লেখক:DRM Shohag পর্ব:০৪
----------------
হৃদয়ের বড় ভাই হৃদম নওরোজ মাত্র বাড়িতে প্রবেশ
করেছে। দু'হাত ভর্তি বাজারের ব্যাগ। ছেলেটির বয়স ৩৪
এর কোঠায়। গত পাঁচবছর আগে বিয়ে হয়েছে তার। ঘরে
চার বছরের একটি ছেলে বাচ্চা আছে। যার নাম রূপম।
হৃদম সপ্তাহে একদিন করে নিজ দায়িত্বে বাজার করে।
এটা তার দায়িত্বের পাশাপাশি ছোটোখাটো ইচ্ছেও
বলা যায়। সে বাড়ির ভেতর আসতে আসতে রূপসা
ডাকতে
লাগে বাজারের ব্যাগগুলো ধরার জন্য। কয়েক পা এগিয়ে
আসলে সিঁড়ির কাছে দাদুকে বসে খিলখিলিয়ে হাসতে
দেখে হৃদমের কপালে ভাঁজ পড়ে। পা জোড়া-ও থেমে
যায়।
এদিকে স্বামীর ডাকে রূপসা ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এসে
হৃদমের হাত থেকে বাজারের ব্যাগগুলো নিয়ে পাশেই
রেখে দেয়। হৃদম জিজ্ঞেস করে, “দাদুর কি হয়েছে?”
রূপসা জানায়, ‘তারা নিজেরাও জানে না।’
হৃদম এগিয়ে এসে তার দাদুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। ভ্রু
কুঁচকে বলে,
“কি হয়েছে দাদু? পা'গ'ল টা'গ'ল হলে না-কি? একা একা
এভাবে হাসছ কেন?”
আরমান নওরোজ বড় নাতিকে দেখে নিজেকে
সামলানোর চেষ্টা করে। হৃদম মাথা উঁচু করলে সিঁড়ির
কোণায় দাঁড়ানো অপরিচিত এক মেয়েকে দেখে ভ্রু কুঁচকে
তাকায়। এরকম অদ্ভূত গ্রাম্য স্টাইলের মেয়েকে দেখে
বলে,
“এই মেয়েটা আবার কে?”
আরমান নওরোজ বা হাত হৃদমের কাঁধে রেখে ধীরে ধীরে
ওঠার চেষ্টা করলে হৃদম তার দাদুকে ধরে উঠতে সাহায্য
করে৷ ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ানোর পর হৃদমের উদ্দেশ্যে
ফিসফিস কণ্ঠে বলে,
“ও আমাদের হৃদয় দাদুভাইয়ের বউ!”
কথাটা শুনতেই হৃদম শব্দ করে বলে ওঠে, “কিহ্!”
হৃদমের এরকম রিয়েকশনে সকলে অদ্ভূতভাবে তাকায়।
আরমান নওরোজ বিরক্ত হলো। হৃদমের হাত ধরে টেনে
একটু সাইড দিকে টেনে এনে বলে,
“চেঁচাচ্ছো কেন?”
হৃদম নিজেকে সামলে বলে,
“তোমার মাথা খারাপ? হৃদয় কি করে বিয়ে….”
কথাটা বলতে বলতে হৃদম রজনীর দিকে তাকিয়ে থেমে
যায়। মনে পড়ল, হৃদয় নিলয়ের বোনের বিয়ে খাওয়ার
জন্য গ্রামে গিয়েছিল। আর আজ এক গ্রামের মেয়েকে
সাথে করে এনেছে। হিসাব তো ভালোই মিলে গেল! কিন্তু
হৃদয়!
আরমান নওরোজ রূপসার উদ্দেশ্যে বলে,
“রূপসা দিদিভাই, রজনী দিদিভাইকে হৃদের পাশের
রুমটাতে রেখে এসো।”
মেয়েটি তার দাদা-শ্বশুরের কথা মেনে এগিয়ে এসে
রজনীর সামনে দাঁড়ালো। এরপর রজনীর হাত ধরে সিঁড়ি
বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। রজনী আড়চোখে মেয়েটিকে
দেখছে আর সিঁড়ি দিয়ে একটু একটু করে উঠছে।
অপরিচিত এক বাড়িতে কোথায় যাচ্ছে, কিভাবে থাকবে,
ক'দিন থাকবে, আবার কোনো প্রবলেম হবে কি-না
সবমিলিয়ে মেয়েটি তটস্থ।
রূপসা রজনীকে নিয়ে চলে গেলে আরমান নওরোজ গলা
ঝেড়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে,
“মেয়েটির নাম রজনী। ও নিলয়দের গ্রামেরই মেয়ে।
আমাদের হৃদয় দাদুভাই গ্রাম থেকে আসার সময়
এক্সিডেন্টলি ওকে বিয়ে করে ফেলেছে। এরপর
মেয়েটিকে ফেলে শহরে চলে আসছিল। রজনী উপায় না
পেয়ে আমাদের হৃদের পিছু পিছু শহরে চলে এসেছে।”
আরমান নওরোজ এর কথা শুনে নাওমি নওরোজ আর
নিতু নওরোজ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। হৃদম ভ্রু কুঁচকে
বলে,
“তাহলে মেয়েটিকে হৃদয়ের পাশের রুমে রাখতে বললে
কেন? হৃদয়ের রুমেই ওকে থাকতে হবে। দাঁড়াও আমি
দেখছি ব্যাপারটা।”
কথাটা বলে হৃদম আরমান নওরোজকে পাশ কাটিয়ে
যেতে নিলে আরমান নওরোজ থতমত খেয়ে দ্রুত বড়
নাতির হাত টেনে ধরে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“তুমি তো তোমার ছোট ভাইকে চেনো হৃদম দাদুভাই। ও
মেয়েটিকে এক্ষুনি মানবে না। তোমাদের সবাইকে ওকে
কৌশলে মানাতে হবে, বুঝেছ?”
ততক্ষণে উপর থেকে রূপসা রজনীকে নির্দিষ্ট ঘরে রেখে
এসেছে। হৃদয়ের বাবাও সিঁড়ি বেয়ে নামছিল। দুই ছেলে-
বউ সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে আরমান নওরোজ এর
কথায় ভীষণ অবাক হয়। তাদের হৃদয় ইচ্ছে হোক বা
অনিচ্ছায় হোক, বিয়ে করেছে? ব্যাপারটা ঠিক হজম হতে
চাইলো না। তবে হৃদয় কাকে করেছে সেটা ফ্যাক্ট না, কিন্তু
বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ যে হয়েছে এটাই তো বড় বিষয়। এর
পিছনে অবশ্য কারণও আছে। হৃদয়ের বাবা তার বাবার
সামনে এসে বলে,
“এজন্যই তুমি মেয়েটিকে সাথে করে এনেছ বাবা? আর
হৃদয় কি সত্যিই বিয়ে করেছে? তুমি সত্যি বলছ?”
হৃদয়ের বাবার কণ্ঠে যেমন অবাকতা, তেমনি কিছুটা
খুশির আমেজ মিশে। মানুষের জীবনে কখনো না কখনো
কিছু উত্থান পতন আসে। হৃদয়ের বাবার মতে, তার ছোট
ছেলেটার জীবন ছোট থেকে একই নিয়মে চলছে। দেখতে
দেখতে এক যুগের বেশি পেরিয়ে গেল, কিন্তু হৃদয়ের
জীবন একটুও বদলালো না। ছেলেটা নির্দিষ্ট কয়েকটা
মানুষের থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, যার মধ্যে
সে একজন অন্যতম ব্যক্তি। বিয়ে নিয়ে হৃদয় যদিও
কখনো কিছু বলেনি। কারণ হৃদয়ের এখনো পড়াশোনা
শেষ হয়নি। তবে হৃদয়ের চালচলনে তাদের বাড়ির
প্রত্যেকে বুঝতে পারে, বিয়ের প্রতি হৃদয়ের মনের কোঠায়
তীব্র অনীহা জমে আছে। এর পিছনে অবশ্য কারণও
আছে। তবে জীবন তো এভাবে চলে না। ‘বাবা-ছেলের
মাঝে চিরদিন বিচ্ছেদ’ এভাবেও জীবন চলে না।
এতোগুলো বছর পর হৃদয়ের বাবার মনে হয়, বিয়ে নামক
বন্ধনে জড়ালে তার ছোট ছেলের জীবনে একটি বড়
উত্থান নেমে আসবে৷ যার মাধ্যমে হয়ত তাদের হৃদয়
আবারো আগের মতো হবে। হয়তো বিয়ে নামক বন্ধনের
মাধ্যমে হৃদয় আবারো স্বাভাবিক হবে। এর অছিলায়
হয়তো ছেলেটার সাথে বাবার সম্পর্কটাও হুট করে ঠিক
হয়ে যাবে। সবমিলিয়ে হৃদয়ের বাবা খুশি ছাড়া অখুশি
হলেন না।
এদিকে আরমান নওরোজ এগিয়ে এসে ডায়নিং টেবিলের
চেয়ার টেনে বসেন। এরপর সকলের উদ্দেশ্যে গম্ভীর
গলায় আদেশের সুরে বলেন,
“যত দ্রুত সম্ভব হৃদয় দাদুভাইকে সবাই মানাও। এরপর
ওদের ধুমধাম করে বিয়ে হবে। স্পেশালি হৃদম। হৃদয়
দাদুভাইয়ের বড় ভাই তুমি। তাই তোমার উপর সবচেয়ে
বেশি দায়িত্ব, বুঝলে?”
হৃদম দাদুর কথায় মাথা নেড়ে স্বায় জানিয়ে তার ঘরের
দিকে গেল৷ ফ্রেশ হয়ে হৃদয়ের ঘরে যাবে।
আরমান নওরোজ মুখে হাত দিয়ে সকলের আড়ালে
হাসলেন। আসার পথে রজনীর সাথে টুকটাক কথা বলে
জেনেছে রজনীর গ্রামের নামসহ, রজনীর বাবার নাম।
অবাক করার ব্যাপার হলো, সে রজনীকে চিনতে
পেরেছে। চেনার কারণ আছে। নিলয়ের দাদা আর
হৃদয়ের দাদা ছোটোবেলায় বন্ধু। নিলয়ের দাদা যদিও
মা'রা গিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। কিন্তু আরমান
নওরোজ বন্ধুত্বের সূত্রে বন্ধুর পুরো পরিবারকে এখনো
নিজের পরিবারের চেয়ে কমকিছু মনে করেন না। অর্থাৎ
নিলয়ের পরিবারকে সে তার-ই এক পরিবার মনে করেন।
সেই সূত্রে হৃদয়ের পরিবারের সকলেরই কমবেশি
নিলয়দের গ্রামে আসা-যাওয়া আছে। নিলয়ের পরিবারের
সবার সাথেই হৃদয়ের পরিবারের খুব দহরম সম্পর্ক বলা
যায়। এই যে বিয়ে খেতে গিয়ে নিলয় হৃদয়ের পরিবারের
সবাইকে অনেক জোর করেছিল। কিন্তু তারা কাজের
চাপে যেতে পারেনি। তবে আরমান নওরোজ রজনীর
বাবাকে চেনার একটি বিশেষ কারণ হলো, সে গ্রামে
গেলেই রজনীর বাবার ভ্যান ভাড়া করে সারা গ্রাম ঘুরে
বেড়ায়। সাথে ছোট বাচ্চা কাচ্চাদের নেয়। দীর্ঘদিন এভাবে
চলাফেরা করায় রজনীর বাবাকে ভদ্রলোক বেশ
ভালোভাবেই চেনে। রজনীর বাবার দুই মেয়ে তিনি
জানতেন। ছোট মেয়েটাকে দেখেছিলও৷ কিন্তু রজনীকে
কখনো দেখেনি, আর মেয়েটার নাম-ও কখনো শোনেনি।
আজকেই প্রথম দেখলো রজনীকে।
আরমান নওরোজ শুধু জানেন রজনীর সাথে একজনের
বিয়ে হতে গিয়ে, রজনী পালিয়ে এসেছে। তবে তিনি এটা
জানেন না, রজনীর বিয়েটা নিলয়ের কাজিন রিয়াদের
সাথে হওয়ার কথা ছিল। এজন্য তিনি রজনীকে দেখে,
রজনীর পরিচয় জেনে হৃদয়ের জন্য ভীষণ পছন্দ করেন।
আর তা বাস্তবায়ন করতে ফন্দি আঁটলেন।
কথাগুলো ভেবে আরমান নওরোজ এর মন উৎফুল্ল
হলো। সে ভেবেছিল, বড় নাতির মতো ছোট নাতিটাও
শহুরে কোনো মেয়েকে বিয়ে করবে। তবে তিনি হৃদয়ের
মনের খবর জানেন, এর বিয়ে করার ইচ্ছে আদো আছে
বলে মনে হয় না৷ সেখানে রজনীর মতো মেয়েকে পেয়ে
হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অনুভূতি হয় ভদ্রলোকের।
গ্রামের মেয়ে রজনীকে ছোট নাতির বউ হিসেবে দেখার
এক আকাশ পরিমাণ ইচ্ছে পুষে সেদিকেই পা বাড়ালেন।
আরমান নওরোজ নিজেকে সামলে তার স্ত্রীর দিকে চেয়ে
অত্যন্ত দাম্ভিকতার সাথে বলেন,
“এসব মিথ্যা নিউজ বিশ্বাস করার শা'স্তি তুমি পাবে
নাওমি। তার আগে বলো, এসব ফা'ল'তু নিউজ তোমাকে
কে দিয়েছে?”
স্বামী রে’গেছে বুঝতে পেরে ভদ্রমহিলা একটু ভ’য় পেল।
উত্তরে বলে, “হৃদয়ের বন্ধু নিলয় বলেছে।”
নামটা শুনে আরমান নওরোজ অবাক হলেন না। সে কিছু
একটা ভেবে মনে মনে হেসে বিড়বিড় করে, “নিলয়
দাদুভাই, তোমার চেয়ে আমার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি।
এটা তুমি বারবার ভুলে যাও।” . .
নীতি বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিয়ে মাত্র বাড়ির গণ্ডি
থেকে বের হয়। পিছন পিছন নিলয় হাঁটছে। তার ট্যুর ব্যাগ
পিঠে। নীতির একটি বড়সড় ব্যাগ তার বা হাতে। নীতি
মাথা নিচু করে মন খারাপ করে হাঁটছে। এই প্রথম নিজের
গ্রাম ছেড়ে অন্যএকটি শহরে যাচ্ছে পড়াশোনার জন্য। এর
আগে কখনো বাড়ির লোকদের থেকে দূরে থাকা হয়নি।
সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রাণপ্রিয় গ্রাম ছেড়ে তো কখনোই
যাওয়া হয়নি। আজ পড়াশোনা করতে যেতে হচ্ছে বলে,
মেয়েটির মন ভীষণ খারাপ।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর নিলয় আর নীতি একটি বড়োই
গাছ তলায় আসে। নীতি মাথা নিচু করে হাঁটছে তো
হাঁটছেই। বড়োই গাছটি নিলয়ের চোখে পড়তেই নিলয়
একটা লাফ দিয়ে ডান হাতে বড়োই গাছের বড়সড় একটি
ডাল টেনে ধরে। শব্দ পেয়ে নীতি দাঁড়িয়ে গিয়ে ঘাড়
ফিরিয়ে তাকায় নিলয়ের দিকে। নিলয় কয়েকটি বড়ই
ছিঁড়ে নিয়ে গাছের ডাল ছেড়ে দেয়। এরপর বড়োইগুলো
প্যান্টে কয়েকবার ডলে নিয়ে, একটি বড়োই মুখে পুড়ে
নীতির দিকে তাকায়। নীতি কিছু বলতে নেয়, তার আগেই
নিলয় ভ্রু কুঁচকে বলে,
“এবার হা করে আব্বা বলতে পারলেও বড়োই দেবো না।
তাই ছুঁচোর মতো থাকিয়ে থেকে লাভ নেই।”
নীতি চোখমুখ কোঁচকালো। মুখ ভেঙচি কেটে বলে,
“তোমার বড়োই তুমি খাও। তোমার ওই নোং’রা হাতের
বড়েই খাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই।”
নিলয় চোখ পাকিয়ে বলে,
“কি বললি, আমার হাত নোং’রা?”
নীতি মাথা উপরনিচ করে বলে,
“শুধু হাত না, তোমার পুরো বডি-ই নোং’রা।”
নিলয় আরেকটি বড়োই মুখের মধ্যে দিয়ে চিবোতে
চিবোতে বলে, “হা কর।”
নীতি ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আমি কেন হা…..
হা বলতে গিয়ে যখনই নীতির মুখ হা হয়ে গেল, তখন-ই
নিলয় মাথাটা ঝুঁকিয়ে নীতির মুখ বরাবর তার মুখ নিয়ে
মুখ গোল করে চোখের পলকে থুতু ছুঁড়ে দেয়ার মতো
করে তার মুখের ভেতরে চিবানো বড়ই নীতির মুখের
ভেতর দিয়ে দেয়। এরপর সাথে সাথে বা হাতে নীতির মুখ
চেপে ধরে৷ নীতি চোখমুখ কুঁচকে দু'হাতে নিলয়ের হাত
সরানোর চেষ্টা করে আর উ উ করে। নিলয় মেকি রে'গে
বলে,
“আমাকে নোং’রা বলা? কত্ত বড় সাহস! সব গিলবি। গেল্
বে'য়া'দ'ব। গেল্ বলছি!”
নীতি অসহায় চোখে চেয়ে মাথা এদিক-ওদিক মাথা
নাড়ানোর চেষ্টা করে। নিলয় বাঁকা হেসে বলে, “অ’মৃত
মিশিয়ে দিয়েছি। মনের মাধুরি মিশিয়ে খেয়ে নে। নয়তো
আজ ট্রেন মিস হলেও তোর মুখ থেকে আমার হাত সরবে
না। বে’য়া’দবি ছোটাবো তোর।”
শেষ কথাটা একটু গম্ভীর শোনালো। নীতি অসহায় চোখে
চেয়ে রইল কতক্ষণ। এই অ'সভ্য ছেলের থেকে যে সে
ছাড় পাবে না, তা খুব ভালো করেই জানে সে। বহুক’ষ্টে
মুখের ভেতর বড়ই টুকু গিলে ফেলে। নিলয় বুঝতে পেরে
নীতির মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলে নীতি বা পাশে মুখ
নিয়ে থু থু করতে থাকে। নিলয় মিটিমিটি হাসতে হাসতে
বলে,
“সকালে বা'থরুম করে হাত ধুতে ভুলে গেছিলাম। যাক,
তুই তোর জিহ্বা দিয়েই পরিষ্কার করে দিলি। আমাকে
আর ক’ষ্ট করে হাতে সাবান লাগাতে হবে না। ভালোই
হলো। তুই খুব ভালো রে নীতি।”
কথাটা শুনতেই নীতির চোখমুখ উল্টে এলো। বেচারি উঁকি
করতে লাগলো। আশেপাশে তাকিয়ে একটি বাড়ির
উঠানে কল দেখে সেদিকে দৌড়ে গেল। নীতির অবস্থা
দেখে নিলয় শব্দ করে হেসে দেয়।
নীতি কল চেপে চেপে সমানে কুলি করে। নিলয় এগিয়ে
এসে দাঁড়ায় কলের পাড়ে। নীতি বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ
কুলি করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু’হাত কোমরে রেখে রাগে
ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
“তোমার সব কু’কীর্তি আমি কড়ায়গন্ডায় হিসাব রাখছি।
তোমার বউয়ের কানে সব ঢেলে তোমার সংসার যদি আমি
না ভে’ঙে’ছি, তাহলে আমার নাম-ও নীতি নয়। অ'সহ্য
একটা।”
কথাগুলো বলে নীতি ধুপধাপ পা ফেলে সামনে এগিয়ে
যায়। নিলয় নীতির পিছু যেতে যেতে মিটিমিটি হাসছে।
গলা ঝেড়ে খুব ইনোসেন্ট কণ্ঠে বলে,
“কোথায় যেন শুনেছিলাম, বড়দের সম্মান না করলে তার
ফল ভোগ করতে হয়ই হয়। আহারে আমাদের নীতি! তুইও
সেই ফল ভোগ করতে যাচ্ছিস ভেবে ক'ষ্টে আমার বুকটা
ফেটে যাচ্ছে। নীতির পায়ের কাছে ঘুরঘুর করা ওহে সাপ,
ভুলে যাস না নীতি আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান এর
মেয়ে। তাই ওকে একটু দেখেশুনে কা'ম'ড়া'স কেমন?”
কথাটা কানে যেতেই নীতিকে আর কে পায়। বেচারি
চেঁচিয়ে ওঠে। তাদের গ্রামে এসব গাছগাছালির
কাছাকাছি, কতশত সাপ থাকে। এ তো নতুন নয়। তবে
নীতি গ্রামের মেয়ে হলেও, খুব আদরে বড় হয়েছে। আর
পাঁচজন গ্রাম্য মেয়ের মতো সে ততটা বাইরেও বের হত
না। তার লাইফ লিডে কিছুটা শহুরে ভাব মিশে ছিল।
মেয়েটি ভ'য়ে কোনদিকে যাবে বুঝে পায় না। উপায় না
পেয়ে উল্টো ঘুরে এক দৌড়ে নিলয়ের কাছে এসে
নিলয়কে ঘেঁষে একপ্রকার নিলয়ের বুকের উপর আঁচড়ে
পড়ল যেন। কম্পিত কণ্ঠে বলে,
“সাপ তাড়িয়ে দাও নিলয় ভাই, আমি তোমার সব কথা
শুনব সত্যি!”
নীতির অবস্থান দেখে ছ্যাঁত করে ওঠার মতো নিলয় দূরে
সরে গেল। রে'গে বলে,
“এসব কি ধরনের ধরনের অ'সভ্যতামি? আমার সাথে
ঘেঁষাঘেঁষি করছিস কেন?”
নীতি অনুতপ্ত হয়। টুকটাক প্রয়োজনে একটু-আধটু টাচ
লাগলে নিলয় কিছু না বললেও এভাবে ঘেঁষলে নিলয় খুব
রা'গ করে সে জানে। মেয়েটা ভ’য়ে ভ’য়ে অসহায় কণ্ঠে
বলে,
“স.সাপ।”
নিলয় বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“বা'লের সা'প। খাচ্ছে তোকে। ভাইয়ের তো চ’রিত্রের নেই
ঠিক। ভাইয়ের লেজ ধরে তুই-ও সে পথেই হাঁটছিস তাই
না? শা’লার ভাইবোন দু'টোই ন'ষ্ট! ভাইয়ের লেজ ধরলে
কানের গোড়ায় লাগাবো একটা।”
কথাটা বলতে বলতে নিলয় হাত উঠিয়ে নীতিকে মা'রার
ভঙ্গি করে। নীতি মা'র খাওয়ার ভ'য়ে মাথাটা পিছনদিকে
সরিয়ে নেয়। নিলয় মাঝপথেই হাত নামিয়ে নিল। নীতি তা
দেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কথায় আছে না,
সত্যি কথা গায়ে লাগে বেশি। নীতির ক্ষেত্রে সেটাই হলো।
নিজের ভাই রিয়াদের চরিত্র আসলেই ভালো না। এজন্যই
তো মেয়ে পালিয়েছে। অন্যরা না জানলেও তারা
ভাইবোনেরা বেশ ভালোই জানে। রিয়াদ নীতির নিজের
ভাই হওয়ায় কথাটা নীতির গায়ে আরও বেশি লাগলো।
এদিকে নিলয় কথাটা বলে বা হাতে তার শরীর ঝাড়তে
লাগলো। এটা দেখে নীতি মুখ ভেঙালো। বিড়বিড় করল,
“যতসব ঢং! মনে হচ্ছে আমার গায়ে গু লেগে আছে।
তোমার বউয়ের গায়ে সত্যি সত্যিই গু লাগিয়ে দিব
আমি।”
নিলয়ের কানে গেল। নীতির বলা প্রথম কথায়
বিরক্ত হলেও শেষ কথায় শব্দহীন হেসে ফেলল। এরপর
নীতিকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলে, “আমার বউয়ের
গায়ে গু লাগাতে পারলে, তোর আর তোর ফিউচার
হাজবেন্ড ম'রার আগ পর্যন্ত যত ট্যুর দিবি, সব খরচ আমি
বহন করব।”
কথাটা শুনে নীতি তড়াক করে মাথা উঁচু করে। উল্টো ঘুরে
এগিয়ে যাওয়া নিলয়ের দিকে এক দৌড়ে ছুটে এসে
নিলয়ের পাশে হাঁটতে হাঁটতে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে, “তাহলে
নিশ্চিত থাকো নিলয় ভাই, তোমার পকেট ফাঁকা হবেই
হবে। আমি কন্তু পৃথিবীর সব দেশ ঘুরব।”
নিলয় কিছু বলল না। সামনে অনেক দূরে এগিয়ে থাকা
তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে শব্দহীন হাসলো। যাদের সে
আগে যেতে বলেছে।
_______________________
হৃদয় ঘরে এসে পরনের শার্ট খুলে তাওয়াল নিয়ে সরাসরি
ওয়াশরুমে এসে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়েছে। গত ৩০
মিনিট যাবৎ সে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর পর
ডান হাত উঠিয়ে উম্মুক্ত বুকে হাত বুলায়। মাঝে মাঝে চাপ
দাঁড়িসহ সারা মুখে হাত বুলিয়ে নেয়৷ টানা এতক্ষণ পানির
নিচে দাঁড়িয়ে থাকার পরও ভেতরের অস্থিরতা কমছে না
হৃদয়ের। বা হাত উঠিয়ে ঘাড় ডলল দু'বার। প্রথম থেকেই
চোখ খোলা। এতক্ষণ ভেজার ফলে চোখদু'টো লাল হয়ে
এসেছে। মাত্র চোখজোড়া বন্ধ করতেই ঝটকা খাওয়ার
মতোন চোখজোড়া খুলে ফেলে হৃদয়। বাদামি দু'টো
চোখ। ওই বাদামি চোখ দু'টো হঠাৎ তাকে তীব্র অস্বস্তিতে
ফেলে দিয়েছে। এইতো কিছুক্ষণ আগেও ভালো ছিল।
হঠাৎ কি হলো? যতবার চোখ বুঝল, ততবারই এমনটা
হচ্ছে। রা'গ লাগছে। মাথা ব্য’থা ধরে গেছে। চোখের
সামনে থেকে সেই বাদামি চোখ দু'টো সরিয়ে নিতে
কতশত প্রচেষ্টা করল এতক্ষণ যাবৎ। কিন্তু লাভের লাভ
কিছুই হলো না। হৃদয় দু'হাতে শ'ক্ত করে মাথার চুল টেনে
ধরে ডানপাশে রাখা বালতিতে হঠাৎ ডান পা দ্বারা
জোরেসোরে একটি লাথি বসায়। বাতলিটি দু'হাত দূরে
গিয়ে ছিটকে পড়ল৷ হৃদয় চোখ বুজল। ডান হাত বাড়িয়ে
শাওয়ারের সুইচ চেপে ধরে শ’ক্ত গলায় বিড়বিড় করে,
“তোর চোখ একদম উপড়ে ফেলবো মেয়ে। শাহরিয়ার
হৃদয়কে নিয়ে খেলার দুঃসাহস ভে'ঙে দিব।”
বলে হৃদয় ফোঁসফোঁস করতে লাগলো। শ’ক্তহাতে
শাওয়ারের সুইচ অফ করে কোমরে তাওয়াল পেঁচিয়ে
ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে। বাইরে এসে আরেকটি
তাওয়াল দিয়ে মাথা মুছে নিল। লোমশহীন উদাম সারা
শরীরে বিন্দু বিন্দু পানির ছিঁটেফোঁটা। তবে হৃদয় শরীর
মুছল না। হাতের তাওয়াল ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখলো। বিশাল
রুমের একপাশে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো একটি বড়সড়
ক্যানভাসের সামনে। বা হাত দিয়ে ক্যানভাসের উপর
ঢেকে রাখা কাপড় টান দিয়ে সরিয়ে ফেলে। উম্মুক্ত হয়
কাঠের ফ্রেমে বাঁধা সাদা রঙের ক্যানভাস।
হৃদয়ের চোখেমুখে কঠোরতা। মনে তীব্র অস্বস্তি, যেখান
থেকে সে সামান্য হলেও মুক্তি পেতে চাইছে। হৃদয় বা হাতে
তুলি তুলে নিল। ডান হাত ক্যানভাসের মাথায় ঠেকিয়ে
রেখে বা হাতে অয়েল পেইন্ট নিয়ে ব্যস্ত হলো ক্যানভাসে
কিছু আঁকতে। সে আঁকতে এতোটাই তৎপর যে বসার
ইচ্ছেটুকুও তার মনে জাগলো না। সামান্য ঝুঁকে বা হাত
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আঁকতে লাগলো। পাঁচ মিনিটের জায়গায়
দশ মিনিট সময় লাগলেও সে বিরক্ত হলো না। বরং খুব
মনোযোগীর সাথে আঁকায় মগ্ন হয়ে থাকলো। ১২
মিনিটের মাথায় দু'টো বাদামি চোখের মণি আঁকতে সক্ষম
হলো। এক সেকেন্ড এর জন্য আঁকতে থাকা ব্যস্ত হাত
থামিয়ে দিল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বা দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে
দেখার চেষ্টা করল ঠিক আছে কি-না। নিজের মর্জি মতো
হওয়ায় বিরক্তির মাত্রা আর বাড়লো না। কমলো
এতক্ষণের অস্বস্তির মাত্রা। তবে মুখাবয়বে তা বিন্দুমাত্র
প্রকাশ পেল না। আবারো বা হাত তুলল ফিনিশিং দিতে,
তখন-ই বড় ভাই হৃদমের গলা পেয়ে বাড়ানো বা হাত দিয়ে
ক্যানভাসটি কাপড়ের সাহায্যে ঢেকে দিল। এরপর উল্টো
ঘুরে বা হাতের তুলি ডানদিকে ছুঁড়ে দিয়ে, তুলিটি ডান
হাতে ক্যাচ ধরে নিল। দৃষ্টি দরজায় দাঁড়ানো বড় ভাই হৃদমের দিকে।
হৃদম হৃদয়ের দু'হাতে মাখা রঙের ছিঁটেফোঁটা দেখে
বিরক্ত হলো। তার রগচটা ছোট ভাইয়ের আঁকার ধৈর্য
দেখে আর পাঁচজন প্রশংসা করলেও তার বিরক্তি ছাড়া
আর কিছু আসে না। হৃদয় ঘরের ভেতর আসতে আসতে
বলে,
“তোর সাথে ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে হৃদয়৷”
হৃদয় বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“বলো।”
হৃদম ভ্রু কুঁচকে বলে, “আমি এখানে তোর প্রয়োজনে
এসেছি। তাই তোর এসব বিরক্তি বাদ দিয়ে ভালোভাবে
কথা বল।”
হৃদয় খুব স্বাভাবিকভাবে বলে,
“তোমার মতো গাধাকে আমার প্রয়োজন হবে? হাউ
ফানি! নো নিড ব্রো। তুমি যেতে পারো। দরজা ওদিকে।”
হৃদয়ের কথা শুনে হৃদম চটে গেল। কত্ত বড় সাহস তাকে
গাধা বলে? সে দাঁত কিড়মিড় বলে,
“তুই আমাকে গাধা বলছিস? এই আমি নিয়ম করে
বাজার করে এনে তোদের খাওয়াই।”
হৃদয় হাতের তুলি টেবিলের উপর রেখে দু'হাতে চুল
ঝাড়তে ঝাড়তে ভাইয়ের দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“গাধাদের কাজ বোঝা বহন করা। তুমি সেটাই কর।
তাহলে তোমাকে গাধা ছাড়া অবশ্যই গরু বলব না? যদি
তুমি আমাদের দুধ দিতে তাহলে অবশ্য তোমাকে গরু
বলতে পারতাম। বাট নো অপশন!”
ছোট ভাই হৃদয়ের কথা শুনে হৃদম হতবাক হয়ে তাকিয়ে
আছে। এসব কি ধরনের কথা? সে ক'ষ্ট করে বাজার করে
এনে এদের খাওয়ার বলে এই বে'য়া'দ'ব টা তাকে গাধার
সাথে তুলনা দিচ্ছে? তার ইচ্ছে করল, একে চিবিয়ে
চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে। হৃদয় এগিয়ে এসে ডিভানে বসতে
নিলে হৃদম রাগান্বিত স্বরে বলতে নেয়,
“দেখ হৃদয়!”
হৃদয় সাথে সাথে হৃদমের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে চোখ
ছোট ছোট করে বলে,
“তোমার বউ থাকতে, তুমি আমাকে যা তা দেখাতে পারো
না ভাইয়া।”
হৃদম থতমত খেয়ে তাকালো ছোট ভাই হৃদয়ের দিকে।
দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“তুই বোধয় ভুলে যাচ্ছিস, আমি তোর বড় ভাই!”
হৃদয় ডিভানের উপর পা তুলে বসে বড় ভাইয়ের দিকে
চেয়ে ভাবলেশহীনভাবে বলে,
“থ্যাংক্স মনে করিয়ে দেয়ার জন্য।”
একে তো হৃদয়ের একেকটা কথায় হৃদমের গায়ে আ'গু'ন
ধরে যাচ্ছে। তার উপর তার সামনে এভাবে বসায় হৃদম
ক্ষো'ভের সাথে বলে,
“স্ট্যান্ড আপ হৃদয়।”
হৃদয় বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“গেট আউট হৃদম।”
হৃদম বিস্মিত হলো। এই বে'য়া'দ'ব টা তার নাম ধরল? সে
অ'সহ্য কণ্ঠে বলে,
“আমি তোর বড় ভাই। আর তুই আমার নাম ধরে
ডাকলি?”
হৃদয় ডিভানে গা এলিয়ে দিয়ে বলে,
“হ্যাঁ ডাকলাম। এতক্ষণ তো সম্মান দিচ্ছিলাম। বাট
তোমার ব’দ’হজম হলে, আমাকে অবশ্যই হজমের
ট্যাবলেট দিতে হবে। ইট'স মাই রেসপনসেবলিটি।”
হৃদম দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তাকালো হৃদয়ের দিকে। হৃদয়
কিছু বোঝার আগেই হৃদম হৃদয়ের ডান ডান গাল বরাবর
একটা শ'ক্ত ঘু'ষি মে'রে দেয়। ব্যাপারটা বুঝতে হৃদয়ের
যতটা সময় লাগলো, তার চেয়েও কম সময়ে হৃদয় সোজা
হয়ে দাঁড়িয়ে ডান পায়ে টি-টেবিল বরাবর জোরেসোরে
একটা লাথি দিয়ে, হৃদমের নাক বরাবর পর পর দু'টো
ঘুষি মে'রে বা হাতে হৃদমের কলার ধরে রাগান্বিত স্বরে
বলে,
“তোমরা সবাই জানো, আমি চরম লেভেলের বে'য়া'দ'ব।
তবুও আমার আগেপিছে আসার ন'ষ্ট স্বভাব তোমাদের
কেন যায় না? হোয়াই?”
কথাটা বলতে বলতে হৃদমের নাক বরাবর আরেকটি ঘুষি
মে'রে দেয়। হৃদমের নাক দিয়ে ইতোমধ্যে র'ক্ত বেরিয়ে
এসেছে। তবে দৃষ্টি শ'ক্ত। হৃদমের অবস্থায় হৃদয় মোটেও
ঘাবড়ালো না। আর না তো তার দৃষ্টি নরম হলো। এদিকে
নাক বেয়ে র'ক্ত গড়িয়ে পড়া হৃদম হঠাৎ-ই গায়ের
সর্বশক্তি দ্বারা হৃদয়ের নাক বরাবর ঘুষি মা'রে৷ দ্বিতীয়বার
ঘু'ষি মা'রার আগেই হৃদয় হৃদমকে গায়ের জোরে ধাক্কা
মে'রে মেঝেতে চিৎপটাং করে ফেলে দেয়। হৃদম ওঠার
আগেই হৃদয় হৃদমের উপর উঠে দু'পা দু'দিক দিয়ে দেয়।
এরপর হৃদম কিছু বোঝার আগেই হৃদয় সমানে হৃদমের
নাক বরাবর ঘুষি মা'রতে থাকে। একনাগারে চারটে ঘুষি
মে'রে হৃদয় থেমে যায়। সেই সুযোগে হৃদম চোখের পলকে
হৃদয়কে নিচে ফেলে, ছোট ভাইয়ের মতো একই কায়দায়
ডান হাতে হৃদয়ের নাক বরাবর একটি ঘু’ষি মা'রে। দ্বিতীয়
ঘু’ষি মা'রতে নিলে হৃদয় বা হাতে হৃদমের হাত শ'ক্ত হাতে
ধরে নেয়। হৃদমকে উল্টো অ্যাটাক করতে নিলে হৃদমের
রাগান্বিত স্বরে বলা কথাটি শুনে থেমে যায়।
“ভেবেছিলাম তোকে মানিয়ে তোর বিয়ে করা বউকে তোর
কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তোর জীবন সুন্দর করে দিব। কিন্তু
তোর জীবনে বউ নামের কাউকেই থাকতে দিব না। আর
না তো তোর জীবনে সুখও আসতে দিব! তোর মতো
বে'য়া'দ'বের জীবনে সুখ লিখতে চাইলে আল্লাহ
আমাকেই পা’পী বানিয়ে দিবে।”
কথাটা বলতে বলতে হৃদম বা হাতে নাক বেয়ে পড়া র'ক্ত
মুছে নেয়। হৃদমের কথা শুনে হৃদয় ভ্রু কুঁচকে বলে, “কে
আমার বউ?”
হৃদম ব্যঙ্গ স্বরে বলে,
“ওহ্, এখন বউকে স্বীকার-ই করছিস না? বিয়ে করে
নিজের বউকে অস্বীকার করতে ল'জ্জা করেনা? তোর
আসলেই অনেক বেশি অধঃপতন হয়েছে।”
হৃদয় রে'গে বলে,
“ফা'ল'তু কথা বলবে না ভাইয়া। আমি কাকে বিয়ে
করেছি? কখন বিয়ে করেছি?”
হৃদম হৃদয়ের উপর থেকে সরে বসল। হৃদয় নিজেও উঠে
দাঁড়ালো। টেবিলের উপর থেকে টিস্যু বক্স নিয়ে হৃদমের
দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলে,
“আমার ভাই হয়ে এতো উইক হয়ে জন্মেছ! না-কি
তোমার মায়ের ভালোবাসা পেয়ে পেয়ে তোমার আজ এই
হাল! আগেই বলেছিলাম, পরের মায়ের আঁচল ছাড়ো।
কিন্তু শাহরিয়ার হৃদয়ের ভাই হয়েও তোমার রুচির বড়োই
দু’র্ভি’ক্ষ চলছে।”
হৃদম উঠে গিয়ে হৃদয়ের বেডে গিয়ে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে
পড়ে। হতাশার শ্বাস ফেলে বলে,
“ভাগ্যিস তোর মতো বে'য়া'দ'ব হয়ে যায়নি।”
হৃদয় সামান্য ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
“বে'য়া'দ'বি! দিস ইজ মাই আর্ট।”
কথাটা বলতে বলতে হৃদয় তার ফোন নিয়ে কয়েক
সেকেন্ডে কিছু একটা টাইপ করে হৃদমের উদ্দেশ্যে বলে,
“রাত ৯ টায় তোমার সিরিয়াল। একটা মেন্টাল ডক্টর দেখে
নিও। তাহলে আমার মতো পিওর অবিবাহিত, সিঙ্গেল
ছেলেকে নিয়ে আর এসব উল্টাপাল্টা কমেন্ট করবে না।
আর হ্যাঁ, পরের মায়ের আঁচল ছেড়ে আমার কাছে এসো।
আমি তোমার নাকের ট্রিটমেন্ট করে দিব। এরপর আমি
আমার মনের মাধুরি মিশিয়ে তোমার নাকে বক্সিং
খেললেও তোমার নাক স্ট্রং থাকবে।”
হৃদম কিছু বলল না। রা'গে শরীর কাঁপছে তার। মা'র
খাওয়ার জন্য নয়। জন্মের পর থেকেই তাদের মারামারি
করার স্বভাব। যে অভ্যাস হৃদম বাবা হওয়ার পরও ছাড়তে
পারেনি। তার রা'গ তো লাগে হৃদয়ের একেকটা গা জ্বলুনি
কথা শুনে।
যেমনটা এখনো হচ্ছে। কত্ত বড় বে’য়া’দ’ব হলে তাকে
পা’গ’লের ডক্টরের কাছে যেতে বলছে। চবারও
সিরিয়ালও দিয়েছে। কিন্তু শরীরে কুলাচ্ছে না বলে শান্ত
হয়ে শুয়ে রইল। শব্দ করে বলে উঠল,
“শা'লা কু’ত্তা। তোকে আমি অ’ভি’শা’প দিলাম, তুই
জীবনে বউয়ের সুখ পাবি না।”
কথাটা শুনে হৃদয় বিরক্তি কণ্ঠে বলল,
“আমি আবার কবে বউয়ের সুখ চাইলাম? এমন ফা'ল'তু
সুখ শাহরিয়ার হৃদয়ের প্রয়োজন পড়ে না। এসব সো কল্ড
সুখ তোমাদের জন্যই ঠিক আছে। নট মি। অ্যান্ড থ্যাংক্স
ফর ইয়্যুর কার্স কু'ত্তার বড় ভাই বড়ো কু'ত্তা।”
হৃদম দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলে রাখলো। আর
কিচ্ছু বলল না। এর সাথে যে সে পারবে না তা সে জানে।
উল্টে তার শরীর আরও কা'ম'ড়াবে।
হৃদয়ের কোমরের তাওয়াল অনেকটা ঢিলে হয়ে এসেছে।
হৃদয় দরজার দিকে ফিরতে ফিরতে পরনের তাওয়ালে
হাত দিয়ে খুলতে নেয়, তাওয়াল ঠিক করার জন্য।
এদিকে রজনী হৃদয়ের পাশের রুম থেকে বের হয়ে
পাশের রুমে হৃদয় আর হৃদমকে এভাবে ছোট বাচ্চাদের
মতো মা'রা'মা'রি করতে দেখে বেচারি তখন থেকে হা
করে দেখছিল। তার মায়াও লাগছিল, হৃদমের জন্য।
কারণ হৃদয়ের কোথাও জখম না হলেও হৃদমের নাক
দিয়ে অনেকটাই র'ক্ত বেরিয়েছে। কিন্তু এইমাত্র হৃদয়
এদিক ফিরে তাওয়াল খুলছে বলে মনে হতেই রজনী ভীত
কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠে, “খুলবেন না।”
হৃদয়ের হাত থেমে যায়। মাথা উঁচু করে দরজার দিকে
তাকালে রজনীকে দেখে তার কপালে ভাঁজ পড়ে। দু'টো
বাদামী চোখের মণি আঁকার পর বহুক'ষ্টে যেই অস্থিরতা
কিছুটা কমিয়ে এনেছিল, সেই অস্থিরতা এইমাত্র বিদ্যুৎের
ন্যায় আবারো ফিরে আসলো রজনীর চোখে চোখ
রাখতেই। হৃদয় শুকনো ঢোক গিলল। হঠাৎ-ই হৃদয় বড়
বড় পায়ে এগিয়ে এসে রজনীর সম্মুখ বরাবর দাঁড়িয়ে
গম্ভীর গলায় বলে,
“খুলব। তোমার তো ছেলেদের গায়ে পড়তে ভালো লাগে,
ছেলেদের এসব দেখতেও নিশ্চয়ই ভালো লাগে, এজন্যই
এখানে এসেছ। আমি বুঝে গিয়েছি, তুমি আমাকে
পুরোপুরি খোলাখুলিভাবে না দেখে আমার পিছু ছাড়বে
না। তাই আমি সাময়িক দয়াল বাবা হয়ে আমার সবকিছু
দেখিয়ে তোমার ইচ্ছে পূরণ করব। বি রেডি।”
কথাগুলো শুনে ল’জ্জায় রজনীর চোখমুখ লাল হয়ে
উঠল। মেয়েটি পিছনদিকে বা পা নিয়ে সরতে নিলে হৃদয়
কড়া কণ্ঠে বলে,
“ম্যানারলেস মেয়ে, এখান থেকে এক পা নড়লে তোমার
দু'টো পা ভে’ঙে গুণে গুণে দশটা টুকরো করে তোমার
দু’হাতে ধরিয়ে দিব।”
রজনী পিছনে এক পা নিয়ে সেভাবেই স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে
যায়। মেয়েটা বুঝল, এই ঘরের সামনে দাঁড়ানোটাই তার
সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। সে ভ'য়ে ভ'য়ে হৃদয়ের দিকে
চেয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“বিশ্বাস করুন, আমি এসব খারাপ জিনিস দেখতে চাই
না।”
হৃদয় ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আমার বডির ইম্পর্ট্যান্ট পার্টগুলোকে তুমি খারাপ
জিনিসের সঙ্গে তুলনা করছ?”
রজনী কাঁদোকাঁদো মুখ করে দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“না না, আপনার সব ভালো তো!”
হৃদয়ের ভ্রু নাচিয়ে বলে,
“কিভাবে বুঝলে? আমি দেখানোর আগেই সব দেখে
ফেলেছো?”
রজনী দু'হাতে তার মুখ চেপে ধরে অস্পষ্টস্বরে বলে, “না
না। আমি কিচ্ছু দেখিনি।”
হৃদয় তার দু'হাত তাওয়ালে দিতে দিতে বলে,
“ওকে, তাহলে এখন দেখো।”
রজনী মুখ থেকে হাত সরিয়ে শব্দ করে চেঁচিয়ে ওঠে,
“নাআআআ।
হৃদয় ধমকে ওঠে, “সাটআপ।”
রজনী কেঁপে ওঠে। ঢোক গিলে বলে,
“আপনার ল'জ্জা লাগবে না?”
হৃদয়ের গম্ভীর স্বরে,
“নো।”
রজনী থেমে থেমে বলে,
“কে.কেনো?”
হৃদয় দু'পা পিছিয়ে গিয়ে রজনীর বাদামি চোখে চোখ
রেখে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। এই মেয়েটির জন্য তার
ভেতরে উৎপত্তি হওয়া অসহনীয় এক অস্থিরতা, কয়েকশ
হাজারগুণ রজনীকে ফেরত দিতে হৃদয় তার কোমরের
তাওয়ালের ভাঁজ খুলতে খুলতে গম্ভীর গলায় বলল,
“কারণ আমি তোমার মতোই আরেক নি’র্ল’জ্জ। তোমার
দেখতে ল’জ্জা লাগবে না আর আমার দেখাতে ল’জ্জা
লাগবে না। দ্যাট’স ইট। চুপচাপ দেখো।”
চলবে...... |
0 Comments