![]() |
লেখিকা - আসফিয়া রহমানপর্ব:১৪----------------------২৫.ইরাকে দেখতে পাত্রপক্ষ এসেছে আজ। অভিকের মা, বাবা, বড় বোন, দুলাভাই, সাথে অভিকের একটা কাজিনও এসেছে। সবাই বসে আছে ড্রয়িং রুমে। ইরার বাবা ইকরাম হোসেন, খালু আজিজ রায়হান ওরফে শুভ্রর বাবা, আরেক পাশে শুভ্র। তখনই অনিন্দিতা আর প্রীতিকে সাথে নিয়ে ইরা এলো সেখানে। শুভ্রর চোখদুটো তৎক্ষণাৎ নিজ দায়িত্বে চলে গেল তার মেঘফুলের দিকে। আর তার সাথে সাথেই ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল ওর। মেঘফুল এতো সেজেছে কেন আজ? ওকে তো দেখতে আসেনি এরা! এসেছে ইরাকে দেখতে। তবে? তবে, মেঘফুলকে সুন্দর দেখাচ্ছে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার মাঝেই হঠাৎ করে শুভ্রর চোখ গেল উল্টোদিকের সোফায় বসে থাকা অভিকের কাজিনের দিকে। ছেলেটা আড়চোখে তাকিয়ে আছে ওর মেঘফুলের দিকে। সাথে সাথেই মাথায় ধপ করে আগুন জ্বলে উঠলো ওর। চোখ ঘুরিয়ে অনিন্দিতার দিকে তাকালো ও। মেয়েটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে ইরার বসা সোফাটার পাশে। অভিকের মা তখন হেসে বলছেন, “ইরা, মা, তোমাকে তো ছবির চেয়েও মিষ্টি লাগছে।” ইরা লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল, শুভ্রর চোখদুটো আলগোছে ছুঁয়ে গেল অনিন্দিতার মুখ। ওর গলায় ঝুলতে থাকা নীলচে শিফন ওড়নাটা কাঁধ থেকে পিছলে এসে পড়েছে পাশে দাঁড়ানো প্রীতির দিকে। চুলগুলো নেমে এসেছে কোমর ছুঁয়ে। শুভ্র সেদিকে চেয়ে অস্থির বোধ করল, মেয়েটা যাচ্ছে না কেন এখান থেকে? অভিকের মা ইরাকে টুকটাক প্রশ্ন করছেন। কিন্তু শুভ্রর কানে পৌঁছাচ্ছে না সেসব শব্দ। ওর দৃষ্টি ঘুরেফিরে বারবার চলে যাচ্ছে অনিন্দিতার দিকে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ, মাঝে মাঝে প্রীতির ফিসফাস কথায় ঠোঁটে ফুটছে মৃদু হাসি, সেই হাসিটুকুই শুভ্রর বুকে দুর্বার ঢেউ তুলতে যথেষ্ট। "এই অনু, শুভ্র ভাই তোর দিকে অমন করে কী দেখছে?" অনিন্দিতা চমকে তাকালো শুভ্রর দিকে। শুভ্র তাকিয়ে নেই, তবে ঠিক সেই মুহূর্তেই যে সে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে তা বোঝা গেল বেশ। অনিন্দিতা অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে বললো, "কই না তো!" "এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল, তুই তাকাতেই চোখ ফিরিয়েছে.." প্রীতির কথা শুনে নিচু গলার আচমকাই কেশে উঠলো অনিন্দিতা। ইরাকে ভেতরে যেতে বলা হলো তখন। উঠে দাঁড়ালো ও। দুই বান্ধবীর মুখে চেয়ে ইশারায় জানতে চাইলো কী হয়েছে! প্রীতি মাথা নাড়ল হালকা করে। তারপর ওকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল দুজনেই। ২৬. "আলহামদুলিল্লাহ, ভাই! আপনার মেয়েটাকে ভারী পছন্দ হয়েছে আমাদের। আপনাদের কী ছেলে পছন্দ হয়েছে?" "আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ! আপনাদের ছেলেও তো মাশাআল্লাহ! পছন্দ না হয়ে উপায় আছে!" দুই পরিবারের মুখে তখন আনন্দের হাসি, ঘরজুড়ে উচ্ছ্বাসের আবেশ। বিয়ের দিন নির্ধারণ হলো আগামী শুক্রবার। শুভ কাজে দেরি করে কাজ নেই। ইকরাম সাহেব স্ত্রীকে ইশারা করলেন মিষ্টি আনতে। সুস্মিতা বেগম মিষ্টি নিয়ে এলেন। মিষ্টি নিতে নিতে অভিকের মা কথার ফাঁকে বললেন, "ইরা মামণির পাশে একটা মেয়ে দাঁড়িয়েছিল না, আপা? নীল ওড়না, চুল লম্বা... ওটা কে? ইরার বান্ধবী নাকি?" শুভ সতর্ক চোখে তাকালো খালামনির দিকে। সুস্মিতা বেগম হেসে উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ, ইরার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী।" অভীকের মা একবার তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরালেন সুস্মিতা বেগমের দিকে। "ওহ্ তাই! খুব ভদ্র মনে হলো।" অভিকের মা হেসে বললেন, "আসলে আমার দেবরের ছেলেটার জন্যও মেয়ে খুঁজছি। আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে, আমরা ওর মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাই।" ইকরাম সাহেব ও সুস্মিতা বেগম অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালেন। তারপর হেসে বললেন, "না, না, আমাদের আপত্তি থাকবে কেন? আপনারা..." শুভ্র ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে এতক্ষণের কথোপকথন শুনছিল। এ পর্যায়ে এসে কথার মাঝখানেই আচমকাই উঠে দাঁড়ালো। তারপর দশ জোড়া অবাক চোখকে পেছনে ফেলে হনহন করে বেরিয়ে গেল ড্রইং রুম থেকে। ২৭. "আ... শুভ্র, ক-কী হয়েছে আপনার! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? ব-বাড়ি ভর্তি লোকজন। কেউ দেখে ফেললে..." অনিন্দিতাকে দরজার সাথে চেপে ধরে ঠাস করে দরজাটা লাগিয়ে দিল শুভ্র। অনিন্দিতার কথা থেমে গেল তখনই। বড় বড় চোখে তাকালো মেয়েটা। "শু-শুভ্র! দ-দরজা বন্ধ ক-করলেন..." শুভ্রর লাল হয়ে আসা চোখের পানে তাকিয়ে থেমে গেল অনিন্দিতা। অবাক হয়ে তাকালো মানুষটার দিকে, "কী হয়েছে আপনার? এভাবে..." কথাটুকু সম্পূর্ণ করতে দিল না শুভ্র। একটা হাত মেয়েটার সরু কোমরের বাঁকে গলিয়ে, আরেকটা হাত মাথার পেছনে রেখে আচমকাই ঝুঁকে এসে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো গোলাপের পাপড়ির ন্যায় তুলতুলে অধরজোড়ায়। বিস্ময়ে হতবাক অনিন্দিতা নিঃশ্বাস নিতে পর্যন্ত ভুলে গেল। মাথাটা হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ খালি হয়ে গেল ওর। আচমকা শুভ্র কামড় বসালো তুলতুলে অধরজোড়ার . নিম্নাংশে। অনিন্দিতা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে শুভ্রর চুলগুলো খামচে ধরলো। শুভ্র আরো খেই হারিয়ে বসলো এতে। মেয়েটাকে নিজের সাথে একদম ঠেসে ধরে পাগলের মতো নিজের দখলদারিত্ব জাহির করতে ব্যস্ত হলো পাতলা অধরজোড়ার ওপর। অনিন্দিতার শ্বাস ফুরিয়ে আসবার উপক্রম প্রায়। শুভ্রর চুলগুলো সর্বশক্তি দিয়ে খামচে ধরলো চাইল মেয়েটা, তবে শরীরটা অবশ হয়ে আসছে ক্রমশই। হাত দুটো শুভ্রর চুলের ভাঁজ থেকে আস্তে করে খসে পড়ল প্রসস্থ কাঁধের ওপর। শুভ্রর হুঁশ ফিরল তাতেই। ঠোঁটজোড়া ছেড়ে দিয়ে আলগা করলো হাতের বাঁধন। অনিন্দিতার অবস্থা নাজেহাল ততক্ষণে। চোখদুটো বন্ধ রেখে হাঁপানি রোগীর মতো টেনে টেনে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে মেয়েটা। শুভ্র খানিকটা সরে দাঁড়ালো। এতক্ষণ পর মাথা ঠান্ডা হতেই বুঝে আসল কী করেছে ও। একটুখানি এগিয়ে এসে হাঁপাতে থাকা মেয়েটার গালে হাত রাখল আলতো করে। "নন্দিতা...?" অনিন্দিতা চোখ মেলে তাকালো। গভীর চোখদুটোয় চোখ পড়তেই তীব্র লজ্জায় ছেয়ে গেল নাজুক বদন। "এতো সেজেছো কেন?" "ক-কোথায় সেজেছি? সাজি নি তো! চ-চোখে কাজল দিয়েছি শুধু..." শুভ্র ভালো করে লক্ষ্য করলে এবার। আসলেই তো সাজে নি মেয়েটা! শুধুমাত্র পুরু করে চোখে কাজল টেনেছে দীঘল কালো নয়নজোড়ায়। তাতেই এতো অপ্সরা লাগছে? শুভ্র মুগ্ধ চোখে হারিয়ে গেল কাজল কালো নয়নজোড়ার গভীরে। হাঁসফাঁস করে উঠলো অনিন্দিতা। "শুভ্র?" "তোমাকে দেখতে আজ অন্যরকম লাগছে মেঘফুল..." অনিন্দিতা লজ্জা পেয়ে চোখ নামালো। আমতা আমতা করে বলল, "ওরা আমাকে খুঁজবে শুভ্র। দরজাটা খুলুন প্লিজ, চলুন এখান থেকে..." শুভ্রর যেন সম্বিত ফিরল এতক্ষণে। "তুমি অতক্ষণ ধরে ও ঘরে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন তখন?" অনিন্দিতা অবাক হয়ে তাকালো, "মানে? ইরাকে রেখে চলে আসতাম কী করে!" "আমি অতশত জানি না, শুধু জানি অন্য কেউ তোমার দিকে চোখ তুলে তাকালে তার পরিণাম ভালো হবে না, নন্দিতা।" শুভ্রর চোখদুটো আবারও লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। সেদিকে তাকিয়ে অনিন্দিতা অবুঝের ন্যায় শুধাল, "কে তাকিয়েছে আমার দিকে? ওখানে তো শুধু বড়রাই ছিল!" "আরো কেউ ছিল অনিন্দিতা। ওদের সাথে অভিকের একটা কাজিন এসেছে। ওরা বলছিল..." এতোটুকু বলতেই থেমে গেল শুভ্র। অনিন্দিতা কৌতূহলী চোখে তাকালো, "কী বলছিল?" সাথে সাথেই রক্তিম আঁখিদ্বয়ের তীব্র দৃষ্টিতে বিদ্ধ হলো বোকা মেয়েটা, তারপর থমকে গেল সেখানেই। তার এক সেকেন্ডের মাথায় হঠাৎ করে ঘটনার যোগসূত্র পরিষ্কার হলো ওর কাছে। তৎক্ষণাৎ চোখদুটো হয়ে উঠল মার্বেল আকৃতির, ঠোঁটজোড়া ফাঁক হয়ে গেল নিজ দায়িত্বে। "তাই জন্য আপনি অমন করে আমায় টেনে আনলেন এখানে? অমন করে ঠোঁটে..." মার্বেল আকৃতির চোখদুটো নিয়ে অনিন্দিতার হাত আপনাআপনি চলে গেল নিজের ঠোঁটের ওপর। সেদিকে চেয়ে শুভ্র গম্ভীর স্বরে আওড়ালো, "আমার কিছুতে . কারোর বিন্দুমাত্র অধিকার নেই, অনিন্দিতা। যেটা আমার, সেটা শুধুই আমার। সেখানে কারোর এক তিল পরিমাণ আগ্রহও সহ্য করব না আমি।" অনিন্দিতা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল মানুষটার দিকে। বুকের ভেতরটা কেমন থেকে থেকে কেঁপে উঠছে, অথচ মুখে কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না ও। শুভ্রর দৃষ্টি তখনও মেয়েটার ওপর স্থির। অচঞ্চল, তীব্র সে দৃষ্টি। যেন মেয়েটার চোখের ভেতর দিয়েই পড়ে ফেলতে চাইছে মনের অব্যক্ত কথাগুলো। . "শুভ্র..." অনিন্দিতার গলা কাঁপল, "সবাই খুঁজবে আমাদের..." শুভ্র ছোট্ট করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল, "লেটস গো..." নব ঘুরিয়ে দরজাটা খুলতেই দৃশ্যমান হলো চোয়াল ঝুলে পড়া দুটি মুখাবয়ব। বিস্ফোরিত দুজোড়া চোখ বেরিয়ে আসবার উপক্রম প্রায়। এমনভাবে স্থির হয়ে দুজন দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে, যেন কোনো ভয়ংকর অপরাধের সাক্ষী হয়ে গেছে তারা। অনিন্দিতা প্রায় ছুটে বেরিয়ে এল শুভ্রর পাশ থেকে। রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার ন্যায় চেহারা নিয়ে কিছু খুঁজে পেল না বলবার মতো। প্রায় জমে যাওয়া ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে কোনোরকমে আওড়ালো, "ই-ইরা... প-প্রীতি... তোরা এখানে কী—" প্রীতির চোখ এখনো বিস্ফোরিত। ব্যাপারটা এখনো হজম করতে পারেনি ও! সেভাবেই চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, “তুমিই বরং বল, তোমরা এখানে কী করছিলে?” ইরার মুখে এখনো কথা ফোটেনি। ও একবার তাকাচ্ছে অনিন্দিতার দিকে, আরেকবার শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বোকার মতো চোখ পিটপিট করছে। শুভ্র নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি। কলারটা ঠিক করতে করতে ও গম্ভীর মুখে বলল, “দরজাটা আটকে গিয়েছিল। সেটাই খুলছিলাম।” প্রীতি দুই ভ্রু উঁচু করে তাকাল, “হুঁ, তাই?" অনিন্দিতা ততক্ষণে মাথা নামিয়ে ফেলেছে, চুপচাপ ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু থেমে গেল ইরার ফিসফিসানি কণ্ঠস্বরে, “অনু... ঠোঁটে কী হয়েছে তোর?” মুহূর্তেই থমকে গেল অনিন্দিতার পা জোড়া। কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো লজ্জায়। হাতটা অজান্তেই উঠে এলো ঠোঁটের কাছে। আমতা আমতা করতে করতে কোনোরকমে বলল, "কী করে যেন একটা মৌমাছি ঢুকেছিল তোর ঘরে, ওটাই কামড়েছে..." বলতে বলতে আড়চোখে একবার চাইল শুভ্রর দিকে। সে তখন গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে এদিকেই। অনিন্দিতা তড়িৎ গতিতে চোখ সরিয়ে নিল। তাড়াহুড়ো গলায় বলল, "আম্মু তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছে, ইরা। আমি... আমি আসছি!" অনিন্দিতা পালিয়ে গেল একরকম। ও চলে যেতেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দুটো ধা করে ঘুরে এসে পড়ল শুভ্রর পানে। শুভ্র অবশ্য তোয়াক্কা করলো না সেসব। ভুরু উঁচিয়ে ভীষণ নির্লিপ্ত কন্ঠে শুধালো, "কী হয়েছে তোমাদের? কিছু বলবে?" "ভাইয়া, তুমি আর অনিন্দিতা কী—" "তোর বান্ধবী মৌমাছির কামড় খেয়ে চিৎকার করছিল, সেটা দেখতেই তো এসেছিলাম... তারপর বের হবার সময় দেখি দরজাটা কীভাবে যেন লক হয়ে গেছে! তারপর কত কারসাজি করে খুলতে হলো সেটা! খালুকে ভালো একটা মিস্ত্রী ডাকতে বলিস। এরকম হুটহাট লক হয়ে গেলে তো সমস্যা! অযথা এমন এমব্যারেসিং সিচুয়েশনে পড়তে হয়..." বলেই শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে গটগট করে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সেখান থেকে প্রস্থান ঘটালো সে। পেছনে ফেলে গেল শান্তশিষ্ট ভদ্র ছেলেটার মিথ্যে বলার অপূর্ব গুণ দেখে ভীষণভাবে বিষম খাওয়া দুই মানবীকে। To be continued... |

0 Comments