![]() |
লেখিকা :সুরভী আক্তার পর্ব:২২ -----------------------বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগ মুহুর্ত । সূর্য অস্ত গেছে কেবল । আকাশ ঢেকে আছে কালো মেঘে । বৃষ্টি আসবে না, সম্ভবনাও নেই কোনো । তবে আকাশের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি নামবে । দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয় । সেখান থেকেই কালো মেঘ ছুটে এসেছে মাধবপুরে । সেই আসরের পর থেকেই ঘাটের সিঁড়িতে একলা আনমনা হয়ে বসে আছে ময়না । ওর এই ভাবটা একেবারে নতুন । চঞ্চলা হয়েও ও কখনো ঘাটের দিকে তেমন ভেড়ে নি । এভাবে এতো সময় ধরে বসে থাকা তো দূরের কথা । তবে এখন তো ও বদলেছে । ওর অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে । এই যেমন, সবসময় গড়িমা করা মেয়েটা কেমন চুপসে গেছে । চঞ্চল মেয়েটা গুটিয়ে গেছে , সুন্দর চেহারা খানাও শুকিয়েছে , সাজগোজ ও করে না আজকাল । প্রয়োজনের বেশি কথাও বলে না । সেই তখন থেকেই ঘাটে বসে আছে ও । পড়নের শাড়ির আঁচলটা অবহেলিতের ন্যায় বিছিয়ে আছে ঘাটের সিঁড়িতে । গোসলের পর থেকেই চুল গুলো খোলা , এখনো খোলাই আছে । নদীর পাড়ের মৃদু বাতাসে আলতো ঢেউ খাচ্ছে সেগুলো । ময়না চেয়ে আছে নদীর পানে । নড়ছে না একটুও । পাথরের ন্যায় বসে আছে , ক্ষিয় কাল পর পর পলক পড়ছে চোখে । আজ যেন শ্যামার অনুরূপ লাগছে ওকে । চোখ মুখ শুকনো মেয়েটার । সন্ধ্যা গড়াচ্ছে তবুও ঘরে আসার নাম নেই । জাভেদ যায় নি , আজ থাকবে । কাল ফিরবে বাড়িতে । অতঃপর রুপা আর একটু সুস্থ হলে জাভেদ ওকে ফেরাবে নিজের কাছে । এই দুদিন রুপার সাথে টুকটাক একটু আধটু হলেও কথা বলে সময় পার করেছে ময়না । আজ কাল আবার সময় বইতেই চায় না । এক পলক কে এক প্রহরের সমান মনে হয় । সেই প্রহর মনে মনে গুনে চলে ময়না । এখন ঘরে রুপার সাথে জাভেদ আছে । ঐ ঘরে যাওয়া ভালো দেখায় না । অলকাও রান্না করছেন । তার কাছেও বসতে ইচ্ছে করে না । আম্মার তীর্যক দৃষ্টি অস্বস্তিতে ফেলে দেয় ময়না কে । ময়না বসে বসে ভাবছিল কিছু । ঝিঁঝিঁ পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে । মশাও হানা দিচ্ছে । এমন সময় পিছন থেকে মোখলেছের শীতল কন্ঠে ডাক ভেসে আসলো.... " ময়না... হুট করে আব্বার ডাক কানে আসায় ময়না ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নড়ে চড়ে উঠলো । চকিতে পিছন ফিরতেই মোখলেছকে দেখতে পেল সে । মোখলেছ দাঁড়িয়ে আছেন বড় আমগাছটার কাছে । আলো আঁধারের মাঝে তার নরম অসহায় চাহনি নজরে আসলো ময়নার । ময়না বসা ছেড়ে উঠলো তৎক্ষণাৎ । মাথার চুল গুলো হাত খোঁপা করে আটকালো কোনো রকমে । অতঃপর ধৃত পায়ে এসে দাঁড়ালো আব্বার সম্মুখে । শুকনো হাসার চেষ্টা করে বললো.... " কও আব্বা ,,, মেয়ের মুখে হাসি দেখে মোখলেছ ও জোর পূর্বক ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে মোলায়েম কন্ঠে বললেন... " আন্ধার হইতাছে তো , এই হানে একলা একলা বইসা কি করতাছোস ? ঘরে যা... " যাইতাছি ! তুমি কখন আইছো আব্বা ? " কেবল আইলাম ! ময়না চোখ নামালো । মোখলেছ চেয়ে আছে কেমন করে । চেয়ে থেকেই হুতাশ হয়ে শ্বাস ফেললেন তিনি । কম্পমান হাত বাড়িয়ে মেয়ের মাথায় রাখলেন । নিরিহের ন্যায় অদ্ভুত স্বরে বললেন.... " তোর আম্মা কথা কয় না তোর লগে ? " কয় তো । তয় আমার কথা কইতে ইচ্ছা করে না । আম্মার দিকে তাকাইতেই মনে চায় না । বুক কাঁপে আমার । জানো আব্বা,, মনে হয় আমার ভয় লাগে... মোখলেছ হাত নামালেন । পল্লব ঝাপটে ঢোক গিলে বললেন... " জামাই আইবো না ? ময়না কপাল কুঁচকে চোখে চোখ রেখেই পাল্টা প্রশ্ন করলো... " আওনের কথা আছে বুঝি ? মোখলেছ নজর ঘোরালেন এদিক ওদিক । কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলার মতো কথা খুঁজে পেলেন না তিনি । ময়না চেয়ে আছে । মোখলেছ মেয়ের দিকে তাকাতে পারলেন না , ঝট করে প্রসঙ্গ পাল্টালেন তিনি.... " ঘরে যা তুই , আমি আড়তে যাইতাছি আবার । মেলা কাম আছে । বাড়তি সময় কাম করলে আলাদা কইরা টাকা পামু , চিন্তা করিস না । আমি আইতাছি... বলা শেষ করে এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলেন না আর । দ্রুত পায়ে ময়নার সামনে থেকে স্থান ত্যাগ করলেন তিনি । ময়না আব্বার চলার পানে তাকিয়ে ফিকে হাসলো । ঘাটের দিকে ঘুরে আকাশের পানে মুখ তুললো । চোখ বুজে দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো বুক ভরে । ঠান্ডা বাতাস নাসারন্ধ্রের ভিতরে প্রবেশ করা মাত্রই কেঁপে উঠলো ময়না । এদিকে বিকেলের দিকে সংগ্রাম বেরিয়েছে আবারো । হাজার বারনের পরও শ্যামা সবার অগোচরে রান্না ঘরে ঢুকেছে । শ্যামা কে দেখে তটস্থ উপস্থিত সমস্ত গৃহকর্মীরা । সালেহা আর লতিফা কড়া ভাবে শ্যামা কে হেঁশেলের আশে পাশে যেতেও নিষেধ করেছেন । তাদের কথার অবমাননা হলে শ্যামার কি হবে জানা নেই , তবে বাকিদের হেনস্থা করা হবে কটু কথার দ্বারা । যার ভয়ে সবাই অনুনয় বিনয় করে শ্যামা কে কাটানোর চেষ্টা করলো রান্না ঘর থেকে । কিন্তু কাজ হলো না । শ্যামার কাজ নেই কোনো , ঘরেও সবসময় একা একা থাকতে ভালো লাগে না । শবনমের কাছে যাওয়া যেত , কিন্তু এই সময় জুনাইদ বাড়িতে আছে । তাই সেখানে ও যাওয়া হলো না । আতিয়া বেগমের মাজায় ব্যাথা বেড়েছে, শ্যামা তাকে অতি যত্ন সহকারে তেল মালিশ করে দিচ্ছিল এতক্ষণ । এখন তিনিও আরাম পেয়ে ঘুমিয়েছেন একটু । আর কোথায় যাওয়ার আছে শ্যামার ? তাই শত বাঁধার পরও রান্না ঘরেই সই । শ্যামা নড়লো সেখান থেকে । একপাশে বসলো গুটিসুটি হয়ে । আজ আর রান্না বান্নায় হাত লাগালো না শ্যামা । এমনিতেও জমিদার বাড়ির বউয়েরা রান্না বান্নায় হাত লাগায় না তেমন । এতদিনে সালেহা কে রান্না ঘরের দরজা মাড়াতে অবধিও দেখে নি শ্যামা । আর লতিফা তো আর যাই হোক বাড়ির মেয়ে । শবনম ও তেমন রান্না ঘরে ঢোকে না । যা করার বাড়ির কাজের লোকরাই করে । সবার চাহিদা আর সূচি অনুযায়ী রান্না করা হয় রোজ । শ্যামা কে এভাবে সামনে বসে থাকতে দেখে কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে বোধহয় সবার । সব গৃহকর্মীরা বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে শ্যামার দিকে । আড়ষ্টতায় গুটিয়ে আছে তারা , ভয়ে বুক ঢিপঢিপ করছে । এই বোধহয় শ্যামা কোনো ভুল ধরবে । তাই হয়তো এভাবে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে ওদের কর্মকাণ্ড । শ্যামা সবার জড়তা বুঝে অস্বস্তি কাটিয়ে হাসার চেষ্টা করলো । টুকটাক কথা বলতে আড়ম্ভ করলো সবার সাথে । এভাবে বেশ কিছু সময় কেটে গেছে । মাগরিবের আজানের ধ্বনি পড়ছে কানে । শ্যামা কথা বাড়িয়ে আর সময় পার করলো না । নামাজের জন্য রান্না ঘর ত্যাগ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠলো নিজের ঘরে । শ্যামা বের হতেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সবাই । বুকে হাত দিয়ে প্রবল তপ্ত শ্বাস ফেললো । ভয় ছিলো যদি সালেহা বা লতিফা দেখে ফেলে , তাহলে পরবর্তীতে কথা শুনতে হবে ওদের । শ্যামার যাওয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো । শ্যামা মেয়ে টাকে বেশ পছন্দ হয়েছে সবার । কেউ আগ বাড়িয়ে কথা বলে নি কখনো , কিন্তু যতটুকু দেখেছে বা কথা বলেছে ততটুকু তে শ্যামা কে তাদের মনে ধরেছে বেশ । মেয়েটার গায়ের রং শ্যামলা হলেও মনটা উজ্জ্বল । শ্যামা ঘরে এসে নামাজ পড়ে নিলো । অতঃপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো । ঠান্ডা কমে আসছে এখন । শীত বিদায় নিচ্ছে ধীরে ধীরে । চারদিকে রিক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে । আজকাল ঠান্ডা লাগে না তেমন । তবে সকাল সন্ধ্যা শিরশিরে ঠান্ডা বাতাস বয় । শ্যামার পড়নে দামি একটা কাতান শাড়ি । খোলা বারান্দায় দাঁড়ানোর সাথে সাথে একটা দমকা ঠান্ডা হাওয়া ছুঁয়ে দিলো শ্যামা কে । শ্যামা কেঁপে উঠলো । শাড়ির আঁচল টেনে শরীরে পেঁচিয়ে নিলো । আলমারি ভর্তি সংগ্রামের জোয়ার্দারের জমিদারি শাল । দুদিন আগে আরো কতগুলো এসেছে শহর থেকে । সংগ্রাম এক শাল দ্বিতীয় বার পড়ে না । আগের পরিহিত ব্যবহার করা শাল গুলো বিলিয়ে দেওয়া হয় হয়তো । সংগ্রাম আগে বলেছিল একবার । সংগ্রামের কথা মনে আসতেই মুচকি হাসলো শ্যামা । কিছু একটা ভেবে বারান্দা ছেড়ে ঝট করে ঘরে ঢুকলো । সকালে সংগ্রাম যে শালটা পড়েছিল সেটা বিছানার একপাশে গুছিয়ে রেখেছে শ্যামা । শ্যামা হাতে নিলো সেটা । ভাঁজ খুলে গায়ে জড়িয়ে আবারো খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো । শালের প্রতিটা সুতোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে একটা মিষ্টি সুবাস আকৃষ্ট করছে শ্যামা কে । বরাবরই এই তীব্র ঝাজালো গন্ধ টা নাকে বাঁধে শ্যামার । আতরের গন্ধের সাথে সাথে পুরুষালি শরীরের ঝাঁজালো ঘ্রাণের মিশ্রণে অদ্ভুত মাদকিয় একটা গন্ধ । শ্যামা শাল টাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে অতিব কামুকতায় উপলব্ধি করলো গন্ধ টাকে । পর মূহুর্তে শ্বাস ফেলে মুচকি হাসলো সে । নিচে বাগানের দিকে চোখ পড়লো এবার । অতিথি শালার বাইরে খোলা আকাশের নিচে গোল বৈঠক বসেছে ছেলে মেয়েদের । সংগ্রাম তখন ওদের সম্পর্কে বলেছে শ্যামা কে । শ্যামার দৃষ্টি ওদের দিকে যেতেই কপাল কুঁচকে আসলো আপনা আপনি । বৈদ্যুতিক আলোয় সবার চেহারা স্পষ্ট । সবাই চেয়ারে বসে গোল হয়ে আড্ডায় মজেছে বোধহয় । সবার মধ্য থেকে শ্যামার চোখ খুঁজে নিলো সেই মেয়ে টাকে। ঐতো একপাশে বসে আছে । মেয়েটার দুই পাশেই দুটো ছেলে । শ্যামা মেয়ে টাকে দেখে বিরক্ত হলো । চোখ ফেরালো সহসা । সংগ্রামের শাল টাকে জড়িয়ে ওর কথা বলা গুলো ভেবে মুচকি হাসলো । কোনো এক দিকে এক ধ্যানে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ । ওর ধ্যান ভাঙ্গলো দরজার খট করে ওঠা শব্দে । অকস্মাৎ ভড়কে গিয়ে পিছন ফিরলো শ্যামা । সংগ্রাম এসেছে এই ভেবে বারান্দা থেকে দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকলো । দরজা চাপিয়ে ঘরে ছিল সে , এখন দরজার দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলো দরজাটা বন্ধ । কপাল গুটালো শ্যামা । ঘরে সংগ্রাম নেই , তারমানে আসে নি সে । তাহলে শব্দ হলো কিসের ? নিজের ভাবনাতেই সংকিত হয়ে দরজার কাছে গিয়ে থামলো শ্যামা । হাত বাড়িয়ে খোলার চেষ্টা করলো দরজাটা । তবে খুললো না । শ্যামা শক্ত হাতে পুনরায় খোলার চেষ্টা করলো দরজা খানা , আবারো বিফল । মনে হয় আটকে গেছে, কিন্তু কি করে ? বাইরে থেকে লাগিয়েছে কেউ ? কে লাগাবে ? আর কেন ? আচমকা ভয় কাজ করলো ভীত নারী হৃদয়ে ! চারদিকে কেমন নিঃসঙ্গ গুমোট ভাব ঠেকলো । ভিতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলো একলা ঘরে । শ্যামা এদিক ওদিক তাকালো , বিশাল ঘর পুরোটাই ফাঁকা । মৃদু বাতাসে বারান্দার পাশের জানালার পর্দা গুলো উড়ছে । শ্যামা বরাবরই ঘরে একা থাকে ,ভয় লাগে না , সংগ্রাম কাছে থাকলে তো একেবারেই না । তবে আজ কেমন জানি গাঁ ছমছম করে উঠলো । বুকটা ধক্ করে উঠলো । শ্যামা শুকনো ঢোক গিললো , শুকনো অধর ভেজালো জিভে । অতঃপর কাঁপা হাতে পুনরায় দরজা ধাক্কালো, মৃদু স্বরে ডাকলো.... " কেউ আছেন বাইরে ? দরজা টা খুলে দিন না ! আটকে গেছে দরজা টা । ভাবি আছেন ? ওপাশে কারোর সাঁড়া নেই । আর না কেউ দরজা খুলে দিল । হয়তো কেউ নেই আশেপাশে । এমনিতেই ঘরের ভেতরের শব্দ মোটা দেয়াল ভেদ করে বাইরে কম পৌঁছায় । শ্যামা শান্ত হলো । বোঝালো নিজেকে , চাপানো দরজা মৃদু বাতাসে বন্ধ হয়েছে হয়তো । আর নয়তো কেউ নিশ্চয়ই মজা করছে ? ছোট জমিদার সাহেব নয়তো ? এটা ভেবেই জোর পূর্বক এক চিলতে হাসি ফুটালো নিজের ঠোঁটের কোণে । শ্যামা আর দরজা ধাক্কালো না । সংগ্রাম কি করে এটা দেখার জন্য সরে আসলো দরজার সামনে থেকে । এক নজরে তাকিয়ে রইল দরজার দিকে । এভাবে কাটলো আরো কয়েক মুহূর্ত । কেউ দরজা খুললো না, আর না কারোর উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে । শ্যামা একই ভাবে তাকিয়েই কপাল কুঁচকালো । সরু করলো চাহনি । আচমকা বিকট শব্দে ধাম করে খুলে গেল দরজা টা । দরজা বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামা চমকে উঠলো তৎক্ষণাৎ । চোখে পলক ফেলে আবারো বৃহৎ নয়নে তাকালো । বক্ষ স্থল ধক্ করে উঠলো মুহুর্তেই । দরজা খোলার সাথে সাথে দমকা হাওয়া ছুঁইয়ে দিয়েছে শ্যামার শরীর কে । শিহরণে আপাদমস্তক কেঁপে উঠলো শ্যামার । তবুও ক্ষিয় কাল বাদ হাসার চেষ্টা করলো সে । কম্পন রত পায়ে ছোট ছোট কদম ফেলে এগোতে এগোতে হালকা স্বরে ডাকলো... " ছ.. ছোট জমিদার সাহেব...! আপনি এখানে...? এগোতে এগোতে দরজার বাইরে পা রাখলো । পুরো করিডোরে কেউ নেই । সম্পুর্ন টা ফাঁকা । উজ্জ্বল আলোয় মার্বেল পাথরের মেঝে চকচক করছে । শ্যামা এবার হাঁফ ছাড়ল । বুকে হাত রেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । সিঁড়ির কাছে এগিয়ে গিয়ে নিচের দিকে দৃষ্টি পাত করলো, বসার ঘরে কেউ নেই । দুজন কাজের মেয়ে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো , ওরা ট্রে হাতে অন্দরের বাইরের দিকে বেরোলো । শ্যামা তপ্ত শ্বাস ফেললো আবারো । কেউ নেই এখানে , তারমানে অতিরিক্ত ভয়ের কারণে হয়তো মনের ভুল । এটাই মনকে বোঝালো শ্যামা । এক মুহুর্তের জন্য মন এটা মানলেও পরক্ষনে অন্য চিন্তা মাথায় আসলো । দরজা টা বন্ধ হলো কিভাবে , আর খুললোই বা কিভাবে ? বাতাস ও তো তেমন নেই ? ঘরের ভেতর তো একেবারেই না , যা আছে খোলা বারান্দায় । আর এতো ভারি শাল কাঠের দরজা সামান্য বাতাসে এক চুল নড়ার ও কথা নয় । শ্যামা সব চিন্তা ঝেড়ে দুদিকে মাথা নাড়ালো । অতঃপর ঘরের দিকে পা বাড়ালো । দরজা মাড়ানোর আগেই আশেপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা ঝুনঝুন শব্দ কানে ঠেকলো শ্যামার । তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে গেল শ্যামা । পা দুটো থমকে গেল । ঝট করে পিছন ফিরে কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করলো । কোথাও থেকে নুপুর, না না ঘুঙ্গুরের শব্দ ভেসে আসছে । হ্যাঁ , এটা তো ঘুঙ্গুরের শব্দ ! বুঝতে অসুবিধা হলো না শ্যামার । শ্যামা তীক্ষ্ণ ভাবে কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করলো কোথা থেকে আসছে শব্দটা । ঠাহর করতে পারল না । মনে হচ্ছে সবদিক থেকেই শব্দ টা শোনা যাচ্ছে । আবারো ভড়কালো শ্যামা । ভীত নারী সত্ত্বা চুপসে গেল । শ্যামা এদিক ওদিক ঘন পল্লব ফেললো । এলোমেলো পায়ে বালার ঘরের দিকে এগোলো । বাড়িতে একমাত্র বালা'ই নুপুর পড়ে । হয়তো ওর ঘর থেকেই শব্দ ভেসে আসছে । শ্যামার পা এগোচ্ছে, তবে মনে হচ্ছে এইটুকু পথ পেরোচ্ছে না , শেষ হচ্ছে না ওর ঘর থেকে বালার ঘরের সামান্য দূরত্বটুকু । সেই দিনের মতো দম বন্ধ হয়ে আসছে শ্যামার , হাঁসফাঁস লাগছে , ঠান্ডা তেও ঘামছে পুরো শরীর । মনে হচ্ছে ঠিক সেই দিনের মতো দুদিকের সাদা দেওয়াল গ্রাস করে নিচ্ছে ওকে । চারদিক কেমন শুন্য আর ঘোলাটে- ঝাপসা হয়ে আসছে , এলোমেলো লাগছে । মনে হচ্ছে গোলক ধাঁধার মতো শ্যামা কে কেন্দ্র বিন্দুতে রেখে গন্ডি পাকিয়ে ঘুরছে সবকিছু । শ্যামা চলতে চলতে থেমে গেল । মাথা টা চক্কর দিয়ে উঠলো । পড়তে পড়তে দেয়ালে হাত ঠেসে নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়ালো সে । চোখ খিচে বন্ধ করে একহাতে মাথা চেপে ধরলো । ঘুঙ্গুরের আওয়াজ এখন বিলিন । শোনা যাচ্ছে না আর । আবারো নিস্তব্ধ চারদিক । শ্যামা দম ফেলছে ঘনঘন । কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম , চিবুক বেয়ে গড়াচ্ছে দুই ফোঁটা । শ্যামা চোখ তুললো । নিস্তেজ চোখে আশেপাশে তাকালো । এখনো কেউ নেই । শ্যামার এই অবস্থা কেউ কি দেখছে না ? পা টলমল করছে শ্যামার । অদ্ভুত ভাবে পা দুটো কাঁপছে । শ্যামা এবার পথ পাল্টে এগোনোর চেষ্টা করলো নিজের ঘরের দিকে । দেয়াল ঘেঁষে ধরে ধরে কোনো রকমে এগোচ্ছে সে । কয়েক কদম এগোতেই আবারো সেই ঘুঙ্গুরের আওয়াজ । এবার আওয়াজ টা খুব কাছে । মনে হয় ঠিক পেছনে , শ্যামার পিছু পিছু এগোচ্ছে কেউ । প্রত্যেক কদমেই ঝুনঝুন শব্দ বাজছে । গায়ে কাঁটা দিলো শ্যামার । দুর্বল চাহনি বৃহৎ হলো । পিছন ফেরার সাধ্যি টুকু নেই ওর । শ্যামা থামলো , গলা শুকিয়ে আসছে , শুল্ক ঢোক গিললো সে । ও থামার সাথে সাথে শব্দ টাও থেমে গেল । কয়েক সেকেন্ড পর এবার দৃঢ় পায়ে পা বাড়ালো শ্যামা , পা বাড়ানোর সাথে সাথে আবারো সেই ঘুঙ্গুরের শব্দ । ভয়ে আতকে উঠলো শ্যামা । এক ঝটকায় পিছন ফিরলো । কি আজব , কেউ তো নেই এখানে ! তাহলে....? শ্যামা কাঁপা গলায় হাওয়ায় প্রশ্ন ছুঁড়লো... " কে এখানে ? ক..কেউ আছেন ? কেউ নেই ! শ্যামা কপালের ঘাম মুছলো হাতের উল্টো পিঠে । জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে চোরা চোখ ঘোরালো এদিক ওদিক । কাউকে না দেখে আবারও পিছন ফিরলো , চোখ বন্ধ করে দম খিচে এক পা এগোতেই আবারো সেই একই শব্দ । এবার আর সহ্য হলো না শ্যামার । মাথা ফেটে যাচ্ছে মনে হচ্ছে । শ্যামা দুহাতে কান চেপে ধরে চোখ খিচে গলা চিরে বিকট আওয়াজে জোরে চিৎকার করে উঠল । সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে । ★ রাত ঠিক আটটা... সংগ্রাম জোয়ার্দারের ঘরের ঘড়ির কাঁটায় টিকটিক শব্দ হচ্ছে । টিকটিক শব্দের সাথে সময় গুনছে সবাই । ঘরে সবাই উপস্থিত , শবনম আর আতিয়া বেগম চিন্তিত মুখে খাটের দুই পাশে বসে আছেন । শ্যামা তাদের মাঝে অবচেতন হয়ে শুয়ে আছে । সেই যে চিৎকার করে জ্ঞান হারালো , তখন থেকে জ্ঞান ফেরেনি আর । ওর চিৎকারের শব্দে বাইরে বেরিয়েছিল সবাই । শ্যামা কে মেঝেতে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে সবাই বিস্মিত । কোনো রকমে ধরে বেঁধে ওর নিস্তেজ শরীর টাকে ঘরে নিয়ে আসা হয়েছে । পানি ছেটানো হয়েছে মুখে , তবুও জ্ঞান ফেরেনি । বালা ও চিন্তিত মুখে বসে আছে শ্যামার পায়ের কাছে । সালেহা আর লতিফা মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দরজা বরাবর । শ্যামার এই অবস্থা তেও তাদের মুখে চিন্তার রেশ টুকুও নেই । এমনকি শ্যামার মুখ পানে তাকানোর রুচি টুকুও নেই বোধহয় । তাইতো মুখ ঝামটাচ্ছেন বারবার । চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি তাদের । এতক্ষণে একটু নড়ে উঠলো শ্যামা । এক হাত মাথায় রেখে চোখ খুললো পিটপিট করে । মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে । চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে । তবুও চোখ দুটো আবছা খুলে বোঝার চেষ্টা করলো বর্তমান পরিস্থিতি । সরু ঝাপসা চোখে ঘরের মধ্যে বাড়ির সবার উপস্থিতি দেখে থমকালো । ভ্রু যুগল জড়ো হয়ে আসলো আপনা আপনি । শ্যামা কে চোখ খুলে নড়চড় করতে দেখে আতিয়া বেগম খানিক ঝুঁকে উদ্বিগ্ন হয়ে পরপর শুধালেন.... " নাত বৌ , ও নাত বৌ.. কি হইছে নাত বৌ ? ভালা আছোস নি এহন? কি হইছে তোর... এমনে জ্ঞান হারাইলি ক্যামনে ? কি হইছিলো...? শ্যামা শুনলো । তবে সাথে সাথে উত্তর করলো না । চোখ ঘুরিয়ে সবাই কে এক পলক করে দেখে নিলো । অতঃপর দূর্বল শরীরে শোয়া থেকে উঠে বসার চেষ্টা করলো । শবনম সাহায্য করলো উঠে বসতে । শ্যামা পিঠের কাছে বালিশ রেখে আধশোয়া হয়ে হেলান দিলো পিছনের দিকে । কপাল চেপে চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলো । সবকিছু ধ্যানে আসতেই ঝট করে চোখ খুললো শ্যামা । বৃহৎ চঞ্চল নেত্রে এদিক ওদিক তাকালো । শ্যামা কে উদ্বিগ্ন দেখে শবনম ওর হাত ধরে শুধালো.... " শ্যামা,, কি হয়েছে বোন ? কি দেখছো ? ঠিক আছো তুমি ? বাইরে ওভাবে জ্ঞান হারালে কিভাবে ? শ্যামা শবনমের হাত দুটো খপ করে চেপে ধরলো । কম্পিত গলায় ফিসফিস করলো..... " কেউ ,, কেউ ছিল ওখানে ! ব.. বাইরে কেউ ছিল ! ঐ ঘুঙ্গুরের আওয়াজ,, ওটা, ওটা কোথা থেকে আসছিল ? আমি, আমি শুনেছি । আপা কেউ ছিল বাইরে..... আমি এমনি এমনি জ্ঞান হারাইনি । কেউ তো ছিল । আহহ্... মাথাটা ফেটে যাচ্ছে আমার.... শবনমের হাত ঝাড়া দিয়ে ছেড়ে দুহাতে মাথা চেপে শেষের কথাটা বললো শ্যামা । আতিয়া বেগম আর শবনম শ্যামার কথা গুলো না বুঝে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো । বালা কপাল কুঁচকে তাকালো । শ্যামার পায়ের কাছ থেকে উঠে ওর পাশে বসলো । লতিফা বালার এহেন কান্ড দেখে চোখ মুখ শক্ত করে তাকালেন। দাঁতে দাঁত পিষলেন তিনি । রুষ্ট কন্ঠে ঝংকার তুলে বললেন... " এই ,, তুই ঐ মেয়ের কাছে ঘেষছিস কেনো এভাবে ? দূরে সরে ওর থেকে ! বালা কথায় পাত্তা দিলো না । প্রতিক্রিয়াও দেখালো না কোনোরূপ । বরং আরো কাছাকাছি বসে নরম কন্ঠে শ্যামা কে শুধালো... " শ্যামা ,, কি হয়েছে ? কি সব বলছো তুমি ? কি শুনেছো ? আর , ঘুঙ্গুরের আওয়াজ কোথা থেকে আসবে ? শ্যামা হাত নেড়ে বাঁধ সাধলো.... " না ,,, বাইরে আমি শুনেছি ঘুঙ্গুরের শব্দ । বিশ্বাস করো কেউ তো ছিল , কিন্তু আমি দেখতে পাই নি কাউকে । সেইদিন ও আমি অনুভব করেছিলাম..আর আজ আবার । কিন্তু আজ ঐ ঘুঙ্গুরের আওয়াজ , ওটা.... " এই মেয়ে ,, কিসব বলছিস তুই ? পাগল হয়ে গেছিস ? পাগলের প্রলাপ বকছিস ? জমিদার বাড়িতে ঘুঙ্গুর আসবে কোথা থেকে ? ওসব নর্তকীদের জিনিস এই বাড়িতে আনবে কার সাধ্যি ? কান খারাপ, নাকি মাথা খারাপ তোর ? শ্যামা কে কথার মাঝে থামিয়ে কটাক্ষ করে কথা গুলো বললো সালেহা । শ্যামা ফের বাঁধ সাধলো.... " বিশ্বাস করুন আম্মা ,, আমি মিথ্যে বলছি না । আমি স্পষ্ট শুনেছি । ঐ ঘুঙ্গুরের তীক্ষ্ণ আওয়াজ অনেক বার শুনেছি আমি । প্রথমে ভেবেছিলাম মনের ভুল । কিন্তু আমার মনের ভুল ছিল না । সত্যি শুনেছি আমি .... এবার বিদ্রুপ করলো লতিফা । দুপা এগিয়ে ঝাঁজালো কন্ঠে বলল.... " চুপ কর অপয়া মেয়ে । একে তো নাটক করছিস , তার উপর আবার মুখে মুখে তর্ক করছিস । মুখের চোপা বেড়েছে তোর ? শ্যামা অসহায়ের মতো মাথা ঝাঁকালো । পুনরায় বোঝানোর স্বরে বলার চেষ্টা করলো কিছু । ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আতিয়া বেগম বলে উঠলেন.... " থাক নাত বৌ । শান্ত হ তুই । আমগো জমিদার বাড়িতে ঐ সব ঘুঙ্গুর কোই থাইকা আইবো ক ? তুই মনে হয় ভুল শুনছোস । " আমি ভুল শুনি নাই দাদি জান.... " হইছে ... এই নিয়া আর কথা বাড়াইস না । ভুল হইতেই পারে মাইনষের । তুই একটু আরাম কর ,, দম নে , দেখবি মাথা পাতলা হইলে সব ঠিক হইয়া যাইবো । ভয় পাইছিলি মনে হয় , তাই তো জ্ঞান হারাইছিলি । শ্যামার চোখ ছলছল করছে । ও যে মিথ্যে বলছে না । সত্যি সত্যি শুনেছে সবটা ! কি করে বোঝাবে সবাইকে ? কেউ তো ওর কথা বোঝার চেষ্টা টুকু ও করছে না । শ্যামা উশখুশ করছে , অস্থির লাগছে ভীষণ । এর মধ্যে সংগ্রাম ঢুকলো ঘরে । স্বভাব সুলভ গায়ের শাল খুলতে খুলতে ঘরে ঢুকলো । চোখ তুলে ঘরে সবাইকে দেখে কপাল কুঁচকালো । বিশেষ করে সালেহা আর লতিফা কে দেখে । ওর নিঃশব্দ উপস্থিতি টের পায় নি কেউ । সংগ্রাম গলা ঝেড়ে বললো.... " কি হয়েছে এখানে ? একই সাথে দরজার দিকে তাকালো সবাই । শ্যামাও তাকালো ছলছল নয়নে । লতিফা একটু কাত হয়ে পিছন ফিরতেই সংগ্রাম খাটে গুটিয়ে বসে থাকা শ্যামা কে দেখতে পেলো । শ্যামার ছলছল চাহনি নজর কাড়লো সবার আগে । অমনি আঁতকে উঠলো সে । হাতের শাল টা ছুড়ে মারলো পাশের টেবিলের উপর । দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল শ্যামার দিকে । শবনম শ্যামার পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে ওকে দেখে । সংগ্রাম তড়িতে শ্যামার কাছে বসলো । সবাই এখানে উপস্থিত থাকলেও কাউকে গ্রাহ্য করলো না । সে নিজ উদ্যোগে এক হাত শ্যামার গালে রেখে উদ্বিগ্ন নরম কন্ঠে শুধালো..... " কি হয়েছে বেগম ? এভাবে বসে আছো কেনো ? চোখে, চোখে পানি কেনো তোমার ? এমন দেখাচ্ছে কেনো তোমায় ? কি হয়েছে তোমার ? শ্যামার ঠোঁট ভেঙে আসলো এ পর্যায়ে । ছলছল চোখ দুটো দিয়ে দুই ফোঁটা পানি টুপ করে গড়ালো । সংগ্রাম আবারো বিচলিত কন্ঠে বলল.... " কি হয়েছে তোমার ? দাদি জান , কি হয়েছে শ্যামার ? ভাবি , কি হয়েছে এখানে ? তোমরা সবাই একসাথে এখানে কি করছো ? শবনম শান্ত কন্ঠে শান্তনা দিলো.... '' আরে ভাই , কিছু হয় নি তেমন । এতো উত্তেজিত হয়ো না তো ! কিচ্ছু হয় নি তোমার শ্যামার ! ও একদম ঠিক আছে । আসলে একটু ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল খানিক আগে । আর তেমন কিছু না । " জ্ঞান হারিয়েছিল মানে ? ও জ্ঞান হারিয়েছিল আর তুমি বলছো কিছু হয় নি । আর আমাকে জানাও নি কেনো তোমরা , খবর পাঠাও নি কেনো আগে ? খানিক ক্ষিপ্ত শোনানো সংগ্রামের তেজি কন্ঠে বলা কথা গুলো । শবনম থতমত খেলো এতে । এর আগে সংগ্রাম কখনো ওর সাথে এভাবে কথা বলে নি । আতিয়া বেগম বললেন... " আরে দাদু ভাই... নাত বৌ ঠিক আছে এহন । আমরা সবাই তো আছিলাম এইহানে , তোর ও আওনের সময় হইয়া গেছিল । তাই আলাদা কইরা আর জানাই নাই তোরে...তয় নাত বৌ এর কিছু হয় নাই । একটু ভয় পাইছিলো মনে হয় । সংগ্রাম শ্যামার দিকে ঘুরলো । দুহাত গালে রেখে বৃদ্ধা আঙ্গুলে শ্যামার গালে বেয়ে গড়ানো পানি টুকু মুছিয়ে দিলো । মোলায়েম কন্ঠ প্রশ্ন করলো.... " ভয় পেয়েছিলে ? ভয় পেয়েছিলে কেনো বেগম ? শ্যামা অধর কাঁপছে তিরতির করে । সে কিছু বলার আগেই সালেহা ব্যাঙ্গ করে বলে উঠলেন... " কচি খুকি তোর বউ ? যে এতো বড় বাড়িতে , এতো গুলো ভরা লোকের মাঝে থেকেও ভয় পাবে ? বউয়ের একেবারে গোলাম হয়ে গেছিস দেখছি ! এভাবে তো কোনো দিন আমাকে নিয়েও চিন্তা করিস নি । সংগ্রাম তৎক্ষণাৎ উত্তর করলো... " তোমার স্থান আর আমার বেগমের স্থান এক নয় আম্মা ! তোমরা দুজন আমার কাছে দুই মেরুর । তোমাদের দুজনেরই আলাদা আলাদা যথার্থ গুরুত্ব আছে আমার কাছে । তুমি আমার গর্ভধারিনী হলে,ও আমার অর্ধাঙ্গিনী । আমার বেগমের স্থান আমার কাছে সম্পুর্ন আলাদা । ওকে নিয়ে চিন্তা করারও যথার্থ কারণ আছে । যেটা তোমাদের কারোরই অজানা নয় । শ্যামা বিস্মিত হয়ে নিগুড় চোখে তাকিয়ে থেকে শুনলো ওর তীব্র কথা গুলো । এই লোকটার সৌন্দর্য যেভাবে চোখে ধরে , ওনার জবানে উচ্চারিত প্রত্যেকটা ধ্বনিও সেভাবে মনে ধরে । শ্যামার অশান্ত মনকে শান্ত করার জন্য ওনার একটা টু শব্দই যথেষ্ট । শ্যামার এখন আর উতলা লাগছে না । মনটা স্থির হয়েছে এখন । ভয় ডর মুছে গেছে । সংগ্রাম সালেহার দিকে তাকিয়ে আছে এখনো । সালেহা দাঁত চেপে চোয়াল শক্ত করে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন । শ্যামা সংগ্রামের দিকে স্থির হয়ে চেয়ে আছে । শ্যামার সাথে সাথে সংগ্রামের দিকে আরো এক জোড়া স্থির ছলছল নয়ন চেয়ে আছে । যেখানে শ্যামার চোখ প্রাপ্তিতে ভরাট , সেখানে অন্য এক জোড়া চোখ অপ্রাপ্তির বেদনায় ভরাট । সংগ্রাম সালেহার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে শ্যামার পানে নরম দৃষ্টি পাত করলো । এদিকে সংগ্রাম চোখ সরাতেই লতিফা পেছন থেকে ফিসফিস করে সালেহা কে খুঁচিয়ে বললো কিছু একটা । যা শুনে দ্বিগুণ তেঁতে উঠলো সালেহা । শক্ত কন্ঠে বলল.... " তোর ঐ বউয়ের স্থান কোথায় সেটা আমাকে আর আলাদা করে বোঝাতে হবে না তোকে । ওর স্থান জানা আছে আমার ! পাগল একটা... তুই দেখ তোর পাগল বউ এর পাগলামি । আমার ওসব দেখার ইচ্ছা নেই... থাক তুই তোর বউ কে নিয়ে.... কথা টা বলেই আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না সালেহা । হুড়হুড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । পিছন পিছন মুখ ঝামটা দিয়ে স্থান ত্যাগ করলো লতিফা । সংগ্রাম তপ্ত শ্বাস ফেললো । আতিয়া বেগম দুদিকে মাথা নাড়ালেন । অতঃপর তিনিও ধীরে সুস্থে নিঃশব্দে পা বাড়ালেন ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য । শবনম ও দাঁড়ালো না আর । সবাই বের হতেই ঘর ফাঁকা হলো । বালা এখনো বসে আছে নিস্তেজ হয়ে । নির্বাক হয়ে একবার তাকাচ্ছে শ্যামার দিকে , অন্যবার সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম শ্যামার দিকে চেয়ে আছে । বালা অস্বস্তি বোধ করলো । চোখ নামিয়ে সেও নামলো নিঃশব্দে । সংগ্রাম ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে দেখলো । বালা ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা চাপিয়ে দিয়েছে । সংগ্রাম চোখ ফিরিয়ে শীতল কন্ঠে বলল.... " কি হয়েছিল ? ভয় পেয়েছিলে কেনো ? শ্যামা ঢোক গিলে সংগ্রামের হাত শক্ত করে ধরে বলতে আড়ম্ভ করলো... " ছোট জমিদার সাহেব,, বিশ্বাস করুন আমি মিথ্যা বলছি না । আমি স্পষ্ট শুনেছি, বাইরে কেউ ছিল । ঘুঙ্গুর পড়ে হাটছিলো কেউ । এই ঘরের দরজা , এই ঘরের দরজাটাও বাইরে থেকে আটকে দিয়েছিল কেউ । আমি একদম মিথ্যা বলছি না , আপনি অন্তত বিশ্বাস করুন আমায় । সেই দিন ও আমি অনুভব করেছিলাম , বাইরে কেউ ছিল । আর আজ আবারও । বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়লো শ্যামা । সংগ্রাম বললো... " শান্ত হও বেগম । আমি বিশ্বাস করি তোমায় । আমি জানি তুমি মিথ্যা বলছো না । ভয় পেয়ো না, আমি আছি তো । আমি খোঁজ করবো , তখন বাইরে কে ছিল জানবো আমি । একদম চিন্তা করো না । ভয় পাবে না আর । শ্যামা ঢোক গিলছে বারবার । সংগ্রাম ক্লান্তি হীন চেয়ে থেকে ওকে জড়ালো নিজের বুকের মাঝে । শ্যামা তার ছোট জমিদার সাহেবের বুকে মুখ গুজে তৃপ্ত শ্বাস ফেললো । কিছু সময় বাদ শ্যামা শান্ত হতেই সংগ্রাম বিছানা ছেড়েছে । হাত মুখ ধুয়ে পোশাক পরিবর্তন করে আবারো বসেছে শ্যামার কাছে । সংগ্রামের আদেশ অনুযায়ী রাতের খাবার একটা কাজের মেয়ে দিয়ে গেছে ঘরে । পেটে ক্ষুধা থাকায় হাত মুখ ধুয়ে এসেই খেয়ে নিয়েছে সংগ্রাম , সাথে শ্যামাও । সংগ্রামের কিছু একটা মনে পড়তেই সে শ্যামা কে বললো... " বেগম ,, আমি বাইরে যাই একটু । অতিথি শালায় যেতে হবে একবার । পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসবো । শ্যামা খপ করে ওর হাতটা ধরলো । বাঁধা হীন নিচু কন্ঠে বলল... " কোথাও যাবেন না আপনি । সংগ্রাম মুচকি হাসলো । শ্যামা মাথায় খোপা করা । খোঁপা ছুটে ছোট ছোট চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছড়ে পড়েছে কপাল ও মুখে । সংগ্রাম হাত বাড়িয়ে ছোট ছোট চুল গুলো সযত্নে কানের পাশে গুজে দিতে দিতে বলল.... " মাথায় তেল দাও নি ? শ্যামা মাথা নোয়ালো । কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো... " না... শ্যামার চুল কোমর ছড়ানো । তার উপর ঘন অধিক । এতো বড় চুলে অন্য কেউ তেল দিতেই হিমশিম খেয়ে যায় । সেখানে শ্যামা নিজে নিজে তেল দেওয়া তো বড্ড পেরেশানির কাজ । এমনিতেও শ্যামা একা একা কখনও মাথায় তেল দেয় নি । অলকা দিয়ে দিতো সবসময় । এখন তো আম্মা নেই । কাল সকালে শবনমের কাছে তেল দিয়ে নেবে ভেবেছিল । সংগ্রাম শ্যামা কে পরখ করে নির্দ্বিধায় বললো... " তেল নিয়ে এসো তো , বেগম ! শ্যামা চাইলো তৎক্ষণাৎ । বিস্মিত হয়ে শুধালো... " কি করবেন ? " আমার বেগমের এই রেশমের মত চুলে অতি যত্নের সহিত তেল দিয়ে দেবো । জানো , এটা আমার অনেক আগের ইচ্ছে । নিজের বেগম কে যত্ন সহকারে ভালোবাসার মধ্যে এটাও একটা । আমি তোমার যত্নে কোন ত্রুটি রাখতে চাই না , আর না আমার দায়িত্ব পালনে । আমি আমার দায়িত্ব পালন করি, আর তুমি আমার কাছ থেকে তোমার প্রযোজ্য, প্রাপ্য যত্ন টুকু বুঝে নাও । যাও নিয়ে এসো... শ্যামা মুচকি হাসলো । কোনো কথা বললো না । তেল নিয়ে এসে বসলো সংগ্রামের পাশে । হাতে ধরিয়ে দিলো । সংগ্রাম ওষ্ঠ বাড়িয়ে শ্যামার কপালে পরশ আকলো আলতো । অতঃপর তেলের ডিব্বা টা ঠোঁট কামড়ে উল্টে পাল্টে দেখে নিলো । সংগ্রাম কি করে এটা দেখার অপেক্ষায় শ্যামা ঠোঁট চেপে বসে আছে । সংগ্রাম শ্যামার খোঁপা টা খুলে দিলো । শ্যামার কালো ঘন চুলে নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ টেনে নিলো মন ভরে । অতঃপর...... চলবে.......... |

0 Comments