাবার ঢেকে রাখা । তারমানে দুজনের কেউই এখনো খাবার খায় নি । শ্যামার দিকে আবারো দৃষ্টি ফেরালো সংগ্রাম, অতঃপর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে ডাকলো....
" শ্যামা.. এই শ্যামা । ওঠো..
নড়ে উঠলো শ্যামা । পিটপিট করে চোখ খুললো । ঝাপসা নিভু চোখে সামনে সংগ্রাম কে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে তৎক্ষণাৎ উঠে বসলো । নিজের দিকে একবার চেয়ে পাশেই চোখ ফেরালো বালার দিকে । বিভোর হয়ে ঘুমিয়ে আছে ও । শ্যামা হাত বাড়িয়ে কপাল থেকে জ্বর পট্টি নামিয়ে হাত ছোঁয়ালো ওর কপালে । জ্বর নেমেছে একটু । আগের তুলনায় শরীরের তাপমাত্রা কম । শ্যামা নিশ্চিন্ত হয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো । এবার চোখ ফেরালো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম ভ্রু উঁচু করে তাকিয়ে ছিল বালার দিকে, শ্যামা চোখ ফেরাতেই সেও তাকালো শ্যামার দিকে । চোখাচোখি হলো দুজনের । বরাবরের মতো সংগ্রামের তীক্ষ্ণ নিরেট দৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না শ্যামা । চোখ সরিয়ে নিল সে । স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো....
" আপনি এখানে ?
" ঘরে ছিলে না কেনো ? এখানে না থেকে ওকে নিয়ে নিজের ঘরেও থাকতে পারতে । জানো আমি কতটা ভয় পেয়ে গেছিলাম তোমাকে ঘরে না পেয়ে !
খানিক কাতর শোনালো সংগ্রামের কথা গুলো । চোখ তুললো শ্যামা । প্রশ্ন করলো...
" আপনি ভয় ও পান ?
পল্লব ঝাপটে কথা ঘোরালো সংগ্রাম...
" খাও নি এখনো..?
" নাহ..!
" বালা খেয়েছে ?
" না..!
" ঘরে চলো..!
" আমি এখানেই থাকবো !
তাৎক্ষণিক জবাবে দৃষ্টি নিরেট করলো সংগ্রাম । কন্ঠে গম্ভীরতা টেনে বললো...
" দেখো, কথা বাড়িও না । ক্লান্ত লাগছে আমার , আর ভীষণ ক্ষিদেও পেয়েছে । সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয় নি । একটু সময় আমার কাছে থেকে আবার চলে এসো, বাঁধা দেবো না ।
দৃষ্টি শীতল হলো শ্যামার । কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো...
" পোশাক বের করা আছে আপনার । আপনি ঘরে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নিন । আমি আসছি...
শ্যামার কথার বিপরীতে আর কথা বাড়ালো না সংগ্রাম । এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । সংগ্রাম বের হতেই পিটপিট করে চোখ খুললো বালা । গরম নোনতা জল গড়ালো চোখের কর্নিশ বেয়ে । মুহুর্তেই মুছে ফেললো সেটা । ধীরে ধীরে উঠে বসলো । শ্যামা চোখ ফিরিয়ে বালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল...
" উঠে পড়েছো ? ক্ষিদে পেয়েছে না ? খাও নি তো ! আমি খাইয়ে দেই ?
" দাও...
নরম কন্ঠে উত্তর করলো বালা । শ্যামা মুচকি হাসলো । হাত ধুয়ে কয়েক লোকমা খাইয়ে দিল বালা কে । দু একবার খেয়ে নাক সিকেয় তুললো বালা । জ্বরের জন্য স্বাদ লাগছে না মুখে । তেঁতো লাগছে সবকিছু । আর খেতে পারলো না । হাত দিয়ে ইশারা করলো সে আর খাবে না । শ্যামাও জোর করলো না । হাত ধুয়ে যত্ন সহকারে মুখ মুছিয়ে দিলো বালার । মোলায়েম কন্ঠে বলল...
" তুমি শুয়ে পড়ো, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি ।
" তার আর প্রয়োজন হবে না , এতো যত্ন করে কি হবে ? তোমার স্বামী ডেকে গেলো তো তোমায়, যাও তার কাছে । আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না । আমি ঠিক আছি...
অপ্রস্তুত হয়ে পরলো শ্যামা । হাসার চেষ্টা করে বললো...
" তুমি ঘুমাও তার পর যাচ্ছি !
" উহুম.. এক্ষুনি যাও , আর হ্যাঁ, আর আসতে হবে না তোমায় । তুমি যাও আমি দরজা লাগিয়ে ঘুমাবো ।
শ্যামা কথা বাড়ালো না । খানিক চেয়ে থেকে নামলো খাট থেকে । দরজা পর্যন্ত এগোতেই পিছু পিছু আসলো বালা । শ্যামা দরজার চৌকাঠ পেরোতেই খট করে দরজা লাগিয়ে দিল সে । চমকে উঠে পিছন ফিরলো শ্যামা । বালা দরজা লাগিয়েই ছুটে এসে আছড়ে পড়ল খাটের উপর । বালিশ মুখে গুজে ডুকরে কেঁদে উঠলো । দম আটকে আসছে ওর । গলায় শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে । ওর ফোপানোর শব্দ দরজা পেরিয়ে পৌঁছে গেল বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামার কানে । চোখ মুখ স্থির হলো শ্যামার । হাত পা শিরশির করে উঠলো । খানিক ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল সে । তার পর পা বাড়ালো নিজের ঘরের দিকে । সংগ্রাম হাত মুখ ধুয়ে পোশাক পরিবর্তন করে বসে আছে খাটের উপর । শ্যামা ঘরে ঢুকতেই একটা তীব্র ঝাঁজালো গন্ধ নাকে বিধলো । তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ করে নিলো সে । অনুভব করলো সেই আধো পরিচিত আতরের গন্ধ টাকে । খানিক সময় দাঁড়িয়ে রইল সেভাবেই । অতঃপর ভিতরে ঢুকলো । শ্যামা ঢুকতেই সংগ্রাম তাকালো ওর দিকে । কপাল কুঁচকে শক্ত গলায় প্রশ্ন করলো...
" সকাল থেকে খাও নি ?
" না...
সাবলীল ভাবে উত্তর করলো শ্যামা । সংগ্রাম হতাস শ্বাস ফেললো । পা টলছে শ্যামার । সারাদিন না খেলে যা হয় আর কি । সংগ্রাম লক্ষ্য করে মিহি স্বরে ডাকলো...
" এদিকে এসো ।
এগিয়ে গেল শ্যামা । সংগ্রাম খাবারের প্লেট হাতে তুলতেই শ্যামা বলে উঠলো...
" দিন গরম করে আনছি । এগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে । শুনলাম ঠান্ডা খাবার খেতে পারেন না আপনি ।
চোখ তুললো সংগ্রাম । নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল..
" দরকার হবে না । খেতে পারবো । বসো তুমি, হাঁ করো...
বলতে বলতে এক লোকমা ভাত ধরলো শ্যামার সম্মুখে । মুখ ফিরিয়ে নিলো শ্যামা । তপ্ত স্বরে বলল...
" আমার ক্ষিদে নেই , আপনি খান ।
" সকাল থেকে খাও নি কিছু , ক্ষিদে নেই কেন ? জেদ দেখাচ্ছো আমার উপর ? আমাকে টপকাতে চাইছো ?
" আপনাকে টপকানোর মতো শক্তি বা সাহস কোনো টাই নেই আমার ।
" তাহলে যা বলছি তাই শোনো । চুপচাপ খেয়ে নাও । বেশি কথা বলতে ভালো লাগছে না আমার ।
" খাবো না আমি..!
এবার চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো সংগ্রামের । চোখ মুখ শক্ত করে নিরেট দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সে । শ্যামার শুকনো মুখের পানে চেয়ে দৃষ্টি শীতল হলো আপনা আপনি । আহত গলায় প্রশ্ন ছুড়লো...
" তুমি কি এই সম্পর্কে থাকতে চাইছো না শ্যামা ? আমি কি কোনো ভাবে জোর করছি তোমায় ?
অকস্মাৎ সংগ্রামের দিকে কম্পিত দৃষ্টি ফেরালো শ্যামা । কেঁপে উঠলো ওর পল্লব দ্বয় । সংগ্রাম কোমল নেত্রে চেয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষায় । উত্তর করলো না শ্যামা, চোখ ফিরিয়ে নিলো কয়েক মুহূর্ত পর । সংগ্রাম তবুও স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বেশ কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো উত্তরের । শেষমেষ উত্তর না পেয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো । হাত থেকে খাবারের প্লেট নামিয়ে হাত ধুয়ে নিলো । না তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল...
" সরো, ঘুমাবো আমি !
তাৎক্ষণিক চাইলো শ্যামা । নরম কন্ঠে বললো...
" খাবেন না ?
" ক্ষিদে নেই !
" কিন্তু আমার ক্ষিদে পেয়েছে । সকাল থেকে খাই নি...
" খেয়ে নাও , কে বাঁধা দিচ্ছে তোমায় ?
" উঠুন আপনি , আপনিও তো কিছু খান নি । একসাথে খাবো...
উঠলো না সংগ্রাম । পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করলো । শ্যামাও জোর করলো না । গুটিসুটি হয়ে বসে কোমল নেত্রে চেয়ে রইল । খানিক বাদ আবার ডাকলো....
" কি হলো , উঠুন ।
এবার উঠলো সংগ্রাম । চোখ ফিরিয়ে বসলো । তাকালো না । বাঁকা চোখে একবার লক্ষ্য করলো শ্যামার চাহনি । একই থালায় একটু খেয়ে নিলো দুজনে । জমিদার বাড়িতে স্বামী স্ত্রী একই থালায় খাওয়ার একটা রীতি আছে । শবনম বলেছিল শ্যামা কে । তাই আর বাঁধ সাধলো না শ্যামা । খেয়ে দেয়ে নিজের স্থানে খাটের একপাশে গিয়ে বসলো সে । আচমকা প্রশ্ন করলো....
" সারাদিন কোথায় ছিলেন আজ ?
সংগ্রাম তাৎক্ষণিক চেয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লো...
" অধিকার দেখিয়ে প্রশ্নটা করলে ?
" কেনো , অধিকার ব্যতীত প্রশ্ন করতে পারি না ? আপনাকে প্রশ্ন করার অধিকার নেই আমার ?
" আছে তো , সবথেকে বেশি অধিকার আছে তোমার । এভাবে মাঝে মাঝে একটু অধিকার দেখিও, তাহলে ভালো লাগবে আমার ।
খানিক চুপ থেকে শ্যামার কোলে মাথা রাখলো, শাড়ির ভাঁজে মুখ গুজে শ্বাস টেনে আবারো বললো...
" সকালের মতো একটু হাত বুলিয়ে দাও মাথায়, বলছি সবটা ।
এই মুহূর্তে আর অস্বস্তি হলো না শ্যামার । হালাল পুরুষের স্পর্শে এখন আর অস্বস্তি হওয়ার কথাও নয় । শ্যামা হাত রাখলো সংগ্রামের মাথায় । মুচকি হাসলো সংগ্রাম । খানিক বাদ বললো....
" তোমার আপার গ্রামে গেছিলাম । তাই সারাদিন বাড়িতে আসতে পারি নি ।
শ্যামার কষ্ট পুনরায় জেঁকে উঠলো । চোখ বন্ধ করে কম্পিত স্বরে শুধালো...
" কেমন আছে আপা ?
" চিন্তা করো না , ও সুস্থ আছে এখন । তোমার আম্মাও ঠিক আছে । নতুন জামাই হিসেবে আমাকে বেশ পছন্দ করেছেন তিনি ।
" আম্মাকে বলেছেন সবটা ?
" হুম..!
" আসতে চাইলো না ?
" দোটানায় ছিলেন তিনি , তোমার আপার কাছে থাকাটাও প্রয়োজন । তাই তোমার দায়িত্ব আমার হাতে সঁপে দিলো । কি বললো জানো..
" কি..?
অধির আগ্রহে প্রশ্ন করলো শ্যামা । নিঃশব্দে হাসলো সংগ্রাম । মাথা তুলে স্নিগ্ধ চোখ তাক করলো শ্যামার দিকে । কোমল কন্ঠে বলল...
" তিনি বললেন, তোমাকে যেনো আগলে রাখি সবসময় । তুমি নাকি খুব আবদার করো তার কাছে , আজ থেকে তোমার সব আবদার পূরণের দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করলেন তিনি ।
" আবদার ? আর আমি ?
অদ্ভুত শোনালো শ্যামার কথা টা । সংগ্রাম বললো...
" কেনো, আবদার করবে না আমার কাছে ?
" আমি কারোর কাছেই আবদার করি না । কারোর উপর কোনো চাওয়া নেই আমার । শুধু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন.. নিজেকে কেনো জড়ালেন আমার জীবনের সাথে ?
" জড়ায় নি তো, জড়িয়ে গেছো তুমি !
" কবে জড়ালাম ? বিয়ের দিন , বিপদে পড়ে ?
" জন্মের পঞ্চাশ হাজার আগেই জড়িয়ে গেছো । ঐ উপর থেকেই আমাদেরকে একে অপরের সাথে জড়ানো হয়েছে । জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে সব ঐ উপর আল্লাহর লিখন । তার লিখন অনুযায়ী জড়িয়ে গেছি আমরা একে অপরের সাথে ।
সংগ্রামের কথা গুলোর পরিবর্তে শ্যামার কোন উত্তর আসলো না । দু'জনেই নীরব থাকলো কিছুক্ষণ । সংগ্রাম এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো শ্যামার দিকে । অমনি কপালে ভাঁজ পড়লো ওর । এই মেয়ে তো ঘুমিয়ে গেছে । কখন ঘুমালো ? সংগ্রাম ধারালো তীক্ষ্ণ চোখে চাইলো শ্যামার কম্পিত চোখের পাপড়ির দিকে । আলতো হাসলো ও । চেয়ে থাকলো কয়েক পলক । নিজে উঠে শ্যামা কে ভালো করে শোয়ালো । শ্যামা ইতিমধ্যেই বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে । সংগ্রাম শ্যামার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । অলকা'র বলা সমস্ত কথা মাথায় ঘুরছে ওর । শ্যামার জীবনের প্রত্যেকটা ছোট ছোট ঘটনা সম্পর্কে এখন অবগত সংগ্রাম । কোন কিছুই বলতে বাকি রাখেন নি অলকা । সংগ্রাম উপরের দিকে স্থির দৃষ্টি বজায় রাখলো কিছুক্ষণ । হাজারো চিন্তা মাথায় ঘুরছে ওর । আম্মা অর্থাৎ সালেহা বেগম এখনো মেনে নেয় নি শ্যামা কে । আর বাকিরা মানলো কি মানলো না তাতে যায় আসে না সংগ্রামের । গত ক'দিন সংগ্রামের মুখোমুখি হননি সালেহা বেগম । একটা কথাও বলে নি । সংগ্রাম নিজেও চেষ্টা করে নি কথা বলার । তবে এখন করবে । করাটা জরুরি । সংগ্রাম মাথায় কিছু একটা সাজিয়ে শুয়ে পড়লো তাৎক্ষণিক ।
★
সকাল সকাল আজ ও নিচে এসেছে শ্যামা । আজ সে রান্না করবে সবার জন্য । রান্না বান্না বলতে গেলে সবটাই করতে পারে সে । আম্মার পাশে বসে থাকতে থাকতে শিখে গেছে সবটা । লতিফা আছেন আজ নিচে । চোয়াল শক্ত করে শ্যামার কর্মকাণ্ড দেখে যাচ্ছেন তিনি । লতিফ জোয়ার্দার আর আতিয়া বেগম পাশে থাকায় কিছু বলতে পারছেন না । কুলুপ এঁটে আছেন মুখে । সংগ্রাম ঘুম থেকে ওঠার আগেই শ্যামা একজন কাজের মেয়ে কে দিয়ে এক কাপ চা পাঠিয়েছে ওর ঘরে । এতে বেশ কপাল কুঁচকায় সংগ্রাম । শ্যামা নিজে না এসে অন্য কাউকে পাঠিয়েছে ? সংগ্রাম কাজের মেয়ে টাকে গম্ভীর স্বরে আদেশ দেয়, সে যেন নিচে গিয়ে শ্যামা কে পাঠিয়ে দেয় ঘরে । আদেশ পাওয়া মাত্রই নিচে এসে মাথা নুইয়ে শ্যামা কে সবটা বলে মেয়েটা । পাশে আতিয়া বেগম আর শবনম সবটা শুনে মিটিমিটি হাসে । শ্যামা পাত্তা দেয় নি , রান্নায় মনযোগ দিয়েছে সে । সংগ্রাম চা শেষ করার পরও শ্যামা আসলো না ঘরে । এই সুযোগে সংগ্রাম ঘর থেকে বেরিয়ে আম্মার ঘরের দিকে পা বাড়ায় । দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ে । খোলাই ছিল দরজা, তবুও গলা খাঁকারি দিয়ে ঘরে ঢোকে সংগ্রাম । সালেহা বেগম বসে ছিলেন খাটের উপর । পুরো বিছানার উপর গয়নার ছড়াছড়ি । সংগ্রামের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সব গয়না কোন রকমে একসাথে জড়ো করে বাক্সে ভরে নেন । মুখ ফিরিয়ে শক্ত হাতে ধরে থাকেন গয়নার বাক্স টা । সংগ্রাম ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, খাটের পাশে আম্মার পায়ের কাছে বসে । আড়চোখে এক পলক চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নেন সালেহা বেগম । সংগ্রাম আহত করুন স্বরে বলে...
'' আম্মা খেয়েছো কিছু ? তোমার বউ মা রান্না করছে আজ , খাবে না ?
সহসা চোখ পাকিয়ে তাকালেন সালেহা । কটমট করে বললেন....
" বউয়ের হয়ে ওকালতি করতে এসেছিস ?
" উহুম... একটু বোঝাতে আসলাম তোমায় , রাগ ভাঙাতে আসলাম । তোমার রাগ তো আমার উপর , আমি না জানিয়ে হঠাৎ বিয়ে করেছি । তোমার রাগ থাকাটা স্বাভাবিক । কিন্তু তুমি শ্যামা কে কেনো মেনে নিচ্ছো না আম্মা ?
" জিজ্ঞেস করছিস এটা ,, কোন মুখে ? ঐ মেয়ে কে কোন দিক থেকে মেনে নেবো আমি ? বল , কি যোগ্যতা আছে ঐ মেয়ের ?
" যোগ্যতা আছে বলেই আজ ও আমার বেগম হয়েছে আম্মা ! তোমার ছেলে নিজে থেকেই স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছে ওকে । বাড়ির সবাই মেনে নিয়েছে , তুমিও মেনে নাও !
" এই জন্মে তো কখনোই না । ঐ কালো, কলঙ্কিনী, লগ্নভ্রষ্ঠা মেয়েকে কখনো মানবো না আমি ।
" ওর লগ্নভ্রষ্ঠা হওয়ার কথা ছিল, তাই হয়েছে । ওর ভাগ্য আমার সাথে জুড়ে দেওয়া আছে, তাইতো অন্য কারো জীবনের সাথে জড়ানোর আগেই মুক্তি পেয়েছে ও । আর ভাগ্যের ফেরে আমার জীবনে এসেছে । আমি নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছি ওকে । সেই দিনের সেই ঘটনা না ঘটলেও আমিই ওকে বিয়ে করতাম ।
" লজ্জা করছে না এসব বলতে ?
নাক সিকেয় তুলে ব্যাঘ্র করে কথাটা বললেন সালেহা । আম্মার কথায় সাবলীল ভঙ্গিতে হাসলো সংগ্রাম ।
" একদম লজ্জা করছে না আম্মা । লজ্জা করার মতো কিছুই তো বললাম না ।
এরপর আম্মার হাতে থাকা গয়নার বাক্সের দিকে চেয়ে বললো...
" এসব তো সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগমের জন্য তুলে রাখা গয়না, তাই না ? এসব দেবে না আমার স্ত্রী কে ?
" কোন দিন না , এই গয়নার ভার সামলানোর মতো যোগ্যতা বা শক্তি কোনোটাই নেই ঐ মেয়ের মাঝে । যেদিন তুই ঐ মেয়েকে ছাড়বি, সেদিন তোর নতুন বেগম আসবে এই বাড়িতে এই গয়নার ভার সামলানোর জন্য ।
" সেই আশা ভুলে যাও আম্মা । আমি ঐ মেয়েকে কখনোই ছাড়বো না । ইহজন্মেও না আর পরজন্মেও না । আর তোমার এসব গয়নার কোনো প্রয়োজন নেই আমার বেগমের । সে যেমন তেমনই সুন্দর ।
" আমিও তোর আম্মা , জেদ টা তুই আমার কাছ থেকেই পেয়েছিস । বলে রাখলাম তোকে , ঐ মেয়েকে তোর জীবন থেকে সরাবোই আমি ।
সংগ্রাম এবার ভারী গলায় বলল....
" বৃথা চেষ্টা করো না আম্মা । জেদ তোমার কাছ থেকে পেয়েছি, সেটা আমার মাঝে দ্বিগুণ আছে । নিজের ছেলের মুখ পানে চেয়ে হলেও মেনে নাও সবটা । শ্যামা কোন দিন কারোর ভালোবাসা পায় নি আম্মা, ওর জীবনে অনেক অপূর্ণতা , অনেক অভাব , একমাত্র ওর আম্মাই ওর কাছে সব । এখন তো ও ওর আম্মাকেও রেখে চলে এসেছে , তুমি ওর এই অভাবটা পূরন করে দাও ।
" হয়েছে বলা,, দুদিনে চামচে হয়ে গেছিস ?
সংগ্রাম আর কথা বাড়ালো না । নিস্তেজ চোখে চেয়ে রইল আম্মার দিকে । দরজার বাইরে এক জোড়া পা থমকে দাঁড়িয়ে শুনলো তাদের সব কথা গুলো । তাদের কথা শোনার কোন উদ্দেশ্য ছিল না সে পায়ের মালিকের । আপনা আপনি পা দুটো পিছিয়ে গেল দু'কদম । দেয়াল ধরে সামলে নিলো নিজেকে । অপর দিক থেকে অন্য কারোর পায়ের শব্দ কানে আসতেই এলোমেলো হয়ে রিনিঝিনি শব্দ তুলে ছুটলো সেই পা দুটো । গিয়ে থামলো একটা ঘরের এক কোনায় । নিস্তেজ হয়ে বসলো মেঝেতে । সকালের মিষ্টি রোদ ছুঁয়ে দিলো তাকে । সামনে তাকালো সে, একটা সাদা খরগোশ গুটি গুটি পায়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে । খরগোশ টার দিকে তাকিয়ে আলতো হাতে কোলে নিলো ওকে । গায়ে হাত বুলিয়ে চুমু খেলো কয়েকটা । খরগোশ টার নরম শরীরে হাত বোলাতে বোলাতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে গেয়ে উঠলো...
" ওহে কি করিলে বলো পাইব তোমারে , রাখিবো আঁখিতে আঁখিতে..(২) ওহে এতো প্রেম আমি কোথা পাবো না.. ওহে এতো প্রেম আমি কোথা পাবো না তোমারে হৃদয়ে রাখিতে... আমার...সাধ্য কিবা... তোমারে দয়া না করিলে.. কে পারে , তুমি আপনি নি এলে কে পারে হৃদয়ে রাখিতে... . মাঝে মাঝে তবো দেখা পাই চিরদিন কেন পাই না... মাঝে মাঝে তবো দেখা পাই চিরদিন কেন পাই না...
গাওয়ার মাঝে জড়িয়ে আসে কন্ঠ । ভেঙে যায় গানের সুর । থেমে যায় গানের সুর তোলা মিহি কন্ঠটা । গান থামার কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ভেসে আসে আর একটা মোলায়েম কন্ঠ...
" বালা...
থেমে গেলে কেনো ? তুমি তো অনেক সুন্দর গাইতে পারো !
চলবে........... |
0 Comments