লেখিকা:সুরভী আক্তার
পর্ব:১০
জাফর ব্যাপারি কালচে কড়া দাঁত দু'পাটি পেষেন । আবারো স্বাভাবিক করেন নিজেকে । খিলখিলিয়ে হেসে বলেন....
" একটা চিন্তা আইলো দিমাকে,, তোমারে আর না কোই । তুমি বরং মাইয়ারে সাবধানে রাইখো । চারদিকে খারাপ,কু-নজরের অভাব নাই ।
" সেইটা আমি জানি । আমার মাইয়ার ব্যপারে আমার চিন্তা আছে ।
আমি এহন নামাজ পড়তে যামু, দেরি হইতাছে আমার । আপনি কি বইয়া থাইকবেন, না চইলা যাইবেন ?
জাফর ব্যাপারি উঠে দাঁড়ান । লুঙ্গির এক কোনা একহাতে টেনে বলেন...
" আর না বহি,, যেই লাইগা আইলাম ঐটা তো আর হইলো না । মেলা কাম আছে আমার । বইয়া থাইকা লাভ নাই । যাই আমি...
বলেই বাড়ি থেকে বের হন তিনি । অলকা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থুথু ছুড়ে মারে তার যাওয়ার দিকে । কলপাড় থেকে ওযু করে আসেন । এর মধ্যে শ্যামার নামাজ শেষ । ভেজা চুল গুলোতে এখনো গামছা পেঁচানো । শ্যামা চুল মুছতে মুছতে বাইরে বের হয় । অলকা মেয়েকে দেখে বলেন....
" নামাজ শেষ ?
" হ আম্মা !
" ভাত বাইড়া রাখছি, আমার নামাজ শেষ হওনের আগে তোর আব্বা আইলে, যদি ভাত চায় তাইলে একটু আগায় দেইস । আমি নামাজে গেইলাম ।
" আইচ্ছা আম্মা !
অলকা চলে যান নামাজ পড়তে ।
মোখলেছ একেবারে বাড়ি ফেরেন আসরের পর । তখন নামাজ শেষে বাড়িতে ঢোকার সময় বাড়ির বাইরে জাফর ব্যাপারির সাথে দেখা হয় । তিনি মোখলেছ কে কোথাও নিয়ে গেছিলেন । বাড়িতে এসেই তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলেছেন তিনি । তার কথার আগা মাথা কিছুই নেই । তিনি কি বিষয়ে চেঁচামেচি করছেন সেটা বলছেন না । একবার বলছেন - ঘর থেকে তার নাকি টাকা হারিয়েছে , তো আরেকবার বলছেন - তার নাকি কেউ কোনো খোঁজখবর রাখে না । সকাল থেকে কিছু খান নি তিনি , এই বিষয়ে নাকি কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই । অলকা নীরবে দাঁড়িয়ে শুনছেন । নামাজের পর আর বাড়ি আর বাড়ি ফেরেনি মোখলেছ, তাহলে খাবে কখন ?
একপর্যায়ে শ্যামা কে নিয়ে কটুক্তি করা শুরু করে দেয় মোখলেছ । এই মেয়ের কারনেই তার সংসারের যত কুৎসা,, যত ঘাটতি যত অবমাননা সব এই মেয়ের কারনেই । তার সংসারে অভিশাপের ন্যায় খাড়া হয়ে আছে এই মেয়ে । আরো কতো কি ! মোখলেছের সাথে তাল মেলান কাকড়ি বুড়ি , সুযোগ পেয়েছেন তিনি , হাতছাড়া করা যায় কিভাবে । তাদের দুজনের উচ্চ স্বরে চেঁচামেচির মাঝেই বাড়ির বাইরে লোক জড়ো হয় । দেওড়ির বাইরে থেকে উঁকি দিচ্ছে অনেকে । গ্রামের আশেপাশের মহিলারা মুখ চেপে চোখ সরু করে ফাঁক ফোকড় দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে ।
অলকা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে সব কথা গিলে যাচ্ছেন । প্রতি উত্তরে কোন প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো বা প্রতিবাদ করার মতো রুচি নেই তার । শ্যামা ঘরের ভেতর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে । আজ এতো কথা শোনার পরেও ওর অনুভূতির কোন পরিবর্তন আসে নি । দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছে সবটা ।
এদিকে মোখলেছ আর কাকড়ি বুড়ি নিজেদের মতো বকবক করেই চলেছেন ।
তাদের বকবকের মাঝে কারোর দীর্ঘ সালামের স্বর শোনা যায়....
" আসসালামুয়ালাইকুম বেয়াই সাহেব.....
মোখলেছ চুপ করে কপাল কুঁচকে তাকান । দেউড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে মানিকের কাকা । সাদা পাঞ্জাবি , লুঙ্গি পড়নে । মুখে উৎসুক হাসি । হাতে কয়েকটা হাঁড়ি । দেখে বোঝাই যাচ্ছে মিষ্টির হাঁড়ি । অলকাও ফিরে তাকান কারোর কন্ঠ শুনে । শ্যামা দরজার আড়াল থেকে মাথা বাড়িয়ে একটু উঁকি দেয় । বারান্দা পেরিয়ে দেওড়ির কাছে কে আছে দেখা যাচ্ছে না । তার উপর আবার অলকার শরীরের আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা । তবে না দেখলেও কন্ঠ শুনে উক্ত ব্যক্তি কে চিনতে অসুবিধা হয় না শ্যামার ।
সবার তাকিয়ে থাকার মাঝে আরো একজন বেরিয়ে আসে খিড়কির আড়াল থেকে । মানিকের কাকার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ান তিনি । প্রাপ্ত বয়স্ক তাগড়া একটা যুবক । গায়ের রং শ্যামলা । ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ।
তাদের দুজনকে দেখে মোখলেছ ধাতস্থ করেন নিজেকে । বেয়াই বাড়ির লোকজন এসেছে বলে কথা । মোখলেছ অপ্রস্তুত হেসে সালামের উত্তর নেন । পাল্টা সালাম দেন মানিকের কাকা কে । মানিকের কাকা বরাবরের মতো উজ্জ্বল হেসে সালামের উত্তর দেন । এগিয়ে আসেন তাদের কাছে । শ্যামা এবার লক্ষ্য করে দু'জনকে । ভ্রু কুঁচকায় ও । দরজার পাশ থেকে গলা আরো একটু বাড়িয়ে সম্পুর্ন টা দেখার চেষ্টা করে ।
মানিকের কাকা সবার উদ্দেশ্যে বলেন...
" ভালো আছেন সবাই ?
মোখলেছ ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠেন...
" ভালো আছি বেয়াই সাহেব । কিন্তু আপনে হঠাৎ ? আমাগোরে আগে জানাইবেন তো যে আপনি আইতাছেন । এখন কি করি কন দেহি ? কি গো অলকা, খাড়ায় আছো ক্যান ? বইতে দেও হেগোরে ।
" এতো অধৈর্য হইয়েন না বেয়াই সাহেব । কেবলি তো আইলাম, ধীরে সুস্থে বইয়া লোই । আগে পরিচয় করাই দেই , এইডা আমার পোলা - আফতাব ।
অলকা চকিতে তাকান আফতাবের দিকে । মাথা থেকে পা অবধি পর্যবেক্ষণ করেন একবার । মুখে বাবার মতোই হাসি নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা । বাবার কথায় মাথা তুলে সালাম দেয় মোখলেছ কে । মোখলেছ তাকিয়েই সালামের উত্তর নেন । অলকা বড় ঘরের বারান্দায় চেয়ার পেতে দেন বসার জন্য । সবাই উঠে বসে সেখানে ।
মোখলেছ বলেন....
" তা , হেরে তো আগে দেখি নাই !
" বিদেশে আছিল, ঐ আপনার জামাইয়ের লগে একসাথে আছিলো । তিন দিন আগে বাড়ি ফিরছে ।
অলকা বলে ওঠেন...
" কিন্তু বেয়াই সাহেব , আপনি তো কোইছিলেন হের ফিরতে আরো দেরী হইবো । হের তো আরো একমাস পরে ফেরার কথা আছিল !
মোখলেছ অবাক নয়নে তাকান অলকার পানে । মানিকের কাকা বলেন....
" হ আপা ,, পরে আওনের কথা আছিলো । এইটা তো আমগোরেও কইছিলো । কিন্তু আমাগোরে চমকায় দিয়া হেয় আগেই চইলা আইছে ।
মোখলেছ বলেন...
" তুমি ক্যামনে জানলা, হেয় কবে দেশে আইবো, না আইবো ? চেনো হেরে ?
অলকা উত্তর করতে অপ্রস্তুত হন । তার অবস্থা বুঝে মানিকের কাকা বলেন...
" আমি কইতাছি বেয়াই সাহেব ।
একটু থেমে কন্ঠ নিচু করে বলেন...
" আপনার মাইয়া শ্যামার লগে আমি আমার পোলার বিয়া দিতে চাই । আপনার মাইয়ারে বউ বানাইতে চাই আমার পোলার । দিবেন আপনার মাইয়ারে আমার পোলার বউ হিসাবে ?
মোখলেছ দাঁড়িয়ে যান আচমকা । অবিশ্বাস্য নয়ন যুগল কিঞ্চিত কুঁচকে যায় তার । কাকড়ি বুড়ি পাশে চোখ গোল গোল করে তাকান । আফতাবের দিকে ভালো ভাবে নজর বুলিয়ে নেন । রূপ সৌন্দর্যে কোন অংশে মানিকের থেকে কম নয় , বরং বেশি । শুধু গায়ের রংটা একটু শ্যামলা । শ্যামার মতোই । বিদেশে ছিল এতদিন, শ্যামলা হলেও একটু উজ্জ্বল দেখাচ্ছে ।
মোখলেছ ঢোক গেলেন । শান্ত স্বরে তবে গলা একটু উঁচিয়ে বলে ওঠেন....
" বিয়া মানে ? হঠাৎ কি কইতাছেন এইগুলা আপনি ?
ঐ অপয়া, লগ্ন ভ্রষ্টা মাইয়ারে আপনি স্বইচ্ছায় ঘরে তুলবেন ?
আফতাব ভ্রু কুঁচকে তাকায় । ওর বাবা শক্ত কন্ঠে বলে ওঠেন...
" হ তুলমু ,, স্বইচ্ছায় ঘরে তুলমু । কোনো আপত্তি নাই আমাদের । আর না আমার পোলার । কি কও আব্বাজান ?
শেষ কথাটা আফতাবের দিকে তাকিয়ে বলেন তিনি । আফতাব হেসে উত্তর দেয়....
" শ্যামা কে আমি দেখি নি এখনো । তবে দেখার আগেই ওর বর্ননা শুনেই এই বিয়েতে রাজি হয়েছি আমি । আপনাদের শোনানোর জন্য আবারো বলছি - এই বিয়েতে আমার কোন আপত্তি নেই । বিয়ে করতে চাই আমি শ্যামা কে ।
অলকার বুকটা শীতল হয় । স্বস্তি পান তিনি । আফতাবের কথার ধরন আধুনিক । বেশ শান্ত শিষ্ট । আঞ্চলিকতা নেই ওর মাঝে । পড়াশোনা করেছে, বিদেশে থেকেছে, আঞ্চলিকতা থাকার কথাও নয় ।
মোখলেছ দৃঢ় কন্ঠে বাঁধ সাধেন....
" আপনাগো আপত্তি না থাকলেও আমার আপত্তি আছে এই বিয়াতে । এই বিয়া মানমু না আমি ।
অলকা স্বশব্দে উত্তর দেন...
" আপনি না মানার কেউ নন । আমি মানি,, আর আমার মাইয়ার লাইগা এইটাই যথেষ্ট ।
" মুখের উপর তড়াক কথা কইবা না কইয়া দিলাম । আমি ঐ মাইয়ারে আমার মাইয়ার সংসারে যাইতে দিমু না । আমার মাইয়ার সুখি সংসারের পা বাড়াইতে দিমু না হেরে ।
আফতাবের বাবা একটু অদ্ভুত হাসেন ।
" সুখী সংসার ? ঠিক কইছেন বেয়াই সাহেব , সুখী সংসার আপনার মাইয়ার । কতটুকু সুখী আপনি জানেন । আর এইটাও জানেন, তাগো সংসার আর আমাগো সংসার আলাদা । শ্যামা আমার সংসারের লক্ষী হিসাবে যাইবো, আপনার মাইয়ার সংসারে যাইবো না । তাই আপত্তি থাকার কোনো কথা না । বরং আপনার খুশি হওয়ার কথা , আপনার ভাষায় আপনার বাড়ির অলক্ষ্যি মাইয়ারে আমি আমার বাড়িতে নিজ থাইকা সাইধা লইয়া যাইতাছি ।
মোখলেছ শক্ত মুখে চুপ হয়ে যান । মানিকের কাকা অলকার দিকে ফিরে বলেন....
" আর আপনার ভাষায় আপনার লক্ষীরে আমি আমার ঘরের লক্ষী কইরা লইয়া যাইতে চাই । আপনার আপত্তি নাই তো আপা ?
অলকা হেসে মাথা ঝাঁকান । অর্থাৎ আপত্তি নেই । আফতাব মুচকি হাসে তা দেখে । ওর বাবা শ্বাস ফেলে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে ওঠেন । কাকড়ি বুড়ি নীরব দর্শকের মতো দেখছেন সবটা । আফতাবের বাবা বলেন...
" দুই সপ্তাহের মধ্যে আমি আমার ঘরের লক্ষীরে ঘরে তুলতে চাই । কোন খরচ লাগবো না । আর না কোনো আয়োজন । আমার পোলা আর শ্যামা মায়ের বিয়া হইবো মসজিদে । আল্লাহ কে সাক্ষী রেখে ওরা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হইবো । আমি আর কিছু চাই না আপা ।
অলকার বুকটা পুনরায় শুন্যতা অনুভব করে । মানিকের সাথে বিয়ে হওয়ার সময় ঠিক যেমনটা হয়েছিল,ঠিক তেমনটা । কিন্তু তখন অলকার সেই শুন্যতা শুন্য হয় নি , শ্যামা অলকাকে শুন্য করে রেখে চলে যায় নি । কিন্তু এবার তো যাবে । অলকা শুন্য হবে এবার । পুরোপুরি শুন্য , না রুপা, না শ্যামা আর না ময়না , কেউ থাকবে না ওর কাছে । অলকার নিঃশ্বাস জোড়লো হয়ে আসে ।
আফতাব সবাইকে একবার দেখে সবার মাঝেই বলে ওঠে....
" আমি শ্যামার সাথে কথা বলতে চাই একবার ! আশা করি কারোর কোনো সমস্যা হবে না ।
অলকার ধ্যান ভাঙ্গে আফতাবের কথায় । কাকড়ি বুড়ি আর মোখলেছের কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ পড়ে আফতাবের এমন জোড়ালো কথায় । আফতাব শান্ত চোখে তাকায় অলকার দিকে । অলকা শ্যামার ঘরের দিকে তাকিয়ে বলে....
" শ্যামা ঘরেই আছে , ও এহনো এইসব বিষয়ে কিছু জানে না বাবা ।
" যদি আপনাদের সমস্যা না থাকে তাহলে ওকে সবকিছু আমি জানাতে চাই ।
অলকা প্রতি উত্তরে বাঁধা দেন না । আফতাব উঠে দাঁড়ায় । অলকা এগিয়ে যান শ্যামার ঘরের দিকে । আফতাব ঘরের বাইরে গিয়ে থেমে যায় । অলকা পিছন ফিরে একপলক তাকিয়ে ভেতরে ঢোকেন । শ্যামা পিছনের জানালার পাশে বসে আছে । চোখ দুটো আকাশের পানে শান্ত স্থির । শ্যামা যে কিছু কিছু আন্দাজ করতে পেরেছে তা বুঝতে বাকি রইলো না অলকার । অলকা নিঃশব্দে মেয়ের পাশে ঘেঁষে দাঁড়ান । শ্যামা শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় আম্মার দিকে । মেয়ের পবীত্র স্নিগ্ধ মায়াবী মুখটা দেখে অলকার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে । হাসার চেষ্টা করেন তিনি । শ্যামার মাথায় হাত রেখে নির্মল স্বরে বলেন....
" রুহের জগতে যে যারে বাইছা নিছে, দুনিয়াতে তার সাথেই তার মিলন হইবো । সে যত দূরেই থাকুক না ক্যান, পুরা দুনিয়া ঘুইরা হইলেও ফিইরা আইবো । বাম পাজরের হাড়ের একটা টান আছে যে ।
এতক্ষণে বুইঝা গেছোস সবটা । মাথায় কাপড় টান । আমি যাইতাছি ।
অলকা নিশ্চল পা বাড়ান ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য । শ্যামা চোখ বন্ধ করে নেয় । খানিক বাদে দম নিয়ে চোখ খোলে । গায়ের ওরনাটা ভালো করে মাথায় টেনে নেয় । চাদর জড়ানোই আছে । পিছন ফিরে জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে । অলকা বাইরে এসে আফতাব কে বলে...
" ভিতরে যাইতে পারো বাবা...
" যাবো...?
দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করে আফতাব । অলকা হালকা হেসে বলেন...
" যাও...
বলেই বারান্দা ছেড়ে নিচে নামেন অলকা । আফতাব ঢোক গিলে অস্বস্তি এড়িয়ে দরজায় কড়া নাড়ে । ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে এক পা ঘরের ভিতরে রাখে ।
মাথা এগিয়ে দেখে খাটের উপর পিছন ফিরে বসে আছে শ্যামা । জানালা খোলা । খোলা জানালা দিয়ে আসা মৃদু হাওয়ায় মাথার ওরনাটা খানিক দুলে দুলে উঠছে । গায়ে একটা কালো শাল জড়ানো । আফতাব দুই পা ঘরের ভিতরে রাখে । গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানায় । শ্যামা একটু নড়ে ওঠে । ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় । তবে পেছন ফেরে না । জানালার কাঠের সিকে হাত ।
দু'জনেই নীরব অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে । শ্যামা মেয়ে মানুষ । ওর লজ্জা বা আড়ষ্টতা থাকতেই পারে । আফতাব শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে । আবারো গলা খাঁকারি দিয়ে কোমল স্বরে সালাম প্রদান করে.....
" আসসালামুয়ালাইকুম....
শ্যামা খানিক মাথা নাড়ায় । তবে মুখে কোন শব্দ উচ্চারণ করে না । ওর মাথা নাড়ানোতেই আফতাব বুঝতে পারে যে ও সালামের উত্তর দিয়েছে । আফতাব বলে...
" ভালো আছেন..?
শ্যামা আবারো আলতো মাথা নাড়ায় । হ্যাঁ সূচক সম্মতি প্রকাশ করে । আফতাব মৃদু হেসে মাথা নামিয়ে বলে...
" কেউ ভালো আছে জিজ্ঞেস করলে তার উত্তরের পর সে ভালো আছে কি না , সেটা জিজ্ঞেস করতে হয় ! আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না আমি ভালো আছি কি না ?
শ্যামা থতমত খেয়ে যায় খানিক । সময় নিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করে...
" আ..আপনি ?
" জ্বি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি । এখন আরো ভালো লাগছে আপনাকে দেখে ।
আ..একটু এদিকে ফিরবেন ? দেখতাম আপনাকে !
কি বলুন তো , আপনার কথা শুনতে শুনতে আপনাকে দেখার একটা তীব্র বাসনা জন্মেছে বুকে । যতক্ষণ না দেখতে পারছি, শান্তি লাগছে না ! একটু ফেরা যাবে এদিকে ?
আবদারের মতো শোনালো কথাটা । শ্যামা শ্বাস ফেলে । বুকটা কেমন ভার হয়ে আছে ওর ।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাথা নামিয়ে পিছন ফেরে । চোখ তুলে তাকায় না ।
কিছু সময় পেরিয়ে যায় । আর কারো কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না । শ্যামা পিট পিট করে চোখ তুলে তাকায় । সামনে সাদা পাঞ্জাবি পা-জামা পড়া একটা সু-পুষ্ট দেহি পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে । প্রথম অবস্থায় থমকায় শ্যামা । চোখের সামনে চেনা মুখ মনে হলো । একই পাজামা পাঞ্জাবী তে অন্য কাউকে দেখছে শ্যামা । শ্যামা তাৎক্ষণিক মাথা নামিয়ে নেয় । চোখ ঝাপটে আবারো তাকায় । পুর্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে । নাহ , সামনের জন তো চেনা নয় । তাহলে একটু আগে কেনো মনে হলো শ্যামা অন্য কাউকে দেখলো ? কাকে দেখলো শ্যামা ? চেনা কাউকে ? হ্যাঁ, চেনাই তো ! যার মুখশ্রী শ্যামার চোখের সামনে ভাসলো শ্যামা তো তাকে চেনে । এই তো কদিন আগেই চিনলো । কিন্তু সামনের জন তো তিনি নন । তাহলে শ্যামা তাকে কেনো দেখলো ?
শ্যামার চোখ আফতাবের দিকে স্থির থাকলেও, ওর দৃষ্টি সেদিকে নেই । অন্য ভাবনায় মগ্ন সে । হঠাৎ আফতাব ডেকে ওঠে...
" শ্যামা....
ধ্যান ভাঙ্গে শ্যামার । এদিক ওদিক তাকিয়ে আফতাবের দিকে তাকায় । এবার দেখলো আফতাব কে । আফতাব ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । দুজনের চোখ একে অপরের দিকে চেয়ে আছে ।
মুহুর্তেই চোখ সরিয়ে নেয় শ্যামা । ঘন পলক ফেলে তড়িৎ বেগে আবারো পিছন ফিরে তাকায় । আফতাব বলে ওঠে....
" আপনি অনেক সুন্দর শ্যামা !
শ্যামা একটু শব্দ করেই হাসলো । হাসিতে তাচ্ছিল্যের সুর । আফতাব বুঝতে পারে তা । সে বলে....
" আপনার আর আমার বিয়ের কথা চলছে । আপনার জীবন সম্পর্কে কিছুটা হলেও অবগত আমি । আর সবকিছু জেনেই আজ এখানে এসেছি আমি ।
আমার সম্পর্কে আপনি জানেন না -- আমি আফতাব । আপনার ছোট বোনের সম্পর্কে দেবর । বিদেশে ছিলাম পাঁচ বছর । ফিরেছি কদিন আগেই । তাও শুধু আপনার জন্য । আব্বা বলেছে আমাকে আপনার কথা । আমাদের পরিবার অত্যন্ত সাধারণ । আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো এখন থেকে নিজ দেশেই খেটে খাবো । যদি ভাগ্যের লিখন অনুযায়ী আমাদের বিয়ে হয় , তাহলে বেঁচে থাকতে অন্তত আপনার জীবনে কোনো কিছুতে শুন্যতা রাখতে দেবো না । আপনাকে আগলে রাখার দায়িত্ব আমার । আর সেটা আ'মরণ পালন করবো আমি - কথা দিলাম !
হাহ্.... বেশি বলে ফেললাম হয়তো । আমি আপনার মতামত শুনতে চাই শ্যামা - আপনি কি এই বিয়েতে রাজি ?
প্রশ্নটা স্বাভাবিকের তুলনায় আরো নরম শোনায় । আফতাবের কথা গুলো সুন্দর । তবে শ্যামার মনকে ছুঁতে পারলো না । অজানা কারণে মনটা খচখচ করছে ওর । শ্যামা কপাল কুঁচকায় । কি বলবে ও ? ওর জবাবে দেরি হওয়ায় আফতাব বলে ওঠে....
" নীরবতাই কি সম্মতির লক্ষণ ধরে নেবো ?
শ্যামা বিরতিহীন উত্তর দেয়....
" আম্মা আমার লাইগা যা করবে, আমি সেই সবকিছুতেই রাজি । আলাদা কইরা আমার আর কোনো মতামত নেওন লাগবো না ।
আফতাব মুচকি হাসে ।
" তাহলে আজ থেকে ঠিক চৌদ্দ দিন পর আবারো দেখা হবে আপনার সাথে । তখন হালাল ভাবে, এভাবে চোখ এড়িয়ে চলতে হবে না তখন । অপেক্ষায় রইলাম...
আজ আসি..? এই চৌদ্দ দিন সামলে রাখবেন নিজেকে । তার পরের দিন গুলো আপনাকে সামালানোর দায়িত্ব আমার !
আসলাম..? আল্লাহ হাফেজ !
শ্যামা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয় । আফতাব কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে ঘুরে পা বাড়ায় বাইরের দিকে । দরজার কাছে এসে একবার আটকায় । স্নিগ্ধ চোখে তাকায় শ্যামার দিকে । আবারো দেখতে ইচ্ছে করছে শ্যামার শ্যামলা কোমল মায়াবী মুখটা । শ্যামা তো এদিকে ঘুরছেই না । আফতাব ভাবলো আরো একবার ডাকবে । কিন্তু পরমুহূর্তে আর ডাকলো না । আফতাব ঘাড় চুলকায় নিজের, নিজেকে বোঝায় - আর তো মাত্র চৌদ্দ দিন, তার পর তো ও তোরই হবে । যতো পারিস দেখিস । এখন আর ওকে লজ্জা দিতে হবে না ।
বলেই পিছন থেকে আরো কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে ।
আজ তো শুক্রবার, আজ থেকে পরের শুক্রবার পেরোলে তার পরের শুক্রবারে শ্যামার আর আফতাবের বিয়ে । এই সিদ্ধান্ত স্থির করে আফতাব আর ওর বাবা বের হয় শ্যামা দের বাড়ি থেকে । অলকা সম্মতি জ্ঞাপন করেন । এর মধ্যে মোখলেছ আর কথা বলেন নি । কাকড়ি বুড়ি মনে মনে একটু খুশি ।
হওয়ারই কথা - অবশেষে তার গলার কাঁটা বাড়ি থেকে বিদায় হতে চলেছে যে ।
মাঝে কেটে গেছে আরো দুটো দিন । শ্যামা আবার আগের মতো বিষন্ন দিন কাঁটায় । মনটা ভার হয়ে থাকে সারাদিন । আশেপাশের কোন কিছুতেই মন বসে না । সবকিছুই কেমন বিরক্ত লাগে । নদীর ঘাটেও যায় নি এই দুই দিন । সারাদিন ঘরে থাকে গলু'কে নিয়ে ।
সকাল থেকে গাঁ-মাথা ভারী ভারী লাগছে শ্যামার । শুয়েই ছিল অনেকটা বেলা অবধি । মাথাটা ধরেছে । ঝিমঝিম করছে সকাল থেকে । গাঁ টাও একটু গরম ।
দুপুরে খবর আসে রুপার বাচ্চা হয়েছে । তাও আবার দু-দুটো জমজ বাচ্চা । ওর শশুর বাড়ি থেকে খবর পাঠানো হয়েছে । আট মাসেই বাচ্চা ভূমীষ্ঠ হয়েছে । যদিও এখনো সময় হয় নি । রুপার অবস্থা ভালো না । এমনিতেই রুপার শরীর দূর্বল ছিল , তার উপর সময়ের আগেই দুটো বাচ্চার জন্মদান । প্রাথমিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে ওকে । বাচ্চা আর রুপা দুজনের অবস্থাই সংকট জনক ।
দুপুরে খবর এসেছে থেকে চিন্তায় আরো বেশি ভেঙে পড়েছে শ্যামা । অলকাও সামলাতে পারছেন না নিজেকে । মায়ের মন ,শান্ত থাকে কিভাবে ? কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছেন তিনি । এদিকে এমনিতেই সকাল থেকে শ্যামার শরীর ভালো নেই । তার উপর এখন এসব চিন্তা । মোখলেছ অলকা কে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রুপার শশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে । প্রত্যেকটা মেয়েরই মা হওয়ার সময় তাদের আপন মায়ের সঙ্গের প্রয়োজন । অলকা নিজেকে আটকে রাখতে পারছিলেন না বাড়িতে । এদিকে শ্যামা কে একা রেখেও যেতে পারছেন না তিনি । ছোট বেলা থেকে শ্যামা কখনো বাড়িতে একা থাকে নি । আর না অলকা শ্যামা কে একা রেখে কোথাও গেছিলেন কখনো । শ্যামার জন্য কোথাও একা গিয়ে একটা রাত অবধি কাঁটান নি তিনি ।
মায়ের দোটানা পুর্ণ চিন্তিত মনভাব দেখে শ্যামা মাকে ধাতস্থ করে । ও এখন বড় হয়েছে, একা থাকতে পারবে বাড়িতে । এমনিতেও কাকড়ি বুড়ি থাকবেন ।
শ্যামার সাথে সাথে মোখলেছও উত্তেজিত চাক্ষুস স্বরে অলকা কে বলেছেন ...
' শ্যামা এই বাড়ির মাইয়া, নিজের বাড়িত থাকতে ওর কি সমস্যা হইবো ? এমনিতেও আম্মা আছে ওর লগে, আমিও আইমু কাইলকা, দেইখা রাখমু আমি ওরে । তুমি এই মাইয়ার চিন্তা বাদ দিয়া নিজের মাইয়ার চিন্তা করো । হের দরকার এহন তোমারে । '
এই প্রথম মোখলেছের কথায় অবাক হয়েছেন অলকা । মোখলেছ কিনা শ্যামা কে দেখে রাখবে ! খেয়াল রাখবে ওর !
তবে এই মুহূর্তে শ্যামার থেকেও রুপার চিন্তা বেশি । অতিরিক্ত চিন্তা আর শ্যামার জোরাজুরিতে অলকা রুপার কাছে যেতে রাজি হন । তবে যাওয়ার আগে শ্যামার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন ফুলিকে । সকাল নাহোক, রাতটুকু যেনো ফুলি শ্যামার সাথেই থাকে । ফুলিও আশ্বাস দিয়েছে অলকা কে ।
মোখলেছ আর অলকা বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়েছেন । রাতে গাঁ কাঁপিয়ে তীব্র জ্বর এসেছে শ্যামার । ফুলি এসেছে সন্ধ্যায় । ওর বাড়িতেও সমস্যা । আম্মা অসুস্থ । তাকে রেখে আসাও দায় । কিন্তু শ্যামা..? ওকে একা রাখাও ভালো হবে না । অলকা বারবার বলে গেছেন । বাড়িতে এখন কাকড়ি বুড়ি ছাড়া কেউ নেই । এই বুড়ির ভরসায় শ্যামা কে একলা রাখাটা ঠিক হবে না । ফুলি বাড়ির সমস্ত কাজ সেরে সন্ধ্যায় এসেছে । এসেই দেখেছে শ্যামা কম্বল মুড়ি দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে গুটিয়ে শুয়ে আছে । ফুলি কয়েক বার ডাকে শ্যামা কে । শ্যামার সাঁড়া দেওয়া ক্ষীন কম্পিত কন্ঠে ফুলি শ্যামার অবস্থা বুঝতে পারে । কপালে,গলায় হাত দিয়ে দেখে গাঁ গরম হয়েছে । জ্বর আসবে ।
ভাবতে না ভাবতেই রাতের বেলা গাঁ কাঁপিয়ে প্রচণ্ড জ্বর এসেছে শ্যামার । শ্যামার থেকে কয়েক হাত দূরে থাকলেও শ্যামার গায়ের তীব্র তাপ অনুভব করা যাচ্ছে ।
এদিকে বাড়িতে কেউ নেই । এতো রাতে কি করবে ফুলি ? শ্যামার গায়ে কম্বলের উপর দুটো কাঁথা, আরো একটা লেপ চাপিয়ে দিয়েছে । তবুও ঠান্ডায় কাঁপছে শ্যামা । জ্বরের ঘোরে অর্ধ জ্ঞান হীন হয়ে গেছে । ঘোরের মধ্যে আবোল তাবোল বকছে । ফুলি শিয়রের পাশে বসে অনবরত শ্যামার মাথায় জ্বর পট্টি দিয়েই যাচ্ছে । একে চিন্তা আর ভয়ে চোখ মুখ চুপসে গেছে ফুলির । এদিকে কাকড়ি বুড়ির দরজায় কয়েক বার কড়া নেড়েছে, ডেকেছে জোরে জোরে, কিন্তু বুড়ি কোনো সাড়া দেয় নি । শেষমেষ একাই শ্যামার পাশে বসে ওর মাথায় জ্বর পট্টি দিয়েই যাচ্ছে । বারবার গায়ে হাত বুলিয়ে দেখছে জ্বর কমলো কি না ?
খানিক বাদে শ্যামার গায়ের তাপমাত্রা একটু কমে । এতে স্বস্তি পায় ফুলি । জ্বর কমলেও সারারাত অবচেতন ছিল শ্যামা । কিচ্ছুটি টের পায় নি । এদিকে শ্যামার চিন্তায় সারা রাত ঘুমোতে পারে নি ফুলি । পুরো রাত পানির বাটি আর জ্বর পট্টি নিয়ে বসে ছিল শ্যামার মাথার কাছে । চোখের পাতা এক করতে পারে নি ।
সকালে চোখ লেগে এসেছে একটু । শ্যামার এখনো কোনো হুস নেই । বেঘোরে ঘুমাচ্ছে । দু'জন ঘুমায় বেলা পর্যন্ত । দরজা ভেতর থেকে লাগানো ।
ভোর বেলায় ফিরেছে মোখলেছ । হাত মুখ ধুয়ে নিজের ঘরে আরাম করেছে একটু । বেলা হতেই ঘর থেকে বেরিয়েছে । কাকড়ি বুড়ি সেদ্ধ ভাত ছাড়া আর কিছু করেনি । শ্যামা কেও ডাকেনি । মোখলেছ বারান্দায় খানিক দাঁড়িয়ে থেকে শ্যামার ঘরের সামনে যায় । বারান্দার নিচ থেকেই স্বাভাবিক কন্ঠে ডাকে...
" শ্যামা,, শ্যামা,, ঐ মাইয়া, উঠবি না ? সকাল হইয়া গেছে । কোন বাড়ির মাইয়ারা এতো বেলা অবধি ঘুমায় ?
মোখলেছের ডাকে ঘুম ছুটে যায় ফুলির । এক ঝটকায় উঠে বসে । জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আলোয় বুঝতে পারে অনেকটা বেলা হয়েছে । ফুলি চোখ কচলে শ্যামার পানে তাকায় । শ্যামা মুখ খিচে নড়ে ওঠে । শ্যামার কপালে হাত রাখে ফুলি । এখন আর আগের মতো গাঁ গরম নেই । ফুলির স্পর্শে পিটপিট করে চোখ খোলে শ্যামা । ঝাপসা চোখে ফুলিকে দেখে । ফুলি বিছানা থেকে নামতে নামতে শ্যামার উদ্দেশ্যে বলে....
" উইঠা পর শ্যামা,, বেলা হইছে অনেক । তোর আব্বা ডাকতাছে ।
আব্বার ডাকের কথা শুনতেই তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ে শ্যামা । মাথাটা ব্যথা করছে এখনো । শ্যামা এক হাতে মাথা চেপে ফুলিকে বলে...
" আব্বা আমারে ডাকতাছে ?
" হ নাম ধইরা ডাকলো তোর,, শুনলাম ! খাড়া, আমি দরজা খুইলা দেই....
বলতে বলতে দরজা খুলতে এগিয়ে যায় ফুলি । শ্যামার চোখ মুখ চিকচিক করে ওঠে । এই জীবনে কখনো আব্বা ওর নাম ধরে ডাকে নি । আজ ডাকলো ? শ্যামা তড়িৎ বেগে খাট থেকে নেমে পড়ে । ফুলি দরজা খুলে দিয়েছে । বারান্দার সামনে কোমরে এক হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে মোখলেছ । শ্যামা বাইরে বের হয় । মোখলেছের সাথে চোখাচোখি হয় । মোখলেছ ভ্রু গুটিয়ে বলেন....
" এতোক্ষণে ওঠার সময় হইলো ? তোর আম্মা বাড়িত আছে ,, বাড়ির কাম কেডায় করবো ? রান্না করতে হইবো না ? খামু কি ?
ফুলি বলে ওঠে....
" শ্যামা সারা রাইত জ্বরে কুকাইছে কাকা । জ্বরে গাঁ পুইড়া যাইতাছিল একদম । কিচ্ছুটি টের পায় নাই ।
" কি কস ,, ঔষধ খাওয়াইছোস ?
" ঔষধ কনে পামু আমি ? জ্বর পট্টি দিয়া দিছি সারা রাইত । এহন একটু গাঁ টা ঠান্ডা হইছে ।
" আচ্ছা,, আমি হাট যাইতাছি, ঔষধ কিইনা আইনা দিমু নে । আইজ আর আড়ত যামু না ।
বলেই সেখান থেকে গটগট পায়ে চলে যান মোখলেছ । শ্যামা নিগুড় ভেজা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আব্বার দিকে । এই প্রথম বোধহয় মোখলেছ শ্যামার বিষয়ে কিছু একটা ভাবলো । শ্যামার চিন্তা করলো । শ্যামার সাথে শান্ত গলায় কথা বললো ।
শ্যামার ঠোঁট জোড়া আপনা আপনি প্রসারিত হয়ে আসে ।
ফুলি শ্যামার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে....
" আমি বাড়িত যাই শ্যামা ! তোর জ্বর একটু কমছে, গাঁ নড়াইস না বেশি । আমি ফের তাড়াতাড়ি চইলা আমু । তুই একটু আরাম কর । বাইরে বাইর হইবি না কিন্তু । আমি যাইতাছি...!
বলেই মাথায় কাপড় টেনে বেরিয়ে আসে ফুলি ।
ভাত রেঁধে ছিলেন কাকড়ি বুড়ি । শ্যামা বসে বসে গলু'কে পাশে রেখে আলু দিয়ে পালং শাকের ভাজা করে ।
দুপুরে মোখলেছ ঔষধ এনে দিয়েছিলেন শ্যামা কে । ইদানিং শ্যামা সব কিছুতেই যেন শুধু অবাক হচ্ছে । মোখলেছের এমন ব্যবহার নতুন । মোখলেছ কিনা স্বইচ্ছায় নিজের ট্যাকের খরচ করে শ্যামার জন্য ঔষধ কিনে নিয়ে আসলো ? এটা সত্য, তবে শ্যামার কাছে ভ্রম মনে হচ্ছে ।
দুপুরের নামাজের পর আর ঘর থেকে বের হয় নি শ্যামা । আসর গড়িয়েছে , তবুও বের হয় নি, নামাজ ও পড়ে নি । আবারো হাড় কাঁপছে ওর । জ্বরে অবচেতন হয়ে পড়ে আছে নিজের ঘরে । ফুলি আসবে সেই সন্ধ্যায় । ওর বাড়ির সব কাজ-বাজ সেরে একেবারে আসবে ।
এদিকে কখন থেকে শ্যামা এভাবে পড়ে আছে জানা নেই । কেউ একবারও খোঁজ ও করে নি । সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসছে ।
গলু শ্যামার গায়ের উপর খানিক লাফালাফি করে গুটিয়ে বসে আছে ওর মাথার কাছে । বাইরের আঁধারের সাথে সাথে পুরো ঘর অন্ধকার । সাঝঁ বাতি দেওয়া হয় নি এখনো ঘরে । অন্ধকার, শ্যামার শরীরের তাপ আর গরম নিঃশ্বাসে গুমোট হয়ে আছে পুরো ঘর । বাইরে ঘরের পেছনে ঝিঁঝিঁ পোকারা আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে ।
শ্যামার কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না সেই ডাক । একটুও নড়ছে না শ্যামা । নিঃশ্বাসের সাথে সাথে ওঠা নামা করছে বুকটা । জ্বর আর মাথা যন্ত্রণায় কাতরাতে ও পারছে না । শরীর অবশ হয়ে গেছে । এই মুহূর্তে আম্মার স্বপ্ন দেখছে শ্যামা ।
আম্মা ওর শিয়রের কাছে এসে বসলো । মুচকি হেসে শ্যামার মাথাটা তুলে নিলো নিজের কোলে । নরম আলতো হাত রাখলো মাথায় । ঠোঁট জোড়া এগিয়ে গাঢ় চুমু খেল শ্যামার কপালে । আম্মা এখন শ্যামার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছে । শ্যামা আরামে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে আম্মার কোলে ।
শ্যামা ঘোরের মাঝেই হাসে । জড়িয়ে ধরে আম্মার কোল । অস্পষ্ট স্বরে কি যেনো একটা বিড়বিড়ায় । শ্যামা আরো গুটিসুটি হয়ে লুকায় আম্মার কোলে । দুহাতে আকড়ে ধরে আম্মাকে ।
হঠাৎ এক বালতি পানির ছিটকায় ঘোর কাটে শ্যামার । অকস্মাৎ উঠে বসে শ্যামা । মনে হলো যেনো শরীরের উপর দিয়ে বিশাল বড় সমুদ্রের ঢেউ চলে গেল । শ্যামার চোখ মুখ জ্বলছে । লাল হয়ে আছে শ্যামলা মুখশ্রী । ঠিকমতো তাকাতেই পারছে না । দুহাতে বিছানায় ভর করে কোন রকমে বসে আছে শ্যামা । এই যেন গড়িয়ে পড়বে ।
এদিকে শ্যামা অনুভব করতে পারছে ওর পুরো শরীর ভিজে গেছে । একে তো জ্বর, তার উপর ঠান্ডা । শ্যামার পুরো শরীর কেঁপে ওঠে । ভেজা শরীরে কাপড় লেপ্টে আছে । গাঁ দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে । ঐ আগুনে পানি ঢাললে যেমন হয় , ঠিক তেমন ।
শ্যামা জোরপূর্বক কোন রকমে চোখ দুটো খোলে । সামনে ঝাঁপসা, অন্ধকার । এক কোনে পিটপিটে হারিকেনের আলো জ্বলছে । শ্যামা চোখ বন্ধ করে আবার তাকায় । টিমটিমে আলোয় দুটো কুচকুচে অবয়ব নজরে আসে শ্যামার । শ্যামা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে পারছে না, চোখ দুটো আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসছে । তবুও শ্যামা লক্ষ্য করে সামনে কে আছে । অবয়ব দুটো আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না শ্যামার । শ্যামা এক হাতে ইশারা করে কম্পিত স্বরে আওড়ায়....
" আ.. আব্বা, দাদি ,, তোমরা ?
কাকড়ি বুড়ি দাঁত পিষে খেকিয়ে বলে ওঠেন...
" হ রে ছেড়ি আমরা । ওঠ কইতাছি,,ওঠ.....
শ্যামা চোখ বন্ধ করে ক্লান্ত স্বরে বলে....
" মাথাটা ফাইটা যাইতাছে দাদি । ঠান্ডা লাগতাছে আমার । চোখ খুলতে পারতাছিনা ।
খাকড়ি বুড়ি শ্যামার খোলা চুলগুলো শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরেন । গুঙ্গিয়ে ওঠে শ্যামা । চোখ মেলে তাকায় বুড়ির দিকে । কাকড়ি বুড়ির ঝুলানো মুখটা শক্ত হয়ে আছে ।
শ্যামা পর মূহুর্তে ছলছল চোখে তাকায় মোখলেছের দিকে । মোখলেছও শক্ত মুখে চোখ খিচে তাকিয়ে আছেন ।
কাকড়ি বুড়ি কটমট করে বলেন.....
" ওঠ অলক্ষ্যি দামড়ি,, বিয়া হইবো তোর আইজ, বিয়া ..! বিদায় করমু আইজ তোরে । সারা জীবনের লাইগা দুর হইয়া যাইবি তুই । ওঠ....
চলবে....

0 Comments