গল্প:এক‌ নির্বাসিত বসন্ত (পর্ব:০৪)



লেখিকা:তন্দ্রাতরঙ্গ

পর্ব:০৪



"এত এত কবিদের মাঝে তোমার সমরেশ মজুমদারের বই কেন বেশী পছন্দ? শরৎচন্দ্রের বই কিসে কম তার থেকে?"
তপতী শ্বেতাকে জিজ্ঞেস করলো।

"কম-বেশী বলে কিছু নেই। দুইজনই আমার পছন্দের।শরৎচন্দ্র সহ্য করতে শেখায় আর সমরেশ লড়াই করতে।তবে সমরেশকে আমার বেশী পছন্দ কারণ উনি দীপাবলির মতো একটা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন।"

"সাতকাহন? "

"হুম"

"তোমার কি মনে হয় না যে দীপা একটু বেশী বেশী করে? চাইলেই তো অলোককে একটা সুযোগ দিতে পারতো, একটু পূর্ণতা পেতো। "

তপতীর এই কথায় শ্বেতা হাসলো।তারপর বললো,

"প্রেম কি কখনো অপূর্ণ হয়? দীপাবলি ঠিক কাজই করেছিলো।বড় হয়ে আরেকবার পড়লে বুঝতে পারবি তখন।"

তপতী এহেন উত্তরে গাল ফোলালো আর বললো,

"এমন তো না যে তুমি আমার থেকে বেশী বড়।"

শ্বেতা বেরিয়ে গেলো ফ্রেশ হতে।সত্যিই তো! ও কেন এমনভাবে চিন্তা করছে? এই বয়সে তো ওর চিন্তাও তপতীর মতোই হওয়ার কথা।ও কেন বড়দের মতো চিন্তা করছে?ফ্রেশ হয়ে পুরো ঘর খুঁজে দেখলো তার মা ঘরে নেই।বিরক্ত হলো একটু শ্বেতা।এই দুর্যোগের দিনেও পাশের বাড়িতে গল্প করতে গেছে।

গ্যাস অন করে চট করে চা বসিয়ে দিলো শ্বেতা।চা না খেলে মাথা কাজ করে না ঠিকমতো। চা হতে হতে একটা মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে নিলো।আজ কারেন্ট না আসার সম্ভাবনা বেশী,এইটা দিয়েই পড়া যাক।চা করে নিয়ে দুটো কাপে ঢেলে তপতীর কাছে গেলো।তপতী মন দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে।এই মেয়েকে ফর্সা না হলেও প্রচন্ড সুন্দরী বলা যায়।এইজন্যই কি ওর পিসিমা ওর সাথে এমন খারাপ আচরণ করেন?হয়তো...

---------------

"এই মেয়েকে এত পাত্তা দিস কেন রে?মাথায় চড়ে বসবে তো!"

শ্বেতার মা মাথা মুছতে মুছতে বললেন।এইমাত্রই খাবার খাইয়ে তিনি তপতীকে তার বাড়ির দিকে এগিয়ে দিয়ে এসেছেন।
শ্বেতা কথাটা গায়ে মাখলো না দেখে তিনি আবার বললেন,
"দেখো বাপু।যা ভালো বোঝো। কোনদিন দেখবে তোমার শেলফ ফাঁকা করে সমস্ত বই নিয়ে চলে যায়।এসব মেয়েদের বিশ্বাস আছে নাকি?"

"মা!!! ও চোর নয়।প্লিজ এভাবে বলো না।"

তখনই তপতীর বাবার আওয়াজ ভেসে এলো রুম থেকে,
"কিভাবে বলবে তাহলে?আমরা বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে দেখছি না,আমরা চাইছিও না এসব ফাঁদে তুমি পা দাও।এই নিয়ে আর কথা হবে না।"

শ্বেতা চুপচাপ নিজের রুমে চলে গেলো। তার বাবা-মায়ের এমন আচরণে তার লজ্জা লাগলো।এসব যদি বাইরের মানুষ জানতে পারে তাহলে কি হবে.?

------------

বাড়িতে আসতেই চুলির মুঠি ধরে তপতীকে টানতে টানতে রান্নাঘরে নিয়ে এলেন অনামিকা দেবী।
"ছেমড়ির সাহস কত আরেক বাড়িতে গিয়ে বসে থাকে!এখানের কাজ কাম কি তোর মরা মা এসে করবে হারামজাদি?"

বলেই তপতীকে জোরে ধাক্কা মারলেন।তপতীর মাথা দেয়ালে বাড়ি খেলো।

"পুরো রান্নাঘর একদম সাফ হয় যেন।দশটা বাজে যেন রাতের খাবার তৈরি থাকে।যতসব... "

তপতী ধীর পায়ে কলপাড়ে যায়।কপালটা জ্বলছে, হাত দিয়ে ভেজা ভেজা অনুভব করলো।চার্জলাইটের আলো শেষের দিকে, তবুও মিটমিট করে জ্বলছে কারণ জ্বলে থাকতে হবে।দুপুরের সকল এঁটো বাসন ধুয়ে,চুলো মুছে তপতী রান্না চাপালো।চারদিকে ঘোর অন্ধকার...তা শেষ হবে কবে?শ্বেতাদি বলে মানুষের খারাপ সময় নাকি আজীবন থাকে না,ওর এই দুঃখ কবে শেষ হবে?কখন ওর একটা ঘর হবে?একটা পরিবার থাকবে যারা ওকে ভালোবাসে? ও বড় হতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?বড় হলেই কি ওর সুখের দিন আসবে?ও উত্তর পায় না...কেবল চুলোর মধ্যে কাঠকয়লা জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে চেয়ে থাকে।

--------------

স্কুলে গিয়েই শ্বেতা দেখলো আজ অর্ধেক মানুষই আসে নি।কাল রাতে একটু ঝড় হয়েছে কি হয় নি এতেই ওরা সকলে গায়েব। আফরোজা আর সুপ্রিয়াও আসে নি আজ।চুপচাপ বই খুলে বসে পড়লো শ্বেতা। তখনই পত্র ঝালমুড়ি খেতে খেতে হাজির হলো।

"দেখলি আজ কোনো মানুষজন নেই?"

"না"

"না মানে?"

"দেখি নি এখনো"

"অসভ্য "

"...."

"পড়া ধরবে আজ? আমি কালকে পড়তে পারি নি একদম, কিছুই পারি না।"

"আমি তো পেরেছি।তুমি পারলে না কেন ডার্লিং? "

"সবাই কি তোর মতো ব্রিলিয়ান্ট নাকি?আমরা পারি না।"

"তাহলে আর কি!"

"শুন না... আমি বাসায় এই বিয়ের জন্য মানা করে দিয়েছি জানিস?"

"এখন কি রিগ্রেট হচ্ছে?"

"না...তবে কি জানিস?অয়ন ভাই মনে হয় এই সিদ্ধান্তে খুশি নয়!"

"ওহ"

"কি ওহ?উনি কি চাচ্ছিলেন যে আমার বিয়ে হয়ে যাক?উনি কি আমায় একদমই পছন্দ করেন না?"

"করেন হয়তো...কেবল বোন হিসেবে। "

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পত্র বেঞ্চে বসলো।বসেই অন্যমনস্ক হয়ে গেলো।শ্বেতা মাথা তুলে একবার পত্রের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নামিয়ে নিলো।তারপর বইয়ের দিকে চোখ রেখে বলল,

"কিছু কিছু জিনিস কখনো জোর করা যায় না,বিশেষ করে অনুভূতি। "

শ্বেতা এবার পত্রের দিকে ঘুরে বসলো।পত্রও শ্বেতার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,

"অয়ন ভাই বোধ হয় অন্য একজন মেয়েকে পছন্দ করে জানিস?"

"কিভাবে বুঝলি?"

"বারে!ঢাকা শহরের মেয়েরা কত স্মার্ট, দেখতেও সেরা।ওখানে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে যে অয়ন ভাই আমায় পছন্দ না করে অন্য কাউকে পছন্দ করবে?"

"যে ভালোবাসে সে কখনো তুলনা করে না। "

"আর..."

"কি?"

"আমার মনে হয় কি জানিস?"

"আর কি মনে হয়?"

"অয়ন ভাইয়ের প্রেমিকা বোধ হয় ধ*র্ষি*তা!"

শ্বেতা পত্রের চোখে চোখ রাখলো।একজোড়া চোখ যাতে বিস্ময়, আরেকজোড়া চোখে কাতরতা!"



চলবে....




 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×