একাকীত্বের শেষ সীমানা (মা - ছেলে) (পার্ট -০১)




লেখক:Masranga

চ্যাপ্টার ১ – সাধারণ দিনগুলো



ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই রাহাতের নাকে ভেসে আসে মসুর ডালের গভীর, ঘন সুগন্ধ। সঙ্গে পেঁয়াজ আর রসুন ভাজার হালকা ঝাঁঝালো ঘ্রাণ মিশে একটা আরামদায়ক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাকপ্যাকটা দরজার পাশের কোণে ফেলে দিয়ে সে জুতো খোলে। ব্যাকপ্যাকের চেন খোলা ছিল, ভেতর থেকে একটা কুঁচকে যাওয়া কাগজ পড়ে যায়—গণিতের ক্লাস টেস্টের উত্তরপত্র। ২৮ নম্বর। রাহাত দ্রুত কাগজটা কুড়িয়ে পকেটে ঢুকিয়ে দেয়। মায়ের সামনে এটা দেখাতে একদম ইচ্ছে করে না।

রাহাত আহমেদ এখন ঠিক ১৮ বছরের যুবক। নটরডেম কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ে। লম্বা, স্লিম-অ্যাথলেটিক গড়নের ছেলে। গায়ের রং ফর্সা, চুল ছোট করে কাটা, কালো আর ঘন। চোখ দুটো বড়-বড়, কিন্তু সারাদিনের কলেজ, কোচিং আর টিউশনের চাপে চারপাশে হালকা কালি পড়েছে। হাসলে দাঁতের ফাঁকটা এখনো ছেলেমানুষি মায়া ছড়ায়। সে দরজা বন্ধ করে সিঙ্কের কাছে গিয়ে হাত-মুখ ধোয়। ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নেয়—ক্লান্তি স্পষ্ট।

“রাহাত! এসে গেছিস?” রান্নাঘর থেকে শিউলির গলা ভেসে আসে। শিউলি আক্তার, রাহাতের মা। বয়স চল্লিশের মাঝামাঝি। তিনি এখনো শুন্দরী। গায়ের রং ফর্সা, মুখটা গোলাকার কিন্তু খুবই আকর্ষণীয়—নরম, গভীর চোখ, হালকা টোলওয়ালা গাল। হাসলে মুখটা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। শরীরটা স্বাস্থ্যবতী, একটু পুষ্ট—কিন্তু গঠন অসাধারণ সুন্দর। কার্ভি ফিগার, ঘড়ির কাঁটার মতো hourglass শেপ। কোমর সরু, নিতম্ব আর বুকের লাইনগুলো প্রাকৃতিকভাবে পূর্ণ আর মাদকতাময়। বছরের পর বছর সংসার সামলাতে গিয়ে শরীরে যে স্বাভাবিক পূর্ণতা এসেছে, তা তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পরনে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ, চুল খোঁপা করে বাঁধা, হাতে হলুদের হালকা দাগ। মুখে স্নেহ আর একটু উদ্বেগ মিলেমিশে এক অপূর্ব মায়া।

শিউলি চুলায় হাঁড়ি ঢেকে রেখে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসেন। “আজ কলেজ থেকে টিফিন খেয়েছিস তো? আমি যে ভাত-মুরগি দিয়েছিলাম?”
“হ্যাঁ, খেয়েছি।” রাহাত টেবিলে বসে। প্লেটে ভাতের ওপর মসুর ডাল, মুরগির ঝোল, আলু ভর্তা আর শসার কয়েকটা টুকরো। সে খেতে শুরু করে। শিউলি নিজের প্লেট নিয়ে উল্টোদিকে বসেন।
“আজ কলেজে কী হলো?” প্রশ্নটা প্রতিদিনের, যেন একটা অভ্যাস।
“কিছু না... টেস্ট হয়েছে গণিতে।”
শিউলি চামচ থামিয়ে তাকান। চোখে সামান্য উদ্বেগ। “কেমন হলো?”
“ভালোই।” রাহাত মুখ নামিয়ে খেয়ে যায়। শিউলি আর জিজ্ঞেস করেন না। তিনি জানেন, ছেলে যদি সত্যিই খারাপ করে থাকে তাহলে নিজেই বলবে। না বললে চুপ থাকাই ভালো।
খাওয়া শেষ করে রাহাত সোফায় গিয়ে বসে। টিভি অন করে। Netflix-এ একটা লাইট কমেডি শো চালিয়ে দেয়। কখনো পুরোনো অ্যানিমের ক্লিপ দেখে হাসে—নস্টালজিয়ায়। কার্টুন দেখার অভ্যাস এখন আর নেই, কিন্তু মাঝে মাঝে পুরোনো SpongeBob বা Adventure Time-এর ক্লিপ দেখলে মনটা একটু হালকা হয়ে যায়।
শিউলি প্লেট তুলে রান্নাঘরে যান। ধোয়ার শব্দ আসে। মাঝে মাঝে তাকান ছেলের দিকে। রাহাত সোফায় হেলান দিয়ে বসে হাসছে। শিউলির মুখে হালকা হাসি ফোটে। অন্তত বাড়িতে ফিরে এলে ছেলেটা রিল্যাক্স করে, শান্তি পায়।

বাবা আব্দুর রহমান ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। এখন চট্টগ্রাম শাখায় অডিটের কাজে। তিন দিন হয়ে গেল। রাতে ফোন করে বলেছিলেন, “আর কয়েকদিন লাগবে। অনেক কাগজপত্র। তুমি আর রাহাত ভালো থেকো।”
শিউলি বলেছিলেন, “ঠিক আছে। তুমি সাবধানে থেকো। খেয়ে-দেয়ে নিও।”

ফোন রাখার পর তিনি একটুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। তারপর উঠে রাহাতের ঘরে যান। ছেলে পড়তে বসেছে। বইয়ের সামনে খাতা খোলা, কিন্তু পেন্সিলটা হাতে নিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। জানালা দিয়ে দেখা যায় আফতাবনগরের সবুজ-সবুজ এলাকা, দূরে রামপুরা খাল আর বনশ্রীর দিকে বাঁশের সাঁকো। এলাকাটা পরিকল্পিত, ব্লক করে সাজানো। এখানে গ্রিনারি এখনো অনেক, হাটিরঝিলের কাছাকাছি, গুলশান-বনানী যাওয়া সহজ। কিন্তু রাহাতের জীবনটা এখনো কলেজ আর পড়াশোনার মাঝে ঘুরপাক খায়।
শিউলি দরজায় দাঁড়িয়ে বলেন, “পড়া করছিস?”
“হুম।” রাহাত খাতার দিকে তাকায়।
শিউলি কাছে এসে বসেন। খাতাটা টেনে নেন। “এই অংশটা কী লিখেছিস? দেখি।”
রাহাত খাতা এগিয়ে দেয়। শিউলি চোখ বড় করে পড়েন। “এখানে ভুল হয়েছে। ‘x’ এর জায়গায় ‘y’ লিখেছিস। আর হাতের লেখা একটু ধীরে কর, পরীক্ষার সময় দেখতে অসুবিধা হবে।”
“ওহ।” রাহাত পেন্সিল দিয়ে ঘষে ঠিক করে। শিউলি পাশে বসে থাকেন। মাঝে মাঝে বলেন, “আরেকটু পরিষ্কার করে লিখ।”
পড়া শেষ হলে রাহাত বই বন্ধ করে। শিউলি উঠতে উঠতে বলেন, “কাল সকালে উঠে আবার এই অধ্যায়টা দেখবি। আমি চেক করব।”
“আচ্ছা।”

শিউলি ঘর থেকে বেরিয়ে যান। দরজা খোলা রেখে যান। রাহাত আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। অন্ধকারে সে ভাবে—বাবা যদি থাকতেন তাহলে আজ বাবার সাথে ক্রিকেট নিয়ে গল্প করতে পারত, বা কোনো ম্যাচের আলোচনা। কিন্তু বাবা নেই। তাই মা এসেছিলেন।
এক রাতে রাহাতের হঠাৎ জ্বর এলো। রাত দুটোর দিকে। সে ঘুমের মধ্যে কাঁপছিল। শিউলি ঘুম ভেঙে উঠে এলেন। কপালে হাত দিয়ে দেখলেন খুব গরম। তাড়াতাড়ি পানি এনে কপাল ভিজিয়ে দিলেন। ওষুধ খাওয়ালেন। রাহাতের পাশে বসে রইলেন।
“মা... ঠান্ডা লাগছে।” রাহাত কাঁপা গলায় বলে।
শিউলি নিজের চাদরটা খুলে রাহাতের গায়ে দেন। তারপর ছেলের পাশে শুয়ে পড়েন। রাহাতের কপালে হাত রেখে আস্তে আস্তে হাত বোলান। রাহাত চোখ বন্ধ করে। মায়ের হাতের উষ্ণতায় ধীরে ধীরে ঘুম এসে যায়।
সকালে জ্বর একটু কমে। শিউলি রাহাতকে কলেজে যেতে দেন না। সারাদিন তার পাশে থাকেন। খিচুড়ি রান্না করেন। পানি এনে দেন। ওষুধ খাওয়ান। দুপুরে রাহাত যখন একটু ভালো বোধ করে, শিউলি বলেন,
“আজ থেকে তুই আর একা অসুস্থ হবি না। আমি থাকব। সবসময়।”
রাহাত হালকা হেসে বলে, “ধন্যবাদ মা।”
শিউলি হাসেন। কিন্তু হাসির মাঝে একটা ছোট্ট কষ্ট মিশে থাকে। ছেলেটা বড় হয়ে গেছে। কলেজে পড়ে, বন্ধুবান্ধব হচ্ছে, নিজের জগৎ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এখনো তার জন্য দরকারি। আর সে নিজেও বুঝতে পারেন—এই ছেলেটা না থাকলে বাড়িটা সত্যিই খালি হয়ে যাবে। বাবা তো সারাদিন বাইরে। ফোন করেন ঠিকই, কিন্তু ফোন তো আর হাতের ছোঁয়া নয়।
সন্ধ্যায় রাহাত একটু উঠে বসে। শিউলি চা নিয়ে আসেন। দুজনে টেবিলে বসে চা খান। টিভি চালানো নেই। শুধু বাইরের রাস্তার শব্দ, দূরে আজানের আওয়াজ আর পাশের ব্লক থেকে ছেলেদের খেলার হৈচৈ। আফতাবনগরের এই শান্ত পরিবেশে সবুজের ছোঁয়া এখনো আছে, হাতিরঝিলের কাছাকাছি বলে বাতাসটা একটু ঠান্ডা।
শিউলি বলেন, “কাল থেকে আবার কলেজ যাবি। কিন্তু রাতে পড়া আমি দেখব। টেস্টের আগে আরও ভালো করে প্রিপারেশন নিবি।”
“আচ্ছা।”
রাহাত চায়ের কাপে চুমুক দেয়। তার মনে হয়—মা যদি সবসময় এমন কাছে থাকতেন। আর শিউলির মনে হয়—যতদিন ছেলেটা তার কাছে আছে, ততদিন তো সব ঠিক আছে।

দিনগুলো এভাবেই চলতে থাকে। কোনো বড় ঘটনা নেই। কোনো নাটক নেই। শুধু ছোট ছোট মুহূর্ত। একটা মা আর তার ১৮ বছরের ছেলে। যারা একই ছাদের নিচে থাকে। যারা একে অপরের অনুপস্থিতিতে অভ্যস্ত নয়। যারা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে—একজন ছাড়া অন্যজনের দিনটা পুরোপুরি হয় না।

আর এই সাধারণতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পরবর্তী সব অস্বাভাবিকতার প্রথম বীজ। খুব ছোট। খুব নরম। কিন্তু উপস্থিত।

(চলবে)

Post a Comment

0 Comments

🔞 সতর্কতা: আমার ওয়েবসাইটে কিছু পোস্ট আছে ১৮+ (Adult) কনটেন্টের জন্য। অনুগ্রহ করে সচেতনভাবে ভিজিট করুন। ×