একাকীত্বের শেষ সীমানা (মা - ছেলে) (পার্ট:০২)



লেখক:Masranga

 চ্যাপ্টার ২ – ছোট্ট একটা পরিবর্তন



অক্টোবরের প্রথম শুক্রবার। সকাল থেকে বাড়িতে হালকা হৈচৈ। আজ কলেজ বন্ধ, শুক্রবারের ছুটি। রাহাত সকাল থেকে বাড়িতে। বাবা আব্দুর রহমানও বাড়িতে আছেন। তিনি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার, অডিট ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। আজকের এই ছুটির দিনে বাড়িতে থেকে রাহাতের সাথে সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু রাতের ট্রেনে সিলেট যাবেন—চার দিনের অডিটের জন্য। সেই কথাটা মাথায় ঘুরছে, কিন্তু দিনের বেলায় এখনো অনেক সময় আছে।

দুপুর হয়ে এসেছে। তিনজন—রাহাত, বাবা আর মা—সোফায় বসে টিভি দেখছেন। বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের ওয়ানডে ম্যাচ। বাবা আব্দুর রহমানও রাহাতের মতোই ক্রিকেট পাগল। দুজনের মধ্যে এটা একটা অদৃশ্য বন্ধন। বাবা বলেন, “দেখ রাহাত, আজ লিটন যদি সেঞ্চুরি করে, তাহলে ম্যাচটা আমাদের হাতে।” রাহাত হেসে বলে, “বাবা, তুমি তো সবসময় লিটনের ফ্যান। আমি বলি তাসকিন আজ ৪ উইকেট নেবে।” বাবা হাসেন, “ঠিক আছে, বাজি ধরি। যে হারবে, সে রাতে চা বানাবে।”

শিউলি পাশে বসে দুজনকে দেখছেন। মুখে হালকা হাসি। তিনি জানেন, এই মুহূর্তগুলো কতটা দামি। বাবা রাতে চলে যাবেন, চার দিন পর ফিরবেন। কিন্তু আজকের এই বিকেলটা পুরোপুরি তাদের। টিভিতে চিৎকার উঠছে—বাংলাদেশের উইকেট পড়েছে। রাহাত আর বাবা দুজনেই একসাথে চেঁচিয়ে ওঠেন, “ধুর!” টিভিতে ধারাভাষ্যকার চেচিয়ে ওঠেন, “কিন্তু না, বাবর আজম লং অন-এ ক্যাচ মিস করলেন!” তারপর দুজনেই হেসে ওঠেন। শিউলি বলেন, “দেখো, তোমরা দুজনেই একই রকম। একই পাগলামি।”

ম্যাচ চলতে থাকে। বাবা রাহাতের কাঁধে হাত রেখে বলেন, “জানিস রে, তুই যখন ছোট ছিলি, তখন থেকেই আমি তোকে ক্রিকেট শিখিয়েছি। আজ দেখ, তুই আমার থেকে বেশি জানিস।” রাহাত লজ্জা পেয়ে বলে, “বাবা, তুমি না থাকলে আমি কী করতাম? তোমার সাথে এভাবে বসে ম্যাচ দেখা... এটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।”
বাবা একটু চুপ করে যান। তার চোখে একটা অদ্ভুত উষ্ণতা। তারপর আস্তে করে বলেন, “আমারও। কিন্তু রাতে যেতে হবে। চার দিন পর আবার ফিরব। ততদিন মা-কে দেখিস। আর পড়াশোনা করিস।” রাহাত মাথা নাড়ে। কিন্তু বুকের ভেতরটা একটু ভারী হয়ে যায়। ম্যাচ শেষ হয়। বাংলাদেশ জিতে যায়। বাবা আর রাহাত দুজনেই উঠে দাঁড়িয়ে হাই-ফাইভ করেন। শিউলি হাসেন, “আজ তোমরা দুজনেই জিতলে। চা বানানোর বাজি কেউ হারেনি। আমি চা বানিয়ে আনছি।”

সন্ধ্যা হয়। বাবা রাতের ট্রেনের জন্য তৈরি হচ্ছেন। রাহাত তাকে স্টেশন পর্যন্ত ছেড়ে দিতে যাবে। যাওয়ার আগে বাবা রাহাতকে জড়িয়ে ধরেন। আস্তে করে বলেন, “তুই ভালো থাকিস। মাকে দেখিস। আর... আমি ফিরে এলে ফাইনাল ম্যাচটা দেখব।”
রাহাতের গলা ভারী হয়ে যায়। সে বলে, “আচ্ছা বাবা। তুমি সাবধানে যেও।”

বাবা চলে যান। রাহাত ফিরে আসে। বাড়িটা আবার শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু আজকের এই শান্ততা আগের দিনগুলোর মতো খালি লাগছে না। কারণ আজ বাবার সাথে কাটানো সময়টা বুকের মধ্যে জড়িয়ে আছে। শিউলি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, “আমি ডিনার রেডি করছি। টেবিলে বস।”
রাহাত টেবিলে বসে। ডিনার শেষ করে দুজন একসাথে।
খাওয়ার পর শিউলি আস্তে করে বলেন,
“আজ আমরা দুজনে মিলে কিছু করি? সিনেমা দেখি? অনেকদিন... অনেকদিন হয়ে গেল একসাথে কিছু করিনি।”
রাহাত এবার তাকায়। চোখে সামান্য অবাক, কিন্তু তার মধ্যে একটা অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা। যেন সে বুঝতে পেরেছে মায়ের বুকের ভেতরের কথা।
“কোন সিনেমা?”
শিউলি হাসার চেষ্টা করেন, কিন্তু হাসিটা ভাঙা। চোখের কোণে একটু জল চিকচিক করে।
“আমার পুরোনো একটা আছে। তোর বাবার সাথে... বিয়ের পর প্রথম দেখা। চল, চালাই।”
শিউলি প্লেয়ার খোলেন। হাত কাঁপছে খুব সামান্য। একটা ডিস্ক বের করেন—হুমায়ুন আহমেদের ‘আমার আছে জল’। সেই সিনেমাটা দেখার সময় তাঁর চোখে জল এসেছিল, রাহাতের বাবা হাত ধরে বসেছিলেন। আজ সেই স্মৃতি বুকের মধ্যে একটা পুরোনো ক্ষতের মতো জ্বলে উঠেছে। তিনি কিছু বলেন না। শুধু বলেন,
“এটা ভালো। একটু পুরোনো, কিন্তু গল্পটা... খুব কাছে লাগে।”
রাহাত সোফায় বসে। শিউলি পাশে। মাঝখানে ছোট টেবিলে দুটো কাপ চা। সিনেমা শুরু হয়। নীরবতা। গভীর, ভারী নীরবতা। রাহাতের মনে হয়—এই নীরবতার মধ্যে তার বাবার অনুপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিউলির মনে হয়—এই ছেলেটা বড় হয়েছে, কিন্তু তার চোখে এখনো সেই ছোটবেলার নির্ভরতা।
সিনেমার মাঝামাঝি একটা গান। শিউলি অজান্তেই গুনগুন করতে শুরু করেন। গলাটা ভাঙা, কিন্তু সুরটা এখনো জীবন্ত —

"যদি ডেকে বলি এসো হাত ধরো
চলো ভিজি আজ বৃষ্টিতে
এসো গান করি মেঘো মল্লারে
করুনাধারা দৃষ্টিতে
আসবে না তুমি জানি আমি জানি
অকারনে তবু কেন কাছে ডাকি
কেন মরে যাই তৃষ্ণাতে
এইই এসো না চলো জলে ভিজি
শ্রাবণ রাতের বৃষ্টিতে..."

রাহাত তাকায়। মা চোখ বন্ধ করে গাইছেন। গালে একটা হালকা হাসি, চোখের কোণে জল। রাহাতের গলা শুকিয়ে যায়। বুকের ভেতরটা গরম হয়ে ওঠে। মনে হয়—এই মহিলাটা আমার মা। এত সুন্দর গাইতে পারেন। আর আমি কখনো... কখনো লক্ষ্য করিনি। কেন করিনি? কেন এতদিন এই মায়াটা দেখিনি? কেন এতদিন এই মায়ের কাছে আসতে পারিনি?
গান শেষ। শিউলি চোখ খোলেন। চোখ ভিজে। লজ্জা পেয়ে বলেন,
“আরে... আমি কি গাইছিলাম! লজ্জা লাগছে।”
রাহাতের গলা ভারী। সে আস্তে করে, প্রায় ফিসফিস করে বলে,
“ভালো লাগলো। খুব... খুব ভালো লাগলো। মা... তুমি এত সুন্দর গাইতে পারো, আমি জানতাম না। আমি... আমি তোমার গান শুনতে চাই।”
শিউলির চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। তিনি হাত দিয়ে মুছে হেসে বলেন,
“তোর বাবা বলতেন আমার গান শুনলে কান বন্ধ করতে হয়।”
রাহাত চোখ নামিয়ে বলে,
“বাবা ভুল বলতেন। আমার... আমার খুব ভালো লাগলো। সত্যি। আমি চাই... আরও শুনি।”
দুজনে চুপ। কিন্তু এই চুপে আরাম। উষ্ণতা। একটা অদৃশ্য সুতো যেন আজ টান পড়েছে—যে সুতোটা কখনো ছিঁড়বে না। সিনেমা চলে। মাঝে মাঝে শিউলি বলেন,
“এই দৃশ্যটা দেখ... কত সুন্দর।”
রাহাত মাথা নাড়ে। কিন্তু তার চোখে জল আসার উপক্রম। আজ বাড়িটা খালি নয়। দুজন আছে। আর সেই দুজনের মাঝে একটা গভীর বন্ধন জেগে উঠছে—যে বন্ধনটা আর কখনো আলাদা হবে না।

সিনেমা শেষ। রাত সাড়ে এগারোটা। শিউলি রিমোট বন্ধ করেন। গলা ধরে আসে। তিনি বলেন,
“ভালো লাগলো না?”
রাহাতের চোখ ভিজে। সে বলে,
“খুব ভালো লাগলো। মনে হচ্ছে... বাড়িটা আবার পুরো হয়েছে। মা... তুমি না থাকলে আমি কী করতাম?”
শিউলির চোখে আবার জল। তিনি হাসার চেষ্টা করেন, কিন্তু গলা ভেঙে যায়।
“আরেকদিন আবার দেখব। তোর পছন্দের যেকোনোটা। আমি তোর সাথে থাকব। সবসময়। তুই তো আমার সবকিছু।”
রাহাত উঠে যায়। যাওয়ার সময় বলে,
“কাল তো বাবা নেই... কালকে আরেকটা দেখব? তোমার সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে আমার।”
শিউলি চমকে উঠেন। তারপর আস্তে করে, গলা ভেঙে বলেন,
“দেখব রে। যতদিন তুই চাইবি। আমি তোর জন্য সবসময় আছি। তুই তো আমার জীবন।”

রাহাত ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। অন্ধকারে বুকের ভেতরটা গরম। মনটা কেন যেন ভারী, অদ্ভুত অনুভূতি একটা। মনে হয়—আজ মা যদি না বলতেন, তাহলে সে একা থেকে এই খালি ভাবটাকে আরও বড় করে তুলত। আজ অন্যরকম। খুব ভালো। খুব গভীর। যেন মায়ের সাথে আবার নতুন করে একটা সম্পর্ক শুরু হয়েছে—যে সম্পর্কটা আর কখনো ভাঙবে না।
শিউলি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে প্লেট ধোয়। চোখের জল পড়তে থাকে। কিন্তু মুখে হাসি। ছেলেটা হাসছিল। তার গান শুনে বলেছিল ভালো লাগলো। অনেকদিন পর বাবা না থাকার পরেও বাড়িটা খালি লাগেনি। ছেলেটা পাশে ছিল। সত্যিই ছিল। আর সেই অনুভূতিটা বুকের মধ্যে একটা নরম আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে—যে আলোটা কখনো নিভবে না।

পরদিন সকালে রাহাত উঠে দেখে মা রান্নাঘরে। পরোটা আর ডিম ভাজা। রাহাত টেবিলে বসে বলে,
“আজ পরোটা?”
শিউলি হেসে বলেন,
“হ্যাঁ। গতকাল তোর সাথে সিনেমা দেখে মনটা ভালো ছিল। তাই ভাবলাম... আজও একটু স্পেশাল।”
রাহাত খেতে খেতে বলে,
“ভালো লেগেছে। আজকের রাতে কিন্তু আরেকটা সিনেমা দেখব।”
শিউলি চুপ করে থাকেন। তিনি আস্তে করে বলেন,
“দেখব রে।”

এই ছোট্ট পরিবর্তনটা খুব সামান্য। একটা শুক্রবার। মা-বাবা-ছেলের একসাথে থাকা। তারপর রাতে মা-ছেলের কিছু সুন্দর মুহূর্ত। কিন্তু এই মুহূর্তগুলোর মধ্যে একটা গভীরতা লুকিয়ে আছে—একটা অদৃশ্য বন্ধন, যা ধীরে ধীরে আরও শক্ত হচ্ছে। যা পরে আরও জটিল, আরও গভীর হয়ে উঠবে। মনে হতে পারে একটা অতি সাধারণ শুক্রবারের স্মৃতি। কিন্তু সেটা মা আর ছেলের বুকের মধ্যে নরম করে জড়িয়ে ধরে আছে। খুব আস্তে। খুব গভীরভাবে। যেন একটা নতুন শুরু।

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×