![]() |
লেখক: সাইফুল ইসলাম সজীবপর্ব- (০৫) যতটা ভয় পেয়েছিলাম ততটা ভয়ের কিছু নয়। বিমল স্যার যার সঙ্গে কথা বলেছেন সেই ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নাই। ওটা আমাদেরই থানার আরেকটা বাড়ির মামলা। মূলত সেই প্রেগন্যান্ট মহিলাকে তাদের প্রতিবেশী মারধর করেছে। সেসব নিয়েই মামলামকদ্দমার কাজকর্ম। আমি যখন ভিতরে ছিলাম তখন মেজো ভাইয়া দরজা দিয়ে বের হয়েছে শোনার পর এসআই বিমল মিত্র স্যার এবং আমি দুজনেই ভাবতে থাকি। ভাইয়া যদি আমার আগে সেখানে যায় তাহলে সেটা কেন? ভাইয়া এসে মায়ের সাক্ষী সম্পুর্ণ অস্বীকার করেন। তার দাবি তিনি সারাদিন দোকানে বসে ক্লান্ত থাকেন। রাতে বিছানায় গেলেই ঘুম আসে৷ তিনি কীভাবে গভীর রাতে ভাবির ঘরে যাইবেন। মা তখন দোটানায় পড়েন। অনেকটা কাচুমাচু ভঙ্গিতে মা তখন বলেন, আসলে রাতের মধ্যে কাকে যে দেখলাম। কেউ একজন ছিল সেটা মিথ্যা না। পুলিশের কাছে এসব যুক্তি চলে না। উপস্থিত সবার সঙ্গে কথা বলে এবং ভাবির মামার মামলার জোরে পুলিশ মা'কে জিজ্ঞেসাবাদ করার জন্য থানায় নিয়ে গেলেন। ভেবেছিলাম আমাকেও নিবেন। কিন্তু কেন নিল না সেটা পুলিশই ভালো জানে। (সব পর্বের লিঙ্ক)রাতে ভাইয়া ও বাবা আমাকে বকাবকি করেন। যেই ফুফু ভাবির সঙ্গে বিয়ের কথা ওঠাতে আমারে বকাবকি করেছিলেন সেই ফুফু আমাদের বাড়ির দোতলায় থাকতেন। যদিও মাসে মাসে কিছুটা বাসা ভাড়া তিনি মায়ের হাতে দিতেন। ফুফা থাকেন দেশের বাইরে। আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট তাদের একটা মেয়ে আছে, নাম নিলা। ফুফুদের এলাকায় নিলাকে একটা ছেলে খুব বিরক্ত করতো। রাজনৈতিক কারণে সেই ছেলেটার কিছুই করা যাচ্ছিল না। তাই ফুফু তার মেয়েকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে দোতলায় থাকেন। কথা ছিল দোতলা কমপ্লিট হলে মেজো ভাই দোতলায় চলে যাবে। একই বিল্ডিংয়ে তিন ভাইয়ের জন্য তিনতলা ফাউন্ডেশন করার প্ল্যান ছিল। কিন্তু বড়ো ভাইয়ার মৃত্যু সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। একদিকে আমি শহরে তাকি। অপরদিকে মা-বাবা আর মেজো ভাই বড়ো ভাবি। সেজন্য আর দোতলায় না গিয়ে সবাই নিচে থাকতাম। ফুফাতো বোন নিলা আমাকে পছন্দ করে। সরাসরি আমাকে প্রপোজও করেছিল। ফুফু বিষয়টা বুঝতে পেরে আমাকে সতর্ক করে দেয়। বলেন আত্মীয়ের মধ্যে নতুন করে আত্মীয় বাড়ানো যাবে না। আমি যেন নিলাকে প্রশ্রয় না দেই। যাইহোক, মা'কে পুলিশ থানায় জিজ্ঞেসাবাদ শুরু করে। আমি সকাল বিকাল দু'বার করে মাকে দেখতে যেতাম। এভাবে এই কদিন কেটে গেল। ভাবির মৃত্যুর আজ পাঁচ দিন হয়ে গেছে। মা আজকে আমার সঙ্গে একটা বেঈমানী করেছেন। তিনি খুব ভালো করে জানেন আমি ভাবিকে হাত দিয়ে স্পর্শই করিনি। কিন্তু সেখানে মা পুলিশের কাছে বলেন, তিনি নাকি দরজা খুলে দেখেছেন আমি ভাবিকে বালিশ চেপে মেরে ফেলতেছি। সরাসরি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিলেন মা। বললেন, এতদিন নাকি নিজের আপন সন্তানকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি চান আসল খুনি শাস্তি পাক। আমার মা আমাকে এভাবে মিথ্যা বলে ফাঁসিয়ে দেবেন এটা কিছুতেই মানতে পারছি না৷ আপনারা যদি মনে করেন আমি খুনি তাহলে সেটাই মেনে নিন। ভাববেন ভাবির খুনির ফাঁসি হয়েছে। এমনিতেই মা'কে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ার পর থেকে বাবা, ভাইয়া ফুফু সবাই আমাকে এমনভাবে মানসিক যন্ত্রণা দিচ্ছিলেন যেটা সহ্য করা অসম্ভব। সবার একই কথা ক-ন-ড-ম এর প্যাকেট ভাইয়া দেখেছেন। আমার আর ভাবির মধ্যেই নাকি ঝামেলা ছিল। আমার জন্য নাকি মা মিথ্যা মামলায় ফেঁসে গেছেন৷ এতো অপবাদ সহ্য করে নিজের আপনজনের মধ্যে বেঁচে থাকা কষ্টকর। মায়ের সাক্ষীতে এভাবে আমাকে ফেসে যেতে হবে এটা মেনে নেয়া যাচ্ছে না। সবাই দরজা খোলার চেষ্টা করছে৷ আমাকে তারা ডাকছে। আমি চলে যাচ্ছি তবে যারা ডাকছে তাদের কাছে নয়। আমার যা বলার সব বলে গেলাম। মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই এই বিদায়। …………… রেকর্ড শেষ হলো। যেখান থেকে রিশাত বলেছে যে মাকে পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে। তার দশ সেকেন্ড আগে থেকে সাজু আবার রেকর্ড শুনলো। পিছনে টেরে টেনে তিন চারবার সাজু শুনলো। এরপর শুরুর দিয়ে এক মিনিট আর শেষের দিকে এক মিনিট পুনরায় শুনলো সাজু। এসআই বিমল মিত্র সাজু এমন আচরণ দেখে বিব্রত। প্রতিবাদ করার উপায় নেই। কারণ সাজু নামের ব্যক্তিটি বর্তমানে ডেনমার্ক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা সরকারি পঞ্চাশজন স্পেশাল ডিটেকটিভের একজন। ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের পতনের পর নতুন সরকার গঠন হয়। সেই সরকারই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির কারণে দেশ থেকে বাছাই করে পঞ্চাশ জনের একটা টিম প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছিল৷ যারা মাত্র পনেরদিন আগে দেশে ফিরেছে। কিছুদিন পরই তাদের নিয়ে সরকারের গঠিত নতুন একটা সংস্থা যাত্রা শুরু করবে৷ সাজু সেই পঞ্চাশ জনের একজন। একে চাইলেই অবহেলা করতে পারছে না বিমল মিত্র। রিশাতের মোবাইল রেখে সাজু ভাই রিশাতের বাবার দিকে তাকালেন। বললেন, আপনার ছেলের কণ্ঠের সঙ্গে আপনাদের বংশের কারো কণ্ঠের মিল আছে? প্রশ্ন শুনে কপাল কুঁচকে যায় সবার৷ এতবড় লম্বা রেকর্ড। তাছাড়া যেখানে প্রায় পুরোটাই রিশাত তার মেজো ভাই ও মা'কে সন্দেহ করেছে৷ সেটাকে অন্য কারো রেকর্ড হিসেবে সন্দেহ করছে সাজু। বিমল মিত্র বলেন, আপনি কি ভাবছেন সেটা যদি বলতেন তাহলে ভালো হয়। সাজু যেখানে বারবার টেনে টেনে নিয়ে শুনছিল সেখানটায় আবার নিয়ে গেল। বিমল মিত্র বারবার শুনলো। কিন্তু তবুও তাকিয়ে রইল। সাজু ভাই বললেন, সহজ বিষয়টা বুঝলেন না? বিমল মিত্র মাথা দোলায়। সে কিছু বুঝতে পারেনি। সাজু ভাই বললেন, রেকর্ডের চৌত্রিশ মিনিট সাতচল্লিশ সেকেন্ডে খেয়াল করুন। মসজিদে আজান শুরু হয়েছে। মাগরিবের আজান। তারপর দেখুন পয়ত্রিশ মিনিট চল্লিশ সেকেন্ডে গিয়ে আজানের আর কোনো শব্দ নেই। অথচ আজান সেখানে শেষ হয়নি। “হাইয়া আলাল ফালাহ।” একবার শেষ হয়ে আরেকবার “হাইয়া আলা…” গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর আজান নেই। আপনি যেহেতু আমাদের ধর্মের নয় তাই আপনার কাছে হয়তো বিষয়টি ধরা পড়েনি। সাজু কথা শুনে সবাই নড়েচড়ে বসলো। রিশাতের বাবা তখন বলে, হতে পারে মসজিদে বিদ্যুৎ চলে গেছে তাই মাইক বন্ধ হয়ে গেছিল৷ সাজু ভাই মাথা নেড়ে বললেন, আপনার যুক্তিও ঠিক আছে আঙ্কেল। সেটাও আমি ভেবেছি। ভেবেছি বলেই কয়েকবার শুনলাম। আপনি ভালো করে লক্ষ করুন। সাইত্রিশ মিনিটে গিয়ে আজান আবার শুরু হয়েছে। কিন্তু সেটা শুরু থেকে। আর মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ আলাদা। রেকর্ড আবার প্লে করা হলো। এমনটা আগে কেউ মনোযোগ দিয়ে শোনেনি সেটা বোঝা যাচ্ছে। এবার শুনে সবাই সাজুর দিকে তাকায়। সাজু আস্তে করে বললো, রেকর্ডের শুরুর কথাগুলো রিশাতের নিজের। প্রথম আজানের সময় রিশাতের কণ্ঠ পরিবর্তন করা হয়েছে। মানে হচ্ছে রিশাতকে কেউ খুন করেছে। গলায় ফাঁস দিয়েই করেছে। রেকর্ড অবশ্য চলছিল। কিন্তু খুনি সেই রেকর্ড শুনেছে। পরে নিজের কিছু ভয়েস রেকর্ড করেছে। তারপর দুটো ভয়েস একসঙ্গে এডিট করে দুটোকে হালকা পরিবর্তন করেছে। যেন শুনতে একরকম মনে হয়। খেয়াল করে দেখুন রেকর্ডটা মোবাইলের এডিট করা ফোল্ডারে। যদি সরাসরি রেকর্ড করা থাকতো তাহলে এটা রেকর্ড ফোল্ডারে পেতাম। একটু থেমে সাজু বলেন, আপনি তো তার বাবা। আপনি বলুন রিশাতের কণ্ঠের কাছাকাছি মিলে যায় এমন কে আছে? মোবাইলে কথা বললে কারো কণ্ঠ কি আপনার কাছে রিশাতের মতো মনে হতো? রিশাতের বাবা তখন মেজো ছেলে নিলয়ের দিকে তাকান। কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, নিলয় আর রিশাত ওরা কল দিলে আমি সহজে বুঝতে পারতাম না কে মোবাইলে কথা বলছে। . . চলবে… |

0 Comments