গল্প:এক নির্বাসিত বসন্ত (পর্ব:০২)


 

লেখক:তন্দ্রাতরঙ্গ


পর্ব:২





কামড় বসিয়ে দিতেই অচেনা লোকটা ছোটো একটা চিৎকার দিয়ে দূরে চলে গেলো কিছুটা।হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
"তুই কি কুকুর?এভাবে মানুষকে কামড়াস কেন?"


"আপনি মানুষকে অপহরণের চেষ্টা করবেন আর আমি কামড়ালে দোষ?"

"অপহরণ? ছি! আমি ওসব করতে পারি?"

"নাহলে?"

"আমি তো তোর সাথে একটু কথা বলার অপেক্ষায় ছিলাম জাস্ট"

"কে আপনি?"

"শ্বেতা!আমি...অরুণ!!তুই ভূলে গেছিস?"

শ্বেতা মনে করার চেষ্টা করলো এই নামের কাউকে সে চেনে কিনা।বহু চেষ্টার পর এমন একটা নাম তার মস্তিষ্ক খুঁজে পেলো।তার মা প্রায়ই কোনো এক অরুণের গুণগান গায়।এ কি সে?এই কি সেই বাগানবাড়ির অরুণ?নাহ!শ্বেতার মনে যে চেহারা ভেসে উঠছে তার সাথে এই চেহারার কোনো সাদৃশ্য বের করতে পারলো না তার।একজন মানুষের এত পরিবর্তন কি হয় কখনো?

শ্বেতাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অরুণ এক পা এগিয়ে এলো।তখনই শ্বেতা জোর গলায় বলে উঠলো, 
"একদম এগোবেন না।আমি আপনাকে চিনি না।পেছনে যান...দূরে থাকুন আমার থেকে।"

অরুণ কিছুটা আশাহত হলো।কিন্তু দমে না গিয়ে সে তার মোবাইল বের করে শ্বেতাকে একটা ছবি দেখানোর চেষ্টা করলো।শ্বেতা মোটেই বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নেয় নি। অরুণ মোবাইল বের করতেই সে দৌড়ে সোজা রাস্তায় উঠে এলো।তারপর সোজা দৌড় দিলো একবারও পিছনে না তাকিয়ে।আর পেছনে রেখে গেলো হতবিহ্বল অরুণকে।

------------

বাড়িতে ফিরতেই তার মায়ের তাড়া খেয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে খাবার খেলো শ্বেতা।খাবার খেয়ে শরীরের ভরটুকু বিছানার উপর ছেড়ে দিয়ে সে আজকে তার সাথে ঘটা ঘটনার কথা চিন্তা করছিলো।

এতক্ষণ আর সময় পায় নি এসব ভাবার।অরুণ...কি বলতে চেয়েছিলো লোকটা।
মনে মনে অরুণের ছোট বেলার একটা চেহারা আঁকার প্রয়াস চালালো শ্বেতা।
পারলো না সে, বারবার সেই লোকটার চেহারায় গিয়ে থামছে।
তাই এসব ভাবনা বাদ দিয়ে সে তার মোবাইল হাতে নিলো।
একটু নিউজফিডটা ঘুরে আসা যাক।হঠাৎই লক্ষ্য করলো তার একটা মেসেজ রিকোয়েস্ট এসে রয়েছে।
আইডির নাম "শমিত বন্দোপাধ্যায়"।
মনে বেশ কৌতূহল নিয়ে শ্বেতা আইডিটা ঘুরে দেখলো।একটা ফেইক আইডি,কোনো পোস্ট নেই, ফ্রেন্ডও তেমন নেই।
মনে মনে বেশ কষ্ট পেলো শ্বেতা।
এমন সুন্দর একটা আইডির নাম, এটা ফেইক না হলে কি হতো?মেঘের গর্জন শুনা যাচ্ছে, আজ আবার বৃষ্টি নামবে, আবারো পৃথিবীর বুকে শীতলতা ছড়াবে আজ।
জানলা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শ্বেতা।
তারপর কখন যে ঘুমকুমারী এসে তার চোখে ভর করলো তা সে টের পেলো না।
জানলা দিয়ে শোঁ শোঁ আওয়াজ করে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করে শ্বেতার চুলগুলো নিয়ে খেলায় মত্ত হলো, টেবিলের উপর পরে থাকা " চরিত্রহীন" এর পাতা উল্টাতে লাগলো।কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝম করে পৃথিবীর বুকে বৃষ্টি নেমে এলো।

-----------------

"রাস্তার মানুষকে শরীর দেখাতে খুব ভাল্লাগে না?" 
বিশ্রী মুখভঙ্গি করে তপতীর দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন অনামিকা। 
তপতী এসব গায়ে না মেখে সোজা ঘরে ঢুকে গেলো।শুকনো জামা-কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢুজে গেলো ভেজা জামা পাল্টানোর জন্য তার এহেন আচরণে অনামিকা আরো রেগে উঠলেন।
গলা চড়াও করে বললেন,

"জমিদারের বেটি কিনা?তা আমাদের গরীব ঘরে বাবা এসবের চলন নাই।ছা-পোষা মানুষ আমরা,আমাদের মান-মর্যাদাটাই সব।
জমিদারের বেটি পুরো এলাকায় শরীর দেখিয়ে আমার বাড়িতে এসে থাকবেন ভাববেন আমি চুপ করে থাকবো তা তো হচ্ছে না বাপু।
গরীবের টানাটানির সংসারে তোমায় জায়গা দিচ্ছি তাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে আমাদেরই মান ডুবাচ্ছে।"

কাপড় পালটে বাইরে আসলেই অনামিকা তপতীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে এবার সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
"কি এমন রাজকার্য করছিলি তুই?স্কুলের নাম করে সারাদিন বাইরে থেকে তোমার ফষ্টিনষ্টি তো চলবে না এখানে বাপু।স্কুল তো অনেক আগে ছুটি হয়েছে।কোথায় ছিলি?”

শেষের লাইন বেশীই জোরে বললেন অনামিকা।তপতী দুর্বল কন্ঠে উত্তর দিলো,

"বৃষ্টি হচ্ছিলো তাই... "

কথা শেষ হওয়ার আগেই অনামিকা সজোরে তপতীকে চড় মারলেন।তারপর টেনে নিয়ে দরজার সামনে নিয়ে ধাক্কা মেরে বললেন,

"তো ফিরে এলি কেন?যা না...সেখানেই গিয়ে থাক।আমার হয়েছে যত জ্বালা।
বাপ-মা মরে আমার ঘাড়ে উঠিয়ে দিয়ে গেছেন...নাও, এবার মানুষ করো এনাকে।
আপদ একটা!" 



বলেই গজগজ করতে করতে উনি ভেতরে চলে গেলেন।তপতী বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো।
তার কী দোষ? তার বাবা-মা কেন তাদের সাথে ওকেও নিয়ে গেলো না?কেন তার বিধবা পিসিমার বাড়িতে তাকে রেখে গেলো?তাকে তো রাস্তায় শেয়াল-কুকুরের খাবার হিসেবে ফেলে গেলেই পারতো, কেন এভাবে অন্যকে কষ্ট দিয়ে বেঁচে থাকা ওর? শ্যামবর্ণা গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।

প্রচন্ড বৃষ্টিতে ভিজে বাড়িতে না এসে একটা ছাউনির নীচে আশ্রয় নেওয়ার অপরাধে আজ তার খাওয়া বন্ধ।
মনে মনে তার বান্ধবীদের সে দোষারোপ করলো।
তারা যদি জোর না করতো তাহলে সে তাদের সাথে আসতো না, তাহলে এসব কাহিনীও হতো না।
এই কাজের জন্য কয়দিন যে পিসিমা মুখ কালো করে রাখবে কে জানে!চোখের জল মুছে ওড়না মাথায় টেনে সে বেরিয়ে পড়লো।
এখানে থেকে লাভ নেই,সন্ধ্যার আগে পিসিমা তাকে ঘরে ঢুকতে দেবে না।



চলবে.............


 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×