লেখক:তন্দ্রাতরঙ্গ
পর্ব:০৩
"আমায় এভাবে ইগ্নোর করার কি মানে?"
অসহায় কন্ঠে অয়ন উচ্চারণ করলো।তার চোখ টইটম্বুর হয়ে আছে যেন এখনি গড়িয়ে পড়লো বলে।অথচ সামনে থাকা মানুষটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই এতে।নিজের মনে কোলে থাকা বিড়ালের গায়ে হাত বুলাচ্ছে তিতির।অয়ন আরো ব্যস্ত হলো।এমনটা তিতির করতে পারে না।সে ভালোবাসে তিতিরকে।ধরা গলায় পুনরায় কাতর স্বরে উচ্চারণ করলো,
"আমার অপরাধ?"
চোখ তুলে এবার অয়নের দিকে তাকালো তিতির।অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেলো।এই দৃষ্টি...এতে কি সে ঘৃণা দেখছে?শত-সহস্র মানবানুভূতির মধ্য থেকে ওই অনুভূতিই কেন?তিতিরের এমন ঠান্ডা দৃষ্টি অয়নের দৃষ্টিপথে দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যেন তার শিরদাঁড়া বেয়ে এক ঠান্ডা স্রোত হয়ে নেমে গেলো।তিতির কাঠকাঠ কন্ঠে উচ্চারণ করলো,
"বাসনা"
বলেই তিতির জানলার পাশ থেকে চলে গেলো।আদরের ব্যাঘাত ঘটায় বিড়ালটা ডেকে উঠলো,তারপর তিতিরকে অনুসরণ করে অন্তঃপুরে চলে গেলো।জানলার বাইরে এই বৃষ্টির মধ্যে অয়ন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।তিতিরের ঠান্ডা দৃষ্টি তার হৃদয়ে বিদ্ধ হয়ে রয়েছে।আজ হঠাৎ ওর উপলব্ধি হলো...সব ওর দোষ। এই বিশ্বে প্রতিদিন যত দুঃখ-কষ্ট আছে,তার সবের জন্য দায়ী একমাত্র অয়ন।ও না জন্মালে এসব হতো না হয়তো।আর যাই হোক এসব দেখতে তো হতো না।ধীর পদক্ষেপে সে বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পিচঢালা রাস্তায় উঠে এলো।মাঝ্রাস্তায় হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে পড়লো।অপেক্ষা করলো,এই ঝড় থেমে যাওয়ার। ---------------
মাথায় ঘোমটা টেনে তপতী দ্রুত পায়ে সামনে এগোচ্ছে।কেবল মাত্র একটা ঘোমটা তাকে বৃষ্টির থেকে রেহাই দিলো না।পায়ের স্যান্ডেল হাতে নিয়ে সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে ওকে।ছিড়ে গেলে পিসিমা নতুন কিনে দেবেন না।বেশ খানিকটা এগোনোর পর হঠাৎ কি একটা গাছের শিকড়ের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলের নখ উল্টিয়ে ফেলল।যন্ত্রণায় অস্ফুট এক চিৎকার করলো সে।তার পায়ের রক্ত বয়ে চলেছে এই মাটির পথ ধরে।রাক্ষুসে মাটি!এত বৃষ্টিতেও তার তৃষ্ণা নিবারণ হয় না?খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকলো তপতী।হঠাৎ তার কানে এলো এক সৌম্য, গম্ভীর কন্ঠস্বর,
"কী হয়েছে তোমার?"
তপতী পেছন ফিরতেই দেখতে পেলো কালো রঙের ছাতা মাথায় একজন পুরুষ।তার পরনে একটা সাদা রঙের নীল রঙের শার্ট।লোকটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।তপতী ভয় পেয়ে কিছুটা পিছিয়ে গেলো।এবার লোকটা তাড়াতাড়ি তপতীর কাছে এসে তপতীর হাতে ছাতাটা ধরিয়ে দিলো।পকেট থেকে রুমাল বের করে তপতীর দিকে দিলো।তপতী বুঝতে পারছিলো না কিছু।তখন পুরুষটি নিজেই উদ্যোগ নিয়ে রুমাল দিয়ে তপতীর পা বেঁধে দিলো।তারপর বলল,
"জুতোর জায়গা পায়ে,হাতে নয়।সাবধানে যাও।"
এইটুকু বলে আগন্তুক চলে গেলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে।তপতীর কাছে রেখে গেলো তার খানিকটা যত্ন,কিছুটা ভালো লাগা আর তার ছাতা।তপতী আর অপেক্ষা না করে তার গন্তব্যের দিকে পা বাড়ালো।মুখ ফুটে একটা শব্দ বের হলো,
"আশ্চর্য!!! "
---------------
রুমে প্রবেশ করে তপতী দেখলো জানলা দিয়ে বাতাস এসে খাটের ও টেবিলের উপরের বেশ খানিকটা ভিজে গেছে।শ্বেতা উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে।পাশে তার প্রাণপ্রিয় মোবাইল পড়ে আছে।তপতী নিঃশব্দে জানলা বন্ধ করলো।বৃষ্টি আরো জোরে আসবে বোধ হয়,চারদিকে রাত্রির মতো ঘন অন্ধকার।তপতীর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো এই অন্ধকার দেখ,মনে হলো এই অন্ধকার বুঝি এখনই তাকে নিজের মধ্যে টেনে নেবে,ঠিক ব্ল্যাক হোলের মতো।তাদের বিজ্ঞান ম্যাডাম ব্ল্যাক হোল নিয়ে বলেছে একদিন ক্লাসে,খুব ভালো লেগেছিলো সেদিন শুনতে।কিন্তু আজ বিষয়টা ভয়ংকর মনে হলো। জানলা বন্ধ করে টেবিলের উপর পড়ে থাকা "চরিত্রহীন" নিয়ে সে পাতা উল্টাতে লাগলো। সে বেশ কিছু বই পড়েছে শ্বেতার থেকে।শ্বেতাই একমাত্র মানুষ বোধ হয় যে ওকে ভালোবাসে।শ্বেতার বইগুলো শ্বেতা কাউকে ধরতে দেয় না,তপতী ছাড়া।বেশ মজা লাগে তপতীর কাছে।হঠাৎই শ্বেতা ঘুমের মধ্যে কিছু একটা বলল।তপতীর হাসি পেলো এই দৃশ্য দেখে।ইচ্ছে হলো একটা ছবি তুলে রাখতে। কিন্তু মোবাইল নেই তার,তাই তুলতে পারলো না।শ্বেতাকে তপতীর কাছে একজ৷ অসম্ভব সাহসী আর জেদি মানুষ মনে হয়,মনে হয় যেন শ্বেতা কোনো মন ভালো করে দেওয়ার জাদু জানে।তার কাছে মন খারাপ করে থাকা যায় না আর না কখনো তার মন খারাপ থাকে। আবার মাঝে মাঝে শ্বেতাকে বোকা মনে হয়!নইলে কেনো সে তপতীর মতো একজনকে ছোটো বোনের মতো ভালোবাসে? এক গভীর দীর্ঘশ্বাস আসে তার। বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে তপতী।
হঠাৎই শ্বেতা জেগে উঠে তার মোবাইলের বিকট চিৎকারে। ধড়ফড় করে উঠে দেখে ২৪০০ থেকে কল এসেছে।মেজাজটা বিগড়ে যায় ওর। উঠে বসেই দেখে পাশে তপতী বসে ওর দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। শ্বেতা উঠে বসে তপতীকে জিজ্ঞেস করে,
"পড়া শেষ বইটা?"
"এখনো না"
"বাড়িতে নিয়ে যা, পড়া হয়ে গেলে ফেরত দিস।"
তপতী চকিতে চোখ তুলে তাকালো শ্বেতার দিকে। ভয়মিশ্রিত চোখে বলল,
"না... আমি...আমি এখানে এসেই পড়তে পারবো।ওখানে এসব পছন্দ করবে না ওরা।"
শ্বেতা ভ্রু কুঁচকে তাকালো তপতীর দিকে।তারপর জিজ্ঞেস করলো,
"মাসিমা কি তোকে পড়তে বসলে জ্বালায় নাকি?এমনভাবে বললি কথাটা?"
অসহায় চোখে তাকায় শ্বেতার দিকে তপতী।তার পিসিমা যে কেমন তা সবাই জানে। সবাই তপতীকে দয়া করে, তবে তাতে যে বিন্দুমাত্র আন্তরিকতা থাকে না,তা যে লোক দেখানো এইটা এতদিনে বুঝতে শিখে গেছে সে। আর সেখানে শ্বেতা কিনা এমনভাবে কথা বলে যেন সব দোষ তপতীর। তপতীকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শ্বেতা বলল,
"ভালোই করে।সাইন্স নিয়ে আবার এত উপন্যাস পড়া কিসের?সামনের বছর ক্লাস টেনে উঠে তাহলে সরষে ফুল দেখবি। এখানে এসেই ঘড়ি ধরে ১৫ মিনিট বই পড়বি।"
তপতীর মুখে হাসি ফিরে এলো। এই মেয়ে কখনো মুখ ফুটে না বললে কি হবে,তপতী ঠিকই বুঝে যে এই কঠোরতার আড়ালে কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।
চলবে........
|
0 Comments