গল্প:, মেঘবরণ প্রেম (পর্ব:১৩)

 

লেখিকা - আসফিয়া রহমান 

পর্ব:১৩

  

------------------


"চলুন ম্যাডাম! আপনার বান্ধবী ওরফে প্রিয় ননদিনী 

এইমুহূর্তে তার হবু বরের সাথে বাইক রাইড করছেন। 

আপনিও কি আপনার হবু বরের সাথে কার রাইডে যেতে 

চান?"


অনিন্দিতা ভ্রু কুঁচকে তাকাল তৎক্ষণাৎ, 

“আমার এই হবু বরটা কে, শুনি?”


শুভ্র অবাক হওয়ার ভান করল, 

“এইযে, জলজ্যান্ত একটা 

হ্যান্ডসাম ছেলে আপনার চোখের সামনে খাম্বার মতোন 

খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে আপনার চোখে পড়ছে 

না, নন্দিতা? নাকি আপনি আগে থেকেই গোপনে কাউকে 

ঠিক করে রেখেছেন? সত্যি করে বলুন তো?” বলতে 

বলতে শুভ্রর চোখদুটো ছোট ছোট হয়ে গেল।


 
সব গুলো পর্বের লিঙ্ক



অনিন্দিতা গম্ভীর মুখে বলল, “আমার গোপন কথা 

আপনাকে বলব কেন?”



শুভ্র চোখদুটো এবার আগের চেয়েও দ্বিগুণ ছোট হয়ে 

এলো, “তাহলে আছে বুঝি?”


অনিন্দিতা বিরক্ত মুখে বলল, "বলব না!"


শুভ্র নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকে হাত চাপা দিল, “আহ্! 

বিশ্বাসঘাতকতা! আমি ভাবতাম আপনি শুধু আমার, 

অথচ আপনি—”



“এই, চুপ করবেন আপনি?” অনিন্দিতা গম্ভীর মুখে 


বলল, 


“রাস্তায় দাঁড়িয়ে কী নাটক শুরু করলেন!"




“চলুন, তাহলে গাড়ির ভেতরে গিয়েই কন্টিনিউ করি?”



মেয়েটা এবার রীতিমতো বিরক্ত হয়ে গেল। বিরক্তি ভরা

মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলে বলল, “আপনার গাড়িতে

যাব না আমি, আপনি যান।”



শুভ্র প্যাসেঞ্জার ডোরটা খুলতে খুলতে হালকা গলায়

বলল, “এভাবে জেদ করতে নেই, কিউটি পাই! ইউ আর

লুক লাইক আ রেড চেরি, হোয়েন ইউ গেটস অ্যাংরি..." 


তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অনিন্দিতার দিকে এগোতে

এগোতে বলল, "অ্যান্ড, মেইবি ইউ রিমেমবার মাই টাস্ক,

রাইট? আ কিস, রাইট হেয়ার...?"




অনিন্দিতা চোখ বড় বড় করে এক পা পিছিয়ে গেল। কি

ভয়ঙ্কর লোক রে বাবা! এক মুহূর্তের ভেতর প্রসঙ্গ বদলে

ফেলল?



"আ-আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছি না, শুভ্র!"



আরো এক পা পিছিয়ে যাবার আগেই শুভ্র হাত বাড়িয়ে

বড়ো অবলীলায় ধরে ফেলল মেয়েটার সুডৌল কোমর,

"ওহ্, রিয়েলি? দেন রিমেমবার, না? আমি বলে দেব

সবাইকে!"


অনিন্দিতা কেঁপে উঠল, তবু গলার স্বরে কৃত্রিম দৃঢ়তা

যথাসম্ভব ধরে রাখার চেষ্টা করতে করতে জিজ্ঞেস করল,

“কী বলবেন?” 



“যে আপনি আমার সঙ্গে চুড়ি কিনেছিলেন,” শুভ্র ওর

কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আর তখন

চুড়িওয়ালি আন্টি আপনাকে আমার বউ ভেবেছে, বলেছে

— আমার বউয়ের হাতে চুড়িগুলো খুউউব মানাবে…”



মানুষটার এতটা কাছে এসে অনিন্দিতার নিশ্বাস

এলোমেলো হয়ে গেল ভীষণভাবে। মেয়েটা দুহাতে ধাক্কা

দিল শক্তপোক্ত বুকটায়, তবে টলাতে পারল না একচুলও।





“আপনার হুমকি কাজ করবে না মিস্টার… আমি যাচ্ছি না

আপনার সাথে।”



"ওকে, অ্যাজ ইওর উইশ, মাই লেডি!"



শুভ্র মেয়েটার সরু কোমর থেকে নিজের হাতটা আলগা

করলো। তাতেই যেন হাফ ছাড়লো বোকা মেয়েটা। হাফ

ছেড়ে যেইনা একটুকরো স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবে, তার

আগেই নিজেকে শূন্যে অনুভব করলো সে। প্রচন্ড আতঙ্কে

চিৎকার দিয়ে তড়িৎ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মানুষটার

গলা।


মানুষটা ততক্ষণে তুলোর মতো হালকা শরীরটা নামিয়ে

দিয়েছে প্যাসেঞ্জার সিটে। তারপর ঠাস করে দরজাটা বন্ধ

করে এক মুহূর্তের ভেতর নিজেও ঘুরে এসে বসেছে

ড্রাইভিং সিটে। বসেই প্রথমে গাড়ির ডোর লক করে

দিয়েছে সে। পরপর এগিয়ে গেছে তার বোকাফুলের

কাছে।


শুভ্রর বোকাফুল তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে।

নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়েছে সে। একটু আগের ঘটে

যাওয়া ঘটনায় হৃদপিণ্ডটা এখনও লাফাচ্ছে তেজী ঘোড়ার

ন্যায়। সেটাকে সামাল দেবার আগেই আবারো কাছে

আসছে কেন মানুষটা? মেরে ফেলার ধান্দা নাকি?



শুভ্র নিজের শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে মেয়েটার

মাথার কাছ থেকে সিটবেল্টটা টেনে আনলো। টেনে

আনার আগে প্রিয়ার খোলা চুলে মুখ ডুবিয়ে মাতাল করা

গন্ধটা টেনে নিল বুক ভরে। তারপর খানিকটা সরে এসে

সিটবেল্টটা ওর বুকের ওপর দিয়ে টেনে এনে লক করে

দিল ভালোভাবে। 



অনিন্দিতা জমে গেল এহেন কার্যে। নিঃশ্বাস নিতেও যেন

ভুলে গেল মেয়েটা। শরীর গরম হয়ে উঠছে অজান্তেই।

কান দিয়ে দৃশ্যমান রূপে বেরোচ্ছে আগুনের হলকা। 



সিটবেল্ট লক করা শেষে শুভ্র মুখ তুলে মেয়েটার দিকে

তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “নাউ ইউ আর সেফ, মিস

অনিন্দিতা!"


সেফ? ঠাট্টা করছে নাকি এই ছেলে? এইভাবে হুটহাট

কাছে এসে ভয়ানক লজ্জায় ফেলে নাক-কান দিয়ে

সমানতালে ধোঁয়া ছুটিয়ে এখন বলছে সেফ? লজ্জার

সাথে সাথে এবার রাগ জেঁকে বসলো মেয়েটার মাথায়। 


একটানে সিটবেল্টটা খুলে ফেলে দরজায় হাত রাখল ও, l


"লক করেছেন কেন! খুলুন, নামব আমি..."



শুভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ি স্টার্ট দিল, যেন কিছু শুনতেই

পায়নি। অনিন্দিতা আহাম্মক বনে গেল সেদিকে চেয়ে!



"আরে, আরে! গাড়ি স্টার্ট দিলেন কেন? আমি নামব

বললাম তো..."



হঠাৎ করে চাকার নিচে একটা স্পিড ব্রেকার পড়তেই

গাড়িটা ঝাঁকুনি খেলো। একে তো সিটবেল্ট বাঁধা ছিল না,

তারওপর ছোটাছুটি করতে থাকা মেয়েটা আচমকা

ঝাঁকিটা সামলাতে না পেরে প্রায় হুমরি খেয়ে পড়ল

ড্যাশবোর্ডের উপর। শুভ্র এক হাতের স্টিয়ারিং সামলে

আরেক হাত বাড়িয়ে তৎক্ষণাৎ ধরে ফেলল মেয়েটার

হাতের কনুই। পরপর গাড়িটা নিয়ে সাইড করলো রাস্তার

একপাশে।



"কী সমস্যা, হ্যাঁ? সিটবেল্ট খুলেছেন কেন? আরেকটু

হলেই মাথায় বাড়ি খাচ্ছিলেন। চুপচাপ শান্ত হয়ে বসে

থাকা যাচ্ছে না? লাফালাফি করতেই হবে? নামতে

চাইছেন কেন? আমি কামড়েছি আপনাকে?"



ধমক খেয়ে রীতিমতো চুপসেই যাচ্ছিল অনিন্দিতা, তবে

লজ্জায় আইঢাই করে ফুঁসে উঠলো শেষ কথাটা শুনে,

"আপনি..."



"চুপ, একদম চুপ!" শুভ্র সহসাই এগিয়ে এসে গোলাপি

ঠোঁটজোড়ায় আঙুল চাপা দিল, "নো মোর আর্গুমেন্টস.."


অনিন্দিতা কেঁপে উঠে চোখজোড়া বন্ধ করে ফেলল

তড়িৎ। দুহাতে খামচে ধরলো কোলের ওপর থাকা

চামড়ার পার্সটা। মোলায়েম গোলাপি অধরযুগল ছুঁয়ে ছুঁয়ে

ধীরগতিতে নামল দুষ্টু তর্জনীটা। অনিন্দিতার শরীরে বিদ্যুৎ

খেলে গেল আবারও। কেঁপে উঠে পার্সটা ছেড়ে খামচে

ধরলো শুভ্রর নির্লজ্জ হাতটা। 



"ক্যান আই হ্যাভ আ কিস, রেড চেরি?"



অনিন্দিতা ফট করে চোখ মেলে চাইল। একজোড়া

নেশাক্ত দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই ভয়াবহ চমকে উঠলো

মেয়েটা।




"উইল ইউ গিভ মি ইওর প্রিশিয়াস পারমিশন, কিউটি

পাই?"



"শু-শুভ্র, এখন এ-সব..."



শুভ্র মেয়েটার কথা থামিয়ে দিল মাঝপথে। মেয়েটার

মনোভাব বুঝেছে ও। তাইতো দু সেকেন্ডের জন্য নরম

গোলাপি অধরজোড়ায় নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে সরে এলো

সাথে সাথেই। পরপর প্রিয়ার কপালে পড়ে থাকা চুলক'টা

কানের পেছনে ঠেলে দিয়ে সেথায় আদুরে ভঙ্গিতে ঠোঁট

ছুঁইয়ে শান্ত করল নিজের উথলে আসা অনুভুতিটুকু। 



"আই উইল ইগারলি ওয়েট ফর ইওর প্রিশিয়াস

পারমিশন, মাই কিউটি পাই!"


অনিন্দিতার মাথা হেঁট নিদারুণ লজ্জায়। এতবড় গাড়িতে

নিজের ছোট্ট শরীরটা লুকোনোর জায়গা পেল না

মেয়েটা! অথচ একটু আগে ভয়াবহ রকমের কান্ড ঘটানো

পুরুষটা নির্বিকার। প্রসন্ন চিত্তে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছেন তিনি।

লজ্জাবতী মেয়েটাকে আরেক দফা লজ্জা ফেলতেই বোধ

হয় সে আবার বলে উঠলো, এভাবে তাকিয়ে কী দেখছেন,

মেঘফুল? ছোটখাটো চুমুতে মন ভরেনি? বিশাল চুমু

চাই?"



অনিন্দিতা তড়িৎ চোখ সরিয়ে নিল নির্লজ্জ পুরুষটার

ওপর থেকে। কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো লজ্জায়।

ঠোঁট নাড়িয়ে কোনোরকমে বলল, "চুপ থাকুন, অসভ্য

লোক!"


২৪.

"এই এই, তুই না ওই ছেলের সাথে দেখা করতেই যেতে


চাইছিলি না? জোর করে আমি ধরে-বেঁধে নিয়ে গেলাম,

আর দেখা করার সাথে সাথে অমনি আমাকেই ভুলে

গেলি? তোর ওই খাটাশ ভাইয়ের সাথে আমাকে একা

ফেলে ঢ্যাং ঢ্যাং করে দিব্যি ওই ছেলের বাইকে চড়ে বাসায়

চলে গেলি? এই তোর বন্ধুত্ব?"



ফোনের ওপারে ইরা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে

ফোনটা কানের সাথে লাগিয়ে সন্দিহান কন্ঠে বলল,


তার আগে বলো দেখি, আমাকে রেস্টুরেন্টে ফেলে আমার


খাটাশ ভাইয়ের সাথে তুমি কোথায় বেরিয়েছিলে, চান্দু?

আমি তো বেরিয়ে তোমাকে খুঁজেছিলাম, তুমি তো ছিলে

না সেখানে?



নিজের কথার জালে নিজেই ফেঁসে গেল অনিন্দিতা।

ইরার কথায় চুপ করে গেল মুহূর্তখানেক। আমতা আমতা

করে কী বলবে ভেবে পেলো না। তারপর গলা নিচু করে

বলল, "আমি... আমি তোর খাটাশ ভাইয়ের সাথে

বেরোবো কেন, আশ্চর্য! বোরিং লাগছিল বিধায় বাইরে

হাঁটতে বেরিয়েছিলাম..."



"উমম... হাঁটতে বেরিয়েছিলে, না? বাহ্, ভালো ভালো...

তা, একাই গেছিলে তো, না?"



"হ-হ্যাঁ! একাই তো, সাথে আবার কে যাবে!"



“হুমম…”


ইরার গলায় সন্দেহের সুরটা আরও ঘনীভূত হলো, “তাই

তো বলি, ভাইয়ার সাথে যখন কথা বলছিলাম তখন

পাশের চেনা কন্ঠটা কার ছিল..." 



অনিন্দিতা থমকে গেল। ধরা পড়ে গেল কি না এই ভেবে

অস্বস্তিতে চিৎকার করে উঠল এবার, “ইরা! রাত দশটা

বাজে, এইসব আজগুবি কথাবার্তা রাখবি তুই?"



“আজগুবি কথাবার্তা, না?” ইরার মৃদু হাসি শোনা গেল

ওপাশে।

অনিন্দিতা তড়িঘড়ি করে বলল, "ঘুমা গিয়ে, ফোন রাখছি

আমি।”


“ঘুমাবো, কিন্তু শোন—”


“কিছু শুনতে চাই না।”


“ঠিক আছে, তবে লাস্ট একটা কথা বলি?”


“কী?”


“তুই যে হাঁটতে বেরিয়েছিলি... তখন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে

কেউ কী তোকে চুড়ি পরিয়ে দিয়েছিল?”


অনিন্দিতা চমকে উঠে ফোনটা কানে চেপে ধরল শক্ত

করে। ওপাশ থেকে ইরার দুষ্টু হাসি ভেসে এলো, “গুড

নাইট, মিস অনিন্দিতা।”


To be continued...

 

 

 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×