গল্প: প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান (পর্ব:০৬)
লেখিকা:সানজিদা আক্তার মুন্নী
পর্ব:০৬
-------------------------
ইবনান পরিবারে আজ এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প আঘাত
হেনেছে। নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়া বাড়িটার আনাচে-
কানাচে এখন শুধু চাপা উত্তেজনা আর আতঙ্কের ছায়া
এখন। গত দু'দিন আনভির উপস্থিতিতে ওয়াহেজ
নিজেকে প্রবলভাবে সংযত রেখেছিল। চোখের সামনে
অনেক কিছু ঘটে যেতে দেখেও না দেখার ভান করে এক
অদৃশ্য সমতা বজায় রেখে চলেছিল সে। আনভির সামনে
সে কোনোভাবেই নিজের ভিতরের অস্থিরতাকে প্রকাশ
করতে চায়নি। কিন্তু আজ আর পারল না। তার ধৈর্যের
শেষ সুতোটুকুও আজ ছিঁড়ে গেছে। আজ না পেরে সে
ফিরে এসেছে তার সেই আদিম, রুদ্ররূপে যে রূপ দেখলে
পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত
নেমে যায়।
ওহির দুঃসাহসিকতার ঘটনাটা ততক্ষণে মিডিয়ার
কানাঘুষোয় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ব্যাপারটা থানা
পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তবে সৌভাগ্যবশত, কেউ এখনো
জানতে পারেনি যে মেয়েটি অভিজাত ইবনান
পরিবারেরই
একজন। ওয়াহেজের বন্ধু সাফি অত্যন্ত বিচক্ষণতার
সাথে
পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। পুলিশ স্টেশন থেকে ওকে
ছাড়িয়ে এনে, একটা কালো আবায়া পরিয়ে তড়িঘড়ি
করে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ওহি বাড়িতে পা
রাখার আগেই ওয়াহেজ পুরো ঘটনা জেনে যায়। খবরটা
শোনার পর থেকেই রাগে তার শিরা-উপশিরা ফুলে
উঠেছে, সারা শরীর যেন ধিকধিক করে জ্বলছে।
দ্রুত বাড়ি ফেরে ওয়াহেজ। সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে
ঢুকতেই দেখে লিভিং রুমে থমথমে পরিবেশ। পুরো
পরিবার সেখানে জড়ো হয়ে আছে। আর মাঝখানে
দাঁড়িয়ে আছে ওহি! অপরাধবোধের ছিটেফোঁটাও নেই
তার চেহারায়, বরং নির্লজ্জের মতো সবার সাথে সমানে
তর্ক জুড়ে দিয়েছে সে। সাফি যে আবায়াটা পরিয়ে তার
মান বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, রাগে-ক্ষোভে সেটা গা
থেকে টেনে খুলে সবার সামনে সজোরে ছুঁড়ে মারে ওহি।
তীক্ষ্ণ, উদ্ধত গলায় চিৎকার করে ওঠে,
"আমি মানি না এসব! আমি মানি না এই সেকেলে নিয়ম!"
ঠিক সেই মুহূর্তে সদর দরজার চৌকাঠ মাড়ায় ওয়াহেজ।
তার মেজাজ এখন সপ্তম স্বর্গে, মুখের পেশিগুলো শক্ত
হয়ে আছে। চোখে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুনের
লেলিহান শিখা। অগ্নিঝরা দৃষ্টিতে একবার ওহির দিকে
তাকায় ওয়াহেজ তারপর আশেপাশে একবার চোখ
বুলিয়ে, রাগে ফেটে পড়ে হাতের কাছে থাকা একটা ভারী
অ্যান্টিক ফুলদানি তুলে নেয় হাতে। তারপর বাঘের মতো
গর্জন করে ওহির দিকে এগোতে থাকে সে,
"বেহায়ার বেহায়া! বেপর্দা, অসভ্য নারী! তোর এত বড়
সাহস কী করে হয়? এই ইবনান পরিবারে জন্ম নিয়ে তুই
ওয়েস্টার্ন পোশাক পরে বাইরে হারাম পুরুষদের সামনে
যাস? এত বড় কলিজা তোর কোথা থেকে গজালো?"
ওয়াহেজের এই রণমূর্তি দেখে৷ওর মা আর ওর বাবা ছুটে
আসেন। আতঙ্কিত হয়ে পথ আটকে দাঁড়ান তারা। উষা
কাঁপা কাঁপা হাতে ওয়াহেজের উত্তপ্ত গাল আর কপালে
হাত বুলিয়ে ওকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন, "বাবা,
রাগ করিস না। শান্ত হ। ও না বুঝে ভুল করে ফেলেছে,
বাচ্চা মানুষ...
কিন্তু ওয়াহেজ আজ কারো কথা শোনার পাত্র নয়। উষার
হাত সরিয়ে দিয়ে, লাল হয়ে যাওয়া চোখে ওহির দিকে
তাকিয়ে দাঁত চেপে ফুঁসতে ফুঁসতে চিৎকার করে ওঠে ,
"সবাইকে আমি বলেছিলাম না?
তোরা পশ্চিমার বেশ্যা নোস,
তোরা ঘরের নারী, তোরা ঘরের ফুল!
নিজেদের শালীনতায় ঢেকে রাখবি।
তুই যদি বেশ্যা হতি আর এভাবে
অর্ধনগ্ন অবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতি, তাহলে আমার
বিন্দুমাত্র আপত্তি থাকত না। কিন্তু তুই আমার বোন!
আমারই রক্ত তুই! তুই কীভাবে এভাবে বাইরে গেলি?
আবার আমার সামনে দাঁড়িয়ে তর্ক করছিস! তোকে
বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছিলাম শিক্ষা নিতে,
এই নোংরামির
সাহস বাড়াতে নয়! গলার রগ একটা একটা করে ছিঁড়ে
নেব। চিনিস তুই আমায়? ভালো করেই তো জানিস আমি
কী কী করতে পারি! এতদিন ধরে সবার নমুনা দেখছি,
কিছু বলছি না বলে একেকজন মাথায় চড়ে বসেছিস,
তাই না?"
এত কথার পরও বিন্দুমাত্র দমে যায় না ওহি। জেদ আর
অহংকারে অন্ধ হয়ে ওয়াহেজের মুখের ওপর অবলীলায়
জবাব দিয়ে বসে ও, "হ্যাঁ, বসেছি! আমার কি নিজস্ব
কোনো স্বাধীনতা নেই?"
এই একটা কথাই সপ্রায় জ্বলন্ত বারুদে এক ড্রাম পেট্রোল
ঢেলে দেওয়ার মতো। দ্বিগুণ ক্ষোভে, উন্মাদের মতো
ফেটে পড়ে ওয়াহেজ।
উষাকে এক ঝটকায় একপাশে সরিয়ে
দিয়ে সরাসরি ওহির দিকে তেড়ে যায় সে। ওহির মা,
অর্থাৎ ওয়াহেজের চাচি মিসেস রুশদী এবার আতঙ্কে
জমে যান। নিজের মেয়ের নিশ্চিত বিপদ দেখে তিনি
দিশেহারা হয়ে পড়েন। ওয়াহেজ যেভাবে এগোচ্ছে, এক
আঘাতেই হয়তো ওহিকে শেষ করে ফেলবে! কী করবেন
বুঝতে না পেরে মিসেস রুশদী হঠাৎ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা
আনভিকে ঠেলে দেন। আনভি এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে
দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে নিজেকে
ক্ষিপ্ত ওয়াহেজের ঠিক সামনে আবিষ্কার করে সে হ
কচকিয়ে যায়। পেছন থেকে মিসেস রুশদী কাঁপাকাঁপা
গলায় ফিসফিস করে বলে ওঠেন,
"তু... তুমি একটু ওকে সামলাও না, আনভি! প্লিজ!"
আনভিকে সামনে এগিয়ে আসতে দেখে নিজের পা
থামায় ওয়াহেজ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুশদীর দিকে তাকিয়ে
গর্জে ওঠে, "চাচিম্মা, তোমার মেয়ের যখন অর্ধনগ্ন
অবস্থায় থাকার এতই শখ, তাহলে আমি ওকে এক্ষুনি,
এই মুহূর্তে, এখানেই জ্যান্ত কবর দেব!"
এরপর আনভির দিকে রুদ্রমূর্তিতে তাকিয়ে বলে, "তুমি
সামনে থেকে সরো।"
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আনভি দু’হাত প্রসারিত করে
ওয়াহেজের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ওয়াহেজের
অগ্নিবর্ষী চোখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে
বলে, "দেখুন... দেখুন, ও আসলে বুঝতে পারেনি.......
আনভির কথা শেষ হওয়ার আগেই ওয়াহেজ একপ্রকার
আনভির মাথার ওপর দিয়েই হাতের ভারী ফুলদানিটা
ওহির দিকে ছুঁড়ে মারতে উদ্যত হয়। পরিস্থিতি পুরোপুরি
হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আনভি মরিয়া হয়ে
ওয়াহেজের দুই কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে। তাকে সামান্য
ধাক্কা দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে,
"ভুল... ভুল হয়ে
গেছে ওর। প্লিজ, ওকে মাফ করে দিন!"
সবসময়কার শান্তশিষ্ট ওয়াহেজের এমন ভয়ংকর রূপ
দেখে আনভির নিজেরই ভয়ে জানপালাই অবস্থা।
আনভির স্পর্শে ওয়াহেজ কিছুটা থমকে যায়। কিন্তু
পরক্ষণেই হাতের ফুলদানিটা সামনের কাঁচের টি-
টেবিলের
পাশে ফ্লোরে সজোরে আছড়ে ফেলে সে। কাঁচ ভাঙার
বিকট শব্দের মাঝেই ওয়াহেজ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
"আমার বাড়ির নারীর দেহ বাইরের মানুষ দেখেছে,
মিডিয়া দেখেছে! কত বড় বিপর্যয় ও ঘটিয়েছে তার
কোনো ধারণা আছে? আর সবচেয়ে বড় কথা, ও আমার
নিয়মের বিরুদ্ধে গেছে। আজ এর একটা বিহিত আমাকে
করতেই হবে!"
কথাগুলো বলেই ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে পাশের কাঁচের
টি-টেবিলটায় সজোরে লাথি মারে ওয়াহেজ। ছিটকে
উল্টে যায় টেবিলটা। এরপর হনহন করে নিজের রুমের
দিকে পা বাড়ায় সে। আনভি মাঝখানে এসে দাঁড়ানোয়
আজ হয়তো ওহি প্রাণে বেঁচে গেল, নয়তো ওয়াহেজ
নির্ঘাত ওর মাথা ফাটিয়ে দিত। বাড়ির উপস্থিত সবার
বুকেই তখনো মৃত্যুভয় কাঁপন ধরাচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে
উঠতেই ভারী গলায় শেষবারের মতো শাসিয়ে যায়
ওয়াহেজ, "শাস্তি এখনো বাকি!"
আনভি সিঁড়ির দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই রাগী
লোকটাকে এর আগে সে কত কথাই না শুনিয়েছে!
আল্লাহই জানেন এখন তার নিজের কপালে কী লেখা
আছে। ওয়াহেজ হয়তো এবার তাকেই বারান্দা থেকে
সজোরে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেবে।
এদিকে রুশদী মেয়ে ওহিকে বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে
কেঁদে ওঠেন, "কেন তুই ওর নিয়ম ভাঙতে গেলি রে?
এখন নিশ্চিত তোর সাথে খারাপ কিছু হবে।
ওয়াহেজ এত সহজে তোকে ছাড়বে না!"
মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ওহিও ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। উষা
ধীরপায়ে এগিয়ে যান। ওহির মাথায় আলতো করে হাত
বুলিয়ে দিতে দিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "শাস্তির জন্য
প্রস্তুতি নাও ওহি। ঠিক যেমনটা আইরা পেয়েছিল।"
আইরাও একদিন ওয়াহেজের নিয়ম ভেঙে বেপর্দায়
বাইরে বেরিয়েছিল, উল্টে তর্কও করেছিল। এরপর
ওয়াহেজ তার সাথে যা করেছিল... তা সত্যিই ভাষায়
প্রকাশ করার মতো নয়।
উষা এবার আনভির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধমকে
ওঠেন, "এই! তুমি এখানে কী করছো? যাও, নিজের ঘরে
যাও। গিয়ে নিজের হাসবেন্ডকে সামলাও!"
এ কথা শুনে আনভির ভেতরটা ভয়ে কেঁপে ওঠে। সে
আমতা আমতা করে বলে, "আ-আমি... আমি যাব?"
"হ্যাঁ, তুমিই তো যাবে! তুমি ব্যতীত ওয়াহেজের অন্য
কোনো স্ত্রী আছে নাকি?"
কথাটি শুনে আনভি আর কোনো উত্তর দেয় না। বুকভরা
ভয় নিয়ে সে ধীরপায়ে রুমের দিকে এগোয়। রুমের
সামনে
গিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই ওয়াহেজকে
দেখতে পায়। ওয়াহেজ আনভিকে দেখে একদম ঠান্ডা
চোখে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ ও শীতল গলায় বলে, "আমি
কাউকে শাসন করার সময় তুমি যদি আর কখনো সামনে
এসে দাঁড়াও, তাহলে নেক্সট টাইম সবার আগে তোমার
মাথা ফাটিয়ে দেব!"
আনভি নিজের ভেতরের প্রবল ভয়টাকে সযত্নে চাপা
দিয়ে কণ্ঠস্বর কিছুটা শক্ত করে বলে, "আমি তো আসতে
চাইনি! কিন্তু আমি না এলে তো আপনি ওকে মেরেই
ফেলতেন! যে বড় ফুলদানিটা হাতে নিয়েছিলেন...
ওয়াহেজ সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, "ওটা স্রেফ ভয় দেখানোর
জন্য নিয়েছিলাম। আমি পাগল নাকি যে ওর গায়ে হাত
তুলব? আমি ওর চাচাতো ভাই, আপন কেউ নই।"
আনভি মৃদু স্বরে পালটা জবাব দেয়, "এভাবে না শাসিয়ে
তাকে তো ভালোভাবেও বোঝাতে পারতেন।"
আনভির কথা শুনে ওয়াহেজের ঠোঁটের কোণে এক
চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে ও বলে, "একটা ছোট
শিশুকে যেমন অ-আ-ক-খ ধরে ধরে শেখানো হয়, আমি
আমার বোনদেরও ঠিক সেভাবেই বুঝিয়েছি। প্রতিদিন
বুঝিয়েছি। এই দুদিন আগেও বুঝিয়েছি যে একজন
বেপর্দা নারী কতটা মূল্যহীন। কতভাবে যে বুঝিয়েছি!
কিন্তু ওহি বোঝেনি।
এর আগেও সে এমন শত শত ভুল
করেছে। আর নয়! এবার এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে।
কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।"
আনভি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ওয়াহেজের দিকে দু-কদম
এগিয়ে গিয়ে মিনতির সুরে বলে, "সবাই তো জানে
আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফ।
আমাদের ভেতরের খবর তো আর
কেউ জানে না। বাড়ির সবাই আমাকে বলছে আপনাকে
বোঝাতে, ওকে মাফ করে দিতে। প্লিজ, ওকে মাফ করে
দিন।"
ওয়াহেজ স্থির দৃষ্টিতে আনভির দিকে তাকায়। তারপর
বেশ রুক্ষ গলায় বলে, "তুমি আমার স্ত্রী, স্ত্রীর মতোই
থাকবে। আইন সবার জন্য সমান। তোমার কথায় আমি
আমার নিজের অবস্থান ভুলে যেতে পারি না।
এটা তোমার
আর আমার মধ্যকার কোনো বিষয় নয় সামাইরাহ।
তোমার আমার বিষয় হতো তাহলে অবশ্যই তোমার কথা
শোনার এবং মানার চেষ্টা করতাম আমি।"
আনভি ওয়াহেজের এই কথাগুলোর গূঢ় মর্ম খুব
ভালোভাবেই বুঝতে পারে। তাই সে আর কথা বাড়ায় না,
একদম চুপ হয়ে যায়। নিস্তব্ধতা নেমে আসে পুরো ঘরে।
কিছুক্ষণ পর.....
বাগনের পরিবেশটা থমথমে হয়ে আছে ইবনান বাড়ির,
বাগানের মাঝখানে রাখা হয়েছে বিশাল আকৃতির একটা
ড্রাম। ড্রাম টা কানায় কানায় বরফগলা পানিতে পূর্ণ। এই
হাড় কাঁপানো ঠান্ডা জলের ভেতর গলার নিচ পর্যন্ত
ডুবিয়ে রাখা হয়েছে ওহিকে। পরনে তার কালো বোরখা,
যা এখন ভিজে শরীরে লেপ্টে আছে। এটা শুধু ওহির
বেপরোয়া স্বভাব বা পর্দা না করার শাস্তি নয়, এর পেছনে
রয়েছে আরও গভীর এক পাপের দগদগে ইতিহাস।
ওহি দেশের বাইরে গিয়ে এক বিবাহিত বিজনেস
টাইকুনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিল। শুধু তাই নয়,
লোকটার বিশ্বাস ভেঙে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ
করে দেশে পালিয়েছে সে।
ওহির এই শয়তানির প্রতিটি নথিপত্র
এখন ওয়াহেজের হাতে। পরিবারের সবার সামনে সেই
জঘন্য সত্য উন্মোচিত হয়েছে। আর এখন চলছে তার
প্রায়শ্চিত্ত। বর্তমান এই দেশে পরকীয়ার একমাত্র শাস্তি
হলো টানা ত্রিশ মিনিট বরফজলে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা।
এর এক মিনিটও এদিক-সেদিক হওয়ার জো নেই।
অভিযুক্ত যেই হোক, যদি এই শাস্তির মাঝে তার মৃত্যুও
হয়, তাতেও কারও কিছু যায় আসে না।
ঠান্ডায় ওহির শরীর জমে আসছে, দাঁতে দাঁত লেগে
ঠকঠক শব্দ হচ্ছে, কিন্তু চিৎকার করার শক্তিটুকুও সে
হারিয়ে ফেলেছে। একের পর এক মহিলা গার্ড নির্লিপ্ত
মুখে ড্রামে আরও বরফ ঢেলে যাচ্ছে।
উঠোনের একপাশে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে
ঊষা, রুশদী, ওজিফা আর আয়রা। আনভিও আছে
তাদের সাথে। চোখের সামনে এই অমানবিক দৃশ্য দেখেও
তারা নিশ্চুপ। ওয়াহেজ তাদের সবাইকে সাক্ষী হিসেবে
দাঁড় করিয়ে রেখেছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার তার ওহির এই
পরিণতি দেখে বাকিরা যেন ভবিষ্যতে এমন ভুল করার
দুঃসাহস না দেখায়। ওয়াহেজের এই নীরব বার্তা সবার
হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
আনভি আর স্থির থাকতে পারে না। চোখের সামনে এমন
দৃশ্য বেশিক্ষণ সহ্য করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে সে কম্পিত পায়ে দু-কদম এগিয়ে যায়
ওয়াহেজের দিকে। তার উদ্দেশ্য ওয়াহেজের পায়ে পড়ে
হলেও ওহির জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করা।
কিন্তু আনভিকে এগোতে দেখেই ওয়াহেজ হাত তুলে
ইশারা করে বরফশীতল গলায় সে ধমকে ওঠে,
"সামাইরা!
যতটুকু এসেছ, ঠিক ততটুকুতেই থেমে যাও। মুখ দিয়ে
আর একটা শব্দ বের করলে এই ড্রামে তোমাকেও চুবিয়ে
দেব আমি।"
আনভি থমকে যায়। ওয়াহেজ এবার ড্রামের ভেতর
যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা ওহির দিকে ফেরে দাঁতে
দাঁত চেপে সে হিসহিস করে বলে ওঠে,
"কিসের এত টাকার প্রয়োজন ছিল তোর? এতটা নিচে
নামলি তুই? টাকার যদি এতই অভাব ছিল, আমাকে এসে
একবার বলতি! আমি আমার নিজের কিডনি বিক্রি করে
হলেও তোকে টাকা দিতাম। কিন্তু তুই...
ওয়াহেজ থামে না, তার গলার স্বরে তীব্র ঘৃণা আর
অসহায়ত্ব ঝরে পড়ে, "এখন তোকে আমি কার কাছে
বিয়ে দেব? কীভাবে দেব? যার কাছেই বিয়ে দিতে যাব,
সে তো মুখের ওপর বলে দেবে 'এত নীতির কথা বলেন,
অথচ নিজের বোনের ইজ্জতেরই তো হেফাজত নেই!'
তখন আমি তাকে কী জবাব দেব? তুই আল্লাহর কাছে কী
জবাব দিবি? তোর বাবা কী জবাব দেবে? ছিঃ! সামান্য
দু'পয়সার জন্য তুই নিজের সত্তা, নিজের সম্ভ্রম সব
এভাবে বিসর্জন দিলি?"
অপমান, অনুশোচনা আর হাড়হিম করা ঠান্ডায় ওহি
এখন হু হু করে কাঁদছে।
তার কান্না দেখে আনভি নিজেকে আর
সামলাতে পারে না। সব ভয় উপেক্ষা করে সাহস সঞ্চয়
করে সে আরেক পা এগিয়ে গিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে,
"ওকে মাফ করে দিন প্লিজ, ওয়াহেজ! ও মরে যাবে......
আনভি তার নির্দেশ অমান্য করে কথা বলায় ওয়াহেজের
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।
মুহূর্তের মধ্যে তার রাগ দ্বিগুণ হয়ে ওঠে।
ওয়াহেজ ফট করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
চলবে.......
🔞
সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন।
×
0 Comments