লেখক:DRM Shohag
পর্ব :০৫ [শেষ অংশ]
----------------------
হৃদয়, হৃদমের বড় বোন হিমি নওরোজ। বয়স ৩৫ বছর।
হিমির বিয়ে হয়েছে, যখন তার ২২ বছর বয়স ছিল। প্রায় ১৪
বছর যাবৎ তার বিবাহিত সংসার। ঘরে ১০ বছরের একটি
মেয়ে আছে। আজ প্রায় দুই মাস পর হিমি মেয়েকে স্বামীর
সাথে স্কুলে পাঠিয়ে বাড়ির গাড়ি করে তার দাদি-দাদুসহ মা,
বাবাকে দেখতে এসেছে। আসার পথে হিমি তার স্বামীকে
বলেছে, মেয়ের স্কুল শেষে সে যেন মেয়েকে নিয়ে সরাসরি
তার বাবার বাড়ি আসে৷ আসার পথে বাগানে দাদুর সাথে
দেখা হয়েছিল, তখন দাদুর সাথে কথা বলে হিমি বাড়ির
ভেতরে এসে প্রথমে দাদি মা আর ভাই হৃদমের বউ অর্থাৎ
ভাইবউ রূপসার সাথে টুকটাক কথা বলে বাড়ির পরিস্থিতি
সম্পর্কে জানে। হিমি বাড়ির ভেতর আসার পর পর হৃদয়
বেরিয়ে গেয়েছিল তার দাদুর সাথে কথা বলতে। এজন্য
হৃদয়ের সাথে তার বড় বোনের দেখা হয়নি৷ এদিকে হিমি
সকলের সাথে কথা বলে রজনীর ব্যাপারে শোনে। সবচেয়ে
বেশি অবাক হয় মেয়েটি নাকি হৃদয়ের বউ, এই ভেবে।
তাদের
হৃদয় হুটহাট কিভাবে বিয়ে করে ফেললো, তাছাড়া মেয়েটিই
বা দেখতে কেমন! এতোসব ভাবনা নিয়ে সে রজনীর ঘরে
আসে।
সব গুলো পর্বের লিঙ্ক
ঘরে এসে কাউকে দেখতে না পেয়ে হিমি পুরো ঘরে চোখ
বুলিয়ে নেয়। এরপর বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়। রজনী
চারপাশে ঘুরে ঘুরে আশেপাশের বিল্ডিং দেখছিল, খেয়াল না করায় হঠাৎ-ই হিমির সাথে জোরেসোরে ধাক্কা খেয়ে
পিছনদিকে পড়ে যেতে নেয়, সাথে সাথে হিমি রজনীর দু'হাত
টেনে ধরে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে, “আরে আরে পড়ে যেও না।”
অপরিচিত এক নারীকে দেখে রজনী ভীত চোখে তাকায়।
হিমিকে দেখে ৩০ বছরের কম থেকে বেশি মনে হয়না।
চেহারায় বয়সের ছাপ একদমই অস্পষ্ট। হৃদয়, হৃদমের সাথে
মুখের গঠনে এক বিস্তর মিল আছে। রজনী ভ্রু কুঁচকে তাকায়
হিমির দিকে। হিমি রজনীর হলুদ ফর্সা ফুটফুটে মুখখানা দেখে
মেয়ে হয়েও মুগ্ধ হয়। মেয়েটি চোখে পড়ার মতো সুন্দর।
হিমির কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস লাগলো, রজনীর
গ্রাম্য স্টাইলে পরা নাকফুলটি। সাথে রজনীর পায়ের পাতা
সমান ঘনকালো চুল। কিন্তু রজনীকে অর্ধেক পোষাক পরে
থাকতে দেখে হিমির মাথা ঘুরে উঠল। হিমি ব্যস্ত চোখে
চারপাশে তাকালো। এরপর দ্রুত রজনীর হাত ধরে ঘরের
ভেতর টেনে আনে। রজনী কেবল অবাক হয়ে দেখছে তার
হাত ধরে টানাটানি করা মেয়েটিকে। ঘরে এসে হিমি রজনীর
উদ্দেশ্যে বলে,
“করেছ কি এটা? এতো খোলামেলাভাবে বাইরে গেছো কেন?
হৃদয় এসব একদম পছন্দ করেনা, জানো না?”
রজনী অবুঝ নয়নে চেয়ে রইল হিমির দিকে। মেয়েটি কিছুই
বুঝতে পারছে না। মনে করার চেষ্টা করল, হৃদয় টা আসলে
কে! তখন নিচে সবাই সেই ছেলেটাকে হৃদয় বলে ডাকছিল
না? যার পাশে বসে রজনী গতরাতে ট্রেনে আসলো। রজনীর
মনে পড়ল, সেই ছেলেকেই সবাই হৃদয় বলে ডাকছিল। কিন্তু
হৃদয়ের সাথে পছন্দ অপছন্দের প্রসঙ্গ কেন আসছে, মেয়েটি
বুঝল না। তবে এটুকু বুঝল, তার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটি এই
বাড়ির কেউ, আর অবশ্যই ভালো। তাই সে মিনমিন করে বলে,
“আপা আমি শাড়ি পরতে পারিনা। আমাকে শাড়ি পরাইয়া
দিবেন? আর এই চুলটা বাঁইধা দিবেন?”
রজনীর কথায় হিমি হেসে ফেলল। হিমির নিজের পরনেও
শাড়ি। কালো রঙের কুচি করে শাড়ি পরা। উপরে বোরখা পরে
এসেছিল। বাড়িতে এসে বোরখা খুলে রেখেছে। হিমি রজনীর
থুতনিতে হাত রেখে মৃদুস্বরে বলে,
“প্রথমে তো হৃদয়ের বিয়ের কথা আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না।
এখন তোমাকে দেখে আর সংশয় কাজ করছে না। কি মিষ্টি
দেখতে তুমি! হৃদয় তোমার এই মুখ দেখেই হয়ত চটপট বিয়ে
করে নিয়েছে। আমি খুব খুশি হয়েছি।
হিমির কথাগুলো রজনীর মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। কিসের
হৃদয়, কিসের বিয়ে, কিসের খুশি! এসব মেয়েটার মাথায়
জটলা পাকিয়ে যাচ্ছে। রজনীকে চুপ দেখে হিমি আবারও
বলে,
ওহ হ্যাঁ, ওয়েট ওয়েট, এক্ষুনি তোমাকে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছি।
তোমার শাড়িটা কোথায়?”
রজনী দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে বিছানার এক কোণা থেকে
এলোমেলো শাড়িটি নিয়ে হিমির সামনে এসে দাঁড়ায়। হিমি
শাড়িটি নিয়ে এক মিনিটের মধ্যেই রজনীকে খুব সুন্দর করে
কুচি করে শাড়ি পরিয়ে দেয়। সে সবসময় শাড়ি পরে অভ্যস্ত,
এজন্য শাড়ি পরার ক্ষেত্রে সময়টা খুবই সীমিত লাগে। রজনী
অবাক হয় হিমির শাড়ি পরানোর গতি দেখে। তার মা-ও তো
এতো দ্রুত শাড়ি পরিয়ে দিতে পারেনা। কিন্তু রজনীর কিছুটা
অসুবিধা হচ্ছে। কারণ হিমি তাকে শাড়িটি কুচি করে পরিয়ে
দিয়েছে। আর রজনী এভাবে শাড়ি পরে অভ্যস্ত নয়। তার মা
তাকে সবসময় গ্রাম্য স্টাইলে শাড়ি পরিয়ে দেয়। একটু অস্বস্তি
হলেও রজনী নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করল। সংকোচ
ঠেলে মুখ ফুটে কিছু বলল না। যেভাবে পরিয়ে দিয়েছে, এতেই
সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করল। হিমি রজনীর কাঁধ ধরে ঘুরিয়ে দাঁড়
করালো। এরপর হিমির লম্বা চুলগুলো নাড়তে নাড়তে বলে,
“লাইফে ফার্স্ট টাইম নিজ চোখে এতো লম্বা চুল দেখছি। তুমি
চুলে কি দাও?”
রজনী কি বলবে বুঝল না। সে তো চুলে কিছুই দেয় না। মাঝে
মাঝে আম্মা তাকে দু'একটা চড়-থাপ্পড় মে'রে জোর করে
কিসব যেন চুলে লাগিয়ে দিত। কিন্তু সে সুযোগ পেলেই
লুকিয়ে চুরিয়ে দৌড়ে গিয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে সব ধুয়ে
ফেলত। অতঃপর রজনী মৃদুস্বরে বলে,
“আমি তো এসব জানিনা আপা। আমার আম্মা জানে।
আম্মার থেকে শুনে আমি আপনাকে বলব। আপনি আমাকে
একটু চুলটা বাঁইধা দিবেন?”
হিমি কিছু বলতে গিয়েও বলল না। শাড়ি পরাতে গিয়ে
বুঝেছে, মেয়েটার পিছন পার্ট পুরো ভিজে গিয়েছে। ভেজা চুল
ছেড়ে রাখায় ঠান্ডা লাগছে বোধয়। রিমি এটা আন্দাজ করে
রজনীর ভেজা চুলগুলো টেনে নিয়ে বড়সড় একটি খোঁপা
বেঁধে দিল।
তখনই হৃদয় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডানহাতে আধখোলা
দরজায় জোরেসোরে একটা ধাক্কা মা'রে। ফলস্বরূপ প্রচন্ড
শব্দের সাথে দরজাটি পুরোপুরি খুলে যায়। এতো জোরে শব্দ
পেয়ে রজনী আর হিমি দু'জনেই দরজার দিকে তাকায়।
হিমির চোখে পড়ে ছোট ভাই হৃদয়ের রাগান্বিত দৃষ্টি রজনীর
পানে। হিমি আড়চোখে রজনীর পানে একবার তাকালো।
বাড়ির মানুষদের কাছে উপর থেকে শুনে হিমি ধরেই নিয়েছে
হৃদয় রজনীকে পছন্দ করে বিয়ে করেছে। হৃদয় ঠান্ডা মাথার
মানুষ নয়। তার যখন যেটা মনে হয়, সেটা না ভেবেই ঠাস করে
বাস্তবায়ন করে ফেলে। এজন্য ব্যাপারটি হিমি খুব
সহজভাবেই নিয়েছে। আর এখন সে ধারণা করছে, হৃদয়
রজনীকে খোলামেলাভাবে বাইরে দেখেছে বলেই রে'গে'ছে।
তার মতে হৃদয় যেহেতু রজনীকে পছন্দ করে বিয়ে করেছে,
সেহেতু অবশ্যই হৃদয় তার অপছন্দের কাজ রজনীর মাঝে
বরদাস্ত করবে না। মায়ের মতো বড় বোন, ছোট ভাইকে এটুকু
তো অবশ্যই চেনে।
হৃদয়কে নিজের দিকে এমন খেয়ে ফেলা চোখে চেয়ে থাকতে
দেখে রজনী কয়েকবার শুকনো ঢোক গিলল। হৃদয়ের
চোখদু'টো বেশ লালচে লাগলো। রজনী বুঝল না, এখন হৃদয়ের চোখ লাল লাগছে কেন! সে দু'হাতে চোখ ডলে
আবার হৃদয়ের দিকে তাকালো। নাহ্ তার চোখ ঠিকই আছে।
তার মানে এই ছেলেটার চোখ-ই লাল। দেখে বোঝাও যাচ্ছে,
খুব রে'গে আছে। এমন রা'গী মানুষ দেখলে রজনীর এমনিই
ভ'য় লাগে। তার মধ্যে এই ছেলেটা একটু বেশি রা'গী মনে হয়।
রজনী ভাবছে, তখন ওভাবে পালিয়ে আসার জন্য হৃদয় তার
উপর খুব রে'গেছে বোধয়। আর এখন সেই রেশ ধরে কি
করবে কে জানে। ভাবনার মাঝেই হঠাৎ-ই হৃদয়কে নিজের
দিকে তেড়ে আসতে দেখে ভ'য়ে রজনীর গলা আরও শুকিয়ে
আসে। মেয়েটা কোনরকমে দু'পা পেছায়, ততক্ষণে হৃদয়
একেবারে রজনীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রজনীর মুখ
বরাবর হৃদয়ের বুক। হৃদয়ের গা বেয়ে ঘাম চুইয়ে চুইয়ে
পড়ছে, যেটা সর্বপ্রথম রজনীর চোখে পড়ে। ৫ ফুটের রজনী ৬
ফুটের হৃদয়কে দেখার জন্য মাথাটা উঁচু করে তাকায়। এতো
কাছ থেকে এতো লাল লাল চোখ দেখে রজনীর কান্না পায়।
সে তো কিচ্ছু করেনি। তখন শুধু একটু পালিয়ে এসেছিল। সে
ওসব ন'ষ্ট জিনিস দেখেনা, তাই তো পালিয়ে এলো। আচ্ছা
হৃদয় কি কোনোভাবে এখন তাকে সেসব ন'ষ্ট জিনিস দেখাতে
এসেছে না-কি! কথাটা ভাবতেই রজনী কাঁদোকাঁদো স্বরে বলে,
“আমি আপনার কিছু দেখতে চাই না। দয়া করে আমাকে কিছু
দেখাবেন না।”
কথাটা হৃদয়ের মাঝে তেমন কোনো প্রভাব ফেললো না। সে বা
হাতে ধরে রাখা ভাঙা চেয়ারের পায়াটি আরও শ'ক্ত করে
ধরল। চোখমুখ এখনো শ'ক্ত। রজনীর পাশে দাঁড়ানো হিমি ভ্রু
কুঁচকে বলে, “কি দেখতে চাও না রজনী?”
রজনী ঘাড় বাঁকিয়ে হিমির দিকে চেয়ে অসহায় কণ্ঠে বলতে
নেয়,
“আপা, উনি উনার সব কাপড়চোপড় খুলে…..
বাকিটুকু বলার আগেই হৃদয় ডানহাতে শ'ক্ত করে রজনীর
মুখ চেপে ধরে। ইচ্ছে করল এই বে'য়া'দ'ব মেয়েকে তুলে এক
আছাড় মা'র'তে।
রজনীর মুখ চেপে ধরায় মেয়েটা ছটফট করে ওঠে। দু'হাত
তুলে তার মুখ চেপে ধরা হৃদয়ের হাত তার মুখ থেকে সরানোর
জন্য অনেক চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু একচুল পরিমাণও
হৃদয়ের হাত সরাতে পারলো না তার মুখ থেকে।
হৃদয় বহুক'ষ্টে নিজেকে কিছুটা সংযত করে তার বড় বোন
হিমির দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“তুমি কখন আসলে আপু?”
হিমি একবার রজনীকে দেখছিল তো একবার হৃদয়কে। কিছু
বুঝতে পারছেনা সে। ছোট ভাইয়ের কথায় তার ধ্যান ভাঙে।
সে বিষণ্ণ মনে বলে,
“এসেছি কিছুক্ষণ আগে। কিন্তু তুই আমাকে না জানিয়ে
এভাবে বিয়ে করতে পারলি ভাই? আমি তোর কেউ না?”
বড় বোনের ইমোশনাল কথা হৃদয়ের মনে প্রভাব ফেলার
বদলে বিরক্তির মাত্রা বাড়ালো। বিরক্তিটা অবশ্য হিমির উপর
নয়, দাদুর উপর। সকাল থেকে একবার ভাইয়ের মুখে সে
বিবাহিত বিবাহিত শুনতে শুনতে কান পঁচে গিয়েছিল, এখন
আবার বড় বোন এসেই তাকে বিবাহিত বানিয়ে দিচ্ছে। সে
হিমির উদ্দেশ্যে খুব সিরিয়াস মুডে বলে,
“এসব ব্যাপারে আমি জানিনা আপু। আমি অজ্ঞান ছিলাম,
তখন দাদু আমার বিয়ে পরিয়ে আমাকে বিবাহিত বানিয়ে
দিয়েছে। তুমি চিন্তা কর না, কয়েকদিন পর বউকে ছোঁয়া ছাড়া
আমি বাচ্চার বাবা-ও হয়ে যাবো।”
হৃদয়ের কথা শুনে হিমি কেশে ওঠে। মাথায় হাত দিয়ে বলে,
“সে কি রে? অজ্ঞান হয়ে থাকলে আবার কিভাবে বিয়ে
পরানো যায়? আর বউকে ছোঁয়া ছাড়া বাচ্চার বাবাই বা
কিভাবে…..”
মাঝ থেকে হৃদয় বলে,
“ডিটিজাল যুগের কারবার সব। তুমি মিছেমিছি ক'ষ্ট করে
জেগে জেগে বিয়ে করেছিলে, আবার ক'ষ্ট করে বাচ্চাও
নিয়েছিলে। আরেকটু লেট করলে আমার মতো তোমারও সব
শুয়ে বসেই হয়ে যেতো। এনিওয়ে, এখন কিছু করার আগে
দাদুর সাথে কন্টাক্ট করে নিও। কারণ এসব ট্রিকস দাদু ছাড়া
অন্যকোথাও পাবে না।”
কথাগুলো বলে হৃদয় ঠোঁট চেপে রাখলো কয়েক সেকেন্ড।
হাসি আড়াল করার প্রচেষ্টা যাকে বলে। ব্যর্থ হলো না।
এভাবেই সে অভ্যস্ত।
হৃদয়ের কথা শুনে হিমি তব্দা খেয়ে যায়। খুব বুঝল দাদু
নিশ্চয়ই হৃদয়ের সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করেছে, আর তাই
হৃদয় দাদুকে এভাবে ঠেস মেরে কথা বলছে। হৃদয়ের কথা
শুনে হাসিও পেল হিমির। সে নিজেকে না দমাতে পেরে একটু
শব্দ করে হেসেও ফেলল।
রজনী এতক্ষণ দু'হাতে হৃদয়ের হাত খামচে শেষ করেছে,
অথচ হৃদয়ের হাত তার মুখ থেকে এক চুল পরিমাণ সরেনি।
মেয়েটা অসহায় চোখে তাকায় হাস্যজ্জ্বল হিমির দিকে।
এরপর আবার হৃদয়ের দিকে তাকায়। এতক্ষণে এদের
কথোপকথনে রজনী বুঝেছে, হৃদয় আর হিমি দু'জন
ভাইবোন। আর এটাও বুঝেছে হৃদয় বিবাহিত। এরকম
বি’দ্ঘু’টে স্বভাবের মানুষের বউ-ও আছে, ভাবতেই রজনীর
অদ্ভুদ ঠেকল। এই বি’দ্ঘু’টে স্বভাবের লোকটা নিশ্চয়ই এর
বউটাকেও একটুও শান্তি দেয় না। রজনীর কাঁদতে ইচ্ছে
করছে। সেই তখন থেকে এভাবে মুখ চেপে ধরায় মেয়েটার
মনে হচ্ছে, তাকে কেউ পঁ’চা পানিতে চুবিয়ে রেখেছে, এতোটা
বা'জে অনুভূতি হচ্ছে।
হিমি নিজেকে সামলে হৃদয়ের উদ্দেশ্যে বলে,
“মেয়েটার মুখ এভাবে চেপে ধরে রেখেছিস কেন? ছাড়
ওকে।”
হৃদয় তাকালো রজনীর দিকে। রজনীর ছটফটানি হৃদয়ের
চোখে পড়ল। সে হিমির উদ্দেশ্যে বলে,
“আমাকে এক মগ ব্ল্যাক কফি এনে দাও আপু, আর্জেন্ট।
প্রচন্ড মাথা ব্য’থা করছে। অবশ্যই নিজের হাতে বানাবে।”
হিমি ছোট করে বলে,
“আচ্ছা আনছি। এরপর বাকি কথা বলব। মেয়েটাকে কিছু
বলিস না যেন। ও বুঝতে পারেনি।”
হিমি কিসের কথা বলল, হৃদয় বুঝল না। তাই সে কিছু বললও
না। দৃষ্টি রজনীর পানে।
হিমি কথাটা বলে ব্যস্তপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়৷ রজনী
অসহায় চোখে চেয়ে দেখল হিমির প্রস্থান। ভ'য়ের চোটে
মেয়েটার চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। আল্লাহ্ এইবার তাকে
একা পেয়ে এই ছেলেটা তার সাথে কি করবে কে জানে!
কোনোভাবে তাকে আবার ওসব দেখাতে চাইলে….এটুকু
ভাবতেই হৃদয় রজনীর মুখ থেকে তার হাত সরিয়ে নেয়। সাথে
সাথে রজনী আরও দু'পা পিছিয়ে যায়। ভীত চোখে তাকায়
হৃদয়ের দিকে।
হৃদয় স্বাভাবিক দৃষ্টিতে রজনীর দিকে চেয়ে আছে। আপাতত
রা'গের ছিটেফোঁটা তার মাঝে নেই। তার দৃষ্টি রজনীর বাদামি
চোখের মণিতে। হৃদয়কে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে
থাকতে দেখে রজনী শুকনো ঢোক গিলল কয়েকবার। জিভ
দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। তখনই হৃদয় ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করে,
“তুমি কি খেতে পছন্দ কর?”
কথাটা শুনে রজনী অবাক হলো। বোকা মেয়েটা অতশত না
ভেবে হৃদয়কে ঠান্ডা দেখে সুন্দর মতো উত্তর করল,
“লজেন্স, আমি লজেন্স খেতে খুব পছন্দ করি।”
শব্দটা হৃদয়ের পছন্দ হলো না, সাথে উদ্ভট লাগলো। সে
বিরক্তি কণ্ঠে আওড়ায়,
“হোয়াট ননসেন্স!”
রজনী হৃদয়ের কথার কি বুঝল কে জানে!
সে মাথা চুলকে বলে,
“না না আপনি ভুল ভাবছেন, আমি ননসেন্স খাইনা তো। আমি
লজেন্স খাই লজেন্স।”
কথাটা শুনে হৃদয় কি রিয়েকশন দিবে বুঝল না। বিড়বিড়
করে, “এ তো একটা পাক্কা গাধীর দাদি!
এরপর বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“তোমার মাথায় কি গোবর ভর্তি?”
রজনী মাথা উপরনিচ করে বোঝালো, “জ্বি।”
হৃদয় অদ্ভুদ কণ্ঠে বলে, “হোয়াট?”
রজনী মিনমিন করে বলে,
“গোবর থেকে তো অনেক সার হয়। আর আমার মাথায়
অনেক গোবর থেকে সার হয়ে বুদ্ধি হয়।”
হৃদয় বাকহারা হয়ে শুনলো রজনীর কথা। মনে হচ্ছে তার
সামনে পাঁচ বছরের এক বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। হৃদয়ের এতো
রা'গ লাগলো, বেচারা রা'গের চোটে ডান হাত উঠালো
রজনীকে থা'প্প'ড় মা'রার জন্য। রজনী ভ'য় পেয়ে পিছিয়ে
যায়৷ তার আগেই হৃদয় হাত সরিয়ে নেয়৷ ফোঁস করে শ্বাস
ফেলে বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “হাত পাতো।”
রজনী ভীত কণ্ঠে আওড়ায়, “কে.কেন?”
হৃদয় গম্ভীর গলায় গলায় বলে,
“লজেন্স দিব তাই।”
বোকা রজনী হৃদয়ের স্বাভাবিক কণ্ঠে বলা কথাটুকু বিশ্বাস
করে সাথে সাথে ডান হাত পাতে হৃদয়ের সামনে। হৃদয় এক
সেকেন্ডও টাইম ন'ষ্ট না করে, বা হাতের মুঠোয় রাখা ভাঙা
চেয়ারের পায়া উঠিয়ে রজনীর পেতে রাখা হাতে সর্বশক্তি
দিয়ে পরপর তিনটে বারি দেয়। কাজটা এতো অল্প সময়ে
করেছে যে রজনী তার হাতটা সরিয়ে নেয়ার সুযোগটুকুও
পায়নি। রজনী ব্য’থা পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। বাচ্চাদের মতো শব্দ
করে কেঁদে দেয়। বা হাত দ্বারা ডানহাত বুকে চেপে কাঁদতে
কাঁদতে হৃদয়ের দিকে তাকায়।
হৃদয় কান্নারত রজনীর দিকে রে'গে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে
বলে,
“আর একদিন এসব আধা ড্রেসে দেখলে, ডিরেক্ট হসপিটালে
পাঠাবো। ম্যানারলেস মেয়ে কোথাকার!”
তখনই হিমি কফির মগ হাতে করে ঘরে প্রবেশ করে। কান্নার
আওয়াজে সে ব্যস্ত পায়ে ঘরে প্রবেশ করে রজনীকে এভাবে
কাঁদতে দেখে হিমি হৃদয়ের দিকে চেয়ে বলে, “কি করেছিস
ওকে?”
হৃদয় হাতের মুঠোয় রাখা চেয়ারের পায়াটি ছুঁড়ে ফেলে এগিয়ে
এসে বোনের হাত থেকে কফির মগ ডান হাতে নেয়। এরপর বা
হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে ঘাড় বাঁকিয়ে কান্নারত রজনীর
দিকে তাকিয়ে একবার কফি মগে চুমুক দেয়। এরপর উল্টো
ঘুরে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে,
“ম্যানারস শিখিয়েছি।”
হিমি ততক্ষণে রজনীর কাছে এসে রজনী হাত দেখল। দেখেই
বোঝা যাচ্ছে, নরম তুলতুলে হাতে শ'ক্ত বা'রি পড়েছে। পুরো
হাত ফুলে ফুলে উঠেছে। জায়গায় জায়গায় চিঁড়ে র'ক্ত
বেরিয়ে গেছে। হিমির মায়া লাগলো। সে এমনিতেও বুঝেছিল,
হৃদয় রজনীর ড্রেসআপ দেখেই রেগেছিল, কিন্তু তাই বলে
এভাবে মা'র'বে, এটা বোঝেনি। সে রজনীকে সান্ত্বনা দিয়ে
বলে,
“কাঁদে না বোন। ওর বিচার আমরা সবাই মিলে করব।
আমাদের বাড়ির বউয়ের গায়ে হাত তুললে এর অনেক
শা'স্তি।”
কান্নার মাঝে রজনী হিমির কথা শুনলো না বোধয়। এতো
জোরে মা'র তো সে তার বাপের জন্মে খায়নি। বাবার হাতে কি
একটু থা'প্প'ড় খেয়ে কত অভিমান করেছিল। আর এখানে
এসে বাইরের মানুষ তার হাত পুরো কে'টে দিল! বেচারি
ফোঁপাতে ফোঁপাতে আওড়ালো,
“আব্বা আমি আর পালাবো না। আমাকে এখানে থেকে নিয়ে
যাও।”
কথাটা বলতে বলতে রজনী ঝাপসা চোখে দরজার দিকে
তাকায়। হৃদয় মাত্র দরজা ক্রোস করবে তখনই সে কান্নামাখা
গলায় শব্দ করে বলে ওঠে,
“নিজে খালি গায়ে থেকে, সব খুলে ন'ষ্ট জিনিস দেখাতে চেয়ে
আমাকে এসে মা'রে। নির্দয় ব্যাটাছেলে।”
কথাটা শুনতেই হিমি কেশে ওঠে। এ কি রে! মেয়েটা বলে কি!
এদিকে রজনীর কথাটা কানে আসতেই হৃদয়ের পা থেমে
যায়। চোয়াল শ'ক্ত হয় ছেলেটার। একে তো নিজের বডি পুরো
দুনিয়া দেখিয়ে এসেছে, এটা ভাবলেই রা'গে মাথা ফে’টে
যাচ্ছে। আর এখন তার বড় আপুর সামনে উল্টাপাল্টা বলছে।
শ'ক্ত হাতে কফির মগ চেপে ধরে হৃদয় সাথে সাথে উল্টো ঘুরে
রজনীর দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায়।
হৃদয়কে এদিকে তাকাতে দেখে রজনী ভ'য় পেয়ে যায়।
মেয়েটা হিমির আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করে। কাঁদতে কাঁদতে
আওড়ায়,
“আমি আর মা'র খাবো না আপা। আমি বাড়ি যাবো।”
চলবে........ |
0 Comments