লেখক:DRM Shohag পর্ব:১২
----------------------------
নীতি এশার নামাজ পড়ে এগিয়ে এসে মাত্র বেলকনির
দরজা আটকানোর জন্য দরজায় হাত রাখে। তখন-ই
কোনোকিছুর শব্দ পেয়ে সে থেমে যায়। কয়েক সেকেন্ডের
মাথায় মৃদু আলোয় রজনীর কান্নারত মুখ ভেসে ওঠে।
রজনী দৌড়ে এদিকেই আসছে। মেয়েটার গায়ে ওড়না
নেই, চুল খোলা, চোখেমুখে অসম্ভব ভীতি। রজনীর এই
অবস্থা দেখে নীতি বিস্মিত হয়। ভাবনার মাঝেই রজনী
বেলকনি পেরিয়ে ঘরের দরজার কাছে নীতির সামনে
এসে দাঁড়ায়। চোখের পলকে নীতিকে শক্ত করে জড়িয়ে
ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। নীতি অবুঝ শিশুর মতো কিছুক্ষণ
দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ কি হলো মেয়েটার? এইতো কিছুক্ষণ
আগে নিজের বাড়ি যাবে এখান থেকে বেরিয়ে গেল, আর
এখন ফিরে এলো এভাবে। নীতি তার ভাবনা রেখে
রজনীর পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,
সব গুলো পর্বের লিঙ্ক
“কি হয়েছে পাখি? এভাবে কাঁদছিস কেন? আর তোর এই
অবস্থা কেন?”
রজনী সময় নিয়ে নিজেকে সামলায়। নীতিকে ছেড়ে
দাঁড়ায়। ফোঁপানির মাত্রা কমে এসেছে। থেমে থেমে বলে,
“আমার না কার সাথে যেন বিয়ে হয়ে গেছে রে নীতি।
এখন আমার কি হবে?”
রজনীর কথা শুনে নীতির মনে হলো তার মাথার উপর
বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। বিস্ময় কণ্ঠে আওড়ায়,
“মানে?”
রজনী কয়েকবার হেঁচকি তুলল। এরপর একে একে সব
ঘটনা খুলে বললে নীতি হতবাক হয়ে যায়। অবাক স্বরে
বলে,
“কিছু না জেনে না চিনে ঠাস করে তাকে বিয়ে করে নিলি
কেন, তুই কি পা'গ'ল? বুদ্ধি হবেনা তোর?”
রজনী নীতির কথায় রেগে বলে,
“আমি সাধে বিয়ে করেছি? গ্রামের মানুষদের চিনিস না
তুই?”
রজনীর কথায় নীতি নিভে গেল। বিভ্রান্ত হয়ে বলল, “শুধু
ছেলের নামটাই বলতে পারছিস। কিন্তু এই শাহরিয়ার
নামে তো এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ আছে।
শধুমাত্র নাম দিয়ে কি আর মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়?”
রজনী মলিন গলায় বলে,
“তাহলে কি আমি তাকে খুঁজে পাবো না?”
নীতি চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“তাকে খুঁজে কি করবি? সংসার করবি না-কি?”
রজনী বাচ্চাদের মতো মাথা উপর-নীচ করে বলে,
“হু করব।”
রজনীর কান্ডে নীতি শব্দ করে হেসে দেয়। রজনী রে'গে
তাকায়। নীতি হাসতে হাসতেই বলে,
“সেই ছেলে মদখোর, গাঁজাখোর, আধপা’গ’ল হলেও
তার সাথে সংসার করবি?”
রজনী উত্তরে বলে,
“উনি মনে হয় তেমন নয়। কি যেন খুব সুন্দর করে পড়তে
পারে। ওই যে তুই মাঝে মাঝে পড়িস।”
নীতি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। সে আবার কি পড়ে? বই ছাড়া
তো আর কিছু পড়েনা। কিছু একটা মনে আসতেই চট
করে বলে,
“কুরআন পড়ার কথা বলছিস?”
রজনী ব্যস্ত কণ্ঠে বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ ওটাই। খুব সুন্দর করে
বলছিল। তোর থেকেও সুন্দর।”
নীতি হতাশ চোখে রজনীর দিকে চেয়ে রইল। মেয়েটা
কেমন অদ্ভুত হলে সামান্য কুরআনের নামটা পর্যন্ত বলতে
পারেনা, পড়তে পারা তো দূর। তবে নীতির এই কথা শুনে
ভালো লাগলো যে, ওই শাহরিয়ার নামের ছেলেটা না-কি
কুরআন পড়েছে সুন্দর করে। তার মানে ছেলেটা হয়তো
বেশ ধার্মিক। নীতির বেশ লাগলো। ওরকম ছেলে তো
রজনীর জন্য একদম ফরজ বলা যায়। সে দু’হাতে
রজনীর ভেজা গাল মুছে দিতে দিতে বলে,
“চিন্তা করিস না। আমি আর তুই তোর অদেখা স্বামীকে
ঠিক খুঁজে বের করব, বুঝলি?”
রজনী আনমনা হয়৷ তার বুকের ভেতর কেমন যেন
লাগছে। ওই ছেলেটাকে তার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে।
একবার কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কি সুন্দর করে কুরআন
পড়ে, রজনীর আবারও শুনতে ইচ্ছে করছে। কয়েক
ঘণ্টার ব্যবধানে হঠাৎ একটি অচেনা অদেখা ছেলের প্রতি
এহেন অনুভূতি রজনীকে তীব্র অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।
.
.
ঘড়ির কাটা তখন রাত ৯ টার ঘরে। নিলয় মসজিদ থেকে
এশার নামাজ পড়ে এসে তাদের উঠানের পেয়ারা
গাছতলায় বসে আছে। সকাল সকাল সে হাঁটতে
বেরোনোর সময় দেখে তাদের বাড়ি আরমান নওরোজ
আর তার ছোট নাতনী হিয়া নওরোজ এসেছে। নিলয়
তাদের ফ্রেশ হওয়ার জন্য ঘরে পাঠিয়ে বাড়ির সবাইকে
ডেকে দিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে যায়। সকাল সকাল না হাঁটলে
তার শরীর ভালো লাগেনা। হাঁটতে হাঁটতে হৃদয়ের সাথে
দেখা হয়, হৃদয়ের বালুমাখা গা দেখে অবাক হয়, সাথে
তার কার্যকলাপ। ছেলেটাকে এতো টানল বাড়ি আসার
জন্য, কিন্তু ও এলো না। নিলয় আর কি করত? সে এদিক-
ওদিক হেঁটে বাড়ি ফিরে আসে। আর বাড়ি ফেরার পর
শোনে আরমান নওরোজ অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। নিলয়
তড়িঘড়ি করে তাদের ডক্টর বাড়িতে ডেকে আনে। ডক্টর
জানায়, প্রেশার হাই হয়ে গিয়েছিল। তারপর হিয়ার মুখ
থেকে শোনে আরমান নওরোজ মূলত তার প্রাণপ্রিয়
নাতির গায়ে হাত তুলেছিল। কথাটা তাদের জন্য
অবিশ্বাস্য ছিল। এরপর নিলয় হাদির কাছে কল করে
সবকিছু আরও ভালোভাবে শোনে। হাদি ততক্ষণে
নিলয়দের পাশের গ্রামে অর্থাৎ নিজ গ্রামে চলে গিয়েছিল।
এরপর থেকেই তারা কেউ হৃদয়কে ফোনে পায়নি। নিলয়
হৃদয়ের জন্য চিন্তা করছিল না, কারণ হৃদয়ের এমন ফোন
না ধরার স্বভাব আছে। তার দাদুর জন্য দুঃশ্চিন্তা হচ্ছিল।
ভদ্রলোক নাতির শোকে একেবারে নুইয়ে পড়েছিল৷ প্রায়
মিনিট ৩০ আগে নিলয়ের ফোনে ফারহানের নাম্বার থেকে
একটি মেসেজ আসে,
“কেমন বন্ধু তুই? তোর বন্ধু ম'র'ছে আর তুই নিশ্চিতে
নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিস!”
মেসেজটি দেখে নিলয়ের কপালে ভাঁজ পড়ে। হাজারো
চিন্তারা ভিড় করে। হঠাৎ ফারহানের এহেন মেসেজ, আর
হৃদয়ের লাপাত্তা ব্যাপারটি নিলয় মোটেও স্বাভাবিকভাবে
নিল না। সে দ্রুত জায়গাটি থেকে উঠে দাঁড়ায়। যেভাবে
ছিল সেভাবেই ব্যস্ত পা চালায় বাড়ির বাইরের দিকে।
কয়েক পা এগোতেই সামনে হৃদয়কে দেখে নিলয়ের পা
থেমে যায়। উঠানের চারিদিকে প্রায় চারটি লাইট আছে,
যেখান থেকে প্রতিফলিত হয়ে তীব্র আলো চারপাশে
ছড়িয়ে পড়ছে। তার মাঝে হৃদয় দাঁড়িয়ে আছে। ফলস্বরূপ
হৃদয়কে একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চোখমুখের অবস্থা
বিধ্বস্ত। মাথার চুল এলোমেলো। চোখ দু'টো টকটকে
লাল। গায়ে বসা বালুকণা শার্টের ফাঁক দিয়ে চিকচিক
করছে। দু'হাত র'ক্তে ভরে আছে। যা এখনো শুকায়নি।
নিলয় শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“ফারহান তোর সাথে কি করেছে?”
নাম শুনে হৃদয় বিন্দুমাত্র অবাক হলো না। তবে সে উত্তর
করার প্রয়োজনবোধ করল না। নিলয়কে পাশ কাটিয়ে
বাড়ির ভেতর যেতে নিলে নিলয় ব্যস্তপায়ে হৃদয়ের পিছু
পিছু যায় আর বলে,
“দেখ হৃদয় মুখে কুলুপ এঁটে থাকবি না। মেজাজ খারাপ
লাগে বলে দিলাম। তুই সারাদিন কোথায় ছিলি? ফারহান
আমাকে মেসেজ করেছে। ও তোর সাথে কি করেছে?”
হৃদয় পায়ের জুতো খুলতে খুলতে গম্ভীর গলায় বলে,
“বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।”
উত্তরটা শুনে নিলয় তব্দা খেয়ে যায়। হৃদয়ের অবস্থা
দেখে ভেবেছিল হৃদয় কথা বললে খুব সিরিয়াস কিছু-ই
বলবে। কিন্তু এ কি বলছে?
হৃদয় জুতো খুলে ভেতরে প্রবেশ করার আগে ডানদিকে
একবার ঘাড় ফেরালে চোখ আটকায় পুকুর পাড়ে
দাঁড়ানো মাটি ছুঁইছুঁই চুলের অধিকারী এক মেয়ের দিকে।
মেয়েটির পরনের জামাটি চিনতে হৃদয়ের বিন্দুমাত্র সময়
লাগলো না। হৃদয় সেদিকে তাকানোর আগেই ডান পা
বাড়িয়েছিল বাড়ির ভেতর প্রবেশ করার জন্য, সেই পা
পিছিয়ে আনে। নিলয়কে পাস করে খালি পায়েই ব্যস্ত হয়ে
পুকুর পাড়ের দিকে এগোয়। হৃদয়ের এহেন কান্ডে নিলয়
অবাক হয়। এ শা'লার হয়েছে টা কি? সকাল থেকে বালু
গায়ে মেখে ঘুরছে, যা এই জীবনে হয়নি আর এখন খালি
পায়ে বাইরে ছুটছে। সে সত্যিই কনফিউজড হয়ে যাচ্ছে
এটা তাদের বন্ধু হৃদয় কি-না!
হৃদয় মেয়েটির কাছে পৌঁছানোর আগেই মেয়েটি সেখান
থেকে দৌড় দেয় বাড়ির পিছন দিকে। হৃদয় আরও দ্রুত
পা চালায়। গলা চড়িয়ে বলে,
“হেই, স্টপিট!”
কারো গলা পেয়ে রজনী ভ'য় পেয়ে দৌড়ের গতি বাড়ায়।
কিছু একটার সাথে চুল আটকে যাওয়ায় রজনী দ্রুত
সামান্য পিছু ফিরে দু’হাতে তার লম্বা চুল ধরতে টানতে
থাকে। সামান্য এদিক মুখ ফেরানোয় উঠানের আলোর
ছিটেফোঁটা রজনীর মুখে এসে পড়ে। জ্বলজ্বল করে ওঠে
রজনীর কান্নামাখা মুখ। যে দৃশ্য দেখে হৃদয়ের পা থেমে
যায়। মনে হলো থেমে গিয়েছে তার হৃৎস্পন্দনের গতি।
স্থির হয়ে যায় চক্ষুদ্বয়।
ততক্ষণে রজনী তার চুল ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে নীতির
ঘরের বেলকনি পেরিয়ে রুমের ভেতর গিয়ে ঠাস করে
দরজা বন্ধ করে দেয়। আজ এই বাড়ির কেউ তাকে দেখে
নিলে কি হত? কথাটা ভাবতেই থরথর করে কেঁপে ওঠে
মেয়েটা।
ওদিকে হৃদয় তখনো স্তব্ধ হয়ে সেই একই জায়গায়
দাঁড়ানো। দৃষ্টি নীতির অন্ধকার বেলকনির দিকে। অদ্ভুত
এক অনুভূতি ঘিরে ধরেছে তাকে। যে অনুভূতিতে য’ন্ত্র’ণার
পরিমাণ এতো বেশি যে হৃদয়ের মনে হলো, তার বুকের
হাড়গোড় সব নিমিষেই ভেঙে গুড়িয়ে যাবে। মনে হলো
তার পায়ের তলা থেকে ধীরে ধীরে মাটি সরে যাচ্ছে।
চোখদু'টো বুজে আসছে। এতো এতো ধকল পেরিয়েও
যেই হৃদয় এতক্ষণ শ'ক্ত পাহাড়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে ছিল, সেই
হৃদয় নিমিষেই যেন ভেঙে পড়ল। দুর্বল শরীর আপনা-
আপনি পিছনদিকে দু'পা চলে যায়, হৃদয় ডান হাত
বাড়িয়ে দ্রুত একটি গাছ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। তখনই
পিছন থেকে নিলয় দৌড়ে এসে সাপ্টে ধরে হৃদয়কে। ব্যস্ত
কণ্ঠে বলে,
“আরে আরে কি হলো তোর? ঠিক আছিস?”
হৃদয় মাথা নিচু করে চোখ বুজে ঘনঘন শ্বাস ফেলছে।
নিলয় চারপাশে তাকায়। কাউকে দেখতে পায় না। কপালে
ভাঁজ তার। হৃদয় কাকে যেন একটা স্টপিট বলল। আবার
কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে। একে আবার কোনো
পরী টরী ধরল না তো?
ভাবনার মাঝেই হঠাৎ করেই হৃদয় গায়ের জোরে
নিলয়কে একটা ধাক্কা দেয়৷ নিলয় পড়তে পড়তে বেঁচে
যায়। সে কিছু বলার আগেই হৃদয় চিৎকার করে বলে,
“আমি বলেছি না, আমি ম'রে গেলেও আমাকে টাচ
করতে আসবি না কেউ? তোদের আল্লাহ আমার জীবন
জা’হা’ন্না’ম বানিয়ে তোদের পাঠিয়ে কোন বা’লের সান্ত্বনা
দেয়!”
হৃদয়ের কথা শুনে নিলয় বিস্ময় চোখে তাকায়। হৃদয়ের
মুখে এহেন কথা সে কখনো আশা করেনি। নিলয়ের
অবাক কণ্ঠ,
“হৃদয়? কাকে নিয়ে কমেন্ট করছিস তুই? ভেবে
বলছিস?”
জ্বলতে থাকা হৃদয় হঠাৎ নিভে যায়। শুকনো ঢোক গিলে
মাথা তুলে তাকায় জোৎস্নামাখা আকাশের দিকে। অস্পষ্ট
স্বরে আওড়ায়, “স্যরি আল্লাহ!
একটু থেমে আবারও বলে,
এবার আমি ওকে কিভাবে তালাক দিব?”
ততক্ষণে নিলয় হৃদয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হৃদয়ের
কথা শুনে নিলয় অবাক হয়। কথার অর্থ বোঝেনা।
ছেলেটাকে ভীষণ ডিস্টার্ব লাগছে। কি হয়েছে এর? সে
কিছু বলতে নেয়, তার আগেই হৃদয় নিলয়কে পাশ
কাটিয়ে বাড়ির দিকে যেতে যেতে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“আমার পছন্দের মেয়ের সাথে আমার বিয়ে হয়ে
গিয়েছে। ইট'স ট্রু নিলয়।”
কথাটা শুনে নিলয় হতভম্ব, বিস্মিত, স্তব্ধ হয়ে যায়।
হৃদয়ের পছন্দের মেয়ে ব্যাপারটা তার ঠিক হজম হচ্ছে
না। আবার তার সাথে না-কি হৃদয়ের বিয়েও হয়ে
গিয়েছে। কিছুই বলল না সে। বিস্ময় চোখে কেবল
হৃদয়ের প্রস্থান দেখল ছেলেটা। হৃদয়ের কথাটুকু হজম
করতেই তার অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
___________________
হৃদয় ঘরে এসে সর্বপ্রথম শাওয়ার নিয়ে দুই ওয়াক্তের
কাজা নামাজসহ এশার নামাজ আদায় করে নেয়। এরপর
বাড়ির বাইরে উঠানে বেরিয়ে আসে। নিলয়ের মা হৃদয়কে
খেতে ডাকল কয়েকবার। কিন্তু হৃদয় শুনল না। সে ছোট
করে জানায়, ‘ক্ষুধা নেই আন্টি।’
নীতি মিনিট পাঁচ আগে তার ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে
এসে ঘুরঘুর করছে। এর কারণ রজনী তখন পুকুর পাড়ে
এসেছিল, ঘরে তার দমবন্ধ লাগছিল বলে। কিন্তু এখানে
আসার পর বেচারীকে নাকি কে যেন দেখে নিয়েছে।
রজনী ভীষণ ভয় পেয়েছে। এজন্য নীতি বাইরে এসে
বোঝার চেষ্টা করছে, রজনীকে তাদের বাড়ির আসলেই
কেউ দেখেছে কি-না! হঠাৎ-ই হৃদয়ের কণ্ঠে নীতি ঝাঁকি
দিয়ে উঠে একদম সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মায়ের ডাকাডাকি,
কথাবার্তায় নীতি জানতো, হৃদয় তাদের বাড়ি এসেছে,
তাই তাকে দেখে অবাক হলো না।
হৃদয় জিজ্ঞেস করে,
“কিছুক্ষণ আগে পুকুর পাড় থেকে লম্বা চুলের এক মেয়ে
তোর ঘরে প্রবেশ করেছে। মেয়েটি তোর কে হয়?”
হৃদয়ের কথা শুনে নীতি শুকনো ঢোক গিলল। তার মানে
রজনীর ওটা মনের ভুল ছিল না। রজনীকে সত্যিই কেউ
দেখেছিল, আর সেই কেউ টা হৃদয় ভাই। নীতি কি বলবে
বুঝতে পারছে না। তার ভাইয়ের হবু বউ রজনী, যে বিয়ের
আসর ছেড়ে পালিয়েছিল তার ভাইকে বিয়ে করবে না
বলে। আর সেই মেয়েকেই নীতি সবার আড়ালে তার ঘরে
আশ্রয় দিয়েছে, এ কথা এই বাড়ির কেউ জানলে তাকে
সবাই মিলে বোধয় জ'বা'ই করে ফেলবে। নীতিকে চুপ
দেখে হৃদয় ধমকে ওঠে,
“কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি।”
নীতি ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। থেমে থেমে বলে,
“ও আ.আমার ফ্রেন্ড হৃদয় ভাই।”
হৃদয়ের গম্ভীর কণ্ঠ, “নাম কি?”
নীতি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মিথ্যে বলতে নেয়, তার
আগেই হৃদয় শক্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,
“মিথ্যে বললে কানের গোড়ায় গুনে গুনে দশটা থা'প্প'ড়
লাগাবো। শেষে নিলয় বয়রা ব....”
হৃদয় থেমে গেল৷ নীতি প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায় হৃদয়ের
দিকে। নিলয়ের ব্যাপারে কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল।
হৃদয় গলা ঝেড়ে ধমকে বলে,
“এমন হ্যাবলার মতো চেয়ে না থেকে যা জিজ্ঞেস করেছি,
তার আন্সার কর, ফাস্ট।”
নীতি ঢোক গিলল। হৃদয় ভাই খুব চালাক। মিথ্যা বলা
যাবে না। তবে তার ভাইয়ের ব্যাপারে হৃদয় কিচ্ছু জানেনা,
বিয়ের সময় ছিল-ও না। সবচেয়ে বড় কথা, হৃদয়ের তার
ভাইকে নিয়ে বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই, বলা যায় তার
ভাইকে পছন্দ করেনা। তবে নীতি হৃদয়কে তার নিজের
ভাইয়ের জায়গাটাই দিয়েছে। সেই কত ছোট থেকে তাকে
বোনের মতো আদর করে। নীতিও ভাইয়ের আদর নিতে
ছোট থেকে হৃদয়ের কাছে যেত। সবমিলিয়ে নীতি ভাবল
রজনী নাম বললেও হৃদয় ভাই রজনীকে চিনবে না। আর
তাই সে উত্তরে বলে, “রজনী।”
হৃদয় ডান হাতে গাল চুলকে বলে,
“ওহ, আই সি! ফেইক নাম হৈমন্তিকা, রাইট?”
কথাটা শুনতেই নীতি চমকে তাকায় হৃদয়ের দিকে।
রজনীর এই নাম হৃদয় ভাই জানলো কিভাবে? এই নাম
তো রজনীর বাবা মা ছাড়া একমাত্র সে জানে। তবে?
বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“নাহ্ হৃদয় ভাই। এটা ওর আরেকটা নাম। কিন্তু ওর এই
নাম তুমি কিভাবে জানলে হৃদয় ভাই?”
নীতির কথায় হৃদয়ের মুখটা থমথমে হয়ে যায়। কয়েক
সেকেন্ড গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু ভাবলো। এরপর
হৃদয় আশেপাশে তীক্ষ্ণ চোখ বুলিয়ে বলে,
“যেভাবে জানার জেনেছি। সাথে এটাও জেনেছি তোর
ফ্রেন্ড একজনকে বিয়ে করে তার গলায় ঝুলে পালিয়ে
এসেছে।”
নীতি অবাকের উপর অবাক হয়। হৃদয় ভাই তো সবই
জানে মনে হচ্ছে। সে আর রজনী রজনীর সেই অদেখা
স্বামীকে খুঁজছে। হৃদয় ভাই সেই ছেলেকে চিনলে তো
ভালোই হবে। অতঃপর নীতি বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“তুমি কি সেই ছেলেটাকে চেনো হৃদয় ভাই? চিনলে তার
ঠিকানাটা একটু দিবে?”
হৃদয় নীতির বেলকনির দিকে নজর করে। বেলকনির
আড়ালে রজনী দাঁড়ানো। যার ছায়া বেলকনির
অপরপাশে পড়েছে। হৃদয় রজনীর সেই ছায়ার দিকে
চেয়ে গলা উঁচিয়ে বলে,
“হুম সব জানি। তোর ফ্রেন্ডকে বল স্বামী সেবার ট্রেনিং
নিতে। যেদিন হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেস হবে সেদিন ভেবে
দেখব তার ঠিকানা দেওয়া যায় কি-না! তাছাড়া সে অত্যন্ত
সুশীল ছেলে, তোর বে'য়া'দ'ব ফ্রেন্ডের সাথে ওকে ঠিক
যায় না। তবুও আমি ছেলেটিকে বুঝিয়ে বলব, দেখা যাক
কতটুকু কাজ হয়।”
হৃদয়র কথা শুনে নীতি কি বলবে বুঝল না। হৃদয়ের কথা
শুনে মনে হচ্ছে, হৃদয় রজনীকে চেনে। কিন্তু সেটা কিভাবে
সম্ভব? নীতির সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। হৃদয় নীতির
উদ্দেশ্যে বলে,
“ভেতর থেকে একটা চেয়ার এনে দে।”
নীতি মাথা নেড়ে দ্রুতপায়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়।
নীতির ঘরে মূলত দু’টো বেলকনি। একটি বাড়ির
পিছনদিকে। আরেকটি পুকুরের দিকে। পিছনের
বেলকনিতে গ্রিল না থাকলেও এই বেলকনিতে গ্রিল
আছে। আর রজনী এখন পুকুরের পাশের বেলকনিতেই
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হৃদয় আর নীতির কথা শুনছিল। হৃদয়
যে নীতিদের এতো ঘনিষ্ঠ এটা সে নীতির মুখে কিছুক্ষণ
আগে শুনেছে। নীতিই গল্প করছিল। মেয়েটা ভীষণ
অবাক হয়েছে। আর এখন হৃদয়ের মুখে যখন শুনল,
হৃদয় তার স্বামীকে চেনে তখন মেয়েটি ভীষণ খুশি হয়।
কিন্তু শেষে হৃদয়ের বলা বে'য়া'দ'ব কথাটায় রজনীর রাগ
হয়। গতকাল রাতে ট্রেনে এই লোকটা তাকে কতগুলো
থা'প্প'ড় মে'রে আবার তাকেই বে'য়া'দ'ব বলছে। কি
খারাপ লোক দেখ! শব্দ করে আওড়ায়,
“খাটাশ ব্যাটাছেলে!”
নীতি ভেতরে গেলে হৃদয় কয়েক পা এগিয়ে এসে রজনী
বরাবর দাঁড়িয়েছিল৷ রজনীর বলা কথাটা শুনে তার
বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে কথাটা তাকেই বলা হয়েছে।
অতঃপর সে উত্তর করে,
“শার্টলেস পরপুরুষকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার হ্যাবিট
কোথায় পেয়েছ বে'য়া'দ'ব বেটিমেয়ে?”
হৃদয়ের কথা কানে যেতেই রজনীর চোখের আকার বড়
হয়ে যায়। মেয়েটি এখানে আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে
দৌড়ে ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজা আটকে দেয়। শব্দ
পেয়ে হৃদয় বিরক্ত চোখে তাকায় বন্ধ দরজার দিকে।
তখনই নীতি হৃদয়ের পাশে চেয়ার রেখে বলে,
“হৃদয় ভাই তোমার চেয়ার।”
হৃদয় ঘাড় ফিরিয়ে চেয়ারটি নিয়ে পুকুরের পাড়ের দিকে
এগিয়ে যায়। নীতি হৃদয়ের দিকে চেয়ে বলে,
“হৃদয় ভাই, দাদু তোমাকে ডাকছে।
হৃদয়ের সাড়া নেই। নীতি আগের চেয়েও গলা উঁচিয়ে
আবারও বলে,
দাদু বলেছে, শুধু একবার তোমাকে দেখবে।”
এবারেও হৃদয়ের কোনো সাড়া নেই। নীতির কথা শুনলেও
তার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। নীতির খারাপ লাগে।
দাদু সবসময় কত শ'ক্ত থাকে। তাদের গ্রামে আসলে
সবাইকে নিয়ে কত মজা করে। আর আজ এসে থেকেই
অসুস্থ। চেয়ার আনার সময় মানুষটা তাকে কাছে ডেকে
কি সুন্দর করে আবদার করল,
‘দিদিভাই আমার নাতিটাকে একবার দেখার সুযোগ করে
দিবি?’
নীতি দাদুকে আশ্বাস দিয়ে এসেছে। কিন্তু হৃদয় তো
শুনছেই না। সে আবারও বলতে নেয়,
“হৃদয় ভাই….
মাঝ থেকে হৃদয় কঠোর স্বরে বলে,
“কয়টা থা'প্প'ড় খাবি, সেটা ঠিক করে আমার সামনে
আয় দরদী বে'য়া'দ'ব কোথাকার।”
নীতি ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। তখনই সেখানে এসে দাঁড়ায়
নিলয়। হৃদয়ের উদ্দেশ্যে রে'গে বলে,
“এই তুই আমার ব….
কথাটা বলতে গিয়ে নীতির দিকে চেয়ে থেমে যায়। ধমকে
বলে,
“কি প্রবলেম? যা এখান থেকে।”
নীতি মুখ ফোলালো। এরা দুই বন্ধু কথা বলতে বলতে ব
আসলেই শুধু মাঝপথে থেমে যায়। ব্যাপারটা তার কাছে
বিরক্ত লাগে। সে মুখ ভেঙচি কেটে বাড়ির ভেতর দৌড়
দেয়।
নীতি চলে গেলে নিলয় এগিয়ে এসে হৃদয়ের পাশে
দাঁড়িয়ে বলে,
“এই বে’য়া’দ’ব তুই আমার বউকে বকলি কোন সাহসে?”
হৃদয় ভাবলেশহীনভাবে বলে,
“কোথায় লেখা আছে, নীতি তোর বউ? আগে দলিল
দেখা। এরপর বাকি কথা।”
নিলয় কটমট চোখে তাকালো। এ শা'লা এক নাম্বার
কু'ত্তা। শুধু কথার প্যাঁচে ফেলে। এদিকে হৃদয় চেয়ারে
বসে ডান পা বা পায়ের উপর তুলে রাখে। এরপর প্যান্টের
দুই পকেট থেকে পাঁচটি সিগারেট এর প্যাকেট বের করে
বা পায়ের উরুর উপর সাজিয়ে রাখে। এক প্যাকেট থেকে
একটি সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে রেখে নিলয়ের
উদ্দেশ্যে বলে,
“লাইটার দে।”
নিলয় থমথমে মুখে তাকায় নিলয়ের উরুর উপর সাজিয়ে
রাখা সিগারেট এর প্যাকেটগুলোর দিকে। সে হাদির
কাছে কল করে হৃদয়ের ব্যাপারে সবকিছু জেনেছে।
হাদির কাছে শুনে, হৃদয়ের পছন্দের মেয়ের ব্যাপারে আর
কোনো ডাউট নেই। আর তখন তো হৃদয় নিজের মুখেই
স্বীকার করল, সেই পছন্দের মেয়ের সাথেই হৃদয়ের বিয়ে
হয়েছে। ঘটনা কিভাবে ঘটেছে, সেটা না জানলেও কি
ঘটেছে সেটা নিলয়ের কাছে একদম পরিষ্কার। আর
এজন্য সে হৃদয়ের এমন চালচলনে আজ অবাক হলো
না। সে পকেট থেকে লাইটার বের করে হৃদয়ের দিকে
এগিয়ে দিয়ে বলে,
“আন্টি সিগারেট খাওয়া একদম সহ্য করতে পারতো না।”
হৃদয় লাইটার দ্বারা সিগারেটে আ'গু'ন ধরাতে গিয়ে এক
সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। এরপর সিগারেটে আ'গু'ন
জ্বালিয়ে লাইটার বাম পায়ের উপর রেখে বলে, “জানি।”
“তাহলে এটা খাস কেন? প্রতিদিন লিমিট রাখিস, আজ
একেবারে দোকান নিয়ে বসলি! আন্টি যদি জানত, তার
একমাত্র বাধ্য ছেলে সিগারেটখোর, তবে কত ক'ষ্ট পেত
ভাব তো!”
হৃদয় নাকমুখ দিয়ে ধৌঁয়া ছেড়ে বিদ্রুপ স্বরে বলে,
“যে আমাকে একা ফেলে পালিয়ে বেঁচেছে, তাকে একটি
ক'ষ্ট দিলে আহামরি কিছু হবে না।”
হৃদয়ের কথার পিঠে নিলয় বলে,
“তুই তোর মায়ের সব কথাই মেনেছিস। জানি এটাও
মানবি। কিন্তু কবে?”
হৃদয়ের বিরক্তি কণ্ঠ,
“সিগারেট ছাড়তে পারবো না। জ্ঞান নিজের পকেটে রেখে
এখান থেকে যা।”
নিলয় চুপ থাকলো। এ নিয়ে আর কিছু বলল না। বলেও
লাভ নেই। তবুও মাঝে মাঝেই বলা হয়। দু'হাত প্যান্টের
পকেটে রেখে লম্বা শ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে, “মেয়েটার
নাম কি রে?”
হৃদয় ছোট করে বলে, “হৈমন্তিকা।”
হৃদয়ের কণ্ঠে উৎফুল্লতা টের পেয়ে নিলয় মৃদু হাসলো৷
কিছু একটা ভেবে তা মিলিয়েও গেল। উদাস কণ্ঠে বলে,
“এজ সুন এজ পসিবল, হৈমন্তিকাকে তালাক দিয়ে দে।”
কথাটা কানে পৌঁছাতেই হৃদয়ের চোখেমুখে ক্রোধ জমা
হয়। আধখাওয়া সিগারেট হাতের মুঠোয় চেপে ধরে। দৃষ্টি
লালচে হয়ে আসে সাথে কঠোর। হৃদয়কে চুপ দেখে
নিলয় ডানদিকে ফিরে আবারো কিছু বলতে নেয়, তার
আগেই হৃদয় চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে
নিলয়ের নাক বরাবর একটি ঘুষি মে'রে দেয়। নিলয়
মোটেও প্রস্তুত ছিল না এর জন্য। বেচারা কয়েক পা
পিছিয়ে গিয়ে একটি গাছের সাথে ধাক্কা খায়। সোজা হয়ে
দাঁড়ানোর আগেই হৃদয় তেড়ে গিয়ে নিলয়কে সমানে ঘুষি
মা'র'তে থাকে। মা'র খেতে খেতে নিলয় গাছের সাথে
হেলান দিয়েই প্রায় বসে পড়েছে। সাথে হৃদয় হাঁটু গেড়ে
বসেই নিলয়কে মারছে। নিলয়ের ঠোঁটের দু'কোণ কে'টে
র'ক্ত বেরিয়ে এসেছে। ছেলেটা হৃদয়ের হাতে এতো মা'র
খেয়েও টুঁ-শব্দটিও করল না। তার চোখেমুখে বিস্ময়।
হৃদয় শেষবারের মতো নিলয়কে আরেকটি পাঞ্চ মেরে
নিলয়ের শার্টের কলার ধরে কঠোর স্বরে বলে,
“আর একদিন ওকে তালাক দেয়ায় কথা উচ্চারণ করলে
তোকে একদম জ'বা'ই করে ফেলব নিলয়।”
এতক্ষণ নিশ্চুপ থাকলেও এবার নিলয় শব্দ করে হেসে
ওঠে। মুখে একটু একটু করে জমা হওয়া র'ক্ত হৃদয়ের
দিকে ছুড়ে দেয়, যা হৃদয়ের গলায় এসে লাগে। তবে এ
নিয়ে হৃদয়ের মাঝে ভাবান্তর দেখা গেল না। সে শক্ত
চোখে নিলয়ের দিকে চেয়ে রইল। নিলয় ভালোভাবে
গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসে বলে,
“আমি তোর আর মেয়েটার ভালোর জন্যই বলছিলাম
ইয়ার।”
হৃদয় দাঁতে দাঁতে চেপে বলে,
“আমাদের এতো ভালো না ভেবে, নিজের ভালো ভাব।
কাজে আসবে। ভুলে যা নীতিকে। কারণ তুই আমি সবাই
জানি, দুনিয়া উল্টে গেলেও তুই নীতিকে পাবিনা।”
হৃদয়ের কথাটা শুনতেই নিলয়ের মুখ থেকে হাসি
মিলিয়েযায়। মুহূর্তেই চোখমুখে কঠোরতা নেমে আসে।
হৃদয় বাঁকা
হেসে উঠে দাঁড়ায়। মাটিতে পড়ে যাওয়া সিগারেট এর
প্যাকেটগুলো নিয়ে চেয়ারের উপর রেখে আরেকটি
সিগারেটে আ'গু'ন ধরিয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে গম্ভীর
গলায় বলে,
“নীতিকে ভুলে যা। আই থিংক, এটা তোর জন্য সবচেয়ে
সুন্দর পরামর্শ, অ্যাম আই রাইট নিলয়?”
নিলয় শুকনো ঢোক গিলল। তার দৃষ্টি এলোমেলো। সে
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে এলোমেলো পায়ে তার ঘরের
দিকে যেতে যেতে বিষাদ সুরে বলে,
“আমি নীতিকে পেতে অনেক বেশি স্ট্রাগল করব হৃদয়।
নীতিমালা শুধু আমারই বউ হবে। তুই মিলিয়ে নিস।”
হৃদয় সিগারেটে দু'বার টোকা দিয়ে সিগারেটের আগায়
জমা ছাই ফেলে সিগারেটটি আবারো ঠোঁটের ফাঁকে রেখে
গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“সেইম ঠু ইউ, ফর মাই প্যারট-ফ্লাওয়ার।”
কথাটা বলে হৃদয় পকেট থেকে ফোন বের করে, ফোন
ভাইব্রেট হচ্ছিল বলে। ফোন চেক করলে দেখল ফারহান
এর নাম্বার থেকে একটি মেসেজ এসেছে,
“হাদিকে সামনে রেখে তুই যে সব কলকাঠি নাড়িস, এ
কথা আমি জেনে গিয়েছি মিস্টার শাহরিয়ার। এবার
থেকে তোর জীবনের সকল সুখ কেড়ে নেয়ার দায়িত্ব নিজ
কাঁধে তুলে নিলাম। ঠিক যেভাবে তোর গা জ্বালানো বিয়ে
নামক বন্ধনে তোকে জুড়ে দিয়েছি, এভাবেই একটার পর
একটা চলবে।”
হৃদয় বাঁকা হেসে রিপ্লাই করে,
“গা জ্বালানো কাজ করিসনি, গা জুড়ানো কাজ
করেছিস। তোর জন্য দশ বালতি সমবেদনা। অ্যান্ড তোকে
মিনি থ্যাংক্স ফর মাই কট ম্যারেজ। মেরা দিল তো বহত
খুশ হ্যায় মেরে প্যায়ারে কু'ত্তে।
এক বাপের ব্যাটা হলে আমার সামনে এসে দাঁড়াবি। আর
দশ বাপের ব্যাটা হলে আড়ালে বসে এভাবেই পর্দা করবি।
কা’পুরুষের বাচ্চা পর্দাশীল মা’দারটোস্ট কোথাকার!”
___________________
ঘড়ির কাটা তখন রাত ১০ টার ঘর পেরিয়েছে। ছটফটে
রজনী আবারও ঘরে থাকতে পারেনি। নীতিকে বলে
পিছনের বেলকনি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। আড়ালে
দাঁড়িয়ে দেখে পুকুর পাড়ে আম গাছের নিচে চেয়ারে বসা
হৃদয়কে। সে হৃদয়ের কাছে তার স্বামীর খোঁজ চায়।
এজন্য হৃদয়ের সাথে কথা বলতে চাইছে। কিন্তু মেয়েটার
সাহসে কুলায় না। গতরাতে ট্রেনে লোকটা তাকে এমনি
এমনি পুরো ছয়টা থা'প্প'ড় মা'র'লো। এরপর সে কিভাবে
উনার সাথে কথা বলবে সেটাই ভাবছে। আবার ভাবছে,
উনার সাথে কথা না বললে সে তো তার স্বামীর খোঁজ
পাবে না। তাছাড়া এটা তো তার নিজের গ্রাম, এখানে
এতো ভ'য় পাবার কি আছে? রজনী সাহস করে ধীর পায়ে
এগিয়ে আসে হৃদয়ের দিকে। কয়েক পা এগিয়ে আসার
পর তার নাকে কিছু একটার গন্ধ আসে। রজনী মুখ চেপে
ধরার বদলে বড় করে শ্বাস টানে। যেন কোনো সুগন্ধি টেনে
নিচ্ছে।
বিচক্ষণ হৃদয় তার পিছনে কারো উপস্থিতি টের পায়, টের
পায় কারো বড় করে শ্বাস টেনে নেয়ার শব্দ। তবে সে
পুরোপুরি মাথা ঘোরায় না। বামদিকে সামান্য ঘাড় বাঁকিয়ে
আড়চোখে তাকালে রজনীকে চিনতে পারে।
তখনই মৃদু বাতাসে কয়েকটি শুকনো পাতা উড়ে এসে
রজনীর পায়ের কাছে পড়ে। আবছা আন্ধারে রজনী ভ'য়
পেয়ে দ্রুত উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে সামান্য নিচু হয়ে দেখার
চেষ্টা করে তার পায়ের কাছ দিয়ে কি গেল! সা'প নয়তো?
সা'প দেখে রজনীর ভীষণ করে।
ততক্ষণ হৃদয় রজনীর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। গম্ভীর দৃষ্টি
নিচু হওয়া রজনীর পানে। বাম হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে
রাখা। ডান হাতের দু'আঙুলের ফাঁকে সিগারেট, যেখানে
অনবরত একটু পর পর হৃদয়ের ঠোঁট স্পর্শ করছে।
ইতোমধ্যে তার পুরো এক প্যাকেট সিগারেট পোড়ানো
শেষ। এটা ছিল দ্বিতীয় প্যাকেটের স্টার্টিং।
হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটি মশা ভনভন করতে করতে
হৃদয়ের লোমশহীন উম্মুক্ত বুকে এসে বসে। সূঁচ ফুটিয়ে
দেয়, হৃদয় বিরক্ত হয়, তবে হাত বাড়িয়ে তাড়িয়ে দেয় না।
তার দৃষ্টি রজনীতে। কিছু ভাবছে বোধয়। কয়েক
সেকেন্ডের মাথায় গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
“সিগারেটের স্মেলে তোমার প্রবলেম হয়না?”
হৃদয়ের কণ্ঠে রজনী সাথে সাথে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে
উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। হৃদয়ের হাতের আধখাওয়া জ্বলন্ত
সিগারেটের দিকে একবার তাকায়। মিনমিন করে বলে,
“না তো। আমার সিগারেটের গন্ধ খুব ভালো লাগে।”
কথাটায় হৃদয় বিরক্ত হলেও অবাক হলো না। গত কয়েক
সেকেন্ডেই সে এটুকু আন্দাজ করে ফেলেছে। হৃদয় তার
হাতের সিগারেটটি তুলে ঠোঁটের ফাঁকে রাখে। একবার
ধোঁয়া টেনে নিয়ে ঠোঁটের ফাঁক থেকে সিগারেটটি সরিয়ে
মুখ গোল করে রজনীর মুখের উপর সিগারেটের ধোঁয়া
ছেড়ে দেয়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রজনীর মুখাবয়বে।
হৃদয়ের এহেন কান্ডে রজনী হকচকিয়ে ওঠে। তবে তার
মাঝে সিগারেটের গন্ধের জন্য বিন্দুমাত্র অস্বস্তি নেই বরং
মেয়েটি যেন সিগারেটের ধোঁয়া তৃপ্তির সাথে নিজের মাঝে
শুষে নিয়েছে। যা হৃদয় খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করে।
হৃদয়ের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। তবে
সে তার বিরক্তি চেপে হাতের সিগারেটটি রজনীর দিকে
বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলে,
“টেস্ট করে দেখ, আরও ভালো লাগবে।”
রজনী অবাক চোখে তাকায়। এই লোকটা এই কথা
বলছে? গলার স্বরটাও কি নরম! লোকটা এতো ভালো
কবে হয়ে গেল? সবচেয়ে বড় কথা হৃদয় তার মনের কথা
পড়ে নিয়েছে না-কি! রাস্তায় কেউ সিগারেট খেলে রজনী
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার গন্ধ টেনে নিত। তার আব্বা খেলে সে
তার আব্বার পাশে গিয়ে বসে। মেয়েটা ভাবত, যার গন্ধ
এতো ভালো লাগে, সেটা খেতে কতই না মজা! কিন্তু মেয়ে
হয়ে আজ পর্যন্ত এটা খাওয়ার সাহস করে উঠতে পারেনি।
সেখানে কেউ নিজে থেকে তাকে সাধলে সে অবশ্যই
ফিরিয়ে দবে না? অতঃপর বোকা রজনী সত্যি সত্যিই হাত
বাড়ায় হৃদয়ের সিগারেটটি নেয়ার জন্য। বহুদিনের ইচ্ছে
পূরণ হবে তার, ভেবে রজনী মনে মনে বেশ খুশি-ই হলো।
এদিকে রজনীকে হাত বাড়াতে দেখে হৃদয়ের চোয়াল শক্ত
হয়ে গিয়েছে। রা'গে কপালের রগ ফুলে উঠেছে। চোখ
দু'টো লালচে হয়ে এসেছে।
রজনীর হাত সিগারেট ছুঁইছুঁই তখনই হৃদয় নিজেকে
বিন্দুমাত্র না দমিয়ে বাম হাতে রজনীর ডান গালে ক'ষিয়ে
একটা থা'প্প'ড় মেরে দেয়। যেটার জন্য রজনী মোটেও
প্রস্তুত ছিল না। মেয়েটি হৃদয়ের হাতের শ'ক্ত থা'প্প'ড়
খেয়ে পাশে একটি গাছের সাথে জোরেসোরে ধাক্কা খায়।
কোনোরকমে দু'হাতে গাছ আঁকড়ে ধরে বিস্ময় চোখে
তাকায় হৃদয়ের দিকে। হৃদয়ের হিং'স্র বা'ঘের ন্যায় দৃষ্টি
দেখে রজনী শুকনো ঢোক গিলল।
গতকাল ছয়টি থা'প্প'ড় খাওয়ার কারণ যেমন মেয়েটি
এখনো জানে না, তেমনি এখনকার থা'প্প'ড় খাওয়ার
কারণও রজনী বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারলো না।
তখনই বাড়ির ভেতর থেকে নিলয় আর নীতি বেরিয়ে
আসে। নীতি মূলত রজনীকে খুঁজতেই এসেছিল, আর
নিলয় নিজের ছটফটানি কমাতে। কিন্তু এখানে এসে
এরকম অদ্ভুত কান্ড দেখে নিলয় নীতি দু'জনেই হতভম্ব
হয়ে যায়। নিলয় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও নীতি
দৌড়ে গিয়ে রজনীর পাশে দাঁড়ায়। দু'হাতে রজনীকে
সাপ্টে ধরে হৃদয়ের দিকে ভীত চোখে তাকায়।
গতরাতে রজনী হৃদয়ের হাতে ছয়টা থা'প্প'ড় খেয়েও তার
অচেনা জায়গায় থাকায় ভ'য়ের চোটে রা'গ'তে পারছিল
না। কিন্তু আজ নিজ গ্রামে এসে হৃদয়ের একটি থা'প্প'ড়
রজনী হজম করতে পারলো না। সে রাগান্বিত স্বরে চেঁচিয়ে
ওঠে,
“আপনি আমায় বারবার এভাবে মা'র'ছে'ন কেন?
জা'নো'য়া'র এক…..”
নীতি সাথে সাথে রজনীর মুখ চেপে ধরে। ভ’য়ে মেয়েটার
অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
রজনীর মুখে জা’নো’য়া’র শব্দ শুনে হৃদয়ের মাথায়
আ'গু'ন জ্বলে উঠল। সে আবারো রজনীর দিকে তেড়ে
যেতে নিলে নিলয় দৌড়ে এসে হৃদয়কে টেনে ধরে বলে,
“আরে কি করছিস? অচেনা একটা মেয়েকে এভাবে
অকারণে মা'র'ছিস কেন?”
হৃদয় রা'গে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
“ওর সাহস কি করে হয়, সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছে পোষণ
করার? ওকে পানিতে চুবিয়ে মা'র'বো আমি।”
হৃদয়ের কথা শুনে নিলয়-নীতি তব্দা খেয়ে যায়। আর
রজনী আরও রে'গে যায়। সেই লাঠি দিয়ে আ'ঘা'ত করা
সহ এই লোকটা পুরো আট বার তাকে আ'ঘা'ত করেছে।
আর এখন পানিতে চুবিয়ে মা'র'তে চায়! কত্তবড় খারাপ
লোক। রজনী তার মুখ থেকে নীতির হাত সরিয়ে হৃদয়ের
উদ্দেশ্যে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“খাবো আমি সিগারেট। একশো একবার খাবো। আপনার
কি? আপনার বাপের কি? আপনার দাদুর কি হ্যাঁ? যত্তসব
ফাউল লোক!”
কথাগুলো বলে রজনী আর এখানে দাঁড়ায় না। গলায়
ওড়না পেঁচানো ছিল, ওভাবেই বাড়ির বাইরের দিকে দৌড়
লাগায়। এই বাড়িতে আর এক মুহূর্ত থাকবে না।
দ্বিতীয়বার এই বাড়ি আসাই তার ভুল হয়েছে। এই বাড়িতে
এই ফাউল, খাটাশ লোক আছে জানলে সে জীবনেও
আসতো না।
এদিকে হৃদয় হাতের জ্ব’ল’ন্ত সিগারেটের মাথায় তার
বুড়ো আঙুল চেপে ধরে রেখেছে। ভস্ম করে দেয়া দৃষ্টি
দৌড়ানো রজনীর দিকে।
পাশে দাঁড়ানো নিলয় রজনীর দিকে বিস্ময় চোখে চেয়ে
রইল। কি মেয়েরে বাবা! হৃদয় পেরিয়ে বাপ পর্যন্ত তো
গেলোই, এরপর আবার লাফ দিয়ে দাদুর কাছেও চলে
গেল। নিলয় একবার রজনীর দিকে তাকায়, আরেকবার
হৃদয়ের দিকে। এদের মধ্যে কানেকশন টা আসলে কি, সে
ঠিক বুঝতে পারছে না। তাছাড়া মেয়েটিই বা কে? কিছু
একটা ভেবে নিলয় চট করে নীতির দিকে তাকায়। ভ্রু
কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
“মেয়েটি তোর কে হয়? আর নাম কি?”
নিলয়ের প্রশ্নে নীতি ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। রজনীর উপর তার
এতো রাগ লাগছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
আজ যদি নিলয় ভাই রজনীকে চিনত, তবে তাকে কে
বাঁচাতো? তাছাড়া হৃদয় ভাইয়ের মুখে ওভাবে কথা বলার
কি দরকার ছিল? এখন বুঝুক ঠ্যালা! নীতি নিজেকে
সামলে উত্তর করে,
“আমার ফ্রেন্ড। নাম হৈমন্তিকা।”
নাম শুনে নিলয়ের দৃষ্টি বিদুৎবেগে হৃদয়ের দিকে ঘুরে
যায়। ওহ এই ব্যাপার! বউকে শাসন করছিল তার মানে!
নিলয় হৃদয়ের কানে ফিসফিসিয়ে বলে,
“দুই জমাই-বউ মিলে সিগারেট খাওয়ার কম্পিটিশন
করবি। প্রবলেম কি? খাবারটা তো তোর পছন্দেরই!”
হৃদয় জ্ব'ল'ন্ত চোখে তাকায় নিলয়ের দিকে। নিলয়
মিটিমিটি হাসে। হৃদয় দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“ও সিগারেট ছুলে, তোকে খু'ন করে ফেলবো।”
নিলয় চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। কি খ্রাপ দেখ, ওর
বউ সিগারেট খেলে তার কি দোষ? নিলয় বলতে নেয়,
‘দেখ হৃদয়……
মাঝ থেকে হৃদয় তার পকেট থেকে একটি সিগারেটের
প্যাকেটসহ একটি লাইটার বের করে নীতির হাতে দিয়ে
বলে,
“আজ রাতের মধ্যে এই প্যাকেট খেয়ে শেষ করবি, নয়তো
নেক্সট ডে তোকে আমি নিজ দায়িত্বে টাক করিয়ে দিব।”
কথাটা বলে হৃদয় বড় বড় পায়ে বাড়ির বাইরের দিকে
যায়, যেদিকে রজনী দৌড় দিয়েছে।
আর এদিকে নীতি তার হাতের সিগারেটের প্যাকেট আর
লাইটারের দিকে চেয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানে
কি? এসব সে কেন খাবে? আর না খেলে নাকি তাকে টাক
হতে হবে! এমনিতেই তার মাথায় চুল নেই, যেটুকু আছে,
সেটুকুও না থাকলে কেমন দেখাবে তাকে?
হৃদয়ের কান্ড দেখে নিলয়ের মনে হলো, সে এই মুহূর্তে
হৃদয়কে খু'ন করতে না পারলে তার শান্তি হবে না। ওর বউ
সিগারেট খেতে চায় বলে কু'ত্তাটা তার বউকেও সিগারেট
খাওয়া শেখাতে চাইছে। নিলয়ের ইচ্ছে করল, এর পা'ছায়
এক লাথি মে'রে এর শহরে পাঠিয়ে দিতে। এসে থেকে
তাকে শান্তি দিচ্ছে না। সে হৃদয়ের দিকে কটমট দৃষ্টিতে
চেয়ে চেঁচিয়ে বলে,
“তোর কোনোদিন ভালো হবে না। শা'লা কু'ত্তা একটা।”
ততক্ষণে হৃদয় চলে গিয়েছে। নিলয় নীতির সামনে এসে
নীতির হাত থেকে সিগারেট আর লাইটার কে'ড়ে নিয়ে
ধমকে বলে,
“কেউ অ’খাদ্য হাতে ধরিয়ে দিলে সেটা ছুঁড়ে ফেলতে হয়,
জানিস না? বে'য়া'দ'ব কোথাকার!”
নীতি বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“তুমি কি একটু ভালোভাবে কথা বলতে পারো না?”
নিলয় রে'গে বলে,
“না পারি না। যা এখান থেকে। নয়তো চটকানা খাবি।”
নীতি রে'গে তাকায়। মুখ ভেঙচি কেটে বলে,
“আমি তোমাকে ব’দদোয়া দিলাম নিলয় ভাই, তোমার বউ
একটা দা'জ্জা'ল হবে, দেখে নিও।”
কথাটা বলে নীতি বাড়ির ভেতর দৌড় দেয়। নিলয় কিছু
বলার সুযোগ-ই পেল না। সে নীতির কথায় রা'গার বদলে
শব্দ করে হেসে দেয়। হাসতে হাসতে বাড়ির গেটের সামনে
বসায় জায়গায় বসে পড়ে।
________________
রজনী দৌড়ের গতি কমে এসেছে। মেয়েটি এতো রাতে
কোথায় যাবে? নিজের বাড়ি? তারা তো সবাই ঘুমিয়েছে।
কিন্তু তাতে কি? এখন সেখানে যাওয়া ছাড়া আর কোনো
উপায় নেই। কিন্তু এটা গ্রাম হওয়ায় সকলে তাড়াতাড়ি
ঘুমিয়ে যায়, সেখানে এখন কত রাত হয়ে গেছে।
আশেপাশে তেমন কেউ নেই, রজনীর একা যেতে ভ'য়
করছে। খারাপ লোক সহ জ্বি’ন ভূ’তের ভ'য়। মেয়েটি
একজায়গায় দাঁড়িয়ে আশপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখছে।
দৌড়াতে দৌড়াতে কোনদিকে যে চলে এসেছে, ঠিক করে
বুঝতেই পারেনি। এখন সঠিক রাস্তা পেতে বেগ পোহাতে
হচ্ছে। অন্ধকার হওয়ায় এই প্রবলেম বেশি হচ্ছে। দিন হলে
রজনী ঠিক চিনে যেত। ভাবনার মাঝেই রজনীর ডান হাতে
জোরেসোরে টান পড়ে। টান পড়ায় রজনী অনিচ্ছা সত্ত্বেও
উল্টোদিকে ফিরে হুমড়ি খেয়ে পড়তে নেয়, তার আগেই
হৃদয় বাম হাত রজনীর চুলের পিছনে রেখে ডান হাতে
রজনীর গাল শ'ক্ত করে চেপে ধরে। ঠোঁটের ফাঁকে তখনো
জ্ব'ল'ন্ত সিগারেট ধরে রাখা। শ’ক্ত চোয়ালে ঘেরা
রাগান্বিত দৃষ্টি রজনীর পানে।
হৃদয়কে দেখে রজনী ভ'য় তো পেয়েছেই, সাথে হৃদয়ের
এভাবে ধরায় মেয়েটার ভ'য়ের মাত্রা তড়তড় করে বেড়ে
যায়। হৃদয় শ'ক্ত কণ্ঠে বলে,
“কি যেন বলছিলি? সিগারেট খাবি, রাইট?”
রজনী মাথা নাড়িয়ে না বোঝানোর চেষ্টা করে, কিন্তু হৃদয়
এতো জোরে তার মুখ চেপে ধরেছে যে মেয়েটা মাথা
নাড়াতে পারেনা। হৃদয় আবারো একই স্বরে আওড়ায়,
“তুই সিগারেট খেলে আমার বাপ-দাদুর কিছুই না। কিন্তু
আমার অনেক কিছু।”
রজনী বিস্ময় চোখে তাকায় হৃদয়ের দিকে।
কথাটা বলে হৃদয় রজনীর চেপে ধরা গাল ছেড়ে দেয়।
এরপর রজনী কিছু বোঝার আগেই হৃদয় তার বাম হাতে
রজনীর মাথা টেনে এনে ঠাস করে তার উম্মুক্ত বুকে চেপে
ধরে। একই সময়ে তার ঠোঁটের ফাঁকে রাখা সিগারেটটি
নিয়ে রজনীর মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে ডান হাতে
রজনীর মুখ চেপে ধরে। বাম হাত দ্বারা রজনীর থুতনি ধরে
রজনীর মাথা সামান্য উঁচু করে, রজনীর চোখে চোখ রেখে
শ'ক্ত গলায় বলে,
“পুরোটা চিবিয়ে খাবি, নয়তো আজকেই তোর শেষ
দিন।”
রজনীর চোখের আকার বড় হয়ে গিয়েছে। মেয়েটির মাথা
অর্থাৎ ডান গাল এখনো হৃদয়ের উম্মুক্ত বুকে চেপে রাখা।
সাথে হৃদয়ের কঠোর দৃষ্টিতে দৃষ্টি, আর মুখের ভেতর
জ্ব'ল'ন্ত সিগারেট। সবমিলিয়ে রজনীর মিশ্র এক অনুভূতি
তৈরী হয়েছে। যেখানে হৃদয়ের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে, ভীতির
সৃষ্টি হয়েছে, আর মুখের ভেতর জ্ব'ল'ছে। রজনী ছটফট
করতে চাইলেও পারলো না। দু'হাত হৃদয়ের পেটে রেখে
হৃদয়কে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলো। কিন্তু হৃদয়ের শ'ক্তির
সাথে পারলো না। বেশ কিছুক্ষণ পরও যখন বিন্দুমাত্র
সুবিধা করতে পারলো না, তখন রজনীর চোখ দু'টো ভরে
ওঠে। অসহায় চোখে তাকায় হৃদয়ের দিকে।
অনেকক্ষণ অন্ধকারে থাকায় এখন সবকিছু অনেকটা
স্পষ্ট লাগছে হৃদয়, রজনীর কাছে। যেমনটা হৃদয়ের
ক্ষেত্রে হলো। রজনীর টলমলে চোখ তার দৃষ্টিতে
আটকায়। তবে সে মায়া দেখিয়ে রজনীর মুখ থেকে হাত
সরালো না। সামান্য ঢিলে করল হাত, এটুকুই। আগের
চেয়ে কণ্ঠ নরম করে রজনীর ঝাপসা বাদামি চোখের
মণিতে দৃষ্টি রেখে গম্ভীর গলায় বলে,
“কি যেন বলছিলে? আমি ফাউল লোক, রাইট?”
রজনী অসহায় চোখে তাকায়। সে ভেবেছিল, তার গ্রামে
তাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। তাই একটু সাহস
দেখিয়ে রা'গ দেখালো। কিন্তু তার ধারণা পাল্টে গিয়ে তার
অবস্থা শোচনীয় হয়ে গেল। ভাবনার মাঝেই হৃদয় বাম
হাত সামান্য পিছনে নিয়ে এসে রজনীর জামার চেইন
একটানে খুলে দেয়। রজনী ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। নড়াচড়া
করতে চাইলেও পারলো না। আলগা দু'টো হাত দিয়েও
কোনো সুবিধা করতে পারেনা দানবীয় হৃদয়ের সাথে। এর
মাঝেই হৃদয় বা হাত রজনীর জামার ভেতর নিয়ে রজনীর
কোমর থেকে একদম ঘাড় পর্যন্ত একটানে তার হাত
বুলিয়ে আনে। রজনী কারেন্ট শক খাওয়ার মতোন ঝাঁকি
দিয়ে ওঠে। তার মনে হলো, তার পিঠ বরাবর একটি
দ্রুতগামী গাড়ি চলে গেল। মেয়েটা থরথর করে কেঁপে
ওঠে।
হৃদয় কাজটি করে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার ভেজা বাম
হাতের দিকে তাকালো, মনে হচ্ছে হাতটি কোনো পানির
মাঝ থেকে চুবিয়ে এনেছে। চুবিয়ে তো এনেছে, তবে পানি
নয়, রজনীর ঘামে। হৃদয় দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে রজনীর
বাদামি চোখে। সেথায় দৃষ্টি রেখে গম্ভীর গলায় বলে,
“আই নো, তোমার হাজবেন্ড আছে। অ্যান্ড ইউ নো,
আমারও একটা কিউট ওয়াইফ আছে। বাট আমি মাঝে
মাঝে বাইরের মেয়ের থেকে সার্ভিস নিতে বেশি প্রেফার
করি। লাইক ইউ।
কথাটা বলে হৃদয় রজনীর পিঠ থেকে ভিজিয়ে আনা তার
ঘামযুক্ত ভেজা হাত রজনীর মুখের সামনে এনে রজনীর
চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় বলে,
ইউ আর আ সুপার ফার্স্ট গার্ল। সার্ভিস দেয়ার আগেই
রেজাল্ট পাবলিশ করে ফেলেছ। আই রিয়েলি লাইক
ইট।”
কথাটা বলে হৃদয় ডান চোখ টিপ দেয়। ঠোঁটের কোণে
অতি সূক্ষ্ম হাসির রেখা, যা একেবারেই অস্পষ্ট।
হৃদয়ের কথা আর কাজে রজনী হতভম্ব হয়ে যায়। কত্তবড়
খারাপ লোক হলে ঘরে বউ রেখে তার সাথে প’র’কী’য়া
করতে চায়। আর রজনী ভেবেছিল, এই লোকের অন্যান্য
খারাপ বৈশিষ্ট্য থাকলেও, লোকটার চরিত্র ভালো। কিন্তু
তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। রজনীর ইচ্ছে করল, হৃদয়কে
এক্কেবারে গলা টিপে মে'রে ফেলে এর প’র’কী’য়া করার
সাধ মিটিয়ে দিতে। একবার এখান থেকে ছাড়া পেয়ে
নিক, এরপর সত্যি সত্যিই সে এই লোকের প’র’কী’য়া
করার সাধ জন্মের মতো মিটিয়ে দিবে। আর শেষে কিসব
অ’শ্লীল কথা বলল! রজনী চোখমুখ খিঁচিয়ে নিয়ে মনে
মনে আওড়ায়,
“ওয়াক থু! ছিঃ! কি অ’শ্লীল!”
চলবে......... |
0 Comments