লেখক:DRM Shohag
পর্ব:০৩
------------------------
হৃদয়ের কথা শুনে নাওমি নওরোজ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়
নাতির দিকে। অবাক হয়ে বলতে নেয়, “কি বলছ তু….”
মাঝখান থেকে হৃদয় তার দাদির দিকে সামান্য ঝুঁকে
সবার আড়ালে ডান চোখ টিপ দেয়। সাথে ডান হাত তার
দাদির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “তুমি কি এই বিয়েতে
রাজি দাদি?”
হৃদয়ের মুখে হাসির ছিঁটেফোঁটা নেই। সে যে কিছুক্ষণ
আগে এক চোখ টিপ দিয়ে তার দাদিকে কিছু বুঝিয়েছে,
এটা এখানকার কেউ নিজ চোখে দেখলেও বোধয় বিশ্বাস
করত না। এদিকে নাওমি নওরোজ নাতির কাজকর্ম
পুরোপুরি ধরতে না পারলে কিছু তো বুঝেছে। সে
নিজেকে সামলে হৃদয়ের হাতে ডান ডান রেখে বলে,
“বিয়ে আমি করবো, তবে ছেলে যেন স্মার্ট হয়!”
হৃদয় তার দাদির পাশে সোফায় ডান পা ভাঁজ করে তার
দাদির দিকে ফিরে বসে স্বাভাবিক গলায় বলে, “নো
টেনশন, ছেলে স্মার্ট প্লাস হ্যান্ডসাম হবে। এট লিস্ট
ভুড়িওয়ালা দাদুর চেয়ে বেটার।”
আরমান নওরোজ বউ আর নাতির কথোপকথন শুনে
হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আর হৃদয় তাকে কি বলল?
ভুড়িওয়ালা? বয়স হয়েছে তার। সে নাহয় এটা মেনে নিল।
কিন্তু তার এই বউটা বুড়ি হয়ে কি বিশ্ব সুন্দরী হয়ে গেছে?
সে ভুড়িওয়ালা হলে তার বউ তো পাটকাঠি! সে কিছু
বলতে গিয়ে থেমে যায় হৃদয়কে ব্যাগ থেকে বিপি মেশিন
বের করতে দেখে।
হৃদয় তার ব্যাগ থেকে বিপি মেশিন বের করে নাওমি
নওরোজ এর হাতে লাগিয়ে, ভদ্রমহিলার প্রেসার মাপায়
মনোযোগী হয়। কিছুক্ষণ আগে হৃদয়ের বলা কথায়
অনেকে মিটিমিটি হাসলেও এখন সকলে চুপ হয়ে আছে।
নাওমি নওরোজ অনেকক্ষণ থেকে চেঁচামেচি, সকালে না
খাওয়া সবমিলিয়ে তার শরীরটা খুব একটা ভালো নেই,
দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
‘শাহরিয়ার হৃদয় নওরোজ’ সে গত দু'বছর আগে ঢাকা
মেডিকেল থেকে পড়ে বেরিয়েছে। এরপর একবছর
ইন্টার্নি করার পর ‘FCPS’ আর ‘BCS’ এর জন্য গত
একবছর থেকে পড়াশোনা করছে। গতবছর সেসহ তার
ফ্রেন্ডসার্কেল FCPS এর জন্য এক্সাম দিয়েছিল, তবে
টিকেনি। এবার আবারো সকলে একসঙ্গে প্রিপারেশন
নিচ্ছে। তারা আশাবাদী, এবার তারা টিকে যাবে৷
হৃদয় দাদির প্রেশার মেপে বিরক্ত হলো। দাদির দিকে
চেয়ে কিছুটা রে'গে বলে,
“তুমি কিসের জন্য এতো প্রেসার ফল করেছ দাদি?
দাদুকে তুমি চেনো না? সে নতুন কেউ? তার বিয়ে করার
ইচ্ছে থাকলে আরও ২০ বছর আগেই করত। যখন তুমি
অসুস্থ হয়ে মৃ'ত্যুশয্যায় ছিলে। সে চাইলে তখনই বাহানা
খুঁজে আরেকজনকে বিয়ে করে সংসার করতে পারতো।
আমার দাদুকে নিজের ছেলের সাথে গুলিয়ে ফেলো না।”
শেষ কথাটা অত্যন্ত রূঢ় কণ্ঠে বলে উঠল হৃদয়। সকলের
ঠোঁটের কোণে এতক্ষণ হাসি থাকলেও হৃদয়ের শেষ
কথাটায় সকলের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়।
দোতলায় দাঁড়ানো হৃদয়ের বাবা আজাদ নওরোজ
ছেলের কান্ডে এতক্ষণ হাসছিল। কিন্তু শেষের কথায় তার
গলা শুকিয়ে এলো। হাসি মিলিয়ে গেল। দু'হাতে রেলিঙ
শ'ক্ত হাতে চেপে ধরল। দৃষ্টি তার সেই ছোট্ট ছেলে দেখতে
দেখতে আজ এতো বড় হয়ে শাহরিয়ার হৃদয়ের পানে।
বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়াতে পারলেন না। ক'সেকেন্ডের
মাথায় ভদ্রলোক নিজেকে সামলাতে দ্রুত জায়গাটি
প্রস্থান করে তার ঘরে চলে যায়।
হৃদয়ের কথায় আরমান নওরোজ খুশি হবে না-কি দুঃখ
পাবে বুঝলো না। তার নাতি তার প্রশংসা করল, একই
সাথে তার ছেলেকেই ছোট করল।
নাওমি নওরোজ নাতির পানে চেয়ে কিছু বলতে চাইলো,
কিন্তু হৃদয় সে সুযোগ দিল না। সে আশেপাশে তাকিয়ে
তার বড় ভাই রিদম নওরোজ এর বউ, অর্থাৎ তার ভাবির
উদ্দেশ্যে বলে,
“ভাবি দাদিকে তিনটে ডিম সিদ্ধ আর দু'গ্লাস দুধ দাও
এক্ষুনি।”
২৬ বছর বয়সী রূপসা দেবর এর কথায় ছোট করে বলে,
“আচ্ছা দিচ্ছি।”
হৃদয় তার ব্যাগ পিঠে নিয়ে বিপি মেশিনটি ভাঁজ করতে
করতে আবারও তার ভাবির উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলে,
“দাদিকে খাবার দিয়ে আমার ঘরে এক মগ ব্ল্যাক কফি
দিও ভাবি।”
হৃদয়ের কথাটা শেষ হতে না হতেই অসম্ভব সৌন্দর্যের
অধিকারী একজন ভদ্রমহিলা হৃদয়ের সামনে কপির মগ
ধরে। যার নাম নিতু নওরোজ। হৃদয় নওরোজ এর সৎ মা।
হৃদয়ের দৃষ্টি আটকায় কফির মগের হাতের মালকিনের
দিকে। যাকে চিনতে তার বিন্দুমাত্র ক'ষ্ট হয়নি। মূহুর্তেই
ছেলেটার মস্তিষ্ক জ্ব'লে উঠল। সে বা হাতে বিপি মেশিনটি
শ'ক্ত করে ধরে রেখে চোখ বুজে ফোঁসফোঁস করতে
লাগলো। সময় নিয়ে নিজেকে সামলাতে চাইলো। কিছু
সময় পর হৃদয় চোখ খুলে নিতু নওরোজ এর হাত থেকে
কফির মগটি নিজের হাতে নেয়। এই প্রথমবারের মতো
হৃদয় মায়ের হাত থেকে কফির মগ নিল, এটা দেখে নিতু
নওরোজসহ সকলে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় হৃদয়ের দিকে।
হৃদয় নিতু নওরোজ এর থেকে দু'পা পেছালো। তার দৃষ্টি
কফির মগের দিকে। নিতু নওরোজের উদ্দেশ্যে গম্ভীর
গলায় বলে,
“এটা আপনি বানিয়েছেন?”
নিতু নওরোজ কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সে
ভাবতে পারছে না, হৃদয় তার কফি নিজ থেকে হাতে তুলে
নিয়েছে। ভদ্রমহিলার চোখের কোণদু'টো খুশির আমেজে
ভরে উঠেছে। সে থেমে থেমে বলে,
“হ.হ্যাঁ হ্যাঁ আমি নিজের হাতে বানিয়েছি তোমার জন্য।”
কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে হৃদয় কফির মগ বাঁকা
করে ধরে, ফলস্বরূপ কফিগুলো সরাসরি মেঝেতে পরতে
শুরু করে। হৃদয়ের এই কাজে সকলের এতক্ষণের আশার
আলোটুকু হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সামনে দাঁড়ানো নিতু
নওরোজ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। এতক্ষণে খুশির
আমেজে চোখের কোণে জমা পানি, দুঃখের আমেজে
রূপান্তরিত হয়ে দু'চোখ বেয়ে গালে গড়িয়ে পড়ে।
হৃদয় মেঝেতে পরতে থাকা কফির দিকে চেয়ে শ'ক্ত কণ্ঠে
বলে,
“আপনি বানিয়েছেন, তাই এটা শাহরিয়ার হৃদয় নওরোজ
এর জন্য বি'ষ। আর আমি বি'ষ খাই না। এভাবেই ফেলে
দিই।”
ততক্ষণে মগের সব কফির স্থান মেঝেতে হয়েছে। পিছন
থেকে হৃদয়ের দাদু আরমান নওরোজ বলে,
“হৃদ, তুমি কিন্তু তোমার মায়ের সাথে বে'য়া'দ'বি করছ!”
হৃদয় দাদুর কথা কানে নিল না। তবে মা শব্দটি শুনে তার
হাসি পেল। মনে মনে হাসলোও বোধয়। তবে মুখাবয়বে
স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্যতা। সে হাতের মগ ছুড়ে ফেলে মাথা
নিচু রেখেই নিতু নওরোজ এর উদ্দেশ্যে কড়া কণ্ঠে বলে,
“ভুলে যাবেন না, আমি এক্সট্রিম লেভেলের বে'য়া'দ'ব।
তাই আমার থেকে দূরে থাকবেন, এটাই আপনার জন্য
বেস্ট অপশন।”
কথাটা বলে হৃদয় আর এখানে দাঁড়ালো না। বড় বড় পায়ে
এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। আরমান নওরোজ আর রজনী
সিঁড়ির দিকেই দাঁড়ানো ছিল। রজনী সিঁড়ি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে
থাকতে থাকতে কখন যে সিঁড়ির উপর উঠে দাঁড়িয়েছে
খেয়াল-ই করেনি। হৃদয়কে এদিকে আসতে দেখে মেয়েটা
সাইদে সরতে নেয়, তার আগেই হৃদয় এগিয়ে এসে বা পা
সিঁড়িতে রাখে, বেখেয়ালে থাকায় তখন-ই রজনীর সাথে
ধাক্কা খায়। ধাক্কা খেয়ে হৃদয় একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও
রজনী পড়ে যেতে নেয়, কিন্তু তার আগেই রজনী
পিছনদিকে সামান্য বাঁকা হয়ে দু'হাতে রেলিঙ আঁকড়ে
ধরে। হৃদয়ের দিকে ভীত চোখে চেয়ে থেমে থেমে বলে,
“আমি ইচ্ছে করে ধাক্কা খাইনি। দুঃখিত ভাইয়া!”
হৃদয় রে’গে ডান হাতের তর্জনী আঙুল তুলে রজনীর
উদ্দেশ্যে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। দৃষ্টি রজনীর
বাদামি চোখে পড়ে। পুরো বাড়ি জুড়ে প্রচুর লাইটিং করা,
সকাল সকাল থাকায় বাড়ির সব লাইট জ্বালানো। যার
ফলে কাছ থেকে রজনীর বাদামি চোখের মণি দু'টো যেন
লাইট দিচ্ছে। হৃদয়ের জিহ্বার ডগায় রাখা রাগান্বিত
বাণীগুলো জিহ্বার ডগায় আটকে রইল। রজনীর
চিকচিক করা বাদামি রঙের চোখদু'টোর দিকে
অদ্ভুদভাবে তাকিয়ে রইল৷
রজনীর চোখের পাতা কাঁপছে। বুক ধুকধুক করছে ভ'য়ে।
এতক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে বুঝেছে, এই ছেলেটা শুধু তার
সাথে নয়, সবার সাথেই খুব কড়াভাবে কথা বলে। এমনকি
নিজের মাকেও ছাড় দেয়না। ছেলেটার মধ্যে শুধু
মেয়েদোষ নেই, তাছাড়া কোনো ভালো গুণ নেই। মেয়েটা
ভ'য়ের ঠেলায় একটু নড়তে চড়তেও পারছে না। সেই
একইভাবে বাঁকা হয়ে দু'হাতে রেলিঙ ধরে নিজেকে
সামলে রেখেছে। বেশিক্ষণ এভাবে থাকলে বোধয় তার
কোমর ভেঙে যাবে।
হৃদয়ের দৃষ্টি এখনো রজনীর বাদামী চোখের মণিতে।
শুকনো ঢোক গিলে শুকনো গলা ভেজালো ছেলেটা৷
রজনীর দিকে তাক করে রাখা তর্জনী আঙুল ধীরে ধীরে
নামিয়ে নিল। রজনীর চোখ থেকে দৃষ্টি সরালো না। বরং
মেয়েটির চোখে চোখ রেখেই মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলে,
“আমাকে প্ল্যান করে মা’র’তে চাইছো। বাট আমি তোমার
ফাঁদে পা দিব না।”
কথাটা বলে হৃদয় আর এখানে দাঁড়ালো না। সে
একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে রজনীর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে
নিয়ে রজনীকে পাশ কাটিয়ে বড় বড় পায়ে দু’তিন সিঁড়ি
পর পর দোতলায় উঠে গেল।
এদিকে হৃদয়ের কথা রজনীর মাথার উপর দিয়ে গেল।
কিসব মে'রে ফেলা, ফাঁদ বলে গেল। কথাটা আদোও
তাকে বলেছে কি-না তাও বুঝলো না। মেয়েটি সোজা হয়ে
দাঁড়িয়ে ভাবুক হয়ে মাথা চুলকালো। আশেপাশে সকলের
দৃষ্টি নিজের দিকে বুঝতে পেরে রজনী নিজেকে গুটিয়ে
নিয়ে মাথা নিচু করে নিল।
এদিকে হৃদয় জায়গাটি প্রস্থান করতেই আরমান নওরোজ
ফিক করে হেসে দেয়। ভদ্রলোক হাসতে হাসতে
একপর্যায়ে সিঁড়ির পাশে বসে পড়ে। আরমান নওরোজকে
হাসতে দেখে বাড়ির সকলে অবাক হয়। নাওমি নওরোজ,
নিতু নওরোজ, রূপসা নওরোজ সকলেই। আরমান
নওরোজকে বসে পড়তে দেখে রূপসা দ্রুত পায়ে এগিয়ে
এসে দাঁড়ায় দাদুর পাশে। সামান্য ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে,
“দাদু ঠিক আছেন?”
পাশে দাঁড়ানো রজনী আরমান নওরোজ এর দিকে
অদ্ভুদচোখে তাকিয়ে আছে। এমনিতেই হৃদয়ের বলা কথা
তার মাথার উপর দিয়ে গেল। এখন আবার এদিকে দাদুও
কারণ ছাড়া হাসছে। মেয়েটির মাথায় আরও চিন্তা জড়ো
হলো।
এদিকে আরমান নওরোজ হাসির জন্য কথা বলতে
পারছেন না। বা হাতে রূপসা নাত বউয়ের হাত ধরে
কোনোরকমে নিজেকে সামলে হাসতে হাসতে বলে,
“আমাদের হৃদকে মে'রে ফেলার অ'স্ত্র এনেছি। ও আমার
ফাঁদে পা দিয়ে ম'রে বলছে, আমার ফাঁদে পা-ও দিবেনা,
ম'রবেও না।”
আরমান নওরোজের কথা প্রত্যেকের মাথার উপর দিয়ে
গেল। প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে রইল তাদের বাড়ির কর্তার
দিকে। আর এদিকে ভদ্রলোক হাসছে তো হাসছেই।
_____________________
নিলয়দের পাটোয়ারী পরিবারে, নিলয়ের বাবারা মোট
তিনভাই। নিলয়ের বাবা ইমাম পাটোয়ারী সকলের বড়।
মেজো জন নিলয়ের বড় চাচা ইমদাদুল পাটোয়ারী। আর
নিলয়ের সবচেয়ে ছোট চাচা ইনামুল পাটোয়ারী। নিলয়ের
বড় চাচার দুই ছেলে মেয়ে। ছেলের নাম রিয়াদ, যে
নিলয়ের সমবয়সী অর্থাৎ দু'জনেরই ২৫ বছর। আর বড়
চাচার মেয়ে অর্থাৎ রিয়াদের বোনের নাম নীতি, বয়স ১৭
বছর, এবার এসএসিসি পরীক্ষা দিয়েছে। নিলয় তার বাবা
মায়ের একমাত্র সন্তান। নিলয়ের ছোট চাচার পাঁচ বছরের
একটি ছোট্ট মেয়ে আছে।
নিলয়রা মূলত যার বিয়ে খেতে এসেছিল সে নিলয়ের
দূরসম্পর্কের এক বোন। তার বিয়ের পর গতকাল
রিয়াদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল কিন্তু মেয়ে পালিয়ে
যাওয়ায় বিয়ে ভেঙে গিয়েছে, আর এজন্য নিলয় তার
বন্ধুদের নিয়ে আজকেই শহরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত
নিয়েছে। আসার সময় নিলয় শুধু তার বন্ধুদের আনলেও
আজ যাওয়ার সময় নিলয় তার সাথে নীতিকেও
নিয়েযাবে। এর কারণ গ্রামে তেমন ভালো কলেজ নেই।
তাই
নিলয় বাড়ির সকলের সাথে কথা বলে নীতিকে শহরে
নিয়ে গিয়ে শহরের কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত
জানিয়েছে। যদিও প্রথমে সকলেই নিলয়ের সিদ্ধান্ত
নাকোচ করে দিয়েছিল। এরপর নিলয় তার বড় চাচাসহ
সবাইকে অনেক বোঝানোর পর সকলে রাজি হয়েছে।
নিলয় রেডি হয়ে একেবারে বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
উঠানে মাকে ভাত বাড়তে দেখে নিলয় চেয়ার টেনে চুলার
পাড়ে বসল। পায়ের উপর ট্যুর ব্যাগ রাখল, যার মধ্যে
দু'দিনের জন্য আনা টুকটাক কাপড়। ছেলেকে দেখে
নিলয়ের মাব্যস্ত হয়ে হাত ধুয়ে ভাত মাখাতে লাগলো।
নিলয়ের বন্ধুদের ভেতরে খেতে দিয়েছে। খেয়েই ওরা বের
হবে। নিলয় ছোট থেকে তিনবেলাই মায়ের হাতে খায়। বড়
হয়েও সে অভ্যাস যায়নি। পড়াশোনার জন্য যখন বাড়ি
ছেড়ে শহরে তখন প্রথম প্রথম নিজের হাতে খেতে অনেক
প্রবলেম হতো। এখন যদিও আর প্রবলেম হয়না। তবে
বাড়ি থাকলে এখনও তিনবেলা মায়ের হাতেই ভাত খায়
নিলয়।
নিলয় তার মায়ের দিকে চেয়ে বলে,
“আমি পারমানেন্ট চাকরি পেয়ে গেলে তোমাকে কিন্তু
শহরে নিয়ে যাবো মা।”
ভদ্রমহিলা ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে দিতে বলেন,
“ছোট থেকে গ্রামে বড় হয়েছি, গ্রামের বউ হয়েছি। বুড়ো
বয়সে এসে গ্রাম ছাড়বো!”
নিলয় মুখের ভাত গিলে বলে,
“আচ্ছা ঠিকাছে, আমিই শহর থেকে গ্রাম আপ-ডাউন
করব।
এরপর দু’হাত চুলের ভাঁজে হাত চালাতে চালাতে বলে,
অবশ্য আমিও গ্রামের ছেলে হয়ে গ্রামের মেয়েকেই বিয়ে
করব।”
নিলয়ের মা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“মেয়ে পছন্দ করে রেখেছিস না-কি?
নিলয় হাসলো। নিলয়ের মা আবারো জিজ্ঞেস করে, মেয়ে
কি আমাদের গ্রামেরই?”
মায়ের কথায় নিলয় এবার শব্দ করে হেসে ফেলল।
হাসতে হাসতে খাবার গলায় বেঁধে যায়। বেচার গলায় হাত
দিয়ে কাশতে শুরু করে। তখনই বাড়ির ভেতর থেকে
বোরখা পরে নীতি বেরিয়ে আসে। নিলয়কে কাশতে দেখে
সে দৌড়ে এসে চুলার পাড়ে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি
ঢেলে, পানিভর্তি গ্লাসটি নিলয়ের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
নিলয় দ্রুত নীতির হাত থেকে পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক
করে পুরো গ্লাসের পানি এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নেয়।
নিলয়ের মা আর নীতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। নিলয়
নীতির দিকে তাকিয়ে বলে,
“আজ বুঝলাম, তোর বুদ্ধি মাঝে মাঝে হাঁটু থেকে উঠে
মাথায়ও আসে।
''নিলয়ের কথায় নীতি চটে গেল। মুখ ভেঙিয়ে বলে,
“আর তোমার বুদ্ধি তো শরীরের কোথাও নেই। সেজন্য
খাওয়ার সময় হে হে করো!”
নিলয় চোখ পাকালো। নীতি পাত্তা দিল না। সে একটি
পিঁড়ি টেনে নিয়ে নিলয়ের মায়ের পাশে বসে বলে, “বড়
আম্মু খাইয়ে দাও।”
নিলয় বলে, “তোর হাত নেই? নিজের হাতে খেতে পারিস
না? আমার মায়ের হাত নিয়ে টানাটানি করিস কেন?”
নীতি নিলয়ের দিকে চেয়ে কিছু বলতে গিয়ে নিলয়ের দৃষ্টি
দেখে আর কিছু বলল না। বিড়বিড় করল, “নিজে
বুড়োগাধা হয়ে সারাদিন মায়ের হাতে খায়। আমি একবার
খেতে চাইলেই যত দোষ।”
কথাটা নীতি বিড়বিড়িয়ে বললেও, নিলয়ের কানে যায়।
সে চুলার পাড় থেকে লাঠির মতো একটি খড়ি নিয়ে
নীতিকে মা'রা'র জন্য তুললে নীতি দু'হাত সামনে দিয়ে
চেঁচিয়ে ওঠে। নিলয় হাতের লাঠি নাড়ায় আর রে'গে বলে,
“কি বললি আমাকে? আমি বুড়োগাধা?”
নীতি দু'হাত মুখের সামনে তুলে দু’দিকে মাথা নাড়ে আর
বলে,
“না না আমি তোমাকে বলিনি তো। আমি আমাকে
বুড়োগাধা বলেছি। সত্যি!”
নিলয় ঠোঁট কা'ম'ড়ে হেসে বলে,
“এইবার ঠিক আছে। কিন্তু ওটা বুড়োগাধী হবে। এরপর
থেকে সঠিকটা বলবি।
এরপর হাতের লাঠি পাশে রেখে মায়ের উদ্দেশ্যে বলে,
আমার পেট ভরে গেছে মা। তুমি এবার তোমার এই
বুড়োগাধী মেয়েকে খাওয়াও।”
নিলয়ের মা হতাশ চোখে দুই ছেলে মেয়েকে দেখছিলেন।
নিলয়ের সাথে কারো না কারো ঠোকর লাগবেই। সে
বেশিরভাগ সময় চুপ করেই দেখেন, মাঝে মাঝে রিয়েক্ট
করেন। কি করবে? বলে লাভ নেই তো! ছেলে তার
এমনই। এককান দিয়ে শোনে আরেক কান দিয়ে বের
করে। ভদ্রমহিলা নীতির মুখে খাবার তুলে দেয়৷
নিলয় আরেকগ্লাস পানি খেয়ে মুখ ধুয়ে নেয়। এরপর
পকেট থেকে ফোন বের করে ফোনে মনোযোগী হয়। নীতি
প্রথমবারের মুখের খাবার শেষ করে নিলয়ের দিকে চেয়ে
বলে,
“নিলয় ভাই আমাকে একটা ফোন কিনে দিবা? আমি তো
এখন কলেজে উঠে গেছি। আব্বা দিবে না। আমি আগামী
একসপ্তাহ তোমার সব কাপড়চোপড় ধুয়ে দিব। তুমি
আমাকে একটা ফোন কিনে দাও নিলয় ভাই, প্লিজ!”
নিলয় তাকালো নীতির দিকে। কথাটা তার মোটেও পছন্দ
হলো না। ইচ্ছে করল এর কানের গোড়ায় ঠাটিয়ে দু'টো
চড় লাগাতে। নাক টিপলে দুধ বের হবে। সে চায় ফোন।
নিলয় তার ফোনের আলো অফ করে নীতির উদ্দেশ্যে
বলে,
“তোকে এতো ক'ষ্ট করতে হবে না। তুই হা করে ১০ বার
আব্বা বল। যেদিন বলতে পারবি সেদিনই তোকে শুধু ১ টা
না, দশ দশটা ফোন কিনে দিব, যাহ্।
নীতি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে, “এ্যা!”
নিলয় ভ্রু কুঁচকে বলে, “এ্যা নয় হ্যাঁ!”
নিলয়ের কথার প্যাঁচ সে ধরতে পারলো। মনটাই খারাপ
হয়ে গেল। তার আর এ জীবনে ফোন ইউস করা হবে না।
এসব নিয়ে আর না ভেবে সে মনে মনে কিছু একটা ভেবে
মনে মনে হেসে বলে, “তোমাকে দশবার আব্বা ডাকবো,
তাইতো?”
নিলয় রে'গে তাকায়। কত্ত বড় সাহস, তাকে আব্বা
ডাকতে চায়! সে ধমকে ওঠে,
“এক চড় লাগাবো বে'য়া'দ'ব! আমি তোর আব্বা?”
নীতি ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে,
“তুমিই তো ডাকতে বললে!”
নিলয় রে'গে বলে,
“বে'য়া'দ'ব, তোর বাপকে ডেকে এনে হা না করে আব্বা
ডাক।”
নীতি মাথা নিচু করে মুখ ভেঙালো। এরপর আবারও
খাওয়ায় মনে দেয়। নিলয় বেশ কিছুক্ষণ নিলয়ের দিকে
চেয়ে রইল। এরপর একটু ঝুঁকে মায়ের কানের কাছে মুখ
নিয়ে বলে,
“আমি হাড্রেন্ট পার্সেন্ট সিইওর মা, মেয়ে তোমার পছন্দ হবেই হবে।”
ছেলের কথায় ভদ্রমহিলা না চাইতেও হেসে ফেলল। নীতি
চোখ ছোট ছোট করে নিলয়ের দিকে চেয়ে আছে। একটু
শোনারও চেষ্টা করল, নিলয় তার বড় আম্মুকে কি বলছে
শোনার জন্য। কিন্তু পারলো না।
নিলয় মাকে কথাটা বলে নীতির দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে
গ্লাস থেকে এক চুমুক পানি নেয়। এরপর চোখের পলকে
নীতির মুখ বরাবর মুখের পানি ছিটকে ফেলে। নীতি মুখে
ভাত নিয়ে উ উ করে চেঁচিয়ে ওঠে। নিলয়ের দাঁত কেলিয়ে
হেসে বলে,
“যেভাবে তাকিয়েছিলি, মনে হচ্ছিল, আমার মায়ের
হাতের ভাত খেয়েও তোর পেট ভরেনি, তার ছেলের
হাতেও খেতে চাইছিস। হাত মাখাতে পারবো না, তাই মুখ
দিয়ে কাজ চালালাম। তুই এসব আ উ না করে মুখের
পানি ভাতের সাথে চেঁটে চেঁটে খেয়ে নে, যাহ্!”
নিলয়ের মা বা হাতে নিলয়কে থা'প্প'ড় মা'র'তে নিলে
নিলয় তার ব্যাগ নিয়ে লাফ দিয়ে চুলার গণ্ডি পাড় হয়ে
যায়। নিলয়ের মা হতাশার শ্বাস ফেলে নীতির মুখে লেগে
থাকা পানি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দেয়। নীতি কটমট
চোখে নিলয়কে দেখছে। ইচ্ছে করল, নিলয়কে
চুইনগামের মতো চিবিয়ে খেতে। একটুও শান্তি দেয়না।
শুধু জ্বা'লি'য়ে মা'রে।
চলবে......... |
0 Comments