লেখিকা:সুরভী আক্তার
পর্ব:৬
সেই দিনের পর আরো তিনটে দিন কেটে গেছে ।
শ্যামা নিজেকে সামলে নিতে শিখেছে । কেউ পাশে না থাকলেও অলকা, রুপা আর ফুলি শ্যামার পাশে সবসময় ছিল । শ্যামার আশ্রয় তারা । এক মুহূর্তের জন্যেও তারা শ্যামা কে একা থাকতে দেয়নি । প্রতিটা মুহূর্ত সঙ্গ দিয়েছে শ্যামাকে । শ্যামা আর কাঁদেনি ।
বিয়ের তিন দিন পর ময়নার আজ ঘর-ফেরানি । আজ ময়না আসবে তার স্বামীকে নিয়ে । সকাল সকাল মোখলেছ টাটকা টাটকা বাজার করে নিয়ে এসেছেন নতুন জামাইয়ের জন্য । সেই দিনের পর অলকা মোখলেছের সামনে আর মুখ খোলেনি,,যেচে পড়ে কথাও বলেনি মোখলেছের সাথে । মোখলেছের আনা বাজারগুলো নিয়ে মোমেনা রান্না করে চলে যান । কাকড়ি বুড়ি বারান্দায় রান্না ঘরের দরজার কাছে বসে মোমেনাকে কি কি রান্না করতে হবে না হবে সেসব বাতিয়ে দিচ্ছেন । মুখের সাথে হাতও চলছে তার,, একটা একটা করে পান সাজিয়ে কৌটাতে রাখছেন তিনি ।
তার উল্টো দিকের বারান্দায় বসে শ্যামার লম্বা ঘন চুলে তেল দিয়ে দিচ্ছে রুপা । দু'বোনের মধ্যে টুকটাক হাসি-মশকরার কথা হচ্ছে । শ্যামাকে হাসানোর জন্য রুপা নানান রকম কথা বলছে, আর সেসব শুনে শ্যামা হাসছে । এক পর্যায়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে শ্যামা । শ্যামাকে এভাবে হাসতে কখনো দেখেনি রুপা । শ্যামা আজকাল হাসে,,একটু বেশি হাসে,, নিজেকে একটু বেশি হাসিখুশি রাখে সে -- হয়তো নিজের দুঃখ কষ্ট গুলো ভোলার জন্য ।
শ্যামার এই প্রাণবন্ত হাসি যেন সহ্য হলো না কাকড়ি বুড়ির । তিনি নাকের পাটা ফুলিয়ে চিল্লিয়ে বলে ওঠেন...
" ঐ মাইয়া,, এমনে খ্যাট খ্যাট কইরা হাসতাছোস ক্যান..? জানোস না মাইয়া মাইনষের উঁচু গলা থাকতে নাই..?
দাদির কথায় রুপাও একই ভাবে চিল্লিয়ে বলে..
" গলা নামায়া কথা কও দাদি,, মাইয়া মাইনষের উঁচু গলা থাকতে নাই । তোমার গলা শুইনা তো টিনের চালের কাউয়া টাও উইড়া গেল বোধ হয় ।
শ্যামা কিছু বলে না,, নীরবে বসে থাকে । রুপার কথায় মোমেনা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে...
" আইজ-কাইল তুই একটু বেশি চ্যাটাং চ্যাটাং কথা কইতে শিখছোস রুপা । কে শিখাইতাছে তোরে এইগুলা..? দিন দিন মায়ের মতো হইতাছোস..?
" একদম ঠিক কইছো ফুফু । ভাগ্যিস আম্মার মতো হইতাছি । কি জানো..? আমি আমার আম্মার মতোই হইতে চাই । তোমাগো মতোন হওয়ার কোন ইচ্ছা আমার নাই ।
রুপার কথায় রি রি করে জ্বলে ওঠে মোমেনা । কাকড়ি বুড়ি কথা কাটিয়ে শ্যামাকে তাচ্ছিল্য করে বলেন...
" ঐ মাইয়া,, খবরদার ঐ ঘরে আর যাইবি না । আমার সোনার টুকরা নাতনি আর জামাই আইতাছে,, ঐ ঘরে এই কয়দিন ওরা থাকবো । ঐ ঘরের দিকে পা বাড়াইবি না কইয়া দিলাম ।
আর হ্যাঁ.... আমার নাতি জামাইয়ের সামনে যাওয়া তো দুরের কথা ওর দিকে চোখ তুইলা তাকাইবি না ।
রুপা ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল....
" বারবার ঐ মাইয়া,ঐ মাইয়া কি করতাছো দাদি..? ওর একটা নাম আছে । নাম কইতে পারো না..? আর ওয় ঐ ঘরে যাইবো না তো কোই যাইবো ? তোমার সোনার টুকরা নাতনি আইতাছে নিজের ঘরে জায়গা দেও নাতনিরে ।
এমন সময় অলকা হাতে করে কিছু কাঠের খড়ি নিয়ে বাড়িতে ঢোকেন । বাইরে কুড়াল দিয়ে গাছের গুঁড়ির বড় বড় কাঠগুলো ছোট ছোট টুকরো করছেন মোখলেছ । রান্নার কাজে লাগবে এসব । অলকা কাঠের টুকরো গুলো উঠানের একপাশে রোদে রাখেন ।
অলকা কে দেখে সবাই চুপ হয়ে যায় । শ্যামার মাথায় তেল দেওয়া শেষ । শ্যামা তেলের বোতলটা নিয়ে ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই অলকা'র ঠান্ডা কন্ঠ ভেসে আসে...
" শ্যামা,, তোর সব দরকারি জিনিসপত্র লইয়া আমার ঘরে আয় । আর রুপা,, তোর জিনিসপত্র গুলাও লইয়া আয় । এই কয়দিন তোগো বোইন ঐ ঘরে থাকবো । তোরা থাকবি আমার ঘরে । সব জিনিসপত্র আমার ঘরে গিয়া রাখ । দ্বিতীয় বার যেন ঐ ঘরে পা রাখতে না হয় ।
অলকা'র কন্ঠে আদেশ । রুপার মনে প্রশ্ন জাগে,,সে মাকে জিজ্ঞেস করতে চায় - " তোগো বোইন ক্যান কইতাছো আম্মা? ও তোমার মাইয়া না ? " ... কিন্তু রুপা জিজ্ঞেস করে না । মনের প্রশ্ন মনেই রাখে । দুই মেয়েই মায়ের আদেশ মতো উপর নিচ মাথা নেড়ে ঘরে চলে যায় । অলকা কলপাড়ে যান হাতমুখ ধুতে । এদিকে মোমেনা কাকড়ি বুড়িকে খুঁচিয়ে বলে ওঠে...
" দেখছো আম্মা,,,কেমন মাইয়া । মায়ের কথায় কেমন সুরসুর কইরা চইলা গেল ।
" ওগো কথা ছাড় । আমার ময়না আইতাছে,, হের যত্ন আদ্যিতে যেন কোনো কমতি না থাকে ।
পড়ন্ত বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগ মুহূর্ত । চারদিকে মৃদু বাতাস বইছে,, আবহাওয়াটা বেশ ঠান্ডা । পশ্চিম আকাশে সূর্য ডোবার টকটকে লাল আভা দেখা যাচ্ছে । সমস্ত আকাশে কেমন গেরুয়া রঙের ছোপ ছোপ আভা । পাখিদের কিচিরমিচিরে চারদিক মুখরিত । আপন টানে নিজেদের নীড়ে ফিরছে পাখিরা ।
শ্যামা আর রুপা, দু'বোনে নামাজ শেষে মায়ের ঘরে গিয়ে নিজেদের কাপড় গুছিয়ে রাখছে ।
দেওড়ির বাইরে থেকে পায়ে চালিত তিন চাকা ভ্যানের ঘন্টির শব্দ ভেসে আসছে । গেটের কাছে দাঁড়িয়ে কাকড়ি বুড়ি অপেক্ষা করছিলো ময়নার জন্য । ময়নাকে ভ্যান থেকে নামতে দেখে,,কাকড়ি বুড়ির চোখ খুশিতে চিকচিক করে ওঠে । অলকা বাইরে বের হননি । বাইরে বের হওয়ার কোন ইচ্ছা বা আগ্রহ নেই তার । মোখলেছ গেছেন আড়তে । মোমেনা দৌড়ে যায় রান্না ঘরে, হাতে মিষ্টির বাটি নিয়ে আবারো হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসেন । বিয়ের পর প্রথম বার নতুন জামাই এসেছে,, মিষ্টি মুখ না করিয়ে ভেতরে আনতে নেই । শুধু নতুন জামাই আর ময়নাই আসেনি, বরং তাদের সাথে এসেছে আরো দুজন পুরুষ । এদের মধ্যে একজন চেনা,, বিয়েতে এসেছিল তিনি,, সম্পর্কে মানিকের বোন জামাই হয় । আর একজন অচেনা,, মানিকের বয়সি একটা ছেলে । কাকড়ি বুড়ি সবাইকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে আসেন । কাকড়ি বুড়ির চোখ জ্বলজ্বল করছে , চোখে মুখে অদ্ভুত মুগ্ধতা তার । ময়নার পড়নে সোনালী পাড়ের লাল শাড়ি সাথে ভারি গহনা । ময়নাকে দেখে অলকার ভঙ্গি পাল্টে যায় । মানিক মাথা উঁচু করে সালাম দেয় অলকা'কে । অলকা নির্বিকার ভাবে সালামের উত্তর দিয়ে সোজা ঘরে চলে যান ।
মানিক আর ওর সাথে যে দুজন এসেছে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয় শ্যামার ঘরে । কাকড়ি বুড়ি সোহাগের নাতনিকে নিজের ঘরে রাখবেন বলে জানিয়েছেন । রসিয়ে রসিয়ে তিনি ময়নাকে নিজের ঘরে থাকার জন্য রাজিও করিয়েছেন । ময়নাকে খাটের একপাশে বসিয়ে কাকড়ি বুড়ি ময়নার গায়ের গয়না গুলো দেখছেন । দেখে মনে হচ্ছে সোনার গহনা । বুড়ি চোখ বড় বড় করে ময়নার দিকে তাকিয়ে বলে....
" এই গুলা সব সোনার ?
ময়না নিজেও জানে না ,, এগুলো সোনার কি-না..? আসার সময় ময়নার শাশুড়ি ওকে এসব দিয়েছিল-পড়ার জন্য । ময়না বুক ফুলিয়ে গড়িমা বজায় রেখে বলে...
" সোনার নয়তো কি ? ঐ বাড়ির একমাত্র বউ আমি । আমারে কি ওরা সিটি গোল্ডের গয়না পড়াইবো..? এই দুইদিনে সবাই আমারে মাথায় তুইলা রাখছিল । জানো...সবাই আমার রুপ দেইখা, আমারে কতগুলা শাড়ি আর গয়না উপহার দিছে । আমি তো সেই গুলা কিছুই লইয়া আহি নাই ।
ময়নার কথায় মোমেনা বিস্ময়ের স্বরে বলে...
" কস কি..? তোর আরো গয়না আছে ?
" হ , আছে তো ।
" শ্যামার জায়গায় তোর বিয়া হইয়া একদম ঠিক হইছে । দেখ, শ্যামার ভাগের সবকিছু কেমন তুই পাইয়া গেলি ।
মোমেনার কথায় কাকড়ি বুড়ি মুখ বাঁকিয়ে বলে ওঠেন....
" হুহ...ঐ মাইয়ারে এগুলা দিত নাকি ? এগুলা তো আমার ময়নার রুপ দেইখা দিছে । ঐ মাইয়ার কোন রুপ আছে ? কি দেইখা ওরে এগুলা দিত ? ওর কালা চামড়া দেইখা দিতো ?
ময়না খানিক বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায় । ময়নাকে দাঁড়াতে দেখে কাকড়ি বুড়ি রসিকতা করে বলেন...
" দাড়াইলি ক্যান ? এহোন আবার কোই যাইবি তুই ? কেবল তো জামাইয়ের ঘর থাইকা আইলি । আবার যাইবি ? জামাইরে না দেইখা থাকতে পারতাছোস না নাকি ? হয় ,হয় ,এমন হয় । আমিও প্রথম প্রথম তোগো দাদারে ছাড়া থাকতে পারতাম না ।
ময়না বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে বলে....
" উফফ বুড়ি,,চুপ করবা ? আমি এহন আম্মার ঘরে যাইতাছি । কাজ আছে আমার ঐ ঘরে । বিরক্ত করবা না একদম ।
বলেই দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের ঘরের দিকে চলে যায় ময়না । ঘরের ভিতর টিমটিমে হারিকেনের আলো জ্বলছে । অলকা রান্না ঘরে গেছেন ভাত বাড়তে । রুপা বিছানা ঝাড়ছে । আম্মা ভাত নিয়ে এলে , খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়বে । হারিকেনের খোলে কালি জমেছে । শ্যামা গরম কাঁচের খোলটা খুলে শুকনো কাপড় দিয়ে কালি পরিষ্কার করায় ব্যস্ত । রুপা বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে শ্যামাকে সাবধান করছে, যাতে হাত পুড়ে না যায় ।
ময়না ঘরে ঢুকেই রুপাকে জিজ্ঞেস করে...
" ভালো আছিস আপা ?
ময়নার কন্ঠ শুনে দরজার দিকে তাকায় শ্যামা আর রুপা । অসাবধানতাবশত হাতে গরম খোলের আঁচ লাগায় মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে শ্যামা । রুপা ময়নার কথায় পাত্তা না দিয়ে, দৌড়ে যায় শ্যামার কাছে । শ্যামার হাত ধরে উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে বলে...
" পুইড়া ফেলাইলি তো হাতটা । বারবার সাবধান করলাম । কানে যায় না কথা ? কোন দিকে মন থাকে তোর ?
" আপা আমি ঠিক আছি,, কিছু হয় নাই দেখো । এমনি একটু আঁচ লাগছে । তুমি দেখো ময়না আইছে...! কেমন আছিস ময়না ?
নিজের ক্ষত ঢেকে ময়নাকে উদ্দেশ্যে করে উৎফুল্ল কন্ঠে কথা গুলো বলে শ্যামা । এদিকে ময়না রাগে গজগজ করতে করতে দাঁত পিষে বলে...
" ঢং কইরো না আপা,, তোমার এই ভালো মানুষির ঢং দেখলে গাঁ জ্বইলা যায় ।
রুপা স্বশব্দে জবাব দেয়...
" তোরে ঢং দেখতে কেডায় কইছে..? আইছোস ক্যান এইখানে ? শ্যামা কেমন আছে এইটা দেখতে আইছোস ? দেখ দেখ.. শ্যামা অনেক ভালো আছে ।
রুপার কন্ঠে ময়নার প্রতি অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য । ময়না এগোতে এগোতে বলে...
" আইছি তো নিজের জিনিস লইয়া যাইতে । এই ঘরে আমার একটা নিজস্ব জিনিস আছে ,,ঐ টাই নিতে আইছি ।
" তাই তো ভাবি,, তোর মতো মাইয়া তো নিজের জিনিস,নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বুঝে না ।
ক্যান করলি এমন, ময়না ? ক্যান করলি ? শ্যামা তো তোর আপা ,, ওরে তো তুই আপা ডাকোস, তাইলে ক্যান এমনটা করলি ?
শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে রুপার গলা ভারি হয়ে আসে । শ্যামা হাসে ,, অদ্ভুত ভাবে হাসে । কারণ সে আর কাঁদতে চায় না,তাই সে হাসে । শ্যামা ময়নাকে নমনীয় কন্ঠে বলে...
" আর কি নিবি ময়না ? আমারে বল ,, আমি তোরে খুইজা দিতাছি ।
ময়না শ্যামাকে পাশ কাটিয়ে খাটের উপর থাকা বালিশ দুটো উলট-পালট করে দেখতে থাকে । একে একে বালিশের কভার গুলো খুলে ছুড়ে ফেলে । বিছানার তোশকের নিচে কিছু খুঁজতে থাকে । পুরো গোছানো বিছানা এলোমেলো করে ফেলে ময়না । তবুও কিছু খুঁজে পায় না সে । গোছানো বিছানা এলোমেলো করতে দেখে রুপা রেগে গিয়ে বলে...
" পাগল হইয়া গেছিস , ময়না ? কি করলি এইটা ?
ময়না শ্যামার সামনে এসে বলে...
" ছবিটা কোই লুকাইয়া রাখছো আপা..?
ময়নার ফর্সা সরু নাকের ডগা ঘেমে গেছে । শ্যামা আলতো হাতে ময়নার নাকের ঘাম মুছিয়ে দিয়ে বলে...
" স্বামী তোরে অনেক ভালোবাসে তাই না ময়না ? আর , ছবি ? ওটা তো আমার কাছে নাই । ওইটা তো আমি আগুনে পুড়াই ফেলছি ।
শ্যামার গাঁ ছাড়া জবাবে ময়না আর কিছু বলে না । যেভাবে হনহনিয়ে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে ।
দরজার কাছে আসতেই মুখোমুখি হয় অলকার । অলকার হাতে খাবারের গামলা । ময়না রাগি মুখশ্রী বদলে মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তোলে । গদগদ হয়ে মাকে বলে....
" আম্মা...কোই গেছিলা, আম্মা ? আইছি থাইকা তোমার লগে কথাই কইতে পারি নাই ।
অলকা মেয়েকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢোকেন । পা বাড়াতে গিয়েও কষ্ট হয় অলকার । অলকার ঘরে ঢোকার আগেই, শ্যামা তড়িঘড়ি করে বিছানা আগের মতো গুছিয়ে নেয় । অলকা ঘরে ঢুকে শ্যামা আর রুপা কে উদ্দেশ্য করে বলে...
" তাড়াতাড়ি আয় , অনেক রাইত হইছে । খাইয়া-দাইয়া ঘুমাইতে হইবো ।
ময়না ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো দরজায় । রুপা আর শ্যামা মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বসে মায়ের দুই পাশে । অলকা গামলায় ভাত মেখে খাইয়ে দিচ্ছেন মেয়েদের । এই কয়েকদিন ধরে রাতের খাবার সময় টুকু যেন অলকার কাছে শান্তির সময় । আজকাল শ্যামা আর রুপা দু'বোনে ছোট বাচ্চাদের মতো বায়না করে মায়ের কাছে । ওদের বায়নাতেই অলকা রাতের খাবার নিজের হাতে খাইয়ে দেন মেয়েদের । ময়না অনেকটা সময় দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখে ওদের । ওর চোখে মুখে একরাশ ঈর্ষা । ময়না মুখ ঝামটিয়ে ফোঁস করে বেরিয়ে আসে সেখান থেকে ।
তিন দিনের মাথায় ময়নার শশুর বাড়িতে ফেরার কথা । মোখলেছ বেজায় খুশি । মানিকের জামাই আদ্যিতে কোন ত্রুটি রাখেনি মোখলেছ । মানিকের সাথে যে দুজন এসেছে তাদেরকে ভালো মতো আপ্যায়ন করা হচ্ছে । আর একদিন থাকবে ওরা । আগামী কাল চলে যাবে সবাই । মোখলেছ দুপুরে হাঁটে গিয়ে ময়না,মানিক আর বাকি দুইজনের জন্য নতুন কাপড় চোপড় কিনে নিয়ে এসেছেন । নিয়ম মাফিক এসব দিতে হয় । মেয়ে আর মেয়ের জামাইকে নিয়ে মোখলেছের গর্বের শেষ নেই । হাটে বাজারে সবাইকে বলে বেড়িয়েছেন - তার সোনার টুকরো মেয়েকে তার জামাই পুরো সোনায় মুড়িয়ে রেখেছে ।
এই দুইদিনে শ্যামা কোন কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হয় নি । নিজেকে যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে । ঘর আর কল'পাড় ব্যতীত অন্য কোথাও এক পা'ও বাড়ায় নি । যে ঘাটে প্রতি দিন সকাল সন্ধ্যা শ্যামার ছায়া পড়ত, সেই ঘাটেও যায় নি এই দুই দিন । অলকা নিজেই মেয়েকে ঘর থেকে বের হতে দেয় নি । এর কারনটা অজানা নয় । মানিকের সামনে তো দূরের কথা, ময়নার সামনেও আর পড়েনি শ্যামা । এক দিকে মানিক, আর অন্য দিকে মানিকের সাথে একটা জোয়ান ছেলে এসেছে, মূলত তার কারনেই অলকা শ্যামাকে বাইরে বের হতে দেননি । মেয়ের কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটে লাগাতে চান না তিনি ।
নিশুতি রাত । ময়না'রা খেয়ে দেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে । কাল দুপুর হতে হতেই চলে যাবে ওরা । রাতের অন্ধকারে চারদিক ছেয়ে গেছে । চাঁদও ওঠে নি আজকে । পুরো বাড়ি অন্ধকার । ঘরের আলো নিভিয়ে যে যার মতো শুয়ে পড়েছে । অলকা কে মাঝখানে নিয়ে, শ্যামা আর রুপা দু'বোন দুদিকে শুয়েছে । ক্লান্ত শরীর নিয়ে শোয়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে গেছেন অলকা । রুপাও ঘুমিয়ে গেছে অনেক আগে । হারিকেন নেভানোর পর একটা পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘরে । পুড়ছে,, শ্যামার মনটাও পুড়ছে । ভিতরে ভিতরে ঝড় বইছে শ্যামার । শত কষ্ট বুকের ভেতর কবর দিয়ে, সারাদিন হাসলেই কি মানুষ ভালো থাকে ? শ্যামার চোখে ঘুম নেই । আছে শুধু নোনা জল । যা নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে । বালিশ ভিজে গেছে ।
রাত অনেকটা হয়েছে । শ্যামা কয়েক দিন ধরে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে নি । আজ ইচ্ছে হলো পড়ার । ভারাক্রান্ত মন নিয়ে শ্যামা শোয়া থেকে উঠে বসে । চোখের পানি মুছে নেয় । খাট থেকে নেমে দুরে গিয়ে হারিকেন জ্বালায় । হারিকেনের হলদে আলোয় আম্মা আর আপাকে একবার দেখে নেয় । বেঘোরে ঘুমিয়ে আছে দু'জনে । তবুও শ্যামা অতি সতর্কতার সহিত দরজা খুলে ঘর থেকে বের হয় ,, যাতে কারোর ঘুম ভেঙ্গে না যায় । হারিকেনের নিভু নিভু আলোয় কল'পাড়ে যায় ওযু করতে । বাইরে হারিকেন রেখে, ভালো করে চোখে মুখে পানি দিয়ে একটু সময় নিয়ে ওযু করে বেরিয়ে আসে কল'পাড় থেকে । বাইরে বেরিয়ে হারিকেনটা হাতে নিয়ে কয়েক পা সামনে এগোতেই একটা শক্ত হাত শ্যামার হাত ধরে আটকে দেয় । শ্যামা ভয় পেয়ে তৎক্ষণাৎ পেছন ফিরে তাকায় । অন্ধকারে ছায়া মুর্তির মতো কিছু একটা দেখতে পায় সে । ভয়ে শ্যামার গলা শুকিয়ে যায় । সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে । সে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে....
" কে..কে ?
ওপাশ থেকে পুরুষালি একটা ভরাট কন্ঠ....
" আমি..?
পুরুষালি কন্ঠে শ্যামার রুহ পর্যন্ত কেঁপে ওঠে । নিজের হাত ছাড়ানোর জন্য, হাত মোচড়াতে মোচড়াতে নিচু স্বরে বলে...
" কে আপনি..? হাত ছাড়েন আমার । এতো রাইতে আপনি আমাগো বাড়িতে কি করেন ? ছাড়েন আমার হাত ।
ওপাশের জন আবারো বলে...
" ছাড়ার জন্যে তো ধরি নাই ।
শ্যামা এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে, হারিকেনটা উপরে তুলে দেখে-- কুচকুচে কালো মনি ওয়ালা একজোড়া চোখ ওর দিকে বিকৃত নজরে তাকিয়ে আছে । শ্যামলা গড়নের সুঠাম দেহি একটা পুরুষ । লম্বায় শ্যামার থেকে অনেকটা উঁচু । কেমন লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্যামার দিকে । পড়নে একটা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি ছাড়া আর কিছু নেই । অচেনা এক পুরুষকে দেখে শ্যামা ভয়ে এলোমেলো ভাবে দু'পা পিছিয়ে যায় । পিছন ঘুরে ঘরের দিকে দৌড়াতে গেলে শ্যামার ওরনার এক অংশ টেনে ধরে লোকটা । ওরনায় হেঁচকা টান পড়তেই শ্যামা থেমে যায় । হাতের হারিকেন টাও মাটিতে কাত হয়ে পড়ে যায় । চারদিকের মৃদু আলো আরো বেশি ঝাপসা হয়ে যায় । ভয়ে শ্যামার গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না । চিৎকার করার শক্তি টুকুও নেই । এমনিতেই শ্যামা ভিতু স্বভাবের, তার উপর এই রকম অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে সে কখনোই ভাবে নি । শ্যামা পুরো শরীর কাঁপছে । সে কাঁপা কন্ঠে আবারো বলে...
" কে আপনি ? আমাগো বাড়িতে কি করতাছেন আপনি ?
লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে শ্যামার কাছে । অনেকটা কাছে এসে মুখের উপর একটু ঝুঁকে বলে...
" আমি ? আমি ফরিদ । গত দুই থাইকা এই বাড়িতেই আছি আমি ,,দেখোস নাই ? আর দেখবি বা কেমন কইরা.....
বলেই লোকটা একহাতে মাটি থেকে হারিকেনটা তুলে শ্যামার সামনে ধরে । হারিকেনের আলোয় শ্যামার আপাদমস্তক লোলুপ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে,, শ্যামার শ্যামলা মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলে....
" আরে বাহ্,,, ছেড়ি কালা হইলেও সুন্দর আছোস । মানিক ভুল কয় নাই । জানোস.. মানিকের মুখে তোর কথা শুইনা, তোরে দেখার লাইগাই আমি এই বাড়িত আইছি । কিন্তু তুই তো শালি ঘর থাইকাই বাইর হস না ।
শ্যামা এতক্ষনে বুঝতে পারে এই লোকটা কে হতে পারে । শ্যামা নিজেকে ধাতস্থ করে দৃঢ় কন্ঠে বলে....
" কাছে আইবেন না,,দুরের সরেন । আমার কাছে কি চাই আপনার ? ছাড়েন আমার হাত,, নাইলে কিন্তু আমি চিল্লাইমু ।
ফরিদ শাহাদাৎ আঙুল নিজের ঠোঁটে ঠেকিয়ে ফিস ফিস করে বলে....
" হুসসসস....কি কইলি ? চিল্লাইবি ? চিল্লা ,, চেঁচা ,, আমি ও দেখি কি করতে পারোস তুই । বিয়া ভাইঙ্গা যাওয়ার পর তো অর্ধেক সম্মান হারাইছোস,আইজ না হয় আর অর্ধেকটা হারাইবি ।
আর কি কইলি..? কি চাই আমি তোর কাছে ? -- আমি তোরে চাই । আইজ রাইতের জন্য,,, আমি তোরে চাই । পছন্দ হইছে তোরে । এর বিনিময়ে যা চাইবি তাই দিমু । হইবি আমার ?
শ্যামার চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় ,,ঘৃণায় গাঁ রি রি করে জ্বলে ওঠে । মুহূর্তেই সে গর্জে ওঠে ....
" কুত্তার বাচ্চা,, হাত ছাড় আমার ।
ফরিদ শ্যামাকে ঘুরিয়ে ওর হাত পেছনের দিকে মুচড়ে ধরে । শক্ত জোরালো হাত দিয়ে আরো জোরে চেপে ধরে শ্যামার হাত । ব্যাথায় কুকিয়ে ওঠে শ্যামা । তবে ভয় ও দোটানায় মুখ দিয়ে জোরে শব্দ বের করে না । শ্যামার পিঠ ঠেকেছে ফরিদের বুকে । ফরিদ শ্যামার ঘাড়ে নাক ঘসতে ঘসতে বলে.....
" উফফফ... শালি,, তোর তেজও আছে দেখতাছি । ইশশশ,, মানিক কি ভুলটাই না করলো । বিশ্বাস কর ,,,, আমি মানিকের মতো অতটাও খারাপ না । তুই যদি চাস,, তাইলে তোরে আমি বিয়া কইরা রাজারানি কইরা রাখমু । বিয়া করবি আমায় ? দেখ তোর ভাগ্য ভালো যে, তুই মানিকের হাত থাইকা বাইচা গেছোস । মানিক কিন্তু সুবিধার পোলা না । পতিতালয়ের সাথে ওর ভালোই যোগ আছে । তোরে সেইখানে বেইচা দিতেও দুইবার ভাবতো না ও । কিন্তু আমি,, আমি তোরে চাই । তোর জন্যই তো আমি এই বাড়িতে আইছি ।
কথার সাথে সাথে ফরিদের বিচ্ছিরি হাতের বিচরন হচ্ছে শ্যামার শরীরে । অনাকাঙ্ক্ষিত আর অপ্রিতিকর স্পর্শ শ্যামার চিত্তকে নাড়িয়ে তোলে । জলন্ত আগুনের মতো জ্বলে ওঠে শ্যামা । কোন কিছু না ভেবেই, নিজেকে ছাড়াতে এক ঝটকায় শরীর ঘুরিয়ে পা দিয়ে সজোরে আঘাত করে ফরিদের পেটে । আচমকা আক্রমণ এবং ব্যথায় ফরিদ দু'পা পিছিয়ে পেট চেপে ধরে কুকিয়ে ওঠে । এই ফাঁকে, শ্যামা হাতে হারিকেন তুলে নিয়ে সেই হারিকেন দিয়ে আবারো জোরে আঘাত করে ফরিদের মাথা বরাবর । হারিকেনের সরু লৌহের রড ভেঙে ঢুকে যায় ফরিদের কপালে । গরম কাঁচের খোলটা ছিটকে পড়ে মাটিতে । তীব্র ব্যথায় ফরিদ মুখ চেপে ধরে মাটিতে নুইয়ে পড়ে । ক্রোধে পুরো শরীর কাঁপছে শ্যামার । অগ্নি চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে ফরিদের দিকে । জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে সে ।
ফরিদ মাথা চেপে ধরে শ্যামার দিকে তেড়ে আসতে নিলে শ্যামা পাশে থাকা একটা চ্যালা কাঠ ছুড়ে মারে ফরিদের দিকে । কাঠা'টা গিয়ে লাগে ফরিদের মাথায় । আঘাতের উপর আঘাত পেয়ে ফরিদ আরো বেশি কুঁকড়ে যায় । হাটু ভেঙে মাটিতে নুইয়ে পড়ে । মাথা দিয়ে প্রচুর রক্ত বের হচ্ছে । চোয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সেই রক্ত । ফরিদ হতচকিত,,শ্যামার এমন রুপ আশা করেনি সে । রাগে হিসহিসিয়ে ওঠে সে । তবে শক্তি কুলোয় না শ্যামার উপর হামলা করার । শ্যামার হাতের হারিকেনের এক অংশ ভেঙে নড়বড়ে হয়ে গেছে । শ্যামা নড়বড়ে হারিকেন'টা নিয়ে এগিয়ে যায় ফরিদের কাছে । ফরিদের রক্তে ভেজা মুখ দেখে একটুও সহানুভূতি জাগে না শ্যামার মনে । বরং সে ফরিদের সামনা সামনি একটু ঝুঁকে এক দলা থুতু ছুড়ে মারে ফরিদের মুখে ।
" মাইয়া মানুষ মানেই দুর্বল তাই না ? আমার চোখে পানি দেইখা ভাবলি , আমি অসহায় , আমি দুর্বল ? মাইয়া মানুষ নরম আর কোমল হইতে পারে, কিন্তু এই কোমলতা কাঁচের মত,,যা একবার ভাঙ্গলে রক্তও ঝড়াইতে পারে । মাইয়া মানুষ শুধু কাঁদে না, মাইয়া মানুষ আগুন ও জ্বালাইতে পারে, সবকিছু ধ্বংস কইরাও দিতে পারে । তুই আমার সম্মানে আঘাত করছোস না,, শুকরিয়া আদায় কর, মানুষ খুন করা পাপ না হইলে এইখানেই তোরে আইজ কবর দিয়া দিতাম । চুপ কইরা থাকি মানে এই না যে তোদের মতো নরপিশাচরা আমাদের সুযোগ নিবো ?
অন্ধকারে চারদিকের গাঁ ছমছমে ভাব আরো বেশি ভয়ানক হয়ে উঠেছে । ফরিদ মাথা চেপে ধরে আছে,, চারদিক ঝাঁপসা হয়ে যাচ্ছে ওর কাছে ।
পরদিন সকাল সকাল ফরিদের কপালে ব্যান্ডেজ দেখে কপাল কুঁচকে যায় অলকার । এ বাড়িতে এসেছে থেকে ফরিদের সাথে কথা বলেনি অলকা । তবে এবার মানবতার খাতিরে অলকা ফরিদকে মাথায় কি হয়েছে তা জিজ্ঞেস করলে ,, ফরিদ আমতা আমতা করতে করতে বলে -- " রাতের অন্ধকারে উষ্ঠা খেয়ে দরজায় বাড়ি লাগার কারণে মাথা একটু কেটে গেছে ।
তবে কথাটা বিশ্বাস হয় না অলকার । তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফরিদকে পর্যবেক্ষণ করে আবারো জিজ্ঞেস করেন...
" ঘরের দুয়ারেই ব্যথা পাইছো..? নাকি অন্য কোথাও ?
ফরিদ মাথা নিচু করে চোরের মত এদিক ওদিক তাকিয়ে জবাব দেয়....
" হ,, ঘরের দুয়ারেই ব্যথা পাইছি ।
বলেই দ্রুত পায়ে সেখান থেকে ঘরের দিকে চলে যায় ফরিদ । অলকা তাকিয়ে দেখেন দরজার কাছে মানিক ইশারা দিয়ে ডাকছে ফরিদকে । দুজনের মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ । প্রথম থেকেই ফরিদের আচরণ নজরে রেখেছিলেন অলকা । ফরিদের ব্যবহার সুবিধার লাগেনি অলকার কাছে । আজ ভোরবেলা কলপাড়ের বাইরের মাটিতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখেছেন অলকা । তারসাথে মাটিতে ছেটা ছেটা কেরোসিন । ফরিদ যদি ঘরের দরজায় আঘাত পায় ,, তাহলে কল পাড়ের বাইরের রক্ত গুলো কিসের ? আর কেরোসিন বা এলো কোথা থেকে ? মাথায় এসব প্রশ্ন আসতেই অলকা সচকিত হয়ে যান । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পিছন ঘুরে ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ান । কয়েক পা এগোতেই দেখতে পান,,, শ্যামা ঘর থেকে বের হচ্ছে । অলকা'র সুক্ষ্ম ভ্রু যুগল কিঞ্চিত কুঁচকে যায় ।
অলকা গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন...
" কনে যাইতাছিস ?
শ্যামা একটু থেমে বলে...
" ঘাটে যাইতাছি আম্মা ।
" একা...? নাকি,ফুলি আইছে ?
" আমি একা ।
অলকা চোখ সরু করে তাকায় শ্যামার দিকে । যে মেয়ে দুই দিন থেকে ঘর থেকেই বের হয় নি,,সে এখন একা ঘাটে যাচ্ছে ..?
" একা যাইবি ? রুপা কোই ? ওরে লইয়া যা..
" আপা শুইয়া আছে আম্মা । পেটে ব্যথা করতাছে,, আপার আরামের প্রয়োজন । আপা শুইয়া থাকুক,,আমি যাই..?
অলকা আর কিছু বলেন না । শ্যামা আলতো হেসে মাথার ওরনাটা ঠিক করে ঘাটের দিকে চলে যায় । অলকা কিছু একটা ভেবে দ্রুত পায়ে ঘরে চলে যান । রুপা জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে খাটের উপর । অলকা ঘরে ঢুকে চঞ্চলতার সহিত এদিক ওদিক কিছু একটা খুঁজতে থাকে । মায়ের হাবভাব দেখে রুপা উঠে বসে,, মাকে জিজ্ঞেস করে...
" কি খুজতাছো আম্মা ?
অলকা এদিক ওদিক তাকিয়ে মাচার উপর থেকে হারিকেনটা হাতে নেয় । পাশে খোলটা পড়ে আছে । হারিকেনের এক অংশ ভাঙ্গা । লোহার সরু রডটা ঝুলে আছে । অলকা ভালো করে হারিকেন টা পর্যবেক্ষণ করে,,সেটা আবার মাচার উপর রেখে দেয় । তারপর রুপার দিকে ঘুরে বলে....
" কিছু খুজতাছি না আমি । তোর পেটের ব্যথা কমছে ? শুইয়া আরাম কর ,, তাইলে ভালো লাগবে । আমি যাই ,,কাম আছে আমার ।
বলেই দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন অলকা । সোজা ঘাটের দিকে চলে যান তিনি । শ্যামা ঘাটের সবচেয়ে নিচের সিঁড়িতে বসে নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছে । বড় আমগাছটার ছায়া পড়েছে শ্যামার মাথার উপর । বরাবরের মতো অন্যমনস্ক হয়ে এক ধ্যানে নদীর শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে আছে শ্যামা । অলকা পেছন থেকে মেয়েকে ডাকেন .....
" শ্যামা....
শ্যামা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়...
" আম্মা... কিছু কইবা ..?
" কাইল রাতে কি হইছিলো..?
" কিছু হয় নাই তো আম্মা । ক্যান ?
" হারিকেনটা ভাঙলো ক্যামনে ..?
" হাত থাইকা পইড়া গেছিলো ..?
অলকা দৃঢ় কন্ঠে প্রশ্ন করছে শ্যামাকে । আর শ্যামাও উৎফুল্ল কন্ঠে প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে । একটুও জড়তা নেই শ্যামার মাঝে । অলকা একটু থেমে আবারো বলে...
" কল'পাড়ের বাইরে রক্ত দেখলাম,, কিসের রক্ত..? জানোস তুই ..?
" আমি ক্যামনে জানমু আম্মা ..? দেখো, হয়তো কোনো জানোয়ারের রক্ত ।
শ্যামা মাথা উঁচু করে দৃঢ় কন্ঠে উত্তর দেয় । অলকা খানিক বিস্মিত হন এতে । তিনি বলেন...
" কি হইছে তোর শ্যামা..?
" কিছু হয় নাই তো আম্মা । বরং যা হইছে সব ভুইলা গেছি আমি । তুমি তো কইছিলা,, আমি যেন মাথা উঁচু কইরা বাঁচি,, নিজের আত্মসম্মানের জন্য বাঁচি ... সেটাই করতাছি আম্মা । নিজের আত্মসম্মানের জন্য বাঁচতাছি আমি ।
অলকা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন শ্যামার দিকে । মাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শ্যামা হাসে । শ্যামার চোখের দিকে তাকিয়েই অলকার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ,, প্রশান্তির হাসি হাসেন অলকা ।
চলবে.....

0 Comments