লেখিকা:তন্দ্রাতরঙ্গ
(০৫)
আকাশ কুসুম কল্পনা করতে করতে পিচঢালা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আসছে শ্বেতা।আর কয়েকমাস গেলেই প্রি টেস্ট এক্সাম।কিভাবে কি সামাল দেবে তা ভেবেই কুলায় না সে।হঠাৎ দূরে একজন ছেলেকে দেখতে পেলো... কালকের সেই ছেলেটাই।আজ আবার এসেছে?আচ্ছা জ্বালা তো!বিরক্ত হয়ে সামনে এগিয়ে চলল শ্বেতা।কাছাকাছি আসতেই,
"দাঁড়া "
শ্বেতা এবার ঘুরে দাঁড়ালো অরুণের দিকে।বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
"কি চাই? "
"তোর মাথার ব্রেইন।"
হকচকিয়ে গেলো শ্বেতা।এভাবে অপমান ওকে আজ অব্দি কেউ করে নি।চোখ বড় কিরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই,
"মাথায় ব্রেইন থাকলে নিশ্চয়ই আমায় পরিচয় দেওয়ার সুযোগটুকু দিতি কাল।নেই বিধায়ই তুই দেস নি।বলদ!!!"
শ্বেতা অবিশ্বাসের হাসি দিলো।চোখ বড় করে বলল,
"কোন দেশের জেন্টলম্যান সামনে এসে পরিচয় না দিয়ে পেছন থেকে মুখ চেপে ধরে?"
"আমি চাচ্ছিলাম না তুই চেঁচামেচি করিস তাই এমন করেছিলাম।তাও তো ষোলোকলা পূর্ণ করে ছাড়লি।"
"আমায় তুই করে বলা বন্ধ করুন।আমি আপনাকে চিনি না।"
অরুণ এতক্ষণে একটু হাসলো।শ্বেতার মনে হলো এমন হাসি এর আগে সে কখনোই দেখে নি।এই ছেলে নিঃসন্দেহে সুদর্শন। কিন্তু ওর হাসিটা একটু বেশীই সুন্দর।
"আমি অরুণ। "
শ্বেতা কিছু বলবে তার আগেই অরুণ বলে উঠলো,
"আমি বুঝতে পারছি তুই আমায় চিনতে পারছিস না।ওকে, নো অফেন্স। কিন্তু তার মানে এই না যে তুই আমায় একেবারে ভূলে গেছিস।যেহেতু একদন ছোটবেলার কথা তাই তুই ভূলে যেতেই পারিস এটাই স্বাভাবিক। আর যাই হোক তখন তোর মাত্র আট বছর ছিলো।"
শ্বেতার সমস্ত রাগ,ভয়,মুগ্ধতা সব একমুহূর্তে গায়েব হয়ে গেলো, জন্ম নিলো প্রচন্ড বিষ্ময়ের।এটা সেই বাগানবাড়ির অরুণ!!!
"তুমি???"
অস্ফূট স্বরে শোনা গেলো কথাটা তবে অরুণ ঠিকই শুনতে পেলো।তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললো,
"চল হাঁটতে হাঁটতে বলা যাক। "
শ্বেতা এখনো বিস্ময়ের ঘোরে আছে।সে প্রশ্ন করলো,
"তুমি...কিভাবে???"
অরুণ বললো,
"আমার সবই মনে আছে স্পষ্ট। আর যাই হোক আমার নিজের বয়স তখনই ছিলো পনেরো প্রায়।"
শ্বেতা কিছু বলতে পারলো না।কেমন যেনো অস্বস্তি কাজ করছে ওর মধ্যে।একজন ছেলে যাকে সে কৈশোরে দেখেছে,আজ সে যুবক অবস্থায় তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে তখন কিনা আট বছরের বালিকা ছিলো আর আজ কিনা সে সতেরো বছরের কিশোরী। তার চোখেমুখে স্পষ্টতই অস্বস্তি ফুটে উঠলো।অরুণ লক্ষ্য করে বললো,
"গ্র্যাজুয়েশন কম্প্লিট করার পর ভাবলাম একটু ঘোরাঘুরি করা যাক তাই কুমিল্লায় চলে এলাম।তা কেমন আছিস?"
"ভালোই"
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো শ্বেতা।মাথা ঘুরিয়ে অরুণের দিকে একবার তাকালো সে।বেশ অনেকটাই লম্বা অরুণ।
"এবার কোন ক্লাসে তুই?"
বলেই অরুণ শ্বেতার দিকে তাকালো। দুজনের চোখাচোখি হতেই সগ্বেতা তাড়াতাড়ি সামনের দিকে ফিরে তাকালো।হাসি আটকাতে পারলো না অরুণ।তার হাসির শব্দে শ্বেতা বেশ খানিকটা লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো।
------------ --------- --------------- ---
তপতী দুপুরের এঁটো বাসন পরিষ্কার করে তাড়াতাড়ি পুকুর থেকে তিন ডুব দিয়ে এলো।তপতী বিশ্বাস করে পুকুরে হয় তিন ডুব আর নাহয় সাত ডুব দিয়ে স্নান করতে হয়।এর কম বা বেশী হলে কি হয় তা অবশ্য তার জানা নেই।স্নান করে দ্রুত সে কাপড় পাল্টাতে গেলে টের পেলো কেউ হয়তো উঁকি মারছে।তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে পেছনের টিনের বেড়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো।হুট করেই সে একটা পেরেকের ছিদ্র দিয়ে চোখের মতো কিছু একটা দেখতে পেলো।এই চোখের পলক পড়ছে না কোনো।গা ঘিনঘিন করে উঠলো তার।এমন ঘরের চেয়ে রাস্তা আরো বেশী নিরাপদ।নিশ্চয়ই ঢাকা থেকে তার পিসতুতো ভাই বাড়িতে এসেছে।শুকনো কাপড় নিয়ে বাড়ির পেছনে চলে যায়। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয় তপতীর মনে।কোথায় যাবে সে.?
রান্নাঘরের কাজ শেষ করে ঘরে ঢুকতেই তপতী শুনতে পেলো,
"কেমন আছো বোইনা?"
তপতীর ছোট্ট দেহ যেন সংকুচিত জয়ে মাটির ভেতর প্রবেশ করতে চায়।পেছন ফিরে সুমনের দিকে তাকাতেই টের পেলো একজোড়া চোখ ক্রমশ ওর পুরো দেহে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো তপতী।সে ওই দৃষ্টি এখনো ভূলতে পারছে না। এর আগে তো আর কখনো এতটা খারাপ দৃষ্টিতে তাকায় নি সুমন।এইবারই কেন.? ধীরে ধীরে মাথা ভাঙা আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো তপতী।নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা জন্মাতে থাকে ওর মনে। বুকের ওড়না সামান্য সরে ছিলো এতক্ষণ এটা তার খেয়াল ছিলো না।এজন্যই এভাবে তাকিয়ে ছিলো সুমন।ওর মনে হলো বুকের এই মাংসপিণ্ডদ্বয়ই সমস্ত খারাপ দৃষ্টির কারণ। গত ছয় মাস আগেও এরা এমন সুগঠিত ছিলো না বলেই তখন হয়তো কেউ এত নোংরা দৃষ্টিতে তাকায় নি ওর দিকে।এরা যদি না থাকতো তাহলে এমন সব দৃষ্টি পেতে হতো না।চোখের জলে দুগাল ভিজে যায় তপতীর।
হঠাৎই জোরে হাওয়া বইতে শুরু করে।পিসিমার চেঁচামেচিতে না চাইতেও ক্লান্ত শরীর নিয়ে উঠতে হয় তপতীকে।মাথায় ওড়না টেনে দিয়ে দ্ররুত পায়ে মাঠের দিকে যায় শুকনো কাপড় আনতে।
তখনই হঠাৎ....
চলবে......... |
0 Comments