পর্ব: শ্যামা সুন্দরী (পর্ব:২২)


লেখিকা :সুরভী আক্তার

পর্ব:২২

-----------------------



বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগ মুহুর্ত ।

সূর্য অস্ত গেছে কেবল । আকাশ ঢেকে

আছে কালো মেঘে ‌। বৃষ্টি আসবে না,

সম্ভবনাও নেই কোনো । তবে আকাশের

দিকে তাকালে মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি নামবে ‌।

দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয় ।


সেখান থেকেই কালো

মেঘ ছুটে এসেছে মাধবপুরে ।


সব গুলো পর্বের লিঙ্ক

 


সেই আসরের পর থেকেই ঘাটের সিঁড়িতে

একলা আনমনা হয়ে বসে আছে ময়না ।

ওর এই ভাবটা একেবারে নতুন । চঞ্চলা

হয়েও ও কখনো ঘাটের দিকে তেমন ভেড়ে

নি । এভাবে এতো সময় ধরে বসে থাকা তো

দূরের কথা । তবে এখন তো ও বদলেছে ।

ওর অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে ‌।

এই যেমন, সবসময় গড়িমা করা মেয়েটা

কেমন চুপসে গেছে । চঞ্চল মেয়েটা গুটিয়ে

গেছে , সুন্দর চেহারা খানাও শুকিয়েছে ,

সাজগোজ ও করে না আজকাল ।

প্রয়োজনের বেশি কথাও বলে না । 


সেই তখন থেকেই ঘাটে বসে আছে ও ।

পড়নের শাড়ির আঁচলটা অবহেলিতের

ন্যায় বিছিয়ে আছে ঘাটের সিঁড়িতে ।

গোসলের পর থেকেই চুল গুলো খোলা ,

এখনো খোলাই আছে । নদীর পাড়ের মৃদু

বাতাসে আলতো ঢেউ খাচ্ছে সেগুলো ।

ময়না চেয়ে আছে নদীর পানে । নড়ছে না

একটুও । পাথরের ন্যায় বসে আছে , ক্ষিয়

কাল পর পর পলক পড়ছে চোখে । আজ

যেন শ্যামার অনুরূপ লাগছে ওকে । চোখ

মুখ শুকনো মেয়েটার । সন্ধ্যা গড়াচ্ছে

তবুও ঘরে আসার নাম নেই । জাভেদ যায়

নি , আজ থাকবে । কাল ফিরবে বাড়িতে ।

অতঃপর রুপা আর একটু সুস্থ হলে

জাভেদ ওকে ফেরাবে নিজের কাছে । 

এই দুদিন রুপার সাথে টুকটাক একটু

আধটু হলেও কথা বলে সময় পার করেছে

ময়না । আজ কাল আবার সময় বইতেই

চায় না । এক পলক কে এক প্রহরের সমান

মনে হয় । সেই প্রহর মনে মনে গুনে চলে

ময়না । এখন ঘরে রুপার সাথে জাভেদ

আছে । ঐ ঘরে যাওয়া ভালো দেখায় না ।

অলকাও রান্না করছেন । তার কাছেও

বসতে ইচ্ছে করে না । আম্মার তীর্যক দৃষ্টি

অস্বস্তিতে ফেলে দেয় ময়না কে । 

ময়না বসে বসে ভাবছিল কিছু । ঝিঁঝিঁ

পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে ।

মশাও হানা দিচ্ছে । এমন সময় পিছন

থেকে মোখলেছের শীতল কন্ঠে ডাক

ভেসে আসলো....


" ময়না...



হুট করে আব্বার ডাক কানে আসায়

ময়না ভ্যাবাচ্যাকা

 খেয়ে নড়ে চড়ে উঠলো ।

 চকিতে পিছন ফিরতেই মোখলেছকে

দেখতে পেল সে । মোখলেছ দাঁড়িয়ে

আছেন বড় আমগাছটার কাছে । আলো

আঁধারের মাঝে তার নরম অসহায় চাহনি

নজরে আসলো ময়নার । ময়না বসা ছেড়ে

উঠলো তৎক্ষণাৎ । মাথার চুল গুলো হাত

খোঁপা করে আটকালো কোনো রকমে ।

অতঃপর ধৃত পায়ে এসে দাঁড়ালো আব্বার

সম্মুখে । শুকনো হাসার চেষ্টা করে

বললো....



" কও আব্বা ,,, 



মেয়ের মুখে হাসি দেখে মোখলেছ ও জোর

পূর্বক ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে

মোলায়েম কন্ঠে বললেন...



" আন্ধার হইতাছে তো , এই হানে একলা

একলা বইসা কি করতাছোস ? ঘরে যা...



" যাইতাছি ! তুমি কখন আইছো আব্বা ? 



" কেবল আইলাম ! 


ময়না চোখ নামালো । মোখলেছ চেয়ে

আছে কেমন করে । চেয়ে থেকেই হুতাশ

হয়ে শ্বাস ফেললেন তিনি । কম্পমান হাত

বাড়িয়ে মেয়ের মাথায় রাখলেন । নিরিহের

ন্যায় অদ্ভুত স্বরে বললেন....



" তোর আম্মা কথা কয় না তোর লগে ? 



" কয় তো । তয় আমার কথা কইতে ইচ্ছা

করে না । আম্মার দিকে তাকাইতেই মনে

চায় না । বুক কাঁপে আমার । জানো

আব্বা,, মনে হয় আমার ভয় লাগে...



মোখলেছ হাত নামালেন । পল্লব ঝাপটে

ঢোক গিলে বললেন...

" জামাই আইবো না ? 

ময়না কপাল কুঁচকে চোখে চোখ রেখেই

পাল্টা প্রশ্ন করলো...



" আওনের কথা আছে বুঝি ?



মোখলেছ নজর ঘোরালেন এদিক ওদিক ।

কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলার মতো কথা

খুঁজে পেলেন না তিনি ।

ময়না চেয়ে আছে ।

মোখলেছ মেয়ের দিকে তাকাতে

পারলেন না , ঝট করে প্রসঙ্গ পাল্টালেন

তিনি....


" ঘরে যা তুই , আমি আড়তে যাইতাছি


আবার । মেলা কাম আছে । বাড়তি সময়

কাম করলে আলাদা কইরা টাকা পামু ,

চিন্তা করিস না । আমি আইতাছি...



বলা শেষ করে এক মুহুর্ত অপেক্ষা

করলেন না আর । দ্রুত পায়ে ময়নার

সামনে থেকে স্থান ত্যাগ করলেন তিনি ।

ময়না আব্বার চলার পানে তাকিয়ে ফিকে

হাসলো । ঘাটের দিকে ঘুরে আকাশের

পানে মুখ তুললো । চোখ বুজে দীর্ঘ একটা

শ্বাস টানলো বুক ভরে । ঠান্ডা বাতাস

নাসারন্ধ্রের ভিতরে প্রবেশ করা মাত্রই

কেঁপে উঠলো ময়না ।


এদিকে বিকেলের দিকে সংগ্রাম বেরিয়েছে

আবারো । হাজার বারনের পরও শ্যামা

সবার অগোচরে রান্না ঘরে ঢুকেছে । শ্যামা

কে দেখে তটস্থ উপস্থিত সমস্ত গৃহকর্মীরা ।

সালেহা আর লতিফা কড়া ভাবে শ্যামা কে

হেঁশেলের আশে পাশে যেতেও নিষেধ

করেছেন । তাদের কথার অবমাননা হলে

শ্যামার কি হবে জানা নেই , তবে বাকিদের

হেনস্থা করা হবে কটু কথার দ্বারা । যার

ভয়ে সবাই অনুনয় বিনয় করে শ্যামা কে

কাটানোর চেষ্টা করলো রান্না ঘর থেকে ।

কিন্তু কাজ হলো না । শ্যামার কাজ নেই

কোনো , ঘরেও সবসময় একা একা থাকতে

ভালো লাগে না । শবনমের কাছে যাওয়া

যেত , কিন্তু এই সময় জুনাইদ বাড়িতে

আছে । তাই সেখানে ও যাওয়া হলো না ।

আতিয়া বেগমের মাজায় ব্যাথা বেড়েছে,

শ্যামা তাকে অতি যত্ন সহকারে তেল

মালিশ করে দিচ্ছিল এতক্ষণ । এখন

তিনিও আরাম পেয়ে ঘুমিয়েছেন একটু ।


আর কোথায় যাওয়ার আছে শ্যামার ?

তাই শত বাঁধার পরও রান্না ঘরেই সই ।

শ্যামা নড়লো সেখান থেকে । একপাশে

বসলো গুটিসুটি হয়ে । আজ আর রান্না

বান্নায় হাত লাগালো না শ্যামা । এমনিতেও

জমিদার বাড়ির বউয়েরা রান্না বান্নায় হাত

লাগায় না তেমন । এতদিনে সালেহা কে

রান্না ঘরের দরজা মাড়াতে অবধিও দেখে

নি শ্যামা । আর লতিফা তো আর যাই

হোক বাড়ির মেয়ে । শবনম ও তেমন রান্না

ঘরে ঢোকে না । যা করার বাড়ির কাজের

লোকরাই করে । সবার চাহিদা আর সূচি

অনুযায়ী রান্না করা হয় রোজ । শ্যামা কে

এভাবে সামনে বসে থাকতে দেখে কাজ

করতে অসুবিধা হচ্ছে বোধহয় সবার । সব

গৃহকর্মীরা বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে

শ্যামার দিকে । আড়ষ্টতায় গুটিয়ে আছে

তারা , ভয়ে বুক ঢিপঢিপ করছে । এই

বোধহয় শ্যামা কোনো ভুল ধরবে । তাই

হয়তো এভাবে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে

দেখছে ওদের কর্মকাণ্ড । শ্যামা সবার

জড়তা বুঝে অস্বস্তি কাটিয়ে হাসার চেষ্টা

করলো । টুকটাক কথা বলতে আড়ম্ভ

করলো সবার সাথে । 


এভাবে বেশ কিছু সময় কেটে গেছে ।

মাগরিবের আজানের ধ্বনি পড়ছে কানে ।

শ্যামা কথা বাড়িয়ে আর সময় পার

করলো না । নামাজের জন্য রান্না ঘর ত্যাগ

করে সিঁড়ি বেয়ে উঠলো নিজের ঘরে ।

শ্যামা বের হতেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো

সবাই । বুকে হাত দিয়ে প্রবল তপ্ত শ্বাস

ফেললো । ভয় ছিলো যদি সালেহা বা

লতিফা দেখে ফেলে , তাহলে পরবর্তীতে

কথা শুনতে হবে ওদের । 


শ্যামার যাওয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে

সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি

হাসলো । শ্যামা মেয়ে টাকে বেশ পছন্দ

হয়েছে সবার । কেউ আগ বাড়িয়ে কথা

বলে নি কখনো , কিন্তু যতটুকু দেখেছে বা

কথা বলেছে ততটুকু তে শ্যামা কে তাদের

মনে ধরেছে বেশ । মেয়েটার গায়ের রং

শ্যামলা হলেও মনটা উজ্জ্বল । 

শ্যামা ঘরে এসে নামাজ পড়ে নিলো ।

অতঃপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো । ঠান্ডা

কমে আসছে এখন । শীত বিদায় নিচ্ছে

ধীরে ধীরে । চারদিকে রিক্ততা ছড়িয়ে

পড়ছে । আজকাল ঠান্ডা লাগে না তেমন ।

তবে সকাল সন্ধ্যা শিরশিরে ঠান্ডা বাতাস

বয় । 


শ্যামার পড়নে দামি একটা কাতান শাড়ি ।

খোলা বারান্দায় দাঁড়ানোর সাথে সাথে

একটা দমকা ঠান্ডা হাওয়া ছুঁয়ে দিলো

শ্যামা কে । শ্যামা কেঁপে উঠলো । শাড়ির

আঁচল টেনে শরীরে পেঁচিয়ে নিলো ।

আলমারি ভর্তি সংগ্রামের জোয়ার্দারের

জমিদারি শাল । দুদিন আগে আরো

কতগুলো এসেছে শহর থেকে । সংগ্রাম

এক শাল দ্বিতীয় বার পড়ে না । আগের

পরিহিত ব্যবহার করা শাল গুলো বিলিয়ে

দেওয়া হয় হয়তো । সংগ্রাম আগে

বলেছিল একবার । সংগ্রামের কথা মনে

আসতেই মুচকি হাসলো শ্যামা । কিছু

একটা ভেবে বারান্দা ছেড়ে ঝট করে ঘরে

ঢুকলো । সকালে সংগ্রাম যে শালটা

পড়েছিল সেটা বিছানার একপাশে গুছিয়ে

রেখেছে শ্যামা । শ্যামা হাতে নিলো সেটা ।

ভাঁজ খুলে গায়ে জড়িয়ে আবারো খোলা

বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো । শালের প্রতিটা

সুতোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে একটা মিষ্টি সুবাস

আকৃষ্ট করছে শ্যামা কে ‌।

বরাবরই এই তীব্র ঝাজালো

 গন্ধ টা নাকে বাঁধে শ্যামার ।

আতরের গন্ধের সাথে সাথে পুরুষালি

শরীরের ঝাঁজালো ঘ্রাণের মিশ্রণে অদ্ভুত

মাদকিয় একটা গন্ধ । শ্যামা শাল টাকে

আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে অতিব

কামুকতায় উপলব্ধি করলো গন্ধ টাকে ।

পর মূহুর্তে শ্বাস ফেলে মুচকি হাসলো সে । 



নিচে বাগানের দিকে চোখ পড়লো এবার ।

অতিথি শালার বাইরে খোলা আকাশের

নিচে গোল বৈঠক বসেছে ছেলে মেয়েদের ।

সংগ্রাম তখন ওদের সম্পর্কে বলেছে শ্যামা

কে । শ্যামার দৃষ্টি ওদের দিকে যেতেই

কপাল কুঁচকে আসলো আপনা আপনি ।

বৈদ্যুতিক আলোয় সবার চেহারা স্পষ্ট ।

সবাই চেয়ারে বসে গোল হয়ে আড্ডায়

মজেছে বোধহয় ।

সবার মধ্য থেকে শ্যামার

 চোখ খুঁজে নিলো সেই মেয়ে টাকে।

 ঐতো একপাশে বসে আছে । মেয়েটার

দুই পাশেই দুটো ছেলে । শ্যামা মেয়ে টাকে

দেখে বিরক্ত হলো । চোখ ফেরালো সহসা ।

সংগ্রামের শাল টাকে জড়িয়ে ওর কথা

বলা গুলো ভেবে মুচকি হাসলো । কোনো

এক দিকে এক ধ্যানে এক দৃষ্টে তাকিয়ে

রইল কিছুক্ষণ । ওর ধ্যান ভাঙ্গলো

দরজার খট করে ওঠা শব্দে । অকস্মাৎ

ভড়কে গিয়ে পিছন ফিরলো শ্যামা ।

সংগ্রাম এসেছে এই ভেবে বারান্দা থেকে

দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকলো । দরজা চাপিয়ে

ঘরে ছিল সে , এখন দরজার দিকে

তাকাতেই লক্ষ্য করলো দরজাটা বন্ধ ।

কপাল গুটালো শ্যামা । ঘরে সংগ্রাম নেই ,

তারমানে আসে নি সে । তাহলে শব্দ হলো

কিসের ? নিজের ভাবনাতেই 


সংকিত হয়ে দরজার কাছে গিয়ে থামলো

শ্যামা । হাত বাড়িয়ে খোলার চেষ্টা করলো

দরজাটা । তবে খুললো না । শ্যামা শক্ত

হাতে পুনরায় খোলার চেষ্টা করলো দরজা

খানা , আবারো বিফল । মনে হয় আটকে

গেছে, কিন্তু কি করে ? বাইরে থেকে

লাগিয়েছে কেউ ? কে লাগাবে ? আর কেন

? আচমকা ভয় কাজ করলো ভীত নারী

হৃদয়ে ! চারদিকে কেমন নিঃসঙ্গ গুমোট

ভাব ঠেকলো । ভিতিকর পরিস্থিতি তৈরি

হলো একলা ঘরে । শ্যামা এদিক ওদিক

তাকালো , বিশাল ঘর পুরোটাই ফাঁকা ।

মৃদু বাতাসে বারান্দার পাশের জানালার

পর্দা গুলো উড়ছে । শ্যামা বরাবরই ঘরে

একা থাকে ,ভয় লাগে না , সংগ্রাম কাছে

থাকলে তো একেবারেই না । তবে আজ

কেমন জানি গাঁ ছমছম করে উঠলো ।

বুকটা ধক্ করে উঠলো । শ্যামা শুকনো

ঢোক গিললো , শুকনো অধর ভেজালো

জিভে । অতঃপর কাঁপা হাতে পুনরায়

দরজা ধাক্কালো, মৃদু স্বরে ডাকলো....



" কেউ আছেন বাইরে ? দরজা টা খুলে

দিন না ! আটকে গেছে দরজা টা । ভাবি

আছেন ? 



ওপাশে কারোর সাঁড়া নেই । আর না কেউ

দরজা খুলে দিল । হয়তো কেউ নেই

আশেপাশে । এমনিতেই ঘরের ভেতরের

শব্দ মোটা দেয়াল ভেদ করে বাইরে কম

পৌঁছায় । 


শ্যামা শান্ত হলো । বোঝালো নিজেকে ,

চাপানো দরজা মৃদু বাতাসে বন্ধ হয়েছে

হয়তো । আর নয়তো কেউ নিশ্চয়ই মজা

করছে ? ছোট জমিদার সাহেব নয়তো ?

এটা ভেবেই জোর পূর্বক এক চিলতে হাসি

ফুটালো নিজের ঠোঁটের কোণে । শ্যামা

আর দরজা ধাক্কালো না ।


সংগ্রাম কি করে এটা দেখার জন্য সরে

আসলো দরজার সামনে থেকে । এক

নজরে তাকিয়ে রইল দরজার দিকে ।

এভাবে কাটলো আরো কয়েক মুহূর্ত ।

কেউ দরজা খুললো না, আর না কারোর

উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে । শ্যামা একই

ভাবে তাকিয়েই কপাল কুঁচকালো । সরু

করলো চাহনি । আচমকা বিকট শব্দে

ধাম করে খুলে গেল দরজা টা । দরজা

বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামা চমকে উঠলো

তৎক্ষণাৎ । চোখে পলক ফেলে আবারো

বৃহৎ নয়নে তাকালো । বক্ষ স্থল ধক্ করে

উঠলো মুহুর্তেই । দরজা খোলার সাথে

সাথে দমকা হাওয়া ছুঁইয়ে দিয়েছে শ্যামার

শরীর কে । শিহরণে আপাদমস্তক কেঁপে

উঠলো শ্যামার । তবুও ক্ষিয় কাল বাদ

হাসার চেষ্টা করলো সে । কম্পন রত পায়ে

ছোট ছোট কদম ফেলে এগোতে এগোতে

হালকা স্বরে ডাকলো...



" ছ.. ছোট জমিদার সাহেব...! আপনি

এখানে...? 



এগোতে এগোতে দরজার বাইরে পা

রাখলো । পুরো করিডোরে কেউ নেই ।

সম্পুর্ন টা ফাঁকা । উজ্জ্বল আলোয় মার্বেল

পাথরের মেঝে চকচক করছে । শ্যামা

এবার হাঁফ ছাড়ল । বুকে হাত রেখে দীর্ঘ

শ্বাস ফেললো । সিঁড়ির কাছে এগিয়ে গিয়ে

নিচের দিকে দৃষ্টি পাত করলো, বসার ঘরে

কেউ নেই । দুজন কাজের মেয়ে রান্না ঘর

থেকে বেরিয়ে আসলো , ওরা ট্রে হাতে

অন্দরের বাইরের দিকে বেরোলো । শ্যামা

তপ্ত শ্বাস ফেললো আবারো । কেউ নেই

এখানে , তারমানে অতিরিক্ত ভয়ের কারণে

হয়তো মনের ভুল । এটাই মনকে

বোঝালো শ্যামা । এক মুহুর্তের জন্য মন

এটা মানলেও পরক্ষনে অন্য চিন্তা মাথায়

আসলো । দরজা টা বন্ধ হলো কিভাবে ,

আর খুললোই বা কিভাবে ? বাতাস ও তো

তেমন নেই ? ঘরের ভেতর তো একেবারেই

না , যা আছে খোলা বারান্দায় । আর এতো

ভারি শাল‌ কাঠের দরজা সামান্য বাতাসে

এক চুল নড়ার ও কথা নয় । 


শ্যামা সব চিন্তা ঝেড়ে দুদিকে মাথা

নাড়ালো । অতঃপর ঘরের দিকে পা

বাড়ালো । দরজা মাড়ানোর আগেই

আশেপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা

ঝুনঝুন শব্দ কানে ঠেকলো শ্যামার ।

তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে গেল শ্যামা । পা দুটো

থমকে গেল । ঝট করে পিছন ফিরে কান

খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করলো । কোথাও

থেকে নুপুর, না না ঘুঙ্গুরের শব্দ ভেসে

আসছে । হ্যাঁ , এটা তো ঘুঙ্গুরের শব্দ !


বুঝতে অসুবিধা হলো না শ্যামার । শ্যামা

তীক্ষ্ণ ভাবে কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা

করলো কোথা থেকে আসছে শব্দটা ।

ঠাহর করতে পারল না । মনে হচ্ছে

সবদিক থেকেই শব্দ টা শোনা যাচ্ছে ।

আবারো ভড়কালো শ্যামা । ভীত নারী সত্ত্বা

চুপসে গেল । শ্যামা এদিক ওদিক ঘন

পল্লব ফেললো । এলোমেলো পায়ে বালার

ঘরের দিকে এগোলো । বাড়িতে একমাত্র

বালা'ই নুপুর পড়ে । হয়তো ওর ঘর থেকেই

শব্দ ভেসে আসছে । শ্যামার পা এগোচ্ছে,

তবে মনে হচ্ছে এইটুকু পথ পেরোচ্ছে না ,

শেষ হচ্ছে না ওর ঘর থেকে বালার ঘরের

সামান্য দূরত্বটুকু । সেই দিনের মতো দম

বন্ধ হয়ে আসছে শ্যামার , হাঁসফাঁস

লাগছে , ঠান্ডা তেও ঘামছে পুরো শরীর ।

মনে হচ্ছে ঠিক সেই দিনের মতো দুদিকের

সাদা দেওয়াল গ্রাস করে নিচ্ছে ওকে ।

চারদিক কেমন শুন্য আর ঘোলাটে-

ঝাপসা হয়ে আসছে , এলোমেলো লাগছে ।

মনে হচ্ছে গোলক ধাঁধার মতো শ্যামা কে

কেন্দ্র বিন্দুতে রেখে গন্ডি পাকিয়ে ঘুরছে

সবকিছু । শ্যামা চলতে চলতে থেমে গেল ।

মাথা টা চক্কর দিয়ে উঠলো । পড়তে পড়তে

দেয়ালে হাত ঠেসে নিজেকে সামলে নিয়ে

দাঁড়ালো সে । চোখ খিচে বন্ধ করে

একহাতে মাথা চেপে ধরলো । ঘুঙ্গুরের

আওয়াজ এখন বিলিন । শোনা যাচ্ছে না

আর । আবারো নিস্তব্ধ চারদিক ।


শ্যামা দম ফেলছে ঘনঘন ।

 কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ,

চিবুক বেয়ে গড়াচ্ছে দুই ফোঁটা ।

 শ্যামা চোখ তুললো । নিস্তেজ চোখে

আশেপাশে তাকালো । এখনো কেউ নেই ।

শ্যামার এই অবস্থা কেউ কি দেখছে না ?

পা টলমল করছে শ্যামার । অদ্ভুত ভাবে পা

দুটো কাঁপছে । শ্যামা এবার পথ পাল্টে

এগোনোর চেষ্টা করলো নিজের ঘরের

দিকে । দেয়াল ঘেঁষে ধরে ধরে কোনো

রকমে এগোচ্ছে সে । কয়েক কদম

এগোতেই আবারো সেই ঘুঙ্গুরের

আওয়াজ । এবার আওয়াজ টা খুব কাছে ।

মনে হয় ঠিক পেছনে , শ্যামার পিছু পিছু

এগোচ্ছে কেউ । প্রত্যেক কদমেই ঝুনঝুন

শব্দ বাজছে । গায়ে কাঁটা দিলো শ্যামার ।

দুর্বল চাহনি বৃহৎ হলো ‌। পিছন ফেরার

সাধ্যি টুকু নেই ওর । শ্যামা থামলো , গলা

শুকিয়ে আসছে , শুল্ক ঢোক গিললো সে ।

ও থামার সাথে সাথে শব্দ টাও থেমে গেল ।

কয়েক সেকেন্ড পর এবার দৃঢ় পায়ে পা

বাড়ালো শ্যামা , পা বাড়ানোর সাথে সাথে

আবারো সেই ঘুঙ্গুরের শব্দ । ভয়ে আতকে

উঠলো শ্যামা । এক ঝটকায় পিছন

ফিরলো । কি আজব , কেউ তো নেই

এখানে ! তাহলে....? শ্যামা কাঁপা গলায়

হাওয়ায় প্রশ্ন ছুঁড়লো...





" কে এখানে ? ক..কেউ আছেন ? 



কেউ নেই ! শ্যামা কপালের ঘাম মুছলো

হাতের উল্টো পিঠে । জিভ দিয়ে ঠোঁট

ভিজিয়ে চোরা চোখ ঘোরালো এদিক

ওদিক । কাউকে না দেখে আবারও পিছন

ফিরলো , চোখ বন্ধ করে দম খিচে এক পা

এগোতেই আবারো সেই একই শব্দ ।

এবার আর সহ্য হলো না শ্যামার । মাথা

ফেটে যাচ্ছে মনে হচ্ছে । শ্যামা দুহাতে

কান চেপে ধরে চোখ খিচে গলা চিরে

বিকট আওয়াজে জোরে চিৎকার করে

উঠল ।

 সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে । 




রাত ঠিক আটটা...


সংগ্রাম জোয়ার্দারের ঘরের ঘড়ির কাঁটায়

টিকটিক শব্দ হচ্ছে ‌। টিকটিক শব্দের

সাথে সময় গুনছে সবাই ।

 ঘরে সবাই উপস্থিত ,

শবনম আর আতিয়া বেগম চিন্তিত মুখে

খাটের দুই পাশে বসে আছেন ।

শ্যামা তাদের মাঝে অবচেতন হয়ে শুয়ে

আছে । সেই যে চিৎকার করে জ্ঞান

হারালো , তখন থেকে জ্ঞান ফেরেনি আর ।

ওর চিৎকারের শব্দে বাইরে বেরিয়েছিল

সবাই । শ্যামা কে মেঝেতে ওভাবে পড়ে

থাকতে দেখে সবাই বিস্মিত । কোনো

রকমে ধরে বেঁধে ওর নিস্তেজ শরীর টাকে

ঘরে নিয়ে আসা হয়েছে । 


পানি ছেটানো হয়েছে মুখে , তবুও জ্ঞান

ফেরেনি । বালা ও চিন্তিত মুখে বসে আছে

শ্যামার পায়ের কাছে । সালেহা আর

লতিফা মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন

দরজা বরাবর । শ্যামার এই অবস্থা তেও

তাদের মুখে চিন্তার রেশ টুকুও নেই ।

এমনকি শ্যামার মুখ পানে তাকানোর রুচি

টুকুও নেই বোধহয় । তাইতো মুখ

ঝামটাচ্ছেন বারবার । চোখে মুখে স্পষ্ট

বিরক্তি তাদের । 


এতক্ষণে একটু নড়ে উঠলো শ্যামা । এক

হাত মাথায় রেখে চোখ খুললো পিটপিট

করে । মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে ।

চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে । তবুও চোখ দুটো

আবছা খুলে বোঝার চেষ্টা করলো বর্তমান

পরিস্থিতি । সরু ঝাপসা চোখে ঘরের মধ্যে

বাড়ির সবার উপস্থিতি দেখে থমকালো ।

ভ্রু যুগল জড়ো হয়ে আসলো আপনা

আপনি । শ্যামা কে চোখ খুলে নড়চড়

করতে দেখে আতিয়া বেগম খানিক ঝুঁকে

উদ্বিগ্ন হয়ে পরপর শুধালেন....



" নাত বৌ , ও নাত বৌ..


কি হইছে নাত বৌ ?

 ভালা আছোস নি এহন?

 কি হইছে তোর... এমনে জ্ঞান হারাইলি

ক্যামনে ? কি হইছিলো...? 



শ্যামা শুনলো । তবে সাথে সাথে উত্তর

করলো না । চোখ ঘুরিয়ে সবাই কে এক

পলক করে দেখে নিলো । অতঃপর দূর্বল

শরীরে শোয়া থেকে উঠে বসার চেষ্টা

করলো । শবনম সাহায্য করলো উঠে

বসতে । শ্যামা পিঠের কাছে বালিশ রেখে

আধশোয়া হয়ে হেলান দিলো পিছনের

দিকে । কপাল চেপে চোখ বন্ধ করে মনে

করার চেষ্টা করলো । সবকিছু ধ্যানে

আসতেই ঝট করে চোখ খুললো শ্যামা ।

বৃহৎ চঞ্চল নেত্রে এদিক ওদিক তাকালো ।

শ্যামা কে উদ্বিগ্ন দেখে শবনম ওর হাত

ধরে শুধালো....



" শ্যামা,, কি হয়েছে বোন ? কি দেখছো ?

ঠিক আছো তুমি ? বাইরে ওভাবে জ্ঞান

হারালে কিভাবে ? 



শ্যামা শবনমের হাত দুটো খপ করে চেপে

ধরলো । কম্পিত গলায় ফিসফিস

করলো.....



" কেউ ,, কেউ ছিল ওখানে ! ব.. বাইরে

কেউ ছিল ! ঐ ঘুঙ্গুরের আওয়াজ,, ওটা,

ওটা কোথা থেকে আসছিল ? আমি, আমি

শুনেছি । আপা কেউ ছিল বাইরে.....


আমি এমনি এমনি জ্ঞান হারাইনি । কেউ

তো ছিল । আহহ্... মাথাটা ফেটে যাচ্ছে

আমার....



শবনমের হাত ঝাড়া দিয়ে ছেড়ে দুহাতে

মাথা চেপে শেষের কথাটা বললো শ্যামা ।

আতিয়া বেগম আর শবনম শ্যামার কথা

গুলো না বুঝে একে অপরের দিকে চাওয়া

চাওয়ি করলো । বালা কপাল কুঁচকে

তাকালো । শ্যামার পায়ের কাছ থেকে উঠে

ওর পাশে বসলো ।

লতিফা বালার এহেন কান্ড

দেখে চোখ মুখ শক্ত করে তাকালেন।

 দাঁতে দাঁত পিষলেন তিনি । রুষ্ট কন্ঠে

ঝংকার তুলে বললেন...



" এই ,, তুই ঐ মেয়ের কাছে ঘেষছিস

কেনো এভাবে ? দূরে সরে ওর থেকে ! 



বালা কথায় পাত্তা দিলো না । প্রতিক্রিয়াও

 দেখালো না কোনোরূপ । বরং আরো

কাছাকাছি বসে নরম কন্ঠে শ্যামা কে

শুধালো...



" শ্যামা ,, কি হয়েছে ? কি সব বলছো তুমি ?

কি শুনেছো ? আর , ঘুঙ্গুরের আওয়াজ

কোথা থেকে আসবে ? 



শ্যামা হাত নেড়ে বাঁধ সাধলো....



" না ,,, বাইরে আমি শুনেছি ঘুঙ্গুরের শব্দ ।

বিশ্বাস করো কেউ তো ছিল , কিন্তু আমি

দেখতে পাই নি কাউকে । সেইদিন ও আমি

অনুভব করেছিলাম..আর আজ আবার ।

কিন্তু আজ ঐ ঘুঙ্গুরের আওয়াজ , ওটা....



" এই মেয়ে ,, কিসব বলছিস তুই ? পাগল

হয়ে গেছিস ? পাগলের প্রলাপ বকছিস ?

জমিদার বাড়িতে ঘুঙ্গুর আসবে কোথা

থেকে ? ওসব নর্তকীদের জিনিস এই

বাড়িতে আনবে কার সাধ্যি ? কান খারাপ,

নাকি মাথা খারাপ তোর ? 



শ্যামা কে কথার মাঝে থামিয়ে কটাক্ষ

করে কথা গুলো বললো সালেহা । শ্যামা

ফের বাঁধ সাধলো....



" বিশ্বাস করুন আম্মা ,, আমি মিথ্যে

বলছি না । আমি স্পষ্ট শুনেছি । ঐ

ঘুঙ্গুরের তীক্ষ্ণ আওয়াজ অনেক বার

শুনেছি আমি । প্রথমে ভেবেছিলাম মনের

ভুল । কিন্তু আমার মনের ভুল ছিল না ।

সত্যি শুনেছি আমি ....



এবার বিদ্রুপ করলো লতিফা । দুপা

এগিয়ে ঝাঁজালো কন্ঠে বলল....



" চুপ কর অপয়া মেয়ে । একে তো নাটক

করছিস , তার উপর আবার মুখে মুখে তর্ক

করছিস । মুখের চোপা বেড়েছে তোর ?



শ্যামা অসহায়ের মতো মাথা ঝাঁকালো ।

পুনরায় বোঝানোর স্বরে বলার চেষ্টা

করলো কিছু । ওকে কিছু বলার সুযোগ না

দিয়ে আতিয়া বেগম বলে উঠলেন....



" থাক নাত বৌ । শান্ত হ তুই । আমগো

জমিদার বাড়িতে ঐ সব ঘুঙ্গুর কোই

থাইকা আইবো ক‌‌‌ ? তুই মনে হয় ভুল

শুনছোস ।



" আমি ভুল শুনি নাই দাদি জান....



" হইছে ... এই নিয়া আর কথা বাড়াইস না ।

ভুল হইতেই পারে মাইনষের । তুই একটু

আরাম কর ,, দম নে , দেখবি মাথা পাতলা

হইলে সব ঠিক হইয়া যাইবো । ভয়

পাইছিলি মনে হয় ‌, তাই তো জ্ঞান

হারাইছিলি । 



শ্যামার চোখ ছলছল করছে । ও যে মিথ্যে

বলছে না । সত্যি সত্যি শুনেছে সবটা ! কি

করে বোঝাবে সবাইকে ? কেউ তো ওর

কথা বোঝার চেষ্টা টুকু ও করছে না । 


শ্যামা উশখুশ করছে , অস্থির লাগছে

ভীষণ । এর মধ্যে সংগ্রাম ঢুকলো ঘরে ।

স্বভাব সুলভ গায়ের শাল খুলতে খুলতে

ঘরে ঢুকলো । চোখ তুলে ঘরে সবাইকে

দেখে কপাল কুঁচকালো । বিশেষ করে

সালেহা আর লতিফা কে দেখে । ওর

নিঃশব্দ উপস্থিতি টের পায় নি কেউ ।

সংগ্রাম গলা ঝেড়ে বললো....



" কি হয়েছে এখানে ? 


একই সাথে দরজার দিকে

তাকালো সবাই ।

শ্যামাও তাকালো ছলছল নয়নে ।

লতিফা একটু কাত হয়ে পিছন ফিরতেই

সংগ্রাম খাটে গুটিয়ে বসে থাকা শ্যামা কে

দেখতে পেলো । শ্যামার ছলছল চাহনি

নজর কাড়লো সবার আগে । অমনি

আঁতকে উঠলো সে । হাতের শাল টা ছুড়ে

মারলো পাশের টেবিলের উপর । দ্রুত

পায়ে এগিয়ে গেল শ্যামার দিকে । শবনম

শ্যামার পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে ওকে

দেখে । সংগ্রাম তড়িতে শ্যামার কাছে

বসলো । সবাই এখানে উপস্থিত থাকলেও

কাউকে গ্রাহ্য করলো না । সে নিজ

উদ্যোগে এক হাত শ্যামার গালে রেখে

উদ্বিগ্ন নরম কন্ঠে শুধালো.....



" কি হয়েছে বেগম ? এভাবে বসে আছো

কেনো ? চোখে,

চোখে পানি কেনো তোমার ?

এমন দেখাচ্ছে কেনো তোমায় ? কি

হয়েছে তোমার ? 



শ্যামার ঠোঁট ভেঙে আসলো এ পর্যায়ে ।

ছলছল চোখ দুটো দিয়ে দুই ফোঁটা পানি

টুপ করে গড়ালো । সংগ্রাম আবারো

বিচলিত কন্ঠে বলল....



" কি হয়েছে তোমার ? 


দাদি জান , কি হয়েছে শ্যামার ? ভাবি , কি

হয়েছে এখানে ? তোমরা সবাই একসাথে

এখানে কি করছো ? 



শবনম শান্ত কন্ঠে শান্তনা দিলো....

'' আরে ভাই , কিছু হয় নি তেমন । এতো

উত্তেজিত হয়ো না তো ! কিচ্ছু হয় নি

তোমার শ্যামার ! ও একদম ঠিক আছে ।

আসলে একটু ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল

খানিক আগে । আর তেমন কিছু না । 

" জ্ঞান হারিয়েছিল মানে ?

ও জ্ঞান হারিয়েছিল আর

তুমি বলছো কিছু হয় নি ।

আর আমাকে জানাও নি কেনো তোমরা ,

খবর পাঠাও নি কেনো আগে ? 



খানিক ক্ষিপ্ত শোনানো সংগ্রামের তেজি

কন্ঠে বলা কথা গুলো । শবনম থতমত

খেলো এতে । এর আগে সংগ্রাম কখনো

ওর সাথে এভাবে কথা বলে নি ।


আতিয়া বেগম বললেন...



" আরে দাদু ভাই...


নাত বৌ ঠিক আছে এহন । আমরা সবাই

তো আছিলাম এইহানে , তোর ও আওনের

সময় হইয়া গেছিল । তাই আলাদা কইরা

আর জানাই নাই তোরে...তয় নাত বৌ এর

কিছু হয় নাই । একটু ভয় পাইছিলো মনে

হয় । 



সংগ্রাম শ্যামার দিকে ঘুরলো । দুহাত

গালে রেখে বৃদ্ধা আঙ্গুলে শ্যামার গালে

বেয়ে গড়ানো পানি টুকু মুছিয়ে দিলো ।

মোলায়েম কন্ঠ প্রশ্ন করলো....



" ভয় পেয়েছিলে ? ভয়‌ পেয়েছিলে কেনো

বেগম ? 



শ্যামা অধর কাঁপছে তিরতির করে । সে

কিছু বলার আগেই সালেহা ব্যাঙ্গ করে

বলে উঠলেন...



" কচি খুকি তোর বউ ? যে এতো বড়

বাড়িতে , এতো গুলো ভরা লোকের মাঝে

থেকেও ভয় পাবে ? বউয়ের একেবারে

গোলাম হয়ে গেছিস দেখছি ! এভাবে তো

কোনো দিন আমাকে নিয়েও চিন্তা করিস

নি । 



সংগ্রাম তৎক্ষণাৎ উত্তর করলো...



" তোমার স্থান আর আমার বেগমের স্থান

এক নয় আম্মা ! তোমরা দুজন আমার

কাছে দুই মেরুর । তোমাদের দুজনেরই

আলাদা আলাদা যথার্থ গুরুত্ব আছে

আমার কাছে । তুমি আমার গর্ভধারিনী

হলে,ও আমার অর্ধাঙ্গিনী । 


আমার বেগমের স্থান আমার কাছে সম্পুর্ন

আলাদা । ওকে নিয়ে চিন্তা করারও যথার্থ

কারণ আছে । যেটা তোমাদের কারোরই

অজানা নয় ।



শ্যামা বিস্মিত হয়ে নিগুড় চোখে তাকিয়ে

থেকে শুনলো ওর তীব্র কথা গুলো । এই

লোকটার সৌন্দর্য যেভাবে চোখে ধরে ,

ওনার জবানে উচ্চারিত প্রত্যেকটা ধ্বনিও

সেভাবে মনে ধরে । শ্যামার অশান্ত মনকে

শান্ত করার জন্য ওনার একটা টু শব্দই

যথেষ্ট । শ্যামার এখন আর উতলা লাগছে

না । মনটা স্থির হয়েছে এখন । ভয় ডর মুছে

গেছে । সংগ্রাম সালেহার দিকে তাকিয়ে

আছে এখনো । সালেহা দাঁত চেপে চোয়াল

শক্ত করে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন ।

শ্যামা সংগ্রামের দিকে স্থির হয়ে চেয়ে

আছে । শ্যামার সাথে সাথে সংগ্রামের

দিকে আরো এক জোড়া স্থির ছলছল

নয়ন চেয়ে আছে । যেখানে শ্যামার চোখ

প্রাপ্তিতে ভরাট , সেখানে অন্য এক জোড়া

চোখ অপ্রাপ্তির বেদনায় ভরাট । 


সংগ্রাম সালেহার দিক থেকে চোখ

ফিরিয়ে শ্যামার পানে নরম দৃষ্টি পাত

করলো । এদিকে সংগ্রাম চোখ সরাতেই

লতিফা পেছন থেকে ফিসফিস করে

সালেহা কে খুঁচিয়ে বললো কিছু একটা ।

যা শুনে দ্বিগুণ তেঁতে উঠলো সালেহা । শক্ত

কন্ঠে বলল....



" তোর ঐ বউয়ের স্থান কোথায় সেটা

আমাকে আর আলাদা করে বোঝাতে হবে

না তোকে । ওর স্থান জানা আছে আমার !

পাগল একটা... তুই দেখ তোর পাগল বউ

এর পাগলামি । আমার ওসব দেখার ইচ্ছা

নেই...


থাক তুই তোর বউ কে নিয়ে....



কথা টা বলেই আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা

করলো না সালেহা । হুড়হুড় করে ঘর

থেকে বেরিয়ে গেল । পিছন পিছন মুখ

ঝামটা দিয়ে স্থান ত্যাগ করলো লতিফা ।

সংগ্রাম তপ্ত শ্বাস ফেললো । আতিয়া

বেগম দুদিকে মাথা নাড়ালেন । অতঃপর

তিনিও ধীরে সুস্থে নিঃশব্দে পা বাড়ালেন

ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য । শবনম ও

দাঁড়ালো না আর । সবাই বের হতেই ঘর

ফাঁকা হলো । বালা এখনো বসে আছে

নিস্তেজ হয়ে । নির্বাক হয়ে একবার

তাকাচ্ছে শ্যামার দিকে , অন্যবার

সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম শ্যামার দিকে

চেয়ে আছে । বালা অস্বস্তি বোধ করলো ।

চোখ নামিয়ে সেও নামলো নিঃশব্দে ।

সংগ্রাম ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে

দেখলো । বালা ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা

চাপিয়ে দিয়েছে । সংগ্রাম চোখ ফিরিয়ে

শীতল কন্ঠে বলল....



" কি হয়েছিল ? ভয় পেয়েছিলে কেনো ? 



শ্যামা ঢোক গিলে সংগ্রামের হাত শক্ত

করে ধরে বলতে আড়ম্ভ করলো...



" ছোট জমিদার সাহেব,, বিশ্বাস করুন

আমি মিথ্যা বলছি না । আমি স্পষ্ট

শুনেছি, বাইরে কেউ ছিল । ঘুঙ্গুর পড়ে

হাটছিলো কেউ । এই ঘরের দরজা , এই

ঘরের দরজাটাও বাইরে থেকে আটকে

দিয়েছিল কেউ । আমি একদম মিথ্যা

বলছি না , আপনি অন্তত বিশ্বাস করুন

আমায় । সেই দিন ও আমি অনুভব

করেছিলাম , বাইরে কেউ ছিল । আর

আজ আবারও । 


বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে

পড়লো শ্যামা ‌।

 সংগ্রাম বললো...



" শান্ত হও বেগম । আমি বিশ্বাস করি

তোমায় । আমি জানি তুমি মিথ্যা বলছো

না । ভয় পেয়ো না, আমি আছি তো । আমি

খোঁজ করবো , তখন বাইরে কে ছিল

জানবো আমি । একদম চিন্তা করো না ।

ভয় পাবে না আর । 



শ্যামা ঢোক গিলছে বারবার । সংগ্রাম

ক্লান্তি হীন চেয়ে থেকে ওকে জড়ালো

নিজের বুকের মাঝে । শ্যামা তার ছোট

জমিদার সাহেবের বুকে মুখ গুজে তৃপ্ত

শ্বাস ফেললো । কিছু সময় বাদ শ্যামা শান্ত

হতেই সংগ্রাম বিছানা ছেড়েছে । হাত মুখ

ধুয়ে পোশাক পরিবর্তন করে আবারো

বসেছে শ্যামার কাছে । সংগ্রামের আদেশ

অনুযায়ী রাতের খাবার একটা কাজের

মেয়ে দিয়ে গেছে ঘরে । পেটে ক্ষুধা থাকায়

হাত মুখ ধুয়ে এসেই খেয়ে নিয়েছে সংগ্রাম ,

সাথে শ্যামাও । সংগ্রামের কিছু একটা মনে

পড়তেই সে শ্যামা কে বললো...



" বেগম ,, আমি বাইরে যাই একটু ।

অতিথি শালায় যেতে হবে একবার । পাঁচ

মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসবো । 



শ্যামা খপ করে ওর হাতটা ধরলো । বাঁধা

হীন নিচু কন্ঠে বলল...



" কোথাও যাবেন না আপনি । 


সংগ্রাম মুচকি হাসলো । শ্যামা মাথায়

খোপা করা । খোঁপা ছুটে ছোট ছোট চুল

গুলো এলোমেলো হয়ে আছড়ে পড়েছে

কপাল ও মুখে । সংগ্রাম হাত বাড়িয়ে ছোট

ছোট চুল গুলো সযত্নে কানের পাশে গুজে

দিতে দিতে বলল....



" মাথায় তেল দাও নি ? 



শ্যামা মাথা নোয়ালো । কন্ঠ খাদে নামিয়ে

বললো...



" না...



শ্যামার চুল কোমর ছড়ানো । তার উপর

ঘন অধিক । এতো বড় চুলে অন্য কেউ

তেল দিতেই হিমশিম খেয়ে যায় । সেখানে

শ্যামা নিজে নিজে তেল দেওয়া তো বড্ড

পেরেশানির কাজ । এমনিতেও শ্যামা একা

একা কখনও মাথায় তেল দেয় নি । অলকা

দিয়ে দিতো সবসময় । এখন তো আম্মা

নেই ‌। কাল সকালে শবনমের কাছে তেল

দিয়ে নেবে ভেবেছিল । 


সংগ্রাম শ্যামা কে পরখ করে নির্দ্বিধায়

বললো...

" তেল নিয়ে এসো তো , বেগম ! 

শ্যামা চাইলো তৎক্ষণাৎ ।

বিস্মিত হয়ে শুধালো...



" কি করবেন ? 



" আমার বেগমের এই রেশমের মত চুলে

অতি যত্নের সহিত তেল দিয়ে দেবো ।

জানো ,

এটা আমার অনেক আগের ইচ্ছে ।

নিজের বেগম কে যত্ন সহকারে

ভালোবাসার মধ্যে এটাও একটা । আমি

তোমার যত্নে কোন ত্রুটি রাখতে চাই না ,

আর না আমার দায়িত্ব পালনে । আমি

আমার দায়িত্ব পালন করি, আর তুমি

আমার কাছ থেকে তোমার প্রযোজ্য, প্রাপ্য

যত্ন টুকু বুঝে নাও । যাও নিয়ে এসো...

শ্যামা মুচকি হাসলো । কোনো কথা

বললো না । তেল নিয়ে এসে বসলো

সংগ্রামের পাশে । হাতে ধরিয়ে দিলো ।

সংগ্রাম ওষ্ঠ বাড়িয়ে শ্যামার কপালে পরশ

আকলো আলতো । অতঃপর তেলের

ডিব্বা টা ঠোঁট কামড়ে উল্টে পাল্টে দেখে

নিলো । সংগ্রাম কি করে এটা দেখার

অপেক্ষায় শ্যামা ঠোঁট চেপে বসে আছে ।

সংগ্রাম শ্যামার খোঁপা টা খুলে দিলো ।

শ্যামার কালো ঘন চুলে নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ

টেনে নিলো মন ভরে । 


অতঃপর......



চলবে
..........

 

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×