Bangla Choty Golpo

গল্প: শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:০৫)

 

লেখিকা : সুরভী আক্তার 
পর্ব:০৫




এক মুহূর্তেই পুরো বিয়ে বাড়ি নিস্তব্ধ । কোলাহল পূর্ণ বিয়ে বাড়ি যেন মরার বাড়িতে পরিনত হয়ে গেল ‌। সবার পা গুলো বারান্দাতেই আটকে আছে ‌। একই সাথে সবাই ফিরে তাকালো পিছনে । পাত্রের মামা দাঁড়িয়ে আছেন । রিতিমত রাগে হিসহিস করছেন তিনি,, পিছনে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোখলেছ । পাত্রের কাকা শুকনো একটা ঢোক গিলে তাকালো অলকার দিকে । অলকা কিছু্ই বুঝতে পারছেন না ,,, হঠাৎ কেনই বা পাত্রের মামা বিয়ে আটকালেন । 

মওলানা সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলেন...

" বিয়ের মতো এমন শুভ কাজে বাধা দেওনের মানে কি সাহেব..?

কাজি সাহেব ও তাল মিলিয়ে বললেন..

" ঠিকই তো । দেখেন ভাই এই বিয়া পড়ানোর লাইগা সেই কখন থাইকা অপেক্ষা কইরা বইসা আছি, আর অপেক্ষা করতে পারতাছি না ,, আমগোরে তো বাড়িও ফিরতে হইবো নাকি । শুভ কাজে দেরি করতে নাই,,চলেন তো তাড়াতাড়ি কাজটা সাইরা ফেলাই ।

" আপনারা কি কানে খাটো নাকি ? একবার কইলাম না এই বিয়া হইবো না । হইবো না মানে হইবো না ,,ঐ মাইয়ারে আমরা ঘরে তুলমু না ।

পাত্রের মামার রুষ্ট কন্ঠ । কারোর মুখে কোন 'রা' নেই । বিয়ে বাড়ির সকল আত্মীয় স্বজন ,, পাড়া প্রতিবেশী মুহুর্তেই সবাই জড়ো হয়ে গেল একদিকে । 
অলকা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেলেন । মস্তিষ্ক কাজ করছে না তার । সবকিছু তো ঠিক ছিল তাহলে এখন এসব কি হচ্ছে ..?
তিনি জিভ দিয়ে অধর ভিজিয়ে বলেন...

" এইসব কি কইতাছেন বেয়াই সাহেব ? বিয়া হইবো না মানে ? এটা কেমন মশকরা করতাছেন আপনি ? আপনারা তো নিজেরাই বিয়া ঠিক করছিলেন,, তাইলে ক্যান বিয়া হইবো না ?

অলকা'র অধৈর্য কন্ঠ । পাত্রের মামা বলে ওঠেন...

" হ বিয়া আমরা ঠিক করছিলাম ঠিকি,, কিন্তু তার সাথে ৩০ হাজার টাকা যৌতুক ও ঠিক করা হইছিলো । আপনি বোধহয় সেইটা জানেন না । কথা আছিল বিয়া পড়ানোর আগে সেই টাকা আমাদের হাতে বুইঝা দেওন হইবো । কিন্তু আপনারা তো পাল্টি মারলেন । 
কি ভাবছিলেন আপনারা,,আপনাগো ঐ কালা মাইয়াডারে আমরা এমনি এমনি সখ কইরা ঘরে তুলতাছি ..? একে তো আপনার মাইয়ার গায়ের রংয়ের কোন শ্রী নাই । আপনাগোর ভাগ্য ভালো আমরা খালি ৩০ হাজার টাকা যৌতুক চাইছিলাম । যৌতুক দিলে আমাগো কোন সমস্যা আছিল না । কিন্তু আপনারা .. আপনারা তো ঐ কালা মাইয়াডারে কোন রকমে আমাদের ঘাড়ে গছাই দিতে চাইছিলেন । কি ভাবছিলেন আপনারা ..? আমরা কিছু বুঝমু না ।

একই সাথে এতো গুলো কথা বলে পাত্রের মামা একটা শ্বাস নেন । 
তার কথায় অলকা স্তব্ধ হয়ে যান । আপনা আপনি দু'পা পিছিয়ে যান তিনি । 
যৌতুক ? যৌতুকের তো কোন কথা ছিল না । পাত্র পক্ষ তো কোন কিছু দাবি করেন নি অলকা'র সামনে । না গাড়ি ,না বাড়ি ,না টাকা- পয়সা...তারা তো শুধু শ্যামা কে চেয়েছিল । 
 
অলকা বারান্দার খুঁটি ধরে ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন । সবকিছুই কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তার কাছে । আশেপাশের সবাই নানান ধরনের কথা বলাবলি করছে । অলকা'র কানে বিঁধছে কথা গুলো । 

এদিকে বাইরের‌ হঠাৎ এমন নিস্তব্ধতায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছে রুপা আর ফুলি । এতোক্ষণ তো বিয়ে বাড়ির সোরগোল শোনা যাচ্ছিল , তবে এখন শুধু কয়েকটা অস্পষ্ট কন্ঠ ভেসে আসছে ঘরের ভেতর । 
শ্যামা বড় একটা ঘোমটা টেনে বসে আছে । রুপা শ্যামার পাশে বসে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে । একটু আগে খবর পেয়েছে কাজি সাহেব আসছেন বিয়ে পড়ানোর জন্য । কিন্তু এখনো দেখা নেই কারোর । বাইরের কোলাহলও কেমন বন্ধ হয়ে গেছে । ফুলি পায়চারি করছে খাটের পাশে । 

এমন সময় মোমেনা'র ১২ বছরের ছেলে মুহিত দৌড়ে আসে ....
" শ্যামা আপার বিয়া হইবো না, শ্যামা আপার বিয়া হইবো না -- বলতে বলতে ঘরের ভেতর হুড়মুড়িয়ে ঢোকে সে ।

ওর এমন কথায় ফুলি দাঁড়িয়ে যায় । শ্যামা ঘোমটার আড়াল থেকে একটু উকি দিয়ে দেখে মুহিত'কে ।
রুপা খানিক রেগে বলে ...

" কি সব অলুক্ষণে কথা বলতাছিস মুহিত ? কেডায় তোরে এইসব কইছে শুনি ..?

" আমি সত্যি কইতাছি আপা,, বিশ্বাস করো...
মামার কাছে ঐ মানুষটা ৩০ টাকা হাজার চাইছিলো ,,মামা দিতে পারে নাই দেইখা বিয়া ভাইঙ্গা দিছেন উনি । বিয়া হইবো না শ্যামা আপার । 

মুহিতের অগোছালো কথা কিছুই বুঝতে পারে না কেউ । রুপা আর ফুলি একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে শ্যামার দিকে তাকায় । অবুঝের মতো শান্ত চোখে মুহিতের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা । 
ফুলি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । অবস্থা ঠাহর করার জন্য রুপাও চোখের ইশারায় শ্যামা কে শান্তনা দিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে ।

বাইরের পরিবেশ গুমোট । অলকা তাকায় মোখলেছের দিকে । বিয়ে ঠিক হওয়ায় পর থেকেই মোখলেছের ব্যবহার কেমন অদ্ভুত লেগেছিল অলকার কাছে । এতোক্ষণে সবকিছু পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পেরেছে অলকা । সেই দিন তাহলে এই বিষয়েই আলাদা ভাবে মোখলেছের সাথে কথা বলেছিলেন পাত্রের মামা । 
ভিড়ের মাঝে অলকার দৃষ্টি কাকড়ি বুড়ি কে খুঁজতে থাকে । দুরে ময়নার সাথে এক কোনে জুবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কাকড়ি বুড়ি ।‌ 
মোখলেছ কখনোই যৌতুক দিয়ে বিয়ে দেওয়ার বিষয়ে রাজি ছিলেন না । মূলত কাকড়ি বুড়ি মোখলেছকে ভুজুং ভাজুং বুঝিয়ে রাজি করিয়েছেন । একবার কোন রকমে বিয়ে হয়ে গেলে,, পরে আর যৌতুকের টাকা দেবেন না ,এই ভেবে মোখলেছও রাজি হয়ে গেছিলেন । বরাবরের মতো মায়ের বাধ্য সন্তানের পরিচয় দিয়েছেন মোখলেছ । এদিকে নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একবারও চিন্তা করেন নি তিনি । 
অলকা কখনো কল্পনাও করতে পারেননি এসব হয়ে যাবে । অলকার পুরো শরীর কেঁপে ওঠে । 

তিনি ধীর পায়ে উঠে গিয়ে দাঁড়ায় মানিকের সামনে,, ভেজা কন্ঠে অনুনয়ের স্বরে বলে...

" বাবা,, তুমি তো আমার শ্যামারে পছন্দ করছিলা তাই না ? তাইলে তোমার মামা এইসব কি কইতাছে হ্যাঁ ? দেখো বাবা,, আমার মাইয়াটা অনেক অভাগী,ও জীবনে কোন দিন কারো ভালোবাসা পায় নাই,,ওর স্বপ্ন, ওর জীবনটারে এমনে নষ্ট কইরা দিও না বাবা । 

অলকা'র কথায় মানিক মাছি তাড়ানোর মতো করে ব্যাঙ্গ করে বলে...

" কি কইলেন..? আপনার ঐ কালা মাইয়ারে আমি পছন্দ করছিলাম..? আমি ? হুহ...‌আরে আমি তো আপনার মাইয়ারে দেখি নাই ,, আপনি তো আপনার মাইয়ারে দেখছেন তাই না..? শুনছি হেয় কালা । এই দেখেন ... আপনি আমারে দেখেন আর আপনার মাইয়ারে দেখেন কোন দিক দিয়া আপনার মাইয়া আমার যোগ্য ? আমি তো এই বিয়াতে রাজি আছিলাম না,, শুধুমাত্র মামার কথায় আপনার ঐ কালা মাইয়ারে বিয়া করতে রাজি হইছিলাম । নয়তো আপনার ঐ মাইয়া তো আমার দাসী হওয়ারও যোগ্যতা রাখে না ।

কথা শেষ হতে না হতেই ঠাস করে একটা চড় পড়ে মানিকের গালে । উপস্থিত সকলেই হতভম্ব হয়ে যান । মানিক গালে হাত দিয়ে গর্জে উঠে তাকায় রুপার দিকে.... 
রুপার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝড়ছে,,সে ক্ষীপ্ত হয়ে আঙ্গুল তুলে শাসিয়ে বলে...

" খবরদার,,, আমার বোনরে নিয়া আর একটা বাজে মন্তব্য যদি তোর ঐ মুখ দিয়া বাইর হয় তাইলে,, তোর এই পা দিয়া হাইটা তুই এই বাড়ি থাইকা বাইর হইতে পারবি না । আর কি কইলি তুই..? আমার বোন তোর যোগ্য না.....? হুহ,,
আরে তোর মতো কাপুরুষ তো আমার বোনের যোগ্য না । 

রুপা এবার মায়ের দিকে তাকায়....

" আম্মা ,, তুমি কাদের কাছে অনুনয় করতাছো আম্মা ? তুমি কি তোমার বোধশক্তি হারাই ফেলছো ..? কি হইছে তোমার আম্মা..?

দুহাতে মায়ের বাহু ঝাঁকিয়ে বলে রুপা । অলকা'র গলায় কথা আটকে আসছে । তিনি থেমে থেমে বলেন....

" শ্যামা যে আমায় অনেক বেশি ভরসা করে রুপা । আমি এইটা কি করলাম..? শ্যামার জীবনটা....

বলতে বলতেই থেমে যান অলকা...গলা দিয়ে আর কথা বের হচ্ছে না ।
একটু সময়‌ নিয়ে নিজেকে সামলে নেন অলকা । এবার নিজের আসল রূপে ফিরে আসেন তিনি । পাত্রের মামার দিকে তাকিয়ে গর্জে ওঠেন...

" আপনারা আমার মাইয়ারে নিজের বাড়ির বউ করবেন না তাইনা ? শুইনা রাখুন.... 
আমি আমার মাইয়ারে আপনাগো বাড়ির বউ হইতে দিমু না । আপনাগো মতো ছোটলোক, নিচু মানসিকতার মাইনষের কোন জায়গা নাই এই বাড়িতে । এক্ষুনি বেরাইয়া যান এই বাড়ি থাইকা । 

অলকা'র কথায় পাত্রের মামা ঠোঁট বাঁকিয়ে একটু হাসেন ,,অন্য সময় হলে হয়তো অপমান বোধ করতেন । কিন্তু এখন করেছেন না ,, এখনো যে তার আসল কার্য হাসিল হয়নি । তিনি বলেন....

" কি যে কন বেয়াইন সাহেবা .... সম্বন্ধি পরিবারের লগে কেউ এমনে কথা কয়‌ ? আর আমরা তো এমনি এমনি বাড়ি থাইকা বাইর হইয়া যামু না । আমরা তো আমাগো বাড়ির বউ লইয়া ,, তারপর যামু । 

দ্বিতীয় দফা বাজ পড়ল সবার মাঝে । বেড়ে গেল কোলাহল । কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পাত্রের মামা পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারো বলেন...

" আজ এই বিয়ার আসরেই আমার ভাইগনা মানিকের লগে এই বাড়ির ছোট মাইয়া ময়নার বিয়া হইবো ।
ময়নার গায়ের রং ফর্সা,দেখতেও সুন্দর, পড়াশোনাও করছে,, আমাগো মানিকের লগে দারুন মানাইবো ময়নারে । ওর লগে বিয়া হইলে আমরা কোন যৌতুক নিমু না । 
এতে মোখলেছ মিয়া নিজেও রাজি আছেন । আর আমরাও রাজি । 
তাইলে শুরু করা যাক বিয়ার অনুষ্ঠান ..?

এতোক্ষণ এক কোনায় দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলো ময়না । নিজের বিয়ের কথা শুনতেই তড়িৎ বেগে চকিতে তাকায় সে । চোখ দুটোতে কেমন ঝিলিক খেলে যায় । 
ময়নার বিয়ের কথা শুনে অলকা ক্ষুব্ধ হয়ে কিছু বলতে যাবেন এমন সময় শ্যামার ঘরের দরজার কাছ থেকে একটা শব্দ ভেসে আসে । সবাই একই সাথে তাকায় সেদিকে । দরজায় দাঁড়িয়ে আছে শ্যামা । চোখ দুটো স্থির, অনুভূতিহীন পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে সে । ফুলি আর রুপার পিছু পিছু শ্যামাও ঘর থেকে বের হতে চেয়েছিল ,, তবে দরজার কাছে আসতেই সবকিছু কানে যায় ওর । সেখানেই থমকে যায় সে । হালকা পাতলা ছিমছাম শরীরটা দুলে ওঠে,, নিস্তেজ হয়ে দরজায় হেলে পড়ে খানিকটা । যার শব্দে সবাই তাকায় ওর দিকে । 

শ্যামা কে দেখে অলকার ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে,, বুকে অসম্ভব ব্যাথা অনুভব হয় তার । বুকের উপর যেন কেউ হাজার টনের পাথর চাপিয়ে দিয়েছে,, চোখের কোটর ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছে । অলকা শাড়ির আঁচল দিয়ে দুহাতে মুখ চেপে ধরেন ,, গলায় নিঃশ্বাস আটকে আসছে তার । 

ফুলি এতক্ষণ নীরব দর্শকের মতো থাকলেও শ্যামা কে দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না সে । দৌড়ে গিয়ে দুহাতে জাপটে ধরে শ্যামা কে । শ্যামা কে শান্তনা দেওয়ার মতো ভাষা নেই ফুলির কাছে । সে কি বলবে শ্যামা কে....যে শ্যামার হবু বরের সাথে এখন ওর ছোট বোনের বিয়ে হতে চলেছে....? 

শ্যামা অনড় দাঁড়িয়ে রইল,, একচুলও নড়লো না । চোখের দৃষ্টি স্থির, কোন দিকে তাকিয়ে আছে ঠাহর করা যাচ্ছে না । 
ফুলি ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয় শ্যামাকে । মানুষ কষ্ট পেতে পেতে পাথরের মূর্তিতে পরিনত হয়,,অনুভুতি গুলো হারিয়ে যায় । সেটার উৎকৃষ্ট প্রমাণ শ্যামা নিজেই । কথার আঘাতে আঘাতে বারবার মৃত্যু হয়েছে শ্যামার । 

এদিকে মানিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল শ্যামার দিকে । শ্যামলা রঙের কোমল সৌন্দর্যের অধিকারীনি শ্যামা । ডাগর চোখে টানা কাজল ,,মুখে হালকা সাজ প্রসাধনী । মাথার ঘোমটা টা দিয়ে কপাল পর্যন্ত ঢেকে রাখা । এর আগে মানিক কখনো শ্যামা কে দেখে নি । গায়ের রং একটু চাপা শোনার পর মানিক শ্যামা কে দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল । 
এবার মানিক একবার তাকায় ময়নার দিকে । এভাবে কয়েকবার শ্যামা আর ময়নাকে নিরীক্ষন করে নেয় সে । ময়নার গায়ের রং ফর্সা হতে পারে,, তবে শ্যামার মতো মায়াবী আর কোমল নয় ।

★★★

ময়না আর মানিকের বিয়েতে বাঁধ সাধেন অলকা । এক মেয়েকে অপমান করে যারা বিয়ে ভেঙে দিয়েছে,, তাদের সাথেই অন্য মেয়ের বিয়ে কিছুতেই হতে দেবেন না তিনি । এদিকে মোখলেছও নাছোড়বান্দা,, তিনি এই বিয়ে দিয়েই ছাড়বেন । এই বিয়েতে মোখলেছকে আলাদা করে আর কোন টাকা পয়সা দিতে হবে না । 

বিয়ের বিষয়ে মোখলেছের সাথে অনেক কথা কাটাকাটি হয় অলকার । অলকা'র গায়ে হাত তুলতেও উদ্যত হন মোখলেছ । এসব দেখে গ্রামের মানুষ মুখ টিপে হাসছেন,,এসব কোন যাত্রাপালার থেকে কম নয় তাদের কাছে ‌। 
শেষমেষ অলকা হার মেনে নেয় । ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে আস্তে আস্তে বসে পড়েন মাটিতে । রুপা এগিয়ে যায় মায়ের কাছে । ফুলি এখনো একই ভঙ্গিতে শ্যামাকে দুহাতে আগলে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায় । 

কাকড়ি বুড়ি বারান্দায় উঠে শ্যামার মাথা থেকে একটানে বিয়ের ওরনাটা খুলে নেন । বেনি করা ফুল পেঁচানো খোঁপা টা খুলে যায় শ্যামার । সামনের ছোট ছোট চুল গুলো এলোমেলো হয়ে যায় । বুড়ি শ্যামার গলা এবং হাত থেকে গয়না খুলতে গেলে ফুলি বাধা দেয় । নিজে সযত্নে শ্যামার গা থেকে গয়না খুলে দেয় ফুলি । 
অলকা ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন ময়নার দিকে । ময়না কি রকম হাসি মুখে বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেল । একবারও নিজের আপার বিষয়ে ভাবলো না সে । কোন প্রকার আপত্তি করলো না বিয়েতে । 
অলকা রুপার হাত ধরে নরম কন্ঠে বলেন....

" ময়না'টা এমন ক্যান হইলো রুপা ? ও তো আমারি গর্ভের মাইয়া । তাইলে ও তোদের মতো হইলো না ক্যান ..? আমি তো ওরে তোদের মতোই শিক্ষা দিয়া বড় করছি,, তাইলে ও আমার শিক্ষা গ্রহণ করলো না ক্যান রুপা ..? বল না..? ও এমন স্বার্থপর ক্যামনে হইলো..? ক্যামনে..? ও একটা বারও আমার শ্যামার কথা ভাবলো না..? ও এমন ক্যান হইলো রুপা,বল না...?

মায়ের কথায় শ্যামা চোখ ঘুরিয়ে তাকায় মায়ের দিকে । শ্যামার চোখ দুটো জ্বলছে ,,খুব বেশি জ্বলছে । অনেক বেশি কাঁদতে ইচ্ছে করছে । শ্যামা মনে মনে ঠিক করে... সে আজ কাঁদবে,, অনেক বেশি কাঁদবে । একবার ময়নার বিদায়টা হয়ে যাক,, তারপর শ্যামা কাঁদবে । শ্যামা কোন রকমে চোখে পানি আটকে রাখে ।



সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে । গ্রামে শুনশান নীরবতা । চারদিক থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে । শ্যামা দের বাড়িটা আজ উজ্জল আলোয় রাগানো । গায়ের গেরস্ত - মদন মিয়ার বাড়ি থেকে বিদ্যুৎ এর সংযোগ নিয়ে পুরো বাড়ি আলোকিত করা হয়েছিল বিয়ের উদ্দেশ্যে । 

দেখতে দেখতে ময়নাকে বিদায় দেওয়া হয় । ময়না কে সাথে নিয়ে পাত্র পক্ষের সবাই চলে গেছেন । সমাগম পূর্ণ বাড়িটা কিছুটা হালকা হয়ে যায় । গ্রামের আশেপাশের মহিলারা এখনো উঠানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন,, একে অপরের মধ্যে কুট কাচালি মুলক আলোচনা করছেন তারা । মোমেনা, মোখলেছ আর কাকড়ি বুড়ি ময়নাকে দেওড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বাড়ির ভেতরে আসেন । মোখলেছ ঘাড়ে একটা গামছা ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয় । একবারও তাকায় না কারোর দিকে । মোখলেছ দু'পা এগোতেই অলকা'র‌ উচ্চস্বর ভেসে আসে...

" দাঁড়ান.....

মোখলেছ থেকে যায়,, পিছন ফিরে তাকায় । গায়ের দুই-একটা বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ সহ বাকি মহিলারা এগিয়ে আসে সামনে । অলকা সিদ্ধান্ত নেয় তিনি আর চুপ থাকবেন না । সবাইকে একবার দেখে নেন তিনি । তারপর দৃঢ় পায়ে বারান্দায় শ্যামার সামনে গিয়ে দাঁড়ান ,, শ্যামার হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসেন তিনি । উঠানের মাঝ বরাবর দাঁড় করান শ্যামা কে ,, শ্যামার হাতটা এখনো ধরে আছেন তিনি । শ্যামা কে দেখে পাশের বাড়ির প্রৌঢ়া আমিনা বুড়ি নাক সিঁটকে বলে ওঠেন...

" এই মাইয়ারে আবার বাইরে নিয়া আইলা ক্যান বউ ? এই অলক্ষ্যির তো মুখ দেখাও পাপ । জানি না এই ছেড়ি কোন শনি কপাল নিয়া জন্মাইছে । আমাদের গাঁয়ে জীবনে এমন কান্ড ঘটে নাই । বয়স তো কম হয় নাই মাইয়ার ,, এখন তো বিয়াটাও ভাইঙ্গা গেল । কেডায় বিয়া করবো এই লগ্নভ্রষ্ঠা মাইয়ারে..? 
এতো এতো অপমানের পরেও দেখ কেমন নির্লজ্জের মত খাড়ায় আছে । অন্য কেউ হইলে তো এতক্ষনে গলায় ফাঁস দিতো । এই গায়ে কয়টা আছে এমন মাইয়া..? 
এমন মাইয়া এই জীবনে একটাও দেহি নাই আমি ‌। 

আমেনা বুড়ির গলায় ঘৃণার বিষ মাখানো তাচ্ছিল্যের সুর । অলকা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমেনা বুড়ির দিকে । তার দৃষ্টিতে যেন তীর ছুড়ছে ,, চোখ রক্ত বর্ন ধারন করেছে,, কপালে টানটান ভাঁজ । অলকা'র তাকানোতে আমেনা বুড়ি খানিক ভড়কে যায় । 
অলকা একটু এগিয়ে বলে ওঠেন...

" ঠিক কইছো খুঁড়ি ..। এই গায়ে আমার মাইয়ার মত মাইয়া একটাও মাইয়া নাই ‌। কারন কি জানো ..? কারন... আমার মাইয়া পবিত্র,, ফুলের মত পবিত্র । ওয় স্নিগ্ধ,ওয় কোমল,, ওয় অনন্য । ওর এই গায়ের রঙে ,ওর‌ এই রূপে ওয় সকলের থেইকা আলাদা । খালি ধলা চামরা থাকলেই হয় না । আমার মাইয়ার এই শ্যামলা চেহারা আমার চৌখের প্রশান্তি । আমার মাইয়া.....

অলকা কে কথার মাঝপথে থামিয়ে কেও একজন বলে ওঠেন....

" কোন মুখে এই মাইয়ারে লইয়া এতো বড় বড় কথা কইতাছোস বুঝি না বাপু । তোর মাইয়া কালা এইটা কি অস্বীকার করতে পারবি তুই ? কালা হওনের লাইগা এমনিতেই কোন বিয়ার ঘর আহে নাই কোন দিন । যেওবা একটা আইছিলো সেইটাও ভাইঙ্গা গেল ‌। স্বামীর ঘরের ধুলা পায়ে লাগার আগেই সবকিছু শেষ হইয়া গেল । সাথে যোগ হইলো লগ্নভ্রষ্ঠা খেতাব । ক্যামনে ঘর থাইকা তাড়াইবি এই মাইয়ারে ..?

সবার মাঝ থেকে কথা গুলো বলেন ঘ্যাঁগি বুড়ি। বয়স অনেক বেড়েছে তার ,, রুগ্ন শরীর বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে গেছে । গলায় গলগন্ড থাকার কারণে পুরো গ্রামে ঘ্যাঁগি বুড়ি নামে পরিচিত তিনি । শ্যামা কে কথা শোনাতে পেরে ঘ্যাঁগি বুড়ির চোখে যেন আনন্দ উপচে পড়ছিল,, তার কন্ঠে বিজয়ের সুর । 
অলকা তার দিকে তাকিয়ে বলেন....

" কি যে কন চাচি... আমার মাইয়ারে আমি তাড়াইতে যামু ক্যান ? আমার মাইয়া আমার কাছে বোঝা হয় নাই এহনো । 
আর আমি যতদূর জানি,, যৌবন কালে আপনার গলগন্ডের জন্যে আপনার একটাও বিয়ার সম্বন্ধ আহে নাই কোন দিন । অবশেষে বাপ-মা অতিষ্ঠ হইয়া লুকাইয়া চুড়াইয়া কোন মতে মতিন চাচার লগে বিয়া দিছিলো আপনার । বিয়ার পরও ভালোভাবে সংসার করতে পারেন নাই একদিনও । চাচার হাতে অনেক মাইর খাইছেন । 

অলকা এবার আমেনা বুড়ির দিকে তাকিয়ে বলে...

" আর খুঁড়ি,, শুনছিলাম চাচার লগে তোমার যখন বিয়া হইছিলো তখন তোমার বয়স ছিলো ২৩ বছর । তাও আবার দ্বিতীয় বিয়া । সেই তুলনায় আমার মাইয়ার বয়স এখনো অনেক কম ।

তাইলে তোমরাই ভাবো ,, আমার মাইয়া তোমাদের থাইকা হাজার গুণ -- না না, কোটি কোটি গুণ ভালো আছে । ওরে নিয়া তোমাগোর কাউরে চিন্তা করতে হইবো না । 

অলকা'র ঠান্ডা মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণ খোঁটা দেওয়া কথায়, আমেনা বুড়ি এবং ঘ্যাঁগি বুড়ি দুইজনেই চুপসে যান । তীব্র অপমান বোধে মাথা নুইয়ে নেয় দুজনে । 
এই বয়সে এসে অলকা তাদের এতো কথা মোটেও শোনাতে চাননি । কথা গুলো বলতে নিজের কাছেও অনেক খারাপ লাগছিল অলকা'র । কিন্তু তিনি আজ থেমে যাননি ,অনেক সময় চুপ করে থাকাটা মানুষের দূর্বলতা হয়ে যায় । 

অলকা এবার শ্যামার দিকে তাকায় । শ্যামা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‌। দৃষ্টি মাটিতে সীমাবদ্ধ । নিস্তেজ শরীরটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে শ্যামার । 
অলকা মেয়ের চিবুক ধরে নিচু মাথাটা উঁচু করে দেন...
কন্ঠে দৃঢ়তা অথচ নরম স্বরে বলেন ...

" তুই মাথা নিচু কইরা নয় ,, মাথা উঁচু কইরা বাঁচবি । মনে রাখবি,, সম্মান সবকিছুর আগে, নিজেরে কখনো ছোট ভাববি না,, এখন থাইকা নিজের মর্যাদা,, নিজের সম্মান তুই নিজেই রক্ষা করবি । 
আর কিসের জন্য কষ্ট পাইতাছোস তুই,, হ্যাঁ । আরে তোর জীবন তো একটা ভুল থাইকা বাঁইচা গেছে । শুকরিয়া আদায় কর আল্লাহর কাছে । চারদিকে তাকায় দেখ সবাই তোরে দেখতাছে । 
তুই যে সুন্দর, সেইটা সবাই জানে । আর তোর এই সৌন্দর্যকে সবাই হিংসাও করে ।‌ এই শ্যামলা রঙের মধ্যেই তুই অনন্য সৌন্দর্যৈর অধিকারি ,,যা হাজারো সাদা চামড়ার মধ্যে নাই । কিন্তু হ্যাঁ,,সবাই কিন্তু এইটাও জানে তোর এই শ্যামলা গায়ের রং তোর দুর্বলতা,,তাই তো তোরে সবাই হিংসা করে ,, তোর দুর্বলতা নিয়ে খোটা দেয় । তোর আশেপাশের লোকে তোরে নিয়া যা ভাবে ,, তুই নিজেও তোরে নিয়া তাই ভাবিস । 
কিন্তু আর না ,, তুই আর সহ্য করবি না । আইজ থাইকা তুই নতুন কইরা বাঁচবি ,,আইজ থাইকা তোর নতুন জীবনের রচনা হইবো । যেই জীবনে তুই নিজের মত কইরা বাঁচবি,, কারোর চোখে পড়ার জন্য নয় ,, বরং নিজের আত্মমর্যাদার জন্য ।

শ্যামা অলকা'র চোখে চোখ রাখে । মায়ের চোখে অদ্ভুত দিপ্তী লক্ষ্য করে সে । শূন্যে তাকানোর মত এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে । অলকা'র কথায় ফোড়ন কাঁটে মোখলেছ । তিনি মুখ বাঁকিয়ে গলা কাঁপিয়ে ব্যঙ্গ করে অলকা কে বলেন...

" এই মাইয়ারে নিয়া তোর এত কিসের লাফানি ..? এই মাইয়ার লাইগা আইজ আমার সব মান সম্মান ধুলায় মিইশা গেছে । এহন আমি সমাজের কাছে ক্যামনে মুখ দেখামু..? কি কইবো আমারে সবাই -- লগ্নভ্রষ্ঠা মাইয়ার বাপ ..?
মুখ পুড়ি , অলক্ষ্যি মাইয়া একটা বিয়ার বাজারেও টিকতে পারলি না তুই ... আরে তোরে জন্ম দেওয়াটাই আমার পাপ হইছে । জন্মের পর যদি মুখে একটু বিষ ঢাইলা দিতাম, তাইলে আইজ আমার এমন দিন দেখতে হইতো না ‌। 

বাবার কথায় শ্যামার এতক্ষনের জমে থাকা চোখের পানি ঝড়ঝড় করে ঝড়ে পড়ে । তিক্ততায় চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় সে । প্রতিটা শব্দ যেন ছুরির মতো শরীরকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিচ্ছে শ্যামার । 
শ্যামা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না । এক ধাক্কায় হুড়মুড়িয়ে ধপ করে বসে পড়ে মোখলেছের পায়ের কাছে । দুহাতে মাথা চেপে ডুকরে কেঁদে ওঠে মেয়েটা । মোখলেছ বিরক্তিতে দু'পা পিছিয়ে যান । অলকা সহ উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে যান । অলকা দু'পা এগিয়ে আসেন মেয়েকে সামাল দিতে, কিন্তু কিছু একটা ভেবে থেমে যান তিনি । রুপা আর ফুলি এগিয়ে আসতে চাইলে, ওদেরকেও ইশারায় আটকে দেন । শ্যামা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে, জড়ানো কন্ঠে বলে....

" আমি যখন এতোই অভিশপ্ত,এতোই অভাগী,এতোই অলক্ষ্যি -- তাইলে জন্মের পর ক্যান আমারে মাইরা ফেলাইলেন না আব্বা ..? ক্যান আমারে জন্ম দিলেন আপনি ..? আর যখন জন্মই দিলেন,, তখন ক্যান ভালোবাসলেন না আমায় ..? কি দোষ আছিল আমার ..? কি দোষ আছিল ,,,বলেন না..? আমি তো নিজেই নিজেরে বানাই নাই‌ আব্বা ... ঐ আল্লাহ আমারে বানাইছে,,ঐ আল্লাহ আমারে দুনিয়াতে পাঠাইছে .. তাইলে আমার ভাগ্যটা ক্যান এমন হইলো..? 
ক্যান কোন দিন আমি আমার আব্বার আদর , ভালোবাসা পাইলাম না ..? ময়নাকে আর আপাকে যেভাবে ভালোবাসেন, আমারে ক্যান সেভাবে ভালোবাসলেন না..? 
আমার খুব কষ্ট হয় আব্বা ,, খুব কষ্ট হয়,, আপনি জানেন..? আমার দম বন্ধ হইয়া আসে .. হা-হুতাশ করে মরে যাওয়ার মত হাহাকার জন্মায় আমার বুকে । আপনি জানেন আব্বা..আমার মনে না অনেক কষ্ট জমা আছে , কিন্তু দেখেন যেইখানে আমি আমার মুখের কথা কাউরে বুঝাইতে পারি না, সেইখানে মনের কথা বুঝামু ক্যামনে ..? আমার সবচাইতে বড় ব্যর্থতা আমি কোন দিন আমার মনের , গভীর কথা, অনুভূতি, কষ্টগুলা কাউরে বুঝাইতে পারি নাই । 

শ্যামা হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে আবারো বলে...

" জানেন আব্বা,, আমার বিয়া ভাইঙ্গা গেছে তাতে আমার কোন কষ্ট নাই , বিশ্বাস করেন কোন কষ্ট নাই । আমার খালি এইটাই কষ্ট - আমার খুব অসহায় লাগে, মনে হয় এই দুনিয়াতে এতগুলা মানুষ থাকতেও আমার আপন বইলা আমার আম্মা ছাড়া আর কেউ নাই । বিধাতা আমার জন্য আর কাউরে বানাইলো না,,এক আম্মা ছাড়া আমারে কেউ ভালোবাসলো না । এটা খুব কষ্টের.....
জন্ম থাইকা ভাগ্যটা এমন হইবো যদি জানতাম তাইলে, আল্লাহ রে জন্মের আগেই কইয়া দিতাম - আমারে দুনিয়াতে পাঠাইয়ো না আল্লাহ,, আমারে দুনিয়াতে পাঠাইয়ো না ....

অলকা এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে মেয়ের আহাজারি শুনেছিলেন । শ্যামার ভেতরের সব চাপা কষ্ট বেড়িয়ে এসেছে আজকে । অলকা থামায় নি মেয়েকে,, এতদিনে জমে থাকা সকল কষ্টের ভার হালকা হতে দিয়েছেন তিনি ।‌
শ্যামা যে এতো গুলো কথা বলতে পারবে ভাবেন নি অলকা ,, তার মেয়ে এতগুলো কথা কখনো বলেছে কিনা তাও জানা নেই ।‌ চুপচাপ শান্ত স্বভাবের মেয়েটার আহাজারি অলকার মনকে নাড়িয়ে তোলে । পাশে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ফুলি । অলকা চোখের পানি মুছে শ্যামার কাছে গিয়ে বসে.. শান্ত কন্ঠে বলে....

" কার‌ জন্য কানতাছিস তুই ..? আর এই অমানুষ টার পায়ে পইড়াই বা কানতাছোস ক্যান তুই.. হ্যাঁ ..? যে তোরে কোনদিন ভালোই বাসলো না , তার পায়ে পইড়া কানতাছিস..ও বুঝবো তোর কষ্ট..? 
একটা কথা কি জানিস শ্যামা... চৌখের পানি ফেলাইয়া কারোর আপন হওয়া যায় না, কারোর ভালোবাসা পাওয়া যায় না.... কারন যে আপন, যে ভালোবাসে সে কখনো চৌখে পানি আসতেই দেয় না ,সে কখনো কান্না করতে দেয়‌ না । 

শ্যামা মায়ের বুকে আছড়ে পড়ে.. কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে শ্যামার,, সে কান্নারত কন্ঠে বারবার আওড়িয়ে বলে...

" আম্মা গো তোমার মত কেউ হইলো না আম্মা । কেউ আমারে তোমার মতো কইরা মায়া দিয়া ভালোবাসলো না । 
আম্মা আমারে একটু জড়াই ধরো আম্মা,,আমার মাথায় একটু হাত রাখো আম্মা ,, আমার খুব কষ্ট হইতাছে আম্মা । 

অলকা শ্যামাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন । বাঁধ ভাঙ্গা চোখের পানি ছেড়ে দেন তিনি । মোখলেছের দিকে ভেজা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ক্ষুব্ধ স্বরে বলে....

'' যদি  আমাদের চৌখ দেহের বদলে আত্মা দেখতো,তাহলে সৌন্দর্য সম্পর্কে আমাদের একটা আলাদা ধারণা থাকতো ।

অলকা ধীরে ধীরে মেয়েকে ধরে উঠে দাঁড়ান। মেয়ের দুই কাঠে হাত রেখে জোরালো কন্ঠে সবার উদ্দেশ্যে বলেন...

'' আমার ভাইয়া শ্যামা, আমার গর্ভের অহংকার। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।আজ এই জায়গায় আমার মাইয়ারে যারা যারা লাঞ্ছিত করলেন,অপমান করলেন, তাদের সবাইরে কইয়া রাখতাছি-- আমার মাইয়া একদিন এমন জায়গায় যাইবো, সেইখানে আপনাদের কারোর ওর ছায়াও মারাবার ক্ষমতা থাকবেনা । মিলাইয়া নিয়েন আমার কথা .......




চলবে........

Share:

0 comments:

Post a Comment

Xgossip. Bangla Choty Golpo

Tags

Xgossip— Bangla Choty Golpo. Powered by Blogger.

Ad Space

Featured post

গ্রাম্য জীবনের সুখ দুঃখে মা ও ছেলে(১৫)

  পর্ব:১৫ বাবা- কি বলব বাবা তোকে, আসলে তোর মাকে বকা ঝকা করেছি তার কারন আছে তুই আমার ছেলে তোকে কি বলব সব তো খুলে বলা যায়না। আমি- কেন বাবা আমি...

Search This Blog

🔞 ১৮% সতর্কবার্তা

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন।

About Us

About Us
এই খানে পাবেন বিভিন্ন লেখকদের বিভিন্ন ক্যাটাগরির চটি গল্প।

Translate

Popular Posts

Popular Posts