![]() |
লেখক:সানজিদা আক্তার মুন্নীপর্ব:০৪------------------------ওয়াহেজের আচমকা ধমকটা চাবুকের মতো আছড়েপড়ে আনভির আত্মসম্মানে। মুহূর্তেই লজ্জায় আরঅপমানে কানদুটো গরম হয়ে ওঠে তার। ছিঃ! এভাবেকেউ ধমক দেয়? তবে লজ্জাটা মুহূর্তেই রাগে পরিণত হয়।
হাতের কাছে ওয়াহেজের কোটটা সেটা সজোরে ছুড়েমারে আবারো বিছানায়।ছুড়ে মেরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়ওয়াহেজের দিকে তারপর কণ্ঠে একরাশ ঝাঁঝ নিয়ে কড়াগলায় বলে ওঠে,"এত 'খাড়ুস' কেন আপনি? কেন সবসময় এমন করেকথা বলেন? দেব না হাত আমি একদম দেব না। আরআপনার মতো এমন একটা 'পান্ডা'র স্ত্রী হয়ে থাকারকোনো শখ আমার নেই!"কথাগুলো একদমে বলেই হনহন করে সোফার দিকেএগিয়ে যায় আনভি। ব্লাংকেটটা টেনে নিয়ে ধপ করেশুয়ে পড়ে সোফায়।আনভির এমন তড়াক তড়াক কথা আর আচমকাআক্রমণাত্মক আচরণে ওয়াহেজ প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকাখেয়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে সে। তারপরকপালে হাত ঘষে বিড়বিড় করে বলে,"সারাটাদিন জনগণের গালি খেয়ে ঘরে ফিরলাম একটুশান্তির জন্য, আর এখানে এসেই শুনতে হচ্ছে আমি নাকি'পান্ডা'! যাক বাবা, রিলাক্স ওয়াহেজ, রিলাক্স।"একটু শান্ত হয়ে নিজের মনেই আবার স্বীকার করে নেয়সে, "আসলে ধমকটা বোধহয় একটু বেশিই জোরে দিয়েফেলেছি।"ওদিকে সোফায় শুয়ে চোখ বুঁজে ফেলে আনভি। বুকচিরে বেরিয়ে আসে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস। অভিমান আরঅসহায়ত্ব নিয়ে মনে মনে সে নিজেকে সঁপে দেয়ওপরওয়ালার কাছে,'সব তোমার হাতে রাব্বুল আলামিন।তুমি চাইলেই আমারএই এলোমেলো জীবনটা সুন্দর হতে পারে। একমাত্রতোমার দয়াতেই তা সম্ভব।"খাওয়া শেষ করে নিজেই খাবারের ট্রে-টা তুলে নিয়েওয়াহেজ ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে কিচেনেগিয়ে ট্রে-টা রেখে আসে।দেশের প্রেসিডেন্ট সে, অথচ তারজীবনযাপনে কোনো বিলাসিতার ছোঁয়া নেই। সবকিছুইভীষণ পরিমিত, ছিমছাম। এই বিশাল বাড়িতে কাজেরলোকও হাতেগোনা মাত্র দুজন। নিয়ম একটাই প্রেসিডেন্টহও বা যেই হও, নিজের ছোটখাটো কাজগুলোনিজেকেই করতে হবে।সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে কপালে চিন্তার ভাঁজপড়ে ওয়াহেজের।পাকিস্তানের সাথে শেল্টার নিয়ে একটাচুক্তিতে গিয়েছে কিন্তু জনগণ এই বিষয়টা কীভাবে নেবে,সেই চিন্তায় জান যায় যায় অবস্থা। কোনো একটা সিদ্ধান্তনিলেই হাজারটা ঝামেলা এসে জোটে, পিছু ছাড়ে না।চিন্তিত মুখে রুমে ঢুকে একনজর সোফার দিকে তাকায়ওয়াহেজ। আনভি পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাঁথা মুড়ি দিয়েশুয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখেই ওয়াহেজের ভ্রু কুঁচকে যায়মনে মনে ভাবে, 'নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে ফোন ঘাঁটছে,তাই এভাবে চোরের মতো লুকিয়ে আছে।'এই ভেবে ওয়াহেজ রুমের মেইন লাইটটা অফ করে দিয়েআবছা অন্ধকারে বিছানায় উঠতে উঠতে গলার স্বর চড়াকরে বলে,"শোনো, এই ঘরে থাকতে হলে এত রাত পর্যন্ত ফোনঘাঁটাঘাঁটি করা যাবে না। কড়া নিষেধ কিন্তু দিয়ে দিলাম।"ওয়াহেজের কথা শুনে কাঁথাটা মুখের ওপর থেকেএকঝটকায় সরিয়ে দেয় আনভি। তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেওয়াহেজের দিকে তাকিয়ে সে বলে,"চোখ কি সতেরোটা সঙ্গে নিয়ে চলেন নাকি আপনি? নাদেখেই সব বুঝে ফেলেন?"ওয়াহেজ বিছানায় উঠে বালিশে মাথা রাখতে রাখতেবেশ ভাব নিয়ে টোন কেটে বলে,"চোখ সতেরোটা হোক আর আঠারোটা যা বোঝার আমিবুঝেছি। ফোন রেখে দাও, এখন এত রাতে ফোনচালানোর কোনো প্রয়োজন নেই।"আনভি এবার চরম বিরক্তি নিয়ে বলে ওঠে,"আজব তো! আমি ফোন চালাচ্ছিই না।খামাখা এত কথা কেন বলতে হবে?"আনভির গলার আত্মবিশ্বাস দেখে ওয়াহেজ পাশ ফিরেভালো করে তাকায়। আবছা আলোয় খেয়াল করে দেখে,সত্যিই তো, মেয়েটার হাতে কোনো ফোন নেই। সে শুধুশুয়েই ছিল। এ দেখে মুহূর্তেই চুপসে যায় ওয়াহেজ।নিজের ভুল বুঝতে পেরে ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।আপন মনে মনে জিভ কেটে ভাবে, 'ইশশ! বারবারপ্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যাচ্ছে এই মেয়ের কবলে পড়ে।হুটহাট কিছু না দেখেই বলতে যাওয়াটা ঠিক হয়নি।'লজ্জা ঢাকতে আর কোনো কথা বাড়ায় না সে।ধীরে ধীরেচোখ বুঁজে নেয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলে,'আল্লাহই ভালো জানেন আগামীকাল আমার জন্য কীঅপেক্ষা করছে।'ঘড়ির কাটায় রাত এখন চারটে ছুঁই ছুঁই। চারদিক নিস্তব্ধহয়ে আছে। ওয়াহেজ তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করেজায়নামাজেই বসে আছে, কিন্তু তার মনটা আজকিছুতেই স্থির হচ্ছে না। বারবার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে সোফারদিকে আনভি এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।ওয়াহেজের বুকের ভেতরটা কেমন খচখচ করছে। সেমনে মনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এই বুঝি আনভিউঠবে, অজু করে তার পাশে নামাজে দাঁড়াবে। কিন্তু কই!মেয়েটার তো ওঠার নামগন্ধও নেই। এমনকি কোনোঅ্যালার্মও বাজছে না। ওয়াহেজের ভুরু কুঁচকে আসে।তবে কি আনভি তাহাজ্জুদ পড়ে না?ওই একদিনই কি শুধুপড়েছিল? নানা প্রশ্নে মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। নাহ আরভাবতে পারছে না ওয়াহেজ। সে ধীরলয়ে জায়নামাজছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পা টিপে টিপে এগিয়ে আসে আনভিরশিয়রে। আনভির সামনে দাঁড়িয়ে একরাশ সংকোচ গ্রাসকরে তাকে। বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে কীভাবেডাকবে তাকে? গায়ে হাত দিয়ে ডাকবে নাকি দূর থেকেইআওয়াজ দেবে? এসব ভেবে বেশ কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়েথাকে ওয়াহেজ। অবশেষে সাহসে ভর করে সে হালকাঝুঁকে আনভির মুখের ওপর থেকে কাঁথাটা আলতো হাতেসরিয়ে দেয়। খুব মোলায়েম স্বরে ডাক দেয়,"এই মেয়ে উঠবে না? নামাজ পড়বে না?"একবার, দুবার টানা চারবার ডাকার পর পঞ্চমবারেআনভির কপালে ভাঁজ পড়ে। খুব কষ্টে চোখের পাতাদুটোএকটুখানি ফাঁক করে সে। ঘুমের ঘোর এখনো কাটেনি,সেই নিভু নিভু চোখে ওয়াহেজের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্টস্বরে জিজ্ঞেস করে,"কিসের নামাজ?"ওয়াহেজ আনভির চোখের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করেউত্তর দেয়,"তাহাজ্জুদের।"আনভি এখনো পুরোপুরি সজাগ নয়। মস্তিষ্কে ঘুমের প্রবলরেশ। তাই সে আধবোজা চোখেই বিড়বিড় করে বলে,"আমার নামাজ নেই এখন পড়ব না।"বলেই সে পাশ ফিরে আবার কাঁথাটা টেনে মুড়ি দিয়েশুয়েপড়ে। আনভির কথা শুনে ওয়াহেজ মুহূর্তের জন্য থমকেযায়। কানদুটো কিছু গরম হয়ে ওঠে তার। একি কথাশুনল সে! মেয়েটা ঘুমের ঘোরে কী নির্দ্বিধায় বলে দিলকথাটা! যদিও বিষয়টিতে লজ্জার কিছু নেই, এটিনিতান্তই স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক একটি ব্যাপার তবুওওয়াহেজের কেন জানি ভীষণ অস্বস্তি আর লজ্জালাগছে। নিজের বোকামির কথা ভেবে সে দ্রুত পায়েসেখান থেকে সরে যায়। মনে মনে ভাবে, কেন যে আগবাড়িয়ে ডাকতে গেল! ধ্যাত।চলবে.......... |

0 Comments