লেখক:DRM Shohag
পর্ব:১১
----------------------------------
“আমাকে জিজ্ঞেস করবি না, আমি কেমন আছি?”
রজনীর মনটা ধীরে ধীরে বড্ড ভাড় হতে শুরু করেছে। সে মাথা নিচু রেখেই বলে,
“চেয়ারম্যান এর মেয়ে খারাপ কেন থাকবে!”
রজনীর কথার ধরনে নীতির খারাপ লাগলো। তবে সে এ
অন্য প্রসঙ্গে বলে,
“তুই অনেক শুদ্ধভাবে কথা বলতে শিখেছিস তো! এক্কেবারে পিইওর শুদ্ধভাষী রজনী হয়ে গিয়েছিস না-কি!”
রজনী মুখ ফুলিয়ে বলে,
“আমি সবভাবেই কথা কইতে পারি। খালি মানুষ বুইঝা মেলা ধরনে কথা কই। রজনী পুরান থুইয়া বদলায় না। সাথে নিয়াই বদলায়।”
রজনীর কথায় নীতি অবাক হয়। তবে তার অবাকতার চেয়ে রজনীর কথা শুনে হাসি পায়। মেয়েটা নিজেকে না সামলে শব্দ করে হেসে দেয়। নীতির হাসির কারণ হয়ত রজনী বুঝল। এইজন্য রজনীর ঠোঁটের কোণেও সামান্য হাসি ফুটে ওঠে৷ যা লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল মেয়েটা। কিন্তু ব্যর্থ হলো নীতির চোখ ফাঁকি দিতে। নীতি দু'হাতে রজনীর কাঁধ ধরে রেখে রজনীকে তার দিকে করে রেখে এখনো হাসছে। তার খুব মনে আছে, আগে রজনী সবসময় একইভাবে কথা বলত। ঘরে, বাইরে সবজায়গায়। কিন্তু নীতি রজনীকে বোঝাতো, বাইরে বের হলে অপরিচিতদের সাথে যেন রজনী একটু শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। রজনী নীতির কথায় চেষ্টা করত। কিন্তু বেশিরভাগ সময় মাঝপথে তার অভ্যাসগত ভাষা ইউজ করত। আর তখন রজনী, নীতি দু'জনেই হেসে ফেলত। ঠিক যেমন আজ করল।
রজনী নিজেকে সামলে কাঁধ থেকে নীতির হাত জোর করে সরিয়ে দিল। এরপর ব্যাগ, বক্স নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জায়গাটি প্রস্থান করতে নিলে নীতি রজনীর হাত টেনে ধরে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“তুই যে বললি তুই পুরান ভুলে যাস না৷ তাহলে আমাকে দেখলে এভাবে পালিয়ে যাস কেন? আমি কি খুব খারাপ পাখি?”
নীতির মুখে পাখি শব্দটি শুনে রজনী তৃপ্ত চোখে তাকায় নীতির দিকে। নীতি তাকে রজনী কম পাখি বলেই বেশি ডাকতো। শুধু নীতি রজনীকে ডাকতো এমন নয়, রজনীও নীতিকে পাখি ডাকতো। কতদিন হলো তাদের মাঝের সেই সম্পর্ক এক জায়গায় থেমে আছে। মেয়েটার নরম মনে নীতির বলা শব্দটি বড্ড প্রভাব ফেলল। সে মলিন গলায় বলে,
“আমি যে ভ্যানওয়ালার মাইয়া,, তোর সাথে আমি মিশলে মানুষ নানান কথা কয়! বড় ঘরের মানুষদের সাথে কথা কইতে আব্বায় না করছে।”
নীতি কি বলবে বুঝল না৷ শুধু এই কারণে রজনী তার সাথে কথা বলে না এটা সত্য নয়, এটা নীতির মন বলে। তবে সে এসব নিয়ে আর এগোলো না। সে রজনীর শাড়িটির দিকে তাকালো। কেমন কুঁচকে আছে। অনেক ময়লাও হয়েছে দেখে বোঝা যাচ্ছে। নীতি রজনীর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে নিলে রজনী শব্দ করে বলে, “আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?”
নীতি মৃদুস্বরে বলে,
“আমাদের বাড়ি।”
কথাটা শুনতেই রজনীর চোখেমুখে ভীতি জড়ো হয়। মেয়েটি ভেবে নিল নীতি তাকে ধরে নিয়ে তার ভাই রিয়াদের হাতে তুলে দিবে। যার হাত থেকে বাঁচতে রজনী এই গ্রাম থেকে পালিয়েছিল। যার জন্য এতো এতো দু’র্ঘটনা ঘটিয়েছে রজনী, এখন তার হাতেই তুলে দিলে রজনীর কি হবে? রজনীর এক্সপ্রেশন দেখে নীতি রজনীর গালে হাত দিয়ে বলে,
“তোকে আমি খুব ভালো করে চিনি রজনী। তুই পালিয়েছিলিস বলে গ্রামের মানুষদের দেখে ভ'য় পাচ্ছিস। নিজের বাড়ি যেতেও ভ'য় পাচ্ছিস। আর এখন ভ'য় পাচ্ছিস আমি তোকে ভাইয়ার হাতে তুলে দিতে নিয়ে যাচ্ছি কি-না, তাইতো?
রজনী অবাক হয়ে চেয়ে রইল নীতির দিকে। মেয়েটা আজও সেই আগের মতোই তার ভেতরটা একেবারে হুবহু পড়ে ফেলল। রজনী কি বলবে বুঝল না। নীতি আবারও বলে,
আমি আমার ভাইয়াকে যতটা ভালোবাসি। তোকে তার চেয়ে একবিন্দুও কম ভালোবাসিনা রজনী। আমার ভাইয়ার মতো মেয়েবাজ মানুষের জীবনে তোর মতোএকটা ফুল আসুক, এটা আমি কখনো চাইনি, আর না তোকে খনো চাইবো। তুই না পালালে আমি নিজেই কোনো না কোনোভাবে এই বিয়ে ভেঙে দিতাম। কারণ মেয়েটা তুই ছিলি রজনী। আমি জানি তুই আমাকে খুব ভালো করেই চিনিস। আমি কি কি করতে পারি তা-ও জানিস। পাটোয়ারী বাড়ির মেয়ে আমি। পাটোয়ারী বংশের র'ক্ত আমার শরীরে। অনেক কিছু করার ক্ষমতা রাখি আমি। খবরদার আমার মুখের উপর কথা বলবি তো, খবর আছে। আমার তোর মতো বন্ধু ছাড়া দিন ভালো যায় না, চুপচাপ আমার সাথে আয়।”
নীতির সব কথা রূঢ় শোনা গেলেও শেষ লাইনটা বলতে গিয়ে কণ্ঠ নরম হয়ে এসেছে। সে রজনীর হাত ধরে সামনের দিকে এগোলে রজনী নীতির হাত ঝাড়া মেরে নীতিকে তার দিকে ফিরিয়ে নীতি কিছু বোঝার আগেই নীতির ডান গালে থা'প্প'ড় মেরে দেয়। নীতি ব্য’থা পেয়ে উহ্ শব্দ করে ওঠে। অবাক হয়ে বলে,
“মারলি কেন? তুই দেখতে ছোটোখাটো হলেও তোর থা'প্প'ড় যে আমার চাপার দাঁত ব্য’থা করে দেয়, সেটা জানিস না?”
রজনী মৃদু হেসে বলে, “জানি দেইখাই তো মারলাম। আরেকটা কারণ হলো, এতোদিন আমারে ছাড়া তোর দিন ভালা গেছে তাই।”
রজনীর কথার ধরনে নীতি আবারো হেসে ফেলে। রজনী নীতির হাত ধরে নীতিদের বাড়ির দিকে যেতে যেতে বলে,
“জানি তোর বাড়ি গেলেও তোর ভাইয়ের ছায়া আমার উপর পড়বে না তোর কারণে। আর তাই
বারান্দা দিয়ে তোর ঘরে ঢুকব। আজকে তোর ভাগের সব খাবার লুকিয়ে আমাকে দিবি। অনেক ক্ষুধা পেটে। তাত্তাড়ি আয়।”
___________________
ধরনীর বুকে সন্ধ্যা নেমেছে। মাগরিবের আজানের ধ্বনিতে হৃদয়ের কান সজাগ হয়। বন্ধ চোখের পাতা ধীরে ধীরে খোলার চেষ্টা করে। কিন্তু তার মনে হলো, চোখের উপর কেউ কয়েকশো মণ কিছু একটা রেখে দিয়েছে সাথে মাথার উপরও। হৃদয় নড়েচড়ে বসতে চাইলো, এবারেও ব্যর্থ হলো। সে বুঝল না তার শরীর এমন কেন লাগছে। যেন কিছু একটা তাকে বেঁধে রেখেছে। হৃদয় সময় নিয়ে বন্ধ চোখের ভারী পাতাজোড়া খুলে তাকালো। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, চোখ খোলার পর হৃদয়ের চোখে আর তেমন কিছুই ধরা পড়ল না। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। হৃদয় দ্রুত উঠে সোজা হয়ে বসতে চাইলো, কিন্তু এবারও বাঁধা পেল। নড়তে পারলো না বিন্দুমাত্র। এবার হৃদয় ভালোভাবে খেয়াল করল তাকে আসলে বেঁধে রাখা হয়েছে। এদিক-ওদিক ছটফটিয়ে আরও নড়েচড়ে নিজেকে বাঁধন মুক্ত করতে চাইলো, কিন্তু পারলো না। দৃষ্টি ডানদিকের জানালায় পড়লে হৃদয় এক মুহূর্তের মধ্যে একেবারে স্থির হয়ে যায়। জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এখন ধরনীতে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। আর আজানটাও মাগরিবের। হৃদয়ের মাথায় চাপ পড়ল। আজ সকালে সে রজনীকে দেখার পর নিলয়কে রেখে বাসস্ট্যান্ডেের দিকে যাচ্ছিল, তারপর তার সাথে কি হয়েছিল? হৃদয় হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারলো না। আর তারপর হঠাৎ মাথায় আসলো, তার যোহর আর আসর নামাজ পড়া হয়নি। কিভাবে, কেন পড়া হয়নি হৃদয় সেসব জানেনা। শুধু এটুকু জানে, তার দুই ওয়াক্তের নামাজ কাজা হয়ে গিয়েছে। সে জানে সাত বছর থেকে নামাজ ফরজ। কিন্তু সে নামাজ ধরেছিল পাঁচ বছর বয়স থেকে। পাঁচ বছর বয়স পেরিয়ে আজ তার ২৫ বছর। গত ১৭ বছরে তার এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা হয়েছে বলে মনে পড়েনা। এতোগুলো বছর পর আজ সে দুই ওয়াক্তের নামাজে সে আল্লাহর সামনে উপস্থিত ছিল না। কথাটা ভাবতেই হৃদয়ের মন শরীর দু'টোই ছটফটিয়ে উঠল। মাগরিবের আজানের শেষ ধ্বনি এসে কানে বাজল। এরপর আজানের ধ্বনি বন্ধ হয়ে গেল। হৃদয় সর্বশক্তি দিয়ে নড়েচড়ে তার বন্ধন খুলে ফেলতে চাইলো। কিন্তু সে সফল হলো না। কে তাকে এভাবে এই বদ্ধ জায়গায় বেঁধে রেখেছে? তার রুটিনে আজ পর্যন্ত যে গরমিল হয়নি, কার জন্য আজ সেই রুটিন উল্টে গিয়েছে? রা'গে শরীর কাঁপছে হৃদয়ের। সে আশেপাশে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে,
“ওই কোন মাদারটোস্ট আমাকে এভাবে বেঁধে রেখেছিস? সাহস থাকলে আমার সামনে আয়।
হৃদয়ের কথা কেউ তো শুনতে পেলোই না। উল্টে হৃদয় নিজেই নিজের বলা কথা বারবার প্রতিধ্বনি রূপে শুনতে পায়। সে আবারও আগের চেয়েও জোরে চিৎকার করে বলে,
কে এতোবড় দুঃসাহস দেখিয়েছিস? সামনে আয় বে'য়া'দ'ব। আমি একবার এখান থেকে মুক্ত হয়ে গেলে আমার দু'ওয়াক্ত কাজা নামাজের বিনিময়ে তোকে দুইশোবার জ'বা'ই করবো ই'ব'লি'শের বাচ্চা।”এবারেও কেউ শুনলো না হৃদয়ের বলা কথা। হৃদয় ছটফট করতে করতে একসময় হাত-পা বাঁধা হৃদয় ডানদিকে হেলে ঠাস পড়ে যায়। লোহার মতো কিছুর সাথে মাথা আ'ঘা'ত পেয়ে ব্য’থা পেলেও হৃদয় সেই ব্য’থাটুকুকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দিল না। সে উপুড় হয়ে শোয়া। বাঁধা হাত দু'টো পেটের নিচে চাপা পড়া। ছেলেটি মাথা উঁচু করে সন্ধ্যার আকাশপানে তাকায়। চোখেমুখে অসহায়ত্বের ছড়াছড়ি। ইতোপূর্বে যা হৃদয়ের মাঝে কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। এইটুকু সময়ের মধ্যে চোখদু'টো টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। চোখের সামনে একটি মিষ্টি মুহূর্ত ভেসে ওঠে। যা হৃদয়ের জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম মুহূর্ত। ~
“আম্মু আমার সাথে কথা বলো প্লিজ! আম্মু? ও আম্মু? আমার সাথে একটু কথা বলো না গো! অল্প একটু কথা বলো। শুধু অল্প একটু বললেই হবে গো। আম্মু? ও আম্মু? আম্মু গো? আমার সাথে কথা বলো আম্মু।”
পাঁচ বছরের ছোট্ট হৃদয় কথাগুলো বলতে বলতে কখনো মায়ের আঁচল ধরে নাড়ায়, কখনো মায়ের গলা ধরে ঝুলে পড়ে, কখনো দু'হাতে মায়ের গাল ধরে মায়ের দৃষ্টি নিজের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হৃদয়ের মা হৈমী নওরোজ ছোট্ট ছেলের পানে তাকায় না। সে দু'হাত আড়াআড়িভাবে ভাঁজ করে গাল ফুলিয়ে রেখে জানালার বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে। ছোট্ট হৃদয় এতক্ষণ ধরে মায়ের উপেক্ষা পেয়ে কেঁদে দিবে দিবে ভাব। বাচ্চাটি কি করবে ভেবে পায়না। ছোট হলেও সে খুব বুঝেছে, আম্মু তার উপর ভীষণ রা'গ করেছে। হৃদয় এবার তার মায়ের পিঠের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। পিছন থেকে দু'হাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। বলে,
“আমি আর তোমাকে রেখে খেলতে যাবো না আম্মু। আমার সাথে কথা বলো। আম্মু গো….”
ছেলের আবেগী সুর আর কথায় হৈমী নওরোজ তড়িঘড়ি করে পিছন দিয়ে হাত দিয়ে হৃদয়কে টেনে এনে কোলের উপর বসিয়ে ছেলেকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে আদুরে সুরে বলে, “কাঁদে না আব্বু। এইতো আম্মু কথা বলছি।”
হৃদয় মাথা তুলে তাকায় মায়ের দিকে। হৈমী নওরোজ ছেলের কপালে চুমু খেয়ে মৃদু হাসে। এরপর ছেলেকে জানালার দিকে মুখ করে বসিয়ে আকাশের দিকে আঙুলতাক করে বলে,
“ওই আকাশ দেখতে কেমন আব্বু?”
বিকালের মেঘলা রঙবেরঙে ভরা আকাশ দেখে ছোট হৃদয় উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“খুব সুন্দর খুব সুন্দর।”
হৈমী নওরোজ জিজ্ঞেস করে,
“ওই আকাশের মালিক কে জানো?”
হৃদয় আকাশের দিকে চেয়েই দু'দিকে মাথা নাড়ায়। হৈমী নওরোজ আকাশপানে চেয়ে উত্তর করে, “ওই আকাশের মালিক মহান আল্লাহ্। যিনি আমাদের সবকিছু দেন। আমাদের খাওয়ায়, পড়ায় সবকিছু দেয়। আমার হৃদয় আব্বুকে একটা সুন্দর আম্মু দিয়েছে ওই আল্লাহ। বুঝেছ আব্বু?”
হৃদয় মাথা উপর-নীচ ঝাঁকিয়ে বলে, “হু হু বুঝছি।”
হৈমী নওরোজ আবারও বলেন,
“যে আল্লাহ তোমাকে এতো সুন্দর আর ভালো আম্মু দিয়েছে, প্রতিদিন তোমাকে এতো এতো সুস্বাদু খাবার খেতে দেয় তিনি, তোমাকে এতো সুন্দর চোখ, হাত-পা দিয়েছে,, তাকে ভুলে গিয়ে খেলাধুলা করলে চলবে আব্বু?”
রজনীর পায়ের কাছে কোথা থেকে যেন একটি কাগজ এসে পড়ে। রজনী দাঁড়িয়ে যায়। মাথা নিচু করে তাকালে চোখে পড়ে একটি কাগজ গুটিশুটি করে দলা পাকানো। রজনী চকলেটের বক্স আর ব্যাগ বা হাতে শ'ক্ত করে ধরে বুকের সাথে চেপে সামান্য ঝুঁকে ডান হাতে কাগজটি তুলে নেয়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাগজের ভাঁজ খুলতে নেয়, তখনই দূর থেকে কেউ একজন রজনী বলে ডেকে ওঠে।
রজনীর বুক ধ্বক করে ওঠে। এখন এই মুহূর্তে সে এই গ্রামের কারো সামনে পড়তে চায় না৷ এতে তারসহ তার বাবা মায়ের উপর খুব একটা ভালো প্রভাব পড়বে না৷ রজনী সামনে তাকানোর সাহসটুকু পেল না। সে ডান হাতের কাগজটি সহ ব্যাগ আর বক্স শ'ক্ত করে ধরে উল্টোদিকে দৌড় লাগায়। শাড়ি পরে খেলাধুলা, দৌড়ানোর অভ্যাস থাকায় রজনীর বিন্দুমাত্র সমস্যা হয় না। সে আপাতত এই গ্রামের মানুষের হাত থেকে পালিয়ে বেঁচে বাড়ি পৌঁছাতে চায়। কিতকিত খেলতে গিয়ে লেট হয়ে গেল। নয়তো গ্রামের মানুষজন ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই রজনী তার বাড়ি পৌঁছাতে পারতো। মেয়েটি ভীষণ আফসোস করল কেন আগে আগে বাড়ি চলে গেল না এই ভেবে। অনেকটা দূর দৌড়ানোর পর হঠাৎ-ই একজনের সাথে জোরেসোরে ধাক্কা খেয়ে রজনী ব্যাগ, বাক্স সব নিয়ে ঠাস করে কাঁচা মাটির উপর শব্দ তুলে পড়ে যায়। বা হাত কোমরে রেখে মৃদু চেঁচিয়ে ওঠে। অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়,
“মাগো আমার কোমরটা গেল গো!”
রজনীকে পড়ে যেতে দেখে নীতি তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে রজনীর সামনে বসে অনুতপ্ত স্বরে বলে, “স্যরি রে! আমি একটুও দেখতে পাইনি।”
পরিচিত কণ্ঠে রজনী কোঁচকানো চোখমুখ তুলে সামনে তাকায়। নীতিকে দেখে রজনীর মুখ মলিন হয়। একসময় সে আর নীতি দু'বান্ধবী সবসময় একসাথে থাকলেও আজ তাদের মাঝে যোজন যোজন দূরত্ব। রজনী তার মলিন মুখখানা নামিয়ে নিয়ে কাগজটি ব্যাগে ভরে, ব্যাগসহ বক্স নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াতে নিলে নীতি
রজনীর হাত টেনে ধরে বলে,
“কেমন আছিস রজনী?”
রজনী মাথা নেড়ে ছোট করে বলে, “ভালো।”
নীতি মলিন মুখে বলে,
ছোট্ট হৃদয় অনেককিছু ভেবে বলে,
“না না চলবে না তো।”
“তাহলে তুমি তাকে ভুলে গিয়ে আজ মাগরিবের নামাজে এলে না কেন?”
হৃদয় মায়ের দিকে চেয়ে ঠোঁট উল্টে বলে,
“আর ভুলে যাবো না আম্মু।”
“সত্যি তো?”
হৃদয় ঘনঘন মাথা উপর-নীচ করে বলে,
“হু হু সত্যি আম্মু।”
হৈমী নওরোজ ছেলের মাথায় চুমু এঁকে বলে,
“কথা দিয়ে কথা না রাখলে কিন্তু আল্লাহ তোমাকে আ'গু'নে ফেলে দিবে। সেদিন আম্মু আর তোমাকে বাঁচাতে আসবে না।”
ছোট্ট হৃদয় মায়ের বুকে মাথা রেখে আকাশের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলে,
“আমি কথা রাখবো তো। আমাকে আ'গু'নে ফেলে দিবা না যেন বুচ্ছো আল্লাহ?”
ছেলের কথা শুনতে পেয়ে হৈমী নওরোজ মৃদু হাসলেন। এরপর ধীরে ধীরে হৃদয়ের সারা শরীরে কাতুকুতু দিতে শুরু করে। ছেলেটা লাফিয়ে ওঠে। মায়ের থেকে ছুটতে চাইলে পারেনা। হৈমী নওরোজ ছেলেকে বিছানায় চিত করে শুইয়ে কাতুকুতু দিতে থাকে। হৃদয় খিলখিলিয়ে হাসে আর ছটফট করে। হাসতে হাসতে বলে,
“ইশ! আর না! আর না আম্মু।” ~
হৃদয়ের ভাবনায় আঁকা প্রতিটি দৃশ্য যেন ওই আল্লাহর আকাশে ফুটে উঠেছিল। যে আকাশের মালিক শুধুমাত্র আল্লাহ্, আর এই কথাটা তার আম্মু তাকে জানিয়েছিল। হৃদয় মুগ্ধ চাহনীতে তার ছোটবেলার দৃশ্যগুলো দেখছিল, কিন্তু হঠাৎ সব কেমন যেন ভ্যানিশ হয়ে গেল। হৃদয়ের মাঝে তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে কেবল অসহায় দৃষ্টিতে ওই আকাশপানে চেয়ে রইল।
দেখতে দেখতে হৃদয়ের জীবন থেকে প্রায় ২০ বছর পেরিয়ে গেল, ছোট্ট হৃদয় সেদিন মাগরিবের সময় তার মাকে আর আল্লাহকে দেয়া কথা রেখেছিল। কিন্তু আজ এক মাগরিবের সময় তার মনে দহন সৃষ্টি হলো, সেই কথা খেলাপ হলো বলে। হৃদয় থেমে থেমে উচ্চারণ করল,
“অ্যা'ম স্যরি আম্মু!”
কথাটি বলার সাথে সাথে আকাশপথে এক হাস্যজ্জ্বল হৈমী নওরোজ ভেসে উঠল। হৃদয়ের বুকটা ধ্বক করে উঠল। কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করে, “আ.আম্মু?”
কিশোরী বয়সী হৈমী নওরোজের দুধে আলতা গায়ের রঙ, নজরকারা নিপুণ চেহারা, পায়ের পাতা সমান ঘনকালো চুল ছিল। আজও সেই একইরকমভাবে হৃদয়ের কল্পনায় এসেছে। মায়ের রূপ দেখে হৃদয় বোধয় একটু হাসতে চাইলো। ঠিক যেভাবে ছোটবেলায় মাকে দেখে হাত তালি দিতে দিতে মায়ের সৌন্দর্যের প্রশংসা করে করে মুখে ফেনা৷ তুলে ফেলত। আজও সেভাবে হাসার ভীষণ চেষ্টা করল। কিন্তু পারলো না। যে হাসি তার জীবন থেকে ১৫ বছর আগে হারিয়ে গেছে, সেই হাসি নতুন করে আর ফেরত আনতে পারলো না। হৃদয় ব্য’থাতুর কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“ওরা আমার থেকে তোমাকে কেড়ে নিয়েছে আম্মু।”
হৈমী নওরোজের মৃদু কণ্ঠ,
“কারো থেকে কাউকে কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই আব্বু।”
হৃদয় ছোট বাচ্চার মতো মায়ের কাছে অসহায় কণ্ঠে বিচার দেয়, “জানো আম্মু, তোমার আল্লাহ আমাকে ভীষণ দুঃখ দিয়েছে।”
হৈমী নওরোজের নারাজ কণ্ঠ,
“যেটুকু সুখ পেয়েছ, সেটুকুও তো আমার তোমার আল্লাহ-ই দিয়েছে আব্বু। কখনো আল্লাহর সাথে নাফরমানি করে আমাকে দুঃখ দিওনা আব্বু। আমার শিক্ষার মান রেখো।”
উত্তরে হৃদয় বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। তার ভাঙা স্বর, “আমার তোমাকে ভীষণ মনে পড়ে আম্মু। তুমি আর কখনো আমার মাথায় তোমার স্নেহের হাত রাখবে না আম্মু?”
হৈমী নওরোজ এর ঝাপসা দৃষ্টির সাথে মলিন কণ্ঠ,
“আমার মালিক যে সে পথ যে বন্ধ করে দিয়েছে আব্বু।”
হৃদয়ের বুক ব্য’থা করে। ছেলেটার টকটকে র’ক্তলাল লাল চোখদুটো থেকে পানি বেরোতে চাইছে বোধয়। তার আগেই হৈমী নওরোজের কঠোর স্বর ভেসে আসে,
“আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত কখনো চোখের জল ফেলতে নিষেধ করেছিলাম। ভুলে গেছো আব্বু?”
হৃদয় শুকনো ঢোক গিলল। কোনোকিছু চুমুক দিয়ে শুষে নেয়ার মতোন করে হৃদয় তার চোখদু'টো খড়খড়ে করে ফেললো। যেখান থেকে দুর্বল সত্তার নোনা পানি নয়, ঝরলে তাজা র'ক্ত ঝরবে। অতঃপর সে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“তোমার দেওয়া শিক্ষার একটি অক্ষরও আমি ভুলিনি আম্মু। প্রতিকূল স্রোতে ভেসে যাওয়া কোনো খড়কুটো আমি নই, আমি তোমার দেওয়া শিক্ষায় বেড়ে ওঠা এক বটবৃক্ষ। যার ধমনীতে প্রতিকূল পরিবেশে মাথা উঁচু করে বাঁচার শক্তি প্রবল।”
ততক্ষণে অসম্ভব সৌন্দর্যের অধিকারী হৈমী নওরোজ হৃদয়ের আম্মু হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তবে হৃদয়কে বিন্দুমাত্র বিচলিত দেখা গেল না। তার অসহায় দৃষ্টিজোড়া আকাশপানের একই জায়গায় নিবদ্ধ। সে অশান্ত হবেই বা কেন? তার জীবনে এসব কল্পনা কি নতুন না-কি? বরং এই কল্পনাগুলো তাকে নতুন করে ভালো রাখে। ওই যে একটু-আধটু মায়ের দেখা পাওয়া যায়। হোক না কল্পনায়, তার কাছে তো জীবন্তই লাগে। হৃদয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও নিজেকে মুক্ত করতে ধীরে ধীরে বাদিকে সরে আসে। সরতে গিয়ে একটি পাথরে দ্বিতীয়বারের মতো মাথায় আ'ঘা'ত লাগে। এসব ব্য’থা হৃদয়ের উপর এবারেও বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলে না। সে বেশ কসরত করে ধীরে ধীরে বাঁধা হাত-পা নিয়েই উঠে বসে। বাঁধা দু'হাত সামনে এগিয়ে নিয়ে আন্ধারে হাতিয়ে হাতিয়ে কিছু খুঁজল। হঠাৎ-ই একটি ধারালো পাথরে গিয়ে হাত দু'টো আ'ঘা'ত লাগে। হৃদয়ের হাত থেমে যায়। সে সেই পাথরে বাঁধা দু'হাত ঘষতে শুরু করে। অন্ধকারে বুঝতে পারছে না তার হাত আসলে কি দিয়ে বাঁধা। তবে এটুকু বুঝতে পারছে, এটা খুব মানে খুবই শ'ক্ত। হৃদয় থামলো না। সে একইভাবে দু'হাত এদিক-ওদিক করে হাতের বাঁধন খুলতে উদ্যত হলো। কিন্তু লাভের লাভ তেমন হলো না। সেই দড়ি ছেড়ার বদলে হৃদয়ের দু'হাত ধারালো পাথরে ঘর্ষণ লেগে হাত দু'টো ছিঁলে গিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে একপর্যায়ে হৃদয়ের দু'হাত কেটে টপটপ করে র'ক্ত ঝরতে শুরু করল। কিন্তু তাতে হৃদয়ের বিন্দুমাত্র ভাবান্তর নেই। সে এক সেকেন্ডের জন্যও থামলো না। তাকে এখান থেকে যেকোনো মূল্যে মুক্ত হয়ে নামাজ পড়তে হবে। মাকে দেয়া কথা রাখতে হবে, আল্লাহকে দেয়া কথা রাখতে হবে। আপাতত এটাই তার একমাত্র লক্ষ্য। র'ক্তমাখা দু'হাত ধারালো পাথরে ঘষতে ঘষতেই হৃদয় বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করে,
“O Allah, Please help me. I seek you with all my heart.”
[হে আল্লাহ, দয়া করে আমাকে সাহায্য কর। আমি আমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে তোমার সান্নিধ্য চাই।]
___________________
সেই যে সকালে রজনী নীতির ঘরে আসল, এরপর আর কোথাও যায়নি মেয়েটি। সারাদিন এই ঘরেই লুকিয়ে থেকেছে। নীতির ভাগের খাবার আজ সত্যিই সত্যিই সব রজনীর পেটে গিয়েছে। আর নীতি খেয়ে থেকেছে চানাচুর আর বিস্কুট। কি আর করবে, আজ নিলয় ভাই বাড়ি ছিল। নিলয় ভাইয়ের জহুরি চোখ ফাঁকি দিয়ে বেচারি একজনের জায়গায় দু'জনের খাবার নিজের ঘরে আনতে পারেনি। শেষমেশ অসহায় হয়ে শুকনো খাবার খেয়েই চালিয়ে দিয়েছে। মাগরিবের নামাজ পড়ে নীতি জায়নামাজ ভাঁজ করে রাখে। আশেপাশে তাকিয়ে রজনীকে খুঁজলে দেখল রজনী জানালার কাছে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি কখনোই এতো শান্ত নয়, ভীষণ-ই চঞ্চল এক মেয়ে রজনী। কিন্তু আজ সেই মেয়েটা একদম শান্ত হয়ে গেছে। নীতির খানিকটা অবাক লাগলো, তবে সে রেশ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কারণটাসে জানে। গ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ায় তার বাবা মাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে, এ কথা শোনার পর থেকেই রজনীর এই অবস্থা। মেয়েটা অনুতাপে ভুগছে। নীতি এগিয়ে এসে রজনীর পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
“নামাজ পড়লে মনে শান্তি আসে রজনী।”
রজনী বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“তোর নামাজ তুই পড়। আমার এসব ভাল্লাগে না, বিরক্তিকর!”
রজনীর কথায় নীতি অবাক হয়না। রজনী মেয়েটা কেমন যেন অদ্ভুদ টাইপ। এমন নয় যে মেয়েটা খারাপ। মানুষ হিসেবে সে যথেষ্ট ভালো। কিন্তু তার চালচলন ভালো নয়। ভালো নয় বলতে, এই যে নামাজের প্রতি অনীহা, এরপরখোলামেলাভাবে চলাফেরা। এসব রজনীর মাঝে প্রবল। হঠাৎ-ই রজনী নীতির দিকে ফিরে বলে,
“আমি বাড়ি যেতে চাই নীতি। আব্বা, আম্মাকে ছাড়া আর একটুও থাকতে পারছিনা আমি।”
রজনীর কণ্ঠে অসহায়ত্ব। নীতি আর জোর করল না। এখন যাওয়াই ভালো হবে। বেশি রাত হয়ে গেলে আবার ঝামেলা। নীতি মাথা নেড়ে বলে,“আচ্ছা যা। আমি এগিয়ে দিব?”
রজনী ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“না না লাগবে না। আমি যাচ্ছি।”
কথাটা বলে রজনী বেলকনির দিকে যেতে নিলে নীতি রজনীর হাত টেনে ধরে বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“ওড়না ছাড়াই বাইরে যাবি? তোর মাথায় কি বুদ্ধিশুদ্ধি কিছুই নেই রজনী?”
রজনী নিজের দিকে তাকালো। তার সব কাপড়ে অনেক ময়লা লেগে যাওয়ায় গোসল করে নীতির একটি জামাপায়জামা পরেছিল। নীতির চেয়ে সে একটু শুকনো হওয়ায় জামা ঢিল হয়েছে। এজন্য সে ওড়না নেয়ার প্রয়োজনবোধ করছে না। এসব জামা কাপড় পরার অভ্যেস তার নেই। সে শাড়িতেই অভ্যস্ত। সেখানে আবার ওই উটকো ঝামেলা ওড়না নিতে রজনীর হাজারখানা বিরক্তি। নীতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“একটু ঢেকে থাকতে পারিস না? এতো খোলামেলাভাবে কিভাবে চলাফেরা করিস?”
রজনী সহজ উত্তর, “আমার দমবন্ধ লাগে।”
নীতি ভ্রু কুঁচকে বলে,
“সামান্য গায়ে ওড়না জড়াতে আর মাথায় কাপড় দিলেই তোর দমবন্ধ লাগে? দেখবি একদিন তোর জীবনে এমনকেউ আসবে, যার জন্য তুই
তোর চোখদু'টো পর্যন্ত ঢেকে রাখতে বাধ্য হবি। আর সঠিক সময়ে নামজ পড়ার জন্য রীতিমতো দৌড়াবি।”
রজনী বিরক্তির শ্বাস ফেলে বলে,
“তুই ভুল ভাবছিস, আমি কখনোই এসব বিরক্তিকর পর্দায় নিজেকে মোড়াতে পারবো না। আর নামাজটাও আমার দ্বারা হবে না। এসব তোদের মতো হাজীদের জন্যই ঠিক আছে।”
নীতি কিছু একটা ভেবে বলে,
“খুব বিশ্বাস করলাম। এইজন্যই এক ছেলের কথায় পুরো ১২ ঘণ্টা গায়ে বোরখা জড়িয়ে ছিলি, তাইনা? তোর মায়ের হাতে কত মার খেয়েছিলি মাথায় কাপড় না দেয়ার জন্য, তবুও
জেদ্দী তুই ভুলেও মাথায় কাপড় তুলিসনি৷ আর সেই ছেলের এক কথায় বোরখা পরে নিলি? আর একদিন থাকলে হয়ত নামাজটাও আদায় করে নিতি, যা এই জীবনে করিসনি। সে যাক, ছেলেটা কে রে?”
রজনী এবার প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে বলে,
“তুই যা ভাবছিস তা নয় নীতি। নতুন শহরে গিয়ে আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। কি করেছি নিজেই জানিনা। নিজেই নিজেকে চিনতে পারছিলাম না। এইতো আমি আমার গ্রামে চলে এসেছি। এবার আমার সামনে বাঘ আসলেও এই রজনী তাকে ভয় পাবেনা।”
নীতি শব্দ করে হেসে দেয়। তার বড়সড় ওড়না এনে রজনীর মাথাসহ শরীরে ঢেকে দিয়ে বলে,
“সময় কিন্তু কথা কয়!”
রজনী শরীর থেকে ওড়না ছুঁড়ে ফেলতে চাইলো। নীতিআটকে দিয়ে বলে, “রাত হলেও গ্রামের কেউ তোকে দেখে নিতে পারে। এই কারণে অন্তত নিজেকে ঢেকে রাখ পাখি। আমার কথাটা শোন।”
রজনী নীতির কথা মেনে নীতিকে জড়িয়ে ধরে নীতির গালে একটা চুমু খেয়ে মৃদু হেসে বলে,
“আচ্ছা পাখি শুনলাম তোর কথা। আজ আসি। টাটা।”
কথাটা বলে রজনী আর এখানে দাঁড়ালো না। ব্যস্ত হয়ে বেলকনিতে গিয়ে বেলকনি থেকে এক লাফ দিয়ে কাঁচা মাটিতে নেমে এক দৌড় দিল।
_____________________
হৃদয়ের দু'হাত র'ক্তে মাখামাখি হয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে সে কোনো এক র'ক্তের নদীতে তার দু'হাত ডুবিয়ে এনেছে। শরীরে সামান্য ক্লান্তি। কিন্তু হৃদয়ের হৃদয়ে .কোনো ক্লান্তি আসেনি। শরীরের সেই সামান্য ক্লান্তিটুকুরসাথে ব্য’থার বিন্দুমাত্র ছাপ তার মুখাবয়বে নেই। সে এখনো তার বাঁধা হাতের খুলতে ব্যস্ত। তার বিশ্বাস, আর দু'সেকেন্ডের মাঝেই এই বাঁধন ছিঁড়ে যাবে। সত্যি সত্যিই তাই হলো। ঠিক দু'সেকেন্ডের মাথায় ঝট করে হৃদয়ের হাতের বাঁধন ছুটে যায়। সেই একই সময় ঘরটিতে সামান্য আলোর একটি লাইট জ্বলে ওঠে, সাথে সামনে থেকে একটি মেয়ে কারো ধাক্কা খেয়ে হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ে হৃদয়ের বুকের উপর। যার জন্য হৃদয় মোটেও প্রস্তুত ছিল না। এমনিতেই এতক্ষণ একপ্রকার যুদ্ধ করে নিজের হাতের বাঁধন ছুটিয়েছে, স্বস্তির নিঃশ্বাসটুকু নেয়ার আগেই আরেকটি ঝামেলা এসে জুটলো। তাও আবার যে সে ঝামেলা নয়, সেই ঝামেলা যা সে একফোঁটাও সহ্য করতে পারেনা। মেয়েদের গায়ে টাচ লাগলে আ'গু'ন ধরে যায়তার শরীরে। ঠিক যেমন এখন হলো। হৃদয় মেয়েটিকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগটুকু দিল না। ভ'য়া'ন'ক রা'গে র'ক্তা'ক্ত ডান হাত উঠিয়ে মেয়েটির কাঁধ বরাবর হাত রেখে সর্বশক্তি দিয়ে মেয়েটিকে তার বুক থেকে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলে। হৃদয়ের শক্তিশালী এক ধাক্কায় মেয়েটি ফুটবলের মতো উল্টে গিয়ে দেয়ালের সাথে মাথাসহ পুরো শরীর জোরেসোরে ধাক্কা খায়। তীব্র ব্য’থা পেয়েও মেয়েটি টুঁশব্দ করল না। ব্য’থা সয়ে নেয়ার অসীম সহ্যক্ষমতায় মোড়া রজনী দাঁতে দাঁত চেপে ব্য’থাটুকু গিলে নিল। ডান হাতে কোমর চেপে ধরে রেখেছে। মেয়েটি বুঝতেও পারলো না, কে তাকে এই ঘরে ধাক্কা দিল, কে-ই বা আবার দ্বিতীয়বারের মতো এমন শট মারলো। সে তো মাথায় কয়েক হাত ঘোমটা টেনে নিজেকে ঢেকে দৌড়ে দৌড়ে তার বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ কি যে হলো!
ঘোমটার আড়ালে থাকা রজনীর দিকে হৃদয়ের রাগান্বিত দৃষ্টি ক'সেকেন্ড নিবদ্ধ ছিল। তার বুকে আছড়ে পড়ার অপরাধে হৃদয়ের ইচ্ছে করল, একে পাথর নিক্ষেপ করে এক্ষুনি একেবারে হ'ত্যা করে ফেলতে। কিন্তু সে বহুক'ষ্টে নিজেকে সামলে র'ক্তা'ক্ত হাত দু'টো দিয়ে পায়ের বাঁধন খুলল। এরপর ব্যস্ত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলে একজন আধবয়সী লোক ঘরের ভেতর প্রবেশ করে হৃদয়ের সম্মুখ বরাবর দাঁড়ায়। তার দৃষ্টি ঘোমটা দেয়া রজনীর এলোমেলো কাপড়ের দিকে যায়, মেয়েটির হাত-পা অনেকটা পর্যন্ত উম্মুক্ত। হৃদয় বিরক্ত হয়ে লোকটিকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে অজ্ঞাত লোকটি হৃদয়ের কলার চেপে ধরে রেগে বলে,
“রাত-বিরেতে মেয়েটার সাথে ফ’ষ্টিন’ষ্টি করে এখন সেই মেয়েকে রেখে পালাচ্ছিস? ওই মেয়েকে বিয়ে করে তবেই এই গ্রামের বাইরে পা রাখতে পারবি, তার আগে নয়।”
হঠাৎ অপ্রস্তুত কিছু কথা শুনে হৃদয় হতভম্ভ হয়ে যায়। দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে লোকটির দিকে তাকায় হৃদয়। লোকটি তার বাবার বয়সী না হলে এতোক্ষণে হয়ত সে লোকটিকে এই গ্রামের মাটির তলায় পাঠিয়ে দিত। লোকটি হৃদয়কে কথাটি বলে, সামান্য দূরত্বে দাঁড়ানো রজনীর উদ্দেশ্যে বলেন,
“এ্যাই মাইয়া তোর নাম ক।”
অপরিচিত দু'জন মানুষের সামনে দাঁড়ানো বুক সমান ঘোমটার আড়াল থেকে রজনী ভ'য়ে কাঁপছে। লোকটির মুখে বিয়ের কথা শুনেই রজনীর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে .আসছে। গ্রাম সম্পর্কে তার খুব ভালো ধারণা আছে। গ্রামে .এসব নতুন কিছু নয়। কিন্তু তার বিয়ে হয়ে গেলে তার কি হবে? আর তার আব্বা আম্মা? রজনীর কান্না পাচ্ছে। এ কোথায় ফেঁসে গেল সে?
রজনীকে চুপ দেখে আরেকজন লোক রজনীর সম্মুখ বরাবর দাঁড়িয়ে ধমকের স্বরে বলে,
“কি রে মাইয়া তোর নাম কস না ক্যা? নাক ক কইতাছি।”
রজনী কি করবে ভেবে পায় না। এটা তো তারই গ্রাম। তাকে দেখলে, তার নাম শুনলে হয়তো এরা চিনে ফেলবে। তখন তার কি হবে? এক বিপদ থেকে উঠতে না উঠতেই আরেক বিপদ। লোকটির আরেকটি ধমকে রজনী ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। তার পুরো নাম ‘মেহজাবীন রজনী হৈমন্তিকা’ মেহজাবীন রজনী নামে সবাই তাকে চিনলেও হৈমন্তিকানামে এই গ্রামে কেউ তাকে চেনে না। একমাত্র তার বাবা-মা আর নীতি জানে এই নাম। অতঃপর রজনী উত্তরে বলে,
“হৈমন্তিকা।”
রজনী কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। মেয়েটির ভয়েস সামনের লোকটি ব্যতীত আর কেউ শুনতে পায়নি।
লোকটি শব্দ করে উচ্চারণ করে,
“হৈমন্তিকা। মেলা কঠিন নাম।”
হৃদয় অপরিচিত মেয়েটির দিকে র'ক্তলাল চেয়ে বিড়বিড় করে,
“আমার প্যারট-ফ্লাওয়ারের জায়গা কেউ নিতে আসলে তার জায়গা এই জমিনে হবে না ইনশাআল্লাহ। নেভার-এভার। লাইক ইউ মিস হৈমন্তিকা।”
কথাটি বলতেই হৃদয়ের আরেক মন বলে উঠল,‘তুই মায়ার জালে ভর্তি মেয়েদের সাথে নিজেকে জড়িয়েনিবি হৃদয়? তুই জানিস না মেয়েরা শুধু ছলচাতুরী করতে জানে? ছেলেদের ঠকাতে জানে? তারা ভালোবাসতে জানেনা। আর যে মেয়েরা সত্যিকারের ভালোবাসতে জানে, তাদের কপালে মৃ'ত্যু অবধারিত।’
হৃদয় শুকনো ঢোক গিলে। সে তার অপর মনের বলা কথাটির ঘোর প্রতিবাদ করে বিড়বিড়িয়ে বলে, ‘আমি প্যারট-ফ্লাওয়ারকে চাইনা। আমি শুধু তার জায়গা আজীবন শূণ্য রাখতে চাই।’
ওদিকে হৃদয়ের সামনে দাঁড়ানো লোকটি হৃদয়ের কাঁধে একটা ধাক্কা মেরে বলে,
“এ্যাই ছেঁড়া একা একা কি বকরবকর করিস? তোর নাম ক তাত্তাড়ি।”
ভাবনায় ব্য’ঘাত ঘটায় হৃদয় লোকটির দিকে রে'গে তাকায়। র'ক্তমাখা দু'হাত বারবার মুঠো পাকায়। ভাগ্যিস মায়ের শিক্ষায় তার মাঝে আজও একটু-আধটু ভদ্রতা বজায় আছে, নয়তো বাবার বয়সী তো দূর, দাদার বয়সী বে'য়া'দ'ব লোকদেরকেও সম্মান করার সময় হৃদয় তার হাতে রাখতো না। সে চোখ বুজে ফোঁসফোঁস করতে করতে ক্ষীণ স্বরে বলে,
“শাহরিয়ার।”
হৃদয়ের ভয়েসটিও ছিল ক্ষীণ, যা রজনীর কানে পৌঁছালো না। সে ওড়নার আড়ালে দু'হাত মোচড়ায় আর ভাবে কিভাবে এখান থেকে পালাতে পারবে। লোকটি হৈমন্তিকা নামটি যেভাবে শব্দ করে উচ্চারণ করেছিল, এবারেও হৃদয়ের শাহরিয়ার নামটি শব্দ করে উচ্চারণ করে। এবার শাহরিয়ার নামটি রজনীর কান অব্দি পৌঁছায়। . .
রজনী হাজার চেষ্টা করেও এখান থেকে পালাতে পারেনি। শেষমেশ মেয়েটি তার নামসহ তার বাবা মায়ের যে নামগুলো বলেছে এই নামগুলো তাদের নিকনেইম বলা যায়, যে নামগুলোয় গ্রামের মানুষ রজনীসহ রজনীর বাবা-মাকে চেনে না।। আর সে নামেই হৃদয়ের সাথে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
আর মাথা গরম মানুষ হৃদয় বিয়ের আগ পর্যন্ত মাথা গরম রাখলেও বিয়ের পর একেবারে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মূলত সে শান্ত হয়নি, ঝড় আসার পূর্বে শান্ত পরিবেশের মতো চুপ হয়ে আছে। গ্রাম সম্পর্কে তার একটু-আধটু ধারণা থাকলেও এতোটা ছিল না। তবে এবার ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে। ইচ্ছে করছে এই গ্রামের প্রতিটি মানুষকে টেনে হিঁচড়ে বের করে সবকটাকে কু’পি’য়ে মে'রে ফেলতে। কারণ হৃদয়ের মনে হচ্ছে এই গ্রামের সকলেই টক্সিক। যাদের কাজই হচ্ছে একে-অপরকে ধরে বেঁধে বিয়ে দেয়া।
ঘরের এক কোণায় দাঁড়ানো রজনীর গায়ে মাথায় এখনো ওড়না দ্বারা ঘোমটা টানা। মেয়েটা শরীরের ব্য’থায় নয়, মনের ব্য’থায় কেঁদেকেটে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। তার আব্বা-আম্মার কানে এতোবড় কেলেঙ্কারির কথা গেলে বা গ্রামবাসীর কানে গেলে তাদের কি হবে? মানুষ তো সত্যি সত্যিই রজনী, রজনীর পরিবার নিয়ে ছিঃ ছিঃ করবে, সবাই তার মুখে থুতু ছুঁড়ে ফেলবে। না না। এতো অপমান সে নিজেও নিতে পারবেনা, আর না তো তার আব্বা-আম্মাকে দিতে পারবে! রজনী ভাবল, কেউ তাকে চিনে ফেলার আগেই তাকে এখান থেকে পালাতে হবে। তবে কেউ আর তার হদিশ পাবে না। কারণ সে তারসহ তার বাবা-মায়ের যে নাম বলেছিল, সেই নামগুলো গ্রামের কেউ জানেনা। সাথে এখন পর্যন্ত কেউ তার মুখ দেখেনি। এই দু'টো কারণেই সে বেঁচে যাবে, যদি সে এখান থেকে পালাতে পারে। ভাবনা অনুযায়ী রজনী ওড়নার ফাঁক দিয়ে এই পুরোনো বিদঘুটে ঘরের দরজা খুঁজল। তার থেকে সামান্য দূরত্বে ডানদিকেই ঘরের দরজা দেখে রজনী বুক ভরে শ্বাস নেয়। সুযোগ বুঝে মেয়েটা বিচ্ছুর মতো এক দৌড়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়। শব্দ পেয়ে হৃদয় দ্রুত দরজা দিকে তাকালে দেখল মেয়েটি দৌড়ে পালাচ্ছে। যা হৃদয়ের বিন্দুমাত্র পছন্দ হলো না। সে দ্রুতপায়ে ঘর থেকে বের হয়ে সামনে তাকালে দেখল মেয়েটি দিকবিদিকশুন্য হয়ে দৌড়াচ্ছে। হৃদয় এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে রজনীর পিছু দৌড়ায়।
রজনী বুঝতে পারে, কেউ তার পিছে দৌড়ে আসছে। মেয়েটা ভীষণ ভ'য় পায়। পায়ের গতি বাড়ায়। মাথায় টানা ওড়না বাতাসে উড়ে যায়, রজনী দৌড়াতে দৌড়াতেই হাত দিয়ে আটকাতে চাইলো, কিন্তু পারলো না। মেয়েটার ভীতির পরিমান কয়েকশো গুণ বাড়লো। লোকটা তার চেহারা দেখে নিলে যে তার সব শেষ হয়ে যাবে। মেয়েটি আরও জোরে দৌড়ায়। ঝাঁকি লেগে রজনীর খোপা করা চুলগুলো ধীরে ধীরে খুলে যায়। একপর্যায়ে রজনীর লম্বা চুলগুলো একেবারে খুলে গিয়ে মাটি ছুঁইছুঁই হয়ে যায়।
যদিও ধরনীতে আন্ধারের ছড়াছড়ি। তবে চাঁদের আলোয় রজনীর লম্বা চুলগুলো হৃদয়ের চোখ এড়ায় না। ছেলেটার দৌড় না থামলেও হৃদয়টা এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। এটা তো অবিকল তার মায়ের চুল। হৃদয়ের দৌড়ের গতি ধীরে ধীরে কমে আসে। হঠাৎ-ই হৃদয় দৌড়ের মাঝেই মাথা এদিক-ওদিক নাড়িয়ে নিজেকে সামলায়। দৌড়ের গতি বাড়িয়ে বড়সড় একটি লাফ দিয়ে বাম পা দ্বারা মাটি ছুঁইছুঁই রজনীর চুলের একটি বড় অংশ শ’ক্ত করে চেপে ধরে। ফলস্বরূপ রজনী আর সামনে এগোতে পারেনা। মাথাটা সামান্য পিছনদিকে হেলে আসে। দু’হাত পিছনে নিয়ে মাথা চেপে ধরে চোখমুখ কুঁচকে নেয়। সে শব্দহীন সামনে দিকে সরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়।
হৃদয়ের রাগান্বিত দৃষ্টি অন্ধকারের মাঝে রজনীর ঝাপসা অবয়বে। সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করে হৃদয়। পা দ্বারা চেপে ধরা রজনীর চুল ওভাবেই ধরে রেখে লালিত চোখজোড়া আকাশপানে রেখে সূরা বাকারাহ এর (২৩২) নাম্বার সুরেলা কণ্ঠে তেলাওয়াত করে,
অর্থ : যখন তোমরা (তোমাদের) স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দাও, অতপর (তালাকপ্রাপ্ত) স্ত্রীরা তাদের নির্ধারিত অপেক্ষার সময় (অর্থাৎ ইদ্দত পালন) শেষ করে নেয়, তখন তোমরা তাদের (পছন্দমতো) স্বামীদের সাথে বিয়ের ব্যাপারে বাধা দিয়ো না, (বিশেষ করে) যখন তারা (বিয়ের জন্যে) সম্মানজনকভাবে কোনো ঐক্যমতে পৌঁছে যায়; তোমাদের ভেতর যারা আল্লাহ তায়ালা ও পরকালীন জীবনের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের এর মাধ্যমে আদেশ দেওয়া যাচ্ছে; (মূলত) এটা তোমাদের জন্যে অধিক সম্মানের এবং অনেক পবিত্র (কর্মধারা, কারণ); আল্লাহ তায়ালা জানেন, তোমরা কিছুই জানো না।
আয়াতটি তেলাওয়াত শেষ করে হৃদয় চুপ হয়ে যায়। তার শান্ত দৃষ্টি তখনো আকাশপানে।
এদিকে রজনী একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়। সে এ জীবনে হাজার হাজার গান শুনেছে। কিন্তু এমন সুরেলা কণ্ঠে তেলাওয়াত সে আগে কখনো শোনেনি। মেয়েটি এতোটাই অজ্ঞ যে হৃদয় যে কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছে, সেটাও সে বুঝতে পারছে না। সে শুধু বুঝতে পারছে, এইমাত্র সে এতো সুরেলা কণ্ঠে কয়েকটি লাইন শুনেছে সেটি তার চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে। হৃদয় ঠান্ডা করে দিয়েছে। রজনীর মনে প্রশ্ন জাগে, লোকটি কি এমন বলল? ওই শব্দগুলো শুনে তার এতো শান্তিই বা কেন লাগলো? ভাবনার মাঝেই তার কানে হৃদয়ের শ'ক্ত কণ্ঠ ভেসে আসে,
“লিসেন মিস হৈমন্তিকা, আমি তোমাকে তালাক দিতে চাই।”
কথাটি শুনতেই রজনীর বুকটা কেমন যেন করে উঠল। নাহ সে হৃদয়ের কণ্ঠ চিনতে পারেনি। কারণ হৃদয়ের কণ্ঠ আজ পুরোপুরি ডিফরেন্ট। একেবারে ভাঙা। এজন্যই মূলত রজনী হৃদয়ের কণ্ঠ চিনতে পারলো না। তার হঠাৎ কি হলো কে জানে। সে মাথা নিচু করে উল্টো ঘুরে গায়ের জোরে হৃদয়ের বুক বরাবর দু’হাতে একটি ধাক্কা মেরে বেখেয়ালি হৃদয়কে দু'পা পিছিয়ে দেয়। এরপর রজনী উল্টোদিকে ফিরে সর্বশক্তি দিয়ে দৌড় দেয়। অন্ধকার প্লাস রজনীর মাথা নিচু, হৃদয়ের অন্যদিকে নজর, রজনীর মাথা নিচু সবমিলিয়ে হৃদয় রজনী কেউই কাউকে চিনতে পারলো না।
রজনীর ধাক্কা খেয়ে হৃদয় রে'গে যায়। সাথে রজনীকে পালাতে দেখে তার রাগের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। চেঁচিয়ে বলে,
“পালাতে পারবে না তুমি, মিস হৈমন্তিকা। তালাক না নিলে তোমার মৃ’ত্যু আমার হাতে অনিবার্য।”
কথাটা বলে রা'গে হৃদয় বাম হাত মুষ্টিবদ্ধ করে পাশে একটি গাছ বরাবর পাঞ্চ মে'রে দেয়। র'ক্তা'ক্ত হাত থেকে আরও খানিক তাজা র'ক্ত গাছ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তবে কঠোর হৃদয় নির্বিকার। তার মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত জ্বলছে অন্যকেউ তার বউ ভেবে। . রজনীর কি হয়েছে কে জানে। মেয়েটা দৌড়াচ্ছে আর নিঃশব্দে কাঁদছে। মেয়েটি বাহ্যিক ব্য’থায় তো কাঁদেনা। তবে কি মনে ব্য’থা পেয়েছে? সে জানেনা। কিচ্ছু জানেনা। সে এলোমেলো পায়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বিড়বিড়িয়ে বলে, “জানিনা কেন, আমি আপনার থেকে তালাক চাইনা।
আমাকে ক্ষমা করবেন ‘শাহরিয়ার সাহেব’।”
চলবে............. |
0 Comments