গল্প: শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:১১)

  

 লেখিকা:সুরভী আক্তার



পর্ব:১১




শ্যামা যেন আকাশ থেকে পড়লো । নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে কোন রকমে চোখ দুটো পিটপিট করে খুললো । পুরো শরীর, মাথার যন্ত্রণা, আর কাকড়ি বুড়ির হাতের খামচিতে চুলে টান পড়ায় আপনা আপনি শ্যামার চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো চিবুক বেয়ে ‌। শ্যামা ভেজা ঝাঁপসা চোখে দেখতে পেল- সামনে মোখলেছ আর কাকড়ি বুড়ি কটমট করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে । ওদের দুজনের চোখে ক্রোধের পাশাপাশি উন্মাদনা । শ্যামা ভাবলো হয়তো ও স্বপ্ন দেখছে । এই তো একটু আগে আম্মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো । আম্মার গায়ের গন্ধ অনুভব করতে পারছিল শ্যামা । এখন কোথায় গেল আম্মা । ও এখন চোখের সামনে যা দেখছে সেটা কি সত্যি ? নাকি কোন দুঃস্বপ্ন । 
শ্যামা চোখ খিচে বন্ধ করে নেয়, আবারো খোলে । সামনের কোন কিছুই তো পরিবর্তন হয় নি । তারমানে সব সত্যি । শ্যামা কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে না । শ্যামার দূর্বল হৃদয় কেঁপে ওঠে । কাঁপা কাঁপা গলায় শ্যামা বলে....


" কি কইতাছো দাদি ? বিয়া মানে ? কা..কার বিয়া ? 

কাকড়ি বুড়ি কটমট করে শ্যামার চুল গুলো আরো শক্ত করে ধরে শ্যামা কে বিছানায় ছুড়ে মারে । দূর্বল শরীর নিয়ে কুকিয়ে বিছানায় ছিটকে পড়ে শ্যামা । বুড়ি দাঁত পিষে বলে ওঠে....


" তোর বিয়া ,, এই মুহূর্তে বিয়া হইবো তোর । মুখ দিয়া যদি একটা পেচাল বাইর করিস তাইলে আমার থাইকা খারাপ কেউ হইবো না কইয়া দিলাম । বেইচা দিছি তোরে আমরা,শুনছোস? কড়া দামে তোর মতো কালি অপয়ারে বেইচা দিছি...
মোখলেছ বাইরে যা তুই, সব কিছু তৈয়ার কর , আমি হেরে শাড়ি পড়াইয়া লইয়া আইতাছি । 


মোখলেছ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই শ্যামা করুন স্বরে ডাকে....

" আব্বা...
আব্বা, দাদি কি কইতাছে আব্বা ? আমারে বেইচা দিছে মানে ? 
আমি আম্মার কাছে যামু আব্বা, আমার আম্মারে ডাইকা দাও তুমি । আমি এই বিয়া করমু না, কার লগে বিয়া দিবো দাদি আমারে ?কার কাছে তোমরা আমারে বেইচা দিছো ? আমি আম্মার কাছে যামু আব্বা...

বলতে বলতে কয়েক ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়লো শ্যামার গাল বেয়ে ‌ । শ্যামার করুন কন্ঠেও পিতৃ স্নেহ জাগলো না মোখলেছের মাঝে । তিনি দাঁত কিড়মিড় করে কাকড়ি বুড়ি কে উদ্দেশ্য করে বললেন...

" আম্মা, বাইন্ধা রাখো ঐ মাইয়ার মুখ , বাইরে যেন একটা আওয়াজ ও না আহে । 
জাফর ব্যাপারি বইসা আছে বাইরে, অপেক্ষা করতাছে , যা করার তাড়াতাড়ি করো । 
আন্ধার হইছে,এই আন্ধারের মধ্যেই আমার ঘরের আন্ধাররে বিদায় করমু আইজ । 

জাফর ব্যাপারির‌ নাম শুনে শ্যামার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে । মস্তিষ্ক জানান দেয় বিপদ সংকেত সম্পর্কে । শ্যামা কোন রকমে বিছানায় ভর করে উঠে বসে । মোখলেছ পা বাড়াতেই আবারো করুন চোখে চেয়ে শ্যামা বলে....

" এই লাইগা আমারে সকাল থাইকা এতো যত্ন করলা আব্বা, বেইচা দেওনের লাইগা ? আমার জ্বরের ঔষধ আইনা দিলা বেইচা দেওনের লাইগা ?
তুমি তো আমার আব্বা,, দয়াকর আব্বা, আম্মারে ডাইকা দাও । আম্মা শুনলে অনেক কষ্ট পাইবো আব্বা ! আম্মা তোমারে কোন দিন ক্ষমা করবো না । 
ঐ জাফর ব্যাপারি ভালো মানুষ না আব্বা, আম্মা সবসময় হের থাইকা দূরে রাখতো আমারে । 

কাকড়ি বুড়ি আবারো শ্যামার চুল গুলো নিজের হাতের মুঠোয় টেনে ধরেন । প্রচন্ড ব্যথায় কুকিয়ে ওঠে শ্যামা । নিস্তেজ শরীর নিয়ে ছটপট করতেও পারে না । 
চোখ মুখ খিচে নেয় সে । মনে হচ্ছে এই যেন সব চুল ছিঁড়ে আসবে বুড়ির হাতের মুঠোয় । 
এদিকে শ্যামার ব্যাথা কে তোয়াক্কা না করে বুড়ি হিসহিসিয়ে বলে ওঠেন....

" জামাই হইবো তোর,, জাফর ব্যাপারি আর একটু পর জামাই হইবো তোর । নিজের জামাইয়ের নামে এমন কথা কইতে নাই । চুপ কর.. একদম চুপ কর । আইবো না তোর আম্মা । আইজ কেউ আইবো না তোর কাছে ।‌ কেউ বাঁচাইবো না তোরে ! 
কি রে তুই খাঁড়ায় আছোস ক্যান ? যা বাইরে যা.. শাড়ির পড়ায় লইয়া আইতাছি আমি ওরে । 

বুড়ির কথায় মোখলেছ দ্রুত উদ্যমে বড় বড় পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । 
ভেজা শরীরে কাঁপুনি উঠেছে শ্যামার । জ্বর তিরতির করে বাড়ছে । আবারো অবচেতন হয়ে পড়েছে শ্যামা । কাছাকাছি যাওয়া যাচ্ছে না শরীরের তাপে । কাকড়ি বুড়ি দাঁতে দাঁত চেপে শ্যামার শরীর থেকে ভেজা কাপড় খুলে একটা লাল রঙা তাঁতের শাড়ি পড়িয়ে দেয় । শ্যামার হুস নেই । পুরোপুরি হুস নেই তা নয় । শ্যামা বিড়বিড় করে বারবার কিছু একটা বলছে । চোখ খুলতে পারছে না আর । অবস হয়ে গেছে পুরো শরীর ।
বুড়ি শ্যামা কে কাপড় পড়িয়ে বাইরে আসেন । জাফর ব্যাপারি সহ আরো চার পাঁচ জন পেয়াদা এসেছে । মৌলভী সাহেব তাদের পাশে উঠানের এককোণে একটা চেয়ারে গুটিয়ে বসে আছে । পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মোখলেছ । কাকড়ি বুড়ি কে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে জাফর ব্যাপারি কুৎসিত ভাবে গাঁ দুলিয়ে হাসেন । উঠে দাঁড়ান চেয়ার ছেড়ে । লুঙ্গির এক কোনা একহাতে উঁচিয়ে বলেন....

" শাড়ি পড়াইছেন আমার বউরে ? কোই দেহি দেহি, আমার বউ টারে কেমন লাগতাছে একটু দেইখা আহি !! 

পা বাড়াতেই বাঁধ সাধেন মৌলভি সাহেব । তিনি গলা নামিয়ে নিচু স্বরে বলেন...

" বিয়া তো হইবোই ব্যাপারি সাহেব,, বিয়ার আগে মাইডার কাছে না গেইলেই কি নয় ! 

বাড়ানো পা আটকে যায় জাফর ব্যাপারির । তিনি চকিতে পিছন ফিরে তাকান । মৌলভী সাহেব মাথা নিচু করে আছেন । গ্রামের মসজিদের ইমামতি করেন তিনি । স্বভাবে ইসলামি গোড়া পন্থি , বড্ড ভালো মানুষ । শ্যামা কে হাতে গোনা কয়েক বার দেখেছেন তিনি । শ্যামার মতো তার নিজের ও একটা মেয়ে ছিল । বেঁচে থাকলে এতদিন হয়তো শ্যামার বয়সী হতো । বেঁচে থাকলে ? বেঁচে নেই ! অল্প বয়সেই কয়েক গুলো অজানা নরপশুর স্বীকারের থাবা বসেছিল মেয়েটার নিষ্পাপ শরীরের উপর । ওর নাম ছিল 'আলমিনা',, তখন বয়স কতোই বা হবে - এই বারো কি তেরো...। ওর ঐ ক্ষুদে শরীরে দাগ বসেছিল একাধিক কালো হাতের । যে দাগের তোপ সামলাতে পারে নি সেই ক্ষুদ্র ফুলের মতো দেহটা । অকালেই ঝরে পড়েছে সেই ফুল । 
সেই স্নিগ্ধ ফুল টাকে ধ্বংস করা পাপিদের শাস্তি হলো কোই ? তাদের তো খুঁজেই পাওয়াই যায় নি । শাস্তি হবে কার ? 
আলমিনার মৃত্যুর পর শ্যামা কে যতবার দেখেছে আলমিনার প্রতিচ্ছবি ততবার শ্যামার মাঝে খুঁজে পেয়েছেন মৌলভী সাহেব । আলমিনার পরিনতির সাথে শ্যামার জন্য অপেক্ষাকৃত পরিনতি কোন অংশেই কম নয় । জাফর ব্যাপারি মোটেই ভালো মানুষ নয় ‌ । মানুষ রুপি পশু তিনি । 
কিন্তু মৌলভী সাহেবের করনীয় কিছু নেই ‌ ‌। তাকে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে বিয়ে পড়ানোর জন্য । গ্রামের মাতব্বর জাফর ব্যাপারি, তার কথার অবাধ্য হওয়া মানে ভালো কিছু হবে না মৌলভী সাহেবের সাথে । 
যেখানে শ্যামার বাবা নিজেই এই অন্যায় কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন সেখানে তার করার মতো কিছুই নেই । তিনি মাথা নত করে সয়ে যাচ্ছেন সবটা । 

মৌলভী সাহেবের বাঁধায় বিরক্ত হলেও মুখে তা প্রকাশ করে না জাফর ব্যাপারি ।
ঘুরে এসে আবার চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসলেন । মেকি হেসে বললেন....

" তা মৌলভী সাহেব, বিয়া পড়ানো টা শুরু কইরা দেও , আর তো তোর সইতাছে না । এই রাইতের মধ্যে বাড়িও ফিরতে হইবো আবার । তিন তিনটা বউ রাইখা আইছি ঘরে, হেগো লগে তাগো নয়া সতিনরে পরিচয় করায় দেওন লাগবো না ? তারপর আবার তো অনেক কাম আছে ! 
আর দেরি কইরো না..কইগো মোখলেছ মাইয়ারে বাইরে বাইর করাও !! 

মৌলভী সাহেব চোখ বন্ধ নিলেন । কাকড়ি বুড়ি বারান্দা থেকে নামতে নামতে বললেন...

" বিয়া ঘরেই পড়াও.. ঐ মাইয়া জ্বরের তোপে জ্ঞান হারাইছে । বাইরে বাইর করোন যাইবো না হেরে । 

" তাইলে আর কি.. 
ঘরে যাও মৌলভীরে লইয়া.. আমিও যাই তোমাগো সাথে । দেইখা আহি একবার, বিয়ার পরে না হয় আরো ভালো কইরা দেখমু । 

বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে আবারো উঠে দাঁড়ান তিনি । মৌলভী সাহেবের দিকে চোখ তাক করতেই তিনিও উঠে দাঁড়ান ‌ । মাথার টুপি খুলে পাঞ্জাবির পকেটে রাখেন । একটা পাপের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন তিনি । মাথায় টুপি মানায় না । নিজেকে আল্লাহর বান্দা বলতেও লজ্জা লাগছে তার । চেয়েও কিছু করতে পারছেন না । মনে মনে এক আল্লাহ কে ডাকছেন তিনি । ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের পানে তাকালেন তিনি । চোখ বন্ধ করে নীরবে নালিশ জানালেন এ উপর আল্লাহর কাছে । 
এক পা এগোনোর আগেই দেউড়ির খিড়কিতে ধাক্কার শব্দ শোনা যায় । ফুলি গলা উঁচিয়ে ডাকছে । 

" বুড়ি... ও দাদি, ও কাকা, খিড়কি খুইলা দেও....
কাকি শ্যামার দায়িত্ব আমার কাছে দিয়া গেছে । আমারে থাকতে কইছে শ্যামার লগে । কাইল থাইকা শ্যামার অনেক জ্বর কাকা.. আইজ মনে হয় আবারো জ্বর আইছে । ওর কাছে যাইতে দেও আমারে.....

এই নিয়ে একের পর এক তিন বার বাড়ির বাইরে থেকে ডাকলো ফুলি । সন্ধ্যা থেকে দু'বার পায়চারি করেছে নিজের বাড়ি আর এই বাড়ি । দুবার ডেকে গেছে ইতোমধ্যে । ভেতর থেকে কেউ সাড়া দেয় নি , আর না কেউ দরজা খুলে দিয়েছে । 
তবে এবার আটঘাট বেঁধে এসেছে ফুলি ‌। এতো বার ডাকার পরেও যখন কেউ সাড়া দিচ্ছে না, এমনকি শ্যামা ও না - এখন ফুলির চিত্ত নড়ে উঠেছে । ও বুঝতে পারছে ভেতরে কিছু না কিছু ঘটছে । নয়তো কেউ সাড়া দেবে না কেনো । 
আবারো ফুলির ডাকে বাঁধা পাওয়ায় চরম বিরক্ত হয় জাফর ব্যাপারি । চোখ মুখ কুঁচকে মুখে গালি জাতীয় কিছু উচ্চারণ করেন তিনি । চোখ ঘুরিয়ে তার পেয়াদা গুলোকে ইশারা করতেই তারা ইশারা বুঝে তেড়ে যায় দেওড়ির দিকে । কাছাকাছি গিয়ে থেমে যায় তারা । দেওড়ির বাইরে একাধিক ব্যক্তির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে । কয়েকটা পুরুষ কন্ঠ সহ মহিলা স্বরের ও গুজগুজানি শোনা যাচ্ছে । 
পেয়াদা গুলো থমকে দাঁড়ায় । ফুলির উচ্চস্বরে আশেপাশের লোকজন জেগে গেছে । অনেকে জমা হয়েছে দেওড়ির বাইরে । পেয়াদা গুলো খানিক ভীত হয়ে পিছন ফিরে তাকায় জাফর ব্যাপারির দিকে । 
তার একটা আলাদা সম্মান আছে এই গ্রামে । যাহোক এই গ্রামের মাতব্বর তিনি । গ্রামের মানুষরাই তাকে মাতব্বর বানিয়েছে । কোনো কুলশ রচনা হলে তার জন্য অপেক্ষাকৃত খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হবে ‌।

এদিকে ফুলি সেই তখন থেকে ডেকে যাচ্ছে । মৌলভী সাহেব যেন স্বস্তি পেলেন একটু । জাফর ব্যাপারির মুখে স্পষ্ট ভয় ফুটে উঠেছে । ক্ষমতা হারানোর ভয় । 
তার মুখ পানে চেয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন মৌলভী সাহেব । এই যাত্রায় যদি কোন ভাবে শ্যামা বেঁচে যায়, তাহলে তার চেয়ে খুশি হয়তো আর কেউ হবে না ‌। 
জাফর ব্যাপারি ঢোক গেলেন । একবার মোখলেছ আর কাকড়ি বুড়ি কে দেখে নেন । এরা তো নিজেরাই তাদের মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি আছে । তাহলে তো ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই । জাফর ব্যাপারির চোখ দুটো আবারো চিকচিক করে উঠলো । মোখলেছের কাছ থেকে তিনি টাকা পান অনেক । লাভ সমেত টাকার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখের কাছাকাছি । এই টাকার বিনিময়েই তো তিনি শ্যামা কে বিয়ে করছেন । শ্যামা কে তার সাথে বিয়ে দিলে এই টাকা মৌকুভ হয়ে যাবে । মোখলেছকে আর পরিশোধ করতে হবে না এই টাকা । যত যাই হোক, অনেক টাকার ব্যপার । মোখলেছ এখন গ্রাম বাসির সামনে পাল্টি খাবে না , এটা জানেন জাফর ব্যাপারি । 
মোখলেছের ভীত মুখ পানে চেয়ে যেন শক্তি সঞ্চয় হলো জাফর ব্যাপারির মাঝে । তিনি পেয়াদাদের ইশারা দিলেন খিড়কি খুলে দেওয়ার জন্য । তার ইশারা পেতেই খিড়কি খুলে দেওয়া হলো । 
খিড়কি খুলতেই হুড়মুড়িয়ে বাড়ির ভেতরে ঢোকে ফুলি । সাথে সাথে কয়েক জন মহিলা আর পুরুষ । ভেতরে ঢুকেই আঁতকে ওঠে ফুলি । সামনে শ্যামার ঘরের বারান্দার সামনে লুঙ্গির এক কোচা উঠিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফুলির দিকেই তাকিয়ে আছে জাফর ব্যাপারি । ফুলির পাশে ব্যাপারির কয়েক জন পেয়াদা । মৌলভী সাহেব মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছেন চেয়ারের পাশে । কাকড়ি বুড়ি আর মোখলেছ ও চুপসে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । ফুলি চঞ্চল চোখে আশেপাশে তাকায় । শ্যামা কোথাও নেই । ফুলির তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক জানান দেয় বিপদের আশঙ্কা সম্পর্কে । সে বুঝতে পারে কি হতে চলেছে এখানে । ফুলি ঢোক গেলে । চোখ ভরে আসছে ওর । দু'পা পিছিয়ে যায় ফুলি । অকস্মাৎ পিছন ফিরে ছুট লাগায় সে । রাতের অন্ধকারে এলোমেলো পায়ে কোন দিকে ছুটে চলেছে সে নিজেও জানে না । ওর মাথায় একাধিক বিপদের হাতছানি সম্পর্কিত বার্তা ঘোরপাক খাচ্ছে । 
ফুলি চলে যেতেই গ্রাম বাসিরা জাফর ব্যাপারি কে দেখে এগিয়ে আসে তার কাছে । একজন বয়োজ্যেষ্ঠ তাচ্ছিল্য মুলক বিনয় দেখিয়ে বলেন....

" জাফর ব্যাপারি যে ? তা এতো রাইতে মোখলেছ মিয়ার বাড়িত কি করো হে ? তাও আবার খিড়কি লাগাইয়া ? সাথে মৌলভীও আছে দেখতাছি !! 

তার কথায় থতমত খেয়ে যায় মোখলেছ । জাফর ব্যাপারি কিঞ্চিত হেসে উত্তর দেন.....

" বিয়া করতে আইছি গো খুড়া....
মোখলেছের মেজো মাইয়ার লগে আইজ আমার বিয়া । 

উপস্থিত সবাই অবাক হন । মহিলারা মুখে আঁচল টেনে ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করে দেন । পাশ থেকে অন্য একজন বলে ওঠেন....

" কি কও ? বিয়া ? তাও মোখলেছের মাইয়ার লগে ? 

" হ ... মোখলেছ মিয়া নিজে থাইকাই হের মাইয়ারে আমার হাতে তুইলা দিতাছে ? 
তাই না মোখলেছ মিয়া..? ও তোমার সাথে তো আবার এখন থাইকা সম্পর্ক পাল্টাই যাইবো,, শশুর হইবা তুমি আমার । নাম ধইরা তো আর ডাকোন যায় না । 

মোখলেছ জোর পূর্বক একটু হেসে বললেন....

" আমার মাইয়ার লগে আমি জাফর ব্যাপারির বিয়া দিতাছি । আমার মাইয়াও রাজি এই বিয়াতে । 

উপস্থিত সবার মধ্য থেকে কেউ একজন বলে ওঠেন....

" তা রাজিই যখন, তখন রাইতের আন্ধারে সবার অগোচরে মাইয়ার বিয়া দিতাছেন ক্যান ? অলকাও তো বাড়িত নাই শুনলাম ! 

জাফর ব্যাপারি বলে ওঠেন....

" মোখলেছ মিয়ার কি সামর্থ্য আছে ঢাক ঢোল পিটাইয়া মাইয়ারে বিয়া দেওয়ার ? সামর্থ্য নাই দেইখা তো রাইতের আন্ধারে বিয়া দিতাছে । আর এমনিতেও আমি চাই নাই আমার শশুরের উপর কোন খরচের চাপ আসুক । তাই তো কোন খরচ ছাড়াই বিয়া করতে আইছি ‌। 

জাফর ব্যাপারির তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন কথায় যেন গলে গেল উপস্থিত সকলে । সবার মুখের প্রতিক্রিয়া দেখে ক্রুর হাসলেন ব্যাপারি । 
কেউ একজন তাকে উদ্দেশ্য করে বলল....

" তাইলে আর খাঁড়ায় না থাইকা বিয়ার কাম শুরু কইরা ফেলাও দেহি । মিষ্টি তো লইয়া আইছো নাকি ? মাতব্বরের চাইর নাম্বার বিয়ার ভোজ না হোক, মিষ্টি তো খাইতে পারমু !!

আর কথা বাড়ালো না কেউ । সবাইকে বসতে দেওয়া হলো চেয়ারে । কেউ কেউ দাঁড়িয়েই রইলো । মহিলারা কানাঘুষা করছে,, ব্যাপারির চরিত্র ভালো নয় , মেয়েটার কপাল পুড়লো বোধহয় । কেউ কেউ বলছে- হয়তো টাকা দিয়ে শ্যামা কে কিনে নিয়েছে ব্যাপারি । 
মৌলভী সাহেব সহ কাকড়ি বুড়ি আর জাফর ব্যাপারি সহ আরো চারজন পুরুষ সাক্ষী হিসেবে ঘরে ঢুকলো । শ্যামা সেই অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে ভেজা বিছানার উপর । শরীরে লাল রঙা শাড়ি জড়ানো । ঠান্ডায় জমে গেছে পুরো শরীর । জ্বরের ঘোরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে । শ্বাস প্রশ্বাস অত্যাধিক গরম হয়ে গেছে । কাকড়ি বুড়ি শ্যামা কে কোন রকমে তুলে বসায় । শ্যামার শাড়িটা পায়ের কাছ থেকে একটু উপরে উঠে গেছে । জাফর ব্যাপারি সহ বাকি চার জন পুরুষ কু নজরে চেয়ে আছে শ্যামার পায়ের দিকে । মৌলভী সাহেবের বুক চিরে ব্যর্থ শ্বাস বেরিয়ে আসলো । শ্যামার কোমল মুখটা দেখে হৃদয় কেঁপে উঠলো তার । তিনি পায়ের কাছে বসে ওর শাড়িটা টেনে ঢেকে দিলেন ওর পা । দুর থেকেই শ্যামার শরীরের তাপ অনুভব করতে পেরে একটা কাঁথা জড়িয়ে দিলেন শ্যামার গায়ে । উষ্ণতা পেয়ে একটু নড়ে উঠলো শ্যামা । 
জাফর ব্যাপারি মৌলভীর কাজে কিঞ্চিত ভ্রু কুঁচকালেন । মেয়েটাকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিলেন এতক্ষণ । কিন্তু এখন মেয়েটার পুরো শরীর ভারী কাপড়ে আবৃত । 
জাফর ব্যাপারি বিরক্তির স্বরে বললেন....

" তাড়াতাড়ি বিয়ার কাম শুরু করো মৌলভী,, সময় নাই আমার হাতে । 

মৌলভী সাহেব খানিক চুপ থেকে বিয়ের কাজ শুরু করে দিলেন । 
এবার আসল কাজ । কবুল বলার পালা মেয়ের । কিন্তু শ্যামা তো অচেতন । ও কি করে কবুল বলবে । মৌলভী সাহেব নরম কন্ঠে কয়েক বার ডাকলেন শ্যামা কে । কিন্তু কোন সাড়া নেই । 
জাফর ব্যাপারি বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে মুখে 'চ' সূচক শব্দ উচ্চারণ করলেন । কাকড়ি বুড়ি শ্যামার নরম চোয়াল চেপে ধরলেন শক্ত হাতে । খিটখিট করে বলে উঠলেন....

" ঐ মাইয়া,ওঠ কইতাছি । মরনের ঘুম ঘুমাইছোস ? আমাগো বাড়ি থাইকা বিদায় হইয়া তারপর এই ঘুম ঘুমাইছ । ওঠ কইতাছি...ক কবুল...বিয়া করবি না বিয়া ? কবুল ক.....

শ্যামা অবচেতন অবস্থায় কুকিয়ে উঠলো । শ্যামার কোন পরিবর্তন না দেখে জাফর ব্যাপারি দাঁত পিষে বললেন....

" খুঁড়ি , তাড়াতাড়ি উঠাও তোমার নাতনিরে । আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না । পানি ঢালো হের মুখে, যে কইরাই হোক তাড়াতাড়ি উঠাও...

ব্যাপারির কথা মতো এক মগ পানি আবারো শ্যামার মুখে ঢেলে দেয় কাকড়ি বুড়ি । শ্যামা হাঁসফাঁস করে ওঠে । বুড়ি শ্যামার চোয়াল শক্ত করে ধরে বলেন....

" কবুল ক...
যত তাড়াতাড়ি কইবি ততই তোর ভালা । 

শ্যামা চোখ খুলতে পারছে না । সে অস্পষ্ট স্বরে আওয়াজ তুললো...

" আ.. আমি কমু না । কিছুতেই কমু না । এই বিয়া করমু না আমি । 

কাকড়ি বুড়ি সপাটে একটা চড় বসালেন শ্যামার গায়ে । বুড়ো হাতেও শক্তি কম ছিল না তার । শ্যামা হুমড়ি খেয়ে পড়ে খাটের কাঠের তক্তার উপর । কাঠের তক্তায় বারি খেয়ে কপাল কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে নিমিষেই । ব্যাথা পেলেও মুখ দিয়ে শব্দ বের হয় না শ্যামার । কাকড়ি বুড়ি আবারো শ্যামার চুল খামচে উঠিয়ে বসায় শ্যামা কে । 

" কবুল ক....

শ্যামার কিছুই বলে না ।
বুড়ি আবারো একটা চড় বসায় শ্যামার গালে । এবার ঠোঁট কামড়ে কেঁদে ওঠে শ্যামা । কাকড়ি বুড়ি হিংস্র, তবে অলকার জন্য শ্যামার প্রতি তিনি কখনো হিংস্রতা প্রকাশ করতে পারেন নি । যা বলেছেন সব মুখেই বলেছেন । 
শ্যামার বুক ফেটে আওয়াজ বেরিয়ে আসে....

" আম্মা... 

মৌলভী সাহেবের চোখ থেকে আপনা আপনি দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে শ্যামা কে দেখে । শ্যামার নরম গালে কাকড়ি বুড়ির চড়ের দাগ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে । ঠোঁট কেটে রক্ত ঝড়ছে ‌। কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে অনারগল । জাফর ব্যাপারি এসব দেখে যেন মজা পাচ্ছেন খুব । তার মুখে অদ্ভুত হাসি লেগে আছে । 
কাকড়ি বুড়ি আবারো শ্যামা কে কবুল বলতে বলে । কিন্তু শ্যামা বলে না । ও ধীরে ধীরে আবারো বিবস হয়ে পড়ছে । চোখ লেগে আসছে পুনরায় । চারদিকের সব গাঢ় অন্ধকার হয়ে আসছে । অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু । 
শ্যামা শরীর ছেড়ে দেয় বিছানার উপর । কাকড়ি বুড়ি আবারো টেনে তোলে ওকে । পুনরায় চড় বসাতে যায় ওর গালে । তবে শ্যামার গালে চড় পড়ার আগেই একটা শক্ত হাত আটকে দেয় বুড়ির উদ্ধত হাত ‌। রেগে গিয়ে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে হাত ধরা ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ বুড়ি । 
অমনি চুপসে যান তিনি । চোখ মুখে ক্ষিপ্ততার পরিবর্তে আতঙ্ক নেমে আসে । সামনে স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছে জমিদারের একমাত্র উত্তরাধিকারি , আগামীর জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দার । 
বুড়ি চোখ কচলে আবারো তাকান , জাফর ব্যাপারির দিকে একবার তাকান । ব্যাপারি অবিশ্বাস্য ভীত নয়নে চেয়ে আছে । 
বুড়ির জং ধরা হাতে সংগ্রাম জোয়ার্দার বাঁধন শক্ত করেন , আরো জোরে চেপে ধরেন বুড়ির হাত । বুড়ি বিবস কন্ঠে গুঙ্গিয়ে ওঠে । মনে হচ্ছে বুড়ো হাড় ভেঙ্গে যাবে এক্ষুনি । 
সংগ্রাম জোয়ার্দার বুড়ির হাত চেপে ধারালো রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বুড়ির দিকে । বুড়ি কিছু বলার আগেই খাটের উপর শ্যামার কাছে হুড়মুড়িয়ে বসে পড়ে ফুলি । কান্নারত অস্থির কন্ঠে শ্যামা কে ঝাঁকিয়ে গালে আলতো চাপড় মেরে ডাকে...

" এই শ্যামা,, শ্যামা,, ওঠ শ্যামা । আমি আইছি তোর কাছে, তোর ফুলি আইছে । ওঠ শ্যামা, তোর কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবো না আর । আমি আইছি তো...! একবার চোখ খোল শ্যামা..! লক্ষীটি আমার, একবার চোখ খোল....

সংগ্রাম মুহুর্তেই বুড়ির হাত ছেড়ে দেয় । কাকড়ি বুড়ি ছাড়া পেতেই পিছিয়ে যায় কয়েক পা । জাফর ব্যাপারি শুকনো ঢোক গেলেন । সংগ্রাম চেয়ে দেখে শ্যামার মুখ । কপাল আর ঠোঁটের কোণা কেটে রক্ত বের হচ্ছে । গালে চার আঙ্গুলের দাগ স্পষ্ট । রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায় সংগ্রামের । শ্যামা পিটপিট করে চোখ খোলে, ঝাঁপসা চোখে ফুলিকে কান্নারত অবস্থায় দেখে আলতো হাসে শ্যামা । হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ফুলির চোখের পানি মুছিয়ে দেওয়ার জন্য । কিন্তু শক্তি কুলোয় না । সম্পুর্ন নেতিয়ে পড়ে শ্যামা । চোখ দুটো বোজার আগে অস্পষ্ট স্বরে বলে....

" আমারে বাঁচা ফুলি । আমি জানতাম তুই আইবি , আমার আম্মা......

আর কিছু বলতে পারে না শ্যামা । সম্পুর্ন অচেতন হয়ে পড়ে । ফুলি শ্যামা কে বুকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে । সংগ্রাম শীতল চোখে চেয়ে থাকে শ্যামার নেতিয়ে পড়া ক্লান্ত মুখের পানে । 
পুনরায় চোয়াল শক্ত হয়ে যায় সংগ্রামের । এবার ক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জাফর ব্যাপারির দিকে । সংগ্রামের অগ্নি চক্ষু দেখে ভয়ে গলা শুকিয়ে যায় জাফর ব্যাপারির । তিনি শুকনো ঢোক গেলেন । 
আশেপাশের সাত গ্রামের জমিদারের ছেলে সংগ্রাম জোয়ার্দার । ওদের ক্ষমতা অনেক । ওদের করুনার ফলেই জাফর ব্যাপারি আজ মাধবপুর গ্রামের মাতব্বর ।
অন্যান্য ছয় গ্রামের তুলনায় মাধবপুর গ্রাম একটু ছোট । প্রত্যেকটা গ্রামেই একজন করে মাতব্বর নিয়োগ দিয়েছেন জমিদার লতিফ জোয়ার্দার । মাধবপুরের মাতব্বর জাফর ব্যাপারি । জাফর ব্যাপারির একাধিক কুকর্ম সম্পর্কে জমিদার অবগত নন । অনেক নালিশ রয়েছে তার সম্পর্কে । কিন্তু প্রখ্যাত কোন প্রমাণ নেই । যার ফলে বারবার বেঁচে যান তিনি ‌ । 
জমিদারের অগোচরে অনেক কিছুই চলে । 
সংগ্রাম স্বভাব বশত প্রত্যেক রাতেই জিপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় গ্রামে । গ্রামের মানুষ সন্ধ্যা হতেই ঘুমিয়ে পড়ে । পুরো শুনশান এলাকায় জিপের ধোঁয়া উড়িয়ে ঘুরে বেড়ায় সংগ্রাম । সাথে দু-একজন সঙ্গী থাকে । 
আজও ব্যতিক্রম হয় নি তার । প্রত্যেক দিনের মতোই আজও জিপ নিয়ে বেরিয়েছিলো সংগ্রাম । আজ এসেছিল মাধবপুর গ্রামে । গ্রামের আঁকা বাঁকা রাস্তায় থেমে থেমে জিপ চলছিল । জমিদার প্রত্যেক গ্রামের উন্নয়নে খরচ ঢালেন । তবুও এই গ্রামের এই রাস্তার কোন উন্নয়ন নেই । যুগ থেকে রাস্তায় কোন পরিবর্তন আসে নি এখনো । এই গ্রামের মাতব্বর কি করেন ? মাতব্বর থাকা স্বত্বেও, উন্নয়ন বাবদ টাকা ব্যয় হওয়া সত্ত্বেও কোন উন্নয়ন নেই এই গ্রামের । 
সংগ্রাম এসব দেখে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকায় । রাস্তার খাঁজে বারবার আটকাচ্ছে জিপের চাকা । হঠাৎ একটা মেয়ে ছুটে আসে জিপের সামনে । অকস্মাৎ ব্রেক কষা হয় । এতো রাতে অন্ধকার শুনশান রাস্তায় জিপের আলোয় একটা মেয়েকে দেখে এক লাফে জিপ থেকে নেমে পড়ে সংগ্রাম ।
সামনে ফুলিকে হাঁসফাঁস করতে দেখে জিপের ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে আসে আহাদ । সংগ্রামের সাথে জিপের ড্রাইভার হিসেবে কাজ শুরু করেছে আহাদ । আগে কদিন জমিদারের জমিজমা দেখতো । এখন কদিন থেকে সংগ্রামের সাথে সঙ্গী হিসেবে থাকছে । 
ফুলির অবস্থা দেখে আহাদ ব্যাকুল হয়ে পড়ে । ফুলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলে.....

" ফুলি.. তুই ? এতো রাইতে ? কোই যাইতাছিলি এমনে ? কি অবস্থা হইছে তোর ? কি হইছে ক...? 

ফুলি আহাদকে দেখে আরো বেশি অস্থির হয়ে পড়ে । অস্থির কন্ঠে আওড়ায়....

" আহাদ ভাই...
আমার শ্যামা... আমার শ্যামারে বাঁচাও আহাদ ভাই....

শ্যামার নাম শুনে সংগ্রাম ভারী গলায় ফুলিকে শুধায়....

" শ্যামা..? কি হয়েছে শ্যামার ? 

ফুলি সংগ্রামের দিকে ঘুরে বিনয়ের স্বরে বলে....

" আমার শ্যামারে বাঁচান ছোট জমিদার,, ওরা ওর সর্বনাশ কইরা দিবো । ওরা ওরে জোর কইরা বিয়া দিবো...
দয়া কইরা বাঁচান ওরে.....

ফুলির মুখে এমন কথা শুনে চোখ মুখ শক্ত হয়ে যায় সংগ্রামের । দ্রুত জিপে উঠে পড়ে ওরা । 

★ বর্তমান__________

সংগ্রাম জাফর ব্যাপারির পাঞ্জাবির কলার ধরে এক টানে ঘরের বাইরে নিয়ে আসে । 
বাইরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবাই । মোখলেছ ভয়ে চুপসে আছেন । যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম প্রতিবাদ সঞ্চার করে এটা কারোরই অজানা নয় ।
বাইরে এসে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে একে একে সবাইকে দেখে নেয় সংগ্রাম । হুংকার ছেড়ে বলে....

" কি হচ্ছিলো এখানে ? 

সংগ্রামের হুংকারে কেঁপে ওঠে উপস্থিত সবাই । সবাই চুপ, কারোর মুখে কোন কথা নেই । মোখলেছ ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নিচু স্বরে বলেন....

" আ..আমার মাইয়ার বিয়া দিতাছিলাম ছোট জমিদার .... ছোট পরিসরে ঘরোয়া ভাবে বিয়া দিতাছিলাম । কিন্তু আপনি এইহানে ‌? 

" কার সাথে বিয়ে দিচ্ছিলেন আপনার মেয়ের ? 

খানিক শান্ত কন্ঠে ঘাড় বাঁকিয়ে প্রশ্ন করে সংগ্রাম । ওর শান্ত স্বরে মোখলেছ যেন একটু স্বস্তি পেলেন । তিনি মাথা উঁচিয়ে বললেন....

" জা.. জাফর ব্যাপারির লগে ! 

" আপনার মেয়ে এই বিয়েতে রাজি ? 

" হ হ ছোট জমিদার... রাজি তো । আমার মাইয়া রাজি এই বিয়াতে । 

" মিথ্যা কথা ,, শ্যামা এই বিয়াতে রাজি নয় । ওরা জোর কইরা শ্যামা কে বিয়া দেওনের চেষ্টা করতাছিল । কাকি বাড়িত নাই, এই সুযোগে ওরা ঐ জাফর ব্যাপারির কাছে শ্যামারে বেঁইচা দিতে চাইতাছিল । 

ফুলির ঝাঁজালো কথায় জাফর ব্যাপারি অগ্নি দৃষ্টিতে তাকান ওর দিকে । চোখ ফিরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন তার সাগরেদ'রা কোথাও নেই । পালিয়েছে ইতোমধ্যে । সংগ্রাম আবারো হুংকার ছেড়ে বলে ওঠে....

" জাফর ব্যাপারি আপনার থেকেও বেশি বয়সী । ওনার বয়স জানেন আপনি ? কোন অধিকারে আপনি আপনার মেয়ের সাথে ওনার বিয়ে দিচ্ছিলেন ? 

মোখলেছ ঢোক গেলে আবারো । পুনরায় কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে....

" আমি মাইয়ার বাপ,, ওরে বিয়া দেওনের অধিকার আমার আছে । আর ইসলামেও বয়োজ্যেষ্ঠ দের সাথে বিয়া দেওয়ার নীতি আছে ! 

" চুপ... একদম চুপ । ঐ মুখে ইসলামের নীতি তুলবেন না আপনি । 
শ্যামা ছুঁয়েছে কে ? বলো.. কে ছুঁয়েছে ওকে ? ওর গায়ে হাত তুলেছে কে ? 

সংগ্রামের গর্জনে মাটি সহ কেঁপে ওঠে উপস্থিত সবাই । কাঁকড়ি বুড়ি চুপসে যান । সিটিয়ে যান মোখলেছের পেছনে ।

জাফর ব্যাপারি সাফাই গাওয়ার স্বরে তুতলিয়ে বলেন....

" শ্যামা রে কেউ ছোঁয় নাই সংগ্রাম বাবা । বিশ্বাস করো আমি এখনো ওরে এক আঙ্গুলেও ছুঁইয়া দেখি নাই । একটু পর তো বিয়া হইতোই, তাই বিয়ার আগে ছুঁই নাই আমি ওরে । 

সংগ্রাম কড়া দৃষ্টি পাত করে জাফর ব্যাপারির পানে । মৌলভী সাহেব মাথা নামিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলেন....

" কোন মাইয়া মানুষরে শুধু ছুঁইলেই যে অসম্মান করা হয় এটা কোন যৌক্তিক কথা নয় ছোট জমিদার । 

সংগ্রাম বুঝতে পারলো মৌলভী সাহেবের কথার মানে । ওর চোয়াল অত্যাধিক শক্ত হয়ে গেল নিমিষেই । কাউকে কিছু বলার সুযোগ না সংগ্রাম জাফর ব্যাপারি কে উদ্দেশ্য করে দুজন পেয়াদা কে বললেন..

" এই জানোয়ার টাকে নিয়ে যাও । আর ওকে কোথায় রাখতে হবে সেটা তোমরা খুব ভালো করেই জানো । 

জাফর ব্যাপারি হুড়মুড়িয়ে সংগ্রামের পায়ের কাছে বসে দু'পা জাপটে ধরেন । তিনি আন্দাজ করতে পারছেন তার শাস্তি স্বরূপ কি হতে পারে । তিনি ভেজা গলায় বলতে শুরু করেন...

" ক্ষমা কইরা দেও বাপ , এই বারের মতো ক্ষমা কইরা দেও । আর জীবনেও এমন ভুল হইবো না । আর জীবনেও বিয়া করমু না আমি । আমারে কোথাও পাঠাইয়ো না বাপ,, আমার বাড়িত তিন তিনটা বউ আছে । ওরা না খাইতে পাইরা মইরা যাইবো বাপ । আমারে মাফ কইরা দেও, আর একটা সুযোগ দেও আমারে ...

সংগ্রাম আর কিছু বললো না । স্বভাব সুলভ পেছনে হাত গুটিয়ে মুখ ফিরিয়ে সটান দাড়িয়ে রইল । পেয়াদা'রা এসে টেনে হিচড়ে জাফর ব্যাপারি কে নিয়ে গেলো কোথাও একটা । তার আর্তনাদ আর কেউ শুনলো না । 
বাড়ির উঠানে একাধিক মানুষ থাকা সত্ত্বেও কারোর মুখে কোন রা নেই । মহিলারা ফিসফিস করছে আড়ালে । সংগ্রাম কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করছে তাদের কথা । 
ওরা একে অপরকে বলছে --

-- দুই দুই বার বিয়া ভাঙলো এই মাইয়ার , আর কেডায় বিয়া করবো এরে । কয়দিন আগে শুনলাম কোথায় জানি বিয়া ঠিক হইছে,, সেইখানেও মনে হয় আর বিয়া হইবো না এইসব শুনলে । কি একটা শনি কপালি মাইয়া কন দেখি , জীবনে না শান্তি পাইলো আর না অলকারে শান্তি পাইতে দিলো । কি জানি অলকা এইসব শুনলে কি করবো ।

সংগ্রাম তাদের কথা শুনে দাঁত পিষলো । মোখলেছের হাঁটু কাঁপছে । মৌলভী সাহেব দাঁড়িয়ে না থেকে পা বাড়ালেন চলে আসার জন্য । সংগ্রাম গম্ভীর স্বরে বাঁধা দিলেন তাঁকে....

" দাঁড়ান....

মৌলভী সাহেব দাঁড়িয়ে গেলেন । সবাই একসাথে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম এবার দ্বিগুণ গম্ভীর গলায় ফুলিকে ডাকলো....

" ফুলি....

ফুলি চকিতে উত্তর দিলো....

" জ্বি ছোট জমিদার....

" শ্যামা কে তৈরি করাও ,, আজ এই মুহূর্তে বিয়ে হবে ওর। 



চলবে........

 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×