পর্ব - ০৬
লেখা - আসফিয়া রহমান
১২. সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল অনিন্দিতা। ঘাড়ে
ঝোলানো ব্যাগের ফিতাটা কাঁধ থেকে নেমে এসেছে খানিকটা,
ঘর্মাক্ত মুখে বিদ্যমান সারাদিনের ক্লান্তির ছাপ। বাসার দরজায়
পৌঁছে ডোরবেল চাপার আগেই ও দেখল, ওদের বাড়িওয়ালা
মজিবর সাহেব ওপর থেকে নামছেন। ভদ্রলোকের বয়স
পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই, মুখের চিরচেনা গম্ভীর ভাবটা যেন আজ একটু
বেশিই গাঢ় মনে হলো।
অনিন্দিতা ভদ্রভাবে সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।”
মজিবর সাহেব থেমে গেলেন, সালামের উত্তর দিয়ে একটু
ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন, “তোমাদের বাসাতেই আসছিলাম,
একটু কথা ছিল..."
অনিন্দিতা অবাক হয়ে তাকাল, “জী, বলুন না, কিছু হয়েছে
কি?”
ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “আসলে ব্যাপারটা
একটু অপ্রত্যাশিত… আমার এক আত্মীয়— ছোট ভাইয়ের
ছেলে ঢাকায় নতুন চাকরি পেয়েছে। ওদের ইমিডিয়েট থাকার
জায়গার খুব দরকার। তো, এই ফ্ল্যাটটা ওদের দিতে চাইছি।
তাই ভাবলাম আগে থেকেই তোমাদের জানিয়ে দিই, যেন
তোমরা প্রস্তুতি নিতে পারো।”
ভদ্রলোক কথাটা যতটা সম্ভব নরমভাবে বললেও,
অনিন্দিতার মুখের রং বদলে গেল তৎক্ষণাৎ। ও হকচকিয়ে
গেল মুহূর্তের জন্য, “মানে... আমাদের এখন বাসাটা ছেড়ে
দিতে হবে?”
“দেখো মা, আমি জানি এটা হঠাৎ করে বলা হচ্ছে। কিন্তু কী
করব বলো! ছেলেটা পরিবার নিয়ে আসছে, একটা থাকার
জায়গা না পেলে খুব বিপাকে পড়বে। তাই আর উপায় দেখছি
না।” মজিবর সাহেব একটু বিব্রত মুখে বললেন, “তবে এ
মাসের তো আরো প্রায় পনেরো দিনের মতো বাকি আছে।
আশা করি এর মধ্যেই নতুন বাসা পেয়ে যাবে..."
একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো মুহূর্তেই। সিঁড়ির ফাঁক দিয়ে
দুপুরের রোদ পড়েছে দেয়ালে, তাতে ধুলো নাচছে বাতাসে।
অনিন্দিতার বুকের ভেতর যেন একটা ভারী পাথর নেমে
এলো। নিঃশব্দে মাথা নাড়ল ও,
“ঠিক আছে, আঙ্কেল, আমরা চেষ্টা করব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব
কিছু একটা ব্যবস্থা করতে।”
ভদ্রলোক মাথা নেড়ে প্রস্থান ঘটালেন। মজিবর সাহেব নিচে
চলে গেলে কিছুক্ষণ অনিন্দিতা সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে রইল।
অনেকগুলো বছর ধরে এই ফ্ল্যাটটাই তো ওদের ঘর, আশ্রয়,
প্রতিদিনের ছোটখাটো অভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একরাশ
স্মৃতি। বাবার স্মৃতিগুলোও লেগে আছে এই বাসার প্রতিটা
দেয়ালে। এখন হঠাৎ করে সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়া—
ব্যপারটা ভাবতেই গলাটা শুকিয়ে গেল ওর। এখন কোথায়
যাবে ওরা? এত অল্প সময়ে কোথায় নতুন বাসা খুঁজে পাওয়া
সম্ভব?
-----------
হাত উঠিয়ে ডোরবেলটা চেপে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দরজা
খোলার অপেক্ষা করলো অনিন্দিতা। দরজার ওপাশ থেকে
পায়ের মৃদু শব্দ হলো, তারপর দরজা খুলে গেল। রাবেয়া
বেগমের হাতে খুন্তি, মুখমন্ডল ঘেমে একাকার। অনিন্দিতা
মায়ের দিকে তাকিয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, "তোমার
রান্না এত দেরিতে কেন? মিনু খালা আসেনি আজ?"
রাবেয়া বেগম শাড়ির আঁচলে গলার ঘাম মুছতে মুছতে
বললেন, "আর বলিস না, স্কুল থেকে ফিরে আমি বারোটা
পর্যন্ত বসে আছি মিনুর জন্য, সাড়ে বারোটায় ফোন করে
বলছে আজকে নাকি আসতে পারবে না। কেমন লাগে বল!"
অনিন্দিতা ডাইনিং এর ওপর ব্যাগটা রেখে মায়ের পিছে পিছে
রান্নাঘরে গেল। একটা চুলায় ভাতের পাতিল পাশের চুলায়
ডাল ফুটতে ফুটতে উপচে পড়ল খানিকটা। রাবেয়া বেগম
তড়িঘড়ি করে চুলার আঁচ কমিয়ে দিলেন।
“স্কুলে এক দফা ঝক্কি সামলে এসে এখন আবার তুমি একা
একা এসব সামলাচ্ছো?”
রাবেয়া বেগম মেয়ের দিকে তাকালেন, "এছাড়া আর কী
করবো?"
অনিন্দিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, "আম্মু?"
"বল..."
"আসার সময় মজিবর আঙ্কেলের সাথে দেখা হলো।
তোমার সাথে কথা বলতেই আসছিলেন।"
"কী বিষয়ে?"
অনিন্দিতা ইতস্তত করে বলল, "সামনের মাসে বাসাটা ছেড়ে
দিতে হবে। ওনার কোন আত্মীয় নাকি আসবেন, তার জন্য..."
রাবেয়া বেগমের হাতের খুন্তিটা থমকে গেল মাঝপথে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন কথাটার মানে
ঠিকঠাক বুঝে নিতে চাইছেন। তারপর ধীরে ধীরে খুন্তিটা
নামিয়ে রেখে ঘুরে তাকালেন অনিন্দিতার দিকে।
"সামনের মাসে মানে? এই নভেম্বরে?" তারপর একটু থেমে
কিছু একটা চিন্তা করে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন, "কয় তারিখ
আজকে? সতেরো না?"
অনিন্দিতা মাথা নাড়ল নিঃশব্দে, “হুঁ, সতেরো।”
রাবেয়া বেগম এক নিঃশ্বাসে বললেন, “তাহলে হাতে তো মোটে
তেরো দিন!” তাঁর গলায় উৎকণ্ঠা ধরা পড়ল স্পষ্ট, “তেরো
দিনের মধ্যে বাসা খোঁজা, দেখা, কথা বলা, অ্যাডভান্স দেওয়া
— সবকিছু কেমন করে হবে বল তো?”
চুলার পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন রাবেয়া, চোখে
একরাশ ক্লান্তি। ভ্রু কুঁচকে নিচু স্বরে যেন নিজের সঙ্গেই কথা
বললেন, “একটা মানুষও তো চেনা নেই এই এলাকায়। তুই
ভার্সিটিতে থাকিস সারাদিন, আমি একা কোথায় যাব বাসা
খুঁজতে?”
অনিন্দিতা এগিয়ে গিয়ে মায়ের কাঁধে হাত রাখলো। কোমল
স্বরে বলল, “এত চিন্তা কোরো না, আম্মু। আমরা বিকেল করে
বের হবো প্রতিদিন। দেখো, একটা না একটা ব্যবস্থা হয়েই
যাবে ইনশাআল্লাহ।"
“এই বয়সে আবার নতুন বাসা খোঁজা, প্যাকিং, ওঠা-নামা—
ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে!” রাবেয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস
ফেললেন, “সেই কবে এসেছি এই বাসায়... তোর বাবা বেঁচে
ছিল তখন। এই ফ্ল্যাটের প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা কোণে
মানুষটার স্মৃতি। এখন হঠাৎ করে সব ছেড়েছুড়ে যেতে
হবে…”
কথাটা শেষ করতে না করতেই চোখের কোণে জল চিকচিক
করে উঠল রাবেয়ার। অনিন্দিতা ধীরে ধীরে মায়ের কাঁধে
মাথাটা এলিয়ে দিল, “আম্মু, তুমি ভেঙে পড়ছো কেন? আমি,
অর্ক- আমরা আছি না?”
রাবেয়া হাত উঁচিয়ে চোখের কোনায় জমে ওঠা বাষ্পটুকু মুছে
ম্লান হাসলেন, “তোমরা দুজন আছো বলেই তো এতদিন টিকে
আছি রে মা।”
১৩.-----------------------
পরদিন দুপুরের তীক্ষ্ণ সূর্যরশ্মি যখন ম্লান হয়ে ঢলে পড়েছে
পশ্চিমে, নরম সোনালি রোদ জানালার গরাদ বেয়ে লম্বা ছায়া
ফেলছে ঘরের মেঝেতে। অনিন্দিতা রেডি হয়ে তাড়া দিল
মাকে, “আম্মু, তাড়াতাড়ি চলো, বিকেল ছোট, দেখতে না
দেখতেই অন্ধকার নেমে যায়।"
রাবেয়া বেগম ওড়নাটা মাথায় জড়িয়ে নিলেন ধীর ভঙ্গিতে,
“চলো। অর্কর কাছে চাবি আছে তো?"
"হ্যাঁ, নিয়ে যেতে বলেছিলাম তো..."
অর্কর কোচিং থাকায় অনিন্দিতাদের সাথে যেতে পারছে না
ও। তাই মা-মেয়ে দুজন বেরোলেন হাঁটতে হাঁটতে। এলোমেলো
গলির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়লো পাঁচ তলা
একটা বিল্ডিং এর গেটে টু-লেট টাঙানো। ভেতরে গিয়ে বাসাটা
ঘুরে দেখে পছন্দ হলো রাবেয়া বেগমের। কিন্তু বাড়িওয়ালার
সাথে কথা বলে জানা গেল বাসাটা ফাঁকা হতে মাঝে আরো
একমাস বাকি।
হতাশ হয়ে বেরিয়ে এলেন দুজনে। আরো দুটো গলি পার করে
আরেকটা বিল্ডিং এর সন্ধান পেল ওরা যেখানে একটা ফ্ল্যাট
খালি আছে। গেটের ভেতরে ঢুকতেই দারোয়ান জানালো
বিল্ডিংয়ে লিফট নেই। চারতলা উঠতে হবে সিঁড়ি বেয়ে।
রাবেয়া বেগমের হাটুতে ব্যথা। সিঁড়ি ওঠার কথা শুনে বাসা না
দেখেই বেরিয়ে এলেন।
আরেকটা বাসা খুঁজে পাওয়া গেল, সেটা একটু দূরে —
আধুনিক বহুতল বিল্ডিং, কিন্তু ভাড়া আবার বাজেটের বাইরে।
বাসা দেখে মোটামুটি পছন্দ হলেও ভাড়া শুনে চুপচাপ বেরিয়ে
এল ওরা।
“মানুষের সাধ্যেরও একটা সীমা থাকে, বাপ রে বাপ!" একটু
থেমে রাবেয়া আবার বললেন, "মাগরিবের আজান পড়ে
গেছে। আজ আর হবে না, বাসায় যাই চল..."
১৪.-----------------------
পরের দিন শুক্রবার। সকালের হালকা রোদে শহরের মেজাজ
যেন আজ একটু শান্ত, একটু অলস। রাস্তায় সাধারণ দিনের
মতো তীব্র যানজট নেই— কোথাও কোথাও দোকানপাটের
শাটার তখনও নামানো। ছুটির দিন হওয়ায় অনিন্দিতা, অর্ক,
রাবেয়া বেগম সবাই আজ বাসায়। সকালে নাস্তা সেরে
তিনজন বেরোলেন বাসার খোঁজে।
আধঘণ্টা রিকশায় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়ল তিনজনই। একটার
পর একটা গলি ঘুরেও মনমতো কিছু মিলল না। কোথাও
ভাড়া বেশি, কোথাও রুম ছোট, কোথাও আবার আলো-
বাতাসের ঠিক নেই। রাবেয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“এই ঢাকা শহরে মনমতো একটা বাসা খুঁজে পাওয়া এখন
যেন ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে গেছে!”
রিকশাওয়ালা নিরবেই যাচ্ছিল, হঠাৎ অর্ক সামনের দিকে
তাকিয়ে বলল, “আম্মু ওখানে দেখো, ওই লাল ইটের বাড়িটা
— গেটের পাশে টু-লেট টাঙানো।”
রিকশা থামল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা অন্যগুলোর
মতো সাধারণ নয়। লালচে ইটের গায়ে পুরনো দিনের স্নিগ্ধ
একটা ছোঁয়া, ব্যালকনির কার্নিশে কয়েকটা মানিপ্ল্যান্ট
ঝুলছে, কালো রঙের গেটটার ফাকে দেখা যাচ্ছে বাড়ির
সামনে ছোট্ট বাগান।
গেটের পাশে ঝকঝকে সাদা ফলকে লেখা— “শুভ্রনীড়”।
নামটা দেখে অনিন্দিতার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“শুভ্রনীড়?” বিষ্ময়ের সাথে নামটা উচ্চারণ করল ও।
অর্ক চোখ ছোট করে তাকিয়ে বলল, “লাল ইটের বাড়ির নাম
'শুভ্রনীড়' হয় কি করে আপু?"
"আমিও সেটাই বোঝার চেষ্টা করছি..."
অর্ক আবার বলল, "শুভ্র মানে তো সাদা, অথচ বাড়ির রং
লাল! উম... ঘাপলা আছে মনে হচ্ছে!"
অনিন্দিতা অর্কর মাথা চাটি মারল, "এর মধ্যে আবার কি
ঘাপলা পেলি তুই?"
অর্ক চোখ কুঁচকে ফেলল, "আহ্! সমস্যা কি তোমার? ব্যথা
পাই তো, নাকি!"
“চুপ থাক! বেশি কথা বললে আম্মুকে বলে দেব তুই কাল
রাতে চুপিচুপি ফ্রিজ থেকে কেক খেয়েছিলি।”
অর্ক চোখ বড় বড় করে তাকালো, “এই! আমাকে মেরে তুমি
আমাকেই থ্রেট দিচ্ছো?"
রাবেয়া বেগম তখন গেটের কাছে গিয়ে দারোয়ানের সাথে
কথা বলছিলেন। দারোয়ান জানাল, বাড়িওয়ালা ভেতরেই
আছেন— চাইলে এখনই ফ্ল্যাটটা দেখা যাবে।
"চলো..."
রাবেয়া বেগমের ডাকে বাধা পরল ওদের খুনসুটিতে। অর্ক
গম্ভীর মুখে আগে আগে ভেতরে ঢুকে গেল। পেছনে পেছনে
অনিন্দিতা মায়ের সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে।
দোতলায় উঠে নির্দিষ্ট বাসাটার ডোরবেল চাপতেই এক
সৌম্যকান্ত ভদ্রলোক দরজা খুললেন। ভদ্রলোকের পরনে
সাদা কটন টি-শার্ট, চোখে চশমা, হাতে নিউজ পেপার।
"আসসালামু আলাইকুম।"
রাবেয়া বেগম সালাম জানাতেই ভদ্রলোক ডান হাতে চশমাটা
খুলে ভালো করে তাকালেন, "ওয়ালাইকুম আসসালাম!
রাবেয়া ভাবি না?"
অনিন্দিতা আর রাবেয়া বেগম ভ্রু কুঁচকিয়ে একে অপরের
দিকে তাকাল। ভদ্রলোক আবার বললেন, "আমাকে চিনতে
পারেননি ভাবি? আমি আজিজ। আজিজ রায়হান। আরিফের
ফ্রেন্ড।"
পেছন থেকে ততক্ষণে আজিজ রায়হানের স্ত্রী সোনালী বেগম
এসে দাঁড়িয়েছেন, "আরে, ওনাদেরকে আগে ভেতরে ঢুকতে
বলবে তো! দরজায় দাঁড়িয়েই পরিচয় পর্ব সাড়বে নাকি?"
তারপর রাবেয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এই
লোকের কোনো কান্ডজ্ঞান নেই! আপা, ভেতরে আসুন তো
আপনারা..."
------------
"ব্যবসার সূত্র ধরে আমাদের আলাপ। বন্ধুত্ব অতটাও গাঢ় না
থাকলেও নেহাত কম ছিল না। আপনার সাথেও তো একবা
দেখা হয়েছিল ভাবি, মনে নেই? ওই যে গুলশানে সাউথ ডেল্টা
ট্রেড এক্সপো-টা হলো... অবশ্য বহু বছর আগের কথা,
আপনার মেয়ে তো তখন একদমই ছোট।" আজিজ রায়হান
অনিন্দিতার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আবার রাবেয়া বেগমের
দিকে তাকালেন, "আরিফের সাথে এসেছিলেন আপনি।"
রাবেয়া বেগম কিছুক্ষণ মনে করার প্রয়াস চালালেও সম্পূর্ণ
স্মৃতিটুকু মনে করতে পারলেন না। টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি
নিয়েই ভদ্রতার খাতিরে সম্মতি জানালেন, "হ্যাঁ ভাই, মনে
পড়েছে।"
সোনালী বেগম ততক্ষণে কাজের মেয়েটাকে সাথে নিয়ে
সেন্টার টেবিল ভর্তি করে ফেলেছেন নানা রকম খাবার-
দাবারে।
রাবেয়া বেগম অবাক হয়ে শুধালেন, "আরে আপা, করেছেন
কী! এত আয়োজন কেন! আমরা তো আপনাদের বাসায়
খালি ফ্ল্যাট আছে শুনে দেখতে এলাম..."
আজিজ রায়হান হাসলেন, "এই সামান্যকে এত আয়োজন
বলছেন ভাবি! বাচ্চাগুলো এই প্রথমবার ওদের আঙ্কেলের
বাড়িতে এলো, এতোটুকু তো করতেই হবে!"
অর্ক চোখ বড় বড় করে অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস
করে বলল, "এই আপু, আমরা বাচ্চা?"
অনিন্দিতা কড়া চোখে তাকালো, "চুপ কর!"
অর্ক তৎক্ষণাৎ ঠোঁট সিল করে ফেলল, যেন কেউ টেপ মেরে
দিয়েছে। কিন্তু চোখ দুটো এখনো চকচক করছে দুষ্টামিতে।
বোনকে এখনো নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে ফিসফিস
করে আবার বলল, “চোখ দুটোও বন্ধ করতে হবে? এভাবে
তাকিয়ে আছ কেন!"
"এতো বেশি কথা বলছিস কেন, হ্যাঁ?" অনিন্দিতা নিচু স্বরে
ধমকাল, "সবাই শুনে ফেললে কী ভাববে?"
"কী ভাববে?" অর্ক কৌতূহলী চোখে তাকালো।
“আরেকটা শব্দ করলে এই ব্যাগটা ছুঁড়ে মারবো মাথায়,”
অনিন্দিতা থমথমে গলায় বলল।
অর্ক নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বিরবির করল, “দুঃখিত
আপা! আমার ভুল হয়ে গেছে...”
অনিন্দিতা এবার টেবিলের নিচ থেকে অর্কর পায়ে একটা
ঠোক্কর মারল। অর্ক মুখ বিকৃত করে ফেলল তাতে, “আহ্!
আপু, তুমি একটা সহিংসতাকারী মহিলা!"
অনিন্দিতা তীব্র চোখে তাকাল, “কী বললি তুই?"
অর্ক আরো কিছু বলার আগেই রাবেয়া বেগম পাশ থেকে
তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “কী সমস্যা তোমাদের?”
অর্ক দ্রুত ভদ্র মুখভঙ্গি করে বলল, “কই, কিছু না তো আম্মু,
মশা কামড়েছে।”
সোনালী বেগম হেসে উঠলেন, “ভাই-বোন দু’জনের মধ্যে বেশ
বোঝাপড়া আছে, দেখি!”
রাবেয়া বেগমও হেসে ফেললেন, “এই বোঝাপড়াটাই সারাটা
দিন আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়, আপা!”
একটা আপনসুলভ উষ্ণ হাসির তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল ঘরজুড়ে।
বাইরে তখন সূয্যিমামা বোধহয় মাথার উপরে চলে এসেছেন।
কড়া রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে গলে ঝিলমিল করছে চায়ের
কাপের ধোঁয়ায়।
ঠিক সেই সময় আজিজ রায়হান বললেন, “চলেন তো ভাবি,
আগে ফ্ল্যাটটা দেখাই আপনাকে, তারপর আরেকদফা
জমজমাট আড্ডা হবে।"
রাবেয়া বেগম মাথা নাড়লেন, "হ্যাঁ, চলেন..."
আজিজ রায়হানের বাড়িটা ডুপ্লেক্স হলেও নিচতলায় একটা
আলাদা ফ্ল্যাট আছে। ফ্ল্যাটটা খালি পড়ে আছে অনেকদিন
ধরে। কিছুদিন আগেই আজিজ ভেবেছেন ভাড়া দেবেন ওটা।
সেই হিসেবেই বাড়ি খালির বিজ্ঞাপন টানানো হয়েছিল।
ডুপ্লেক্স বাড়িতে সাধারণত লিফট না থাকলেও আজিজ
রায়হান নিজেদের সুবিধার্থে লিফট লাগিয়েছেন।
লিফট দিয়ে নিচতলায় নেমে এলো সবাই। চাবি দিয়ে দরজার
লক খুলতেই ঘরের ভিতরে ঢুকল অনিন্দিতা, অর্ক, রাবেয়া
বেগম। পিছে পিছে ঢুকলেন আজিজ রায়হান। ফ্ল্যাটটা
দীর্ঘদিন খালি পরে থাকলেও অপরিচ্ছন্ন নয়, বোধহয়
কিছুদিন আগেই পরিষ্কার করা হয়েছে। দেয়ালে হালকা ক্রিম
কালারের পেইন্ট, মেঝেতে চকচকে ম্যার্বেল। জানালার বন্ধ
কাঁচ দিয়ে নীলচে রোদ ঢুকছে, পুরো ঘরটাকে ভরিয়ে দিচ্ছে
মৃদু উষ্ণ নীলচে-সোনালি আলোয়।
ঘুরে ঘুরে ফ্ল্যাটটা দেখলেন রাবেয়া বেগম। তারপর আজিজ
সাহেবকে জানালেন বাসাটা বেশ পছন্দ হয়েছে তাদের।
ভাড়ার কথা জিজ্ঞেস করতেই আজিজ সাহেব বেঁকে বসলেন।
ভাড়া তো নেবেন না তিনি! বন্ধুর পরিবারের কাছ থেকে কেউ
বাড়ি ভাড়া নেয় নাকি!
ওদিকে রাবেয়া বেগমও কম যান না। এভাবে বাড়ি ভাড়া না
দিয়ে থাকতে উনি কোনোভাবেই রাজি না। সেরকম হলে অন্য
কোথাও বাসা দেখবেন, তবুও এভাবে থাকতে পারবেন না।
আজিজ রায়হানকে অবশেষে মধ্যস্থতায় আসতে হলো।
নির্ধারণ হলো মূল ভাড়ার ৫০% দেবেন রাবেয়া বেগম। দুপক্ষই
খুশি তাতে।
আজিজ সাহেব জানালেন অনিন্দিতারা চাইলে কালই উঠতে
পারে। তবে গোছগাছের বিষয় আছে বিধায় আগামী তিন-চার
দিন পর উঠতে চাইল ওরা। আজিজ রায়হান সম্মতি
জানালেন। তারপর আবারও দোতালায় যাওয়ার কথা বলতেই
রাবেয়া বেগম বললেন, "আজকে আর যাব না ভাই। তিন
চারদিন পর তো আসছিই। এখন গোছগাছের বিষয় আছে,
আজকে চলে যাই..."
আজিজ রায়হান ব্যাপারটা বুঝে রাজি হলেন। বিদায় জানিয়ে
বাইরে বেরিয়ে এলো অনিন্দিতারা।
১৪.------------------
শুভ্রর আরামের ঘুমের তেরোটা বাজিয়ে কর্কশ রিংটোনটা গত
এক মিনিট ধরে বেজেই চলেছে। ভয়াবহ রকমের বিরক্ত হয়ে
চোখ-মুখ কুঁচকে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা টেনে বের
করল শুভ্র। ফোনটা রিসিভ করেই দিল এক বাজখাঁই ধমক,
"সমস্যা কী তোমার, হ্যাঁ? প্রত্যেক শুক্রবার সকালে আমার
ঘুমটা না ভাঙ্গালে কি তোমার গোটা সপ্তাহের পেটের ভাত
হজম হয় না?"
ওপাশের ব্যক্তি হকচকিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত ওপাশ থেকে
কোন শব্দ এলো না। তারপর জবাব এলো কড়া গলায়, "দুপুর
১টা তোমার কাছে সকাল হলেও বাকিদের কাছে এটা দুপুরই,
মিস্টার তাহমিদ রায়হান শুভ্র!"
শুভ্র নিজে এবার হকচকিয়ে গেল। দুপুর ১টা মানে?
দ্রুতগতিতে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে চোখের সামনে এনে
সময় দেখল ও। ঘড়িতে ১টা বেজে ১৫ মিনিট। এতবেলা হয়ে
গেল কখন! আম্মু কোথায়? ডাকতে আসেনি কেন আজকে?
অন্য দিনগুলোতে তো ডাকতে ডাকতে কানের পোকা বের
করে দেয়!
ওপাশের ব্যক্তি তখন 'হ্যালো, হ্যালো' করছে! শুভ্র দ্রুত
ফোনটা কানে ঠেকালো, 'সরি! আসলে আমি ভেবেছি এখনো
বোধহয় সকাল! ঘুমাতে ঘুমাতে বুঝতেই পারিনি কখন যে
দুপুর হয়ে গেছে!"
ওপাশের ব্যক্তি ঠাস করে লাইন কেটে দিল। মুখ ফুলিয়ে
বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেললো শুভ্র! অসহ্য! সৃষ্টিকর্তা আসলে এই
নারী জাতিকে কী দিয়ে বানিয়েছে কে জানে! কথায় কথায়
তাদের অভিমান! কিছু হলেই মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে!!
তারপরে তাদের মান ভাঙানোর জন্য শুভ্রর মত বেচারা
পুরুষগুলোকে অযথাই ব্যতিব্যস্ত হতে হয়!
শুভ্র দুপাশে মাথা নেড়ে উঠে বসলো। এসব নাটক আর
ভাল্লাগেনা! গার্লফ্রেন্ড নামক বস্তুটা ওর সুখের জীবনটা তামা
তামা করে দিল রে! কোন কুক্ষণে যে বদমাইশ বেটিটার প্রেমে
পড়েছিল... শুভ্র ওর গার্লফ্রেন্ড নামক আপদ-টার চৌদ্দগুষ্টি
উদ্ধার করতে করতে ওয়াশরুমে ঢুকলো। ঢুকেই সোজা
শাওয়ারটা ছেড়ে দিল। সকাল সকাল ঘুম ভাঙিয়ে বদমাইশ
আপদটা মাথাটা গরম করে দিয়েছে, এক্ষুনি ঠান্ডা করা
দরকার! উপস্ সরি! এখন তো আবার সকাল না, সকাল শেষ
হয়ে শুরু হয়েছে দুপুর, মাথা গরম হয়ে যাওয়া দুপুর!
To be continued...
গল্পটা কি আদৌ ভালো লাগছে তোমাদের? কি হাবিজাবি
লিখছি আল্লাহ মালুম! তোমাদেরও কোনো রেসপন্স নেই।
চুপচাপ পড়ে চলে যাও সবাই। রেসপন্সের অভাবে লেখার
আগ্রহ চলে গেছে আমার। এই চার-পাঁচ দিনে এতটুকু লিখতে
পেরেছি! একেকটা পর্বে ১০০ রিয়াক্টও হচ্ছে না। এভাবে তো
লিখব না আমি!! ভালো না লাগলে জানিয়ে দাও, এই পর্যন্তই
আল্লাহ হাফেজ করে দিই? |
0 Comments