গল্প: পারসোনাল নোটিফিকেশন (পর্ব:০৬)




লেখক: সাইফুল ইসলাম সজীব 


পর্ব- ০৬ 
 


মেজো ভাই হঠাৎ রাগে ফেটে পড়ল। কণ্ঠটা কাঁপছিল, কিন্তু চোখে ছিল আগুন। আমার কণ্ঠে মিল পাও কীভাবে, বাবা? তুমি ছাড়া এত আত্মীয়স্বজন, পরিচিত মানুষ, কেউ তো কোনোদিন বলেনি আমাদের কণ্ঠ এক! এখন মনগড়া কথা বানিয়ে আমাকে ফাঁসাতে চাইছ!
বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধমক ছুড়ে দিয়েই সে ঘুরে দাঁড়াল সাজুর দিকে। মুহূর্তেই গলার সুর পাল্টে গেল। নম্র, প্রায় অনুনয়ভরা।

(সব পর্বের লিঙ্ক) 


ভাই, আমি সহজ-সরল মানুষ। রিশাত রেকর্ডে যা বলেছে, আমি ততটা খারাপ নই। আমার জীবনে লুকানোর কিছু নেই। আমার দৈনন্দিন রুটিন একেবারেই সোজা।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। নিলয় ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, 
ফজরের আজান হলেই ঘুম ভাঙে। নামাজ পড়ি। একটু হাঁটি। তারপর বাড়ি ফিরে এক কাপ চা খেয়ে গোসল। আটটার মধ্যেই দোকানে যাই। বাজারের হোটেলে নাস্তা করে দোকান খুলে বসি। বাবা আসে প্রায় দশটার দিকে।
সে এক মুহূর্ত থামল। চোখ বুলিয়ে নিল উপস্থিত সবার মুখের ওপর।
জোহরের আজান দিলে বাবা দোকান থেকে বের হয়ে নামাজে যায়। বাড়ি গিয়ে দুপুরের খাওয়া দাওয়া করে আমার জন্য খাবার নিয়ে আসে। তারপর আবার সারাদিন দোকানে। এশার সময় বাবা বের হয়। আর আমি…
কণ্ঠটা এবার একটু ভারী হয়ে উঠল।
রাত এগারোটার দিকে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরি। কোনো মতে খাওয়া শেষ করে বিছানায় গেলেই ঘুম আমাকে কুয়াশার মতো জড়িয়ে ধরে।

শেষ কথাটুকু বলেই নিলয় থেমে গেল। যেন আর কিছু বলার নেই।
ঘরের ভেতর তখন শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। উপস্থিত সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ কিছু বলছে না, শুধু মাথা নেড়ে যাচাই করছে শোনা কথাগুলো।

নীরবতার ভেতর হঠাৎ কথা বললেন সুচনার মামা। অর্থাৎ রিশাতের বড় ভাবির মামা। তিনি সাজুর দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বললেন, আপনার অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করলাম। এসআই স্যারের কাছে আপনার পরিচয় শুনে আমি অবাক হয়েছি। আপনার সম্পর্কে আমি এতটা জানতাম না। কাল আমার এক বন্ধুর সাথে বিকেলে কথা হচ্ছিল তখন সে-ই আপনার নাম বলছিল। 

সাজু শুধু হাসলো৷ নিজের ব্যাগ থেকে কফি বের করে আবার কাপে কফি ঢালতে লাগলেন। কফির নেশাটা অনেক বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন যে সাজু এখন নিজের ব্যাগে করে কফি নিয়ে যায়। যেখানে যায় সেখানেই সঙ্গে কফি থাকে। একসময় ঠান্ডা কফি প্রিয় ছিল, কিন্তু এখন কফি হলেই হচ্ছে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। 

সূচনার মামা তখন বললেন, আমার বন্ধু রাতে ঘটনা শুনে আপনাকে আমার হয়ে মেইল করেছে। আমি নিজেও জানতাম না। কিন্তু আপনি আসছেন আমি খুব খুশি হয়েছি৷ এবার যদি দ্রুত সূচনার হত্যাকারী সনাক্ত করতে পারি তাহলে আরেকটু সস্তি পেতাম। 

সাজু ভাই রিশাতের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি একটু রিশাতের ঘরে যেতে চাই। চলুন ঘুরে আসি। বিমল ভাই আপনিও আসেন। 

সাজু ভাই, রিশাতের বাবা, এসআই বিমল মিত্র, মেজো ভাই ও সূচনার মামা সবাই মিলে রিশাতের ঘরের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ায়। সবাই স্থির থাকলেও সাজু চারিদিকে তাকিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। 
রিশাতের লাশ এখন জেলা হাসপাতালের মর্গে। কাল রাতেই পুলিশ এসে তার লাশ উদ্ধার করে পোস্টমর্টেম করতে নিয়ে গেছে। রাতেই পুলিশ ঘরের চারিদিকে ছবি তুলে রেখেছিল সেগুলোই সাজু আগে একবার দেখে নিয়েছেন। 

এসআই কে উদ্দেশ্য করে সাজু বললো, আপনার ছবিতে এখানে একটা গুছানো ব্যাগ ছিল। সেটা কোথায় গেল? 

-এসআই বিমল মিত্র বলেন, কিসের ব্যাগ?

-রিশাতের লাশ সিলিংয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় যখন দেখা যাচ্ছিল তখন তার পিছনেই খাটের পাশে একটা ব্যাগ দেখেছিলাম ছবিতে। কিন্তু সেই ব্যাগটা এখন নেই কেনো? ঘরের জিনিসপত্র সরানো হয়েছে? 

মেজো ভাই বললেন, আমি সরিয়েছি। রিশাত মনে হয় রাগ করে বাড়ি থেকে চলে যেতে চাচ্ছিল তাই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিল। কিন্তু তার আগেই তো আত্মহত্যা করে মইরা গেল। 

সাজু বললো, একটা মানুষ ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাড়ি থেকে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে সেই মানুষ আবার আত্মহত্যা করে? 

সূচনার মামা বলেন, আমারও মনে হচ্ছে আত্মহত্যা হতেই পারে না। কিন্তু রেকর্ডের গড়মিল ছাড়া আর তো শক্ত প্রমাণও কিছু নেই। 





সাজু ভাই মামার দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনি তো টুকটাক রাজনীতি করেন তাই না? নিজ এলাকায় বেশ দাপট আর পরিচিতি আছে আপনার। 

মামা গর্বের সঙ্গে বলেন, ঠিকই ধরেছেন। আপনি কি আমাকে চেনেন নাকি? এতবড় একজন মানুষ, তিনি আমার খবরও জানেন। 

মানুষ খাল কেটে কুমির আনে। কিন্তু অপরাধী হয়েও সব দোষ লুকাতে, বেশি ভালো সাজতে গিয়ে কেউ নিজেই আইনের আশ্রয় নেয় এমনটা কখনো শুনেছেন মোশাররফ সাহেব? 

সাজুর ইঙ্গিতের খোঁচা খেয়ে মামা চুপসে গেলেন। খানিকটা রাগ করলেন সেটাও বোঝা যাচ্ছে। তিনি গম্ভীর গলায় বলেন, এটা কেমন ধরনের কথা? আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন? 

সাজু দাঁত বের না করেই ঠোঁট নাড়িয়ে হাসলো। 
-আপনাকে কেন সন্দেহ করবো? আপনিই তো পুলিশ ডাকলেন। নিজের ভাগ্নি হত্যার বিচার চেয়ে দিনরাত থানা-পুলিশ মাতিয়ে রেখেছিলেন। 

-তাহলে ও কথা কেন বললেন? 

-আরেকটু গভীরে যাই। তারপর আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দেবো। অবশ্য আমি উত্তর দেবার আগেই আপনি নিজে উত্তর পেয়ে যাবেন। 

মামা বেশ বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে রইলেন। সাজু সেদিকে সম্পুর্ণ অগ্রাহ্য করে মেজো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার গলায় কিসের আঘাত? যখন থেকে এসেছি তখন থেকেই দেখছি মাফলার জড়িয়ে দাগটা বারবার লুকানোর চেষ্টা করছেন। 

মেজো ভাই হঠাৎ কি বলবেন ভেবে না পেয়ে থতমত খেয়ে নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, রাতে ঘুমের মধ্যে গলায় জড়িয়ে গেছিলো। খুলতে গিয়ে গিট্টু লেগেছিল। 

-আপনার স্ত্রীর সিজার হয়েছিল কোন হসপিটালে? চলুন আমরা একটু হসপিটাল থেকে ঘুরে আসি৷ যেহেতু আপনার স্ত্রীর মৃত্যু নিয়ে একটা রহস্যের প্রশ্ন এসেছে। সেটাকেই খুঁজে পাই কি-না দেখি। 

নিজের স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনার কথা উঠতেই মেজো ভাই আবার চুপসে গেলেন। মুখটা অন্ধকার করে এদিক সেদিক তাকিয়ে বললেন, ভাবি মারা গেল, রিশাত মারা গেল, এদের খুনিদের আগে বের করেন না। সেই সাত মাস আগে কি হইছিলো সেটা কি বের করতে পারবেন। 

সাজু বললো, রশির মাঝখান থেকে টেনে কোনো লাভ নাই ভাই। যেকোনো একটা সাইড থেকে টান শুরু হরলে অপরপ্রান্ত খুব সহজেই চলে আসবে। 
মনে রাখবেন, “ খুনি সবসময় সত্য লুকাতে চায় না। সে শুধু এমন একটা মিথ্যা বেছে নেয়, যেটা তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়। ঘটনাস্থলে যে জিনিসটা থাকার কথা ছিল না, সেটাই আসলে আমাকে খুনির কাছে নিয়ে যাচ্ছে। 
মানুষ ভুলে যায়, সময় ভুলে যায়। কিন্তু খুনির করা একটামাত্র ছোট অভ্যাস কখনো মুছে যায় না। ” 

এসআই বিমল মিত্র কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সাজুর মনোযোগ তার মোবাইলে। সাজু ভাই তার মোবাইলে তাকিয়ে আছেন। কয়েকটা লাইনের একটা মেইল এসেছে, 

হ্যালো সাজু ভাই, 
ভেবেছিলাম আর বাইরে আসবো না। চার বছরে কতো প্রস্তাব পেয়েছি। কতো রাজনৈতিক দলের থেকে অফার ছিল জেল থেকে বের হয়ে পুনরায় আগের মতো কাজ করার। কিন্তু কখনো মনে হয়নি আমি বের হবো। ৫৬ খুনের দায় নিয়ে ফাঁসির মঞ্চে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম সবসময়। 
আল্লাহ ভাগ্যে অন্যকিছু রেখেছেন। সারাদেশে যেহেতু জানে তাহলে আপনিও নিশ্চয়ই জানেন যে “বিদ্রোহী মঞ্চে”র এক নেতাকে রাস্তায় প্রকাশ্যে গুলি করা হয়েছে। সপ্তাহ খানিক মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে লোকটা মারা গেল। দেশের লাখ লাখ মানুষ তার জন্য দোয়া করলো৷ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তার খুনিকে এখনো গ্রেফতার করা গেল না। 
আমার দীর্ঘ কালো জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানি ওই খুনিকে আর পাওয়া যাবে না। চোখের সামনে পেলেও ধরা হবে না। আমি নিজেই কতো কন্ট্রাক্ট নিয়ে এভাবে খুন করতাম। মাথায় বড়ো হাত না থাকলে এরকম রিস্ক কেউ নেয় না। 
“ আমি জেল থেকে পালাইলাম। শুনলাম “বিদ্রোহী মঞ্চে”র সেই লোকটার হত্যার বিচারের দাবিতে কিছু মায়েরা অনশন করছেন। তাদের মধ্যে দু'জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এসব দেখে নিজেকে সামলানো কষ্ট। আমি আবার মায়ের মতো মানুষের কাছে খুবই দুর্বল। 
আমি আবারও লড়াইয়ে নামলাম। দু চারটা খুন হবে। তবে এবার আমি আমার অস্তিত্ব পুরো দেশেই ছড়িয়ে দেবো৷ অসহায় মানুষের একটা ভরসার স্থান হবে, “রবিউল ইসলাম রাব্বি”। 
কি করবো বুঝতে পেরেছেন তো? 
আপনি বুঝবেন, কারণ আপনি বুদ্ধিমান। 

সম্ভবত খুব শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে।
আমার সেই চাদরটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে এখনো রয়েছে তাই না? যেই চাদরে আমি একটা চিরকুট জড়িয়েছিলাম “ চাদর জড়ানো চিরকুট ”। 
আবারও চিরকুট পাবেন। অনেক চিরকুট। সবগুলোই আমি চাদরে জড়িয়ে দেবো৷ আপনি, আপনারা, আপনার দেশের আইনও অনেকিছুর কাছে বাধাগ্রস্ত হয়ে যায়। আমার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। অসংখ্য চিরকুট নিয়ে আমি সেইসব মানুষের দরজায় হাজির হবো৷ যারা নিরপরাধ মানুষকে কষ্ট দেয়। প্রত্যেকে চিরকুট পাবে, “ চাদর জড়ানো চিরকুট”! 

ইতি, রাফসান মাহমুদ বা রবিউল ইসলাম রাব্বি। 

মেইল পড়ে সাজুর কপালে ভাজ পড়ে। ডিবি অফিসে বড়ভাই হাসানের কাছে কল দিয়ে জানা যায় ঘটনা সত্যি। রাফসান মাহমুদ ওরফে রবিউল ইসলাম রাব্বি আজকে ভোরবেলায় পালিয়েছে। 

মোবাইল পকেটে রেখে সাজু এসআই বিমল মিত্র ও মেজো ভাই নিলয় মুন্সিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। 

❝পার্সোনাল নোটিফিকেশন❞ আগামী পর্বে সমাপ্ত হবে। শেষের যে মেইল সেটা সাজু ভাই সিরিজের চাদর জড়ানো চিরকুট গল্পের পরবর্তী অংশ। এখান থেকেই শুরু হবে চাদর জড়ানো চিরকুট দ্বিতীয় খন্ড। সাজু ভাই সিরিজের পাঠকদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে ইন শা আল্লাহ। 
.
চলবে… 



 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×